- মতামত - https://opinion.bdnews24.com/bangla -

তরুণ ভোটারই নির্ধারণ করবেন নির্বাচনী ফল মিষ্টি নাকি টক!

তারুণ্যের শক্তি ও ব্যাপ্তি দুই-ই প্রশ্নাতীত। তবে একুশ শতকের তরুণদের সঙ্গে কবিকথিত ‘মাথা নোয়াবার নয়’ চিত্রকল্পের পুরোটা কী মেলে? শাব্দিক অর্থে এখনকার তরুণরা বরং উল্টো মাথা ‘নুইয়ে’ই থাকেন, মনোযোগ যখন মুঠোফোনের পর্দায়! চমৎকার এই প্রযুক্তির চমৎকারিত্ব মনে রেখেও এ কথা বলা বোধকরি অন্যায্য হয় না— মুঠোফোন মুঠোর মধ্যে ‘দুনিয়া’ এনে দিলেও একইসঙ্গে ‘দুনিয়াদারি’ থেকে কমবেশি বিযুক্ত করেও ছেড়েছে আমাদের। এই আমাদের বড় অংশই তরুণ-যুবা-নবীন, যাদের বলা চলে প্রযুক্তিশাসিত সময়ের সন্তান। ভার্চুয়াল বিশ্বে যতটা তাদের বিচরণ, বাস্তবের দুনিয়ায় কি তারা ততটা ঘুরে বেড়ান? এই প্রশ্ন যখন মাথা তোলে, তখন তরুণদের ‘মাথা না নোয়াবার’ প্রশ্নটি পুরোপুরি উপেক্ষা করা যায় না।

এই পটভূমিতে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে: বাংলাদেশের তরুণরা কি মাথা তুলে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছেন? তাদের চোখে এই নির্বাচন কি স্রেফ ভোটাধিকার প্রয়োগ, নাকি নিজেদের মতামতেরও প্রতিফলন? অর্থাৎ আগামীতে কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান তারা, তেমন দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতিশীল দল বা জোটের প্রতি কি তাদের সমর্থন থাকছে, নাকি মোটাদাগে বহমান দুই ধারার একটিতেই গা ভাসাবেন তারাও?

একজন তরুণের ‘চাওয়া’র মতো বাংলাদেশের রূপকল্প হয়তো কোনও রাজনৈতিক দল বা জোটের ইশতেহারে পুরোপুরি প্রতিফলিত হবে না, হয়তো তা সম্ভবও নয়। কিন্তু তার চাওয়ার মতো করে যারা চিন্তা করছে, সম্ভাবনার দুয়ারগুলো খোলা রাখছে, তাদের পক্ষেই কি দাঁড়াবেন না তারা?

এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আরেক প্রশ্নের মীমাংসা জরুরি- দেশ সম্পর্কে আজকের তরুণদের ভাবনাটা কোন ধারার, তাদের চাওয়াটাই বা কেমন?

পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই বাংলাদেশের সমস্যা এখনও এন্তার। এ কথা মেনে নিয়েও জোর গলায় বলার কথাটি হলো, বাংলাদেশের সম্ভাবনাও দিগন্তছোঁয়া। এই বিপুল ইতিবাচক হাতছানির ‘হাত’ মূলত তরুণদেরই। তাদের উদ্যোগ ও উদ্যমই পারে দেশকে নিয়ে যেতে স্বপ্নের সোনার বাংলার কাছাকাছি। নেতৃত্বের একটা অংশে তরুণদের উপস্থিতি সেই সম্ভাবনাকে পোক্ত করছে বটে, কিন্তু নেতৃত্বের বাইরে থাকা লাখ লাখ তরুণ, সাধারণ ভোটার যারা, তাদের সিলমারা ব্যালট কোন দলের বা জোটের ভোটবাক্সে পড়বে?

এই দুর্নামটা, বলা যায়, সর্বব্যাপী যে এ সময়ের তরুণরা তেমন ‘সিরিয়াস’ নন; তাদের চিন্তা-ভাবনা ওপরভাসা, কোনোকিছু তলিয়ে দেখেন না তারা— না ইতিহাস-ঐতিহ্য, না ভূতভবিষ্যৎ! সে কারণে দেশের জন্মকথা যেমন লাইন-টু-লাইন জানেন না তারা, তেমনি আগামীদিনের দেশ নিয়েও তাদের চিন্তা-চেতনা অগভীর। ফেসবুকীয় তরুণরা আছেন অনেকটা তাৎক্ষণিক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে; তারা আত্মকেন্দ্রিক। কিন্তু এই দুর্নামের বিপরীতে তাদের সুনামও কিন্তু আকারে আজদাহা, বিস্তৃতিতে আকাশছোঁয়া। এর পক্ষে একটা উদাহরণই যথেষ্ট, দেশের অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি কর্মক্ষম শ্রেণি, অর্থাৎ তরুণরা।

প্রচলিত অর্থে ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সীদের ‘তরুণ’ বিবেচনায় দেশের মোট ভোটারের প্রায় ৬০ শতাংশই তরুণ। হিসাব কষে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, দেশের জনসংখ্যার ৩০ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। আর ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ভোটারের সংখ্যা ১৫ শতাংশের মতো। অর্থাৎ ৩০০ সংসদীয় আসনের প্রতিটিতে এই ‘নবীন’ ভোটারের সংখ্যা কম-বেশি ৫০ হাজার। অর্থাৎ তরুণদের এই ‘নবীন’ অংশই যে কোনও প্রার্থীর জয়-পরাজয় নির্ধারণের পক্ষে যথেষ্ট।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই জয়-পরাজয় ‘নির্ধারক’ তরুণ ভোটারদের বাড়তি ও অমোচনীয় আরেকটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান: তারা স্বাধীনতার পরের প্রজন্ম। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধ তাদের স্মৃতিতে নেই, রক্তক্ষয়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আসতে হয়নি তাদের। কিন্তু তাই বলে দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ, লড়াই-সংগ্রাম তাদের জানা-বোঝার বাইরে— দুর্নাম রটনাকারীর গলায়ও এ কথা উচ্চারিত হওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং ভোটের মাধ্যমে তাদের মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে আশার জায়গাটা এখানেই, একই সঙ্গে আশঙ্কার ক্ষেত্রও এটাই। কীভাবে?

যে সুস্পষ্ট বিভাজন রেখা দেশের স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-সমাজের বুক বরাবর টেনে দেওয়া হয়েছে, সেখানে সঠিক জায়গায় পা রাখাটা দুরূহ বৈকি। দলীয় রাজনীতির নামে দেশে যা চলছে, একে ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার বৈ অন্য কিছু মনে করাই কঠিন; যে হাতিয়ার বিরোধী পক্ষের ‘রুধিররঞ্জিত’! নিজেদের নীতিগত অবস্থান তুলে ধরা নয়, বরং বিরোধী পক্ষের পিণ্ডি চটকাতে, কুৎসা রটনায় বেশি মনোযোগী হতে দেখা যায় রাজনীতির খেলুড়েদের। নিজেদের মতো করে ইতিহাসের বয়ান পর্যন্ত খাড়া করেন তারা, অম্লান বদনে! তাই দেশের জন্মকথার ‘নির্মোহ সংস্করণ’ তরুণদের সামনে নেই বললেই চলে। আর, দুর্ভাবনাটা এখানেই।

এই সরলসিধা পরিসংখ্যানের বিপরীতে কিছু ঘোরপ্যাঁচের সংখ্যাতত্ত্বও হাজির। একটি জরিপ বলছে, দেশের ২৭ দশমিক ৪ শতাংশ তরুণই নাকি নিষ্ক্রিয়। তাদের না আছে পড়ালেখা, না প্রশিক্ষণ অথবা না আছে কাজ-কর্ম। এদের কি ‘বেকার’ বলা যায়? নাকি সার্বিক সামাজিক-রাষ্ট্রিক ব্যবস্থার ‘বাইপ্রোডাক্ট’ তারা? আরও ভয়ের কথা, দেশের প্রায় ৩৬ লাখ মাদকাসক্তের বড় অংশই তরুণ। গত সাত বছরে বেকারত্বের সংখ্যা লাফিয়ে হয়েছে ‍দ্বিগুণ।

অতীত স্মরণে রেখে বলা যায়, ‘কর্মসংস্থান’ শিরোনামে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে যত বুলি ছিল দিনশেষে তা ‘ভেলকি’ হয়ে গেছে! সর্বশেষ ৪০তম বিসিএসে রেকর্ডসংখ্যক (৪ লাখ ১২ হাজার ৫৩২ জন) আবেদন দেশের শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হালহকিকত তুলে ধরার পক্ষে সবচেয়ে জোরালো দালিলিক প্রমাণ। এ সময়ের কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রধানতম কারণ কি ‘বেকারত্ব’ ছিল না? এর পেছনে অন্য অনেক কারণ যা-ই থাক, চাকরিতে প্রবেশাধিকারের পথটা আরও প্রশস্ত হোক— মোদ্দাকথায়, এটাই ছিল আন্দোলনকারীদের চাওয়া।

‘ডিজিটাল বাংলাদেশে’ তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপ্তি শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে গাঁওগেরামে কতটা আছড়ে পড়েছে, তার নজির আলাদা করে এলান করার কিছু নেই। দেশের একজন প্রান্তিক যুবক কি ঢাকাইয়া তরুণদের মতো শুধু প্রযুক্তিগত নয়, অন্য যে কোনও ধরনের সেবা-সুবিধা ভোগ করতে পারেন? যে কোনও খাতে কিছু করার উদ্যোগ নেওয়ার অর্থ আমলাতন্ত্রের ‘সাজানো-গোছানো’ গোলকধাঁধার মধ্যে পড়া! সরকার নির্ধারিত টাকায় বিদেশ যাওয়ার ভাগ্য কতজন তরুণের হয়? উচ্চশিক্ষার বিস্তৃতিই বা কতটুকু ঘটেছে? একজন তরুণ কি তার ইচ্ছেমাফিক বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে পারেন? তাই এখনও তরুণদের তথাকথিত ‘প্রতিষ্ঠিত’ হওয়া পাথর খুঁড়ে জল বের করার সমান।

তাই এমন অনেক প্রশ্নেরই একটা বিহিত হওয়া প্রয়োজন, যা প্রত্যক্ষভাবে তরুণদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। পাশাপাশি বাক্‌স্বাধীনতা, আইনি ব্যবস্থা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি ইত্যাদি বিষয়ও সংশিত অবস্থায় থাকা সমানভাবে কাম্য।

তাই রাজনীতির-রাষ্ট্রের এত এত ‘প্রশ্নচিহ্ন-যুক্ত’ আয়োজনকে ‘প্রশ্নচিহ্ন-মুক্ত’ করার মওকা তরুণরা হাতছাড়া করবেন, প্রতীতি হয় না। তাদের দৃষ্টি যখন যেখানেই থাক— কী মুঠোফোনের পর্দায়, কী আত্মকেন্দ্রিকতায়, যতই বিভ্রান্তির আলেয়া ছড়ানো হোক, সময়ে  ঠিক জায়গাতেই দৃষ্টি স্থির করেন তারা; আলো জ্বালেন ঠিক আঁধার ঘনালে। উদাহরণ, গণজাগরণমঞ্চে তরুণদের আলোকোজ্জ্বল উপস্থাপনা।

সুতরাং তরুণদের স্থির দৃষ্টি এখন নির্বাচনেই। তাই যারা নানা পরিসংখ্যানের মারপ্যাঁচে নির্বাচনী ফলের মিষ্টতা চেখে দেখতে উৎগ্রীব হয়ে আছেন, দিনশেষে তা কাকের আঙুর ফল হয়ে যেতে পারে!

১ Comment (Open | Close)

১ Comment To "তরুণ ভোটারই নির্ধারণ করবেন নির্বাচনী ফল মিষ্টি নাকি টক!"

#১ Comment By কাজী ফয়েজ আহমেদ On ডিসেম্বর ৯, ২০১৮ @ ৪:১৩ অপরাহ্ণ

জনাব
২৭ লক্ষ শিক্ষিত বেকার তরুণের কাছ থেকে কি আশা করেন?