কালীপূজা হিন্দুদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। অনেকের মতে, বিশ্বসৃষ্টির আদিকারণ তিনি। যারা শক্তির আরাধনা করেন তাদের বলা হয় শাক্ত। আর ভারতবর্ষে শাক্তরা কালীপূজা করেন। আবার অন্যমতে, ইনিই আদ্যাশক্তি মহামায়া। তন্ত্র ও পুরাণে কালীর অষ্টরূপের সন্ধান পাওয়া যায়। সেই অনুসারে দক্ষিণাকালী, সিদ্ধকালী, গুহ্যকালী, মহাকালী, ভদ্রকালী, চামুণ্ডাকালী, শ্মশানকালী ও শ্রীকালীর সন্ধান পাওয়া যায়।

ভারতবর্ষে সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অসংখ্য দেবদেবী কীভাবে শেষপর্যন্ত গিয়ে এক ভগবানের কাছে সমর্পিত হলেন সে এক বিশাল আখ্যান। ভগবান কিন্তু ‘এক’, তবে তার প্রধান তিন রূপ। ব্রহ্মা, বিষ্ণু আর শিব। ব্রহ্মা সৃষ্টিকর্তা, বিষ্ণু রক্ষাকর্তা, শিব ধ্বংসকর্তা। হিন্দুদের দেব-দেবী নিয়ে নানা কাহিনী প্রচলিত। তবে সব হিন্দুর দেবদেবী এক নয়। স্থান-কাল-পাত্রভেদে দেব-দেবীর গল্প এবং রূপও পরিবির্তত হয়। একেক এলাকায় একেক দেবতার প্রভাব। কোথাও দুর্গা প্রধান কোথাও কালী; কোথাও রাম দেবতা তো কোথাও রাবণ।

বাঙালি হিন্দু সমাজে দেবী কালীর মাতৃরূপের পূজা বিশেষ জনপ্রিয়। কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে অনুষ্ঠিত সাংবাৎসরিক দীপান্বিতা কালীপূজা বিশেষ জনপ্রিয়। এই দিন আলোকসজ্জা ও আতসবাজির উৎসবের মধ্য দিয়ে সারা রাত্রিব্যাপী কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। মা কালী সম্পর্কে ছোটবেলা অনেক গল্প শুনতাম। বড়রা বলতো, মা কালী নাকি অসুর দমন করার জন্য খড়গ হাতে অবতরণ করেছিলেন। অসুরদের আচরণে ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি একের পর এক অসুর দমন করতে থাকেন। দিক-বিদিক জ্ঞান শূন্য মা সকল কিছু ধ্বংস করে দিচ্ছেন।

মা যে যুদ্ধ করতে করতে বস্ত্রহীন হয়ে পড়েছেন তাও খেয়াল করেননি। অসুর দমন করে তাদের মুণ্ডু দিয়ে মালা গড়ে মা সেই মালা নিজের গলায় পড়লেন। তার ক্রোধে পৃথিবী ধ্বংসপ্রায়। দেবতারা দেখলেন এ মহাবিপদ। মাকে শান্ত করতে না পারলে যে আর বিশ্বব্রহ্মাণ্ড রক্ষা করা যায় না। তাই তারা ছুটে গেলেন কালীপতী ভোলানাথ শিবের কাছে। সব কথা শুনে ভোলানাথের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। তিনি তৎক্ষণাৎ ছুটে যান কালীর খোঁজে। গিয়ে দেখেন তার স্ত্রী বিবসনা হয়ে গলায় মুণ্ডুমালা ঝুলিয়ে রক্তাক্ত খড়গ হাতে যুদ্ধে লিপ্ত। এই দেখে মহাযোগেশ্বর বাহ্যিক জ্ঞান হারিয়ে ভূমিতে লুটিয়ে পড়লেন। মা কালী তখনও যুদ্ধে লিপ্ত।

অসুর দমন করতে করতে মা এগিয়ে যাচ্ছেন। এমন সময় হঠাৎ তার পা গিয়ে পড়ল ভূমিশায়িত শিবের উপর। অমনি মা জিহ্বা কামড়ে ধরলেন। সেই থেকে যুগ যুগ ধরে মা কালীর এই রূপেরই পূজো করছি আমরা! কেউ কেউ বলেন গায়ের রং কালো বলে মায়ের নাম কালী। আবার অনেকের মতে, সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তিন কালের আবর্তন চক্রে ঘুরছে। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ। আর এই তিন কালের নিয়ন্তা মহাকাল শিব। কিন্তু মা কালী এই তিন কালের ঊর্ধ্বে। তিনি কালকে জয় করেছেন। কালকে জয় করেছেন বলেই তিনি কালী। আদ্যা-শক্তিস্বরূপিনী। তবে কালীর যে রূপ-তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন রয়েছে।

স্বয়ং রামপ্রসাদ তার গানের মধ্যে কিন্তু প্রশ্ন করে বসেছিলেন, ‘বসন পর মা’ বা ‘শিব কেন তোর পদতলে, মুণ্ডু মালা কেন গলে’। আজও কালীপূজার সময় পান্নালাল ভট্টাচার্যের গলায় তার এই আকুতি আমরা শুনতে পাই। আমাদের পুলিশ ও গোয়েন্দারা যেমন যেকোনো অপরাধ ও হত্যার ব্যাপারে একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করান, ধর্মগুরুরাও ঠিক তেমনি সব প্রশ্নেরই উত্তর দিয়ে রেখেছেন। অনেকের কাছে কালীর প্রচলিত রূপ ভয়াল হলেও এরও ব্যাখ্যা রয়েছে। কালী নগ্নরূপী। এর কারণ কি? কারণ মা সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে আবৃত করে রেখেছেন। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে এমন কিছুই নেই যার দ্বারা মাকে আবৃত করা সম্ভব। তাইতো মা অনাবৃতা।

আরেক মত অনুযায়ী, মা কালী কালের প্রতীক। কাল শূন্যের অনুরূপ ও আচ্ছাদনবিহীন, তাই কালীও দিগম্বর! মা কালী খড়গ হাতে এসেছেন আমাদের ভিতরের অশুভ শক্তিকে দমন করতে। প্রয়োজনে মা আঘাত করেন। আঘাত করেন আমাদের ভিতরকার রজগুণকে। তাই তো মায়ের খড়গ রজগুণের প্রতীক রক্তাক্ত লাল রংয়ে রঞ্জিত। সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় হল অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত এই তিন কালের তিনটি ছন্দ। অর্থাৎ সকলকেই কালের গর্ভে নিমজ্জিত হতে হবে। সংহারিণী কালী অন্তিমে সকল প্রাণীকেই আপন আধ্যাত্ম সত্তাভিমুখে সংহরণ বা আকর্ষণ করে নেন, তাই তার গলায় মুণ্ডুমালা। ভূত-বর্তমান-ভবিষ্যত সর্বকালের ঊর্ধ্বে মা কালীর স্থান। আর এই কালের নিয়ন্ত্রা হচ্ছেন মহাকাল শিব। এ থেকে এটাই স্পষ্ট যে মহাকাল শিবের ঊর্ধ্বে মা কালীর স্থান।

তাইতো মহাকালীর পায়ের নিচে শায়িত মহাকাল! এ ছাড়া কালী মহাদেবের শক্তি, সুতরাং শিবের দেহ থেকে শক্তি পৃথক হয়ে বেরিয়ে এলে শিব শক্তিহীন হয়ে শবের মতো পড়ে থাকেন। অর্থাৎ, শিবের প্রভাব শক্তিযুক্ত থাকলেই; নয়তো তার নড়াচড়ার শক্তিও থাকে না। শাস্ত্রে কালীকে দুর্গার ললাট থেকে উৎপন্না বলা হয়েছে। কালী আসলে দুর্গার রূপান্তর বিশেষ। ক্রোধাবস্থাপন্না শক্তিকেই কালী বলা হয়েছে। ভয়ানক ভাবান্বিতা বিশ্বব্যাপিনী শক্তি-এই অর্থে ঈশ্বরের নাম কালী। মানুষের মধ্যে যেমন আচার-আচরণ, স্বভাব-চরিত্রের ভিন্নতা রয়েছে, দেবদেবীর ক্ষেত্রেও তাই। কালী-সংক্রান্ত সব কিছুই যেমন ভয়ানক, তেমন আবার কৃষ্ণ-সংক্রান্ত সব কিছুই আনন্দপ্রদ। কালীর বাসস্থান ভয়ানক শ্মশান, কৃষ্ণের বাসস্থান মনোহর বৃন্দাবন। কালীর হাতে ভয়ানক খড়্গ, কৃষ্ণের হাতে মনোহর বাঁশি। কালীর শরীর রক্তমাখা, কৃষ্ণের শরীর চন্দনশোভিত। কালী গম্ভীর গর্জন করেন, কৃষ্ণ মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেন।

কালী যুদ্ধে মেতে থাকেন, কৃষ্ণ নাচগান করেন। কালীর গলায় মুণ্ডুমালা, কৃষ্ণের গলায় ফুলের হার। সংক্ষেপে বললে, কালীর ভয়ানক বেশ, কৃষ্ণের মূর্তি মনোহর। কালীর উপাসকরা নানারকম প্রাণী বলি দেয়, কৃষ্ণের উপাসনায় বলি নিষিদ্ধ। কালীপূজার কাল অমাবস্যা তিথি ও ঘনঘোর অন্ধকার রাত। মৃতদেহের উপর বসে, শ্মশানে তার সাধনা করতে হয়। পূজার বাদ্যযন্ত্র ঢাক ও উপহারের ফুল টকটকে লাল রঙের জবা। তান্ত্রিকেরা আবার পঞ্চ-মকার দিয়ে ভয়ানক সাধনপ্রণালির বিধানও দিয়েছেন। মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন—এই পঞ্চ-মকারের প্রায় প্রত্যেকই বাইরে থেকে দেখলে এক এক ভয়ানক সাধন-প্রণালি। বাইরে থেকে—এই কথা বলার তাৎপর্য এই যে, ওই পঞ্চ-মকারের আধ্যাত্মিক ভাব অত্যন্ত নির্মল ও উচ্চ।

লোকনাথ বসু তার ‘হিন্দুধর্ম মর্ম’ নামক বইয়ে পঞ্চ-মকার সম্পর্কে বলেছেন যে, মদ্য বলতে পানীয় মদ বোঝায় না, তা ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে ক্ষরিত অমৃতধারা বা ব্রহ্মানন্দ; মাংস মানে দেহের মাংস নয়, তা হল জিভের সংযম; মৎস্য বলতে মাছ বোঝায় না, তা হল শ্বাসনিরোধ (প্রাণায়ম); মুদ্রা মানে টাকাপয়সা নয়, বরং আত্মাতে যে পরমাত্মা মুদ্রিত হয়ে আছেন, সেই তত্ত্বজ্ঞান এবং মৈথুন বলতে যৌনসংগম বোঝায় না, তা হল জীবাত্মাতে পরমাত্মার বিরাজ।

কালীর এই ভয়াবহ নগ্নিকা ভাবনার পিছনে আদিম কোনও ধর্মধারা বা ‘কাল্ট’ এর প্রভাব রয়েছে বলে অনুমান করেন সমাজবিদেরা। তাদের অনেকেরই মতে কালী আদতে কোনও বৈদিক দেবী নয়। এ দেশের লোকায়ত মাটি থেকেই তার উদ্ভব। কোনও এক নগ্নিকা খড়গ-মুণ্ডমালা শোভিতা যখন দেবী হিসাবে পূজিত হচ্ছেন তখন তা আদিম অরণ্যচারী মানুষের সংস্কৃতির কোনও ঐতিহ্যকে বহন করছে বলে মনে করা হয়। পরবর্তী কালে আর্য ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির দেবীভাবনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে কালী হিন্দু-ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছেন।

কালীর আরেক নাম শ্যামা। শ্যামা বা কালীপূজার সঙ্গে দীপাবলির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কালীপূজার দিনই দীপাবলি উৎসব পালন করা হয়। দীপাবলি বা দেওয়ালি সনাতনধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় মহোৎসব। এটি দেওয়ালি, দীপান্বিতা, দীপালিকা, সুখরাত্রি, সুখসুপ্তিকা এবং যক্ষরাত্রি নামেও অভিহিত হয়। এই দিন আলোকসজ্জা ও বাজি পোড়ানো হয়। কেউ কেউ রাত্রিতে নিজগৃহে দরজা-জানালায় মোমবাতি জ্বালায়।

দীপাবলি মানে আলোর উৎসব। আনন্দের উৎসব মন্দের বিরুদ্ধে ভালোর জয়কে উদযাপন করা। আলোকসজ্জার এই দিবস অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলো জ্বালার দিন। নিজের ভেতরের বাহিরের সকল অজ্ঞতা ও তমকে দীপশিখায় বিদূরিত করার দিন। প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসার চিরন্তন শিখা প্রজ্বলিত করার দিন। দেশ থেকে দেশে, অঞ্চল থেকে অঞ্চলে- এই দিনের মাহাত্ম্য ভিন্ন ভিন্ন; তবু মূল কথা এক। আর আধ্যাত্মিকতার গভীর দর্শনে এই দিন- আত্মাকে প্রজ্বলিত করে পরিশুদ্ধ করে সেই পরমব্রহ্মে লীন হওয়ার দিন।

কালীপূজাই বলি, দ্বীপাবলিই বলি কিংবা অন্য যে পূজাই বলি না কেন, এসব পূজা ও দেবদেবীর আখ্যানের মূলে রয়েছে, অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির লড়াই বা বিকাশ। সেই দিক থেকে ধর্ম পালন বা সবাইকে নিয়ে অশুভের বিরুদ্ধে লড়াই- তা কিন্তু নিরন্তর চলছেই। এই লড়াই যেন শেষ হবার নয়!

চিররঞ্জন সরকারকলামিস্ট।

Responses -- “কালীপূজা ও দীপাবলির কথা”

  1. Not applicable

    I was entertained. How old is this story and how this story kept in archive. How much is it’s authenticity? Any good references and solid evidences that you can provide?

    Reply
  2. jagadish.jps@gmail.com

    দীপাবলি হচ্ছে, ভগবান রামচন্দ্র রাবনকে বিজয় দশমীর দিনে লঙ্কায় বধ করেন, পরবর্তীতে বিভীষণকে লঙ্কার রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করেন এবং লঙ্কা থেকে ভগবান রামচন্দ্র লক্ষণ এবং সীতা দেবীকে নিয়ে অযোধ্যায় উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন, অযোধ্যাবাসী রাম, লক্ষণ, সীতা দেবীকে এই দীপাবলি দিনে অর্থাৎ অযোধ্যা নগরী কে ঘৃত প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে আলোকিত করার মাধ্যমে অভ্যর্থনা প্রদান করেন / দিনে ভগবান রামচন্দ্র অযোধ্যায় প্রবেশ করেন 14 বছর বনবাস এর পর, দীপাবলি সূচনা হয়েছে ভগবান রামচন্দ্রের 14 বছর পর অযোধ্যায় প্রবেশের মাধ্যমে, কারণ এই দিনে অযোধ্যাবাসী ভগবান রামচন্দ্রকে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে অযোধ্যাকে আলোকিত করে তার তার আগমনে তাকে অভ্যর্থনা প্রদান করেন।

    Reply
  3. sarama mitra

    কালী পূজা এবং কালীর উৎপত্তি সম্পর্কে লেখা খুবই উচ্চমানের, কিন্তু কালী পূজার সংগে দীপাবলীর সম্পর্ক পরিস্কার হল না।

    Reply
    • Sumit Mazumdar

      To Sarama Mitra: That is because there is practically no relationship between Kali Puja and Deepavali. The former is entirely Bengali (with perhaps Assamese and Oriya, and these days also Biharis also worshipping Kali). But Deepavali is North and South Indian. Rest of India worships the goddess Lakshmi as the goddess of peace and prosperity. Bengalis until recently had a tendency to look down on Lakshmi, since she is “merely” the goddess of wealth

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—