বাংলাদেশের মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রামকে চেনেন ওখানকার নৈসর্গিক দৃশ্য ও রূপের কারণে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ শীত ও গ্রীষ্মকালীন অবসর যাপন কিংবা ভ্রমণের জন্য বান্দরবানের স্বর্ণমন্দির, চিম্বুক পাহাড়, শৈলপ্রপাত, নীলগিরি, নীলাচল; খাগড়াছড়ির পানছড়ি, মাইনী ও চেঙ্গি উপত্যকা, আলুটিলা পাহাড় ও গুহা, রিছাং ঝর্ণা, বিভিন্ন বৌদ্ধ মন্দির, রাঙ্গামাটির ঝুলন্ত ব্রিজ, শুভলং ঝর্ণা, বনবিহার, চাকমা রাজার বাড়ি, কাপ্তাই লেইক যান।

পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই লেইকের ছলাৎ ছলাৎ জল সাধারণ বাঙালিকে মুগ্ধ করে । কিন্তু এই কাপ্তাই লেইক পাকিস্তান আমল থেকেই যে আদিবাসী জাতি জনগোষ্ঠীর মানুষের কাছে বেদনার্ত চোখের জল তা বাঙালিই জানে না। সমতলের বাঙালির জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ড্যাম-ব্যারেজ নির্মাণ করতে গিয়ে এই কাপ্তাই লেইকের কারণে যে ৪০-৫০টি গ্রাম ডুবে গিয়েছিল, লাখো মানুষ যে বসতভিটাহীন উদ্বাস্তুতে রূপান্তরিত হয়েছিল তা বেশিরভাগ বাঙালিরই জানার সুযোগ নেই।

এম এন লারমা

বাংলাদেশের প্রাথমিক শ্রেণি থেকে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যবই কিংবা ইতিহাসের বইগুলোতে আদিবাসীদের সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও জুমচাষভিত্তিক জীবন, প্রান্তিক সংস্কৃতি, পাহাড়ী ও শান্তিবাহিনী সম্পর্কে যা লেখা হয়ে থাকে বা শিক্ষাদান করা হয় তাতে প্রচলিত ও আধিপত্যবাদী ডিসকোর্সের বাইরে ভিন্নতর কোনও ডিসকোর্স, দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠার ন্যূনতম সুযোগ নেই। বাংলাদেশের উগ্রবাদী বাঙালি জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে আদিবাসী সম্পর্কে লিখতে গিয়ে তারা যা লেখেন, এর বাইরে সাধারণ মানুষের বের হওয়া প্রায় সাধারণভাবে প্রায় দুরূহ এবং অসম্ভব ব্যাপার। যদিও বাস্তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে নিয়ে বাঙালি লেখকদের বাইরে আদিবাসী লেখক, আদিবাসী দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত পোষণকারী মানুষজনও অনেক কিছু লিখেছেন বা লিখে চলেছেন।

তবে এসবের বেশিরভাগ বৃহত্তর বাঙালি জনগোষ্ঠীর কাছে যাওয়ার সুযোগ নেই। এসব লেখা প্রান্তিক অবস্থানে থাকলেও এর মধ্যে বহু বিস্তৃত বিষয়বস্তু আছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম, আদিবাসী আন্দোলন ও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে নিয়ে বহু লেন্স থেকে দেখা কিংবা লেখার সুযোগ থাকলেও আমি বর্তমান প্রবন্ধে শুধু এই বিষয়ে আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতার অনুপুঙ্খ বয়ান তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। লেখাটিতে আমার গড়ে উঠার সময়কালের সমান্তরালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যু, আদিবাসী আন্দোলন ও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সম্পর্কে পাঠ, শিক্ষাগ্রহণ ও পাঠদানের সময়ে কীভাবে আমি বিষয়টি সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠি সেসব বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবো।

সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে থাকার সময়ে সিলেটের ‘বইপত্র’ নামে একটি বইয়ের দোকানে হুমায়ুন আজাদের বই খুঁজছি। আরজ আলী মাতুব্বর, তসলিমা নাসরীন, প্রবীর ঘোষ থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রথাবিরোধী লেখকের মতো নিয়মিতই হুমায়ুন আজাদের বই পড়ি, পড়তে ভালো লাগে। এক ধরনের ঘোর কাজ করে। হুমায়ুন আজাদের প্রবন্ধ, উপন্যাস, কলাম, সাক্ষাৎকার সংকলন, শিশু সাহিত্যের বই নিয়মিত পড়ি, খুঁজে বেড়াই। তো বইপত্রের একটি তাকে হুমায়ুন আজাদ লিখিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম: সবুজ পাহাড়ের ভিতর দিয়ে বয়ে চলে হিংসার ঝরনাধারা’ বইটি চোখে পড়ে। ছোট্ট কিন্তু চমৎকার একটি নাম। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে, হুমায়ুন আজাদের বই এবং চমৎকার ও ব্যতিক্রমধর্মী নামের কারনেই বইটি আমার প্রিয় হয়ে উঠে। কী পড়েছিলাম বিস্তারিত মনে নেই। কিন্তু সেই বই লেখা দুটি নাম আমাকে মুগ্ধ করেছিলো। একজন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা, যিনি আদিবাসী আন্দোলনের নায়ক এবং আরেকজন তখনকার সময়ে অন্যতম পরিচিত কিন্তু বাঙালিদের কাছে পরিচিত কিন্তু খানিকটা রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে পাহাড়ে অশান্তি সৃষ্টিকারী রাষ্ট্রবিরোধী চক্রান্তে জড়িত ও বিতর্কিত জ্যেতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা। সন্তু লারমাকে অবশ্য আগেই চেনা ছিল। তিনি ১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তির আগে কিংবা পরে বাংলাদেশের সংবাদপত্র, টেলিভিশন মিডিয়াতে নিয়মিত খবরের অংশ ছিলেন। এবং আমরা যারা গ্রামে বড় হয়েছি তারাও প্রধানত ছোটবেলা থেকেই বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) এর সংবাদে প্রায় প্রতিদিনই পাহাড়ি নেতা বলে ‘সন্তু লারমা’ এর নাম শুনতাম। তো ওই বইয়ের আর কিছু মনে নেই। শুধু মনে আছে তিনি সেখানে আদিবাসী ইস্যু নিয়ে একটা মোটামুটি দীর্ঘ একটি আলোচনা করেছিলেন।

বামপন্থী রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার কারণে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এর একটি পুস্তিকা আমার কাছে আসে। তা হলো কমরেড খালেকুজ্জামান এর ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে’। আমার যতটুকু মনে আছে, ওই বইয়ে তিনি মার্কসবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে আদিবাসী ইস্যুকে কীভাবে দেখা হয় তা তুলে ধরেছিলেন। এখানে পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুটিকে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা হয়েছিলো। ধারাবাহিকভাবে সংকটের সমস্যা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির সমান্তরালে বিচ্ছিন্নতাবাদ প্রসঙ্গ কিংবা বলতে পারি সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রের কথা সামনে এনে ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো স্বাধীনতার প্রসঙ্গটি সম্ভবত তিনি এড়িয়ে গিয়েছিলেন।

যদিও স্বশাসন কিংবা আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের প্রশ্নটিকে ইতিবাচকভাবে দেখেছিলেন। তবে এই দেখার মধ্যে শ্রেণি প্রশ্নটিই প্রচণ্ডভাবে এসেছিলো এবং এখানে একটি বিষয় বারবারই জোর দেয়া হচ্ছিল যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম কিংবা কাশ্মীর যদি স্বাধীন ভূখণ্ড হয় তবে সেখানে সাম্রারাজ্যবাদী নীলনকশা কিংবা ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনী কিংবা ভারতীয় সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীর আরো সুবিধা হবে। এর বেশি কিছু মনে নেই। ছাত্রজীবনে ওইটুকুই আমার প্রত্যক্ষভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং পরোক্ষভাবে এম এন লারমা সম্পর্কে জানা। তবে এটা ঠিক যে, শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের জন্য সাম্যবাদী সমাজ নির্মাণের রাজনীতিই পরবর্তীতে বিভিন্ন বিষয়ে দেখার চোখ তৈরি করে দিয়েছিলো। মানবমুক্তির সামগ্রিক সংগ্রামের পাশাপাশি বিশেষ শ্রেণি, গ্রুপ বা সংস্কৃতির মুক্তির প্রশ্নটিও মনে হয় তখন থেকেই বুঝতে শিখেছিলাম।

যা হোক, আমার ছাত্রত্ব শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আমি আমার শিক্ষক খায়রুল ইসলাম চৌধুরীর সাথে পিএইচডি গবেষণার সহযোগী হিসেবে কাজ করতে শুরু করি। সেটা ২০০৭ কিংবা ২০০৮ সালের কথা। সেখানে থাকাকালীন আমি নতুন করে আবিষ্কার করতে শিখি পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যুকে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যু নিয়ে স্থানীয় আদিবাসী লেখকদের এত লেখালেখি কিংবা ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল এমনকি বাংলাদেশ আমলে সরকারগুলোর আদিবাসী ইস্যু নিয়ে এত পরিকল্পনা, নীতি ও কার্যক্রম সম্পর্কে আমার জানা ছিলোনা। আমরা সাধারণ বাঙালিরা তখনও বাস্তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘উপজাতীয়’ মানুষজনকে মোটামুটি পিছিয়ে পড়া, সাধারণ জীবনে অভ্যস্ত কিন্তু খানিকটা ‘অশিক্ষিত’ বলেই জানতাম। যেমনটি ব্রিটিশরা আমাদের সম্পর্কে করতেন। প্রাচীন, আদিম কিংবা বর্বর হিসেবে চিহ্নিত করার মানসিকতা। ‘উপজাতীয়’ শব্দটি ব্যবহার করলাম এজন্যই যে, আসলে তখনো আদিবাসী শব্দটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতাম না। এই শব্দের মাজেজা কী ছিল তা জানা ছিলোনা। যা হোক, পিএইচডি গবেষণার জন্য বইপত্র, সরকারি রিপোর্ট, বিভিন্ন সংবাদ নিউজ, আদিবাসী বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের রিপোর্ট থেকে শুরু করে এমন কিছু ছিলোনা, যা স্যারের কাছে নেই! বাস্তবে স্যারের কাছে থাকা বইপত্র দেখে মনে হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আদিবাসী বিষয়ে ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’। আসলে স্যারের সাথে কাজ না করলে আমি কখনোই হয়তো বুঝতে শিখতাম না বা উপলব্ধি করতে পারতাম না যে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আদিবাসী ইস্যু এত গুরুত্বপূর্ণ একটা রাজনৈতিক ইস্যু।

স্যারের কাছে ব্রিটিশ আমল থেকে প্রকাশিত আদিবাসী বিষয়ক সরকারী আইন, নীতিমালা এবং বিধিসমূহ বিশেষ করে ‘১৯০০ সালের আইন’ ‘১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন’ এর কপি থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলসহ যত আইন ছিল, তার একটি করে কপি ছিল। ব্রিটিশ লেখক উইলিয়াম হান্টার, টি এইচ ল্যুইনসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে পাশ্চাত্যের লেখক পিয়েরে বেসাইন, ওলফ গ্যাং মে সহ নাম না জানা অনেক লেখকের বই আমার মনোযোগ কেড়েছিলো। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেশে আদিবাসী জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রনের অধিকার নিয়ে যত আদিবাসী আন্দোলন হয়েছে তার একাডেমিক ও তাত্ত্বিক বইসমূহের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চল নিয়ন্ত্রনের জন্য ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে রচিত বিভিন্ন রিপোর্ট, বিদেশি সংস্থা বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইইউসিএন- এর পলিসি রিপোর্ট। আদিবাসী বিষয়ে পাকিস্তান, বাংলাদেশ আমলে পত্রপত্রিকায়, সেমিনার  ও কনফারেন্সে প্রকাশিত ও পঠিত প্রবন্ধ এবং বইয়ের কপি। আমার মনে আছে ১৯৮০ কি ১৯৮১ সালে সাপ্তাহিক ‘রোববার’ এবং ‘নিউ নেশন’ পত্রিকায় পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে ধারাবাহিক রিপোর্ট, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা নিয়ে কানাডার ন্যাশনাল লাইব্রেরি আর্কাইভ থেকে সংগৃহিত রিপোর্ট, আদিবাসী সমস্যা নিয়ে ইউজিসি কর্তৃক প্রকাশিত মনোগ্রাফ রিপোর্ট, সেন্টার ফর সোশ্যাল স্টাডিজের প্রকাশিত আদিবাসী বিষয়ক জার্নাল ও লেখালেখি, ১৯২০ সালে ব্রিটিশদের বনাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এডিথ কাওয়ান রিপোর্টের মতো দুর্লভ ও হারিয়ে যাওয়া অনেক বিষয়।

স্যারের বইয়ের মধ্যে থেকেই আমি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা, সন্তু লারমা, জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা, রাজা দেবাশীষ রায়, মঙ্গল কুমার চাকমা, প্রশান্ত ত্রিপুরাসহ আদিবাসী বিষয়ে অনেক লেখক কিংবা আদিবাসী আন্দোলনের নেতাদেরকে চিনি। ‘মাওরুম’, ‘জুম’, ‘সলিডারিটি’ এবং ‘উসুই’ নামে বিভিন্ন আদিবাসীবিষয়ক পত্রপত্রিকা কিংবা সংগঠন থাকতে পারে তা আমার কখনো জানাই ছিলোনা! বাস্তবে সাধারণ বাঙালি জাতি, জনগোষ্ঠীর মানুষজনের যে আদিবাসী বিষয়ক ধারণা তা আমার ক্ষেত্রে পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিলো।

সত্যি বলতে আদিবাসীদের নিয়ে কিংবা বলতে পারি আদিবাসী নেতৃত্ব, গবেষক এবং অ্যাকটিভিস্ট যে এত লেখালেখি করেন তা আমি ধারণাও করতে পারিনি। তবে সে সময়েও সাধারণভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যু এবং আদিবাসী আন্দোলন সম্পর্কে আমার যতটুকু ধারণা ছিলো মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সম্পর্কে খুব বেশি গভীরভাবে জানা ছিলো না। আমার যতটুকু মনে হয়, আদিবাসী ইস্যু নিয়ে যত লেখালেখি আছে সরাসরি মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা নিয়ে এত লেখালেখি হয়নি। আর এম এন লারমাও সরাসরি কিছু লিখেছেন কিনা আমার জানা নাই। আমার পড়া হয় নি। অথবা আদৌ আছে কিনা জানা ছিলো না। যা হোক,  স্যারের সাথে কাজ করতে গিয়ে সেই সময়ে আমার আদিবাসী বিষয়ক ধারণা এবং অভিজ্ঞতা একেবারে পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিলো। ওই সময়ে আমি প্রথম বুঝতে শিখেছিলাম আদিবাসী জাতি, জনগোষ্ঠীর মানুষজন ভিনগ্রহের মানুষ নয় বরং সেটেলার বাঙালি ও তাদের সরকার কর্তৃক নিপীড়িত অধিকারহীন একটি ‘জাতি’। যাদেরকে সরকার কখনোই স্বতন্ত্র জাতি বলে স্বীকার না করে বরং তাদের বিভিন্ন নেতিবাচক প্রত্যয় (derogatory term) ব্যবহার করে ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’, ‘ট্রাইবাল’ বলে চিহ্নিত করতে চান।

আসলে ওই সময় থেকেই আদিবাসী বিষয় সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠতে শুরু করি। প্রতিবছর আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস, পার্বত্য শান্তি চুক্তির বার্ষিকী, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা জন্ম কিংবা মৃত্যুবার্ষিকী সম্পর্কে বিভিন্ন অনুষ্ঠান, আলোচনা ও সেমিনারের সংবাদ হলে খোঁজ রাখার চেষ্ঠা করি। আদিবাসী ইস্যু নিয়ে নৃবিজ্ঞানীদের বিভিন্ন লেখা নিয়ে বিশ্লেষণাত্ত্বক প্রবন্ধগুলো পাঠ করতে চেষ্ঠা করি। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা জীবনের প্রথম থেকেই দেখেছি আদিবাসী ছাত্রছাত্রীরা আদিবাসী দিবসে র‌্যালি, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের চেষ্টা করেন। আদিবাসীদের প্রতি স্নেহ ও মানসিক সহযোগিতার কারণে অনেক সময়েই অন্যান্যদের মতো আমাকেও ডাকেন তাদের অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য। আমি যাই, উৎসাহ দেয়ার চেষ্টা করি। ছাত্রজীবন থেকেই শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষের মুক্তির রাজনীতি তথা সাম্যভিত্তিক সমাজরাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলাম বলে সবসময়ই সমাজের প্রান্তিক অবস্থানে থাকা মানুষ বিশেষ করে নারী, ধর্মীয় মাইনরিটির মানুষজন এবং আদিবাসী জাতিসত্তার মানুষজনের প্রতি এক ধরনের বিশেষ দায়বদ্ধতা সবসময়ই কাজ করে। যার কারণে আমার বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগের আদিবাসী ছাত্রছাত্রীরা যাতে বিভাগের অনুষ্ঠান কিংবা সাধারণভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল একাডেমিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমগুলোতে প্রতিনিধিত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারেন সে চেষ্টা কিংবা কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই তাদেরকে আপন করে নেয়ার চেষ্টা। আসলে আদিবাসী ছাত্র-ছাত্রীদের আদিবাসী দিবসের আলোচনা অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সময়ে তাদের সাথে মিথষ্ক্রিয়া, আড্ডা কিংবা তাদের অনুষ্ঠানে বক্তা হিসেবে থাকার কারণে আদিবাসী ইস্যু, আদিবাসী/উপজাতি/ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্পর্কিত বিতর্কগুলো নিয়ে রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ এবং বিরোধিতার সংস্কৃতিকে পাঠ করার চেষ্টা করি। সেসব আলোচনা ও পাঠ থেকেই আদিবাসী বিষয়ে আমার পূর্ণাঙ্গ একটি ধারণা তৈরি হয়েছে। আদিবাসীদের বিভিন্ন সমস্যা বিষয়ে পাঠ করার কারণে এসব বিষয়ে আমি ক্রমশই আলোকিত এবং হৃদ্য হই। তাদের সম্পর্কে চেতনাগতভাবে একটা স্পষ্ট অবস্থান তৈরি হতে শুরু করে।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষকতা করতে গিয়ে ‘অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ’ নামে একটি কোর্স পড়ানোর দায়িত্ব পাই। সেই কোর্সে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেশে স্বাধীনতা, স্বায়ত্বশাসন তথা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, আদিবাসী আন্দোলন করতে গিয়ে গেরিলা, সন্ত্রাসবাদী ও অনেকক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নতাবাদী যুদ্ধগুলোর ইতিহাস পড়ানো হয়। যদিও এগুলো বেশিরভাগই মুক্তির আন্দোলন কিন্তু পাশ্চাত্যের লেখকদের রচিত বইপত্রের বেশিরভাগই এসব আন্দোলন সংগ্রামকে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা থাকে। বিশেষ করে রুয়ান্ডায় হুটু-টুটসি, ইরাকে সুন্নি-কুর্দি, আয়ারল্যান্ডে ক্যাথলিক ও প্রটেসট্যান্ট, স্পেনে স্প্যানিয়ার্ড ও বাস্ক, শ্রীলঙ্কায় সিংহলিজ-তামিলদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধগুলো অনেকটাই পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার সাথে মিলে যায়।

বাস্তবে ওই সব দেশে গেরিলা কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত যুদ্ধাদের রাজনৈতিক দর্শন ও কার্যক্রম অনেকক্ষেত্রেই মার্কসবাদী মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিলো এবং আছে। অন্যান্য দেশের আদিবাসী আন্দোলনের মতো মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে শুরু হওয়া পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের জুম্ম জাতীয়তাবাদী আন্দোলনও মার্কসবাদী সমাজ দৃষ্টিভঙ্গি ও শ্রেণি প্রশ্ন থেকে শুরু হয়েছিলো।

শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে গিয়েই আমি শিখেছি, এগারোটি আলাদা এবং ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও জাতিসত্তাকে একত্রিত করে ‘জুম্ম জাতীয়তাবাদ’ নাম দিয়ে যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি শুরু হয়েছে এবং যে আন্দোলন এখনো চলমান তা বিশ্বের যে কোনও জাতীয়তাবাদী, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সামগ্রিক মুক্তির আন্দোলনের অবশ্যই ইউনিক এবং ব্যতিক্রম। একইভাবে প্রথম বর্ষে ‘বাংলাদেশ স্টাডিজ: হিস্টোরি, সোসাইটি অ্যান্ড কালচার’ শীর্ষক কোর্স পড়াতে গিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যু ও আদিবাসী ইতিহাস সম্পর্কে আমি আরো অনেক বেশি কৌতুহলী হয়ে উঠি। বাঙালি জাতীয়তাবাদের আধিপত্যবাদী যে প্রচলিত ইতিহাসের ডিসকোর্সটি আছে সেখানে আদিবাসী ইস্যু সাধারণত পড়ানোই হয় না। আমার কাছে মনে হয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস পাঠদানের ক্ষেত্রে অবশ্যই প্রান্তিক জাতি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস পড়ানো উচিত। এক্ষেত্রে নিম্নবর্গের ইতিহাস চর্চার সাথে জড়িত লেখকরা বিশেষ করে রনজিৎ গুহ, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, দীপেশ চক্রবর্তী, গৌতম ভদ্রদের লেখালেখি আমাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিলো।

সেই জন্যই বাংলাদেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি কোর্সের সিলেবাস তৈরির ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সম্মানিত শিক্ষক, আমার গুরু প্রফেসর খায়রুল চৌধুরীর সহযোগিতায় সেখানে শ্রমিক-কৃষক, নারী, মুক্তিযুদ্ধ, দলিত এবং আদিবাসী আন্দোলন বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসকে যুক্ত করি। এবং এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ইতিহাস ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে বিশেষজ্ঞ আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক উইলিয়াম ভ্যান স্যান্ডাল এর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে অত্যন্ত উচুঁদরের লেখাগুলোসহ বিশেষ করে ‘বেঙলিজ, বাংলাদেশিস, অ্যান্ড আদারস: চাকমা ভিশন অব এ প্লুরালিস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক লেখাটি আদিবাসী বিষয়ে আমাকে সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতে সহযোগিতা করেছে। বিশেষ করে বাঙালি ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সংকটকে চিহ্নিত করতে চাকমাদের বহুত্ববাদী জাতীয়তাবাদ কিভাবে সহযোগিতা করতে পারে তা আমার আদিবাসী ইস্যু সম্পর্কে নতুন করে চোখ খুলে দিয়েছিলো। আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সাথে যুক্ত থাকার কারণেও পার্বত্য চট্টগ্রাম ইস্যু ও সামগ্রিকভাবে আদিবাসী আন্দোলন সংগ্রাম সম্পর্কে সত্যিকারভাবে জানা সম্ভব হয়েছে বলে আমার মূল্যায়ন।

পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের মুক্তি আন্দোলনের অগ্রদূত ও প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বিষয়ক লেখালেখির মধ্যে বেশিরভাগই অন্যদের লেখা কিংবা সম্পাদনা। গণপরিষদে সক্রিয় বক্তব্য ছাড়া আমি সরাসরি এম এন লারমার নিজস্ব কোন বক্তব্য বা লেখা পাইনি। তবে এম এন লারমা সম্পর্কে আদিবাসী আন্দোলনের নেতা-কর্মী, শুভাকাঙ্খী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সহযোগীদের হাতে এই সব লেখার অনেক কিছুই ইন্টারনেটেও পাওয়া যায়। তবে সেসব লেখার বেশিরভাগই বিভিন্ন সময়ে এম এন লারমার জন্মবার্ষিকী ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে অনুষ্ঠিত প্রোগ্রামে দেওয়া বক্তব্য। যদিও এসব লেখার মধ্যে বহু বিচিত্র বিষয়সূচি আছে। তবে মঙ্গলকুমার চাকমা সম্পাদিত স্মারকগ্রন্থটি সামগ্রিকভাবে এম এন লারমার রাজনৈতিক দর্শন ও বৈচিত্র্যময় রাজনৈতিক কার্যক্রমকে বুঝতে একটি অনন্য ও অসাধারণ গ্রন্থ। বিশেষ করে ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৪-৭৫ পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে গণপরিষদে দেওয়া বক্তব্যে, ভাষণ ও যুক্তি-তর্কগুলো এম এন লারমাকে বোঝার জন্য অসাধারণ একটি দলিল ও সংকলন।

শুধু এই অংশটি দিয়েই পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আদিবাসী আন্দোলনের মূল বক্তব্য; এম এন লারমার রাজনৈতিক দর্শন ও মতাদর্শিক সংগ্রাম সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা সম্ভব। যদিও ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে সক্রিয়ভাবে গেরিলা আন্দোলনে চলে যাওয়ার পরের সময়ে কার্যক্রম সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় না তবুও সেই সময়ের লারমার সহযোগীদের বক্তব্য থেকেই অনেককিছুই উঠে আসে এই স্মারকগ্রন্থে। স্মারকগ্রন্থে স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্যগুলোতে এম এন লারমা সম্পর্কে সামগ্রিকভাবে  অনেককিছুই জানা যায়। তাই এই স্মারকগ্রন্থটির মধ্যে থাকা বিভিন্ন আলোচনা ও গণপরিষদের ভাষণগুলোকে আমার লেখার মূল ফোকাস বলে চিহ্নিত করবো।

এই বই থেকেই আমি জানতে পারি যে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় কলেজে পড়ার সময়ে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত থেকে। ছাত্রজীবন থেকেই শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী মানুষের মুক্তির জন্য তিনি কাজ করতে থাকেন। বৃটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ের জাতি জনগোষ্ঠীর মানুষ রাষ্ট্রের বিভিন্ন উন্নয়নের বলি। তারা বিভিন্নভাবে জাতিগত নিপীড়নের শিকার। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি জুম চাষ কেন্দ্রিক জাতি জনগোষ্ঠীর মানুষ জন অধিকারহীন অবস্থায় বেঁচে আছেন। তাদের পরিচয়ের স্বীকৃতি, মানুষ হিসেবে স্বীকৃতির জন্য তিনি আজীবন লড়াই সংগ্রাম করে গেছেন। প্রচলিত অর্থে বেশিরভাগ গণপরিষদের সদস্যরা যেভাবে আরাম আয়েস, বিলাসী জীবনের সাথে যুক্ত হয়ে নিজের জাতি জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন আকাঙ্খাকে বাদ দিয়ে বাস্তবে আয়েসি ব্যক্তিগত জীবনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে সেখানে এম এন লারমা আজীবন সংগ্রামী জীবন কাটিয়েছেন। গণপরিষদের প্রত্যেকটি অধিবেশনে আদিবাসীদের পরিচয়, শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি মানুষের শিক্ষা, উন্নয়ন তথা সামগ্রিক মুক্তির জন্য তিনি কাজ করে গেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের গণপরিষদে প্রবল ও আধিপত্যবাদী আওয়ামী লীগের সাংসদ, স্পিকারের বিরোধিতার মধ্যেও একাকি সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি এই সংগ্রামে কখনো কখনো হয়তো অন্যান্য স্বতন্ত্র সাংসদকে পাশে পেয়েছেন, তবে বেশিরভাগ সময়ই একা। প্রবল বিরোধিতার মধ্যেও এম এন লারমা গণপরিষদে যেসব ভাষণ দিয়েছেন কিংবা একেকটি অধিবেশনে বিল সম্পর্কে মূল্যবান মতামত দিয়েছেন তার প্রত্যেকটি একান্তভাবে ব্যতিক্রমী ও জনমানুষের পক্ষে। এখানে সাধারণভাবে আমরা তার মানবমুক্তির রাজনীতি এবং বিশেষভাবে আদিবাসী জাতি জনগোষ্ঠীর পরিচয় ও স্বীকৃতির রাজনীতিকে দেখতে পাই।

আজীবন মার্কসবাদী মতাদর্শে বিশ্বাসী ও সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নির্মাণের আকাঙ্ক্ষা থেকেই এম এন লারমা গণপরিষদে আদিবাসী অঞ্চলকে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো বিশেষ স্বায়ত্বশাসিত, স্বশাসিত অঞ্চল ঘোষণা, আধিপত্যবাদী বাঙালি জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি অন্যান্য জাতি জনগোষ্ঠীর পরিচয়ের স্বীকৃতি, বাঙালি ও আদিবাসীসহ মানুষের মতো সকল মানুষের বাঁচার অধিকারের প্রশ্ন, শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি-পতিতা-দলিতসহ সকল মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, তাদের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বেকারত্ব-অধিকার, শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সূনির্দিষ্টভাবে ভূমি সংস্কার, আয়কর, রাজস্ব, জুম ও কৃষি প্রশ্ন, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ও সংবিধান তৈরি, রাষ্ট্রের  ইসলামীকরণ তথা অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স (ওয়াইসি)-তে যোগদানের প্রতিবাদ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ও গণহত্যার সাথে যুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার; সংবাদপত্র ও বাকস্বাধীনতার অধিকার; সাম্রাজ্যবাদবিরোধীতাসহ সহযোগী বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে সহযোগিতা ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি, পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, কারাগারের উন্নয়ন ও তৃতীয় শ্রেণির বন্দিদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, রাষ্ট্রপতির ভাষণের অসারতা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক বক্তৃতা করেন।

সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রম, নীতি-পলিসি এবং প্রতিষ্ঠানকে জনবিরোধী অবস্থান থেকে মানবিক, গণতান্ত্রিক অবস্থানে রূপান্তরিত করার জন্য সংসদে তিনি সবসময়ই উচ্চকিত সরব ভূমিকা নিয়েছেন। সামন্তবাদী, অগণতান্ত্রিক, স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চরিত্র ও খোলনলচে পাল্টে বাংলাদেশকে একটি শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সবসময়ই কাজ করেছেন। আমরা জানতে পাই, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বেশিরভাগ সময়ই আব্দুল্লাহ সরকারের মতো দুয়েকজন জনপ্রতিনিধির সহযোগিতার ছাড়া স্রোতের বিপরীতে গিয়ে সকল সংসদ সদস্যের সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয়ে একা একা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছেন। আমার পাঠ থেকে যে উপলব্ধি হয়েছে তা হলো, কোনও একটি দেশের অভ্যন্তরে থাকা একটি প্রান্তিক জাতি জনগোষ্ঠীর নেতা হয়ে সামগ্রিকভাবে দেশের সকল শ্রেণি পেশার মানুষজনের জন্য মুক্তির বার্তা বহনকারী এমন সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন চৌকস নেতৃত্ব বাংলাদেশের ইতিহাসে আর সৃষ্টি হবে কিনা আমি সন্দেহগ্রস্থ।

বিভিন্ন গ্রন্থ পাঠ থেকে আমরা জানতে পাই যে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরে সামরিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করলে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির গেরিলা ও সামরিক বাহিনী শান্তিবাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর আধিপত্যবাদী নীতি ও কার্যক্রমের প্রতিবাদ, পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিকরণের বিরোধিতা এবং পাহাড়ে সেনাবাহিনীসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর শোষণ, নির্যাতন, অত্যাচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সামরিকযুদ্ধে সরাসরি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। এম এন লারমার রাজনৈতিক সহকর্মী, গেরিলা যুদ্ধা ও অন্যান্যদের জবানবন্দি, স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, তিনি গেরিলা যুদ্ধের সময়ে পার্টির প্রধান হয়েও অত্যন্ত নির্লোভ, সৎ, নিরহঙ্কারী, মানবিক জীবন যাপন করতেন। পাহাড়ের নিরক্ষর মানুষজনকে ঐক্যবদ্ধ করতে গিয়ে একেবারেই তাদের সঙ্গে মিশে যেতেন।

এত বড় নেতা হয়েও সাধারণ আদিবাসী জনগণের সচেতনতা সৃষ্টির জন্য সরাসরি উদ্বুদ্ধ করতেন। তাদেরকে সংগঠিত করতেন, প্রশিক্ষণ দিতেন। মানবিক জীবনবোধে অভ্যস্ত মানুষটি সকল মানুষকে পরিবেশ, প্রতিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল মানবিক আচরণের শিক্ষা দিতেন। পাহাড়ের আদিবাসীদের জন্য শিক্ষা বিস্তারের জন্য স্কুলসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। সরাসরি শিক্ষাদানের সাথে যুক্ত ছিলেন বলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরিসহ স্বউদ্যোগেই শিক্ষা বিস্তারের কাজ করে গেছেন। এই প্রবন্ধের স্বল্প পরিসরে এর চেয়ে বেশি বর্ণনা করার সুযোগ নেই।

আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম, আদিবাসী আন্দোলন এবং এম এন লারমা সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্র থাকার সময় থেকেই এখনো পর্যন্ত যা বুঝতে পেরেছি অথবা আমার যতটুকু সচেতনতা তৈরি হয়েছে তা থেকে বুঝতে পেরেছি তা হলো, এম এন লারমা আজীবন মানুষের মধ্যে আদর্শ ও ন্যায় যুদ্ধের আলোক প্রক্ষেপণের চেষ্টা করে গেছেন। আদিবাসী জাতি জনগোষ্ঠীসহ বাঙালি জাতির প্রত্যেকটা শ্রেণি পেশার মানুষের সামগ্রিক মুক্তির জন্য জন্য কাজ করেছেন। এম এন লারমার যৌক্তিক আন্দোলন ও পরবর্তীতে তার সংগ্রামের ধারাবাহিকতাতেই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিশেষ অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তাই আজকের দিনে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে হলো তাকে ও তার রাজনৈতিক দর্শন সাম্যবাদ ও যুক্তিকে লালন করতে হবে। তবে দেশে দেশে সাধারণভাবে মানুষের মুক্তি ও বিশেষভাবে আদিবাসীদের মুক্তি সম্ভব।

মোহাম্মদ জহিরুল ইসলামমাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযু্ক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় চেয়ারম্যান

Responses -- “পার্বত্য চট্টগ্রাম, আদিবাসী আন্দোলন এবং এম এন লারমা: নিজস্ব অভিজ্ঞতার বয়ান”

  1. নুদিবানা চাকমা

    লেখক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, সাথে উত্তর দাতা সৈয়দ আলি-কে আন্তরিক ধন্যবাদ ।

    Reply
    • সৈয়দ আলি

      নুদিবানা চাকমা, আপনাকেও ধন্যবাদ এবং এটুকুই বলতে চাই যে পাহাড়ী বন্ধুদের ন্যয়াধিকারের সংগ্রামে আমরা সমতলবাসীরাও সাথী আছি।

      Reply
  2. সৈয়দ আলি

    লেখক খুব আন্তরিকতার সাথে পাহাড়ীদের নেতা কমরেড মানবেন্দ্র নারায়ন লারমাকে নিয়ে লিখতে চেয়েছেন। তবে অন্য অনেক কিছুর উল্লেখ করলেও স্বাধীনতার পরে জাতিগত সংখ্যালঘু পাহাড়িদের পক্ষে উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ রুখতে কমরেড লারমা যে শ্রম দিয়েছেন এবং অবমাননা সয়েছেন, লেখক তা’ এড়িয়ে গেছেন অথবা জানেন না। পাহাড়ী জনগনকে বাংলাদেশের মূল ধারার সাথে সংযুক্ত রাখার প্রচেষ্টাই ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের এজেন্টদের হাতে নিহত হন।
    লেখক সন্ত লারমাকে উল্লেখ করছেন কিন্তু বেদনাদায়কভাবে শান্তিচুক্তি বাস্তাবয়নে সরকারের প্রতারক ভূমিকার কথা বলেন নি।

    Reply
    • মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম

      ধন্যবাদ আপনার গুরুত্বপূর্ণ কমেন্টস এর জন্য। আমি আমার লেখায় বলেছি যে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সম্পর্কে অনেক লেন্স দিয়ে দেখার সুযোগ আছে এবং আপনার নির্দেশিত বিষয় নিয়ে আরো আলাদা দুটো লেখা যাবে। আমিও মনে করি চুক্তির বাস্তবায়ন না করে সরকার আদিবাসীদের সাথে প্রতারণা করছেন। আবারো ধন্যবাদ

      Reply
      • সৈয়দ আলি

        মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, আমি আন্তরিকভাবেই আপনার উদ্যোগকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—