আপনার ক্ষুধা লেগেছে কিন্তু কপালে জুটছে বেধড়ক মার, টয়লেটে যেতে চাইলেও পেটানো হচ্ছে, টানা রোদের মধ্যে আপনাকে শুইয়ে রাখা হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, বুটের লাথি চলছে সমানে বুকে, পিঠে। মারের চোটে শরীরে ক্ষত হয়ে গেছে- সেসব ক্ষতে মাছি বসছে। পুঁজ চুঁইয়ে পড়ছে শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে। ছুরি দিয়ে যেখানে সেখানে কাটা হচ্ছে এবং সেসব জায়গায় লবণ দিয়ে দেয়া হচ্ছে। নিয়মিত বিরতিতে রাইফেলের বাট দিয়ে সমানে মারা হচ্ছে।

সারাদিনে খেতে দেওয়া হচ্ছে একবার দু’ছটাক চালের পচা ভাত, তাও নোংরা থালায়। পানি চাইলে দেওয়া হচ্ছে প্রস্রাব। পায়ে দড়ি বেঁধে উল্টা করে ঝুলিয়ে বেধড়ক পিটানো হচ্ছে। এরপর যখন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছেন, তখন একটি গর্তে ফেলে মাটি চাপা দিয়ে চলে গেলো; কিংবা বস্তার ভিতর ভরে কপোতাক্ষ নদে ফেলা দেওয়া হলো; কিংবা ছুরি দিয়ে মেরে সোজা নদীতে ফেলে দিল, কিংবা একটি ঘরে আপনার মতো আরও কয়েকজনকে জড়ো করে লেপ-কাঁথা দিয়ে জড়িয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দরজা বন্ধ করে চলে গেল। কেমন অনুভূতি হতে পারে আপনার?

ধরুন, এগুলো আপনার বাবার ক্ষেত্রে ঘটলে আপনার কেমন লাগতে পারে? এগুলো কোনও রূপকথার কাহিনী নয়, নয় কোনো সিনেমা; বস্তুত বাস্তব এবং ঐতিহাসিক সত্য যা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় প্রতিনিয়ত ঘটেছে। এভাবেই পাকিস্থানিরা এদেশের মানুষের উপর নৃশংসভাবে নির্যাতন করেছে। কর্তব্যরত অবস্থায় গুলি করে হত্যা করেছে। শুধু হিন্দু বলে মিলিটারির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। বিন্দুমাত্র সম্মান মায়ের জাতিকে দেয় নাই। গর্ভবতী মা-কেও পাশবিক নির্যাতন করতে পাকিদের এতোটুকু বাঁধেনি।

যশোর শহরে নেমে মানুষ মণিহার সিনেমা হল দেখে মুগ্ধ হয়, আমি এই বিল্ডিং এর নিচে থাকা অভাগা শহীদদের দেখতে পাই; ওরা সিটি কলেজ দেখে, আমি কলেজের মাঠে অগণিত শহীদদের কান্না শুনতে পাই; ওরা পিকনিক কর্নারে আনন্দ করে, আমি সেখানে জবাই হওয়া মানুষের গোঙানি শুনি; ওরা বকচর, শংকরপুর, হুশতলার ঝকঝকে রাস্তায় হুশ করে চলে যায়- আমি সেসব জায়গায় ছড়ানো-ছিটানো অসংখ্য শহীদদের মরদেহ দেখি। ওরা সার্কিট হাউস দেখে, আমি ওখানে নির্যাতিতদের নিনাদ চিৎকার শুনতে পাই। ওরা কালেক্টরেট ভবনের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে, আমি এর চারপাশে হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোকে খুঁজি। ওরা ক্যান্টনমেন্ট-এ হাওয়া খেতে যায়, আমি পুরো ক্যান্টনমেন্ট জুড়ে বধ্যভূমি দেখি- অসংখ্য নারীর আর্তনাদ শুনি, অসংখ্য মা এবং বাচ্চার কান্না শুনি। মানসী হলের চারপাশের বাতাসে শহীদদের দীর্ঘশ্বাস শুনি। ওরা কপোতাক্ষ নদের স্বচ্ছ পানির প্রশংসা করে, আমি পুরো কপোতাক্ষ নদী রক্তে ভেসে যেতে দেখি- অসংখ্য বস্তাবন্দি লাশের হাহাকার শুনি। ওরা চৌগাছা ডাকবাংলোর দিকে প্রশংসার চোখে তাকায়, আমি এর প্রতি ইঞ্চি মাটিতে আমার পূর্বপুরুষের করোটি খুঁজে ফিরি।

তেসরা মার্চ, ১৯৭১ যশোরে পাকিস্থানি সেনাবাহিনীর হাতে প্রথম শহীদ হন গৃহবধু চারুবালা কর। আর ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ যশোর শত্রুমুক্ত হয়। অর্থাৎ এখানে যুদ্ধ শুরু হয় সবার আগে এবং শেষও হয় সবার আগে কিন্তু মাঝে রয়ে যায় লক্ষাধিক মানুষের রক্তের ইতিহাস।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র এর ৮ম খণ্ড, যেখানে ‘গণহত্যা, শরণার্থী শিবির ও প্রাসঙ্গিক ঘটনা’ নিয়ে তথ্য দেওয়া হয়েছে। সবই বীভৎস হত্যা ও নির্যাতন –এর ইতিহাস। ভাবছিলাম এই বুঝি দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা’র নাম। বারবার চোখ ঝাপসা হয়ে উঠছিল আর ভাবছিলাম- আরো কতটা দাম দিয়ে স্বাধীনতা পেলে সেই স্বাধীনতার মর্ম আমরা পুরোপুরি আত্মোপলব্ধি করতে পারতাম?

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধঃ দলিলপত্র এর ৮ম খণ্ড –এ মোট ২৫টা ভুক্তি আছে যেখানে যশোরের বিভিন্ন ঘটনা উল্লেখ আছে। এর মধ্যে ২১টা ভিকটিম বা প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ। আর ৪টি পত্রিকার রিপোর্ট। যদিও এগুলো এ অঞ্চলে ঘটা গণহত্যার খুব অল্পই প্রতিফলন করে। আমি শুধু এই ২৫টা ভুক্তিতে যা পেয়েছি তার মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখব।

যশোর সদরের ক্ষেত্রে প্রধান টর্চার সেল ছিলো যশোর ক্যান্টনমেন্ট। দেশ স্বাধীনের পর এই সেনানিবাসের বিভিন্ন স্থানে পাওয়া গেছে অসংখ্য গণকবরের সন্ধান। নারী নির্যাতনের কেন্দ্রও ছিল এই যশোর সেনানিবাসে। এছাড়া পাকিস্থানিরা সার্কিট হাউস ও কালেক্টরেট ভবনেও মানুষ ধরে নিয়ে এসে অকথ্য নির্যাতন করতো। বস্তুত গোটা যশোর শহরটাই ছিল গণকবর ও বধ্যভূমিতে পূর্ণ। চৌগাছাতে ডাকবাংলো ও তৎসংলগ্ন স্কুল ঘরগুলোতে নির্যাতন ও খুন করা হতো। ডাকবাংলোর পিছনে ২০-২৫টা গণকবর ছিলো। এসব গণকবরে মৃত-অর্ধমৃত মানুষদেরকে মাটিচাপা দিতো। এছাড়া বন্দিদের প্রথমে বেয়নেট চার্জ করে অর্ধমৃত হলে চটের বস্তায় জীবিত অবস্থায় ভরে বস্তার মুখ বন্ধ করে নিকটবর্তী কপোতাক্ষ নদীতে ফেলে দিত।  এই নদীর উপর একটি ব্রিজ ছিলো। স্থানীয় এবং ভারতগামী অসংখ্য মানুষকে  পাকিরা এই ব্রিজের উপর দাঁড় করিয়ে বেয়নেট চার্জ করে নদীতে ফেলে দিত। এই নদীর তীর ঘেঁষে ছিলো অসংখ্য গণকবর।

মহেশপুর থানা হাসপাতাল ছিল পাকিস্থানিদের ওই অঞ্চলে প্রধান ঘাঁটি। বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ ধরে এনে এখানে বর্বরতম নির্যাতন-হত্যা করা হয়েছে। পাকি সেনারা মহেশপুর, কোটচাঁদপুর, কালীগঞ্জ, খালিশপুর ইত্যাদি এলাকা থেকে বাঙ্গালিদের ধরে এনে হাসপাতালের কক্ষে আটকে রাখত। এরপর প্রতি রাতে হাসপাতালের এলাকার মধ্যেই ৫০/৬০ গর্তে কাউকে জবাই করে, কাউকে বেয়নেট আবার কাউকে গুলি করে হত্যা করতো। মেয়েদের ধরে এনে পাশবিক নির্যাতন করা হতো এবং পরে তাদের হত্যা করা হতো।

২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় ক্রাকডাউনের সাথে সাথে ঐদিন রাতেই যশোরের তৎকালীন অবিসংবাদিত নেতা- আওয়ামী লীগ নেতা এবং জাতীয় পরিষদ সদস্য, যশোরের গৌরব, মশিয়ুর রহমানকে মিলিটারিরা ধরে নিয়ে যায়। পাকিরা ঠিকই জানত এই নেতা বেঁচে থাকা মানে বৃহত্তর যশোর তাদের নাগালের বাইরে চলে যাবে।

দৈনিক বাংলা, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২ –এ একটি রিপোর্টে বলা হচ্ছে,

“তাঁর শরীরের নানা স্থানে আগুনে পোড়ানো, দেহকে বেত্রাঘাতে রক্তাক্ত করে তাতে লবণ মাখানো থেকে আরম্ভ করে ইলেকট্রিক শক পর্যন্ত লাগানো হয়েছে। অত্যাচারে যখন তার বলিষ্ঠ দেহটা ক্রমে ক্রমে নিস্তেজ হয়ে পড়ছিল তখনও তার মনের বলিষ্ঠতা একটুও কমেনি। সব সময় তিনি একই কথা বলেছেন, আমি আমার জনগণের বিরদ্ধে কিছু বলতে বা লিখতে পারবো না। সত্যিই তিনি তা পারেননি। হানাদার বাহিনী যখন তার বাম হাত কেটে ফেলে ডান হাতে লেখার জন্য হুকুম চালায় তখন যন্ত্রণায় শুধু কেঁপেছেন তিনি। কিন্তু তার বলিষ্ঠ ঠোট দুটো একটুও কাঁপেনি। প্রতি দিনে একে একে হানাদার পশুরা তার দুই পা, দুই হাত কেটে বিকলাঙ্গ দেহের ‘পরে অমানুষিক নির্যাতন চালিয়েছে তখনও একটু কেঁপে ওঠেনি তার দৃঢ়ভাবে বন্ধ ঠোঁট দুটো।“

দ্য সানডে টাইমস, ২০ জুন, ১৯৭১ এ লিখছে

“সেনারা যশোরে মশিউর রহমান নামের একজন আওয়ামী লীগ সদস্যের বাসা ঘেরাও করে। উনি জাতীয় পরিষদের সদস্যও ছিলেন। অবাঙ্গালিরা তার পরিবারের সবাইকে হত্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। ১০ বছরের এক বালক দোতলা থেকে লাফ দিলে বাতাসে থাকা অবস্থাতেই এক সিপাই তাকে গুলি করে।”

বদিউজ্জামান (হাজী মেহের আলী রোড, খুলনা) যশোর ক্যান্টনমেন্ট –এ আটক থাকা অবস্থার বর্ণনা করছেন এভাবে-

“২রা মে ২৯ জনকে হাত, চোখ বেঁধে নিয়ে যায় সন্ধ্যাবেলা, বাকী থাকি আমি, একজন ড্রাইভার ও একজন সি,ও। পরে শুনলাম ওদের ট্রেঞ্চ খুঁড়িয়ে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে। ওর মধ্যে অধ্যাপকও ছিলেন।

তারপর থেকে প্রত্যহ রাত বারোটার পর ১০/১২ জন করে নিয়ে যেত আর ফিরতো না। প্রত্যহ নতুন লোক এসে আবার ঘর ভরে যেতো। জুলাই মাসের শেষের দিক হতে শুনলাম যাদেরকে গাড়িতে করে নিয়ে যায় রাতে বহু দূরে নিয়ে গিয়ে বোয়নেট দিয়ে খুচিয়ে হত্যা করতো।

অপারেশন স্পটে যাদেরকে ধরে আনতো তাদেরকে হাত-পা পিটিয়ে ভেঙ্গে ফেলতো। তারপর শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে দিত এবং গুলি করে হত্যা করতো।

অগাস্ট মাসের ২/৩ তারিখে আমাদের ১০/১২ জনকে সেনানিবাসের মডেল প্রাইমারির এক ঘরে ধরে নিয়ে যায়। এখানে নিয়ে আসার পর শুনলাম এর আগে যাদেরকে হত্যা করেছে তাদের কোনও তালিকা বা হিসাব নেই। অসংখ্য মানুষকে তারা হত্যা করেছে ঐ সময়। এপ্রিলে যাদেরকে ধরেছিল একমাত্র আমিই বেঁচে ছিলাম।”

শ্রী নরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় (ষষ্টিতলা, যশোর) এর জবানিতে-

“১৯৭১ সালের ৪ঠা এপ্রিলে সকাল ৮-৩০ মিনিটে ভারত ও তথাকথিত পাকিস্তানের খবর রেডিওর মাধ্যমে শুনছি এমন সময় দু’জন বিহারী ও তিনজন পাঞ্জাবী আমার বাসায় চলে আসে। বিহারী দুজন আমার পাড়া প্রতিবেশী। তারা আসার সাথে সাথে আমি রেডিও বন্ধ করে দেই। তারা সোজাসোজি আমার নিকট চলে আসে এবং আমাকে জিজ্ঞাসা করে তোমার টাকা পয়সা কোথায় রেখেছ? আমি জবাব দেই আমার কোনও গচ্ছিত টাকা পয়সা নাই। আমি আবার ত্রিশ বছর চাঁচড়া রাজ স্টেটের ম্যানেজার ছিলাম। তারা সেই জন্য মনে করত আমার নিকট প্রচুর টাকা পাওয়া যাবে। তারপর তাদের মধ্যে থেকে একজন মিলিটারী আমার পাশের ঘর হতে আমার চাকর কালিপদ দাসকে আমার নিকট নিয়ে আসে। তারপর আমাকে এবং তাকে ভয় দেখায়। টাকা কোথায় রেখেছ যদি না বলে দাও তাহলে তোমাদের দু’জনকেই গুলি করে মারা হবে। আমরা জবাব দিলাম, টাকা আমরা কোথায় পাবো? তখন আমাদের দু’জনকে পাশাপাশি দাঁড় করায়। তারপর একজন মিলিটারী কালিপদকে লক্ষ্য করে গুলি করে। সঙ্গে সঙ্গে তার বুক ভেদ করে গুলি বেরিয়ে যায়। তার পরক্ষণেই সে মারা যায়। তার পর আমাকে লক্ষ্য করে দ্বিতীয় গুলি ছোঁড়ে, গুলিটি আমার এক হাতে লাগে। গুলি লেগে আমার বাম হাতটা প্রায় শরীর হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তারপর আবার আরেকটা গুলি আমাকে করে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার অশেষ করুণায় গুলিটি আমার ডান হাতের এক পাশে লাগে। সাথে সাথে আমাকে অমনই ফেলে চলে যায়। বাড়ি হতে বের হয়ে যাবার সময় আমার বাসা লুটপাট করে বাসার সমস্ত কিছু নিয়ে যায়। অবশ্য উক্ত জিনিসপত্রগুলো মিলিটারীদের সঙ্গে যে দু’জন বিহারী এসেছিল তারাই লুটপাট করে নিয়ে যায়। আমি ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকি। মিলিটারী ঐ দিনই আমার বাড়ির আশে পাশে ১১ জনকে গুলি করে মারে। তার মধ্যে আমি শুধু বেঁচে আছি। যাদের গুলি করে মারা হলো তারা হলো- আমার বাড়ির উত্তরে আমার বিশিষ্ট বন্ধু অবসরপ্রাপ্ত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট রহমত উল্লাহ মন্ডল এবং তার দুই শিক্ষিত পুত্র মোছাদ্দেক ও জিন্নাহ এবং তার বাড়িতে তিনজন ভাড়াটিয়া, একজন প্রফেসর ও দুজন শিক্ষিত ভদ্রলোক। আমার বাড়ির উত্তরে ডাক্তার নাছির উদ্দিন খান এবং তার স্ত্রী ও তার বাড়িতে উপস্থিত আরও তিনজন লোক। আমার বাড়ির পূর্বে সত্য চরণ মিত্র ইত্যাদি ১২ জনকে গুলি করে তার মধ্যে ১১ জন মারা যায়। তার মধ্যে আমি পঙ্গু এবং অন্ধ অবস্থায় বেঁচে আছি। তারা চলে যাবার পর আমি আধমরা অবস্থায় পড়ে থাকি।“

মো. মোহসিন উল্লাহ (গ্রাম-চৌগাছা, থানা-ঝিকরগাছা, জেলা-যশোর)  এর ভাষ্যে

“চৌগাছা সরকারী ডাক বাংলোর পিছনে ২০/২৫ টা কবরে প্রায় ৭০/৮০ জনকে প্রত্যেক দিন প্রায় ৮/১০ জন করে লোককে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে আধা মরা করে ২/৩ জনকে একই ছালার মধ্যে ভরে ছালার মুখ বেঁধে উক্ত কপোতাক্ষ নদীতে ফেলে দিয়েছে। উক্ত নদীর উপর একটা ব্রীজ আছে, সেখানেও নিয়ে গিয়ে বেয়োনেট চার্জ করে নদীতে ফেলে দিয়েছে। অনেককে উক্ত নদীর উপর যে ব্রীজ সেটি পার হয়ে নদীর পশ্চিম পাড়ে প্রায় ৩০/৪০ টা করে ৮০/৯০ জন লোককে মেরে পুঁতে রেখেছে। যে সমস্ত লোক পাকসেনারা চৌগাছায় মেরেছে এবং তাদের ক্যাম্পের আশাপাশে পুঁতে রেখেছে এর মধ্যে অধিকাংশই শরণার্থী। কারণ তারা কাশিমপুর মাশিলা হিজলী বর্ডার দিয়ে ভারতে যাবার সময় পাকসেনারা তাদেরকে ধরে এবং চৌগাছায় তাদের ক্যাম্পে নিয়ে আসে। তারপর নৃশংসভাবে হত্যা করে পুঁতে রাখে। এইবাবে দীর্ঘ নয় মাসে চৌগাছাতে পাকসেনারা ১০০/১৫০ জন লোককে হত্যা করে। তাদের মধ্যে মেয়ে ও পুরুষ উভয়ই ছিল। মেয়েদেরকে ২/৩ দিন রেখে তাদের উপর পাশবিক অত্যাচার করার পর বেয়নেট চার্জ করে নদীতে ফেলে দিত। আমি যে এগার দিন ছিলাম ঐ কয়দিনে প্রায় ২০/২৫ জন লোককে ডাক বাংলোর পিছরে রাত আটটার পর প্রতিদিন ৪/৫ জন করে হত্যা করে পুঁতে রাখে।“

বনবিহারী সিংহ (নওয়াপাড়া, যশোর) বলছেন-

“১৯৭১ সালে ২৭ শে মার্চে পাক বাহিনীর একটি দল সমস্ত ব্যারিকেড সরিয়ে চলে আসে নওয়াপাড়াতে।তারা জনসাধারণকে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে এসে ব্যারিকেড উঠানোর কাজে লাগিয়ে দেয়। সেই সময় আমি সংবাদ পাই যে চেংগুটিয়া রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার সাহেবের নিকট হতে- পাকবাহিনী নওয়াপাড়ার দিকে যাচ্ছে। এই সংবাদ পেয়ে আমি স্থানীয় জনসাধারণদের  জানাই। তারা নিরাপত্তার জন্য যে যতটুকু পেরেছে ততটুকু সাবধান হয়েছে। সেই সময় আমার ঘরে ছিলেন রুস্তম আলী সর্দ্দার (গার্ড ২৮ ডাউন এক্সপ্রেস),  এস এম হক (গার্ড ৬৪ ডাউন প্যাসেঞ্জার),  সালে আহম্মদ, নওয়াব আলী (চেকার), আইনুল হক (পোর্টার), ইমান আলী ও আব্দুল ওদুদ (পয়েন্টম্যান) গ্যাংসেট নবুশেখ গ্যাং, খালাসি শামছু।  আমরা সবাই ডিউটিরত অবস্থায় স্টেশনে ছিলাম। কারণ এছাড়া জীবনের আর কোনও নিরাপত্তা ছিলো না আর আমরা প্রকৃতপক্ষে কোনও অন্যায় করিনি বলে জানতাম। এরপর হঠাৎ  ঐ দিন অর্থাৎ ২৭ শে মার্চ বেলা ১১টার সময় এক দল পাক সেনা স্টেশনে অফিস কামড়ায় প্রবেশ করে। অফিসে প্রবেশ করে প্রথম চেয়ারে অবস্থানরত জনাব রুস্তম আলী সর্দ্দার সাহেব ও নওয়াব আলী সাহেবকে প্রথম হত্যা করে। আমি তাদের নিকটে ছিলাম। তারা হত্যা করেই ঘর হতে বের হয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণে পুণরায় ঘরে প্রবেশ করে বলে যে,  কে জীবিত আছো কাছে এসো। এখানে বলা প্রয়োজন যে, উক্ত দু’জনকে হত্যা করার পর ঘরে অবস্থিত অন্য সবাই বেঞ্চের নীচে আশ্রয় করার ফলে তাদের পাক বাহিনী কর্তৃক ব্রাশফায়ারে কোনও ক্ষতি করতে পারেনি।  কিন্তু পরক্ষণে ঢুকেই যখন তাদের সকলকে দাঁড়াতে বলে তখন আমি একটা আলমারির ও দেওয়ালের মধ্যবর্তী স্থানে আত্নগোপন করে থাকি। দ্বিতীয়বার ঘরে প্রবেশ করে পাক বাহিনী জনাব সালে আহম্মদ ও জনাব এস এম হক সাহেবকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।  এবং আইনুল হক (পোর্টার) কে বাইরে বের করে গুলি করে, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে গুলিটি তার হাতে লাগে,  ফলে জীবনে বেঁচে যায়।“

অনিল কুমার মন্ডল (গ্রামপাজিয়া, ডাকঘরপাজিয়া, জেলাযশোর) –এর ভাষ্যে

“১৯৭১ সালের ২৬ শে জুন, শনিবার সকাল ৭ টার দিকে ৫ জনের একটা পাক সেনার দল আমাকে নিজ বাড়ী হতে ধরে ফেলে। উক্ত দিন প্রায় ৫০/৫২ জন থানা  মিলিটারী গাড়ী  পাজিয়া গ্রাম ঘিরে ফেলে। সকালে তারা গ্রামের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে।

পাক সেনারা প্রথম ধরে জিজ্ঞাসা করে যে, আমি হিন্দু না মুসলমান। আমি নিজেকে হিন্দু বলে প্রকাশ করায় আমার উপর রাইফেলের বাঁট দিয়ে আঘাত করে। এবং উক্ত গ্রামের শ্রী রবি কুমার বাবু কোথায় আছেন তা জানতে চায় এবং আমাকেও মুক্তিফৌজের সাহায্যকারী বলে চিহ্নিত করে। উক্ত স্থান হতে শ্রী রবি কুমার বাবুর বাড়ীতে অবস্থানরত পাক মেজরের নিকট নিয়ে হাজির করে।

পাক মেজর তখন বলে যে, তুমি মুক্তিফৌজ কিনা?  তুমি ভারতে যাতায়াত কর কিনা? কিন্তু আমি অস্বীকার করি এবং বলি যে, আমি স্কুলে শিক্ষকতা করি এবং দৈনিক হাজিরা খাতায় উপস্থিত আছে  সুতরাং উক্ত অভিযোগ মিথ্যা। একথা বলার পর একটা কাঠের লাঠি দিয়ে ভীষণভাবে আঘাত করে। ফলে আমার হাত দিয়ে প্রচুর রক্তপাত হয়। তারপর আমাকে ওখানে বসিয়ে রাখে। সেইখানে নারায়ণ প্রসাদ চক্রবর্তীকে বসিয়ে পিঠে লাঠি দিয়ে বেদম প্রহার করতে থাকলে সে বিকট চিৎকার করতে থাকে। তখন এক জন বাঙ্গালী এসে মেজরকে সংবাদ দেয় যে এক জন বাঙ্গালী বধূকে পাক সেনারা ধরে নিয়ে গিয়ে পাশবিক অত্যাচার করেছে। এই সংবাদে মেজর আমাদের বসিয়ে রেখে চলে যায়।

তখন আমাদের ধরে অন্য ঘরে  নিয়ে যায়। আমাদের অন্য ঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশ করে তৎকালীন পাকিস্তানের ২ জন দালাল। ঐ ঘরে গিয়ে দেখি রামচন্দ্র বিশ্বাস নামে একজন লোককে বেদম প্রহার করে ফেলে রেখেছে। উক্ত লোকের সারা শরীর দিয়ে রক্ত ঝরছে।

আমাকে ও নারায়ণকে উক্ত ঘরে নিয়ে গিয়ে এক সেনার লাঠি, রাইফেলের বাঁট, বুট জুতা ও ঘুসি দিয়ে বিভিন্ন উপায়ে বেদম প্রহার করলো। এইভাবে দিনে সকাল ৮-৩০ হতে বিকাল ৩টা পর্যন্ত বিভিন্ন পাক সেনা পর্যায়ক্রমে প্রহার করে। এইভাবে প্রহার করার পর আমাদের শরীর দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। তখন তারা প্রহার বন্ধ করে নির্দেশ দেয় যে, তিনজন বাঙ্গালী একে অপরের বিরুদ্ধে প্রহার শুরু করো। সেই নির্দেশমত আমাদের তিনজনের হাতে তিনটি লাঠি দিয়ে দেয় এবং বলে যে,  এই লাঠি দিয়ে যদি একে অন্যকে প্রহার না করো তবে তোমাদের হত্যা করা হবে। তখন নিরুপায় হয়ে জীবন রক্ষার জন্য নিজেরা মারামারিতে প্রস্তুত হই। এইভাবে প্রায় এক ঘণ্টা নিজেরা মারামারি করি। তখন পাক সেনারা এই মারামারি উপভোগ করতে থাকে এবং আনন্দ উল্লাস করতে থাকে। নানাভাবে এই সংঘর্ষকে উৎসাহ দিতে থাকে। এইভাবে নিজেরা মারামারি করে প্রায় জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ি। পাক সেনারা আমাকে আট স্থানে বেয়নেট চার্জ করে। বাকী দু’জনকেও ঐ একইভাবে বেয়নেট চার্জ করে। রামের ঘাড়ে বেয়নেট দিয়ে প্রায় দুই ইঞ্চি মতো ক্ষত করে। তখন আমরা মৃতের মতো পড়ে থাকি এবং নড়াচড়া হতে বিরত থাকি। সেই সময় আমাদের শরীর হতে রক্তক্ষরণের ফলে দেহ অসাড় হয়ে আসতে থাকে।

তখন পাক সেনারা মৃত মনে করে আমাদের উপর লেপ তোষক দিয়ে ঢেকে দেয়। লেপের উপর বিভিন্ন ধরনের কাঠ চাপ দেয়। আমরা তখন জীবিত অবস্থায় মৃতের মতো শুয়ে থাকি। আমাদের উপর চাপানো কাঠের এক প্রকার সাদা পাউডার ছিটিয়ে দেয় এবং বিভিন্ন স্থান হতে পেট্রোল ও কেরোসিনের তেল ছিটিয়ে দেয়। এই সমস্ত করার পর দেয়াশলাইয়ের সাহায্যে আগুন ধরিয়ে দেয়। উদ্দেশ্য আমাদের পুড়িয়ে মারা। তখন প্রায় ৬টা বাজে। মেজরের বাঁশি বাজার পর পাক সেনারা ঘরের দরজা বাহির হতে বন্ধ করে চলে যায়। আমরা যাতে ঘরের বাইরে যেতে না পারি তার ব্যবস্থা করে।

যখন পাক সেনারা চলে যায় এবং আগুন জ্বলতে থাকে তখন আমরা অতি কষ্টে উঠে দাঁড়াই এবং ঘর হতে বাইরে যাওয়ার জন্য দরজায় আঘাত করি। কিন্তু বাহির থেকে বন্ধ থাকায় তা কিছুতেই সম্ভব হয় নাই। পরে নিরুপায় হয়ে ও আগুনের বিভীষিকা দেখে প্রাণ বাঁচাবার শেষ চেষ্টাস্বরূপ একটা ছোট দরজা লাথি মেরে ভেঙে ফেলি এবং অতি কষ্টে ঘর হতে বের হয়ে যাই। ঘর হতে বের হয়ে আমরা তিনজন নিকটস্থ একটা বাগানে প্রবেশ করি। বাগান হতে তিনজন তিন দিকে চলে যাই। পাক সেনারা তখন গ্রাম হতে চলে গিয়েছে।  আমি মহর আলী নামে এক ব্যাক্তির বাড়ীতে আশ্রয় নেই। সেখান হতে আমার আত্নীয়রা আমাকে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করায়।“

মো. মনছোর আলী( গ্রামহাকোবা, ডাকঘরমনিরামপুর, থানামনিরামপুর, জেলাযশোর) এর জবানীতে-

“১৯৭১ সালের ১৪ ই অগাস্ট ৩০/৩৫ জন মিলিটারী হাকোবা হাই স্কুল হতে বেলা ১০ ঘটিকার সময় হাকোবা গ্রামে যায়। বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে তারা গ্রামের মধ্যে ঢুকে পড়ে। পাঁচজনের একটি দল আমার বাড়ীতে চলে যায় এবং আমাকে ধরে ফেলে এবং জিজ্ঞাসাবাদ করে, তুমি হিন্দু না মুসলমান? আমি উত্তর দেই যে, আমি মুসলমান। তারপর আমাকে জিজ্ঞাসা করে, এই গ্রামে হিন্দু আছে কি? আমি উত্তরে বলি আছে। আমি হিন্দু পাড়া দেখিয়ে দেই।  মিলিটারীরা আমাকে ছেড়ে দিয়ে হিন্দু পাড়ায় ঢুকে পড়ে। আমার বাড়ী হতে হিন্দু পাড়া যাওয়ার পূর্বে আমার পাশের বাড়ীতে একজন স্ত্রীলোক, ১ সন্তানের মাতা, ভাত রান্না করছিল। মিলিটারীরা তাকে ধরে ফেলে এবং ঘরের মধ্যে নিয়ে যায়। তার উপর প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় পর্যন্ত পাশবিক অত্যাচার করার পর যখন সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে সেই সময় তাকে ফেলে রেখে মিলিটারীরা হিন্দু পাড়ার দিকে চলে যায়। হিন্দু পাড়ায় গিয়ে উক্ত দল মুরগী খুঁজতে থাকে। বিকাল তিনটার দিকে তারা শ্রী অনিল কুণ্ডের বাড়ীতে ঢোকে। তার বাড়িতে তিনজন স্ত্রীলোক ছিল। তারা হলেন অনিল কুণ্ডের স্ত্রী, তার মাতা, আর তৃতীয়জন তার বোন। তার স্ত্রী ঘরের মধ্যে কাঁথা সেলাই করছিল। তার মাথা ও বোন বারান্দায় বসে ছিলো। মিলিটারীরা উক্ত বাড়ীর ভিতর ঢুকেই দুজন ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে আর একজন সেন্ট্রি দিতে থাকে, আর একজন অনিল কুণ্ডের বোনের হাত ধরে হেঁচড়ে টানতে থাকে।  তা দেখে তার মা চিৎকার করতে থাকে। একজন মিলিটারী তার মাতাকে লাঠি দিয়ে বেদম প্রহার করে। কিন্তু অনিল কুণ্ডের বোনকে ঘরের মধ্যে নিতে না পেরে তাকেও ভীষণ প্রহার করে। তার স্ত্রীকে ৩/৪ জন মিলে প্রায় দু’ঘণ্টা পাশবিক অত্যাচার করে। কিন্তু ঐ সময় অনিল কুণ্ডের বড় ভাই সুধীর কুমার কুণ্ড ও একজন বৃদ্ধলোক হরিপদ কুন্ড বাড়িতে ছিলেন। কিন্তু মিলিটারীরা বাড়ীতে ঢুকেই তাদের দুজনকে ধরে ফেলে এবং একটা ঘরের মধ্যে নিয়ে বন্দি করে রেখে দেয়। তারপর মিলিটারীরা উক্ত পরিবারের উপর পাশবিক অত্যাচার করার পর আবার হাইস্কুলে চলে আসে। কিন্তু তাদের সঙ্গে যে অন্যান্য পার্টি গ্রামের ভিতর গিয়েছিল তারা গ্রাম হতে হাঁস মুরগী ইত্যাদি ধরে নিয়ে আসে। তারা কোন মেয়ের উপর পাশবিক অত্যাচার চালায় নাই। যে দুটা মেয়ের উপর পাশবিক অত্যাচার চালানো হয় তাদের একজন মুসলমান আর দ্বিতীয়জন হিন্দু। তাদের উপর পাঁচজন মিলিটারী পাশবিক অত্যাচার করার দরুণ তাদের স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে। অনেক ঔষুধপত্র খাওয়ানোর পর বর্তমানে তারা সুস্থ হয়ে উঠেছে। উক্ত ঘটনার এক মাস পূর্বে অনিল কুণ্ডকে পাক মিলিটারীরা রাস্তা থেকে ধরে ফেলে এবং তাকে ক্যাম্পে নিয়ে যায় এবং তাকে তারা গুলি করে হত্যা করে। তারপরই উক্ত ঘটনা ঘটে যায়।“

দৈনিক আজাদ, মার্চ, ১৯৭২  ‘কেউ পাশবিকতা থেকে অব্যাহতি পায় নি’ শিরোনামের সংবাদে লেখা হয়

“এম ই এস এর জনৈক কর্মচারী হারেছ উদ্দীন জানান যে, ৩০ মার্চ তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৪ দিন ধরে ক্যান্টনমেন্টের ভেতর পাক সেনাবাহিনীর জল্লাদেরা তার উপর অমানুষিক অত্যাচার চালায়। হারেছ উদ্দীনের কাছ থেকে ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানরত তৎকালীন সামরিক বাহিনীর বাঙালি কর্মচারীদের পরিবারের মহিলাদের একটি বন্দী শিবিরের সন্ধান পাওয়া গেছে। সে জানিয়েছে, ৫৫ নং ফিল্ড রেজিমেন্ট আর্টিলারীর ফ্যামিলি কোয়ার্টারের বারো থেকে পঞ্চাশ বছর বয়সের দু’শ পঁচানব্বই জন মেয়েকে আটক করে রেখে প্রতিদিন রাতে তাদের উপর পাশবিক অত্যাচার চালানো হতো। তিনি আরও জানান যে, তাদের সেলটি কিছুটা দূরে হলেও প্রতিদিন রাতেই ভেসে আসতো মেয়েদের করুণ আর্তনাদ। সেই সাথে বর্বর পাক সেনাদের পৈশাচিক উল্লাসধ্বনি বাতাসের সঙ্গে মিশে এক মর্মবিদারী দৃশ্যের সৃষ্টি করতো। প্রতিদিন বিকেলে জনৈক সুবেদার এসে এইসব মেয়েরা কে কোথায় যাবে তারই একটি তালিকা প্রস্তুত করে যেতো। অত:পর সন্ধ্যা হলেই উক্ত লিস্ট মোতাবেক নির্ধারিত মেয়েটিকে পাঠানো হতো নির্ধারিত স্থানে। কখনো কখনো আপন খেয়াল খুশিতে বাইরে নিয়ে এসে পাহারাদার কুকুরের দল উর্যুপরি নারী ধর্ষণে লিপ্ত হতো। একদিন একটি মেয়েকে এইভাবে পরপর চৌদ্দ জন নির্যাতন চালালে মেয়েটি সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু তবুও দুর্বৃত্তরা তাকে রেহাই দেয়নি। অচৈতন্য অবস্থায়ই নিজেদের লালসা চরিতার্থ করেছে। মেয়েটির পুনরায় জ্ঞান ফিরে আসতে নাকি ৩৬ ঘণ্টা সময় লেগেছিলো। জনাব হারেছ বলেন, চৌদ্দ দিন পর তাকে কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তারপর ঐ মহিলা নন্দী শিবিরের বাসিন্দাদের পরিণতি সম্পর্কে কিছুই বলতে পারেন নি। অপর একটি মহিলা শিবিরের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

২৫ শে সেপ্টেম্বর জেলখানা থেকে পুনরায় তাকে ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে আসা হলে সেথা এফ আই ইউ-এ তার উপর নতুনভাবে নির্যাতন করা হয়। সেখান থেকে ১২ নং এফ আই ইউ ব্যারাকের ১০ নং রুমে বহু মহিলাকে বন্দী অবস্থায় দেখতে পান, প্রতিরাতে ঐ ঘর থেকে তাদের চিৎকার শুনতে পাওয়া যেত। এবং একই উপায়ে তারা পাশবিক নির্যাতন চালাতো। এইসব মেয়েদের যৌবন সাধারণত অফিসারেরাই ভোগ করতো। এই সম্বন্ধে হারেছ উদ্দীন আরো বলেন, বন্দীশিবিরের মহিলাদের সাধারণত তিন ভাগে ভাগ করে রাখা হতো। প্রথমভাগে ছিল যুবতী, দ্বিতীয়ভাগে ছিল মধ্যবয়সী এবং তৃতীয়ভাগে কয়েক সন্তানের মাতা। তিনি স্কুল কলেজের সুন্দরী মেয়েদের প্লেনে করে ঢাকা পাঠাতেও দেখেছেন।

হারেছ উদ্দীনের বর্ণনা থেকে আরো অনেক তথ্য জানা যায়। দখলদাররা ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে আন্ডারগ্রাউন্ড সেল তৈরী করেছিল। যশোর পতনের পর ঠিক এমনি একটি সেল থেকে ১১৩ জনকে উদ্ধার করা হয়েছিলো। সবাই জীবিত অবস্থায় থাকলেও তাদের মধ্যে প্রাণ ছিল না বললেই চলে। আলো বাতাস ও খাদ্যের অভাবে মাংসহীন হয়ে তাদের শরীর একেবারেই ভেঙে পরেছিলো। হাড্ডি কংকালসার দেহগুলি অসহ্য নির্যাতনের জ্বালা বহন করে এনেছিল।“

হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড, ১২ এপ্রিল, ১৯৭১ সাংবাদিক নারায়ণ দাশ হরিদাশপুর সীমান্ত চেকপোস্ট থেকে লিখছেন-

“পাকিস্তানী বাহিনীর বর্বরতার কাহিনী বলতে গিয়ে এসকল গ্রামের একটির বাসিন্দা জনাবা হোসনে আরা এই রিপোর্টারকে বলেন যে- পাকিস্তানী বাহিনী তাদের গ্রামের প্রতিটি ঘরে প্রবেশ করে এবং তাদের ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিতে বলে। যদি কেউ স্লোগান দিতে দ্বিধা করে, তাকে তৎক্ষণাৎ গুলি করে হত্যা করা হয়। তারা মানুষের সহায়সম্বল লুট করে, মেয়েদের গায়ের গহনা ছিনিয়ে নেয় এবং পরে তাদের হত্যা করে। তিনি নিজেকে কিভাবে বাঁচালেন আমার এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- ‘যখন পাক আর্মি আমাদের গ্রামের দিকে ধেয়ে আসছিল আমি আমার ৩ বছরের বাচ্চাকে বুকে নিয়ে প্রাণপণ ছুটতে থাকি এবং একটা ঝোপের আড়ালে আশ্রয় নেই, আমি সেখানেই রাত কাটাই এবং পরদিন মুক্তি ফৌজের দেওয়া বাহনে করে বেনাপোলে আমার এক আত্মীয়ের বাসায় চলে আসি। চার দিন পর আমি সীমান্ত অতিক্রম করি। আমি জানি না আমার স্বামীর কি হয়েছে যে কিনা ঐদিন সন্ধ্যায় স্থানীয় হাটে গিয়েছিলেন।’ এই বলে তিনি কান্নায় ভেঙে পরেন।

৬০ বছরের বৃদ্ধ যশোরের হারমত আলী মণ্ডল তার ৩ ছেলেকে হারিয়েছিলেন। তিনি আমার সাথে কোনও কথাই বলতে পারেন নি। কারণ তিনি কান্না থামাতে পারছিলেন না। কিছু মানুষ তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন।”

দুঃখের বিষয় হচ্ছে ৮ম খণ্ডে যশোর বিষয়ক ঘটনাগুলোতে দেশীয় রাজাকারদের নাম-ঠিকানা পাইনি। যাদের নাম পেয়েছি তারা সবাই পাকিস্থানি। তাদের তালিকা নীচে দিলাম।

নির্যাতনকারী পাকিস্থানীদের নাম:

লে: ক: তোফায়েল, এফ আই ইউ (ফিল্ড ইনটেলিজেন্স ইউনিট)-র মেজর খোরশেদ ওমর, মেজর বাবর, মেজর খুরশীদ (এফ আই ইউ), মেজর সরহাদ (এফ আই টি), মেজর আখতার হোসেন (ডিভিশন হেডকোয়ার্টার যশোর ক্যান্টমেন্ট), সুবেদার মেজর শাহজি, সুবেদার মেজর আমীর হোসেন, হাবিলদার ইকবাল শাহ, মেজর আনোয়ার হোসেন। কর্নেল শামস এবং মেজর বেলায়েত আলী মেয়েদের উপর অকথ্য অত্যাচার করেছে।  হাবিলদার মেজর মাসুদ, মেজর ওমর খুরশীদ, হুমায়ূন কবির নামে একজন পাঞ্জাবী ফোন অপারেটার, প্লাটুন ক্যাপ্টেন মেজর আনিছ।

বিশিষ্ট রুশ ইতিহাসবদি ভ্যাসিলি কুচেভস্কির উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করতে চাই। “ফুলকে অন্ধরা দেখছে না, এর জন্য ফুল দায়ী নয়। মানুষের অন্ধত্বই দায়ী।… এমন কি যারা ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষা নেয় না বা নিতে চায় না, তাদেরকেও ইতিহাস শিক্ষা দেয়। ইতিহাসকে খাটো করে দেখা বা অবজ্ঞা করার জন্যও এটি তাদেরকে শিক্ষা দেয়।”

নিজেকে সত্যিকার অর্থে আধুনিক মানুষ গড়ে তুলতে চাইলে ইতিহাস চর্চার কোনো বিকল্প নেই।

তথ্যসূত্র:

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র এর ৮ম খণ্ড

ক) ২নং দলিল:

১. ভুক্তি নং ||১২৪|| বদিউজ্জামান, হাজী মেহের আলী রোড, খুলনা।

২. ভুক্তি নং ||১৬৩|| আখতার হোসেন চৌধুরী, ডি,এস,পি,শিল্প এলাকা, খালিশপুর, জেলা- খুলনা।

৩. ভুক্তি নং ||১৬৫|| মোঃ শহীদুল ইসলাম এ্যাডভোকেট, থানা- কোতোয়ালী, যশোর

৪. ভুক্তি নং ||১৬৬|| শ্রী নরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, ষষ্টিতলা, যশোর।

৫. ভুক্তি নং ||১৬৭|| ডাঃ এস, এম, আহাদ আলী খান , থানা- কোতোয়ালী, যশোর

৬. ভুক্তি নং ||১৬৮|| সৈয়দ আলী ইমাম, এস, ডি, ও, এম, ই, এস; (আর্মি), যশোর ক্যান্টনমেন্ট, যশোর

৭. ভুক্তি নং ||১৬৯|| শ্রী গণপতি সরকার, কোতোয়ালী, যশোর

৮. ভুক্তি নং ||১৭০|| নূর জাহান, সুইপার, সি,এম,এইচ মহিলা বিভাগ, যশোর ক্যান্টনমেন্ট

৯. ভুক্তি নং ||১৭১|| মোঃ মোহসিন উল্লাহ, গ্রাম-চৌগাছা, থানা-ঝিকরগাছা, জেলা-যশোর

১০.ভুক্তি নং ||১৭৩|| শ্রী সংকর প্রসাদ ঘোষ, গ্রাম-আউড়িয়া, পোষ্ট-হাট বাড়ীয়া, থানা-নড়াইল, জেলা-যশোর

১১. ভুক্তি নং ||১৭৪|| মোঃ মানিক শিকদার, গ্রাম- চিলগাছা রঘুনাথপুর, ডাকঘর- কমলাপুর, থানা- নড়াইল, জেলা-যশোর

১২. ভুক্তি নং ||১৭৫|| শ্রী বিনয় কৃষ্ণ দত্ত, মহেশপুর, যশোর

১৩. ভুক্তি নং ||১৭৬|| যশোর জেলার মহেশপুর থানার অধীন, মহেশপুর হাসপাতালে পাক সেনাদের কার্যাবলী

১৪. ভুক্তি নং ||১৭৭|| আইনুল হক, গ্রাম- কচুবিল, থানা-মহেশপুর, জেলা-যশোর

১৫. ভুক্তি নং ||১৭৮|| বনবিহারী সিংহ, নওয়াপাড়া, যশোর

১৬. ভুক্তি নং ||১৭৯|| অনিল কুমার মন্ডল, গ্রাম- পাজিয়া, ডাকঘর- পাজিয়া, জেলা- যশোর

১৭. ভুক্তি নং ||১৮০|| সুধীর কুমার নাথ, গ্রাম- মদার দাঙ্গা, ডাকঘর- পাঁজিয়া, থানা- কেশবপুর, জেলা- যশোর

১৮. ভুক্তি নং ||১৮১|| মিঃ মানিক মিয়া (পুলিশ), থানা- মনিরামপুর, জেলা- যশোর

১৯. ভুক্তি নং ||১৮২|| মোঃ শহীদুল ইসলাম, গ্রাম-বেড়ী, ডাকঘর- জাদবপুর, থানা- শারসা, জেলা- যশোর

২০.ভুক্তি নং ||১৮৩|| মোঃ মনছোর আলী, গ্রাম- হাকোবা, ডাকঘর- মনিরামপুর, থানা- মনিরামপুর, জেলা- যশোর

২১. ভুক্তি নং ||১৮৪|| বিকাশ চন্দ্র মল্লিক, মনিরামপুর, যশোর

খ) ৪৮ নং দলিলঃ [অমানুষিক নির্যাতনেও তাঁর মনের বলিষ্ঠতা কমে নি] -দৈনিক বাংলা, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২।

গ) ৬১ নং দলিলঃ [কেউ পাশবিকতা থেকে অব্যাহতি পায় নি] -দৈনিক আজাদ, ৮ মার্চ, ১৯৭২।

ঘ) ৮৭ নং দলিলঃ দা সানডে টাইমস, ২০ জুন, ১৯৭১, পাকিস্তানে গণহত্যা, শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক হত্যা, গুলিবিদ্ধ ম্যাজিস্ট্রেট, চিকিৎসক গুম, গেস্টাপো ধারার আক্রমণ, ধর্ষণ, অত্যাচার।

ঙ) ৮৮ নং দলিলঃ হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড, ১২ এপ্রিল, ১৯৭১, বাস্তুহারাদের মুখে আর্মি বর্বরতার কাহিনী, নারায়ণ দাশ, হরিদাশপুর সীমান্ত চেকপোস্ট, এপ্রিল, ১৯৭১।

বিদ্যুৎ দেআইনজীবী ও লেখক

One Response -- “‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র’ থেকে যশোরে সংগঠিত গণহত্যা”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—