খুলনা-১ আসনে মোট ভোটারের চেয়ে বেশি ভোট পড়েছে। এরকম ‘খবর’ প্রকাশ করে এক প্রতিবেদক গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাকে  গ্রেপ্তার করা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায়। এই আইনে একজন সংবাদকর্মীর বিচার হতে পারে কি? কিংবা এই গ্রেপ্তারের ঘটনা কি সংবাদমাধ্যমের দুর্দিন বা স্বাধীনতাহীনতার প্রতীক/প্রমাণ? এই বিষয় দুটি আলাদা আলোচনার দাবি রাখে যা এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়।

নির্বাচনের ফল প্রকাশের রাত। সেসময় খবর এলো কোনো আসনে ‘ভোটার সংখ্যার চেয়ে বেশি ভোট পড়েছে’। এরকম ‘খবর’ স্বাভাবিকভাবেই বার্তাকক্ষে কর্মরতদের জন্য উত্তেজনাকর ও আগ্রহোদ্দীপক। সেই আগ্রহ ও উত্তেজনার কাছে পরাজিত হয়েছে সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি।

২.

গ্রেপ্তার হওয়া সংবাদকর্মী ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন ও বাংলা অনলাইন সংবাদমাধ্যম বাংলা ট্রিবিউনের খুলনা প্রতিনিধি।  তবে তার দেয়া ‘বেশি ভোট’ বিষয়ক ‘খবর’টি প্রকাশ হয় শুধু ঢাকা ট্রিবিউনে।  বাংলা ট্রিবিউনে কি তিনি ‘খবর’টি পাঠাননি? এমনও হতে পারে যে তিনি পাঠিয়েছেন কিন্তু বাংলা ট্রিবিউন তা প্রকাশ করেনি। বাংলা ট্রিবিউনের ক্ষেত্রে দুটির কোনটি ঘটেছিল তা আমার জানা নেই।

ঢাকা ট্রিবিউন তার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত খবরটি মুছে দিয়েছে।  ‘Khulna 1 constituency: 22,000 extra votes cast’ শিরোনামে প্রকাশিত খবরটির লিঙ্কে ক্লিক করলে ‘পেইজ নট ফাউন্ড’ বার্তা পাওয়া যাচ্ছে।  প্রকাশিত ‘খবর’ সম্পর্কে কোনো ধরনের ব্যাখ্যা না দিয়ে সেটি স্রেফ মুছে দিয়েছে ঢাকা ট্রিবিউন।  কিন্তু খবরটি যখন তারা পেলেন, তখন কি এর সত্যতা ও নির্ভুলতা তারা নিশ্চিত করেছিলেন? যদি করে থাকেন, খবরের সত্যতার প্রমাণ যদি তাদের কাছে থাকে তাহলে তারা খবরটি মুছে দেবেন কেন? খবরের সত্যতা ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করার জন্য তারা সময় নিতে পারতেন। খুলনা প্রতিনিধি যতক্ষণ না তার খবরের সত্যতার কোনো প্রমাণ দিচ্ছেন ততক্ষণ পর্যন্ত তারা এই খবর প্রকাশের জন্য অপেক্ষা করতে পারতেন।

এখানে ভুলে যাওয়া যাবে না যে সংবাদকর্মীর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও কোনো সংবাদের সত্যতার প্রমাণ।  কিন্তু এই ঘটনার ক্ষেত্রে সংবাদকর্মী কোনো ‘ঘটনা’র খবর দিচ্ছেন না, ফলে প্রত্যক্ষদর্শীর প্রমাণ নীতি খাটানো যায় না।  ওই সংবাদকর্মী তথ্য সরবরাহ করছিলেন। সেই তথ্যের সত্যতার কোনো না কোনো প্রমাণ সংরক্ষণ করা তার জন্য বাঞ্ছনীয়। রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছ থেকে ফলের নথির কপি ওই প্রতিনিধি কি কৌশলে সংগ্রহ করতে পারতেন? কিংবা রিটার্নিং কর্মকর্তার কোনো অডিও রেকর্ড সংরক্ষণ করতে পারতেন?

এই প্রমাণ সংরক্ষণের বিষয়টি যে মৌল গুরুত্বপূর্ণ নীতি তা বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল আইনে সাংবাদিকদের জন্য আচরণ বিধিতেও সতর্ক করা আছে: “অন্যান্য গণমাধ্যমের তুলনায় সংবাদপত্রের প্রভাবের ব্যাপ্তি ও স্থায়িত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি। এ কারণে যে সাংবাদিক সংবাদপত্রের জন্য লিখবেন তার সূত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা বা সত্যতা সম্পর্কে বিশেষভাবে সাবধান থাকা এবং ঝুঁকি এড়ানোর জন্য সূত্রসমূহ সংরক্ষণ করা;”। ১৯৯৩ সালে তৈরি হওয়া এই আচরণবিধি সংশোধন হয় ২০০২ সালে। তখনো বাংলাদেশে ইন্টারনেটের বিপুল বিস্তার হয়নি। প্রবল প্রচার পায়নি অনলাইন সাংবাদমাধ্যম। এ কারণেই বোধকরি আচরণবিধিতে ‘অনলাইন সাংবাদমাধ্যম’ শব্দ দুটি নেই। না থাকলেও বাংলাদেশে কর্মরত সংবাদকর্মীমাত্রেরই এই আচরণবিধি পড়া ও জানা থাকার কথা।

৩.

ঢাকা ট্রিবিউনের বার্তাকক্ষ তার অনলাইন সংস্করণে খবরটি প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার মৌল নীতি অনুসরণে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে ৩০ ডিসেম্বর রাতে।  বেশি ভোটের খবরটি ট্রিবিউন অনলাইনে প্রকাশ হয় ৩০ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে।  প্রকাশের পর রাত ১২টা ৪ মিনিটে ফেইসবুকে শেয়ার করেছিলেন একজন পাঠক।  পরে অবশ্য সেই লিঙ্কে খবরটি পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে সেখানে আরেকজন পাঠকের মন্তব্য পাওয়া যায় ২ জানুয়ারি দুপুর আড়াইটায়। তিনি বলছেন, খবরটি তিনি প্রকাশের সময়ই পড়েছিলেন। বেশি ভোটের বিষয়টি যে গণনার ভুল ছিল তা খবরের শেষ অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা ছিল।  ট্রিবিউন বাঁকানো (টুইস্টেড) শিরোনামেই খবরটি প্রকাশ করে। অর্থাৎ ঢাকা ট্রিবিউন অনলাইন ভুলের বিষয়ে জানা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে ‘বেশি ভোট’ পড়ার শিরোনামে খবরটি প্রকাশ করে। এরকম ক্লিক-উপযোগী বাঁকানো শিরোনামের ব্যবহার অহরহই অনলাইন সংবাদমাধ্যমগুলো করে থাকে।

ট্রিবিউন যে সংবাদটি প্রত্যাহার করেছে সেখানেও কোনো নীতি মানা হয়নি। একটি সংবাদমাধ্যম প্রত্যাহার করলে এ বিষয়ে তার ব্যাখ্যা দেয়াটাই যৌক্তিক। ট্রিবিউন তার পুরনো সংবাদের লিঙ্কে এই ব্যাখ্যা সংযুক্ত করতে পারত। কিন্তু তারা তা করেনি। এমনকি তার প্রতিনিধি গ্রেপ্তার ও এ সম্পর্কিত যত খবর ট্রিবিউন প্রকাশ করেছে তার কোনোটিতে খবর বিষয়ে ট্রিবিউনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। তারা কি খবরটি ছাপার ক্ষেত্রে ভুল করেছিল? কিংবা তাদের খবরটি যে সঠিক এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনো প্রমাণ কি আছে? এসবেরও কোনো উত্তর তাদের সংবাদকর্মী গ্রেপ্তার বিষয়ক খবরে নেই।

Responses -- “বার্তাকক্ষের ব্যর্থতা”

  1. রহমান সাদেক

    ইন্টারনেটে সাইট মুছে ফেললেও ইতিহাস রয়েই যাবে। ঢাকা ট্রিবিউনের মত পত্রিকার ইচ্ছা মত পাবলিশ আর ডিলিটকে পাওয়া সহজ।
    https://web.archive.org/web/20181231053009/https://www.dhakatribune.com/bangladesh/election/2018/12/31/khulna-1-constituency-22-000-extra-votes-cast

    Reply
  2. রাহিল

    এই মিথ্যা সংবাদটি কিন্তু প্রথম প্রচার করে মানবব্জমিন, তারাও সংবাদ এর লিঙ্ক থেকে সংবাদ মুছে দিয়েছে কিন্তু চালাকি করে শিরোনামসহ লিঙ্কটি রেখেছে – সামাজিক মাধ্যমে যারা শেয়ার করেছিলেন এখনো তাদের পোস্টে শিরোনামসহ লিঙ্ক দেখায়।
    ট্রিবিউনের ক্ষেত্রেও সেরকমটিই আছে। শিরোনামটিই তাদের মূল প্রোপাগান্ডা ছিল।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—