শারদ উৎসবকে ‘পূজো’ বলে ডাকতে অভ্যস্ত বাঙালি। দুর্গা বা দুগ্গা পূজো না বলে, এক কথায় এই শারদ বন্দনাকে ‘পূজো’-ই বলে থাকে বাঙালি। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে দুই বাংলাতেই এই শারদ বন্দনাকে ‘পূজো’ বলার একটা রেওয়াজ অনেককাল ধরেই চলে আসছে। আজকের বাংলাদেশ, অতীতের পূর্ব বাংলা এককালে এই পূজো উপলক্ষে কলকাতাতে কর্মরত মানুষদের পূজো উপলক্ষে বাড়ি ফিরে আসার আনন্দে এককালে মশগুল হয়ে উঠতো।

আমাদের প্রজন্ম এই পূজোর ছুটিতে দেশে ফেরার আনন্দটাই নিতে পারিনি। আমরা দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়েছি, দাদু, বাবাদের কাছে গল্প শুনে। আমাদের পরের প্রজন্মের যদি এতোটুকু উৎসাহ থাকে, তাহলে তাদের সম্বল হবে কেবলমাত্র শঙ্খ ঘোষের ‘সুপারিবনের সারি’র মতো হাতে গোনা এক-আধখানা বই। অবশ্য যদি পরের প্রজন্ম বই পড়ে!

হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে যেমন এপার বাংলার বাঙালির ওপারের ঈদ ঘিরে একটা তুমুল আকর্ষণ থাকে, তেমনি ওপারের বাঙালিরও সীমাহীন আগ্রহ থাকে এপারের দুর্গা পুজো সম্পর্কে। যদিও এপারে ঈদের জাঁকজমক তেমন একটা না হলেও, ওপার বাংলাতে দূর্গা পুজো কিন্তু বেশ জাঁকজমক করেই হয়। জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে বাঙালি উৎসবের মেজাজে সেই পূজো উপভোগ করে। পূজোর বাঙালি মেজাজটা বাংলায় কতোখানি ধরে রাখা যাচ্ছে – এই ভাবনাটা কী কারো মাথায় আছে? পবিত্র ঈদকে বাঙালিয়ানার সাবেকি ঢঙে ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষ যতোখানি যত্নবান, শারদ উৎসব নিয়ে কি এপারের বাঙালির ততোখানি মাথাব্যথা আছে? উৎসবে সাবেকিয়ানার সঙ্গে সময়ের নিরিখে আধুনিকতার ছাপ পড়বে- এ নিয়ে কোনও বিতর্ক থাকতে পারে না। তবে আধুনিকতার নাম করে সবটাই অন্যরকম হয়ে গেলে কেমন লাগে!

গত চার-পাঁচ বছর ধরে পশ্চিম বাংলার পূজোর সঙ্গে অদ্ভুত রকমের ‘পলিমিক্স’ ঘটেছে, যা শারদ উৎসবের সাবেকিয়ানার সঙ্গে দলীয় রাজনীতির একটা অদ্ভুত মিশ্রণ ঘটিয়েছে। দক্ষিণ ভারতে যেকোনও সামাজিক বা ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে রাস্তায়, যেসব ফেস্টুন পড়ে সেখানে সেই রাজ্যের হর্তা-কর্তাদের ছবি আর কাট-আউট, অর্ধেকের বেশি জায়গা জুড়ে থাকে। আমাদের এই রাজ্যে কাট-আউট সংস্কৃতি এখনো সেভাবে না ঢুকলেও শারদ উৎসব থেকে শ্মশান যাত্রা – সবেতেই যেভাবে শাসক দলের শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের ছবি থাকে, তেমনটি আর যাই হোক আগের কোনও জামানাতে দেখতে পাওয়া যেত না। এই অভিনবত্ব সাধারণ মানুষের কাছে ভালো লেগেছে না মন্দ লেগেছে- সে কথা অবশ্য জানবার কোনো উপায় সাধারণ মানুষের নেই। কারণ, শারদ উৎসবকে ঘিরে শাসকের যে দাপট, সেই দাপটের উল্টো সুরে কথা বলার মতো ঘাড়ে মাথা কজন সহ নাগরিকের আর এই বাংলায় আছে?

শারদ উৎসব উপলক্ষে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বেশ কিছু পূজো কমিটিকে দশ হাজার টাকা করে বিলি করেছেন রাজ্য সরকার। বিষয়টি নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে মামলা হয়েছে। মামলাটি এখনো মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন। কোনও একদিন হয়তো সেই মামলার রায় আমজনতা শুনতে পাবে। তার আগেই অবশ্য একটি স্বাধীন- ধর্মনিরপেক্ষ দেশে জনগণের ট্যাক্সের টাকাতে একটি বিশেষ ধর্মের পূজোতে ক্লাবগুলিকে, পূজো কমিটি গুলিকে রাজ্য সরকার টাকা দিয়ে যে পক্ষপাতিত্বের কেবল নয়, প্রতিযোগিতার নিদর্শন স্থাপন করলেন- তা জানি না আগামী দিনে কোন্ সঙ্কেত বহন করে আনবে।

আজ থেকে বিশ বছর আগে ও শারদ উৎসবকে কেন্দ্র করে বাঙালির ভিতরে যে ধরনের উন্মাদনা দেখা যেত, এখন তার চরিত্র বদল ঘটেছে। আমাদের শৈশবে, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে কী ছিল, তা খুঁজে বেরিয়ে এখন কোনো লাভ নেই। কারণ, পঞ্চাশ বছরে সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক জগতে যে পরিবর্তন ঘটেছে তার নিগড়ে এখনকার সময়কে কিছুতেই আর বাঁধা যাবে না। ধরা যাক, শারদ সাহিত্যেরই কথা। এখন বর্ষাকালে শারদের পত্র-পত্রিকা বের হতে থাকে। বর্ষায় ভিজতে ভিজতে মানুষ শারদকে উপলব্ধি করবার চেষ্টা করে। সেই চেষ্টাতে কী শারদের আমেজ থাকে?

শারদ উৎসবের কয়েকদিন আগেই মুখ্যমন্ত্রীর কুশপুতুল পোড়ানোর ‘অপরাধে’ শিলিগুড়ির গণ আন্দোলনের কর্মী সুকৃতি আশ-কে গ্রেপ্তার করে রাজ্য পুলিশ। আদালত তাকে পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয়। সুকৃতির গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে গোটা রাজ্য জুড়ে সি পি আই (এম) কর্মী – সমর্থকেরা প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠেন। রাজ্যের বহু জায়গায় সুকৃতির সমর্থনে তারা সভা সমিতি করেন। প্রতীকী মুখ্যমন্ত্রীর কুশ পুত্তলিকা দাহ করেন। অবশেষে আদালতের নির্দেশে শারদ উৎসবের প্রারম্ভেই সুকৃতি মুক্তি পান। সুকৃতির মুক্তি সকলেরই মনে একসঙ্গে স্বস্তি এবং কিছু প্রশ্ন জাগিয়ে দিয়েছে।

এ রাজ্যে একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকার আছে। গণতন্ত্রের যা রীতি, তাতে একাংশের মানুষ সরকারের সমর্থক হবেন। একাংশ সরকার বিরোধী হবেন। এটাই গণতন্ত্রের দস্তুর। সরকারের পক্ষের মানুষদেরও যেমন অনেক কিছু বলার অধিকার থাকবে, তেমনি সরকারবিরোধীদেরও থাকবে সরকারের বিরোধিতার অধিকার। সরকার ক্ষমতা, পুলিশতন্ত্র, রাষ্ট্রযন্ত্রের জেরে বিরোধীদের অধিকার কেড়ে নিতে পারেন না। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার বিরোধিতা গণতন্ত্রেরই একটি সুস্থতার লক্ষণ। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শাসকের প্রতীকী কুশপুতুল পোড়ানো জাতীয় আন্দোলনের সময়কাল থেকে আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি অঙ্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে এ কাজ স্বদেশবাসী করেছেন। কংগ্রেসি আভলে, স্বাধীনতার পরে এ কাজ বামপন্থিরা কংগ্রেসি শাসকদের বিরুদ্ধে করেছেন। বাম আমলেও এই একই কাজ আজকের মুখ্যমন্ত্রীর কর্মী, সমর্থকেরা বাম শাসকদের বিরুদ্ধে করেছেন। ব্রিটিশ আমলে ব্রিটিশ সরকারের কুশপুতুল পোড়ালে যে শাস্তি দেশবাসীর কপালে জুটতো, সে শাস্তি কখনোই দেশবাসী কংগ্রেসি বা বাম আমলে পান নি। তাহলে আজ পাচ্ছেন কেন? মানুষের প্রতীকী প্রতিবাদের রাস্তাটিও কী রাজ্য সরকার পুলিশের ভয় দেখিয়ে বন্ধ করে দিতে চান?

তার কুশপুতুল পোড়ানোর ‘অপরাধে’ সুকৃতি আশের গ্রেপ্তারে কি আদৌ মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর সম্মতি আছে? বিষয়টি কি রবীন্দ্রনাথের দুই বিঘা জমির সেই বহু পঠিত পঙতির মতো- ‘বাবু যতো বলে পারিষদগণ বলে তার শতগুণ’! সরকার বিরোধী প্রতিবাদের মাশুল হিসেবে বামপন্থী কর্মী সুকৃতি আশের হাজত বাস নিয়ে সরকারের প্রথম সারির কর্তা ব্যক্তিরা যতো নীরবতা পালন করবেন, সাধারণ মানুষ, তারা সরকারের পক্ষের মানুষ হতে পারেন, আবার বিপক্ষের মানুষ হতে পারেন- প্রত্যেকের মনেই প্রশ্নটা তীব্র হতে থাকবে। বাম শাসনের শেষ কয়েক বছর পুলিশের কৃতকর্মের দায় কিন্তু বর্তেছিল বাম শাসকদেরই উপরে, তেমনি সুকৃতি আশদের নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের পুলিশ যদি আজ ‘অতি সক্রিয়তা’ দেখান, তাহলে আখেরে পুলিশ নয়, তার দায় বর্তাবে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী এবং তার সতীর্থদের ই উপরে। মুখ্যমন্ত্রী যদি এই বিষয়ে এই মুহূর্তেই তার দৃষ্টি নিক্ষেপ না করেন তাহলে আগামীদিন আরো কঠিন হয়ে উঠবে।

সুকৃতি আশ যেহেতু সিপিআই (এম) কর্মী, তাই তার মুক্তির দাবিতে আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট দলের বাইরে অন্যান্য বামপন্থী দলের নেতা কর্মীদের অনুপস্থিতি যথেষ্ট বেদনাদায়ক। এখনো যদি সিপিআই (এম) এর বাইরের দলগুলো মনে করেন; প্রশাসনিক বা শাসকের রাজনৈতিক ছোবল পড়েছে সিপিআই(এম) এর উপর, তাতে আমাদের কী এলো গেলো। তাহলে সেইসব দলগুলো যেটুকু অস্তিত্ব তাদের এখনো টিকে আছে, তা নিয়ে আগামী দিনে টিকে থাকতে পারবেন তো? শাসকের প্রবণতা হলো; ছলে বলে কৌশলে, লোভ দেখিয়ে, নয়তো ভয় দেখিয়ে নিজের দল ভারি করা। সেই দল ভারি করার খেলার থাবায় অনেক ক্ষেত্রেই ভূমিস্তরে সিপিআই (এম) এর বাইরের দলগুলি ইতিমধ্যে পড়েছে।

তাই তাদের এই সঙ্কটে আরো গায়ে গা লাগিয়ে, প্রাণে প্রাণ স্পর্শ করে থাকাটাই কি অধিক রাজনৈতিক দায়িত্ববোধের পরিচায়ক নয়? আজ আর সমস্যাটা কেবল সুকৃতি আশ সিপিআই (এম) করেন, সুতরাং সমস্যাটা তারাই বুঝুক- এমনটা নয়। কিংবা চৌত্রিশ বছর ধরে সিপিআই (এম) অন্য বাম দলগুলিকে কোনঠাসা করে রাখতে চেয়েছিল- ‘এখন, দ্যাখ, কেমন লাগে’-ও নয়। পাশের চালে আগুন লাগলে আমার ঘরও যে নিরাপদ থাকে না বন্ধু।

এই নিরাপত্তার খোঁজে এখন আমাদের নিরন্তর যাত্রা। হিন্দু সাম্প্রদায়িক শক্তি আরএসএস এর শাখা সংগঠন গত শারদ উৎসবের সময় বীরভূমের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিশুদের কেবল অস্ত্র শিক্ষা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, শিশু মনস্তত্ত্বে রীতিমতো মুসলিম বিদ্বেষের শিক্ষা তারা দিয়েছে। খবরের কাগজে আমরা পড়ে থাকি যে, ওই অঞ্চলে তৃণমূল নেতা অনুব্রত মণ্ডলের খুব দাপট। বিশেষ করে তার অসংসদীয় বাক্যবাণের সঙ্গে পরিচয় নেই- এমন বাঙালি বোধহয় এপার বাংলা ঢুঁড়লে একটিও মিলবে না। তাহলে এ কাণ্ড ঘটছে কী করে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—