২০১০ সালের সিটি করপোরেশন নির্বাচনের একদিন পর। দুপুরের দিকে চশমা হিলের বাড়িতে নিচতলার বৈঠকখানায় চোখ বুজে চুপচাপ বসে আছেন মহিউদ্দিন চৌধুরী। বাড়তি লোকজনের ভিড় নেই। তবু মহিউদ্দিনের ঘনিষ্ঠ ছাত্রলীগ-যুবলীগের কয়েকজন আছেন। দুয়েকজন সংবাদকর্মীও বসে আছেন। বেশ কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে তাকালেন মহিউদ্দিন।

বিমর্ষ বসে থাকা একজনকে বললেন, চুপ করে ওখানে বসে আছো কেন? এদিকে এসো, খাও। বৈঠকখানায় উপস্থিত অনেকেই একদিন আগে ভোটের পরাজয়ের শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। সেদিনের সেই নেতাকর্মী-অনুসারীরা শুধু নয় রাজনীতি জানা-বোঝা অনেকেই ভেবেছিলেন ওই ভোটের পরাজয় হয়তো মহিউদ্দিনের রাজনীতির উপসংহার লিখতে শুরু করেছে। কিন্তু রাজনীতির মাঠের পোড় খাওয়া সেনাপতি মহিউদ্দিন জানতেন, পুরো রচনার অনেকটা তখনো লেখা বাকি আছে। যন্ত্র সঙ্গীতের মূর্ছনার মতো শেষাংশের তূরীয় আনন্দ তখনো বাকি। তখনো বাকি দিগ্বিজয়ী যোদ্ধার শেষ কয়েকটি লড়াই।

এটা তিনি জানতেন, কারণ তিনি নিজেকে জানতেন। আর জানতেন চট্টগ্রামের মানুষকে। যেমনটা চট্টগ্রামের মানুষ জানতো মহিউদ্দিনকে। পরস্পরের এই অলিখিত বোঝাপড়া একদিনে রচিত হয়নি। ছাত্রজীবনে মহিউদ্দিন খুবই ডানপিটে ছিলেন। তখন থেকেই ছিলেন রাজনীতির মানুষ। মৌলভি সৈয়দ আর জহুর আহম্মদ চৌধুরীর মতো দেশপ্রেমী-অকুতোভয় নেতাদের স্নেহধন্য ছিলেন শৈশবেই। তারুণ্যে স্নেহধন্য ভালোবাসা পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর। ছাত্র আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ, যুব সংগঠন, শ্রমিক আন্দোলন পেরিয়ে যুবক মহিউদ্দিন হয়ে উঠেছিলেন বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী এক অপরাজেয় সৈনিক। ৭৫ এর নারকীয় হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতার মসৃণ পথে না হেঁটে মহিউদ্দিন তাই বেছে নিয়েছিলেন প্রতিরোধের দুর্গম পথ। সেই যুদ্ধে নেতা ও সঙ্গীদের অনেককে হারিয়েছেন। ক্রমশ একাকী হয়েছেন। কিন্তু লড়াই ছাড়েননি, হারও মানেননি।

লক্ষ্যে অবিচল যোদ্ধার মতো তিনি জানতেন- বিজয় আসবেই। সেজন্য পাড়ি দিতে হবে কঠিন পথ। লড়তে হবে হন্তারক, দেশবিরোধী আর পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী শ্বাপদের বিরুদ্ধে। এ লড়াইয়ে মৃত্যু ছিল চোখের সীমানায়। শত্রু ছিল ঘরে-বাইরে। তবু পিছপা হননি মহিউদ্দিন। নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের সাথে বেঈমানী করেননি। লড়ে গেছেন, মৃত্যুর খড়গ মাথায় নিয়েই।  প্রতারক সময়ে একই রাজনৈতিক বিশ্বাস আর নেতৃত্বের প্রতি অবিচল ছিলেন আমৃত্যু।

বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে ফিরে ছুটে গেছেন টুঙ্গিপাড়ায়, জনকের ঠিকানায়। চোখের জলে আর ভালোবাসার ইট-বালিতে মমতার পরশ দিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর কবরে। নিজ দল আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার লগ্নে মহিউদ্দিন ছিলেন কঠিন-কঠোর। চাইলে তখনই কেন্দ্রের রাজনীতিতে শরিক হতে পারতেন। কিন্তু দায়িত্ব শেষে মহিউদ্দিন ফিরে এসেছিলেন নিজের অস্তিত্বের শহর চট্টগ্রামে। সংগঠনকে শক্তিশালী করতে নোঙর ফেলেছিলেন খরস্রোতা এই কর্ণফুলীর তীরে।

চট্টগ্রামে দলের রাজনীতি করেছেন মন-প্রাণ দিয়ে। জাতীয় নির্বাচনে পরাজয় মেনেছেন, তবে হারেননি তখনো। সময় গড়িয়েছে, আরো পরিণত হয়েছেন পোড় খাওয়া মহিউদ্দিন। লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন নতুন গন্তব্যে। মানুষের কান্না তিনি শুনতে পেতেন। অনুভব করতে পারতেন চট্টগ্রামবাসীর আনন্দ-বেদনা। ১৯৯১ এর ঘূর্ণিঝড়ের পর তাই ছুটে যান মানুষের কাছে। লাশের পাহাড় বেদনাহত করলেও তিনি ভেঙ্গে পড়েননি। দ্রুত সিদ্ধান্তে লেগে যান উদ্ধার ও পুর্নবাসন কাজে। অসংখ্য প্রাণ রক্ষার্থে ব্যবস্থা করেন খাবার ও চিকিৎসার। মিশে যান সাধারণের কাতারে। হয়ে ওঠেন অসাধারণ।

সেই ভালোবাসা ফিরে আসে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। এবার চাঁটগাবাসীর দেবার পালা। নিজেদের মহিউদ্দিনকে তারা ভালোবাসা ফিরিয়ে দেন দু’হাত উজাড় করে। চাঁটগা প্রেমিক মহিউদ্দিন হয়ে ওঠেন চাঁটগাবাসীর নেতা। ভালোবাসার প্রতিদান দিতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়েন জনপ্রতিনিধি মহিউদ্দিন।

নগরীতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ঐতিহ্য অনেক পুরনো। মহিউদ্দিন সেই ঐতিহ্য ধরে রেখে এগিয়ে যান আরো কয়েক ধাপ। শহরের বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে দরিদ্র ও সাধারণ পরিবারের সন্তানদের লেখাপড়ার সুব্যবস্থা করেন। মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠা করেন মাতৃসদন ও সেবাকেন্দ্র। পরিচ্ছন্ন নগরীর উপাধি জোটে চট্টগ্রামের কপালে। জনসম্পৃক্ত রাজনীতিবিদ মহিউদ্দিন হয়ে ওঠেন জনদরদী জনপ্রতিনিধি।

লালদীঘির মাঠে দাঁড়িয়ে জনসভায় শামিলদের ‘প্রাণপ্রিয়’ সম্বোধনে ভাষণ শুরু করতেন মহিউদ্দিন। অকৃত্রিম এই সম্বোধনের মতোই চট্টগ্রামের মানুষের সাথে ছিল মহিউদ্দিনের সম্পর্ক। ভালোবাসার আদান-প্রদান চলেছে দুই পক্ষেই। দ্বিতীয় মেয়াদেও বিজয়ী হন মহিউদ্দিন। আগে বাড়তে চান আরও বড় স্বপ্ন নিয়ে। সফলও হয়েছেন।

ব্যক্তিজীবনে ও চর্চায় মহিউদ্দিন একজন মুসলমান। আর চেতনা ছিলেন একজন বাঙালি। ৭২ এর সংবিধানের চার মূলনীতিই ছিল মহিউদ্দিনের রাজনীতির ধ্যান-জ্ঞান। মহিউদ্দিনের এক রাজনৈতিক সহকর্মী বলেছিলেন, ‘শৈশবেই যদি মহিউদ্দিন ভাই আওয়ামী লীগে যুক্ত না হতেন, তাহলে অনায়াসে হয়ে যেতে পারতেন একজন সমাজতন্ত্রী। কারণ তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন, মানুষের কাছে যেতেন।’ সেই চেতনার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই সমাজের প্রান্তজনদের প্রতি মহিউদ্দিনের অকৃত্রিম ভালোবাসায় আর দরিদ্র মানুষের কষ্ট লাঘবে নেয়া নানা উদ্যোগে। অচ্ছুত প্রান্তজনদের আলিঙ্গনে জড়িয়েছেন হৃদয়ের উষ্ণতায়। দিয়েছেন ‘সেবক’ উপাধি। তাদের জন্য ভবন করেছেন। সেবকদের সন্তানের বিয়েতে মহিউদ্দিন উপস্থিত থাকতেন তাদের পিতার আসনে। তিন দফায় মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন হয়ে ওঠে এক স্বয়ংসম্পূর্ণ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সংস্কৃতি আর খেলাধুলার প্রতি ছিল নিরব আকর্ষণ। চট্টগ্রামে স্বতন্ত্র সংস্কৃতি কেন্দ্র থিয়েটার ইন্সটিটিউট নির্মাণ ভাবনা মহিউদ্দিনেরই মস্তিক প্রসুত ধারণার বাস্তবায়ন। বিশ্বকাপে চট্টগ্রামের খেলোয়াড় বা ভেন্যু বাদ পড়লে দাবি আদায়ে মহিউদ্দিন দাঁড়িয়ে যেতেন অসীম সাহস নিয়ে।

গণতন্ত্রে বিশ্বাস ছিল অবিচল। ২০১০ সালের নির্বাচনের দিন দুপুরে পরিস্থিতি বুঝে ‘নিয়ে নেওয়ার’ প্রস্তাবও এসেছিল মহিউদ্দিনের কাছে। রাজনৈতিক দূরদর্শিতায় তিনি অনেক আগে থেকেই জানতেন কী হতে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের মানুষের হাঁড়ির খবর রাখতেন মহিউদ্দিন। জানতেন কার বিরোধিতার নেপথ্যে কী। জানতেন পুরনো সুবিধাভোগীরা কেন সঙ্গ ছেড়েছে। জানতেন কোন ইশারা রচিত হয়েছে বিরোধীতার চিত্রনাট্য। নেপথ্যে কী এবং কারা- এর সবটাই। তাই স্থির সাধকের মত ছিলেন নিরব ও দৃঢ়। পূর্ব রচিত পাণ্ডুলিপি মঞ্চায়নের মতো সেই ‘পরাজয়’ তিনি মেনে নিয়েছিলেন। কেন ? সেটা তিনি  ভালোই জানতেন। কিন্তু  নিজের অনমনীয় মনোভাব একটুও ত্যাগ না করে আঁকড়ে ধরেছিলেন আরো বেশি করে। আঁকড়ে ছিলেন ভালোবাসার-চট্টগ্রামকে।

চট্টগ্রাম প্রেম ছিল মহিউদ্দিনের রাজনীতির এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। তিনি জানতেন চট্টগ্রামের সমৃদ্ধ ইতিহাস। হার না মানা বিপ্লবী ঐতিহ্য। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবীদের দিয়েছিলেন শ্রদ্ধার আসন। জানতেন চট্টগ্রামের বঞ্চনার ইতিহাস। আর তাই সচেতন ছিলেন চট্টগ্রাম বিরোধী ষড়যন্ত্রের বিষয়ে। সবসময় হুঙ্কার দিতেন চট্টল বিরোধীদের বিরুদ্ধে। এসএসএ বন্দর বিরোধী আন্দোলনে সারাদেশ দেখেছে মহিউদ্দিনের ‘চট্টগ্রাম প্রেম’। আর জেনেছে বিপ্লবী চট্টলা চিরকালই বিপ্লবী। এরপরও যতবার চট্টগ্রামের স্বার্থে আঘাত লেগেছে ততবার দ্বিধাহীনভাবে তিনি দিয়েছেন লড়াইয়ের ডাক।

ঘরে-বাইরে শত বিরোধিতা আর দংশন সয়ে মহিউদ্দিন হয়ে উঠেছিলেন এ যুগের রাজনীতির এক নীলকণ্ঠ। দলীয় নেতৃত্ব আর আর্দশ থেকে এসবের কিছুই তাকে নড়াতে পারেনি একটু। আবারো সংগঠনের কাজে মন দিয়েছেন। আবারো চট্টগ্রামকে ভালোবেসেছেন নিজের সবটুকু দিয়ে। রাগী ও উদ্ধত মহিউদ্দিনের মুখের ভাষা ‘সুশীলদের’ কাছে হয়তো অপরিমিত ছিল কিন্তু চাঁটগাবাসীর কাছে সেই বাণী ছিল শ্রুতিমধুর আর হৃদয়স্পর্শী।

বুক পেতে ঝড়-তুফান ঠেকিয়ে দেওয়া বঙ্গোপসাগর তীরের চট্টগ্রামের মানুষ মহিউদ্দিনেই খুঁজে পেয়েছিল তাদের যোগ্য কান্ডারি। যে কোনও তুফানে যিনি নিজেই আগে দাঁড়িয়ে যেতেন বুক চিতিয়ে। কর্ণফুলী তীরে বেড়ে ওঠা মহিউদ্দিন নদী ও সাগর দুইয়ের ভাষাই জানতেন। জানতেন কখন পাল তুলে নৌকা ভাসাতে হয় আর কখন শক্ত হাতে ধরতে হয় হাল। শুধু তাই নয় মহিউদ্দিন পড়তে পারতেন বঙ্গোপসাগর আর কর্ণফুলীর স্রোতধারার ভাষাও। বারবার তিনি ঝড় সামলে প্রিয় চট্টগ্রামের মানুষকে পৌঁছে দিয়েছেন গন্তব্যে।

‘প্রাণপ্রিয়’ চাঁটগাবাসী সহজেই মহিউদ্দিনের হৃৎস্পন্দন টের পেতেন আর মহিউদ্দিন টের পেতেন প্রিয় চাঁটগাবাসীর মনের কথা। এ দুইয়ে মিলে এক অনবদ্য প্রেমকাহিনী রচিত ও মঞ্চায়িত হয়েছিল চট্টগ্রামের রাজনীতির মঞ্চে। সেনাপতির বিদায়ে সেই জীবননাট্যের যবনিকা পড়েছে। কিন্তু রেশ রয়ে গেছে আজও। চট্টগ্রামের মানুষ এখনো দারুণ দু:সময়ে খুঁজে ফেরেন তাদের সেনাপতিকে। স্মরণ করেন মহিউদ্দিনের কীর্তিগাঁথা। এখানেই মহিউদ্দিন বিজয়ী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—