রাজনীতির ‘র’ না বোঝা বাঙালিও অন্তত এটুকু ঠাওর করতে সক্ষম— দুইয়ে দুইয়ে চারের মতো সরল সমীকরণে ন্যস্ত বিএনপি ও জামায়াত; একে অন্যকে ছাড়া তারা অসম্পূর্ণ, যাকে বলে ‘হরিহর আত্মা’। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির ইশতেহার তাদের এই ‘চিরস্থায়ী’ সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা; তাদের বোঝাপড়ার দালিলিক বয়ান।

ভোটের অঙ্কে জোটের ভাঙা-গড়া অনেক দেখা আছে দেশবাসীর। রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই— এই সিদ্ধবাক্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে অনেক অনেক বার। আজ যে মিত্র, কাল তার সঙ্গে বৈরিতা হবে না—  এ কথা রাজনীতিতে অচল। পাঁচ-দশ বছরে এক-আধবার ভোট দেওয়ার মওকা পাওয়া বাঙালি এটুকুও ওয়াকিবহাল: কিতাবি ভাষায় নীতির রাজা হলো রাজনীতি। কিন্তু বিএনপি ও জামায়াত সম্পর্কে তাদের রাজনীতির এই ‘অ আ ক খ’ ধারণা ও কিতাবি বয়ান কোনোটাই খাটে না। কেন?

রাজনীতিতে জোটের অঙ্কের প্রধান নিয়ামক ‘ভোট’। কার সঙ্গে হাত মেলালে তাদের সমর্থকদের ভোট করায়ত্ত হবে, সেই বিবেচনা থাকে সর্বাগ্রে। এভাবে দুই বা ততোধিক পক্ষ একজোট হলে তাদের ভোটব্যাংকও শক্তিশালী হয়। ফলে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো যায় শক্ত পায়ে, প্রতিদ্বন্দ্বিকে ফেলা যায় চ্যালেঞ্জের মুখে। জোটের অঙ্ক ঠিকঠাক হলে এমনকি বিজয়ও ছিনিয়ে নেওয়া সম্ভব প্রতিপক্ষের কাছ থেকে। সরল-সিধা এই হিসাবই জোটের রাজনীতির গোড়ার কথা, তবে ভোটের অঙ্ক জোটের শেষ কথা নয়।

জোট তার সঙ্গেই সম্ভব যার সঙ্গে নীতিগত অবস্থানেও অভিন্নতা থাকে। শতভাগ অভিন্ন না হলেও অন্তত মোটাদাগে সাংঘর্ষিক নয়। নীতিগত প্রশ্নে বনিবনা না থাকলে, আদর্শিকভাবে মিলমিশ না থাকলে শুধু রাজনীতিতে কেন, রাজনীতির বাইরেও কোনো জোট গঠন সম্ভব নয়।

প্রতিদ্বন্দ্বিকে পরাজিত করা, নিদেনপক্ষে তার বিজয়ের পথে কাঁটা বিছিয়ে দেওয়ার যত বাসনাই থাক, তাই বলে শত্রুর শত্রু কি সবক্ষেত্রে বন্ধু হতে পারে? রাজনীতির মতো সচল যুদ্ধ বিশ্বে আর দ্বিতীয়টি নেই— এ কথা মনে রেখেও কি মেনে নেওয়া যায়: জয়ের প্রশ্নে যুদ্ধে কোনও ‘অপরাধ’ নেই!

বিএনপির দলীয় ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে একটি শব্দও নেই। বিপক্ষে কেউ আশাও করেনি অবশ্য; তবে পক্ষেও টুঁ শব্দ করেনি তারা। এই অবস্থার অর্থ সবার কাছে পরিষ্কার। এই পরিষ্কার অবস্থাকে, বিজ্ঞাপনের ভাষায় ‘হারপিক পরিষ্কার’ করেছে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে জামায়াত নেতাদের নির্বাচনের বন্দোবস্ত।

যেখানে আদর্শিক অবস্থানে ভিন্নতা নেই সেখানে প্রতীক অভিন্ন হওয়াই তো দস্তুর। বিএনপি এ ক্ষেত্রে ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। তারা শুধু ‘রাজনৈতিক মিত্র’ পরিচয়ের কুয়াশা সরিয়ে ‘আদর্শিক বন্ধু’কে জাতির সামনে দাঁড় করিয়েছে। আর নির্বাচনের উত্তাপও অবশ্য এত জোরালো যে প্রাকৃতিক শীত এখন অন্তর্হিতই বলা যায়। আর শীত না থাকলে কুয়াশাই বা থাকবে কীভাবে!

‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ নামের জোটভুক্ত অন্য দলীয় নেতারাও প্রশংসার দাবিদার; তারা নিজেরাও ধানের শীষে নির্বাচন করতে মাঠে নেমেছেন। অর্থাৎ বিএনপি, অ-বিএনপি (বিএনপিপন্থী অন্যান্য দল) ও জামায়াত— তিন পক্ষেরই নির্বাচনের প্রতীক ধানের শীষ। ধান মানে শেষতক যা ভাত, তা-ই তো বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জোটসঙ্গীরা সবাই বিএনপির ‘ভাত’ খেয়ে বেঁচেবর্তে থাক, বাঙালির চোখের সামনে থেকে কুয়াশা কেটে যাক।

হাসান ইমামসাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—