জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণার আগ মুহূর্তে অনির্বাচিত চার মন্ত্রীর পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গৃহীত হয়েছে। নির্বাচনকালে অনির্বাচিত কারও সরকারে থাকার সুযোগ নাই- সুপ্রিম কোর্টের এমন রায়ের আলোকে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের গত ৬ নভেম্বর পদত্যাগের নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর ওই নির্দেশনার দিনই তারা পদত্যাগপত্র জমা দেন, এবং এর ৩৩ দিন পর রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সে পদত্যাগপত্র গৃহীত হওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারির ব্যবস্থা করে।

একাদশ সংসদ নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলের অধীনে হচ্ছে, এবং সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নানা দাবি ও আপত্তি সত্ত্বেও সংবিধানস্বীকৃত এই ধারা থেকে সরে আসেনি আওয়ামী লীগ। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে সরকারের এই অবস্থান, এবং এই অবস্থানকে আরও বিশ্বাসযোগ্য এবং দৃশ্যমান করতে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগে সরকার মন্ত্রিসভা থেকে চার টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের নির্দেশ দেওয়ার পর আনুষ্ঠানিক প্রচারণার আগের দিন থেকে সে পদত্যাগপত্র কার্যকর হয়।

কেবল জনপ্রতিনিধি দিয়েই নির্বাচনকালীন সরকার- এই ধারণা একদিকে যেমন সংবিধানস্বীকৃত অন্যদিকে এটা শেখ হাসিনা সরকারের দশম সংসদ নির্বাচন আয়োজনের সময়কার সেই পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম সাধারণ নির্বাচনের সময়েও একইভাবে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রীদের পদত্যাগ করতে হয়েছিল। সেবার আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমানকে পদত্যাগের নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এবারও একই ঘটনা ঘটল। এবার ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার পদত্যাগ করেছেন।

নির্বাচনকালীন সরকারের চার টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী পদত্যাগ করলেও গত পাঁচ বছর ধরে দায়িত্বে থাকা মন্ত্রীর পদ-মর্যাদা ও সুবিধাদি ভোগ করা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও পাঁচ উপদেষ্টা এবং মন্ত্রীর পদমর্যাদা না পাওয়া অন্য দুই জন উপদেষ্টার পদত্যাগের কিংবা দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির কোনো তথ্য সরকারের তরফে দেওয়া হয়নি; এ ধরনের কোনো খবরও আসেনি গণমাধ্যমে। ফলে এই মুহূর্তে ধরে নেওয়া যায় তারা দায়িত্বে রয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত এবং উপদেষ্টা থাকা এই আটজনের সাতজনই জনপ্রতিনিধি নন। জনপ্রতিনিধি কেবল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, তিনি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত।

২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ পুনর্বার ক্ষমতাসীন হলে ১২ জানুয়ারি জারিকৃত এক প্রজ্ঞাপনে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে হোসেন তৌফিক (এইচ টি) ইমাম, ড. মসিউর রহমানকে অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা, ড. গওহর রিজভীকে আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা এবং মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমদ সিদ্দিকীকে
নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

ওই সময় ‘প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত’ হিসেবে নিয়োগ পান জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এরশাদের এই নিয়োগ মন্ত্রীর পদমর্যাদার। মন্ত্রীর পদমর্যাদার বাইরে এরশাদের জন্যে আছে অফিস কক্ষ, বিদেশ ভ্রমণ, ভ্রমণের জন্য বিশেষ ভাতা, ইনস্যুরেন্স, নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা। পেয়েছেন ১১ জন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা-কর্মচারী। দেশ বিদেশে যোগাযোগের জন্য তার বাসা ও অফিসের টিএনটি ফোনের এবং ব্যক্তিগত মোবাইলেরও বিল দিচ্ছে সরকার। আছে সার্বক্ষণিক গাড়ি। তার জন্যে আছে সরকারি বাড়ি নেওয়ার সুযোগ, অন্যথায় তিনি নিতে পারেন বাড়িভাড়া আর রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ ভাতা। এরই সঙ্গে এরশাদের বারিধারার প্রেসিডেন্ট পার্কে পুলিশ প্রোটোকলও রয়েছে।

এরপর ২৬ জানুয়ারি ২০১৪ প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা হিসেবে ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বীরবিক্রমকে নিয়োগ করা হয়। একই বছরের ১৭ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়কে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক প্রশাসন দেওয়ান হুমায়ুন কবীর স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়ের নিয়োগ অবৈতনিক এবং খণ্ডকালীন। অর্থাৎ তিনি কোনো বেতন-ভাতা নেবেন না এবং নিজের কাজের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীকে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ে সহায়তা করবেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ও পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করবেন বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের অপর এক প্রজ্ঞাপনে ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়। তার নিয়োগও অবৈতনিক এবং খণ্ডকালীন। তথ্য উপদেষ্টা হিসেবে ইকবাল সোবহান প্রয়োজনীয় জনবলসহ অফিস, সরকারি যানবাহন এবং দায়িত্ব পালনকালে মন্ত্রীর পদমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিদের সঙ্গে আসন গ্রহণ করবেন বলেও জানানো হয়। সেই থেকে তারা দায়িত্ব পালন করছেন, এবং একাদশ সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা পর্যন্ত দায়িত্বে রয়েছেন।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যে পরিচালনা কমিটি গঠন করেছে সেখানকার মূল কমিটিতে (কোর কমিটি) আছেন প্রধানমন্ত্রীর সাত সদস্য বিশিষ্ট উপদেষ্টা পরিষদের তিন সদস্য। প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম এই কমিটির কো-চেয়ারম্যান এবং তাঁর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য। তারা দুজন আবার মন্ত্রীর পদমর্যাদা সম্পন্ন। প্রধানমন্ত্রী তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয় ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য, যদিও তিনি মন্ত্রী পদমর্যাদা ও সুবিধাদি ভোগ করছেন না।

এইচ টি ইমাম কিংবা ড. মসিউর রহমান নির্বাচিত প্রতিনিধি নন, তারা মন্ত্রীর পদমর্যাদায় নিয়োগপ্রাপ্ত উপদেষ্টা। তারা দুজনই আবার আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্যও। অনির্বাচিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে মন্ত্রীর পদমর্যাদাপ্রাপ্ত এই দুজন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা হওয়া সূত্রে নির্বাচনকালীন সরকারের অংশ হয়ে থাকা সাংঘর্ষিক ব্যাপার হয়ে যায় যখন জনপ্রতিনিধি নন এমন চার টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। একই সঙ্গে সজীব আহমেদ ওয়াজেদ জয়ের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে বহাল থাকা আর আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে থাকাটা সরকারের দ্বৈত ভূমিকাকেই ইঙ্গিত করে।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে দেশ মূলত নির্বাচনের দিকেও কেন্দ্রীভূত। ওই সময়ে সরকারের কাজ নীতিনির্ধারণের চাইতে রুটিন কাজ করে যাওয়া, সেটাই করে আসছে সরকার। এই সময়ে উল্লেখিত আটজনের কোন কাজ থাকার কথা নয়। তাই তাদের স্বপদে বহাল রাখা কতখানি যৌক্তিক এ নিয়ে ভাবা দরকার। তার ওপর আটজনের তিনজনই ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য, এবং অন্য একজন নিজে একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান।

অনির্বাচিত কিংবা জনপ্রতিনিধি নন এমন কেউ থাকবে না নির্বাচনকালীন সরকারে- এই ধারণা শতভাগ বাস্তবায়ন হয় না কেবল টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী হওয়া চারজনের পদত্যাগে। এটাকে শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হলে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় থাকা এবং মন্ত্রীর পদমর্যাদায় না থাকা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও উপদেষ্টাদের তাদের দায়িত্ব ছাড়তে হবে অথবা অব্যাহতি দিতে হবে। তা না হলে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় থাকা উপদেষ্টা-বিশেষ দূতদের রেখে কেবল টেকনোক্র্যাটদের বিদায়ে সরকারের উদ্দেশ্য পুরোপুরি সফল হবে না, একই সঙ্গে জবাবদিহিও পূর্ণাঙ্গ হয় না।

জনপ্রতিনিধিদের অধীনেই নির্বাচনকালীন সরকার এ ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করতে, এবং স্বচ্ছতা-জবাবদিহি নিশ্চিত করতে টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের পাশাপাশি মন্ত্রীদের পদমর্যাদা এবং পদমর্যাদায় না থাকা বিশেষ দূত এবং উপদেষ্টাদের নিয়েও সরকার ভাবতে পারে।

কবির য়াহমদপ্রধান সম্পাদক, সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকম

Responses -- “টেকনোক্র্যাটদের অব্যাহতি: বিশেষ দূত-উপদেষ্টাদের কী খবর”

  1. uzzal hossain

    জনতা চিরকালই অভাগা ও অসহায়। আম জনতার কাম হল ভোট দেয়া, চুঙ্গা ফুকান, আর দুঃখের দিনশেষে ভোগান্তি ভুগে কবরে যাওয়া। জয় বাঙালী।

    Reply
  2. সৈয়দ আলি

    “৩৩ দিন পর রাষ্ট্রপতি কর্তৃক সে পদত্যাগপত্র গৃহীত হওয়ার পর …।” এটি অসত্য। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পদ্ত্যাগের পরেও তাদের কাজ চালিয়ে যেতে বলেছিলেন। তাই তারা কর্মরত ছিলেন।

    Reply
  3. Qudrate Khoda

    লিখেছেন ভাল নিঃসন্দেহ, তবে “চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী” কারণ উনাদের কোন প্রকার উপদেশ বা পরামর্শের দরকার নাই। উনারা সবজান্তা – মানে সব জানেন ।

    জনতা চিরকালই অভাগা ও অসহায়। আম জনতার কাম হল ভোট দেয়া , চুঙ্গা ফুকান, আর দুঃখের দিনশেষে ভোগান্তি ভুগে কবরে যাওয়া। জয় বাঙালী।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—