জঙ্গি দমনে বাংলাদেশ সরকারের সাফল্য প্রশংসনীয়। কিন্তু জঙ্গিদের শেকড় মৌলবাদ উচ্ছেদে দরকার কার্যকর একটা পদ্ধতি, সেটা গুলি-বন্দুক-গ্রেপ্তার দিয়ে হয়না। সমস্যাটার চরিত্র পাকিস্তানের উদাহরণ থেকে শেখা দরকার। কারণ দেশে মৌলবাদ প্রথম থেকেই পাকিস্তানি মৌলবাদীদের দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে পরিচালিত। দু’দলের ধর্মবিশ্বাস, গ্রন্থগুলো, কর্মপদ্ধতি ও উদ্দেশ্যে একই।

“পাকিস্তান কী ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগোচ্ছে তা তিরিশ বছর পর টের পাবে” – বলেছিলেন পাঞ্জাবের নিহত গভর্নর সালমান তাসির-এর সদ্য স্বামীহারা স্ত্রী – জানুয়ারি ২০১১। তিরিশ বছর লাগেনি, এখনই সেই ভয়াবহ পরিণতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, স্বঘোষিত ‘নায়েবে রসূল’-দের তাণ্ডবে টালমাটাল পাকিস্তান।

একাত্তরের পর এত গভীর সংকটে পাকিস্তান পড়েনি কখনো। অলক্ষ্যে ধ্বনিত হচ্ছে ইঙ্গিত, বাংলাদেশের কানে কানে কিছু বলছে নিয়তি – দেখো, দেখে শেখো, নতুবা ওরকম চড়া মূল্য দিয়ে ঠেকে শিখতে হবে।

সংক্ষিপ্ত ঘটনাক্রম, প্রধানত: পাকিস্তানের বিভিন্ন টিভি থেকে।

১. ২০০৯ সাল। পাঞ্জাবে ৪৪ বছর বয়স্ক দুই কন্যার জননী খ্রিস্টান আসিয়া বিবি (আসিয়া নওরীন) তার কাপ দিয়ে বালতি থেকে পানি নেবার পর দুজন মুসলিম নারী ঝগড়া শুরু করে এই বলে যে- ওই পানি অপবিত্র হয়ে গেছে। ঝগড়া বেড়ে গেলে তারা আসিয়া বিবিকে ইসলাম গ্রহণের জন্য চাপ দেয় ও অভিযোগ করে যে আসিয়া নবীজীকে (স) নিয়ে আপত্তিকর কথা বলেছে। কথাটা চাউর হলে উত্তেজিত ক্রুদ্ধ জনতার জমায়েতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং ভীতসন্ত্রস্ত আসিয়া বিবি জনতার ও মুরুব্বীদের সামনে আপত্তিকর কথার স্বীকারোক্তি করে ক্ষমা চায়। তারপর সে গ্রেপ্তার হয় ও তার বিরুদ্ধে ধর্মানুভূতিতে আঘাতের মামলা হয় (আইন নং ২৯৫সি)।

২. নিম্ন আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ২০১০ সালে, সেই থেকে সে কারাগারে একা নির্জন কক্ষে বন্দি। আপিল করলে হাইকোর্ট তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছ ২০১৪ সালে, আবার আপিল করলে সুপ্রিম কোর্ট তাকে খালাস দিয়েছে গত ৩১ অক্টোবর, ২০১৮। এই তারিখটা পাকিস্তানে উগ্র মাওলানাদের ও গণমানসে অত্যন্ত স্পর্শকাতর, কারণ পাঞ্জাবে ১৯২৯ সালে এদিনেই ফাঁসি হয়েছিল ভারতবর্ষের প্রথম ধর্মানুভূতি মামলার খুনি ইলমুদ্দীনের যে এখনও পাকিস্তানে বিরাট হিরো।

লাহোরের ছাপাখানার মালিক রাজপাল নবীজীর (স) নারীসঙ্গ নিয়ে “রঙ্গীলা রসুল” বই বের করলে ইলমুদ্দীন তাকে খুন করেছিল। আসিয়ার পক্ষে ও ব্লাসফেমি আইনের বিরোধী পাঞ্জাবের গভর্নর সালমান তাসিরকে ২০১১ সালে তার দেহরক্ষী মুমতাজ কাদির প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করলে তার মৃত্যুদণ্ড হয়, সেও পাকিস্তানে বিরাট হিরো। (দেখুন কাদির ও ইলমুদ্দীনের মামলার বিস্তারিত – মতামত বিভাগ – “আবার জঙ্গি: পাকিস্তানি বনাম বাংলাদেশি গণমানস” – ১০ জানুয়ারি, ২০১৮)৷ উগ্রপন্থীরা খুন করেছে ব্লাসফেমি আইনের বিরোধী সংখ্যালঘু মন্ত্রী শাহবাজ ভাট্টিকে এবং আরেক অভিযুক্ত বন্দি প্রফেসর জুনায়েদ হাফিজের উকিলকেও।

৩. সুপ্রিম কোর্ট আসিয়াকে খালাস দিলে উগ্র ইসলামী রাজনৈতিক দল তেহরিক-এ লাব্বায়েক-এর হুংকারী ইমাম খাদিম হোসেন রিজভী উন্মত্ত জনতাকে রাস্তায় নামিয়ে দেশজুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে। মিটিং মিছিল স্লোগান কাকে বলে তা বাংলাদেশিরা ভালো করেই জানেন। কিন্তু পাকিস্তানে যা হয়েছে তাকে উন্মাদের তাণ্ডব বললেও কম বলা হয়। তারা প্রকাশ্য ঘোষণায় দেশের সর্বোচ্চ তিন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বলতে গেলে যুদ্ধ ঘোষণা করে – (ক) প্রধানমন্ত্রী  ইমরান খানকে “ইহুদীর চর” ঘোষণা করে, (খ) মামলার বিচারপতিদের “কতলযোগ্য” ঘোষণা করে, প্রধান বিচারপতির গৃহভৃত্যদের আহ্বান জানায় তাকে বিষ দিয়ে হত্যা করতে (হার্ট অ্যাটাক হয়ে তিনি হাসপাতালে ছিলেন) এবং (গ) সেনাপ্রধান জাভেদ বাজোয়া-কে “কাফের” ও “কাদিয়ানি” ঘোষণা করে অন্যান্য জেনারেলদের আহ্বান জানায় বিদ্রোহ করে তাকে উৎখাত করতে।

পরে প্রকাশ পায় যে তারা সুপ্রিম কোর্টের রায়টা পড়েও দেখেনি যেখানে পরিষ্কার লেখা আছে কেন আসিয়াকে খালাস দেয়া হলো। তারা হুংকার দিতে দিতে বড় শহরগুলোর রাস্তা অবরোধ করে আগুন লাগিয়েছে, বহু  জায়গায় যান-চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, অসংখ্য গাড়ি ও দোকান ভষ্মিভুত ও লুট হয়, সরকারও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে অনেক জায়গায় বন্ধ করে দেয় মোবাইল ও ইন্টারনেট, পাঞ্জাব সরকার জারি করেছে ১৪৪ ধারা।

৪. এ হেন উন্মাদ আগ্রাসনের প্রতি দেশের সর্বোচ্চ এই তিন প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া ভেজা পাউরুটির মতো মিনমিনে। হিংস্রতাকে আইনের আওতায় না এনে বরং তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে তারা রসুল-প্রেমিক খাঁটি মুসলিম। তারা উগ্র ইমামের সাথে সমঝোতা বৈঠক করে তার তিনটে দাবি মেনে নিয়েছেন – রায় পুনর্বিবেচনার দরখাস্ত ও আসিয়া বিবিকে ‘একজিট কন্ট্রোল লিস্ট’-এ অন্তর্ভুক্ত করা যাতে তিনি পাকিস্তান ছেড়ে যেতে না পারেন। এদুটো ইতোমধ্যে করা হয়েছে। অথচ এক মন্ত্রী বলেছেন আইন মোতাবেক যার বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই, তাকে অন্য দেশের ভিসা পেলে বিদেশ গমনে বাঁধা দেবার অধিকার সরকারের নেই।

৫. এই সমঝোতা বৈঠকের সম্ভাব্য কারণ ব্যাখ্যা করেছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শহীদ খাকান আব্বাসী। তার আমলে এক উগ্র ইমামের নেতৃত্বে এরকম তাণ্ডব হলে তিনি হার্ডলাইনে গিয়ে পুলিশ ও আর্মি প্রয়োগের চেষ্টা করেন। কিন্তু দুই প্রতিষ্ঠানই তাকে স্রেফ না করে দেয়। সেনাপ্রধান তাকে বলেছিলেন- ‘স্বজাতির ওপরে গুলি চালাবো না’। কথাটা একাত্তরে মাথায় ঢুকলে ভালো হতো। ফলে তিনি সমঝোতা বৈঠকে বাধ্য হন। জাতি, প্রশাসন ও সেনাবাহিনীর বড়ো একটা অংশ ইসলামের উগ্র জঙ্গিবাদের কতখানি সমর্থক হয়ে উঠলে একজন সরকার প্রধানকে এভাবে নাকে খৎ দিয়ে উগ্র মাওলানাদের হুংকারের সামনে মাথা নত করে পিছু হটে আসতে হয় তা বুঝতে আইনস্টাইন হতে হয়না। এরমধ্যে আসিয়া বিবির স্বামী-সন্তানেরা গোপন জায়গায় পালিয়ে আছেন এবং তাকে সরকার গোপন জায়গায় নিয়ে রেখেছে। এখন হিংস্র মৌলবাদীরা ঘরে ঘরে হানা দিয়ে তার পরিবারকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে – দ্য গার্ডিয়ান, ২১শে নভেম্বর।

৬. প্রথম থেকেই সংবাদমাধ্যম ওই ভেজা পাউরুটির মতোই মিনমিন করে সরকারের পক্ষে আছে, তারাও প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে যে তারা রসুল-প্রেমিক খাঁটি মুসলিম। সম্প্রতি কিছু আলেম রায়ের পক্ষে মত দিয়েছেন, তাদের মধ্যে আছেন বিখ্যাত আলেম মুফতি শফি’র পুত্র পাকিস্তান কেন্দ্রীয় শারিয়া কোর্টের এবং সুপ্রিম কোর্টের “শারিয়া আপিল বিভাগ” এর প্রাক্তন বিচারক, অনেক ইসলামী সংগঠনের সদস্য ও ইসলামী ব্যাংকের অন্যতম প্রবক্তা-নেতা মওলানা ত্বকী উসমানী। সাথে অনেক আলেমও বলেছেন, এ আইন সাধারণ জনগণের বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের কী সর্বনাশ করেছে। কয়বছর আগে এক মওলানা চাউর করে দিল গরীব খ্রিস্টান মহল্লায় এক বালিকা কোরানের পোড়া পৃষ্ঠা আবর্জনায় ফেলেছে। যা হবার তাই হলো, উন্মত্ত জনতা হুংকার দিয়ে ছুটে এল, পুরো মহল্লার খ্রীষ্টানেরা প্রাণভয়ে বৌ-বাচ্চা নিয়ে পালিয়ে গেল, ওই মওলানা তাদের জমি দখল করল। পরে তদন্তে প্রমাণ হল ওই মওলানাই জমি দখল করার জন্য ষড়যন্ত্র করে আবর্জনায় কোরানে পোড়া পৃষ্ঠা ফেলে দিয়ে ঘটনাটা সাজিয়েছে। শত শত ভয়াবহ ঘটনার এ একটা মাত্র।

৭. আসিয়া বিবির সমর্থনে বহির্বিশ্বে যতই অসংখ্য কণ্ঠ, সংগঠন ও সরকার সোচ্চার হচ্ছে, ততই সেগুলোকে উগ্র মাওলানারা “ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমা ষড়যন্ত্র” হিসেবে প্রচার করছে – জনগণের একাংশ তা বিশ্বাসও করছে। আসিয়া বিবির উকিল হল্যাণ্ডে পালিয়ে গেছেন, নিরাপত্তার জন্য হল্যাণ্ড সরকার পাকিস্তান দূতাবাস থেকে তাদের কর্মচারীদের ফেরত নিয়ে গেছে।

৮. উগ্র ইমামেরা জাতির বিরাট অংশকে এতই হিংস্র করে তুলেছে যে কারো বিরুদ্ধে এ অভিযোগ আনলেই তৎক্ষণাৎ তাকে হত্যার জন্য জনতা পাগল হয়ে হামলে পড়ে। এই দানবেরা গত ২৮ বছরে ৬২ অভিযুক্তকে খুন করেছে, এ ধরনের অভিযোগ করা হয়েছে ১৩০০ জনের বিরুদ্ধে – (ডন, ০১ জুলাই ২০১৬)। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে আছে সাক্ষীদের বক্তব্যগুলোতে এতো পার্থক্য ও পরস্পর-বিরোধীতা আছে যে তার ভিত্তিতে কোনো সাজা দেয়া অসম্ভব – দৈনিক ডন, ০৬ নভেম্বর ২০১৮ থেকে সংক্ষেপে:-

(ক) ঘটনার সময় উপস্থিত নারী ছিল ২৫-৩০ জন। কিন্তু আসমা বিবি ও মাফিয়া বিবি ছাড়া আর কেউ ঘটনাটা সম্বন্ধে কারো কাছেই কিছু বলেনি। তার ওপর, আসমা বিবি ও মাফিয়া বিবি কোর্টে এসেও সাক্ষ্য দেয় নি।

(খ) যে কোনো মামলায় প্রথমেই এফআইআর করার বিধান অথচ এ মামলায় ওটা করা হয়েছে ঘটনার দীর্ঘ পাঁচদিন পরে, তাও আবার পুলিশ তদন্তেরও পরে যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাই, ষড়যন্ত্র করে ঘটনা সাজানোর সম্ভাবনা অবশ্যই থেকে যায়। এটা সব দেশেই প্রযোজ্য।   ক্যানাডার এক স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল ও বোর্ডের সভাপতিকে আজ বরখাস্ত করা হয়েছে শুধুমাত্র  স্কুলে এক হিংস্রতার রিপোর্ট পুলিশকে দুদিন পরে দেবার জন্য।

(গ) বাদী ক্বারী মুহাম্মদ সালাম বলেছেন, এফআইআর-এর প্রাথমিক দরখাস্ত লিখেছিলেন এক  উকিল, কিন্তু তিনি তার নাম পর্যন্ত বলতে পারেননি। তাই, “বর্ণিত ঘটনার সত্যতা সম্বন্ধে সন্দেহ থাকে”।

(ঘ) যে জমায়েতে আসিয়া বিবি স্বীকারোক্তি করে ক্ষমা চেয়েছে বলা হয়েছে, সেখানে উপস্থিত লোকের সংখ্যা মাফিয়া বলেছে ১০০০ জন কিন্তু আসমা বলেছে ২০০০ এর বেশি।

(ঙ) আসমা বলেছে, জমায়েতটা হয়েছিল প্রতিবেশী রানা রাজ্জাকের বাসায়, মাফিয়া বলেছে সেটা হয়েছিল তাদের নিজেদের বাসায়, আরেক সাক্ষী মুহাম্মদ আফজাল বলেছে সেটা হয়েছিল মুখতার আহমদের বাসায়।

(চ) অন্যান্য সাক্ষীরা বলেছে বাদীকে ঘটনাটা জানানো হয়েছে ঘটনার দিনই অর্থাৎ ১৪ জুন, ২০০৯ সালে, কিন্তু বাদী নিজেই বলেছে ঘটনাটা তাকে জানানো হয়েছে ১৬ জুন, ২০০৯ সালে।

(ছ) ঝগড়াটা আদপেই হয়েছিল কিনা, কে কোথায় কবে বেলা কয়টার সময় কি করেছে এমন অনেক কিছুতেই সাক্ষীদের একের কথা অন্যের সাথে মেলেনি। একটা উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি। রায়ে এটাও বলা হয়েছে – “আসামীকে শত শত উত্তেজিত লোকের সামনে একা আনা হয়েছে, সেটা খুব ভীতিপ্রদ পরিস্থিতি ছিল। আসামী নিজেকে হুমকির সম্মুখীন ও ভীত বোধ করে থাকতে পারে, এ অবস্থায় সে যদি স্বীকারোক্তি করেও থাকে তবু তা স্বেচ্ছায় করেছে বলা যাবেনা। এক্সট্রা জুডিশিয়াল স্বীকারোক্তি একটি ভঙ্গুর প্রমাণ মাত্র”।

তাহলে সাক্ষীদের সাক্ষ্যে এত অমিলের পরেও আগের দুটো কোর্ট মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল কিভাবে? অনেকে বলেছেন, পাকিস্তানে এ ধরনের মামলার বিচারকেরা ভয় পান ও অরক্ষিত বোধ করেন, সেটা কারণ হতে পারে। তবে কারণ যা-ই হোক না কেন সাক্ষ্য প্রমাণে এত ভজঘট থাকলে তার ভিত্তিতে মৃত্যুদণ্ড কেন কোনো শাস্তিই দেয়া যায়না।

কালতামামী – সাবধান বাংলাদেশ! 

কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানে প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের স্বার্থে মৌলবাদীদেরকে যতই প্রশ্রয় দিয়েছে ততই সে ক্ষমতাশালী হয়েছে। যুগ যুগ ধরে নিঃশব্দ কৌশলে তারা শক্তিশালী হয়ে এখন সশব্দে ফেটে পড়েছে। কৌশলগুলোর মধ্যে আছে ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করা, আর্মিসহ সরকারের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও জাতির মন-মানসকে নিজেদের উগ্র ধর্মতত্ত্বে প্রভাবিত করা, ক্ষমতার সাথে দোস্তী, অসংখ্য মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা যা থেকে তারা নিমেষে অসংখ্য উন্মত্ত কিশোর তরুণকে রাস্তায় নামাতে পারে, সিলেবাস পরিবর্তন- যাতে বাচ্চারা শৈশব থেকেই ‘মগজ-ধোওয়া’ হয় (এর ওপরে আলাদা করে লিখব) ইত্যাদি। এ পর্যন্ত তারা অনেকটাই সফল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেই একই পথে ধাবমান এবং এক যাত্রায় পৃথক ফল হয়না।

প্রতিবাদ করার অধিকার সবারই আছে, কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা প্রতিবাদীর চরিত্র প্রমাণ করে।

হাসান মাহমুদমুসলিম রিফর্ম মুভমেন্ট-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মী, শারিয়া আইনের ওপর গবেষক, লেখক ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনের বক্তা।

১২ Responses -- “ধর্মানুভূতি: কঠিন সংকটে পাকিস্তান, দেখে শিখবো নাকি ঠেকে?”

  1. Rupal

    কিছুদিন আগে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলার কলেজ পড়ুয়া একটি মুসলিম মেয়ে প্রতিবেশি এক হিন্দু ছেলের সাথে প্রেম করায় মেয়েটির মা মেয়েটিকে হত্যা করে লাশ বাড়ির পাশের ডোবায় কচুরিপানার নিচে চাপা দিয়ে গুম করে৷ এরপর মেয়ে নিখোঁজ মর্মে থানায় জিডি করে৷ পুলিশি তদন্তে খুনের বর্নিত কারন বেরিয়ে আসার পর বাংলাদেশের প্রায় সবগুলো পত্রিকায় এসংক্রান্ত খবর প্রকাশ করে৷ আমি প্রথম সারির কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত খবরগুলোর কয়েকশ পাবলিক কমেন্ট পড়ি৷ তাতে দেখা যায়, ৯৯ % মানুষই মেয়েটির মায়ের হত্যাকর্মকে জোরালোভাবে সমর্থন করে বাহবা দিয়েছে৷ মেয়েকে হত্যা করার মাধ্যমে মা ইসলাম ধর্ম রক্ষা করেছে মর্মে অনেকে মত প্রকাশ করেছে৷ এই যদি হয় এদেশের মানুষের বর্তমান মানসিকতা তবে বাংলাদেশের অবস্থাও পাকিস্থানের মত হতে বেশি সময় লাগবে বলে মনে হয় না৷

    Reply
    • Bongo Raj

      সময়োপযোগী যথাযথ কমেন্ট। ধন্যবাদ।
      ধর্ম যখন আদিমতাকে প্রচন্ডভাবে জড়িয়ে ধরে, তখনি তার পতন শুরু হয়। অতীতের ধর্মগুলো এই রূপ নেবার পরই আরেকটা ধর্ম তাকে সরিয়ে জায়গা করে নিয়েছে (অন্যভাবে বললে বলা যায়, খোদাতালা নতুন করে তার পয়গম্বর পাঠিয়েছিলেন জন্ম নেওয়া আদিমতাকে মুছে দিতে।

      তারপরও আমি হতাশ নই, জনাব মুজতবা আলীর সেই বিখ্যাত বয়ানটাকে স্মরণ করে বুকে আশা বেঁধে রাখি, যেমন
      “বাঙ্গালীর চরিত্রে বিদ্রোহ বিদ্যমান। তার অর্থ এই যে কি রাজনীতি, কি ধর্ম, কি সাহিত্য, যখনই যেখানে সে সত্য শিব সুন্দরের সন্ধান পেয়েছে তখনই সেটা গ্রহণ করতে চেয়েছে; তখন কেউ গতানুগতিক পন্থা, প্রাচীন ঐতিহ্যের দোহাই দিয়ে সে প্রচেষ্টায় বাধা দিতে গেলে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। এবং তার চেয়েও বড় কথা যখন সেই বিদ্রোহ উচ্ছৃঙ্খলতায় পরিণত হতে চেয়েছে, তখন তার বিরুদ্ধে আবার বিদ্রোহ করেছে। এই বিদ্রোহী চরিত্র বাঙ্গালীর জন্মগত চরিত্র”

      অন্য মুসলিম দেশের মুসলমানের চাইতে বাংলার মুসলমানেরা এই যায়গায় একটু আলাদা। তার প্রমাণ ১৯৭৫-১৯৯৬, ২০০১-২০০৬ এর আদিমতাকে আমরা ছুড়ে ফেলতে পেরেছি। তাই বাংলাদেশ হবে না পাকিস্থান এই একটুখানি ভরসা রাখি!!

      Reply
  2. Amalendra Saha

    মানব সভ্যতার অগ্রগতিতে ধর্মের ভূমিকা অপরিসীম। ধর্মগুরু নামক এক শ্রেণীর ভণ্ড এবং প্রতারক সেই ধর্মেরই অপব্যবহার করে বর্বরতার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে এবং
    এখনো করে যাচ্ছে।

    Reply
  3. সরকার জাবেদ ইকবাল

    ধর্মোন্মাদনার জন্য কোন উন্মাদেরই বিচার হয় না। সাংবাদিক খাশুগি হত্যা তার একটি সাম্প্রতিক প্রমাণ। আশা করি লেখক এ বিষয়ে কিংবা সৌদী রাজতন্ত্রের স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ে আগামীতে কিছু লিখবেন।

    Reply
  4. Bongo Raj

    Most devastating and dangerous side of today’s islam is that if anyone uttered anything as such that XYZ had criticized Islam or its relevants (prophet , quran, hadith etc.) thousnds of muslims gathered to kill the respective person(s)/community without confirming anything.
    I wonder what is barbaric if not this behavior Muslims?

    I am a highly devoted muslim.

    Reply
  5. হাসান মাহমুদ

    গণজমায়েতে আসিয়া বিবি প্রথমে বলেছিল সে রসূলের (স) বিরুদ্ধে কিছু বলেনি এবং বাইবেল হাতে শপথ করবে কোরান-রসূল (স)এর প্রতি তার কোনো ঘৃণা নেই, কিন্তু সে সুযোগ তাকে দেয়া হয়নি। তার ওপরে, হানাফী আইনে এ ধরণের মামলার অত্যাবশ্যকীয় শর্ত হচ্ছে অভিযোগ যদি প্রমাণিতও হয় তবু ইসলামী রাষ্ট্র অভিযুক্তকে ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ দিতে বাধ্য। কিন্তু পাকিস্তানের আইন ২৯৫সি-তে এ সুযোগ নেই। ধর্মানুভূতি আইনের সমর্থকদের জন্য এর একমাত্র সমাধান হচ্ছে কতল।

    Reply
  6. ইকবাল করিম হাসনু

    দেখে কেউ তো শেখে না ঠেকেও যে শেখে এমন উদাহরণ বিরল। ধর্ম সে যেই ধরনেরই বা যে কোনো মানবগোষ্ঠীরর চর্চিত হোক না কেন তা সবসময়েই সর্বকালে নিরন্তর জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধিৎসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সেই বিতর্ক দীর্ঘ পরিসর দাবি করে তবে সংক্ষেপে এখানে বিরাজমান বিশ্বরাষ্ট্র ব্যবস্থায় আচরিত অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায় যেসব রাজনীতিক মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠনে ধর্মের ইতিবাচক ভূমিকার কথা বলে থাকেন তাঁরা সত্যের অপলাপ করে থাকেন। ক্যুবা, উত্তর কোরিয়া, বা ভূতপূর্ব সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সমাজে রাষ্ট্র যেখানে ধর্মাচারকে আনুষ্ঠানিকভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেনি সেখানকার মানুষের নৈতিকতায় ধস নেমেছে বলে কোনে সাক্ষ্য প্রমাণ নেই বরং পাশ্চাত্যসহ বিশ্বের নানাস্থানে ঘোষিত ধর্মাশ্রিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় অনৈতিক কার্যকলাপ ও ব্যভিচারের মাত্রা বহুলাংশে বেশি। এটা ধর্মের দোহাই দেওয়া রাজনীতিকরা বিলক্ষণ জানেন তবুও আসল কথাটা তাঁরা মুখে আনেন না এ কারণে যে, সংঘবদ্ধ ধর্মাচার ও তার প্রাতিষ্ঠানিকতা ব্যবসায়ের জন্যে দারুণ কার্যকর এবং মানুষকে শোষণমূলক সমাজব্যবস্থার অন্তর্হিত কারণ সম্পর্কে অজ্ঞ রাখার জন্যে তুরুপস্বরূপ।

    Reply
    • সরকার জাবেদ ইকবাল

      ইকবাল সাহেব, এখানে আরও একটি বিষয় আছে। পুরুষ-শাসিত সমাজে ধর্মগুরুরা যুগে যুগে ধর্মীয় অনুশাসনগুলোকে তাদের নিজেদের সুবিধানুগ করে নিয়েছে এবং সেগুলোর অপব্যবহার/অপপ্রয়োগ করেছে এবং করে যাচ্ছে। ফলে, নারীর আহাজারি/আর্তনাদ অশ্রুতই থেকে যাচ্ছে। অথচ, ধর্মীয় বিধিবিধানে নারীকে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদা দেয়া হয়েছে; অন্তত ইসলামী বিধানে যা প্রতিমুহূর্তে ভুলুন্ঠিত হচ্ছে।

      Reply
      • আহমেদ

        জনাব সরকার জাবেদ ইকবাল, এখানে পুরুষ শাসিত সমাজের কথা আসছে কেন? রসরাজ আর শিক্ষক শ্যামলকান্তির কথা এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলেন। তারা তো মহিলা ছিলেন না।

      • সরকার জাবেদ ইকবাল

        অকাট্য যুক্তি। ধন্যবাদ জনাব আহমেদ। ভুলে যাইনি। আমি শুধু আসিয়া বিবি সূত্রে ভিন্ন একটি দিক দেখানোর চেষ্টা করেছি মাত্র।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—