#মিটু এর ঢেউ লেগেছে বাংলাদেশেও। একে একে মুখ খুলছে মেয়েরা। সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও অভিযুক্ত এবং অভিযোগকারীদের অধিকাংশই মিডিয়া ও সংস্কৃতি অঙ্গনের সাথে জড়িত। অভিযোগের আঙ্গুল উঠেছে  সাংবাদিক থেকে শুরু করে নাট্যকার, আবৃত্তিকার, টিভি সঞ্চালক প্রমুখের বিরুদ্ধে।
#মিটু সমাজে প্রচণ্ডভাবে বিরাজমান নিপীড়ন প্রকাশে এর শিকার নারী-পুরুষকে সাহস যুগিয়েছে। এতোদিন পর তারা অন্তত এটুকু ভরসার জায়গা খুঁজে পেয়েছে যে তাদের কথা শোনার এবং বিবেচনায় নেয়ার কিছু হলেও মানুষ আছে। #মিটু এর এই অকপট প্রকাশ আমাদের চিন্তা প্রক্রিয়া এবং আচরণ নিয়ে আবার ভাবতে বলছে।
এর বিপরীতে মিডিয়া এবং মিডিয়ায় কর্মরত মানুষদের আপাত নীরবতা ও কৌশলী হওয়ার আহ্বান নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে এক ধরনের ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র  নির্মাতা হার্ভি ওয়েনস্টেইনের বিরুদ্ধে আমেরিকায়, এমনকি পাশ্ববর্তী দেশ  ভারতে সাজিদ খান বা আনু মালিকদের যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে মিডিয়া সংশ্লিষ্ট মানুষদের আমরা যেমন একাট্টা হতে দেখেছি, বাংলাদেশে যেন তার অনেকটাই অনুপস্থিত। বিচ্ছিন্নভাবে মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কেউ কেউ আওয়াজ তুললেও, কোনভাবেই যেন প্রতিবাদটা দানা বাঁধতে চাইছে না। উল্টো যারা এই নীরবতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন, তাদের প্রতি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছেন মিডিয়া সংশ্লিষ্ট অনেকে। অনেকে চরিত্রহনন করতে বসেছেন ভিকটিমদের। খেলছেন ‘ভিকটিম ব্লেইমের’ সেই পুরনো কার্ড। সাথে আছে “আগে কেন বলেনি” র হাস্যকর দাবী।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হতেই পারে যে মিডিয়া হাউজগুলো যৌন নির্যাতনের আখড়া। কিন্তু শুধু মিডিয়াকে নিয়ে এমন সিদ্ধান্তে আসার আগে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, আমরা সম্মিলিতভাবে একধরনের ‘ধর্ষণের সংস্কৃতি’- তে বাস করি। মিডিয়া বা সাংস্কৃতিক অঙ্গনও তা থেকে মুক্ত নয়। এবং ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের শিকার নারীর পরিবারের মতোই মিডিয়ার অনেকেই ‘সম্মানহানী’ বা ‘ইমেজ সংকটের’ ভয়ে ভীত। সাথে আছে বিরুদ্ধাচরণ করে ক্ষমতাবানদের রোষানলে পড়ার আশঙ্কা।  এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। বরং মিডিয়া সংশ্লিষ্ট মানুষদের নিয়ে এই অভিযোগের আধিক্যকে আমি সুবাতাস হিসেবে দেখতে চাই।
মিডিয়াকে কেন্দ্র করে চলমান এই অভিযোগের প্রকাশ আমাকে বরং আশাবাদের গল্প বলে। খেয়াল করে দেখলে বোঝা যায়, মিডিয়া সংশ্লিষ্ট মানুষগুলোর এই নিপীড়কদের কথা আমরা যত সহজে প্রকাশ করতে পারছি, একইরকম সাহসিকতা ও ঋজুতায় আমরা পরিবারের ভিতর ঘটে যাওয়া নিপীড়নের ঘটনাগুলো প্রকাশ করতে পারছি না। পরিবারের ভিতরে ঘটা যৌন নিপীড়নের যে কয়টা #মিটু প্রকাশ হয়েছে, তাতে মিডিয়ার মতো সুনির্দিষ্ট পরিচয় প্রকাশের সাহস কেউ দেখাতে পারেননি। অন্য কোনও করপোরেট বা উন্নয়ন সংস্থা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিক পরিসরে  কেউ #মিটু নিয়ে এগিয়েও আসেনি এই পর্যন্ত। এমন ভাবার কোনও কারণই নেই যে, বাংলাদেশের অন্যান্য সব সেক্টর সম্পূর্ণরূপে যৌন নিপীড়ন মুক্ত। একইরকমভাবে অন্যান্য সেক্টরের মেয়েরাও যদি মুখ খোলা শুরু করে, তাহলে বাংলাদেশে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘটে যাবে নিঃসন্দেহে।
তাই আমি মিডিয়ার কারো কারো বিরুদ্ধে এই #মিটু-কে মিডিয়ার সীমাবদ্ধতা নয়, বরং সম্ভাবনা হিসেবেই দেখতে চাই। বিশেষ করে, একটি টিভি চ্যানেল এবং একটি পত্রিকা যখন অভিযোগ আমলে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখন আমাদের মনে আশা জাগে বৈকি।
একটিমাত্র প্রতিষ্ঠান বা সেক্টরের দিকে আঙ্গুল না তুলে বরং #মিটু এর এই আন্দোলন বা প্রকাশ আমাদের কি বার্তা দিচ্ছে খোলা মন নিয়ে সেটা বোঝা বা বোঝার চেষ্টা করাটা জরুরী। এটা শুধুমাত্র একজন দু’জন ভিকটিমের অভিযোগের বিচারের ডাক এটা নয়। ব্যক্তিগত যৌন নিপীড়নের  অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে #মিটু আমাদের বলছে যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রাতিষ্ঠানিক ও নিয়মতান্ত্রিক জেন্ডার বৈষম্য নিয়ে কথা বলতে। বলছে যৌন নিপীড়নের  প্রতিকার ও অবসানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে।
#মিটু মিডিয়াকে তো বটেই, অন্য যেকোনও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে থাকা নিপীড়ক পুরুষকে চ্যালেঞ্জ করছে। চোখে চোখ রেখে দাবি করছে, তোমাদের এবার বদলাতে হবে। শুধুমাত্র তোমাদের সুবিধামতো তৈরি করা নিয়ম ও আচরণবিধি আমরা মানি না। এই দাবিতে কোন ভনিতা নেই, নেই কোনও সংকোচ।
কাজেই #মিটু নিয়ে যারা সাহসিকতার সাথে এগিয়ে এসেছে, তাদের দোষারোপ না করে, আসুন আমরা আর কোন যৌন নিপীড়নের ঘটনা যেন না ঘটতে পারে সেদিকে মনোযোগী হই। কেন এসব ঘটতে পারে সেই কাঠামোগত সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করি। আমরা ভুলেও একবারও না ভাবি, এসব অপরাধ ঠিক আছে বা তেমন মারাত্মক কিছু নয়।
প্রশ্ন উঠতেই পারে, প্রতিবাদের দায় কি শুধু মিডিয়ার? নিশ্চয়ই নয়। একজন সচেতন ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে দায় আমাদের প্রত্যেকের। পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে সকলকেই এই নিপীড়ন ও কাঠামোগত বৈষম্যকে চ্যালেজ করতে পারতে হবে।
তবু কথা থাকে। মিডিয়ার কাছে স্বাভাবিক কারণেই আমাদের প্রত্যাশা একটু বেশি। কারণ, সার্বিকভাবে মিডিয়া কোনও সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুকে যতটা প্রভাবিত করতে সক্ষম আর কোন মাধ্যমই ততটা নয়। মিডিয়ার দায়িত্বশীল আচরণ যৌন নিপীড়নের সংস্কৃতির পরিবর্তনে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
সবশেষে, নিপীড়নের কথা প্রকাশকারী প্রতিটি নারী ও পুরুষকে আমি স্যালুট জানাই। পাশাপাশি,  ভিকটিমের অভিযোগ আমলে নেয়ায় আমি বিশেষভাবে ডিবিসি নিউজ এবং ডেইলি স্টারকে ধন্যবাদ দিতে চাই।

Responses -- “# মিটু- শুধুই মিডিয়ার সমস্যা নাকি সম্ভাবনা?”

  1. হাসান মাহমুদ

    আকাশের তারা দেখি কি মুগ্ধ চোখে,
    বিমুগ্ধ শুনি কত তারকা-কথন,
    সেই তারা খসে যবে পড়ে মর্ত্যলোকে,
    মহা আনন্দে দেখি তারকা-পতন ….

    নিবন্ধ ভালো হয়েছে, তবে পুরো পুরুষ জাতটা যে কোনো নারীর অরক্ষিত শিকার না হয়ে দাঁড়ায়….

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—