১৯৭১ সালের পঁচিশ মার্চের কালো রাতে বর্বর পাকবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। এর পাশাপাশি ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ঢাকায় ইতিহাসের ঘৃণ্যতম গণহত্যায় মেতে ওঠে। রাত পেরিয়ে  দিনের আলো যখন ফুটে ওঠে তখন দেখা যায় চারিদিকে শুধু গুলি খাওয়া ছিন্নভিন্ন নিথর মৃতদেহ পড়ে আছে। বাতাসে বারুদের উল্লাস আর রক্তের পঁচা গন্ধ। কারো হাত নেই, কারো পা নেই। কারো বা মাথার খুলি উড়ে গেছে। যেখানেই চোখ পড়ে সারা শহরে ছোপ ছোপ রক্তের দাগ। যারা বেঁচে ছিলেন তাদের চোখে মুখে অজানা আতঙ্ক। মৃত্যুর বিভীষিকা ছড়ানো চারিদিক।

নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এবং জীবন বাঁচাতে ঢাকায় বসবাসকারী হাজার হাজার মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে পালাতে শুরু করেন। ঢাকা-সিলেট এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে পাক-বাহিনীর টহল এবং চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় এইসব মানুষ হেঁটে তুলনামূলক নিরাপদ গ্রামের দিকে আসতে শুরু করেন। এমনি বহু মানুষ এসে আশ্রয় নেয় সোনারগাঁয়ের সনমান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি আশ্রয় কেন্দ্রে।

সিরাজুল ইসলাম মাস্টারের নেতৃত্বে ও তৎকালীন সনমান্দী গ্রামের সচেতন যুব সমাজের উদ্যোগে নারী ও শিশুসহ সকল শরণার্থীদের জন্য খাদ্য, পানীয়, নিরাপত্তা এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তীতে সনমান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই আশ্রয় কেন্দ্রটিকে ঘিরেই গড়ে তোলা হয় সোনারগাঁয়ের সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর সমগ্র বাংলাদেশে ‘সংগ্রাম পরিষদ গঠন’ করা হয়। সেদিন অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সনমান্দী গ্রামটি পিছিয়ে থাকলেও এই গ্রামের তরুণ ও যুব সমাজ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ডাকে সাড়া দিতে এতটুকু কার্পণ্য বোধ করেনি। বরং তারা বীরত্বের নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে। মহান নেতার আহ্বানে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে অভাগিনী বাংলা মায়ের মান ও সম্ভ্রম রক্ষায় তারা এক একজন অসম্ভব সক্রিয়, চিরজাগ্রত অতন্দ্র প্রহরী হয়ে ওঠে।

১৯৭১ সালের মধ্য এপ্রিলে সনমান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘সনমান্দী গ্রাম সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের উদ্দেশ্যে গ্রাম পঞ্চায়েতের এক সভা আহ্বান করা হয়। সেদিন শুধু প্রাণের ভয়ে প্রবীণ পঞ্চায়েত প্রধানদের অনেকেই সংগ্রাম পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব নিতে অপারগতা এবং অক্ষমতা প্রকাশ করেন। সেই সময় এগিয়ে আসেন অস্ত্র চালনায় অভিজ্ঞ ও অস্ত্র প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত অকুতোভয় এক সৈনিক আবুল হাসেম মোল্লা। তিনি আগে পুলিশ বাহিনীর হাবিলদার ছিলেন এবং পরে সোনারগাঁ সাব-রেজিস্ট্রেশন অফিসের দলিল লেখক হিসেবে কাজ করতেন।

গোপালগঞ্জসহ বৃহত্তর ফরিদপুর ও শরিয়তপুরের ডামুড্যায় পুলিশ বাহিনীতে হাবিলদার পদে চাকরির সূত্রে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তিনি বিশেষ পরিচিত ছিলেন। সে যাই হোক সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আসা হাসেম মোল্লাকে সনমান্দী গ্রামসংগ্রাম পরিষদের সভাপতি এবং শ্রমিক নেতা নেওয়াজ আলীকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়।

পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে স্শস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের পর সোনারগাঁ থানার তৎকালীন সংগ্রাম পরিষদের নির্দেশে কৃষক, শ্রমিক, যুবক, ছাত্র ও শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের ৭ জুন সোনারগাঁ থেকে প্রথম মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে যায়। প্রশিক্ষণ শেষে সোনারগাঁ থানা কমান্ডার আ. মালেকের নেতৃত্বে ১১ জনের একটি দল ৬ অগাস্ট রাতে সনমান্দী গ্রামে ফিরে আসে। সেই সময় নারায়ণগঞ্জ মহকুমার বৈদ্যের বাজার থানার অন্তর্গত সনমান্দী গ্রাম ছিল প্রায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও আদর্শ স্থান।

সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন এলাকার অনেক ছাত্র, কৃষক, যুবক ও তরুণ ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে প্রাণপণে চেষ্টা চালায়। পাক বাহিনীর কড়াকড়ির জন্য সীমান্ত পেরোতে না পেরে, অনেকেই আবার সোনারগাঁয়ে ফিরে আসেন। এরই মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ভারতে যাওয়া কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ভারত থেকে অস্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে  সোনারগাঁয়ে ফেরত আসে।

ভারত ফেরত এই মুক্তিযোদ্ধাদের পরামর্শক্রমে সংগ্রাম পরিষদের সার্বিক সহযোগিতায় সনমান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২নং সেক্টর কমান্ডার মেজর এটিএম হায়দার এর অনুমোদনক্রমে,  ৬ দফা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও সোনারগাঁ থানা সংগ্রাম কমিটির সমন্বয়ক সুলতান আহমেদ মোল্লা বাদশা ৩১ অগাস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি উদ্বোধন করেন।

মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতায় ছিলেন থানা কমান্ডার আ. মালেক। উপদেষ্টা ছিলেন সুলতান আহমেদ মোল্লা (বাদশা) এবং কেন্দ্র প্রধান (ইনচার্জ) হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন মো. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ মাস্টার)।

সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে প্রথম পর্যায়ে সনমান্দী গ্রামের মো. সিরাজুল ইসলাম (সিরাজ মাস্টার), খন্দকার আবু জাফর, মোসলেহ উদ্দিন মোল্লা, আবু সাঈদ, নুরুল ইসলাম, খালেক বিন তোরাব, বেলায়েত হোসেন, গোলাম মোস্তফা, সুরুজ মিয়া, আবুল হোসেন, ইলিয়াস, ইজ্জত আলী, বাচ্চু মিয়া (সাজালের কান্দি), আ: আজিজ, মুক্তিযোদ্ধা তাহের আলী প্রমুখ কৃতি সন্তানসহ আরো অনেকে প্রশিক্ষণ নেন।

এ সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ছিলেন আ. মতিন, মোশারফ হোসেন, টুআইসি হাবিবুল্লাহ, রেহাজ আলী, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক (খালেক বিন তোরাব) এবং আ. কাদির।

এখানে থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এসএমজি চালনা এবং হ্যান্ড গ্রেনেড ছুঁড়ে মারা, রাইফেল বা অস্ত্রহাতে ক্রলিং, গেরিলা আক্রমণের বিভিন্ন কৌশল ও পদ্ধতি, গোপনে কীভাবে পাক-বাহিনীর যাতায়াতের খবরাখবর আদানপ্রদান ও গোয়েন্দা নজরদারি শেখানো প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো সনমান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আর প্যারেড পিটি অনুষ্ঠিত হতো বিদ্যালয়ের নিকটবর্তী গাছপালা পরিবেষ্টিত মফিজউদ্দিন কারির নির্জন বাগান বাড়িতে এবং দেওয়ানজির ভিটা যেখানে বর্তমানে সনমান্দী হাছান খান উচ্চ বিদ্যালয়ের অবস্থিত ঠিক সেখানে। ২০০ জনেরও বেশি মুক্তিযোদ্ধাকে এই কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সেই সময় সাজালের কান্দি গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা বাচ্চুর মিয়ার একটি মোটর সাইকেল ছিল। এই মোটর সাইকেলটিকে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মুক্তিযোদ্ধারা একস্থান থেকে অন্যস্থান যাতায়াত ও দ্রুত খবর দেয়া-নেয়ার কাজে লাগাতেন।

অগাস্টের শেষ সপ্তাহে খালেক বিন তোরাব, নুরুল ইসলাম, সুরুজ মিয়াসহ ২৭ জনের একটি মুক্তিযোদ্ধার দল ভারত থেকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়ে সনমান্দী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এই কেন্দ্র থেকে মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষণ নিয়ে বর্বর হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে চিলারবাগ, আনন্দবাজারের দক্ষিনে মেঘনা নদী তীরবর্তী রানদির খাল যুদ্ধ, লাঙ্গলবন্ধসহ সোনারগাঁগায়ের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে তোলে ও অসংখ্য সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। চিলারবাগে পর পর তিনটি যুদ্ধ হয়। পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উৎযাপনের প্রাক্কালে ১৪ অগাস্ট চিলারবাগ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা অ্যান্টি ট্যাংক মাইন স্থাপন করে পাকিস্তানি সেনা বহনকারী জিপ উড়িয়ে দেয়। পাক-হানাদার বাহিনী সোনারগাঁয়ের পরপর কয়েকটি যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পরাস্ত, পর্যুদস্ত, আহত-নিহত এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির স্বীকার হয়।

ধারণা করা হয়, পাকিস্তান সরকারের পরিবার পরিকল্পনামন্ত্রী এএসএম সোলায়মানের মাধ্যমে হানাদার বাহিনী জানতে পারে সনমান্দী গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি ও মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরের ভোরের সূর্য ওঠার আগেই সনমান্দী গ্রামকে দক্ষিণ-পূর্ব এবং উত্তর এই তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলে। তখন ছিল বর্ষাকাল। বড় বড় ৪০/৪৫ টি নৌকা থেকে এক যোগে সনমান্দী গ্রামের উপর শুরু হয় বৃষ্টির মতো নির্বিচারে গুলিবর্ষণ ও মর্টারের শেল নিক্ষেপ। অতর্কিত এই আক্রমণ স্বত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কিন্ত এক সময় অপ্রতুল অস্ত্র ও  পর্যাপ্ত গোলাবারুদের অভাবে পাকিবাহিনীর অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের কাছে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে।

 

এরপর হানাদারের বাহিনী সনমান্দী গ্রামে প্রবেশ করে। এরই মধ্যে ঝড়ে যায় নারী শিশুসহ ১০টি তাজা প্রাণ। গুলিতে শহীদ হন এই দশ জন। আহত হন দুইশ’ এরও বেশি মানুষ। আত্মরক্ষার্থে শত শত গ্রামবাসী যে যার মতো দ্রুত পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কেউ কেউ মাথার উপর কচুরিপানা দিয়ে লুকিয়ে পানিতে ভাসতে ভাসতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে থাকেন। জীবন বাঁচানোর জন্য কেউ কেউ আবার সনমান্দী কবরস্থান কেউবা আশেপাশের গ্রামে আশ্রয় নেন। পাকি-বাহিনী সনমান্দী গ্রামে ইয়াহিয়া ও টিক্কা খানের পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করে। গান পাউডার দিয়ে পুরো গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়। ৩৯টি বাড়িঘর পাকবাহিনীর দেওয়া আগুনে সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়। আহত কয়েকজন এখনো শরীরে সেই সম্মুখযুদ্ধের ক্ষত ও বুলেট নিয়ে বেঁচে আছেন।

নারী, বৃদ্ধ এমন কী মায়ের কোলে থাকা নিষ্পাপ শিশু পর্যন্ত সেদিনের পাক সেনাদের নির্মম বর্বরতা ও গণহত্যা থেকে রেহাই পায়নি। তাই ভয়াল ২৯ সেপ্টেম্বর এলে সনমান্দী গ্রামের আকাশ বাতাস নিষ্ঠুর নির্মমতা ও নির্বিচারে গণহত্যার বেদনায় ভারি হয়ে ওঠে। স্বজন হারানো প্রিয়জনদের চোখে অশ্রু জমে।

এই দিনটিকে স্থানীয়ভাবে গ্রামের মুক্তিযোদ্ধারা শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল এবং আলোচনা সভার আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালন করে থাকে। ভয়াল ২৯ সেপ্টেম্বরের প্রক্কালে সোনারগাঁবাসীদের পক্ষ থেকে সনমান্দী গ্রামের সেইসব শহীদ ও সোনারগাঁয়ের সকল মুক্তিযোদ্ধাকে জানাই সশ্রদ্ধ সালাম।

সীমিত পরিসরে সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ৭১ স্মৃতি সংরক্ষণ সংসদের উদ্যোগে ও আমন্ত্রণে ২০১০ সালে ৩০ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি মো. গোলাম রাব্বানী সনমান্দী গ্রামের ১০ জন শহিদের নাম সম্বলিত ‘একটি শহীদ স্মৃতি ফলক’ উন্মোচন করেন। এই শহীদ স্মৃতি ফলকটি পরে সনমান্দী হাছান খান উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে স্থাপন করা হয়।

সনমান্দী হাসান খান উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপিত শহীদ স্মৃতিফলক

ভয়াল ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে বর্বর পাক বাহিনীর নির্মম গণহত্যার শিকার ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী সনমান্দী গ্রামের অধিবাসীরা হলেন- ফজলুল করিম, নুরুল ইসলাম, ছমিরউদ্দিন প্রধান, তাহেরুন নেছা, সাবিলা আক্তার, আনোয়ারুল হক, ফারুক মিয়া, মমতাজ আক্তার, আমির আলী এবং মনোয়ারা আক্তার।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় মাত্র হাতে গোনা দু’একটি স্থানে এই ধরনের মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছিল। তাই বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ২০১২ সালে সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও সনমান্দী গ্রামের গণহত্যা নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করে এবং একাধিকবার তা প্রচার করে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে, দেশবাসীসহ সোনারগাঁয়ের জনমানুষ, নতুন প্রজন্ম, এমন কি জাতীয় ও স্থানীয় পত্র-পত্রিকা ও সাংবাদিকদের কাছে এই গণহত্যার ইতিহাস এখনো অবহেলিত, অজানা এবং অপ্রকাশিত রয়ে গেছে।

সনমান্দী গ্রামে গণহত্যায় নিহত ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার পরিজন, আত্মীয়-স্বজন এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আলাপ করে জানা যায় যে, স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের সাক্ষী ও যুদ্ধের গভীর ক্ষত বুকে বহনকারী সনমান্দী গ্রামে সরকারিভাবে এখনো কোনও বিজয় স্মৃতিস্তম্ভ বা শহীদ স্মৃতিফলক স্থাপিত হয় নাই। তাদের দাবি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সংরক্ষণ, নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ, মেধা ও মননে দেশপ্রেমকে শানিত করতে হলে অবশ্যই সনমান্দী গ্রামে একটি শহীদ স্মৃতি স্তম্ভ এবং গ্রামের প্রবেশ পথে স্বাগতম সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র লেখা খচিত বিজয় তোরণ নির্মাণ খুবই জরুরী। তা না হলে হয়তো অবহেলা ও অনাদরে একদিন বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে পারে সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও ভয়াল ২৯ সেপ্টেম্বরের গণহত্যার ইতিহাস।

তবে আশার কথা এই যে, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নির্দেশে আওয়ামী লীগ সরকার এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগ হাতে নিয়েছে। বিটিভিতে প্রচারসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি ও সোনারগাঁয়ের সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকার স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে সোনারগাঁ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সহযোগিতায় উপজেলা প্রশাসন সনমান্দী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠের পূর্ব অংশে সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে  দৃষ্টি নন্দন ‘বিজয় স্তম্ভ ও শহীদস্মৃতি কমপেক্স’ নির্মাণের প্রয়োজনীয় জরিপ কাজ শেষ করেছে।

আশা করি সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয়  আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিত করে সনমান্দী মুক্তিযোদ্ধা উপ-প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বিজয় স্মৃতিস্তম্ভ বা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের মাধ্যমে শহীদদের চরম আত্মত্যাগের ইতিহাস চিরস্মরণীয় করে রাখবে।

ছবি কৃতজ্ঞতা: আমাদের মুক্তিযুদ্ধ

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—