মহান ব্যক্তিদের চরিত্র উদ্ভাসিত হয় যখন তারা চাপের মধ্যে থাকেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ১৯৫০ সালের যে চিঠিগুলো সাম্প্রতিককালে উদঘাটিত হয়েছে, সেগুলোতে আমরা দেখতে পাই কীভাবে তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি হয়ে উঠলেন।

১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ডের ওপর পাকিস্তানের ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের নজরদারির গোপন নথিগুলোর অস্তিত্ব শেখ হাসিনা জানতে পারেন ১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর।

গুরুত্বপূর্ণ সেসব দলিল এখন একাধিক খণ্ডে প্রকাশিত হচ্ছে ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান’ শীর্ষক বইয়ে। ১৯৪৮-১৯৫০ সময়কালের নথি নিয়ে এ বইয়ের প্রথম খণ্ড সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।

ইতিহাসের এই অমূল্য রত্নভাণ্ডার এতদিন লোকচক্ষুর অন্তরালেই ছিল।

এ বইয়ের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে আমরা দেখতে পাই বঙ্গবন্ধুর নিত্যদিনের কর্মকাণ্ডের ওপর পাকিস্তান সরকারের নজরদারির রেকর্ড।

বাঙালির সংস্কৃতি ও ভাষার অধিকার রক্ষা এবং তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে বঙ্গবন্ধু যেভাবে পরিকল্পনা সাজাচ্ছিলেন, যেভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দিচ্ছিলেন, তার মধ্যে দিয়ে আমরা তার তখনকার ভাবনাগুলো, তার অনুভূতি আর মানসিক অবস্থা উপলব্ধি করতে পারি। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সেই সংগ্রামের পথ ধরেই শেষ পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

পাকিস্তানের ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের এসব নথির বেশ কয়েক জায়গায় বঙ্গবন্ধুকে বর্ণনা করা হয়েছে ‘সিকিউরিটি প্রিজনার শেখ মুজিবুর’ হিসেবে।

এই লেখায় বঙ্গবন্ধুর দুটি চিঠির বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই। দুটো চিঠিই ইংরেজিতে বঙ্গবন্ধুর নিজের হাতে লেখা।

১৯৫০ সালের ২১ ডিসেম্বর জনাব সোহরাওয়ার্দীকে লেখা একটি চিঠিতে ফরিদপুর কারাগারে বন্দি শেখ মুজিব লেখেন, “… যারা নীতির পক্ষে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত, তারা খুব কমই পরাজিত হয়। মহৎ কিছু অর্জিত হয় মহান আত্মত্যাগের মাধ্যমে। আল্লাহ যে কারো চেয়ে শক্তিশালী, আর আমি তার কাছেই সুবিচার চাইব।”

এটি ছিল তার কাছ থেকে একটি শক্তিশালী বার্তা, যাকে পরবর্তী বছরগুলোতে নিষ্পেষণ আর বৈষম্যের কবল থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে মুক্ত করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রমে নেতৃত্ব দিতে দেখা যায়।

শেখ মুজিব ওই চিঠিতে সোহরাওয়ার্দীকে লিখেছিলেন, কারাগারে তার বই প্রয়োজন।

“ভুলে যাবেন না, আমি এখানে একা, বই আমার একমাত্র সঙ্গী।”

ওই চিঠির আরেক অংশ বঙ্গবন্ধু লেখেন, তাকে রাখা হয়েছে ফরিদপুর কারাগারে, কিন্তু মামলার শুনানি চলছে গোপালগঞ্জের আদালতে।ফলে তাকে বারবার আনা-নেওয়া করা হচ্ছে।

অনেকটা আক্ষেপ করেই তিনি লিখেছেন, একবার যেতেই ৬০ ঘণ্টা লেগে যায়। আর যে সড়ক দিয়ে যে বাহনে করে তাকে নেওয়া হয়, তা কতটা ক্লান্তিদায়ক, তা বলাই বাহুল্য।

পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ বঙ্গবন্ধুর ওই চিঠি আটকে দেয়। ফলে তা আর প্রাপকের হাতে পৌঁছেনি। সেই চিঠি বহু বছর পর পাওয়া যায় স্পেশাল ব্রাঞ্চের গোপন ফাইলে।

জেপু নামে এক আত্মীয়কে লেখা বঙ্গবন্ধুর আরেকটি চিঠি একইভাবে আটকে দেওয়া হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ১৯৫০ সালের ২৬ মে পাঠানো ওই চিঠিতে তিনি লেখেন, “…তোমার জানা উচিৎ, যে ব্যক্তি আদর্শের জন্য, তার দেশ ও মানবতার মঙ্গলের জন্যনিজেকে নিয়োজিত করেছে, তার কাছে জীবনের মানে অনেক ব্যপক। সেই তুলনায় জীবনের যন্ত্রণা তার কাছে ততটাই কম গুরুত্ব পায়।

“আমি জানি, যারা বুদ্ধি দিয়ে চলে, এ দুনিয়া তাদের কাছে রঙ্গশালা মাত্র, আর যারা অনুভূতির দ্বারা পরিচালিত হয়, তাদের কাছে এটা বিয়োগান্তক।”

শেষের ওই বাক্য আমাদের আশেপাশের অনেকের দৃষ্টিভঙ্গির একটি সারমর্ম প্রকাশ করে।

এরপর তিনি লিখেছেন, “আমি নিশ্চিত, মিথ্যা আর সত্যের দীর্ঘ যুদ্ধে মিথ্যা হয়ত প্রথমবার জয়ী হয়, কিন্তু শেষ যুদ্ধে জয়ী হয় সত্য।”

সেই আত্মীয় ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, রাজনীতি ছাড়ার মুচলেকা দিলে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেবে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ। জবাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান বঙ্গবন্ধু।

তিনি লেখেন, “আমি বুঝতে পারছি না কীভাবে তুমি ‘মুচলেকা’ শব্দটি আমাকে লেখার সাহস পেলে। সর্বশক্তিমান আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে আমি মাথা নত করতে শিখিনি।”

ভাষার ওপর বঙ্গবন্ধুর দখল, তার চারিত্রিক দৃঢ়তা, সর্বশক্তিমানের ওপর তার বিশ্বাস, ব্যক্তিগত জীবনে চরম দুর্ভোগ, মিথ্যার বিপক্ষে সত্যের জয় হবে- এই আপ্তবাক্যে তার দৃঢ় বিশ্বাস, নিপীড়িতদের যন্ত্রণা অনুধাবন, আত্মত্যাগ ছাড়া যে লক্ষ্য পূরণ হবে না এবং আপসকরা মানে যে নিজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা- এই উপলব্ধি, নিজের আদর্শ ও নীতিতে অবিচল থাকা, দেশগঠনে নিবেদিত থাকা, মানবতার সেবা করার প্রবল ইচ্ছা- এর সবই ১৯৫০ সালে লেখা ওই দুটি চিঠিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখন তার বয়স মাত্র ৩০ বছর।

পরের ২১ বছরে লক্ষ্যের প্রতি তার অবিচল থাকা, নিজেকে উৎসর্গ করা, আত্মত্যাগ এবং তার নেতৃত্বের কারণেই যে স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে লাখো মানুষের জীবন ও সম্মানের বিনিময়ে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। আর এর মধ্যে দিয়েই পাকিস্তানের সেই ‘সিকিউরিটি প্রিজনার’ শেখ মুজিবুর হয়ে উঠেন বঙ্গবন্ধু, আমাদের জাতির পিতা।

[লেখাটি ইংরেজি থেকে অনূদিত]

সালমান এফ রহমান দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী এবং সংবাদপত্র মালিক । 

Responses -- “জেল থেকে লেখা চিঠির তরুণ বঙ্গবন্ধু”

  1. Anwar A Khan

    Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman unified the whole Bengali res publica into a solitary platform to combat the beastly Pakistani military establishment and its local mango-twigs to establish Bangladesh in 1971. Being a college student then, I saw in my own eyes how people of all walks of life and people of all religions laid down their lives at gun points and bayonet charges.

    The sub-humans belonging to Pakistani regime monstrously asked our valorous people to say, “Pakistan Zindabad.” But our valiant and patriotic hoi polloi bravely enounced the words, “Joi Bangla. Joi Bangabandhu. Joi Bangladesh” and embraced glorious deaths.

    It was a people’s war in 1971 to attain Bangladesh.

    The two words ‘Bangabandhu’ and ‘Bangladesh’ are synonymous. He was like a sky-touching figure. Being a bantam FF of the 1971 war field, I salute him and shall keep on doing so unto my demise.

    Reply
    • সরকার জাবেদ ইকবাল

      Dear Anwar Bhai,

      We are proud of you and grateful to you all Freedom Fighters who offered us an independent country. I am fortunate enough that I had the opportunity to see Bangabandhu in two occasions in my life. One in 1969 when he just came out of the jail and made a short break in Cumilla on his way to Chottogram. I saw him within a touchable range.

      Later on in 1973 I had the opportunity to give him a guard of honour as a member of my school team in Daudkandi where he was given a reception by the conspirator Khondoker Mustaque Ahmed. We were sitting very close to the stage. During his speech once Bangabandhu pointed his finger at us and said, “এই যে ছেলেরা, সুন্দর সুন্দর জামা-কাপড় পইরা বইসা থাকলে হবে না। মা-বাবার সঙ্গে মাঠে-ঘাটে কাজ করতে হবে।” So generous and affectionate he was!

      Reply
      • Anwar A Khan

        Dear Javed,

        You are aureate enough to be in close propinquity with Bangabandhu like a sky touching statesman twice. You have recollected those groovy memories in your annotates. Keep these grand occasions to hold dear in all along your life.

        Thank you so much for divvying up these intellections.

  2. জিন্নাত আলী

    অনেক সুন্দর তথ্য, এবার শেয়ার বাজার নিয়ে কিছু লেখেন, আমরা তো শেষ হয়ে যাচ্ছি। আমাদের দিকে এবার নজর দিন।
    বঙ্গবন্ধু থাকলে হয়তো আমাদের কষ্ট গুলো বুঝত। আপনি একটু আমাদের কষ্টটা উপলব্ধি করেন। প্রয়োজনে ভালো কিছু কম্পানি বর্তমান কোম্পানির সাথে যুক্ত করেন অন্ততপক্ষে আমরা কিছু সুফল যেন পেতে পারি।

    Reply
  3. সমুদ্র কাবীর

    লেখকের পরিচয় কি কেবলই “শীর্ষস্থানীয়” ব্যবসায়ী আর সংবাদপত্র মালিক? আরেকটু ভাল করে বর্ণনা করা উচিৎ।

    (গণপ্রজাতন্ত্র বাংলাদেশ এর জনগণের কয়েক শত কোটি টাকা ধারের নামে হাতিয়ে এখন) দেশের একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী এবং সংবাদপত্র মালিক।

    আশা করি এটাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ না ভেবে ফ্যাক্ট ভাববেন।

    Reply
  4. Md. Mahbubul Haque

    লেখকের কাছ থেকে শেয়ার বাজার থেকে ‘মূলধন’, ব্যাংক থেকে ‘(অ)ফেরতযোগ্য ঋণ’ লাভের কর্মকৌশল সংক্রান্ত লেখনী চাই।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—