আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ মহল এমনকি সাধারণের চায়ের আড্ডায়- সর্বত্র বাংলাদেশের অর্থনীতির বিস্ময়কর উন্নতি নিয়ে হচ্ছে ব্যাপক আলোচনা। বিশ্বখ্যাত পরামর্শক সংস্থা ‘পিডাব্লিউসি’ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে ২০১৭  সালে, যার শিরোনাম ছিল ‘২০৫০ সালে বিশ্ব’।

ওই প্রতিবেদন অনুসারে ভিয়েতনাম, ভারত এবং বাংলাদেশ হবে আগামী  দিনে  পৃথিবীর সবচাইতে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশ।  ক্রয়ক্ষমতার সমতার (Purchasing Power Parity – PPP) ভিত্তিতে ২০৫০ সালে দেশটি  হবে বিশ্বের ২৩তম বৃহৎ অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের  (আইএমএফ) এর হিসেব অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৩১তম।  স্বনামধন্য  মার্কিন  বহুজাতিক  বিনিয়োগ ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাকস এর সাবেক  চেয়ারম্যান ও প্রাক্তন ব্রিটিশমন্ত্রী জিম ও নেইল এক গবেষণাপত্রে ব্রিকস (BRICS – Brazil, Russia, India, China, South Africa) রাষ্ট্র  সমূহের পরে অর্থনৈতিক উন্নতির সম্ভাবনার দৃষ্টিকোণ থেকে যে এগারোটি রাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশ তাদের মধ্যে অন্যতম।

সম্প্রতি অর্থনীতির প্রচলিত বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় অগ্রগতি সাধন  করেছে। বিগত একদশকের বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে দেশজ  উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি গড়ে ছয় শতাংশ ছিল। এটি নি:সন্দেহে একটি অনন্য  নজির।  এই  সময় কালে মুদ্রাস্ফীতি ছিল সহনীয় পর্যায়ে। গত দুই অর্থ বছরে  প্রথমবারের মতো জিডিপি প্রবৃদ্ধি সাত শতাংশের উপরে অর্জিত হয়েছে।  অন্যান্য  প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি।  বিশ্ব ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৭ সালে বাংলাদেশের মাথা পিছু  আয় যেখানে  ছিল  ৫৪১  মার্কিন  ডলার,  ২০১৭ সালে তা দাঁড়িয়েছে  ১৫১৬ মার্কিন ডলারে। দশ বছরে প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি!

দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অগ্রগতি  প্রশংসনীয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান  ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী ২০১০ সালে দেশে দরিদ্রের হার ছিল ৩১শতাংশ যা ২০১৭ সালে কমে গিয়ে দাঁড়ায় ২৩ শতাংশে। সর্বশেষ  সরকারি তথ্য  অনুযায়ী ২০১৮ সালে দারিদ্রের হার ২১ দশমিক ৮শতাংশ। ২০১৭ সালে অতি দারিদ্র্যের  হার যেখানে ছিল ১২ শতাংশ, ২০১৮  সালে এ সংখ্যা ১১ দশমিক ৮ শতাংশ।   ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার শুন্যের  কোটায়  নামিয়ে আনার আশাবাদ  ব্যক্ত  করেছেন দেশের নীতি নির্ধারণী মহল।

দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে একটি ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে এখনই। যদিও দেশে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে তবে শ্লথ হয়ে পড়েছে দারিদ্র্য হ্রাসের  হার। ২০০৫–২০১০ সাল অব্দি দারিদ্র্য হ্রাসের হার যেখানে  ছিল প্রতিবছর ১ দশমিক ৭ শতাংশ, সেখানে ২০১০-২০১৬ এ সময়কালে এ হার দাঁড়ায় ১ দশমিক ২ শতাংশ। আরেকটি বিষয় এখানে উল্লেখযোগ্য- শতকরা হিসেবে দারিদ্র্য হার কমলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমেনি। ২০১১ সালে  দেশে  অতি দরিদ্র লোকসংখ্যা ছিল মোট ২ কোটি ৬০ লাখ। অন্যদিকে,  ২০১৬ সালে অতি দরিদ্র লোকসংখ্যা দাঁড়ায় ২ কোটি ৮০ লাখের মতো।

মানব উন্নয়ন সূচকেও অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ। ২০১৮  সালে প্রকাশিত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী  বৈশ্বিক মানব উন্নয়ন সূচকে তিন ধাপ এগিয়ে ১৩৬তম স্থান অর্জন করেছে  বাংলাদেশ।

তবে আমাদের আরও অনেকটা পথ এগোতে হবে কেননা আমাদের অবস্থান  এখনও অনেকটাই নিচের  দিকে – ১৮৯ দেশের  মধ্যে  ১৩৬।  দক্ষিণ  এশিয়ার  দেশগুলোর মধ্যে  পাকিস্তান (১৪৭)  এবং  নেপালের (১৪৪)  চেয়ে  এগিয়ে  থাকলেও  শ্রীলঙ্কা (৭৬),  মালদ্বীপ (১০১),  ভারত (১৩০)  ও  ভুটানের (১৩৪) চেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। মূলত গড় আয়ু, ৫ বছরের নিচে শিশু মৃত্যুর  হার, লিঙ্গ সমতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি প্রতিবেশি দেশগুলোর  তুলনায় বেশ ভালো।

আয় বৈষম্য, ধনী-গরিবের মধ্যে ব্যবধান, সামাজিক সাম্য ইত্যাদি বিষয়গুলো  প্রকৃত ও টেকসই উন্নয়নের এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার অন্যতম  পূর্ব শর্ত।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন  জাগে,  এ সকল  শর্ত সমূহ পূরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?  উন্নয়নের সুফল জনগণের দোরগোড়ায় সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে কি না? সম্পদের বণ্টন সুষম হচ্ছে না বিশেষ কোনও  গোষ্ঠী  কুক্ষিগত করছে অধিকাংশ সম্পদ?

আয়  বৈষম্য নিরূপণের স্বীকৃত পদ্ধতি হচ্ছে জিনি সহগ (Gini’s Coefficient)। ১৯১২  সালে  ইতালীয় পরিসংখ্যানবিদ কোর্রাদো  জিনি  এই সূচকটি সর্বপ্রথম  প্রবর্তন করেন।  জিনি  সহগের মান সর্বনিম্ন শূন্য (০) থেকে সর্বোচ্চ এক (১) পর্যন্ত হতে পারে।

এর মান শূন্য হওয়ার অর্থ সমাজে কোনওরকম আয় বা সম্পদের বৈষম্য নেই   অন্যদিকে এক (১) নির্দেশ করে চরম বৈষম্য। জিনি সহগ একটি ভগ্নাংশ। এর মান যতো কম বা শূন্যের কাছাকাছি হবে তার অর্থ হচ্ছে সমাজে বৈষম্য হ্রাস  পাচ্ছে। অন্যথা হলে অর্থাৎ মান যতো একের (১) কাছাকাছি  হবে; বোঝা যাবে বৈষম্য বা অসাম্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।  ২০১০ সালে বাংলাদেশের জিনি সহগের মান ছিল শূন্য দশমিক ৪৬  যা ২০১৬ সালে গিয়ে দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৪৮ এ।  এটা স্পষ্টতই নির্দেশ করে দেশে অপেক্ষাকৃত সন্তোষজনক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি  অর্জিত  হওয়া সত্ত্বেও আয়-বৈষম্য বাড়ছে! এখানে উল্লেখ্য, ১৯৯১-৯২ সালে এই  সূচক ছিল দশমিক ৩৬। সূচকের  মান দশমিক ৫০ পেরিয়ে যাওয়াকে বৈষম্যের দৃষ্টিকোণ থেকে অশনি সংকেত হিসেবে দেখা হয়। বৈষম্যের এ হার  অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ অতিদ্রুতই একটি উচ্চ আয় বৈষম্যের দেশে  পরিণত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে থাকবে ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত সর্বশেষ থানা আয়-ব্যয়  জরিপ-২০১৬-এর তথ্য  অনুসারে,  দেশের  মোট আয়ের ২৮  শতাংশই রয়েছে  ৫ শতাংশ অতি ধনীদের হাতে। আর অন্যদিকে সবচেয়ে গরিব ৫ শতাংশ  পরিবারের আয় মাত্র দশমিক ২৩ শতাংশ (০.২৩%)!  উক্ত জরিপের তথ্য  বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০১০ সালে আয়ের দিক থেকে সবচেয়ে পেছনে  থাকা ৫ শতাংশ পরিবার দেশের মোট আয়ের দশমিক  ৭৮ শতাংশ (০.৭৮%)  আয়  করত। ২০১৬ সালে তা  বেশ খানিকটা হ্রাস পেয়ে দশমিক ২৩ শতাংশ (০.২৩%)  হয়েছে।  পক্ষান্তরে, ২০১০ সালে সবচেয়ে বেশি আয় করা ৫ শতাংশ পরিবারের কাছে দেশের মোট আয়ের ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ  (২৪.৬১%)  ছিল যা ২০১৬  সালে বেড়ে ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশে  (২৭.৮৯%) দাঁড়িয়েছে।  অর্থাৎ  ধনী  মানুষের  আয়  আরও বেড়েছে।

পাকিস্তানি দু:শাসন, বঞ্চনা আর চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য থেকে মুক্তির লক্ষ্যে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আর মুক্তিকামী জনতার আশা-আকাঙক্ষার যথাযথ প্রতিফলন ঘটে ১৯৭২ সালে প্রণীত সংবিধানে। আমাদের পবিত্র সংবিধানের প্রস্তাবনায় সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “আমরা অঙ্গীকার  করিতেছি  যে,  যে সকল  মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে জাতীয়  মুক্তি  সংগ্রামে আত্মনিয়োগ ও বীর শহীদদেরকে প্রাণোৎসর্গ করতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল – জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও  ধর্মনিরপেক্ষতার  সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।”

সমাজতন্ত্রকে সংবিধানেরমূলনীতিহিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ছিল মানুষে মানুষে বৈষম্যের অবসান। এই ঐতিহাসিক দলিলের দশম অনুচ্ছেদে বর্ণিত  হয়েছে, “মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।”

সংবিধানের ১৪  অনুচ্ছদে সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাষ্ট্রের দায়িত্ব  সম্পর্কে নির্দেশনা  হলো, “রাষ্ট্রের  অন্যতম  মৌলিক  দায়িত্ব  হইবে  মেহনতি  মানুষকে- কৃষক ও শ্রমিককে – এবং  জনগণের  অনগ্রসর  অংশসমূহকে সকল  প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা৷” সমতা সৃষ্টির লক্ষ্যে  ১৯.২ অনুচ্ছেদে   বলা  হয়েছে, “মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার  জন্য, নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করিবার জন্য এবং  প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম  সুযোগ-সুবিধাদান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবে৷”

অর্থনৈতিক অসাম্য নি:সন্দেহে উদ্বেগজনক।  আমাদের সংবিধানে সামাজিক ও  অর্থনৈতিক বৈষম্য নিরসন কল্পে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে বিবৃত হয়েছে।  এটি কোনও জটিল বিজ্ঞান নয়।  প্রয়োজন  কেবল  রাজনৈতিক  অঙ্গীকার  এবং  সাংবিধানিক  দায়িত্বের  প্রতি  যথাযথ  শ্রদ্ধা।

অব্যাহত থাকুক বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা। লাখো শহীদের স্বপ্ন একটি  ন্যায়ভিত্তিক,  বৈষম্যবিহীন রাষ্ট্র বিনির্মাণে আমরা সকলে হই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

 

সাজ্জাদুল হাসান
চেয়ারম্যান  ও  ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিএএসএফ বাংলাদেশ লিমিটেড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—