‘মোস্ট ডেঞ্জারাস অ্যানিমেল’ বলে একটা অনুষ্ঠান দেখছিলাম টিভিতে। গন্ডার সেই তালিকায় দুই নম্বরে। প্রতি বছর হাজার হাজার লোক নাকি মারা যায় এই গন্ডারের আক্রমনে। নানা বিস্ময়কর তথ্যে ভরপুর সেই ডকুমেন্টারির এক পর্যায়ে সদ্যই নদী থেকে উঠে আসা একটা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন গন্ডার কথা নেই, বার্তা নেই জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে এঁটেল মাটির আঠালো কাদা পানিতে গলা ডুবিয়ে বসে পড়লো। আমি হায় হায় করে উঠলাম। একি!

“আরে ব্যাটা নদী থেকে এত সুন্দর করে গোসলই যদি করে আসলি, এসেই আবার কাদার মধ্যে বসে পড়লি কেন? নোংরা হয়ে গেল না শরীরটা?” আমার এই অস্বস্তির কথা বোধকরি টের পেলেন ডকুমেন্টরির ন্যারেটরও। তিনি একটু কৌতুকের সুরেই বললেন, যাদের মনে গন্ডারের কাদায় বসা নিয়ে অস্বস্তি হচ্ছে তাদের মনে রাখা উচিত, কাদাতে থাকাতেই তাদের সুখ!

কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই চট করে আমার একটা সাম্প্রতিক অস্বস্তিও দূর হয়ে গেল। বসবাসের অযোগ্য শহর হিসেবে ঢাকা দ্বিতীয় হওয়ায় সোশ্যাল মিডিয়াসহ নানা জায়গায় অনেককেই কিছু অদ্ভুত মন্তব্য করতে দেখছিলাম। সেসবের মমার্থ না করতে পেরে দুইদিন খুব অস্বস্তিতেও ছিলাম। তাদের মূল বক্তব্য হলো সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলার জন্য একটা পক্ষ এমন জরিপ করে ঢাকাকে এমন র‌্যাংকিং দিয়েছে। ঢাকা আসলে মোটেও নগর হিসেবে খারাপ না। পুরোটাই ষড়যন্ত্র!

আমি বুঝতে পারছিলাম এদের কারওরই ঢাকার জীবন হয়তো শুরু হয়নি আরামবাগের নোংরা স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকার মেসে, এরা কখনো লোকাল বাস বা টেম্পোতে চড়ে ঘামতে ঘামতে স্কুল কলেজে যায়নি, এদের কখনো পরীক্ষার আগের রাতগুলোয় বাবে রহমতের মাইকের শব্দের সাথে দীর্ঘ যুদ্ধ করতে হয়নি, এদের কখনো মতিঝিল ৬ নম্বর বাস থেকে হেলপার ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার পর ইঞ্চি খানেকের জন্য পেছনের চাকায় না পড়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা হয়নি, এদের কখনো পরীক্ষার দিন রিকশাসহ নোংরা পানিতে উল্টে পড়ে ভেজা কাপড়েই হলে বসে তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়নি, এদের কখনো ব্যাচেলর ভাড়াটিয়া হিসেবে বাড়িওয়ালার অমানুষিক মানসিক অত্যাচার সহ্য করতে হয়নি…!

ঢাকায় আসার শুরুর দিকে আমার মনে হতো নগর বুঝি এমনই। এভাবে লড়াই করে বেঁচে থাকার নামই শহর। এখানে হাত পা ছড়িয়ে দৌড়ানো যাবে না, এখানে আকাশ দেখা যাবে না, শীতকালে এখানে ধুলার কারণে নিশ্বাস নেওয়া যাবে না, চাইলেই ফুটবল নিয়ে নেমে পড়ার কোনো জায়গা পাওয়া যাবে না…জ্যামে বসে বসে সেদ্ধ হতে হবে, কোনো বিনোদনের ব্যবস্থা থাকবে না…! স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে হলে অবশ্যই নগরের বাইরে যেতে হবে।

নগর বলতেই আমরা দেশ বিদেশের উঁচু উঁচু দালান কল্পনা করে ঢাকার দালানকে তাদের সাথে তুলনা করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছি। সেটা অপরিকল্পিত কি পরিকল্পিত সেটা নিয়ে মাথা ঘামাইনি। মতিঝিলের ৩২ তালা নিয়ে আমরা গর্ব করেছি। রাতের বেলার এয়ারপোর্ট রোডের ঘুরোনো প্যাঁচানো ফ্লাইওভার দেখে অনেককেই বলতে শুনেছি, দেখ দেখ একদম বিদেশ বিদেশ লাগে।

কিন্তু পড়ছি, যতই দেশ-বিদেশ ঘুরছি ততই বুঝতে পারছি উঁচু উঁচু বিল্ডিং, ফ্লাইওভার দিয়ে শহরকে মাপা হয় না কোথাও। শহরকে মাপা হয় তার নাগরিক সুবিধা দিয়ে, তার সৃষ্টিশীলতা দিয়ে। একটা নগর তার নাগরিককে কতটা শারীরিক ও মানসিকভাবে ভালো রাখতে পারলো সেটাই আসল বিষয়।

আমি অন্যদের কথা জানি না, আমি আমার ২২ বছরের ঢাকা জীবনে নিজে এবং অন্য কাউকে কখনো ঢাকার নাগরিক জীবনের সুবিধায় ভালো থাকার তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে দেখিনি। ঢাকার নাগরিক জীবন মানেই গড়পড়তা এমন- জ্যাম ঠেলে অফিস যাওয়া, আবার অফিস থেকে জ্যাম ঠেলে বাসায় ফেরা। অফিস থেকে বের হওয়ার টাইম টেবিলবিহীন গাধার খাটুনি, বাচ্চার স্কুল, ব্যবসা করতে গেলে মাস্তান সামলানো আর বিনোদন বলতে টিভিতে টক শো, না হয় বন্ধুর বাসায় বেড়াতে যাওয়া।

এমন স্ট্রেসফুল জীবন বিশ্বের আরও অনেক নগরেই আছে। কিন্তু সেই সব নগরে স্ট্রেস কাটানোর নানা ব্যবস্থা আছে। ঢাকায় একটা মধ্যবিত্ত বাঙালির স্ট্রেস কমানোর একটা জায়গার কথা বলেন যেখানে সে সহজে অবলীলায় যেতে পারে! যেখানে গিয়ে সে অফিসের পরে একা অথবা পরিবার নিয়ে, বাচ্চাদের নিয়ে একটু নিশ্চিন্তে কিছু সময় কাটাতে পারে। পারবেন বলতে?

২.

দীর্ঘ আঠারো বছরের সাংবাদিকতা জীবনে আমি বেশ কিছু শিশু-কিশোরদের পত্রিকা সম্পাদনা করেছি। বিডিনিউজের কিডজ ডটকম, প্রথম আলোর গোল্লাছুট, কিশোর আলো। সেই সময়গুলোতে প্রায়ই ফোন পেতাম বিদেশ থেকে গরমের ছুটিতে ঢাকায় আসা বাবা-মায়ের। তাদের একটাই প্রশ্ন, এক সপ্তাহ হয় ঢাকায় এসেছি, ঘরে থাকতে থাকতে বাচ্চাটার অবস্থা খারাপ, ওকে নিয়ে ঢাকায় কোথায় যেতে পারি? বাসার কেউ বলতে পারছে না ঠিকমতো আপনি কি কিছু সাজেস্ট করতে পারেন? আমি নিজেও খুব অসহায় বোধ করতাম এই প্রশ্নটা শুনে।

কী বলবো তাদের? শিশু পার্কে যেতে? বোটানিক্যাল গার্ডেন, চিড়িয়াখানায় যেতে? এই ঢাকায় বাচ্চাদের জন্য আমরা ঠিকমতো একটা পার্ক বানিয়ে মেইনটেইন করতে পারিনি, একটা ইনডোর খেলার জায়গা বানাতে পারিনি, একটা ঘুড়ি ওড়ানোর ব্যবস্থা করতে পারিনি, একটা সাইকেল চালানোর জায়গার ব্যবস্থা করতে পারিনি, শিশুপার্কটাকেও শিশুবান্ধব রাখতে পারিনি। আমাদের স্কুলগুলোও আমরা জেলখানা বানিয়ে ফেলেছি পড়াশোনা আর পরীক্ষার বোঝা দিয়ে। বাচ্চারা স্কুল থেকে এসে আবার কোচিংয়ে যাচ্ছে, আমরাও গাধার মতো তাদের পেছনে খরচ করে যাচ্ছি আর জিপিএ ফাইভ পেলে খুব মিষ্টি বিলিয়ে বেড়াচ্ছি।

একটা বাচ্চার শৈশব আর কৈশোর কেমন হওয়া উচিত একটু চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন তো! কেমন? এখন আপনার সন্তান যেমন কাটাচ্ছে তেমন? ঢাকা কি একটা নগর হিসেবে শিশুবান্ধব?

শিশুবান্ধব বা প্রতিবন্ধীবান্ধব দূরের কথা, ঢাকা তো মানুষবান্ধবই না। এই শহরে একা থাকলে একটা মেয়েকে ঘরে ফিরতে হয় সন্ধ্যা হওয়ার আগে আগেই, তাদের জন্য দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠের গেইট বন্ধ হয়ে যায় সন্ধ্যার খানিক বাদেই, ভাড়াটিয়া তরুণদেরও ১১টার পর কোথাও ফেরার উপায় থাকে না। গ্যাসের উপর ‘ভাসা’ এই দেশের রাজধানীর অনেক ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় দিনের পর দিন রান্নার গ্যাস থাকে না, খাবার পানি থাকে না, বিদ্যুত থাকে না, এ শহরে কাজের মেয়েদের লিফটে উঠা বারণ, এ শহরে একা একটা মেয়ে ফুটপাত দিয়ে এক কিলোমিটার হাঁটলে ন্যূনতম ৫ বার অনাকাঙ্খিত হাত এসে ছুঁয়ে দেয়, পাবলিক ট্রান্সপোর্টের কলঙ্ক ছালবাকল উঠে যাওয়া যেই বাসগুলো রাস্তায় চলে সেসবে পুরুষরাই উঠতে পারে না ভিড় ঠেলে, মেয়েরা যদিও কেউ উঠে কী অবর্ননীয় দুর্ভোগ তাদের! নেই পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট, ফলে রাস্তাঘাট ভেসে যায় মানুষের মূত্রকর্মে, ঠিকভাবে দেখে না হাঁটলে মনুষ্য বিষ্টা পায়ে লাগলে যে পা-টা ধোবেন সেই পানির ব্যবস্থাও নাই কোথাও।

ঢাকা দ্বিতীয় হয়েছে এই খবরে অনেকে মর্মাহত হন, মানুষ সেই খবর শেয়ার করলে অনেকে তাকে ঢাকা বিদ্বেষী ভাবেন, ষড়যন্ত্র ছড়াচ্ছে ভাবেন। কিন্তু এই মর্মাহত হওয়া মানুষটা আসলে শহরের কোন এলাকার লোক? তারা কি শহরের এই হাল জানে না? নাকি শহর সম্পর্কে কোনো ধারণাই নাই! তারা এই গরমে এসি গাড়িতে বসেও যে মামের বোতলে টুক করে গলা ভিজিয়ে নিচ্ছে, তার হাতের বাঁ পাশের যে রিকশা চালক, যে পথচারী গরমে ঘেমে নেয়ে ঘন্টাখানেক ধরে একটা পরিবহনে উঠার চেষ্টা করছে তার তেষ্টা পেলে কী হয় সেটা কী একবার ভেবে দেখেছেন? উষ্ণ আবহাওয়ার এই দেশে আমরা কি আমাদের নগরবাসীর জন্য কিছু বিশুদ্ধ পানির কল স্থাপন করতে পেরেছি? নাকি ভেবিছি কখনো? বাড়ি ফিরে সে যে ওয়াসার পানি খাবে সেটাও তো সুয়ারেজের ফেটে যাওয়া লাইনের তীব্র গন্ধযুক্ত পানিই। বাংলার গ্রামে-গঞ্জেও তো জীবন যাপনের এরচেয়ে ভালো ব্যবস্থা থাকে।

নাগরিক জীবনে ভালো থাকার কনসেপ্টটাই সম্ভবত আমরা খুব একটা ভালো করে বুঝতে পারিনি। আমরা মনে করছি ইটের দালানের মাঝে এসি চালিয়ে থাকাই আসলে সুখের জীবন। এই শহরে যে একটা বিনোদনের ব্যবস্থা নাই সেটা নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নাই। কল্পনা করা যায়, উত্তরার মতো একটা এলাকায় লাখ লাখ লোক থাকে সেখানে একটা লাইব্রেরি নাই, একটা সিনেমা হল নাই, বাচ্চাদের একটা যাওয়ার জায়গা নাই। নগর পরিকল্পনায় বিষয়টা মাথাতেই আনা হয় নাই। একটু জায়গা পেলেই খাল-বিল-পার্ক ভরাট করে আমরা বিল্ডিং তুলে দিয়ে ‘নগর’ গড়ে তুলছি। শুধুই বিল্ডিংয়ের এই নগর লইয়া আমরা কী করিব?

৩.

আমি নিজে কখনো ইউরোপ আমেরিকার কোনো শহরের সাথে ঢাকাকে তুলনা করে মন খারাপ করিনি। নিজের সাথে যুক্তি দিয়েছি, এইসব শহর-দেশ শত শত বছরে নিজেদের ডেভেলপ করেছে। আমদের দেশের বয়স এখনো অর্ধশতই হয়নি। বুঝে উঠতেও তো সময় লাগে। আমাদের দেশের প্রকৌশলীরা ইউরোপ-আমেরিকার নগর পরিকল্পনায় যুক্ত হয়ে সুন্দর সুন্দর নগর তৈরি করেছে, সময় পেলে যেদিন ক্ষেত্র তৈরি হবে নিজের দেশেও পারবে। কিন্তু সম্প্রতি একটি শহরে গিয়ে আমার সেই যুক্তি ভেঙ্গে খান খান হয়ে গেছে।

‘নার্কোস’ টিভি সিরিজের কারণে কলম্বিয়ার মেডিজিনের কথা অনেকেই জানেন। দক্ষিণ আমেরিকার আন্দেজ পর্বতমালার আবুরা উপতক্যার মাঝে অসাধারণ সুন্দর এক শহর মেডিজিন। কলম্বিয়ার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই শহরটি আশির দশকের শেষের দিকে ড্রাগ লর্ড পাবলো এস্কোবারের বোমাবাজি আর গোলাগুলির কারণে একেবারে ধংসস্তুপে পরিণত হয়েছিল। বিশ্বের ‘মোস্ট ডেঞ্জারাস সিটি’র তালিকায় এক নম্বরে উঠে গিয়েছিল মেডিজিন। বছরে খুন হতো গড়ে সাড়ে ৭ হাজার লোক। কলম্বিয়ার সেই সময়ের বিখ্যাত ট্রাফিক জ্যামের কথাও অনেকেই শুনে থাকবেন।

১৯৯২ সালে এস্কোবার মারা যাওয়ার পর নগর পরিকল্পনাবিদরা এই ধ্বংসস্তুপের নগরীকে ঠিক করার জন্য এক বিশদ পরিকল্পনা নিয়ে বসলেন। তারা প্রথমেই জোর দিলেন দুটো বিষয়ে, এক যোগাযোগ ব্যবস্থা। দুই বাসস্থান।

যোগাযোগ ব্যবস্থায় তারা দেখলেন, কোনো একটা জায়গা যত বেশি দুর্গম তত বেশি ক্রাইম। আর যত ক্রাইম তত বেশি গরীব হয়ে থাকে সেখানকার লোক। পাবলো এস্কোবারের ঘাঁটি ছিল মেডিজিনের সবচেয়ে দুর্গম ও গরীব এলাকা কমিউনা থার্টিনে। পাহাড়ের উপরের এই কমিউনা থার্টিনে কয়েক লাখ গরীব লোক থাকতো। একদম আমাদের বস্তির মতোই অবস্থা। নগর পরিকল্পনাবিদরা কমিউনা থার্টিন নিয়ে ভাবতে বসে শুরুতেই এর দুর্গম ভাবটা কাটানোর উপায় নিয়ে চিন্তা করলেন। ২৪ তলা দালানের সমান উঁচু এই পাহাড়ের নীচ থেকে উপরে উঠতে খবর হয়ে যায় সবারই। তাই সেখান থেকে বাচ্চারা স্কুলে আসতে পারে না, সেখানকার লোকজন ডেইলি যেতে আসতে হবে এমন কোনো কাজের সাথে জড়িতও হতে পারে না, ফলে বেঁচে থাকার তাগিদে তারা ড্রাগসহ নানা ক্রাইমে জড়িত।

নগরবিদরা সেখানে একটা অদ্ভুত কাজ করলেন। খোলা আকাশের নীচে পাহাড়ের গা কেটে চলন্ত সিঁড়ি বসিয়ে দিলেন। পুরো ২৪ তলা এস্কেলেটর। নিচ থেকে যে পাহাড়ে আগে উঠতে এক দেড় ঘন্টা লাগতো সেটা এখন ১০ মিনিটেই উঠে পরা যায়। কমিউনার লোকজন খুব গর্ব করে তাদের এই এস্কেলেটর নিয়ে। নিজেরাই পালা করে পাহারা দেয় কেউ যেন নষ্ট করতে না পারে।

দুর্গম এলাকা সুগম হয়ে উঠতেই সেখানকার লোকেরা ড্রাগস ব্যবসা ছেড়ে সমতলে এসে নানা ধরনের ব্যবসা বাণিজ্য, চাকরি বাকরির সাথে যুক্ত হতে শুরু করলো। বাচ্চারা স্কুলে ঢুকে গেলো। ‘নার্কোস’ টিভি সিরিজের কারণে টুরিস্টরাও এই এলাকায় আসতে শুরু করলো। স্থানীয় প্রশাসন এই সুযোগে এই এলাকার বাড়িঘরে দেশের বিখ্যাত গ্রাফিতি আর্টিস্টদের দিয়ে শতশত গ্রাফিতি করিয়ে ফেলল। পুরো এলাকা হয়ে উঠলো রঙিন। টুরিস্টদের চাহিদা সামাল দিতে পাহাড়ের উপর গড়ে উঠলো সুন্দর রেস্টুরেন্ট, কফিশপ, স্যুভিনির শপ। সেসব বেশিরভাগই চালায় সেখানকার মেয়েরা। এলাকায় এখন ক্রাইম নেই বললেই চলে। চারদিকে হাসিখুশি মানুষজন ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাচ্চারা চিৎকার করে দৌড়ে সেখানকার পার্কে খেলছে। স্থানীয়রা টুরিস্টদের জন্য ফ্রিতে সালসা নাচের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। চারদিকে এত আনন্দিত মানুষের চেহারা দেখতে এতো ভালো লাগে!

সমতলে বাস-ট্রাম-মেট্রো আর পাহাড়ে ওঠার জন্য রয়েছে এস্কেলেটর আর কেবল কার। পুরো মেডিজন শহরের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থাকে গত ২০ বছরে সেখানকার নগর পরিকল্পনাবিদরা এমনভাবে গড়ে তুলেছেন যে মেডিজিনের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এখন সারা বিশ্বের মডেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ১৯৯৫ সালে চালু হওয়া ‘মেডিজিন মেট্রো’ তাদের অন্যতম গর্বের বিষয়। বাংলাদেশের প্রায় দশগুণ বড় দেশ কলম্বিয়ার একমাত্র এই শহরেই যে রয়েছে মেট্রোরেল।

এ বছরের (২০১৮) জানুয়ারির যে এক সপ্তাহ আমি আর আমার স্ত্রী দিয়া মেডিজিনে ছিলাম তার পুরোটা সময় কাটিয়েছি স্থানীয় এক বন্ধুর বাসায়। আমরা প্রতিদিন সকালে পিঠে একটা ছোট্ট ব্যাগ ঝুলিয়ে শহরের অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়াতাম। কত যে অভিজ্ঞতা! মানুষগুলো একদম আমাদের বাংলাদেশের মতোই। খুবই অতিথিপরায়ন। পাড়ায় পাড়ায় ছোট্ট ছোট্ট বেকারিতে গরম গরম বেক হওয়া কেক, চনমনে স্বাদের খাবার, টসটসে ফল, কমিউনিটি পার্কে ছেলেমেয়েদের সাথে ফুটবল খেলে কি যে আনন্দে কেটেছে দিনগুলো। প্রায় দিনই অফিস শেষ করে আমাদের বন্ধুটি যোগ দিতো আমাদের সাথে। সে আমাদের তার প্রিয় প্রিয় জায়গাগুলোতে নিয়ে যেত। কোনদিন অদ্ভুত ফলের জুসের দোকান, কোনদিন ‘বুয়েনস এয়রস’ নেবারহুডের বুদ্ধিজীবী গোছের তরুণদের আড্ডা দেওয়ার স্থান। আমি সেসব জায়গা দেখতাম আর আফসোস করতাম। আমি এই আফসোস কখনোই ইউরোপ-আমেরিকার শহর দেখে করিনি।

দিয়ার সাথে বাংলায় করা আমার আফসোস শুনে একদিন সেই বন্ধুটি কিছুটা আঁচ করে বললো, তুমি মনে হয় আমাদের এই শহর দেখে খুশি না, প্রায়ই দু:খসূচক দীর্ঘশ্বাস ফেলো। কারণ কী?

আমি বললাম দেখো, তোমাদের শহর আমার এতই পছন্দ হয়েছে যে এজন্য আমার নিজের শহরের জন্য বারবার দু:খ লাগছে। তোমাদের শহরের মানুষ যেমন, আমাদের শহরের মানুষগুলোও ঠিক তেমনই। এখানে যেমন মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তের সংখ্যা বেশি আমাদের শহরেরও একই অবস্থা। মানুষে মানুষে খুব মিল পাচ্ছি কিন্তু এক যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ার কারণে তোমাদের মানুষদের এত সুখি লাগছে দেখতে, এই যে একটু পরপর বাস-ট্রাম-ট্রেন থামছে তা থেকে শতশত হাসিখুশি মানুষ বের হচ্ছে, এই যে একটু পরপর বাচ্চাদের জন্য বানানো ছোট ছোট পার্ক, বড়দের খেলার জায়গা, প্রতি এলাকায় একটা করে লাইব্রেরি, ঝকমকে সিনেমা হল, থিয়েটার, সবুজ পার্কের নিচে পিকনিক করার জায়গা, আড্ডা-দেওয়ার জায়গা, এই যে তোমাদের মেয়েরা এই রাত ১২টাতেও কী সুন্দর হাসিখুশি চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে, চারদিকে আনন্দ করছে এসব দেখে আমার শহরের লোকদের জন্য খুব দুঃখ হচ্ছে। ফার্স্ট ওয়ার্ল্ডে এসব দেখলে খারাপ লাগে না। কিন্তু তোমরাও তো আমাদের মতোই তৃতীয় বিশ্বের নাগরিক, এই তো ২০ বছর আগেও তোমাদের এই শহর ধ্বংসস্তুপ ছিলো, আমাদের চার শ বছরের পুরোনো ঢাকা কেন তোমাদের চাইতে খারাপ থাকবে। সেখানকার মানুষরা কেন এত দুর্ভোগ পোহাবে দিনের পর দিন। তাদের সুখে থাকার কথা ছিল। কেন নেই? এটা নিয়েই আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলছি। এটা কি আমাদের নাগরিকদের দোষ নাকি যারা নগর চালায় তাদের দোষ।

সে বলল, দেখ আমাদের এখানকার লোকরাও খুব ত্যাদড়। বদের হাড্ডিও বলতে পার। সুযোগ পেলেই নিয়ম ভাঙ্গে। তার উপর পাশের দেশ ভেনিজুয়েলার অবস্থা খুব খারাপ। দলে দলে লোক জীবিকার তাগিয়ে এদিকে আসছে। এক সময় কেউই কোনো নিয়ম মানতে চাইতো না। মোটামুটি অরাজক অবস্থাই ছিল বলতে পার। কিন্তু আইনকানুন এত কড়া এখন, কেউ আর নিয়ম ভাঙার সাহস পায় না। বিশাল বিশাল জরিমানা কে দিতে চায়! সাথে রয়েছে ট্রান্সপোর্ট আর নগর প্রশাসনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা আর অক্লান্ত পরিশ্রম। তোমাদের নিশ্চয়ই এর কোথাও এক জায়গায় ঘাটতি আছে। সেগুলো ঠিক হলেই দেখবে চারদিকের সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে। আমি মনে মনে ভাবি, আমাদের কোনো এক জায়গায় ঘাটতি না, আমাদের পদে পদে প্যাঁচ লেগে আছে, সবচেয়ে হতাশার হলো আমাদের অনেকে আবার একে প্যাঁচ বলেই মনে করছে না, রাজনীতিবিদরা তো নয়ই! তারা নিজেরাই হাজার হাজার লোককে থামিয়ে দিয়ে, কখনো বিকট হর্ন বাজিয়ে উল্টা রাস্তায় চলে, জনগনের কথা তো বাদই দিলাম।

৪.

অনেককে বলতে শুনছি, ইউরোপ আমেরিকার অনেক দেশের অনেক শহরে ঘুরেছি কিন্তু ঢাকাই বেস্ট। আবেগের কথা হলে ঠিক আছে। নিজের মাতৃভূমি, নিজের বেড়ে উঠার শহর নিয়ে আলাদা আবেগ থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সত্যিই যখন নাগরিক সুবিধার তুলনা টেনে ঢাকাকে কেউ অন্য শহরের তুলনায় বেস্ট বানাতে চায় তখন আমার সন্দেহ জাগে সত্যিই তারা ইউরোপ আমেরিকার শহরে শহরে ঘুরেছে? ঘুরলে কি সেই শহরের নাগরিক সুবিধাগুলো তারা দেখতে পায়নি। কেন পায়নি? নাকি ঢাকায় বেড়ে ওঠায় না পাওয়ার অভ্যাসে অভ্যাসে এই সুবিধাগুলোর মর্মই তারা বুঝতে পারেনি, দেখার চোখও হারিয়ে ফেলেছে!

সেখানকার কোনো স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কি তারা কখনো কথা বলে জানতে চেয়েছে তারা কেমন আছে? তাদের নাগরিক সুবিধা কি বুঝতে চেয়েছে। তারা কী করে, কীভাবে ভাবে, সেই ভাবনার সাথে আমাদের মিল-অমিলগুলো ধরতে চেষ্টা করেছে? নাকি আইফেল টাওয়ারে এক বেলা ছবি তুলে দুই বেলা ল্যুভ ঘুরে এক বাঙালির বাসায় রাতে আলুভর্তা আর ডাল-মাছ খেয়ে ঢেঁকুড় তুলতে তুলতে খুব প্যারিস দেখলুম বলে পরের ফ্লাইটে রোমের কলোসিয়ামে গিয়ে দুটো ছবি তুলে ফিরে এসেছে!

আমি একে খারাপ বলছি না। করতেই পারে কেউ। কিন্তু আমি বলছি, এই দেখা দিয়ে ‘এর চেয়ে ঢাকাই ভালো’ সার্টিফিকেট দেওয়ার আপত্তির কথা। এর সাথে আমি মিল খুঁজে পাই মফস্বল থেকে ঢাকায় এসে এক সপ্তাহ থেকে জাদুঘর, চিড়িয়াখানা আর শিশুপার্ক দেখার পর যে আত্মীয়টি ‘দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, টিকিট কেটে দে বাড়ি চলে যাই’ বলে তার সাথে। আপনার স্বস্তির সাথে ভালো-মন্দ গুলিয়ে ফেলছেন। প্রত্যেকটা শহরেরই ভালো মন্দ আছে। আপনি যে শহরে গিয়েছেন সেই শহরের সাথে নিজেকে তো কোনোভাবে কানেক্টই করানোর চেষ্টা করলেন না, ভালো লাগাবেন কীভাবে, ভালোটা দেখবেন কীভাবে?

আমি আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে পৃথিবীর অর্ধশতাধিক দেশের প্রায় দুই আড়াইশ শহরে ঘুরেছি। সুযোগ পেলেই চেষ্টা করেছি সেই শহরের স্থানীয় লোকজনদের সাথে থাকার। ওদের সাথে কথা বলে, ওদের সাথে ঘুরে ঘুরে শহর দেখার। কোথায় তারা যায়, কী করে, কীভাবে সময় কাটায়, দেশ নিয়ে তারা কী ভাবে, বাংলাদেশ সম্পর্কে কী ধারণা ইত্যাদি জানার। প্যারিসে গিয়ে যে দম্পত্তির বাসায় তিনরাত ছিলাম তার দুজনই প্যারিস মেট্রোর ডিজাইন টিমে কাজ করে। প্যারিস মেট্রো আগামী বিশ-পঞ্চাশ-একশো বছর নাগাদ কী করতে যাচ্ছে, শহরের কোন দিকে জনসংখ্যার কী পরিমাণ চাপ হবে, কোন দিকে লাইন নতুন করে তৈরি করতে হবে সে বিষয়ে তার কয়েক ঘন্টার লেকচারেই আমার মাথা ঘুরে উঠেছে- এতদূর তারা ভাবে কীভাবে? আমার অতি আগ্রহ দেখে সে পরদিন আমাদের দেখাতে নিয়ে গেছে কীভাবে মেট্রো লাইন তৈরি হয় সেটা দেখাতে। কাজটাকে তারা যে একটি মহৎ কর্ম এবং জীবনের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হিসেবেই নিয়েছে সেটা সেই বিশাল কর্মযজ্ঞ আর তাদের কথা শুনে বুঝতে পারলাম।

পরের একটা রাত কাটালাম বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া এক তরুণীর বাসায়। সকালে নাস্তা করতে করতে সে বলল, আমি আজকে হাঁস ধরতে যাচ্ছি, যাবে নাকি আমার সাথে? ব্যাখ্যা করতে বললাম ব্যাপারটা তাকে। সে বলল, প্যারিসের ভেতরে দিয়ে যে নদীটা বয়ে গেছে- ছেন নদী- খেয়াল করে দেখেছ কিনা সেটায় প্রচুর হাঁস আছে। শীত আসছে। আবহাওয়া দপ্তর জানিয়েছে এবার ভালোই শীত পড়বে। নদীর উপরের স্তর বরফে জমে যাবে। তাই হাঁসগুলোকে এখনি ধরে শেল্টারে রাখতে হবে না হয় নদীর সাথে সাথে তারাও জমে মারা পড়বে। পরিস্থিতি আবার অনুকুলে এলেই এদের ছেড়ে দেওয়া হবে। তুমি হয়তবা পুরো প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত হতে পারবে না তবে দেখতে পারবে।

এই অভিজ্ঞতাগুলো বললাম এ কারণে যে, একটা নগরকে সুন্দর ও মানবিক করতে কত মানুষের কত ভাবনা লাগে, চেষ্টা লাগে, আন্তরিকতা লাগে, পরিশ্রম লাগে, ভালোবাসা লাগে। এই যে হাঁসগুলো- ঠাণ্ডায় মরে গেলে কারও কিছুই যায় আসতো না তবে গ্রীষ্মে নদীটা থাকতো হাঁসশূন্য। তাতে নদীটার সৌন্দর্য্য একটু হলেও তো কমতো। নগরকর্তাদের এই ছোট্ট প্রাণটার প্রতি মায়া আছে বলেই তো হাঁস সমাজেও প্যারিস একটি বসবাসযোগ্য শহর।

একটা শহরতো শুধু মানুষের নয়, এই শহরে পাখি আছে, কুকুর আছে, বিড়াল আছে, হাঁস আছে, মাছ আছে। এই শহরটা তাদেরও।

কিছুদিন আগেও কয়েকদিন পর পরই ঢাকায় দেখা যেত সিটি করপোরেশনের গাড়ি এসে রাস্তার কুকুরগুলোকে তুলে নিয়ে গিয়ে অমানবিকভাবে ঘাড় ভেঙ্গে বা ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলত। কী বিভৎস! এমন না যে ঘাড় ভেঙ্গে না মেরে, এই কুকুরের নিয়ন্ত্রণ কীভাবে করতে হবে এসব খুবই অজানা বিষয়। কোন কোন এলাকায় অত্যুৎসাহী কমিশনাররা তো কুকুর পিটিয়ে মেরে ফেলার মতো অমানবিক কাজে নেতৃত্বও দিয়ে চলছেন।

সারা বিশ্বেই কুকুর বন্ধ্যাকরণ জনপ্রিয় ও সবচেয়ে মানবিক পদ্ধতি। এতে অটোমেটিকই এক সময় কুকুরের নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব। কিন্তু কে ভাবে এইসব প্রাণীদের কথা যেখানে মানুষের জন্যই প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো মানবিকতা বরাদ্দ নাই। সুযোগ পেলেই প্রশাসন সাধারণ নাগরিকদের সাধারণ মৌলিক দাবির বিপরীতে লাঠিপেটা করে, হাত-পা গুড়া করে ফেলে, গুলি করে সারাজীবনের জন্য অন্ধ করে দেয়।

৫.

উন্নত বিশ্বের আধুনিক শহরগুলোতেও প্রচুর খারাপ বিষয় আছে। বিতর্কিত নানা আইন আছে, নানা বিপদ আছে। সেখানেও ছিনতাই হয়, খুন হয়। তেমন খারাপ অভিজ্ঞতার সামনে আমিও পড়েছি। কিন্তু কোনো খারাপ অভিজ্ঞতাতেই শেষ পর্যন্ত নিজেকে কখনো অসহায় মনে হয়নি। সবসময়েই সে শহরের প্রতিনিধি কাউকে না কাউকে পাশে পেয়েছি। ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলিতে যে বাসায় কিছুদিন ছিলাম সেটার সামনে মাসে, দুই মাসে একবার গোলাগুলি হতো। মুহূর্তেই পুলিশের গাড়ি, হেলিকপ্টার ইত্যাদি দিয়ে প্রধানত বাসিন্দাদের আশ্বস্ত করতেন। কিছুদিন পর আরেকটা বাসা ভাড়া নিতে গিয়ে আমরা ‘ব্রাউন’ বলে যখন ভাড়া দিতে গড়িমসি করছিল তখন সিটি কাউন্সিলে গিয়ে অভিযোগ জানাতেই আইনি নোটিস খেয়ে সুরসুর করে ভাড়া দিতে রাজি হলো তখন মনে হয় এই শহরে রাষ্ট্র আমার পাশে আছে। একটা ভরসা পাওয়া যায়। আমি বলছি না ঢাকাকে এখনই এমন হতে হবে। আমার চাওয়া ছিনতাইকারি আমাকে ছিনতাই করার সময় যাতে পুলিশ চুপচাপ দাঁড়িয়ে না থাকে। অন্যের উপকার করতে গেলে পুলিশ যেন আমাকেই উল্টো হয়রানী না করে, আমার পকেটেই যেন ইয়াবা ঢুকিয়ে না দেয়। প্রশাসনের কাছে যেতে যেন আমাকে উল্টো ভয় না পেতে হয়।

৬.

যাদের শৈশব, কৈশোর বা তারুণ্য কেটেছে ঢাকায় তাদের ঢাকার প্রতি একটা আলাদা মায়া আছে। সেই মায়ার বাঁধনে আমরা সবাই নানাভাবে জড়িয়ে আছি। পৃথিবীর যে শহরেই ঢাকাবাসী থাকুক না কেন মনের গহিন কোনে তারা এই শহরটার জন্য একটা মমতা বোধ করে। এই শহরের কোনো খারাপ হলে আমাদের বুক ছিঁড়ে যায়, এই শহরে কোনো খারাপ সংবাদে আমরা মর্মাহত হই। কারণ এই শহর আমাদের জন্য একটা ম্যাজিকাল শহর। হুট করে এই শহরের রাজপথে হেলে দূলে চলে বেড়ায় মস্ত হাতি, লাল ফাইলের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা ইঁদুরের খোঁজে গম্ভীর মুখে রাতের মতিঝিলের ইলেকট্রিক পোলে বসে থাকে শতশত প্যাঁচা, জ্যাম ঠেলে ছুটে চলা স্বচ্ছ কাঁচের গ্লাসঅলা গাড়িতে মুক্তোর মতো জ্বলজ্বল করে বঙ্কিম-জীবনানন্দ-মার্ক টোয়েন-ম্যাক্সিম গোর্কি, বর্ষায় আকাশ কালো করে ঝমঝমিয়ে নামে বৃষ্টি, গভীর রাতে ডেকে ওঠা কাকের ডাকে বুকে জাগে হাহাকার। এসব ম্যাজিক পৃথিবীর আর কোনো শহরে নেই।

কিন্তু এতসব ম্যাজিকের ভিড়ে এই সত্যিটাও আমাদের মেনে নিতে হবে যে, আমাদের এই ভালোবাসার শহর ভালো নেই, রোগে-শোকে-অমানবিকতায় মৃতপ্রায়। এই শহরের প্রাণ যায় যায় অবস্থা।

অন্ধ ভালোবাসা কোনো কিছুকে ভাসায় না, ডুবিয়ে দেয়। তাই আমাদের অন্ধ ভালোবাসায় আর এই শহরের বেঁচে উঠার কোনো সম্ভাবনা নেই। শহরকে যদি সত্যিই আমরা বাঁচাতে চাই তবে গ্রহণ করতে হবে এর ভালো-মন্দ সকল সমালোচনা। এরপর সেই সমালোচনার জবাব দিতে হতে সত্যিকারের কাজ দিয়ে।

আর রবীন্দ্রনাথও বলে গেছেন, ‘এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা।’

১৯ Responses -- “অন্ধ ঢাকা, বন্ধো করো না পাখা”

  1. Not applicable

    It do not have bangla font and I never practiced with any bangla font either. I will only use bangla font when I will learn how to use it. I don’t like to write any bangla word in English font. It’s disrespectful to bangla language. Secondly, I don’t usually see any good articles here. But this one is: a big yes. Again I wish I could write this opinion in bangla so that I could reach too many people . They could understand the pain that many people who are holding their breathes all the time but can’t express themselves. I saw some YouTube video about Dhaka city. How was Dhaka. If you like you can have a look. Links are here. https://www.youtube.com/watch?v=DnrzyQ6f1fQ https://www.youtube.com/watch?v=HoojU4cLSSc&t=41s
    https://www.youtube.com/watch?v=d1IoxTeTpjM I could write a lot about Dhaka but I guess you will see how was Dhaka by yourself. Present Dhaka is disgusting and not fixable because. Who can bring back my old Dhaka? No matter what you do, it’s gone.

    Reply
  2. Nayan

    অনেকদিন পর সুন্দর একটি লেখা পড়লাম। প্রতিদিনের নাগরিক জীবনে যে দীর্ঘ নিশ্বাস আমরা ফেলি তার হুবহু বর্ণনা পেলাম সিমু নাসেরের লেখনিতে।

    একসময় মানুষ মানবিক ছিল। সারাদিন অফিস করে বিকালে বের হয়ে পার্কে বা কোথাও বসে আড্ডা দিত, কেউ কেউ নাটক পাড়ায় নাটক দেখতে যেত। সংস্কৃতির চর্চা থাকার কারনে মানুষের মধ্যে মানবিক সত্ত্বাটা জাগ্রত ছিল। প্রতিবেশীদের বাড়িতে মানুষ যেত। পাড়ায় পাড়ায় নানা উতসবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হত। মানুষের অর্থ কম ছিল কিন্তু সময় ছিল।

    এখন মানুষ অফিস করে ৮ ঘন্টা আর জ্যামে থাকে ৪ ঘন্টা। পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে জানেনা, প্রতিবেশী অনেক পরের ব্যাপার। মানুষ বই পড়ে না, নাটক দেখেনা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড থেকে দূরে। ইট কাঠের দালান ছাড়া একটু সবুজ নেই কোথাও। এখন অর্থ আছে কিন্তু সময় নেই, মানবিকতা নেই, শুভবোধ নেই।

    Reply
    • সরকার জাবেদ ইকবাল

      সুপ্রিয় নয়ন,
      অসাধারণ! আপনি এবং এবং আপনার মন্তব্য। আমার এক সহকর্মী একবার দু:খ করে বলছিলেন, “আমাদের সন্তানেরা খাঁচায় বন্দী ব্রয়লার মুরগির মতো বড় হচ্ছে, ওরা দৌড়াতেতো পারেই না, ধাক্কা দিলে হাঁটতেও পারে না, পড়ে যায়।” অথচ, আমাদের সময়কালে (পাকিস্তান আমলে) এই ঢাকা শহরেই আমরা তাইরে নাইরে করে ছোটার মতো অবারিত মাঠ পেয়েছিলাম। সেই মাঠ এখন কোথায়??? রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলের বাসার বেলকনি থেকে পশ্চিমে তাকালে থৈ থৈ বুড়িগঙ্গার ঢেউ দেখা যেতো। সেই বুড়িগঙ্গা এখন কোথায়???

      Reply
      • Md. Mahbubul Haque

        আমি কুদরত-ই-খুদা ও লালন শাহ হাউজের আাবাসিক ছাত্র হিসাবে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে পড়েছি ১৯৮৩-১৯৯১ পর্যন্ত। আমার জীবনের শেষ্ঠ সময়টা সেখানেই কেটেছে। মাঝে মাঝেই নস্টালজিক হয়ে যাই। ১০ টাকায় জেনেভা ক্যাম্পের ভাই ভাই তেহারি, সাথে ২ টাকায় দুটো টিকিয়া আর ৬ টাকার পোলার আইসক্রিম বৃহস্পতিবার রাতের সেরা বিনোদন ছিল। ধরা পড়লে নির্ঘাত টিসির ভয় থাকলেও পালিয়ে শ্যামলী হলে সিনেমা দেখা বা মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন কেন্দ্রে ম্যাকগাভার দেখা এখনও মিস করি।
        আহা, সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি।

      • সরকার জাবেদ ইকবাল

        মাহবুব সাহেব,

        কাঁদালেন। ১৯৬০ সালে আমার বাবা রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলে প্রথম নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। সেই সুবাদে ওখানে থাকা। তখন মোহাম্মদপুর ধূ ধূ প্রান্তর। শিয়া মসজিদ সংলগ্ন বর্তমানে যে রিং রোড সেটাই ছিল তখন বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়। বড় বড় পণ্যবাহী নৌকা ভিড়তো ওখানে। মোহাম্মদপুর বাজারটি ছিল গ্রামের আর দশটা সাধারণ বাজারের মতই; সন্ধ্যা হলেই বড় বড় কুপি জ্বলতো। আর কত বলবো? বানরের অত্যাচারে অতীষ্ঠ হয়ে মা রান্নাঘরের জানালা বন্ধ করে রাখতেন। ফজলুল হক হলের সামনে ছিল ঘন বন। সেখানেও ছিল শত শত বানর।

  3. গাজী ফরহাদ

    ধন্যবাদ সিমু নাসের, আমাদের অযোগ্যতা এভাবে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়ার জন্য। আমরা এই দেশের অধিকাংশ মানুষই আসলে চূড়ান্ত রকমের অসভ্য। কোন ভালো কিছু আমাদের যেমন সহ্য হয়না, তেমনি বড় বা বিশাল কোন কিছু আমরা আসলে ধারণই করতে পারিনা। এই দেশ মুক্ত হবার পর যেদিন অসংখ্য সাধারণ শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে এড়িয়ে আমরা কেবল বাহিনী ধরে ধরে বীর শ্রেষ্ঠ পদক দিয়েছি, সেদিনই অর্জিত স্বাধীনতা কালিমায় ঢেকে গেছে। আমাদের চেতনা সেই যে অন্ধ এবং বধির হলো, দিনে দিনে সে এখন মানষিক রোগগ্রস্ত। এজন্যই ২লাখ বীরঙ্গনার মধ্যে মাত্র ১৮৫ জনকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিতে আমাদের প্রায় ৫০ বছর লেগেছে। যে রাজধানীতে কোটি মানুষের একটু নিরিবিলি বসার বা হাঁটার জায়গা নেই, লাখ লাখ শিশুর সামান্য খেলার বা দৌড়ানোর জায়গা নেই, সেখানে ভাঙ্গাচোরা একটা বিমান বাহিনীকে আমরা তেজগাঁ এয়ারপোর্টের হাজার হাজার একর জমি চিন্তা ভাবনা ছাড়াই দিয়ে দিয়েছি। এদেশের ৯৯% রাজনীতিবীদ ও আমলা নিজেদের এ দেশের মালিক মনে করে, বাদ বাকিসব মানুষজনকে তারা মানুষই মনে করে না, করলে স্বাধীন স্বার্বভৌম একটা দেশের প্রতিটা ক্ষেত্রে এমন অরাজক পরিস্থিতি তৈরি হতো না…

    Reply
  4. kazi

    খুব সুন্দর লিখেছেন ভাই। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের রাজধানীতে এমন লক্কর ঝক্কর বাস চলে কিনা গুগলও বলতে পারেনি। সিটি কর্পোরেশন এর ক্লিনারদের কাজ তদারকি করার কেউ আছে বলে মনে হয় না। রাজধানী শহরের নতুন নতুন মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং এর কারণে আকাশের চেহারা চেঞ্জ হয়েছে কিন্তু রাস্তা দিনে দিনে চলার জন্য আনফিট হচ্ছে। ফ্লাইওভারে উঠতে জ্যাম নামতেও জ্যাম। বিচিত্র ব্যাবস্থাপনা।

    Reply
    • সরকার জাবেদ ইকবাল

      শব্দচয়নে শালীনতা লঙ্ঘন হলেও আক্ষেপটি চূড়ান্ত রকম খাঁটি। ধন্যবাদ মি: সি।

      Reply
  5. kazi364

    Well Written my friend.Those, who we are living in Dhaka city for the last 25 years, we could feel the sky has changed lot in Dhaka city but all others has deteriorated to a great extend.How the public transport is running in this city?Who should care the city corporation cleaner?how the city dwellers be compelled to avail footpath and foot over bridge?
    Who think about it?We love power and money not the future of our generation.Our next generating has started thinking negatively about their future????

    Reply
    • Not applicable

      I disagree. Dhaka city is horrible. I have seen worse poor city but very organized. He rearly said less. He could say more no idea why he did not clarify those issues.

      Reply
  6. Qudrate Khoda

    চমৎকার, শিক্ষণীয় ও অসাধারণ রচনা। ধন্যবাদ!

    কিন্তু , দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে বাঙালী মুসলমানের মাথায় এই বাণী ঢোকার সম্ভাবনা ক্ষীণ ।

    Reply
  7. সরকার জাবেদ ইকবাল

    অনেকদিন পর একটি ভিন্ন স্বাদের লেখা পড়লাম। লেখার স্টাইলও দারুণ! ‘চলন্ত সিঁড়ি’র কথা শুনে মনে হলো আমাদের সরকার অন্তত এই একটি কাজ করতে পারে,- সবগুলো ‘Foot-over bridge’-এ চলন্ত সিঁড়ি সংযোজন করে দিলে মানুষ এলোমেলোভবে রাস্তা পার হবে না, তাতে দুর্ঘটনাও কমে যাবে।

    Reply
  8. Md. Mahbubul Haque

    ‘একজন’কে পেয়েছিলাম, যে আপনার-আমার মত করে প্রিয় শহর ঢাকাকে দেখতে চেয়েছিল। কাজটা দুর্দান্তভাবে শুরুও করেছিল, কিন্তু শেষ করে যেতে পারেনি। দেখিয়ে দিয়েছিল ‘করা সম্ভব’ against all odds.
    দূর্ভাগ্য আমাদের। হয়ত সে সময়টি এখনো আসেনি, নয়ত সে নিজেই সময়ের আগে এসে আবার চলেও গেছে।

    Reply
    • সরকার জাবেদ ইকবাল

      তিনিই প্রথম ‘৮০’র দশকে নিয়ম মেনে গাড়ী চালানো বিষয়ে রাস্তা থেকে সরাসরি টিভি রিপোর্টিং শুর করেছিলেন (মানিক মিয়া এভিন্যু থেকে)। এ দেশে ভাল মানুষের কদর নেই। হয়তো এ কারণেই তাঁকে অকালেই চলে যেতে হলো!

      Reply
  9. Hasan Mahmud

    চোখে পানি চলে এলো। অর্ধ শতাব্দী বিদেশে আছি, দেখছি সব – আরো লিখুন, আরো নির্দয় চাবুক মারুন আমাদের নগর পরিকল্পনাবিদদের পিঠে – কোনোদিন এদের চোখ খুলবে…. হয়তো…. হয়তো কোনোদিন ….

    Reply
    • Not applicable

      Keep dreaming my friend. They don’t live in Dhaka. They live in London or Singapore. I saw some old pictures of Dhaka city. Same Dhaka city but it could be very attractive for tourists however tourists for present Dhaka , if ever any tourists come to Dhaka by mistake they probably never will come back. You understand what I mean

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—