এক.

উত্তর-পশ্চিম ইরাকের সিনজার জেলার নিরিবিলি এক গ্রাম কোজো। চাষাবাদ আর পশুপালন তার অধিবাসীদের পেশা। সেখানেরই এক চাষী পরিবারে মেয়েটির জন্ম ১৯৯৩ সালে। সাদামাটা পরিবারের দিনপঞ্জির হিসেবে তার জন্মের দিন তারিখটাও লেখা থাকলো না গুছিয়ে। আপন আর সৎ মিলিয়ে নয় ভাই, তাদের একটিই বোন। নিরিবিলি গ্রামের জীবনে মায়ের আর তার নিজের মর্যাদাই মেয়েটির কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্বপ্ন দেখে সে বড় হয়ে হবে একজন ইতিহাসের শিক্ষক। নয়তো বিউটি এক্সপার্ট, যার থাকবে একটা নিজস্ব বিউটি সেলুন।

খ্রিস্টান ও মুসলিম ধর্মাবলম্বীসহ আরব, কুর্দি আর তুর্কি অনেক পরিবার মিলেমিশে থাকে গ্রামটায়। তাদের মতো আরো বেশ কিছু কুর্দি পরিবার আছে ওই গ্রামে, যারা ইয়াজিদি ধর্ম পালন করে। দ্রুজ এবং এলাউইজ ধর্মের মানুষদের মতো এরাও ধর্মীয় এক সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। এই ধর্মের একটা বিশেষ বৈচিত্র্য হলো এই যে, কেউ ইচ্ছা করলেই এই ধর্ম গ্রহণ করতে পারেন না। ইয়াজিদি ধর্মাবলম্বী হওয়া যায় কেবল জন্মসূত্রেই। উত্তর-পশ্চিম ইরাক, উত্তর-পশ্চিম সিরিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কের কিছু অংশে এই ইয়াজিদি ধর্মাবলম্বী সংখ্যালঘুদের বসবাস। সংখ্যাগুরু ধর্মীয় গোত্র বা গোষ্ঠীর আগ্রাসী চাপে এবং বিশেষ করে আইএস বাহিনীর আগ্রাসনে পিছু হটতে হটতে ওদের অনেকেই সিনজিরের পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় বসতি গড়েছে

অদ্ভুত তাদের ধর্ম। অনেকে বলে, ‘তারা হলো শয়তানের উপাসক’। ইসলাম আর খ্রিস্টান ধর্মের মিশেলে একেশ্বরবাদী এক ধর্মরীতি তাদের। পীরের হাতে পবিত্র পানি দিয়ে শিশুদের ব্যাপ্টাইজ করা বা চার্চে যাবার মতোন রীতি যেমন তাদের ধর্মে, তেমনি পশু কোরবানি দেয়া বা তিন দিনের রোজা রাখার পর পীরের সঙ্গে মদ্যপানের একটা বিধিও তাদের ধর্মে আছে। মানে কিছু জায়গায় মিল থাকলেও কিছু জায়গায় ইসলাম ও খ্রিস্টান ধর্মের সাথে আছে বড় গড়মিল। আবার তারা কোরান ও বাইবেল দুটা ধর্মগ্রন্থই মানে। এদেরকে নিয়ে আইএস ও কট্টরপন্থী মুসলিমদের ধারণা যে, ওরা সপ্তম শতকের উমাইয়াদ রাজবংশের অতি অসজ্জন ও অজনপ্রিয় দ্বিতীয় খলিফা ইয়াজিদ ইবনে মুয়াওইয়া (৬৪৭-৬৮৩) এর বংশধর। ইতিহাসবেত্তা গবেষকদের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণে যদিও এটা এখন প্রমাণিত যে, সেই অপছন্দের খলিফা বা পার্সিয়ান শহর ইয়াজিদ, এর কোনোটার সাথেই ইয়াজিদি ধর্মালম্বীদের কোনো সম্পর্ক নেই। পার্সি শব্দ ‘ইজেদ’ থেকে এই ধর্মের নামটির সৃষ্টি। যার মানে হলো ‘দেবদূত’ ‘ফেরেস্তা’ বা ‘দেবতা’। ইয়াজিদি মানে হলো ‘দেবতার উপাসক’। এই মানেটাই তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শত শত বছর ধরে।

এই ধর্মবিশ্বাসটিকে অশুভের উপাসনা বলে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাপী অনেকে। তাদের উপাসনাস্থলে সূর্যের একটা ইমেজ ব্যবহার হয় বলে এবং সমাধিতেও অনুরূপ একটা ইঙ্গিত আছে বলে তাদের একেশ্বরবাদিতার মধ্যে ভিন্ন গন্ধ পায় অন্যেরা। তার উপর তাদের উপাসনার মধ্যে ময়ূরের একটা সম্পৃক্তিও আছে। যার ফলে দেবদেবীদের উপাসক হিসেবেই গণ্য করে কট্টর মুসলিমরা তাদের। ইসলামী রাষ্ট্র গঠনে ব্রতী তথাকথিত জেহাদি সহিংসতাবাদী সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএস এর রোষানলে তাই শতাব্দী ধরে ইসলাম বিরোধী এক নম্বর শক্তি ইজরায়েল বাদ গেলেও সংখ্যালঘু ইয়াজিদিরা ঠিকই পড়েছে। এর জের ধরে ২০১৪ সালের ৩ অগাস্ট ইরাকের সিনজার এলাকা জুড়ে নেমে আসে ভয়াবহ জাতিগত গণহত্যার বিভীষিকা।

আইএস এর বেপরোয়া বাহিনী তাদের জাতিগত অস্তিত্ব নির্মূল করতে ভয়াবহ নৃশংসতা নিয়ে গণহত্যা চালায় গোটা সিনজার জেলায়। ইয়াজিদিদের প্রত্যেকটা পরিবারের পুরুষদের ও যৌনদাসী হবার বয়স পেরিয়ে গেছে এমন নারীদের খুন করে বাকি নারীদের বন্দি করে নিয়ে যায় ওরা। গণহত্যা অভিযানের তেরতম দিন পর্যন্ত কোজো গ্রাম ও তার আশেপাশে ৬০০ মানুষকে জবাই করে আইএসরা। মেয়েটির নয় ভাইয়ের ছয় ভাইকে বরণ করতে হয় এই পরিণতি। তারপর তার মা’কে হত্যা করে মেয়েটাকে তুলে নিয়ে যায় আইএস বাহিনী। আইএসদের হাতে বন্দি ছয় হাজার সাতশ’ ইয়াজিদি নারীর যা নিয়তি, তারও তাই হলো। প্রথমে দখলকৃত নিজ গ্রামেই তার যৌনদাসী জীবনের শুরু। তারপর মেয়েটার ঠাঁই হলো আইএসদের অঘোষিত রাজধানী মসুলের কোনো ক্যাম্পে। এক এক জনের মালিকানায় থাকতো এমন বন্দী যৌনদাসীরা এক এক জন। সেরকম ভাবেই থাকতে হচ্ছিলো তাকে একটা ক্যাম্পে। ক্রয় করা সম্পত্তি হিসেবে যেমন থাকতো সব মেয়েরা কারো না কারো দখলে। কিছুদিন পর পর কেনাবেচার মাধ্যমে হাত বদল হতো ওরা আর দশটা পণ্যের মতোই। যেনতেন রকমের মারধর বা অত্যাচার, সিগারেট দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া, নিরন্তর ধর্ষণ আর ধর্ষণ,এইসব  ছিল সব নারী বন্দিদের দৈনন্দিন জীবনের রুটিন। পালাতে চেষ্টা করলে প্রহরীদের হাতে ধরা পড়া ছাড়া কোনো উপায় ছিলো না। উপরন্তু ধরে বেঁধে ফেরত আনার পর পালানোর চেষ্টা করার অপরাধে কেবল মালিক নয়, ওই ক্যাম্প বা আবাসে যতো পুরুষ থাকতো সবাই তাকে ধর্ষণ করতো। এটা আইএসদের কাছে এক রকমের জেহাদ হিসেবেই স্বীকৃত এবং চর্চিত। পালাবার চেষ্টা করে, ব্যর্থ ও সীমাহীন অত্যাচারিত হয়ে সে চেষ্টায় ইস্তফা দিয়েছিলো মেয়েটা।

এরকম ভাবে কেনাবেচায় হাত বদল হতে হতে এক সময় তাকে কিনে নেয় এমন এক লোক, যে কিনা একা একটা বাড়িতে থাকতো। একা বলে বাইরে যাবার সময় তাকে প্রতিবারই তালাবদ্ধ করে রেখে যেত। এর দখলে আছে বেশ ক’দিন হয়েছে। সে সময়ে লোকটা তাকে অন্য কারো কাছে বিক্রি করে ফেলার ব্যাপারটা পাকাপাকি করে ফেলেছিলো। এরকম একদিন লোকটা ভুল করে তালা না লাগিয়েই তাকে রেখে বাইরে চলে গিয়েছিলো কোনো কাজে। টের পেতেই এদিন আবার সুযোগ নিলো সে পালাবার। গোটা মুসল জুড়ে যখন আইএস কট্টরপন্থী যোদ্ধাদের রাজত্ব,বলতে গেলে এটা ইরাকে আইএসদের রাজধানী। তখন সে পালাবে আসলে কোথায়! খুব সৌভাগ্যক্রমে সে গিয়ে হাজির হলো এক নমনীয় মানসিকতার সুন্নি পরিবারের বাড়িতে। ওরা জানে যে ধরা পড়লে তাদের সবাইকে মরতে হবে। তবু তারা তাকে আশ্রয় দিলো এবং অচিরেই তাদের বড় ছেলেটা তাকে গোপনে নিজ স্ত্রীর পরিচয় দিয়ে ছদ্মবেশের আড়ালে মসুলের বাইরে ইরাক সরকারের দখলি এলাকায় পৌঁছে দেয়। যেখান থেকে মেয়েটা উত্তর ইরাকের দুহক এলাকার এক শরনার্থী আশ্রয় শিবিরে পৌঁছে যাবার সুযোগ পায়। তখন ২০১৪ সালের নভেম্বর মাস চলছে। মেয়েটা অভাবনীয়ভাবে ভয়াবহতম এক বন্দিত্ব থেকে মুক্তি পেলো। কিন্তু এরকম অসহনীয় দৈনন্দিন অত্যাচারের পর একজন নারীর নিজের আপন সত্তা আর মনোবল বলতে কিছুই আসলে আর অবশিষ্ট থাকার কথা না।

রোয়াঙ্গা আশ্রয় শিবিরে একটা কনটেইনারের ভিতর তার মুক্ত জীবন যাপন চলছিলো। তিন মাসের ভয়াবহ স্মৃতি তাকে প্রতিটা লহমায় তাড়া করে ফিরে। তবু সে ক্যাম্পে সবার মাঝে, বিশেষ করে পাচারকৃত ও বন্দি করে নিয়ে যাওয়া নারী ও শিশুদের সাথে, জীবনে ফিরে আসার প্রেরণা নিয়ে কথা বলতো। ২০১৫ এর ফেব্রুয়ারিতে বেলজিয়ান দৈনিক ‘লা লিব্রে বেলজিক’-এ সাক্ষাৎকার দিয়ে সে স্পষ্টভাবে বন্দি করে বা পাচার করে নিয়ে যাওয়া নারীদের যৌনদাসত্বের জীবন নিয়ে অনেক তথ্য ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ সমেত কথা বলে। তার তুলে ধরা বক্তব্য এবং ভয়াবহ নির্মমতাগুলো অজানা অন্ধকার থেকে এক লাফে যেন বিশ্ববাসীর নজরে আসে। জার্মান সরকারের রিফিউজি প্রোগ্রাম ‘বাদেন-রিটেমবার্গ’ এর সুবিধাপ্রাপ্ত এক হাজার নারী ও শিশুর একজন হয়ে ওঠে মেয়েটি। পৃথিবীব্যাপি লোকে ততোদিনে জানতে শুরু করেছে এক অবাক প্রাণোদ্দীপ্ত তরুণীর কথা। নাম তার ‘নাদিয়া মুরাদ বাসি তাহা’। স্থানীয়রা সংক্ষেপে ডাকে ‘নাদি’।

২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সভায় মেয়েটি মানব পাচার ও যৌন সহিংসতার অভিজ্ঞতার বিবরণ জানায়। এ বিষয়ের উপর ওটাই ছিলো জাতিসংঘে প্রথম কোনো নিজ অভিজ্ঞতালব্ধ সবিস্তার বর্ণনা। গোটা সভাসদ তার কথা জেনে ধাক্কা খায়। সে সভার ফলে মানবপাচার ও শরনার্থী বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করার জন্য নাদিয়াকে এ বিষয়ে জাতিসংঘের শুভেচ্ছা দূত ঘোষণা দেয়া হয়। নাদিয়া মনস্থির করেন, আইএস এর ঘৃণ্য অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিচারের দাবি তুলে আন্তর্জাতিক আদালত ও জাতিসংঘের কাছে এর বিচার চাইবেন। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার পক্ষে নিযুক্ত অ্যাটর্নি এ বিষয়ে জাতিসংঘের শুনানিতে নাদিয়ার আরো কথা তুলে ধরেন। অ্যাটর্নি অধিবেশনকে জানান এই দাস বাজার অনলাইনে, ফেইসবুকে এবং মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে জোরালোভাবে সচল ও বিদ্যমান আছে।

এই সেপ্টেম্বর মাসেই নিউ ইয়র্কে টিনা ব্রাউন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতিতে নাদিয়া ঘোষণা দেন ‘নাদিয়াজ ইনিশিয়েটিভ’ নামে এক সংগঠন চালু করার। গণহত্যার মতো নির্মম জাতিগত নির্মূল অভিযানের ভয়াবহতার যারা শিকার, তাদেরকে নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করার ব্রত নিয়ে যাত্রা শুরু হয় সংগঠনের। প্রথমেই যুদ্ধবন্দিত্ব থেকে মুক্তি পাওয়া অর্থাৎ বেঁচে আসা ইয়াজিদি নারী ও শিশুদের নিয়ে কাজ শুরু করে এ সংগঠন। নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও শিশুদের শারীরিক ক্ষত নিরাময় এবং তাদের জীবন পুনঃনির্মাণ করে সমাজে পুনর্বাসিত করার চেষ্টায় নিবেদিত উদ্যোগ হিসেবে এর পরিচিতি একদিকে যেমন বিশ্ব জুড়ে বাড়তে থাকে। তেমনি ভুক্তভোগীদের জবানবন্দি থেকে বের হয়ে আসতে থাকে বন্দিত্ব ও পাচারের ভয়াবহ সব তথ্য ও বিবরণ। এসবের প্রেক্ষিতে নাদিয়া মুরাদকে জীবনের হুমকির মুখোমুখিও হতে হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় এক সময় তাই নাদিয়া ইরাক ছেড়ে জার্মানিতে বসবাস শুরু করেন।

পরে ২০১৭ সালের ৭ নভেম্বর নিজ জীবনের নির্মম অভিজ্ঞতা এবং আইএসদের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধের তথ্য ও ইতিবৃত্ত নিয়ে নাদিয়ার আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘দ্য লাস্ট গার্ল’ প্রকাশিত হয় বিশ্বখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা পেঙ্গুইন থেকে। যা দ্রুত বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হতে থাকে। বইটা এক অর্থে আত্মজৈবনিক হলেও আসলে এটা ভয়াবহ মানব পাচার, আইএসদের অত্যাচার নিপীড়নের ভয়াবহতা, যৌন জিহাদের শিকার বন্দি যৌনদাসীদের মর্মান্তিক জীবন এই সবের এক নথিবদ্ধতাও। নাদিয়ার সোচ্চার কণ্ঠকে আর থামতে হয়নি। পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি আর তাকে। ২০১৬ থেকে পালা করে চলতে থাকে তার কাজ আর স্বীকৃতির পর্ব একের পর এক।

চলতি বছর অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে (যুগ্মভাবে কঙ্গোলিজ ডা. ডেনিস মুকওয়েজসহ) বিশ্ব শান্তিতে নোবেল জয়ী হিসেবে নাম ঘোষণার আগে বন্দিত্ব থেকে মুক্তির মাত্র তিন বছর সময়ের মধ্যে তার জুটে গেছে প্রায় অর্ধশত স্বীকৃতি ও সম্মাননা। ভাকলাভ হাভেল হিউম্যান রাইটস প্রাইজ, ইইউ পার্লামেন্ট কর্তৃক প্রদত্ত শাখারভ প্রাইজ, মানবপাচার রোধে সচেতনতার বৃদ্ধির লক্ষ্যে জাতিসংঘের শুভেচ্ছা দূত মনোনীত হওয়া, ক্লিনটন গ্লোবাল সিটিজেন অ্যাওয়ার্ড, পিস প্রাইজ ফ্রম ইউএন অ্যাসোসিয়েশন অব স্পেন, গ্ল্যামার ওম্যান অব দ্য ওয়র্ল্ড ২০১৬, অক্সি ডে ফাউণ্ডেশন কর্তৃক ব্যাটল অব ক্রিট অ্যাওয়ার্ড ফর কারেজ; এইসব আরো আরো। এখন তার বয়স মাত্র পঁচিশ। সামনে অনেক দিন অনেক কর্মপরিকল্পনা পড়ে আছে তার অপেক্ষায়। তার সব উদ্যোগ সফল হোক। মানবপাচার এবং যুদ্ধ-বিগ্রহ, দাঙ্গা ও সামরিক সংঘাতে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে যৌন সহিংসতার ব্যবহার বন্ধ হোক। আইএস বা এমন সব ভয়াবহ সংগঠনের নামে মানবতা বিরোধী কাজে লিপ্ত অপরাধীরা প্রাপ্য সাজা পাক। মানব সভ্যতার ইতিহাস থেকে এমন কলঙ্কের ও ঘৃণ্য কাজগুলো বন্ধ হোক, মুছে যাক।

দুই.

জীবন্ত কিংবদন্তী ও অত্যাশ্চর্য এক মানুষের কথা বলি। কতোজন জানে তার সব গল্প আর অবাক জীবন গাঁথা, জানা নেই। তিনি, প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ডেনিস মুকওয়েজ। ১ এপ্রিল ১৯৫৫-তে তৎকালীন জায়ার বা বর্তমানের ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর বুকাভু শহরে এক পেনটেকোস্টাল মন্ত্রী ও তার গৃহবধূ স্ত্রীর নয় সন্তানের তৃতীয় জন হলেন এই মুকওয়েজ। বাবাকে জীবনভর যে সমস্ত মানুষের মর্মান্তিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর পর প্রার্থনা করতে দেখতেন তাদের আত্মার শান্তি কামনা করে। সেইসব মানুষদের দুর্ভোগের অমন মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবার এক অদম্য স্পৃহা থেকে তার ইচ্ছা হয় চিকিৎসা শাস্ত্রে পড়াশোনা করবার। সবচেয়ে বেশি তাড়া করতো তাকে শিশু ও প্রসূতি মৃত্যুর নির্মমতা। মানুষের জন্মকে ঘিরে কতোখানি বেদনা বা বিমর্ষতা থাকতে পারে তা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত আফ্রিকার মা ও শিশুদের না দেখলে ধারণা করা সম্ভব হবে না সাধারণ মানুষের। তাদের কারোই বলতে গেলে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাবার এবং ন্যূনতম চিকিৎসা সুবিধা পাবার সুযোগ ছিলো না। অথচ রোজ রোজ এমন মা ও শিশুর মৃত্যু ছিলো সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মতো সাধারণ এক নৈমিত্তিক ঘটনা যেনো!

মানুষের কষ্ট লাঘব করবার স্বপ্নে চিকিৎসা শাস্ত্রে পড়তে তিনি ভর্তি হলেন ইউনিভার্সিটি অব বুরুণ্ডিতে। সেখান থেকে এমডি পাশ করে ১৯৮৩ সালে মুকওয়েজ একজন শিশুরোগ চিকিৎসক হিসেবে কাজ শুরু করেন বুকাভুর কাছে ‘লেমেরা হসপিটাল’ নামে এক গ্রাম হাসপাতালে। সেই সময়ে সন্তান প্রসবকালে প্রয়োজনীয় যত্ন এবং চিকিৎসা সুবিধার অভাবে মায়েদের কষ্ট যন্ত্রণা ও দুর্ভোগ দেখে পীড়িত হয়ে মুকওয়েজ ‘গায়নোকলজি অ্যাণ্ড অবসটেট্রিক্স’ নিয়ে পড়তে ফ্রান্স চলে যান। ১৯৮৯ সালে এ বিষয়ে গ্রাজুয়েশন শেষ করে ফিরে আসেন আগের কর্মস্থলে। সেখানেই কাজ করতে থাকেন তিনি।

এর মধ্যে আফ্রিকার সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টাতে থাকে। পাশ্চাত্যের নানান স্বার্থে বিভিন্ন দেশে ও গোত্রে তৈরি হতে থাকে স্বার্থান্বেষী মহল। শুরু হয় নানা জাতি গোত্র বিভেদকে ঘিরে সাংঘর্ষিক ভয়াবহতা। আন্তর্জাতিক স্বার্থান্বেষী মহল প্রতিনিয়ত উস্কে দিতে থাকে সংঘাতের সূত্রগূলোকে। ১৯৯৬-৯৭ সালে রোয়াণ্ডার নেতৃত্বে আরো কয়েক দেশ মিলে তৎকালীন জায়ারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং আগ্রাসন চালানো শুরু করে। প্রথম কঙ্গো যুদ্ধ নামে এই সংঘাতে অন্যান্য আফ্রিকান কয়েকটি রাষ্ট্র বিদ্রোহী নেতা কাবিলাকে মদত দিয়ে সহিংসতার পথে উস্কে দেয় প্রেসিডেন্ট মবুতুর বিরুদ্ধে। রোয়াণ্ডান আগ্রাসনে সৃষ্ট গণ্যহত্যার জের ধরে পূর্ব জায়ারে সৃষ্টি হয় চরম অস্থিতিশীলতা। কিনশাশায় গড়ে উঠতে থাকে নতুন সরকারের এক অবয়ব। নতুন সরকারের অধীনে জায়ারের ইতিহাস মুছে জন্ম নেয় নতুন এক রাষ্ট্র ‘ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো’। ক্ষমতায় বসেই কাবিলা চমকে দেয় সবাইকে তার মদতদাতা রোয়াণ্ডান ও উগাণ্ডান বাহিনীকে কঙ্গো থেকে বিতাড়িত করে। এই সরকার পরিবর্তন আর নতুন রাষ্ট্র গঠন বাস্তবিক অর্থে নতুন কিছু বা বড় কোনও পরিবর্তন আসলে আনতে পারেনি। পেরেছিলো কেবল অস্থিতিশীলতা এবং দ্বন্দ্ব সংঘাতকে ঘিরে খুনাখুনি ও অরাজকতার মাত্রা বাড়াতে। ক্রমান্বয়ে এইসব পরিস্থিতি তাদেরকে ঠেলে দেয় দ্বিতীয় কঙ্গো যুদ্ধের দিকে।

প্রথম কঙ্গো যুদ্ধের সময় থেকেই জাতিগত বা গোত্র-গোষ্ঠীগত সংঘাতে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হতে থাকে যৌন সহিংসতা। এর ফলে ভয়াবহ মাত্রায় ঘটতে থাকে খুন ধর্ষণ। এসব হয়ে ওঠে অস্থিতিশীল ও সংঘাতময় কঙ্গোর নৈমিত্তিক ঘটনা। ধর্ষণের ভয়াবহতা এমন মাত্রায় ছিল যে ক্ষত বিক্ষত ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন যৌনাঙ্গ নিয়ে বাকি জীবন দুঃসহ যন্ত্রণায় ভোগা ছাড়া গত্যন্তর ছিলো না অগণিত কঙ্গোলিজ নারীর। পরিস্থিতি বিবেচনায় এতো দিনের কর্মস্থল লেমেরা হাসপাতাল ছেড়ে নিজ এলাকা বুকাভুতে চলে আসেন মুকওয়েজ। ১৯৯৯ সালে সেখানে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘পানজি হসপিটাল’। নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এ হাসপাতালের জন্ম থেকে এখানে জননেন্দ্রিয় বিষয়ক শারীরিক ও মানসিক বিপর্যস্ততা নিয়ে চিকিৎসা পেয়েছে পঁচাশি হাজার রোগী। এদের অধিকাংশেরই চিকিৎসা এবং অস্ত্রপোচার করেছেন তিনি। এইসব রোগীদের ষাট শতাংশই ছিলো সরাসরি যৌন সহিংসতার শিকার। এই হাসপাতালে রোগীরা সব আসতো কঙ্গোর বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলো থেকে। মুকওয়েজ তাঁর ‘পানজি’ বইটিতে (২০১২ সালে প্রকাশিত) এসব রোগীদের কথা উল্লেখ করবার সময় বলেছেন এরা কতো মর্মান্তিক অবস্থা নিয়ে আসতো। কখনো কখনো এরা আসতো সম্পূর্ণ উলঙ্গ এবং বর্ণনার অতীত ভয়ার্ত ও সন্ত্রস্ত অবস্থায়। এই সময়ে তিনি বুঝতে পারেন জটিল সব ‘রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি’ ছাড়া এদেরকে বাঁচানো বা কষ্ট যন্ত্রণা লাঘব করে স্বাভাবিক জীবন যাপনের সুযোগ দেবার কোনো পথ নেই। তিনি নিরলস পরিশ্রম করে যেতে থাকেন তার নিজের প্রতিষ্ঠা করা এ হাসপাতালে। প্রতিদিন বারো থেকে ষোল ঘণ্টা পরিশ্রম এবং গড়ে রোজ আট থেকে দশটা জটিল অপারেশন তার রুটিন হয়ে দাঁড়ায়। এ ব্যাপারে তাঁকে অর্থ এবং ওষুধ দিয়ে আন্তরিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো ‘দ্য জার্মান ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল মিশন’ (ডিয়াইএফএইএম)।

২০১২ সালে জাতিসংঘে বক্তব্য প্রদানের সময় কঙ্গো এবং আফ্রিকান সংঘাত নিয়ে বলতে গিয়ে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ক্ষমতার জন্যে সৃষ্ট সংঘাতের জের ধরে সংঘটিত গণধর্ষণের প্রসঙ্গ তুলে এ বিষয়ে কঙ্গো সরকারের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে অক্ষমতার সমালোচনা করেন। কঠোর সমালোচনামূলক এ বক্তব্যে তিনি অন্যান্য আফ্রিকান দেশ এবং সচেতন বিশ্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং দোষারোপ করেন। তার লেখা বইটি এবং তার জাতিসংঘে প্রদত্ত বক্তব্যে যুদ্ধ-বিগ্রহে ও সামরিক সংঘাতে যৌন সংঘাতকে বা ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করতে কার্যকরী পদক্ষেপ নেবার আহ্বান জানিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে জোরালো অনুরোধ জানান। সেই সাথে কঙ্গোয় সংঘটিত গণধর্ষণের ভয়াবহ চিত্রকেও তুলে ধরেন। এ ঘৃণ্য অপরাধকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা রোধ করে এর ইতি ঘটাতে সবাইকে সোচ্চার হতে আবেদন জানান।

তার প্রকাশিত গ্রন্থ এবং জাতিসংঘে প্রদত্ত বক্তৃতার মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও সত্য উন্মোচনের জের হিসেবে তার উপর নেমে আসে হুমকি ও প্রাণনাশের চেষ্টার মতো ভয়াবহ বিপদ। ২০১২ সালের ২৫ অক্টোবর চারজন সশস্ত্র সন্ত্রাসী তার বাড়িতে গিয়ে মেয়েকে জিম্মি করে অপেক্ষা করছিলো তার ফিরে আসার। ফিরে আসবার সাথে সাথে তার রক্ষীরা সন্ত্রাসীদের উপর চড়াও হলে সন্ত্রাসীরা তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকে। সৌভাগ্যক্রমে সময়মতো মাটিতে শুয়ে পড়ে নিজেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হলে তিনি বেঁচে যান। এ ঘটনার পর নিজ ও পরিবারের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ার বাস্তবতা বিবেচনায় মুকওয়েজ ইউরোপে গিয়ে আত্মগোপন করে থাকেন। কিন্তু এর ফলে তার পানজি হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রতিদিন শল্য চিকিৎসার জন্য আগত অগণিত দুর্দশাগ্রস্ত নারী মুকওয়েজের জাদুকরী হাতের কল্যাণে সুস্থ্ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ বঞ্চিত হতে থাকে।

আড়াই মাসের মধ্যে মুকওয়েজকে ফিরে আসতে হয় তার নিজের হাসপাতালের হাল ধরতে। ভীষণ প্রাণস্পর্শী তার এই ফিরে আসার গল্প। তার অগণিত রোগী এবং তাদের আত্মীয় পরিজনরা তাদের ফসলের জমি থেকে আনারস আর পেঁয়াজ বিক্রি করা পয়সা জমিয়ে তাকে ইউরোপের অজ্ঞাতবাস থেকে ফিরতি প্লেনের টিকেট কেটে দেয়। ১৪ জানিয়ারি ২০১৩ কাভুমু বিমানবন্দরে মুকওয়েজ যখন এসে নামেন তখন তার জন্য অপেক্ষা করছিলো এক অভূতপূর্ব বিস্ময়। বিমানবন্দর থেকে তার পানজি আসার পথে কুড়ি মাইল রাস্তার দুই পাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে সম্বর্ধনা জানিয়ে আনন্দ উল্লাস করেছে তার রোগী ও স্বজনরা। ফের শুরু হয় তার অসম্ভবকে সম্ভব করা সব অপারেশন।

মানবতার সেবায় জীবনভর এক ধ্যানমগ্নতায় কাটানো এই মানুষটি সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছেন অন্তত অর্ধশতটি। ইউএন প্রাইজ ইন দ্য ফিল্ড অব হিউম্যান রাইটস, শাখারভ প্রাইজ, লেজিওঁ অব অনার, ওয়ালেনবার্গ মেডাল, ক্লিনটন গ্লোবাল সিটিজেন এওয়ার্ড, হিলারি ক্লিনটন রোয়ার্ড, আফ্রিকান অব দ্য ইয়ার ২০০৯, সিউল পিস প্রাইজ, সিভিল কারেজ প্রাইজ, ফোর ফ্রিডম এওয়ার্ড, টাইম হান্ড্রেড, রাইট লাইভলিহুড এওয়ার্ড, গুলবেঙ্কিয়ান প্রাইজ থেকে সদ্য পাওয়া বিশ্ব শান্তিতে নোবেল কতো কি সেই সম্মাননার ঝুলিতে। যদিও মানুষের ভালোবাসার চেয়ে বড় পুরস্কার ও সম্মাননা এসবের কোনোটিই নয়। খুব নিশ্চিত মহান ব্রত নিয়ে এই অগ্রযাত্রা তাকে আরও অর্জনের দিকে নিয়ে যাবে, যা নিশ্চিত ভাবে মানবতার পক্ষে অবদান রেখে যাবে। স্যালুট এই বিশ্বসেরা রেপ ভিকটিম ডাক্তার, জাদুকরী শল্যচিকিৎসককে।

তিন.

এই যে দুজন মানুষ, একজন যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকের তরুণী, নির্যাতিতা নারী। অন্যজন দাঙ্গা-সংঘাত ও যুদ্ধ-সহিংসতার জের ধরে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ ক্ষেত্র, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর নিবেদিত প্রাণ ডাক্তার। দুজনেরই বক্তব্য এক। অপহরণ ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করা,যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতে ধর্ষণকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার রোধে সোচ্চার প্রতিবাদ ও ব্যবস্থা গ্রহণ। এইসব অনাচারের শিকার ভুক্তভোগীদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা দেয়া এবং তাদেরকে সাধারণ জীবনে পুনর্বাসিত করা।

তাদের দু’জনের দাবি অকাট্য মানবিক। জীবন অভিজ্ঞতা বড্ড কঠিন ও নির্মম বাস্তবতার সাক্ষী। কিন্তু তাদের দু’দেশেই চলমান সংঘাতের পেছনে আসলে কে বা কারা মদতদাতা! কাদের প্ররোচনায় এইসব সহিংসতা বছরের পর বছর ধরে পৃথিবীতে চলমান! এটাই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। এর গভীরে আলো ফেলাটা বড় বেশী প্রয়োজন। সাধারণ লোকে অতোটা না বুঝলেও যারা অল্প বিস্তর বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিতের খোঁজ-খবর রাখেন, তারা সবাই কম-বেশি জানেন কোন কোন দেশ বা পাশ্চাত্যের কোন কোন শক্তি ও পরাশক্তি পৃথিবী জুড়ে ঘটমান এমন আরো সব সহিংসতার পেছনের কারণ। পর্দার আড়াল থেকে সেইসব দেশ ও স্বার্থান্বেষীদের সামনে নিয়ে আসাটাই এখন মানব সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় কাজ।

সেই সব শক্তি আর পরাশক্তি যে আদপে মানব সভ্যতার শত্রুর ভূমিকায় অবতীর্ণ, তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক এবং নব্য ঔপনেশিকতাবাদী স্বার্থসিদ্ধির খায়েশে, ওই তথ্য এবং ব্যাখ্যাগুলো বেশি উচ্চারিত হওয়া প্রয়োজন। আপামর মানুষের সবার জানা প্রয়োজন। অবাক ও নির্মম সত্য হলো এই যে, ঘুরে ফিরে সেই ডিনামাইট আবিষ্কারক আর যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবসায়ী আলফ্রেড নোবেলের সখ্য-স্যাঙ্গাৎরাই অরাজকতাগুলোর পেছনের মদতদাতা। অর্থাৎ এক ভাই দুর্দশা সৃষ্টি করে তো আরেক ভাই যেন সেই দুর্দশাগ্রস্তের সেবা করার নিমিত্তে পুরস্কার দিতে মঞ্চ সাজায়।

ব্যাপারটা আরেক ভাবে ভাবলে মনে হয় এই শান্তিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত দুজনের আসলে আজকে সবার আগে ধন্যবাদ দেয়া উচিৎ তাদের দুই দেশে যুদ্ধ বিগ্রহ বাধিয়ে রাখার পেছনে অবদান রাখা বা মদত দেয়া শক্তিদের। নইলে কি আজ ওরা বিশ্ব শান্তিতে নোবেল পাওয়ার মতো এরকম বড়সর কোনো পুরস্কার পাওয়ার সুযোগ আদৌ পেতো!

তাহলে মানব সভ্যতায় যুদ্ধ-বিগ্রহ উত্তোরোত্তর জোরালো হোক, বৃদ্ধি পাক। সেই সুবাদে আরো আরো মানুষ মানবতার সেবা করতে বিশাল ও করুণ মানবেতর মানবগোষ্ঠী পাক, পেতে থাকুক। আমরা তিন উল্লাস দিই আজ বিশ্ব শান্তিতে নোবেল জয়ীর জন্য না। বরং সব যুদ্ধবাজ আর সংঘাতের মদতদাতাদের জন্য। দিই সেটাই। আমি আপনি সবাই। দেবতার জন্য নয় অসুরের জন্যই দিই, তিন উল্লাস!

লুৎফুল হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—