নির্বাচন একদিকে যেমন সরকার পরিবর্তনের সুযোগ দেয়, আরেকদিকে নির্বাচন মানে মানুষের মতামত জানার সেরা উপায়। তারা যে সরকার পরিবর্তন করতে চান এমনটা নাও হতে পারে। তাদের চাওয়াকে মূল্য দিলে কত আশ্চর্যজনক আর অদ্ভুত কিছু হতে পারে। এইতো কিছুদিন আগে নব্বই বছরেরও বেশি বয়সের মাহথির মুহাম্মদকে আবার ফিরিয়ে এনেছেন মালয়েশিয়ার জনগণ। এটা নিয়ে কারও কিছু বলার নাই। কারণ এ ছিল ‘পিপল্‌স চয়েস’।

অন্যদিকে আমেরিকার জনগণ বা ভোটারেরা তাদের দেশ পরিচালনায় এনেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজনকে। যিনি মানসিকভাবে একধরনের উৎকেন্দ্রিক নেতা। তার আমলে আমেরিকার রাজনীতি ও অর্থনীতি নিজেদের বেলায় ভালো হলেও, বিদেশে তিনি নিন্দিত। ভারতের জনগণ নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে এসেছেন গণতান্ত্রিক ভারতের সিংহাসনে। যে ভারত অসাম্প্রদায়িকতা আর গণতন্ত্রের জন্য দুনিয়া খ্যাত তার রাজমুকূট উঠেছে মোদির মতো ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নেতার মাথায়। সবই জনগণের ইচ্ছা। আমাদের দেশে কখনও কখনও এমন হলেও প্রায়ই তা হয় না। কে দায়ী বা কোন দল দায়ী সে কথা তুললেই চলবে বিতর্ক। সরকারী দল আওয়ামী লীগের যেমন ভোটভীতি আছে, তেমনি বিএনপির আছে অকারণ আস্থা। অকারণ বলা হচ্ছে এই কারণে যে আসলে জনগণ কী চায় সেটা বিএনপি বোঝেনা। তারা মনে করেন নেগেটিভ ভোট মানে তাদের অধিকার। তারা এটাও মানেন না ভারত বিরোধিতা, সাম্প্রদায়িকতা আর সরকারের ওপর অসন্তোষ এই তিনের ওপর ভিত্তি করে আর যাই হোক দীর্ঘকাল রাজনীতি করা যায়না। ভুলভ্রান্তি যে কতো বিপজ্জনক হতে পারে নিচের খবরটাই তার বড় উদাহরণ।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিরোধী জোটের জন্য ৩০০ আসন বণ্টনের রূপরেখা দিয়েছেন বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ও যুক্তফ্রন্ট চেয়ারম্যান একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। এর মধ্যে বিএনপিকে ১৫০ এবং যুক্তফ্রন্ট ও অন্যান্য দলকে ১২০ আসন দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন তিনি। এছাড়া সুশীল সমাজকে ১০ আসন এবং জামায়াত ছাড়া বিএনপি জোটের অন্যান্য শরিকদের ২০ আসন দিতে চান সাবেক এই রাষ্ট্রপতি।

সম্প্রতি বি চৌধুরীর এই আসন বণ্টনের লিখিত প্রস্তাব বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।

কতটা খারাপ হাল হলে বিএনপিকে এমন একটা প্রস্তাব দেয়া যেতে পারে? কে না জানে এই দলটির ওপর এখন শনির দশা চলছে। কিন্তু কেন? একসময় তো তাদের ভূমিকা আর হাবভাব দেখে মনে হতো তাদের বিকল্প নাই। তাদের নেতারা জামাতকে সাথে নিয়ে এমন সব কথা বলতেন বা এমন কাজ করতেন যাতে মনে হতো বাংলাদেশ আসলে মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন হয়নি। কোনও এক সেনা অফিসারের বাঁশির ফু-ই ছিল সবকিছু। ইতিহাসকে যারা অতীতের কর্মকাণ্ড মনে করেন, তাদের চোখ খুলে দেয়া বর্তমান কেন যে তাদের বিবেকের জানালা খুলতে পারেনা কে জানে? পারলে এমন অপমান বিএনপির কপালে জুটতো না। যুবকের ঔদ্ধত্য যুবশক্তির অপমান, আর বঙ্গবন্ধুও বাংলাদেশকে অপমানের শাস্তি পাওয়া দলটিকে এখন বুড়ো আঙ্গুল দেখাচ্ছে তাদের কল্যাণে রাষ্ট্রপতি হতে পারা মানুষ। যিনি কী কারণে সে দল ছেড়ে বিকল্প দল করেছেন, তা সবাই জানেন। সবচেয়ে বেশি জানে বিএনপি নিজে। এই অপমান করার পেছনে যে নিষ্ক্রিয়তা আর হতাশা সেটা আমাদের সমাজকে আরও একবার দেখিয়ে দিয়েছে নেতা হতে হলে মুখে আপসহীন হতে হয়না। হতে হয় শেখ হাসিনার মতো আপন তেজে চলা কেউ। তার আমলে আওয়ামী লীগের নেতাদের ভূমিকা নানাস্তরে প্রশ্নবিদ্ধ হবার পরও দল এবং সরকার চলছে সমান তালে।

জামাতকে সাথে নিয়ে দেশের শাসনভারে থাকা বিএনপিকে মানেনি এদেশের মানুষ। হয়তো মানতো যদি না বিএনপি স্বাধীনতাবিরোধীদের মাথায় রাজমুকূট না তুলে দিত । তারা সহ্য করেছে। যখন সময় হয়েছে জবাব দিতে ভুল করেনি। বলছিলাম ইতিহাস আর অতীতকে কেউ অবজ্ঞা করলে সময় তাদের ছেড়ে কথা বলেনা।

রাজনীতি বিমুখ মানুষ এগুলো নিয়ে যখন তখন মাথা ঘামায় না বটে, তবে সুযোগ পেলে তাদের ভূমিকা রাখতে ভুল করেননা। শাহবাগকে বিস্মরণে রাখা মানে আমাদের দেশের অস্তিত্বকে এড়িয়ে যাওয়া। আমাদের দেশে উন্নয়ন বা অগ্রযাত্রা যেমন প্রয়োজন তেমনি দরকার শান্তি। বিএনপি যে বিষয়টা পরিষ্কার করতে পারেনা সেটা হচ্ছে কীভাবে তারা শান্তি ও প্রগতি নিশ্চিত করবে? আজকের বাংলাদেশ তারেক রহমানের মতো কাউকে চায় কি না সেটাও তারা বোঝেনা। খেয়াল করেছি তাদের বয়সী নেতাদের চোখেমুখে মূলত অবিশ্বাস আর অভিমানের ছাপ। রাজনীতিতে অভিমানের মূল্য শূন্য। দলটি আমাদের যে সব অপকর্ম আর অপরাজনীতি উপহার দিয়েছিল, তা নিয়ে কিছুই বলেনা তারা। যখন তারা সামনে এসে দাঁড়ান আমরা দেখি অন্য দলছুট কিছু মানষের মুখ। কেউ ভাসানী ন্যাপ কেউ মুসলিম লীগ, কেউবা স্বাধীনতা বিরোধী। সেনানায়ক এরশাদের দালাল ও আছে দলে। যারা আসলে কী চায় নিজেরাও জানেননা। এমন নেতাদের অধীনে কারা যাবে আন্দোলনে? মানুষ কি এতটা বেকুব? না তাদের খেয়ে দেয়ে আর কোনও কাজ নাই?

রাজনীতিকে আমলে না নিয়ে সরকার গঠনের জন্য মরিয়া কোনও দলকে মানুষ কীভাবে বিশ্বাস করবে? সবচেয়ে বড় কথা আজকে তাদের নিয়ে হাসি ঠাট্টার মতো কাজ করছে তাদের শরীকেরা। খুব কী দরকার ছিল, জোটের নেতাদের উস্কে দেয়ার? এই নেতাগুলোকে নিয়ে আর লিখতে ইচ্ছে করেনা। ড. কামাল হোসেন আওয়ামী লীগের পিঠে ছুরি মারার জন্য নেমেছেন। যা তার ব্যক্তি হিংসা আর প্রতিশোধের পরিচায়ক। সাথে থাকা মান্না আর রব জনগণে অবিশ্বস্ত এবং স্বার্থপর। রব এরশাদ আমলে যে সত্তরটি দলের নেতা বলে নিজেকে পরিচয় দিতেন তার ঊনসত্তরটি এখন মৃত। হারাধনের এক ছেলে আ স ম রবের হা হা রব এখন আর কারও কানে পৌঁছায় না। বাকী যে বি চৌধুরী তিনি মুখে যাই বলুন, তার ঘরেই আছে সরকারের সাথে আঁতাত করা বদনামের ভাগী পুতৌ মাহী বি চৌধুরী। যিনি এই সেদিনও বললেন, বিএনপিকে গদিতে বসানোর জন্য কোনও জোট হয়নি। কে না জানে মাহি বনাম তারেকের লড়াইয়ের কারণেই যত ফ্যাসাদ। মাহী নিশ্চয়ই গুণগতভাবে তারেকের চাইতে অগ্রগামী।

কিন্তু রক্তের উত্তরাধিকারের রাজনীতি তা মানেনি। মানবেও না। সেখানে কে কার পুত্র, কন্যা সেটাই বড় কথা। সে অসম লড়াইয়ে মাহী পেরে উঠবেন না, আবার তারেকের নেতৃত্বও মানবেন না। ফলে এই লড়াই মিটবেনা। পিতা বি চৌধুরী এখন বয়সী মানুষ। আপাতত তিনি এসব কথা বললেও সময়ে ঠিকই পুত্রের পাশে এসে দাঁড়াবেন বা দাঁড়াতে বাধ্য হবেন। তখন কোথায় যাবে মির্জা ফখরুলদের স্বপ্ন বা খোয়াব? কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তাদের এজেন্ডা?

মূলত শেখ হাসিনার সরকার তার উন্নয়ন কার্যক্রম এবং বিশ্বরাজনীতি বিএনপির মতো দলকে যে জায়গায় নিয়ে এসেছে, সেখান থেকে উত্তরণের পথ একটাই। অতীতের ভুল থেকে পাঠ গ্রহণ করে দেশ জনগণের কাছে ফিরে আসা। মানুষের কাছে মাফ চেয়ে দেশের অতীত ও শুদ্ধ ধারার প্রতি অনুগত থাকা। যেটা করা তাদের জন্য অসম্ভব। কারণ তা করতে গেলে তাদের মূল পরিচয় আর অতীতই হয়ে যাবে ফ্যাকাসে ।

শুন্যগর্ভ রাজনীতির দায় মেটাতে গিয়ে দেউলিয়া বিএনপি মুখে যতই বলুক জনগণের রায় তাদের দিকে সেটা সত্য হলেও গুণগত রাজনীতিতে তারা এখন অসহায়। যে কারণে রেললাইন ধরে দৌড়ে পালিয়ে বাঁচা এককালের বিএনপি রাষ্ট্রপতি নেতাও তাদের সামনে মূলা ঝুলিয়ে বলতে পারে আসলে আসো নাহলে নাই। বিএনপি কী এই অপমান থেকে আসলে কোন ‘লেসান’ নেবে? না, এমন প্রস্তাব গিলে আরও একবার তলিয়ে যাবার রাস্তা খুঁজবে?

অজয় দাশগুপ্তকলামিস্ট।

Responses -- “বিএনপি কি  বি চৌধুরীর ঝোলানো মূলা গিলবে?”

  1. Md. Ahsan Habib

    অজয় বাবু যদি মনে করেন শেখ হাসিনাকে জনগণ বেঁছে নিয়েছে তাহলে তার মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন করা যেতে পারে। যাকে নির্বাচিত হওয়ার জন্য নিজের ভোটও দরকার হয়নি তাকে জনগণ বেঁছে নিলো কি ভাবে? শেখ হাসিনার মতো স্বৈরতান্ত্রিক ও দেশকে পুলিশি রাষ্ট্র বানালে হয়তো খালেদা জিয়াও টিকে যেতেন।

    Reply
    • Shahadat

      পলিক্যাল সাবজেক্ট নিয়ে এভাবে মূল্যায়ন মার্ক লেখা শুধু বোকারাই লিখে, বিএনপিকে নিয়ে এখন যা হচ্ছে যারা এটাকে তাদের পরিণতি মনে করেন, বা কর্মের ফল মনে করেন বা বিভিন্ন ভাবে খোঁচা দিয়ে থাকেন ঠিক যাদের মতোই একটা দল ছিল যারা ৭৫ এর ঘটনার পর ঠিক একইভাবে মূল্যায়ন করেছিল আবার ভবিষ্যতেও করবে কারণ সময় সবার সব সময় একরকম যায় না, তখন অজয় দাশগুপ্তের মতো লেখকরা কি বলবে ??? রাজনীতিতে কিন্তু শেষ বলে কোনো কথা নাই।

      Reply
  2. সাইফুল ইসলাম

    সবাই যেন নিজের ভোটটা দিতে পারে, নির্বাচন যেন উৎসবমুখর হয়, আগের রাতে যেন ব্যালট বাক্স ভরে না যায়, সবাই যেন স্বাধীনভাবে যার যার নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারে দেশের গণতন্ত্র যেন থাকে এগুলো নিয়ে কখনো লিখতে দেখলাম না, আছে শুধু পুরান প্যাচাল আর ধান ভাংতে শীবের গীত। কেমনে পারে এই লোক সারাদিন ভাংগা রেকর্ড বাজাতে!!!

    Reply
  3. মাসুদ

    খুব সুন্দর ও যৌক্তিক মূল্যায়ন। তবে আশা করি, “আলী”রা একটু পরেই লাঠি হাতে ছুটে আসবে হৈ হৈ করে দাশগুপ্তকে বাঁশ দেয়ার জন্যে।

    Reply
  4. sirajul islam

    বিএনপির সমর্থকরা বলতো, যেদিন খালেদা জিয়াকে জেলে নেয়া হবে সেদিনই শেখ হাসিনার পতন ঘটবে, জেলে নেয়া হলো, ১৭ বছরের জেল দেয়া হলো, কিন্তু তেমন কিছুই হলো না, বরং ১৭ বছরের জেল এবং হাইকোর্ট কতৃক দলের নেতৃত্ব থেকে খালেদা ও তারেককে অযোগ্য ঘোষণার পরও বিএনপি আওয়মী লীগের সাথে সংলাপে বসতে বাধ্য হয়েছে, তাও আবার ডঃ কামালের নেতেৃত্বে, ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস!

    Reply
  5. Not applicable

    Bangladesh do not have Dr. mohathir muhammed or Donald trump. We wish we have at least someone who is a leader at the same time, who loves to develop Bangladesh with solid democracy . Now it is not an easy job to do in all these departments to develop when you will gain the seats. Our present government had this opportunity however that was useless after two terms. Now we only can hope, stolen money can be returned to Bangladesh. With those money we can have government operated some industries where our people can work to make better future of Bangladesh. Before she gives a new election, she must take an initiative to do so. Or our nations will not forgive. Those kids stopped the roads to verify your papers, they are coming to vote to the next elections. So it is possible those stolen money will not remain the same. This year they stop the roads. Next time they will stop planes as well as airports.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—