অনেকেরই হয়তো নজরে পড়েছে- নভেম্বর ৩০, ২০১৮ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যার নাম ছিল- ‘হাউস অব কমন্সের প্রতিবেদন: দাবি পূরণ ছাড়া বিএনপির ভোটে আসা ছিল অপ্রত্যাশিত’। সেখানে বলা হয়েছিল- “বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি সবার সমান সুযোগ সৃষ্টি বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর ধারে-কাছেও নেই বলে মন্তব্য করেছে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্স।”   

এর জবাবে ডিসেম্বরের ১ তারিখে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বাংলা মতামত পাতায় আমার ‘হাউস অব কমন্স এর ভূতুড়ে প্রতিবেদন ও সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্ব’ লেখাটি প্রকাশ হয়। সেখানে আমি বলেছিলাম, ‘Bangladesh: November 2018 update’ নামের সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনটি যুক্তরাজ্যের সংসদের নিম্নকক্ষ ‘হাউস অব কমন্স’-এর প্রতিবেদন নয়। পরবর্তীতে আমি জানতে পারি অন্যান্য কয়েকটি জাতীয় দৈনিকেও প্রথম আলোর নভেম্বর ৩০ তারিখের মতো প্রতিবেদন ছাপানো হয়েছিল। আগে জানলে বিডিনউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত লেখায় আমি সেই সব পত্রিকার কথাও উল্লেখ করতাম।  

গতকাল (ডিসেম্বর ৩, ২০১৮) প্রথম আলো তার প্রথম পাতায় একটি ব্যাখ্যা ছাপিয়েছে, যার শিরোনাম ‘প্রকাশিত খবরের ব্যাখ্যা’। প্রথম আলোর ই-পেপার থেকে ব্যাখ্যাটি সংগ্রহ করে পড়েছি, কারণ পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে সেই ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি। 

“প্রকাশিত খবরের ব্যাখ্যা”-তে বলা হয়েছে যে ডিসেম্বর ১ তারিখে প্রথম আলোর মুদ্রিত সংস্করণে নভেম্বর ৩০ তারিখের প্রতিবেদনের বিস্তারিত ব্যাখ্যাসহ প্রকাশ হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে রিসার্চ ব্রিফিং সাংসদদের অবগতির জন্য তৈরি করা হয়ে থাকে। ব্যাখ্যায় আরো বলা হয়েছে যে, প্রথম আলোর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়নি যে রিসার্চ ব্রিফিং জাতীয় দলিল হাউস অব কমন্সের অবস্থান বা প্রস্তাব। এছাড়াও ‘প্রকাশিত খবরের ব্যাখ্যা’-তে স্বীকার করা হয়েছে যে, ‘হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি’ সংশ্লিষ্ট রিসার্চ ব্রিফটি তৈরি করেছিল। 

প্রিয় পাঠক, আপনারা খেয়াল করবেন, নভেম্বর ৩০/ডিসেম্বর ১ তারিখে প্রকাশিত প্রথম আলোর প্রতিবেদনগুলোতে কোথাও ‘হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি’ এর কথা বলা হয়নি। সেখানে বার বার সংশ্লিষ্ট রিসার্চ ব্রিফিংটিকে যুক্তরাজ্যের ‘হাউস অব কমন্স’-এর প্রতিবেদন হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে। একদিকে বলা হয়েছে যে রিসার্চ ব্রিফিং সাংসদদের অবগতির জন্য তৈরি করা হয়ে থাকে, আবার অন্যদিকে বলা হয়েছে যে রিসার্চ ব্রিফিং ‘হাউস অব কমন্স’ এর প্রতিবেদন। এই দুটি কথা পরস্পরবিরোধী। সংশ্লিষ্ট রিসার্চ ব্রিফটি যে ‘হাউস অব কমন্সের’ প্রতিবেদন নয়, বরং ‘হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি’-র, তা আমি পরিষ্কার করেছিলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে প্রকাশিত লেখায়।

‘হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি’ যে সংশ্লিষ্ট রিসার্চ ব্রিফটি তৈরি করেছিল – ‘প্রকাশিত খবরের ব্যাখ্যা’-তে প্রথম আলোর এই স্বীকারোক্তি গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য পত্রিকাটি ধন্যবাদ পাবে। প্রথম আলো এটি স্বীকার না করলে সঙ্গত কারণেই পাঠক খুব স্বাভাবিকভাবেই মনে করতেন যে সংশ্লিষ্ট রিসার্চ ব্রিফটি হচ্ছে ‘হাউস অব কমন্স’ এর প্রতিবেদন।

প্রথম আলোর ‘প্রকাশিত খবরের ব্যাখ্যায়’ শেষ লাইনে বলা হয়েছে- “প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লিখিত রিসার্চ ব্রিফিংটিও তারাই [হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি] তৈরি করেছে এবং তা একইভাবে যুক্তরাজ্যের সংসদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।”

এ প্রসঙ্গে দুটি কথা বলবো, যা পড়ে প্রথম আলো ও সকল পাঠক আশা করি উপকৃত হবেন। সংশ্লিষ্ট রিসার্চ ব্রিফিং ‘যুক্তরাজ্যের সংসদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশ হয়েছে বটে, কিন্তু সেই ওয়েবসাইটের কোথায় প্রকাশ হয়েছে তা স্পষ্ট করা হয়নি। আমি করে দিচ্ছি।

যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে ‘হাউস অব কমন্স’-এর নিজস্ব প্রতিবেদন এবং ‘হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির’ প্রতিবেদন আলাদা আলাদা জায়গায় প্রকাশ হয়। ‘হাউস অব কমন্স’-এর নিজস্ব প্রতিবেদন, যেমন ‘Sessional Returns’, ‘Sessional Diary’, ‘Standing Orders of the House of Commons – Public Business’, ‘House of Commons Commission Publications’ ইত্যাদি প্রকাশিত হয় এখানে- https://bit.ly/2BQkplr; এবং ‘হাউস অফ কমন্স লাইব্রেরি’, ‘হাউস অব লর্ডস লাইব্রেরি’ ও ‘পার্লামেন্টারি অফিস অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’-এর প্রতিবেদন প্রকাশ হয় এখানে- https://bit.ly/2FYWeoR

‘হাউস অব কমন্স’-এর প্রতিবেদন এবং ‘হাউস অফ কমন্স লাইব্রেরি’ (যেখানে বাংলাদেশের নির্বাচন সংশ্লিষ্ট রিসার্চ ব্রিফিং ছাপানো হয়েছে) যেহেতু সম্পূর্ণ আলাদা ধরনের প্রতিবেদন, তাই সেগুলো যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে স্পষ্টভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় স্থান পেয়ে থাকে। 

প্রথম আলোর নভেম্বর ৩০ তারিখের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, “বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি সবার সমান সুযোগ সৃষ্টি বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর ধারে-কাছেও নেই বলে মন্তব্য করেছে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্স”। ডিসেম্বর ১ তারিখে প্রথম আলোর মুদ্রিত সংস্করণের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, “হাউস অব কমন্সের প্রতিবেদন”। তথ্যগতভাবে এই কথাগুলো ভুল এবং উদ্দেশ্যের দিক থেকে অনৈতিক।

যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্স “বাংলাদেশের নির্বাচন পরিস্থিতি সবার সমান সুযোগ সৃষ্টি বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’-এর ধারে-কাছেও নেই” – এমন কথা বলেনি বা তার কোনও  প্রতিবেদনে প্রকাশ করেনি। করলে যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে ‘হাউস অব কমন্স’ এর প্রকাশনার নিজস্ব লিঙ্কে (https://bit.ly/2BQkplr) প্রকাশ করতো। যেহেতু বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট রিসার্চ ব্রিফিং হাউস অব কমন্সের একজন গবেষক লিখেছেন, তাই হাউস অব কমন্সের লাইব্রেরির প্রকাশনার নিজস্ব লিঙ্কে তা প্রকাশিত হয়েছে (https://bit.ly/2FYWeoR)

সাংবাদিক কামাল আহমেদ নিয়মিতভাবে প্রথম আলোতে কলাম লিখেন। ফেইসবুকে অনেকেই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর প্রকাশিত আমার লেখাটি শেয়ার করেছেন। শেয়ার করেছেন এমন দুইজন ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে জনাব আহমেদ মন্তব্য করেছেনঃ 

প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেওয়ার এখতিয়ার প্রথম আলোর, আমার নয়। তবে, যে লেখাটি নিয়ে আপনি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সেবিষয়ে আমি আমার ব্যাক্তিগত মতামত দিতে পারি। প্রথমত: হাউজ অব কমন্সের কাজের ধারা সম্পর্কে জানার জন্য এই লিংকের সহায়তা নিতে পারেন। https://researchbriefings.parliament.uk/ এই পোর্টালে যা প্রকাশিত হয় তা ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রকাশনা। তবে, কোনো প্রকাশনাকে যদি কেউ পার্লামেন্টে গৃহীত প্রস্তাবের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন সেটা সেই ব্যাক্তির সমস্যা। […] কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের গবেষণা বিভাগ একটি গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করলে সেটির পরিচয় সেই প্রতিষ্ঠানের নামে হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। 

জনাব আহমেদ, ‘হাউস অব কমন্স এর ভূতুড়ে প্রতিবেদন ও সাংবাদিকতায় পেশাদারিত্ব’ লেখায় আমি কোথাও হাউস অব কমন্সের লাইব্রেরির প্রতিবেদনের সাথে পার্লামেন্টের গৃহীত প্রস্তাব গুলিয়ে ফেলিনি। মনোযোগ দিয়ে লেখাটি পড়তে অনুরোধ করবো। ‘Bangladesh: November 2018 update’ নামের রিসার্চ ব্রিফিংকে হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির প্রকাশনা বলতে পারেন। দৈনিক প্রথম আলো নভেম্বর ৩০ বা ডিসেম্বর ১ তারিখের প্রতিবেদনগুলোতে তা বলেনি। দৈনিক প্রথম আলো বলেছে সংশ্লিষ্ট রিসার্চ ব্রিফিংটি যুক্তরাজ্যের সংসদের নিম্নকক্ষ ‘হাউস অব কমন্স’ এর প্রতিবেদন।

ডিসেম্বর ৩ তারিখে প্রকাশিত ব্যাখ্যাতে প্রথম আলো তাদের পূর্ববর্তী অবস্থান পরিবর্তন করে স্বীকার করেছে সংশ্লিষ্ট রিসার্চ ব্রিফিংটি হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির প্রতিবেদন। যুক্তরাজ্যের সংসদের নিম্নকক্ষ ‘হাউস অব কমন্স’ একটি সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান। তার নিজস্ব প্রতিবেদনকে হাউস অব কমন্স লাইব্রেরির প্রতিবেদনের সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। আসা করি তফাৎটি এবার বোঝাতে সক্ষম হয়েছি।

এম সানজীব হোসেনকর্নেল আবু তাহেরের ভ্রাতুষ্পুত্র সানজীবের জন্ম ১৯৮৫ সালের ১ এপ্রিল, জাপানের কিয়োটো শহরে। কমনওয়েলথ স্কলার হিসেবে যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা সম্পন্ন করেছেন। এর আগে, ২০০৯ সালে ঢাকার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি এবং ২০১১ সালে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে থেকে ক্রিমিনোলজি ও ক্রিমিনাল জাস্টিস বিষয়ে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। কর্মজীবনে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চিফ প্রসিকিউটরের রিসার্চার হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস স্ট্র্যাটিজি ফোরাম (আইসিএসএফ) এর সদস্য এবং কর্নেল তাহের সংসদ-এর গবেষণা সম্পাদক। ২০১৭ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় সানজীবের সম্পাদিত প্রথম বই 'অপ্রকাশিত তাহের : অপ্রকাশিত রচনা ও পত্রাবলি' আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশ হয়েছে।

Responses -- “জাতীয় দৈনিকের ভুল সংবাদ এবং পরে ‘প্রকাশিত খবরের ব্যাখ্যা’ প্রসঙ্গে”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—