১.

বিশাল জনবহুল দেশ বাংলাদেশ। এই দেশে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার লোকজন বসবাস করে। কারও আয় কম, কারও আয় বেশি কারও বা আয় অত্যধিক। নিরীক্ষে বলতে গেলে, কেউ স্বচ্ছল, কেউ অস্বচ্ছল। স্বচ্ছল মানুষরা অস্বচ্ছল মানুষদের কাজ দেবে তাদের পাশে দাঁড়াবে এইটা মানবিক। এই মানবিক কাজটি করতে গিয়ে যখন স্বচ্ছল মানুষগুলো তাদের মানবিকতা হারিয়ে অমানবিক হয়ে উঠে তখন আমাদের সবারই টনক নড়ে। বলছিলাম গোটা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য গৃহকর্মীর কথা। যারা আমাদের সবার বাসা বা বাড়িতে কাজ করেন। নিত্যদিন, নিত্যক্ষণ আমাদের সবদিকে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।

একটি পরিবারে বিভিন্ন ধরনের কাজ থাকে। ঘর ঝাড়ু দেয়া থেকে শুধু করে ঘর মোছা, নাস্তা তৈরি করা, কাপড় ধোঁয়া, কাপড় শুকাতে দেয়া, বিছানাপত্র ঠিকঠাক করে পরিষ্কার করা, ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্রে ধুলাবালি মোছা, কাপড় ধোঁয়া ও শুকাতে দেয়া, রান্নার আয়োজন করা, তরিতরকারি কাটা-ধোঁয়া, গরমের মধ্যে দাঁড়িয়ে রান্না করা, খাবারদাবারের আয়োজন করা, থালা-বাসন ধোঁয়া সহ অসংখ্য কাজ থাকে একটি পরিবারে। সেই পরিবারে যদি অল্পবয়সী বাচ্চাকাচ্চা থাকে তবে তো কাজের পুরো ধারায় ব্যাহত হয়। বাচ্চার দেখাশোনার জন্য আলাদা করে একজন লোক প্রয়োজন, যে বা যিনি গোটা সময়টাই তার পিছনে সময় দিবে। এইটা সবক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। তাই একজন গৃহকর্মীকে ঘরগৃহস্থালীর কাজ থেকে শুরু করে বাচ্চাদের দেখাশোনার কাজও করতে হয়।

প্রায়শই আমাদের চোখে পড়ে, বাচ্চাসহ গোটা পরিবারের সকলে বাইরে কোথাও খেতে গিয়েছে গৃহকর্মীটি আলাদা বসে আছেন। এমন না যে সেই পরিবারের আরেকটি খাবার কেন সামর্থ্য নেই। সামর্থ্য থাকলেও সেই পরিবারের সদস্যদের বিবেক নেই। একজন মানুষের মধ্যে যদি ন্যূনতম বিবেক না থাকে তবে তার শিক্ষার আর মূল্য থাকলো কোথায়? বা পরিবারের সেই নারী বা পুরুষটি কিভাবে পারেন একজন বাচ্চাকে অভুক্ত রেখে নিজের বাচ্চাকে খাওয়াতে? এইটা আমার মাথায় কোনোভাবেই আসে না।

অভুক্ত রাখার এই কাজটি কোথাও হয়, কোথাও হয়না। কিছু পরিবার গৃহকর্মীকে আলাদাভাবে দেখেন না। কিন্তু যারা দেখেন তাদের আমরা কী বলবো? বা যেসব পরিবারে ৫ থেকে শুরু করে ১৪/১৫ বছরের বাচ্চাদের কাজের অজুহাতে প্রতিনিয়ত শারীরিক অত্যাচার করা হয় তাদেরকেই আমরা কি বলবো?

শারীরিক দিক এরা সবাই মানুষ। কিন্তু মনের দিক থেকে এদের মধ্যে মানবিক দিক নেই। আর নেই বলেই আরেকজন মানুষকে এইভাবে শারীরিক নির্যাতন করতে পারে। শিল্পী আক্তার, সাথি আক্তার, রত্না, মনি আক্তার, হ্যাপি, সাবিনা, হালিমা আক্তার, আসমাউল, শাওন, আমেনা, কলি এইরকম অসংখ্য অসংখ্য নাম বলে শেষ করা যাবে না, যাদের উপর অমানুষিক বর্বর নির্যাতন চালিয়েছে কিছু ভদ্রবেশি সভ্য লোক। এই ভদ্রলোকগুলোর অর্থ আছে কিন্তু সঠিক শিক্ষা জ্ঞান নেই। নেই সদাচার।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ এর তথ্য থেকে জানা যায়, বাসা বাড়িতে কাজ করা ৮০ শতাংশ শিশু গৃহকর্মীই শারীরিক নির্যাতনের শিকার। ২০১৬ সালে সারাদেশে ৬০টি গৃহকর্মী নির্যাতনের ঘটনায় ৪৭ জন গৃহকর্মী আক্রান্ত হয়। এদের বেশির ভাগেরই বয়স ১৮ বছরের নিচে। এর মধ্যে ২৩টি ঘটনায় আক্রান্ত গৃহকর্মীর বয়স ৫ থেকে ১২ বছরের মধ্যে।

অভাব অনটনে থাকা দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের স্বল্প আয়ের আশায় বাবা মা অল্প বয়সে গৃহকর্মীর কাজে দেন। স্বচ্ছল পরিবারের লোকজন দরিদ্র পরিবারগুলোকে আস্থা দিয়ে নিজেদের কাজের জন্য বাসায় নিয়ে আসেন। সেই আস্থাটা কতটুকু তারা রক্ষা করেন? আমি মাঝে মাঝে ভাবি, যেই স্বচ্ছল পরিবারগুলো আজকে নিজেদের সুবিধার্থে দরিদ্র পরিবারের অল্পবয়সী শিশুদের কাজে আনছেন তারা নিজেরা কি কখনো তাদের সন্তান এইভাবে অনিশ্চিত পরিবেশের মধ্যে কাজে দিবেন? স্বচ্ছল পরিবারের লোকজন কেন ভাবেন না, কোন পরিস্থিতি বা কতটুকু অভাবে পড়লে এইরকম অনিশ্চিত পরিবেশে মানুষ নিজের সন্তানকে গৃহকর্মীর কাজে দেয়?

২.

২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩। পল্লবীর ডিওএইচএস এলাকার ডাস্টবিন। ১১ বছরের একটি কন্যাশিশুকে ডাস্টবিনে ফেলে রাখা হয়েছে। আদুরী তার নাম। মৃতপ্রায় মেয়েটির অবস্থা শোচনীয়। এই মেয়েটির পরিবার অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল নয়। কিছু বাড়তি আয়ের জন্য তাকে ঢাকা শহরে গৃহকর্মীর কাজে দেয় তার পরিবার। পরিণামে মেয়েটিকে অমানুষিক নির্যাতন করে আধমরা অবস্থায় ডাস্টবিনে ফেলে রাখা হয়। এটি দেশব্যাপী আলোচিত একটি ঘটনা। গৃহকর্মীর প্রতি বর্বর নির্যাতনের বর্ণনা শুনে কেঁদে উঠেছিল গোটা দেশ।

ঘটনাটি শোনার পর আমার কী অবস্থা হয়েছিল তা আমি কাউকে বলে বোঝাতে পারবো না। আমার মনে হচ্ছিল আমার হৃদপিণ্ড কেউ বন্ধ করে আমাকে আধমরা অবস্থায় রেখে গেছে। আমি শ্বাস নিতে পারছিলাম না, কান্নায় ফেটে পড়তে পারছিলাম না। আমার প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছিল সেই সময়।

আমি বার বার ভেবেছি, একটা মানুষের বাচ্চার প্রতি কীভাবে এইরকম পাশবিক আচরণ করতে পারে? কীভাবে একটা জলজ্যান্ত মানুষের বাচ্চাকে ডাস্টবিনে ফেলে রাখতে পারে? কতটা পশুত্বের পর্যায়ে নিজেদের নিয়ে গিয়ে এই কাজটা কেউ করতে পারে? তাদের বুক কি একটুও কাঁপেনি?

এ ঘটনায় গৃহকর্ত্রী নওরীন জাহান ও তার মা ইসরাত জাহানকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ঘটনার চার বছর পর অর্থাৎ ২০১৭ সালের ১৮ জুলাই নওরীন জাহানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা জরিমানা করেন আদালত। এখন নওরীন কারাগারে রয়েছেন।

একটি নিষ্পাপ শিশুকে নির্যাতন করার চার বছর পর এর বিচার হল। চার বছর লেগেছে এই ঘটনার বিচার হতে। সূত্রমতে, এরপর আর কোনও ঘটনার বিচার এখন পর্যন্ত হয়নি বলে জানা যায়।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’ এর তথ্যমতে, ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ শিশু গৃহকর্মী দৈনিক নয় ঘণ্টার বেশি সময় কাজ করে। ১২ শতাংশ শিশু গৃহকর্মীর কাজের কোনো নির্দিষ্ট সময় সীমাই নাই। অথচ একজন শিশু গৃহকর্মী মাসে গড়ে এক হাজার ১৮৫ টাকা মজুরি পায়। কেউ কেউ তাও পায় না। তারা ঠিকমতো খাবার-দাবার ও পোশাক-আশাক পায় না।

আমার এবং আমার পরিচিত যেসব বাসায় ছোট বড় গৃহকর্মী কাজ করে বা করতো তারা বেশ ভালো অবস্থানে আছেন। আমার এখনো মনে আছে ছোটবেলায় আমাদের বাসা থেকে গৃহকর্মীরা যেতে চাইতো না। তারা নিজেদের বাড়িতে যাওয়ার সময় প্রচুর কান্না করতো। তাদের কান্না আমাকেও আবেগতাড়িত করেছে ছোটবেলায়। আমার এও মনে আছে, এইসব গৃহকর্মী বয়সে বড় হলেও আমরা তাদের গৃহকর্মী মনেই করতাম না। খেলা-আনন্দে দিন পাড় করতাম। আমার মা এখনো সেইসব গৃহকর্মীদের গল্প বলেন। আমাদের সেইসব স্মৃতিময় দিন এখন অতীত। আমাদের স্মৃতিতে এখনো গৃহকর্মীদের স্মৃতি উজ্জ্বল।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’ এর তথ্য মতে, আমাদের দেশে ছোট-বড় সবমিলিয়ে প্রায় ২০ লক্ষের বেশি গৃহকর্মী কাজ করছে। এদের বেশিরভাগেরই জীবন অরক্ষিত ও বিপন্ন। একধরনের অস্থিতিশীল, অনিরাপদ পরিবেশে গৃহকর্মীরা কাজ করেন। ফলে তাদের শারীরিক-মানসিক নির্যাতন এবং হত্যার ঘটনা বেড়ে চলেছে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত সারাদেশে বিভিন্নভাবে ২৮৬ জন গৃহকর্মী নির্যাতন ও হত্যার শিকার হন। তাদের মধ্যে ১৮৩ জনের বয়স ১৮ বছরের নিচে। ২৮৬টি ঘটনার মধ্যে থানায় মামলা হয় মাত্র ১২২টি। শারীরিক নির্যাতনে ৩২ জন এবং অজ্ঞাত কারণে ১১৭ জন সহ মোট ১৪৯ জন গৃহকর্মীর মৃত্যু হয়।

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় মাহী নামের আট বছরের এক গৃহকর্মীর অমানবিক নির্যাতনের ছবি সংবাদপত্র মারফত সবাই জানতে পারে। এই মেয়েটির ছবি দেখে আমার বার বার নিজের মেয়ের কথা মনে পড়ে। আমি অবাক হয়ে ভাবি, এইভাবে কেউ কারো সন্তানকে নির্যাতন করতে পারে? যে পরিবারে মেয়েটি নির্যাতিত হয়েছে তাদের ছবিও ভালো করে দেখলাম, অনেকক্ষণ সময় নিয়ে দেখলাম। ছবি দেখে পাশবিক মনে হয়নি। তাহলে কেন এতো ক্ষোভ? পরিবারের কর্তা আতাউল্লাহ ও তার স্ত্রী উর্মি আক্তারের সন্তানকে কেউ যদি এইভাবে নির্যাতন করে তাহলে তারা সহ্য করতে পারবে? বাচ্চাদের শরীরে একটু আঁচড় লাগলে বাবা মায়ের অশান্তি চরমে উঠে যায়। তাহলে কেন আরেকজনের সন্তানের উপর পাশবিক নির্যাতন? সেও তো কারো না কারো সন্তান। তার বাবা-মায়ের কেমন লাগছে এই অবস্থা দেখে?

সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ক্রিকেটার, পুলিশ, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী এমন কোনো লোক পাওয়া যাবে না যারা গৃহকর্মী নির্যাতনের তালিকায় নেই। ক্রিকেটার শাহাদাত হোসেন রাজীব ও তার স্ত্রী জেসমিন জাহানের ঘটনার আমাদের সবারই জানা।

৩.

একজন শিশুসন্তানকে জন্ম দিতে একটি পরিবারের, বাবা-মায়ের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়, অনেক ত্যাগ-তিতীক্ষা সহ্য করতে হয়। অনেক সংগ্রাম করে একটি শিশুসন্তানকে জন্ম দিতে হয়, সেই শিশুসন্তানকে যখন বাইরের একজন বর্বরভাবে শারীরিক নির্যাতন করে তখন তাকে কোনোভাবেই ক্ষমা করা যায় না। হোক সে অনেক ক্ষমতাধর, সমাজের নামীদামী কোনো ব্যক্তি।

যদি নিজের সন্তান ভয়ানক দুষ্টুমি করার পরও তাকে আমরা শতবার বোঝাতে পারি পরের সন্তানকে কেন আমরা বোঝাবো না? কেন আমরা মাথায় রাখিনা, যে শিশুটির মাঠে দৌঁড়ে খেলার কথা সে শুধুমাত্র অর্থের কারণে গৃহকর্মীর কাজ করতে এসেছে। অর্থাভাবে পড়ে একটি পরিবার কঠোর হয়ে বুকে পাথর বেঁধে তার সন্তানকে পরের হাতে তুলে দিচ্ছে গৃহকর্মীর কাজ করতে। তার ভালোমন্দ সবকিছুর দেখাশোনার দায়িত্ব আমাদেরই। সেই দায়িত্ব আমরা নিতে না পারলে উচিত গৃহকর্মীকে তার পরিবারের হাতে তুলে দেয়া। তাকে নির্যাতন করার অধিকার আমাদের নেই।

Responses -- “গৃহকর্মীর প্রতি মানবিক হওয়া উচিত”

  1. jisu71

    Dear Writer, Thank you very much for Important article about the inhuman torture on child workers. May Allah bless you. You r absolutely right. There should not be any child labourer as this is the time of going to school. In want of money, their parents send them to work. It is the responsibility of the Government to send all children to school and should stop child labour for ever. Thanks again for knocking at our conscience.

    Reply
  2. লতিফ

    মূল বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে গেলেন। দরকার তো আইন, চুক্তি ছাড়া এসব কাজ একধরণের দাসত্ব। কোন কোন ব্যক্তির মানবিক হওয়া বা না হওয়ার উপর গৃহকর্মীকে কেন নির্ভর করতে হবে? নির্যাতন অথবা দয়া কি প্রবাবিলিটির অংক কষে ঠিক করব? আইন থাকবে, সেই আইনের অধীনে রেজিস্টার্ড কোম্পানী গড়ে উঠবে এবং রেজিস্টার্ড কোম্পানীর কাছ থেকে আপনি গৃহকর্মী পাবেন। কী ধরণের কাজ এবং কত ঘণ্টার কাজ সেটা চুক্তিতে উল্লেখ থাকবে। উভয়ের চুক্তি থাকবে কোম্পানীর সাথে। গৃহকর্মীর বেতন দেবে কোম্পানী, প্রতি দুই সপ্তাহ পরে তাদের ব্যাংক অ্যাকাউণ্টে বেতন জমা হবে। দূর্ঘটনার জন্য ইন্সুরেন্স থাকবে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—