১.

আমাদের সুন্দরবন, আমাদের ঐতিহ্য। এই সুন্দরবন ১৯৯৭ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। সেই স্বীকৃতির পর আমাদের হয়তো সুন্দরবনের প্রতি আরও অনেক বেশি দায়িত্বশীল হওয়া উচিত ছিল যেন সুন্দরবন তার আকার, বৈচিত্র্য ধারণ করে থাকতে পারে। কিন্তু বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরিকল্পনা, বিভিন্ন বড় বড় জলোচ্ছ্বাস, প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দিয়ে আমাদের সুন্দরবনকে একরকম কুপোকাত করে দিয়েছে। এরমধ্যে আবার রয়েছে বনদস্যু বা জলদস্যুদের উৎপাত।

অবশ্য যে সময় বসে এই লেখাটি লিখছি ততদিনে সুন্দরবন বনদস্যু মুক্ত না হলেও জলদস্যু মুক্ত ঘোষণা হয়ে গিয়েছে। গত ১ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সুন্দরবনকে আনুষ্ঠানিকভাবে দস্যুমুক্ত এলাকা ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, এখন থেকে সুন্দরবন দস্যুমুক্ত। আমাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দস্যুরা আত্মসমর্পণ করেছে।

মূলত, সুন্দরবন হলো বঙ্গোপসাগর উপকূলবর্তী অঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রশস্ত বনভূমি যা বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলীর অন্যতম। গঙ্গা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদীত্রয়ের অববাহিকার বদ্বীপ এলাকায় অবস্থিত এই অপরূপ বনভূমি বাংলাদেশের খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলা এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দুই জেলা উত্তর চব্বিশ পরগনা ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জুড়ে বিস্তৃত।

এছাড়া সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি। ১০ হাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে গড়ে ওঠা সুন্দরবনের ছয় হাজার ১৭ বর্গ কিলোমিটার রয়েছে বাংলাদেশে এবং বাকি অংশ রয়েছে ভারতের মধ্যে।

সুন্দরবনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল, স্বাদুপানি জলাভূমির বনাঞ্চল। সুন্দরবনের এক-তৃতীয়াংশই নদী-খাল আবৃত। স্বাদুপানির জীবমণ্ডলের পানি সামান্য নোনা এবং বর্ষাকালে এই লবণাক্ততা কিছুটা হ্রাস পায়, বিশেষ করে যখন গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানির কারণে নোনাজল দূর হয় এবং পলিমাটির পুরু আস্তরণ জমা হয়।

মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্যের কারণে এ নদী-খাল ঘিরেই একসময় সুন্দরবনে গড়ে উঠেছিল বিশাল জেলে সম্প্রদায়। ১৯৮৫-৮৬ সালের দিকেও সুন্দরবনের নদী-খাল থেকে মাছ পাওয়া যেত ২০ হাজার টনের কাছাকাছি। মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সুন্দরবন এলাকা থেকে মাছ আহরণ হয়েছিল ১৮ হাজার ৩৬৬ টন।  ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১৭ হাজার ৫৮০ টনে। ২০১৫-১৬ অর্থবছর মাছের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় মাত্র ১৬ হাজার ৮৭০ টনে।

মাছের এই বিশাল বাজারের কারণে এইসব এলাকায় একদিকে যেমন নতুন নতুন জেলে এই পেশায় আসে অন্যদিকে এই অঞ্চলে জেলের উপর প্রভাব বিস্তার করার জন্য একশ্রেণির দস্যু নিজেদের আস্তানা গড়ে তোলে। এদের কাজ হল সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া বিভিন্ন ট্রলার জিম্মি করা এবং ট্রলারের জেলেদের জিম্মি করে টাকা আদায় করা। দস্যুরা জেলে ও বনজীবীদের কাছ থেকে নিয়মিত মোটা অংকের চাঁদা না পেলেই অপহরণ করত, কখনো টাকা না পেয়ে মারধোর করতো। একপর্যায়ে জেলেরা অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ঋণ করে টাকা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের ছাড়িয়ে আনতো। এইসব দস্যুদের মধ্যে ছোট বড় বিভিন্ন দল থাকলেও কখনো কখনো নিজেদের কোন্দলের কারণে একটি দল ভেঙ্গে দুইটি দস্যু দল গড়ে উঠে।

এইসব দস্যু দলের মধ্যে মাস্টার বাহিনী, ইলিয়াস বাহিনী, মোতালেব বাহিনী, মজনু বাহিনী, খোকাবাবু বাহিনী, জনাব বাহিনী, আলিফ বাহিনী, আলম বাহিনী, দাদাভাই বাহিনী, ছোটভাই বাহিনী, আল আমিন বাহিনী, মজিদ বাহিনী, সাহেব আলী বাহিনী, জাহাঙ্গীর বাহিনী, নোয়া বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী, ছোট রাজু বাহিনী, শান্ত বাহিনী, সুমন বাহিনী, ছোট সুমন বাহিনী, সাত্তার বাহিনী, জুলফু বাহিনী, শীষ্য বাহিনী, কাশেম বাহিনী, গামা বাহিনী, সাগর বাহিনী, মুকুল-সিদ্দিক বাহিনী, বড় ভাই বাহিনী, ভাই ভাই বাহিনী, শামসু বাহিনী, মোস্তাক বাহিনী, মানজু বাহিনী ছাড়াও বেশকিছু ছোট ছোট দস্যু দল ছিল।

২.

সুন্দররবনের জলদস্যুদের সাথে জেলেদের এই টিকে থাকার যুদ্ধ আজকের নয়, অনেক আগেই থেকেই। তবে এই চিত্রের খানিকটা পরিবর্তন আসে ২০০৯ সালের পরে। এইবার সেই গল্পটা বলবো। এই গল্পের সাথে উঠে আসবে একজন সাংবাদিকের কথা যার নাম মোহসীন-উল হাকিম।

২০০৯ সালের ২৫ মে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে এক ভয়ানক ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। এই ঘূর্ণিঝড়ের নাম আইলা। এর ব্যাস ছিলো প্রায় ৩০০ কিলোমিটার, যা ঘূর্ণিঝড় সিডরের থেকে ৫০ কিলোমিটার বেশি। এর ফলে পটুয়াখালি, বরগুনা, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালীর হাতিয়া, নিঝুম দ্বীপ, খুলনা ও সাতক্ষীরা জেলায় জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আইলার প্রভাবে নিঝুম দ্বীপ এলাকার সকল পুকুরের পানিও লবণাক্ত হয়ে পড়ে। খুলনা ও সাতক্ষীরায় ৭১১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বিধ্বস্ত হয়। ফলে তলিয়ে যায় খুলনার দাকোপ ও কয়রা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন লোনা পানিতে তলিয়ে যায়। ৭৬ কিলোমিটার বাঁধ পুরোপুরি এবং ৩৬২ কিলোমিটার বাঁধ আংশিকভাবে ধ্বসে পড়ে।

আরও সহজভাবে বলতে গেলে আইলার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সুন্দরবন এলাকা। তার দুই বছর আগে সিডর সুন্দরবনের উপর ব্যাপক আঘাত করেছে। সেই ক্ষতির পরিমাণও বিশাল। প্রথমে সিডর এরপরে আইলা, একটি সামলে উঠতে না উঠতেই আরেকটি আঘাত হানে।

শুধু একটি তথ্য দিলে পরিষ্কার হয়ে যাবে এই আঘাত কতটা তীব্র ছিল। আন্তর্জাতিক এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, ঘূর্ণিঝড় সিডর-এর সময় সুন্দরবন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৪৮৫ দশমিক ২৯ মিলিয়ন ডলার বা ৩ হাজার ৭৮৫ কোটি ২৬ লাখ টাকার সম্পদ বাঁচিয়েছে। এর থেকে ধারণা পাওয়া যায়, এর তীব্রতা কতখানি।

আইলার সময় জেলেরা একেবারেই বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই সময় বাগেরহাটের গাবুরায় আইলা পরবর্তী পরিস্থিতির প্রতিবেদন করতে যাওয়া বেসরকারী টেলিভিশনের সাংবাদিক মোহসীন-উল হাকিমের কাছে সবাই আকুতি জানায়, ভাই আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারব। কিন্তু দস্যুদের তো ঠেকাতে পারব না। আমাদের বাঁচান। পারলে দস্যুদের ঠেকাতে কিছু করুন।

মোহসীন বুঝতে পারেন, সুন্দরবনকেন্দ্রিক জলদস্যুদের কাছে এই অঞ্চলের মানুষ কতটা অসহায়। কতটা আতঙ্কে থাকেন ওই জনপদের মানুষ। কতটা অনিরাপদ তাদের জীবন, যাপন, চাল-চলন, গতিপ্রকৃতি। তিনি বার বার সেই অসহায় মানুষগুলোর চেহারা মনে করেছেন, তাদের অসহায়ত্বের তীব্রতা অনুভব করেছেন। তিনি তখন প্রয়াত মিশুক মুনীরের সাথে বিষয়টি আলোচনা করেন। মিশুক মুনীর মোহসীনকে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন। শুরু হয় মোহসীনের নতুন পথচলা।

তখনো পর্যন্ত মোহসীন জানেন না, কিভাবে আগাতে হবে? কার সাথে কথা বলতে হবে? আদৌ দস্যুরা তাকে সহযোগিতা করবে কিনা? এইসব না জেনেই যাত্রা শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি আগানো শুরু করলেন। যোগাযোগ শুরু করলেন দস্যুদের সাথে। সর্বপ্রথম তিনি যোগাযোগ করেন মোতালেব বাহিনীর সাথে। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। দস্যুবৃত্তির কুফল সম্পর্কে অবহিত করলেন। প্রথমে রাজি হলেও মোতালেব পরে পিছিয়ে যান। এর কয়েকদিন পর র‍্যাবের গুলিতে তার মৃত্যু হয়। কিন্তু আশা ছাড়েননি মোহসীন। একের পর এক বিভিন্ন প্রতিবেদনের মাধ্যমে তিনি তুলে ধরতে থাকেন ওই নিপীড়িত মানুষের কথা।

সুন্দরবনের দস্যুদের সাথে যোগাযোগ করতে করতে মোহসিন প্রায় সুন্দরবনের সবকিছু চিনে ফেলেন। কখনো একরাত থেকে ফিরে এসেছেন। কখনো একসপ্তাহ, দশদিন, কখনো আবার টানা একপক্ষ পড়ে থাকতে হয়েছে সুন্দরবনে। তার পরিবারের প্রচণ্ড প্রয়োজনেও তিনি পেশাদারিত্বের কাজে সুন্দরবনে পড়ে আছেন।

এই যোগাযোগের ধারা অব্যাহত রাখতে রাখতে অবশেষে ২০১৬ সালের ৩১ মে বিনা যুদ্ধে প্রথম দাপুটে মাস্টার বাহিনী আত্মসমপর্ণ করে। ৫১টি আগ্নেয়াস্ত্র, প্রায় পাঁচ হাজার রাউন্ড গুলি ও তাদের ব্যবহারের সিক্স সিলিন্ডারের ট্রলার নিয়ে ১৩ সদস্যের এই দলটি র‍্যাবের কাছে সব জমা দেয়।

বাংলাদেশে এটি প্রথম ঘটনা, সুন্দরবনকেন্দ্রিক কোনও বড় দস্যুবাহিনী বিপুল পরিমাণ আগ্নেয়াস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেছে। এই ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে সকল মহলে। দেশ থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সকল গণমাধ্যম এই সংবাদটি বেশ গুরুত্বের সাথে প্রচার করা হয়।

বাকি দস্যুবাহিনীরা মোটামুটি নিশ্চিত ছিল যে, মাস্টার বাহিনীর সবাই র‍্যাবের হাতে মারা পড়বে। যখন মাস্টার বাহিনীর একটি লোকও মারা যায়নি বরং তাদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এই বিষয়টা সবাই দেখে তখন বাকি দস্যুবাহিনীগুলো যোগাযোগ শুরু করে।

৩.

মাস্টার বাহিনীর আত্মসমপর্ণের পরে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বাহিনীরা একে একে আত্মসমপর্ণ করে। তারা নিজেদের অন্ধকার জীবন ফেলে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চায়। মোট ৩২টি দস্যু বাহিনীর মধ্যে সিংহভাগ দস্যুবাহিনীই মোহসিনের মাধ্যমে আত্মসমপর্ণ করে। এখন সুন্দরবন আনুষ্ঠানিকভাবে দস্যুমুক্ত। এই বিশাল অর্জনের জন্য মোহসিনকে ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, দস্যুদের সাথে যোগাযোগ রাখতে মোট ১৩৭ বার মোহসিনকে সুন্দরবনে যেতে হয়েছে।

যেই সুন্দরবনে গড়ে প্রায় ১ লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক প্রতিবছর ঘুরতে আসেন, যেই সুন্দরবন ২৪ ঘণ্টায় ছয় বার রূপ পাল্টায়, যেই সুন্দরবন বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদের খনি, যেই সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগার আছে সেই সুন্দরবন এখন দস্যুমুক্ত।

আমরা প্রতিদিন কতরকম সংবাদ পড়ি অথচ এই সংবাদের পিছনে কত নিরলস শ্রম, মেধা লুকিয়ে আছে তা আমাদের জানার কথা নয়। সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করার পিছনে একজন মোহসীন-উল হাকিম নিরলস শ্রম দিয়ে গিয়েছেন, হয়তো তিনি পরিবারের অনেক আবদার মিটাতে পারেননি, হয়তো তিনি নিজেকেও সঠিকভাবে সময় দিতে পারেননি কিন্তু তিনি সুন্দরবনের এলাকাবাসীদের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন, এইটাই কি বড় পাওয়া নয়।

বিনয় দত্তকথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—