বিয়ে নিয়ে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজে একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে। সেটা হল, ‘নিজের ছেলেকে বিয়ে দাও এমন একটা মেয়ের সাথে যার অতীত ভাল; আর নিজের মেয়েকে বিয়ে দাও এমন একটা ছেলের সাথে যার ভবিষ্যত ভাল।’ অর্থাৎ লিঙ্গভেদে সন্তানের বিয়েতে দৃষ্টিভঙ্গি থাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম।

একদিন বাদেই বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দেশের সবচেয়ে বড় দুইটি রাজনৈতিক দল, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) উভয়ই এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে দুইটি ভিন্ন জোট করে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দিচ্ছে মহাজোটের, আর বিএনপি নেতৃত্ব দিচ্ছে ঐক্যফ্রন্টের।

ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই জোটগত ও দলীয়ভাবে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেছে। আমি উভয় দলের নির্বাচনী ইশতেহার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পড়ে যতটুকু জেনেছি তাতে একটা জিনিস উপলব্ধি করতে পারছি যে, উভয় দল এককভাবে যে নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছে তাতে আওয়ামী লীগ অতীতকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে, যেখানে বিএনপি গুরুত্ব দিয়েছে ভবিষ্যতকে। অর্থাৎ, একই নির্বাচন নিয়ে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিভঙ্গি কালের হিসেবে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী ঠিক উল্লেখিত মধ্যবিত্ত সমাজের মতো। কারও সময়, ইচ্ছা ও কৌতুহল থাকলে গুগল করে উভয় দলের নির্বাচনী ইশতেহার দেখে নিতে পারেন। এ বিষয়ে শ্রদ্ধেয় জাফর ইকবাল স্যার- ‘আধ ডজন নির্বাচনী ইশতেহার’ শিরোনামে চমৎকার তথ্যবহুল একটি রিভিউ লিখেছেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমসহ আরও বেশ কয়েকটি পত্রিকার বাংলা সংস্করণে (২১ ডিসেম্বর, ২০১৮)।

দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতার মসনদে ছিল তিন টার্ম (প্রায় পনের বছর)। পক্ষান্তরে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপিও সমান সংখ্যাক তিন টার্মে সাকুল্যে ক্ষমতায় ছিল প্রায় দশ বছর। অর্থাৎ, উভয় দলই উল্লেখযোগ্য সময় ধরে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন বর্তমান নেতৃত্বদ্বয়ের অধীনে। ফলে তাদের কেউই অভিযোগ করতে পারবেন না যে, আমরা দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার সূযোগ পায়নি, অতএব আমাদেরকে একবার সূযোগ দেওয়া হোক দেশকে সেবা করার। যেহেতু উভয় দলেরই যথেষ্ট পরিমাণ অতীত অভিজ্ঞতা রয়েছে দেশকে পরিচালনা করার, সুতরাং কোন দলেরই ন্যূনতম সূযোগ নেই অতীতকে উপেক্ষা করে জনগনকে ভবিষ্যতের প্রলোভন দেখিয়ে পুনরায় নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার।

মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানের বিবাহকালীন পরিমাপক এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। তাই ক্ষমতায় থাকাকালীন পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে স্বচ্ছতার সাথে (ভুল হলে অকপটে স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া, আর ভাল কাজের জন্য গর্ব করে জনগনের সামনে তুলে ধরা) নির্বাচনী ইশতেহার জনসাধারণের কাছে তুলে ধরাই হওয়া উচিত প্রতিটি প্রধান রাজনৈতিক দলের আশু কর্তব্য। এক্ষেত্রে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করা যেতে পারে জননেত্রী শেখ হাসিনার সম্প্রতি জনসভাগুলি, যেখানে তিনি কোনও ভুল হয়ে থাকলে তার জন্য অকপটে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন, যেটি উনাকে আরও মহিমান্বিত করেছেন।

তাছাড়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগই একমাত্র রাজনৈতিক দল যারা এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রায় প্রতিটি বিষয়ভিত্তিক অঙ্গীকারের আগে উক্ত বিষয়ে কী কী কাজ সম্পন্ন করেছেন তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন। পক্ষান্তরে বিএনপি ‘ভিশন ২০৩০’ এর আলোকে গৎবাঁধা কিছু চোখ ধাঁধানো অঙ্গীকার নিয়ে এসেছে এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে যার সাথে ক্ষমতায় থাকাকালে তাদের অতীত সাফল্য বা সম্পাদিত কাজের কোন যোগসাজশ নেই।

তবে কি এটাই ধরে নেব যে, তাদের অতীতে কোনও সাফল্য নেই? তারা শুধু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিরোধীদের (বিএনপির সমর্থক নয়)ভোটে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চাচ্ছেন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে?

এবার রাজনৈতিক দলগুলোর মনোনয়নের দিকে নজর দেওয়া যাক। প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ উভয়ই এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্ব স্ব দলের গুটিকয়েক হেভিওয়েট নেতাদের স্ত্রী বা সন্তানদের মনোনয়ন দিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটা অত্যন্ত সাধারণ একটা ব্যাপার। স্ত্রী-সন্তানরাও মনোনয়ন পেয়ে তাদের স্বামীর/বাবার অসমাপ্ত কাজ বা আদর্শকে এগিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়। দেখুন, নতুন মনোনয়নপ্রাপ্ত সবাই কিন্তু নিজ নিজ দলে তাদের অগ্রজদের গ্রহণযোগ্যতার জন্যই মনোনয়ন পেয়েছে, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের কোন কেরামতি এখানে নেই বললেই চলে। আবার, অগ্রজদের ভাল কৃতকর্মের দায়িত্ব তার স্ত্রী/সন্তান নেয় বটে, কিন্তু তাদের কুকর্মের দায়িত্ব কেউ নেয় না। যেমন ধরুন, এবারের নির্বাচনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছে নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ডজন দুয়েক নেতা বা তাদের স্বজনরা। এর মধ্যে অনেকের পূর্বপুরুষের যুদ্ধাপরাধের কারণে শাস্তি হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে পূর্বপুরুষের দায়ভার কেন স্ত্রী/সন্তানদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে? তারা তো আইনের চোখে দোষী নয়। অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত কথা। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, তারা কি মনোনয়ন পেয়েছে নিজ যোগ্যতায় নাকি তাদের পূর্বপুরুষের যোগ্যতায়? উত্তর যদি দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে পূর্বপুরুষের কৃতকর্মের দায়ভার তার স্ত্রী/সন্তানরা কোনওভাবেই এড়াতে পারেন না।

এতোক্ষণ তো আলোচনা করলাম নির্বাচনী ইশতেহার ও মনোনয়ন নিয়ে রাজনৈতিক দলসমুহের অবস্থান। কিন্তু যাদের জন্য এত আয়োজন সেই জনগণ কী ভাবছে? জনগণ কি আদৌ কোন নির্বাচনী ইশতেহার নিয়ে মাথা ঘামায়? নাকি তাদের ভাবনায় শুধুই আমিত্বে সীমাবদ্ধ? অর্থাৎ, আমার ভোট আমি তাকেই দিব যিনি আমার ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষা করতে পারবেন। এটা হতে পারে আমার নিজের বা পরিবারের কোনও সদস্যের চাকরি দেওয়া, ব্যবসায় বৈধ/অবৈধ সহযোগীতা, নিজের সম্পদ সুসংহত করা বা অন্যের সম্পদ/সম্পত্তি ভোগ দখল করতে সহযোগিতা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি বা হাট-বাজারের দখল নিশ্চিত করতে সহযোগিতা ইত্যাদি। কতো শতাংশ জনগণ দেশের ভবিষ্যত চিন্তা করে ভোট দেয়?

কত শতাংশ জনগণ ভোটের আগে দেশের উন্নয়ন সূচকে রাজনৈতিক দলসমুহের অবদান বিবেচনা করে? কত শতাংশ জনগণ ভোট দেওয়ার আগে প্রধান দুই দল সরকারে থাকাকালীন সময়ে দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বিবেচনা করে? কত শতাংশ জনগণ জঙ্গিবাদ দমন বা উৎসাহ প্রসঙ্গে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের অবস্থান বিবেচনা করে?

কত শতাংশ জনগণ সংখ্যালঘু নির্যাতনে রাজনৈতিক দলসমুহের অবস্থান বিবেচনা করে ভোট দেওয়ার সময়? উল্লেখিত কোনও পরিমাপক যদি অধিকাংশ জনগণ ভোটের সময় বিবেচনা না করে থাকে, তাহলে ধূর্ত কোনও রাজনৈতিক দল কি অতীত কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহিতা নিয়ে জনগণের কাছে কখনও আসবেন? আমার তো অন্তত মনে হয় না।

One Response -- “নির্বাচনী ইশতেহার ও জনগণের ভাবনা”

  1. আশরাফ

    সমাজের চৈতন্য ভোঁতা করে দেওয়া, প্রত্যাশার মাত্রা ক্রমেই নামিয়ে আনা সরকারের একটা বড় সাফল্যই বটে। গণমাধ্যম সব সময় ইতিবাচক খবর দিতে চায়। কী সেগুলো? সাফল্যে একের পর এক পুরস্কার, সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর বাহারি অভিযান, সব খারাপ খবর সম্পর্কে কর্তা-মন্ত্রীদের অস্বীকৃতি আর নতুন নতুন প্রতিশ্রুতি। কর্তাদের চোখেমুখে আনন্দ আর উল্লাস। সাফল্যের প্রচারে টিভি, পত্রিকা, সড়ক-মহাসড়ক সয়লাব হয়, আনন্দের বাদ্যবাজনা বাজতে থাকে।ভাষ্যকারদের অবিরাম মিথ্যা ভাষণ এবং নির্লিপ্ত অবস্থান থেকে বোঝা যায় যে তাদের আদেশ অনুযায়ী, অসার কথাগুলোই জনগণকে বিশ্বাস করতে হবে এবং যদি কেউ না করে তাতে তাদের কিছু এসে-যায় না। এসব মিথ্যা ভাষণের পক্ষে কথা বলার মতো সুবিধাভোগী সুধীসমাজও দেশে তৈরি হয়েছে! তাতে সরকার খুবই নিশ্চিন্ত।
    সরকার তাই পূর্ণ বিজয়ীর বেশে। বাংলাদেশে বিচার বিভাগসহ সব প্রতিষ্ঠান এখন সরকারের করায়ত্ত। নির্বাচনও তার হাতের মুঠোয়। তাই সর্বজনের অর্থ দিয়ে, দেশের উন্নয়নের কথা বলে, যা খুশি তা করায় তার কোনো দ্বিধা নেই, ফাঁসির আসামির দণ্ড মওকুফ করে নেতার ট্যান্ডল হিসেবে কাজ করতে দিতে কোনো সংকোচ নেই, বিচারব্যবস্থা চুরমার করতে কোনো দুশ্চিন্তা নেই। শত শত মানুষ বিনা বিচারে খুন-গুম হয়ে যাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তা তো নেই–ই বরং এসব নিয়ে সরকারের তরফে এমন অনেক কিছু বলা হয়, তা অনেকটাই তামাশার মতো।সরকারের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত বিজয়ের সুর। এই বিজয় চিরস্থায়ী এবং অপ্রতিরোধ্য এ রকম একটি ভাব থেকে তৈরি হয়েছে অতি-আত্মবিশ্বাস। সেখান থেকে এসেছে বেপরোয়া এবং থোড়াই কেয়ার মনোভঙ্গি। বিদেশি বৃহৎ ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো তাদের চাহিদা পূরণ হওয়ায় খুশি, দেশের ভেতর ক্ষমতার নানা কেন্দ্র নিজ নিজ চাহিদার চেয়ে বেশি পেয়ে খুশি। সরকারের তাই এ রকম ধারণা হয়েছে যে তার আর জবাবদিহির কোনো দরকার নেই। যা খুশি তা–ই করলে কোনো কিছু যায়-আসে না।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—