কিছুদিন আগে একজন মুক্তিযোদ্ধার সঙ্গে কথা হচ্ছিল উনি একজন আওয়ামী লীগ নেতাও। কথা প্রসঙ্গে উনি জানালেন খুনিরা নাকি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে চায়নি, পরিস্থিতির আকস্মিকতায় এটা ঘটেছে। যারা মনে এমন ধারণা পোষণ করে তারা বোকার স্বর্গেই বাস করেন। এখন পর্যন্ত সকল পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে যা পাওয়া যায়, তাতে এটা স্ফটিকস্বচ্ছ যে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড ছিল পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে।

এখানে জড়িত ছিল আমলা, কুচক্রী রাজনীতিবিদ, সামরিক আমলা, অসাধু ব্যবসায়ী, আর জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। এর বহু প্রমাণ খুঁজে পাওয়া যাবে। এখানে চীনের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে তার কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তারা সমর্থন দেয়নি। চীনের মতো একটা পরাশক্তির জন্য এটা ছিল আত্মসম্মানের উপর মারাত্মক আঘাত যে বাংলাদেশ তাদের বিরোধিতা সত্ত্বেও স্বাধীন হয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে, পাকিস্তানকে অস্ত্র সাহায্য দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের চীনের সঙ্গে দ্বৈত নীতির কারণে মারাত্মক বিরোধ থাকলেও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলার সময়ে তাদের যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিরোধিতায়। আরও অনেক কারণ ও উদাহরণ আছে যা একটা নিবন্ধে পুরোপুরি উল্লেখ করে সম্ভব না।

আমরা সচরাচর বলে থাকি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড। আসলে কী এটা শুধু বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ছিল? আমার তা মনে হয় না, এই হত্যাকাণ্ড ছিল একটা শিশু রাষ্ট্রের নীতি আদর্শকে তথা বঙ্গবন্ধুর নীতি আদর্শকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে। এই হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল প্রগতিশীল বাংলাদেশকে হত্যা করে প্রতিক্রিয়াশীল বাংলাদেশ গঠনের উদ্দেশ্য। পাকিস্তানি আদলে একটা দেশ তৈরির উদ্দেশ্য। মূলত মুজিব দর্শন এবং বাংলাদেশকে হত্যার উদ্দেশ্যেই সেদিনের হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল। যেখানে প্রাণ দিয়েছিলেন প্রায় ২৫/২৬জন। মোটকথা যারা বেঁচে থাকলে বঙ্গবন্ধুর নীতি আদর্শকে দাবিয়ে রাখা যেত না তাদের কাউকেই সেদিন ছাড় দেয়নি খুনিচক্র এবং হত্যা পরিকল্পনাকারীরা।

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী লিখেছেন, “বঙ্গবন্ধু বললেন: বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয়ায় ভারত উপমহাদেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এই বাস্তবতা নিক্সন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন মেনে নিতে পারছেনা। তারা চেয়েছিল পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে মিলিতভাবে তারা ভারত মহাসাগরে নৌঘাঁটি স্থাপন ও ভারতে সোভিয়েত প্রভাব হ্রাসে ব্যবহার করবে। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন মিলিত ভাবে বাংলাদেশকে স্বাধীনতা লাভে সাহায্য করায় তাদের এই পরিকল্পনা ভণ্ডুল হয়ে গেছে। পাকিস্তানের সাথে জয় লাভ করায় ভারত এশিয়ার সাব-সুপার পাওয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। এটা আমেরিকা চীন কারোরই মনঃপূত না। পরাজিত ও দুর্বল পাকিস্তানকে দিয়ে ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব নয়। এজন্য চীনকে সঙ্গে টানা হয়েছে। অন্যদিকে ভারতের অভ্যন্তরে ডানপন্থী ও সাম্প্রদায়িক দলগুলোকে সাহায্য জুগিয়ে ইন্দিরা সরকারকে অপসারণের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।” [তথ্যসূত্রঃ ইতিহাসের রক্ত পলাশ : পনেরই আগস্ট পঁচাত্তর – আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী]

বঙ্গবন্ধুর কথা থেকে বোঝা যায় উনি নিজেও জানতেন উনার সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত চলছে। জার্মানির ফুর্থে জন্মগ্রহনকারি পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার তো লেগেই ছিল। এই নরকের কীটটা এখন আবার জার্মানির ফুর্থেই থাকে বলে জানি। ঠিক আমার পাশের শহরে অর্থাৎ নুরেনবার্গের পাশে।

১০ অগাস্ট এক বক্তৃতায় শাহরিয়ার কবির বলেছেন, “বঙ্গবন্ধুর চেতনা বলতে আমরা বুঝি তাঁর চার নীতিকে। আর এই চেতনার জন্যই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। কারণ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা না করলে ইতিহাস থেকে তাঁর চেতনাকে মুছে ফেলা যেত না, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও মুছে ফেলা যেত না। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার শুরু করেছিলেন সে বিচার বন্ধ করা যেত না এবং বঙ্গবন্ধুকে হত্যা না করলে তো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রতিশোধ নেয়া যেত না।”

“দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে যখন বঙ্গবন্ধু সংবিধান প্রণয়ন করেন তখন জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা এই চারটি মূলনীতি ছিল। এই চারনীতি নিয়ে বঙ্গবন্ধু অসংখ্যবার বলেছেন, আমরা শুধু একটি ভূখণ্ড বা পতাকার জন্য যুদ্ধ করিনি বরং কতগুলো মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করার জন্য যুদ্ধ করেছি।”

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করে স্বদেশে পথে দিল্লীতে যাত্রা বিরতিকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুর সম্মানে এক বিশাল গণসংবর্ধনার আয়োজন করেছিলেন। এই সংবর্ধনা সভায় বঙ্গবন্ধু এবং ইন্দিরা গান্ধী- উভয়ের বক্তব্য ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। সংক্ষিপ্ত এক বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহান বন্ধু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ভারতীয় জনগণের উদ্দেশে বলেছিলেন- আমি আপনাদের তিনটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আমার প্রথম প্রতিশ্রুতি ছিল, বাংলাদেশের শরণার্থীদের আমি সসম্মানে ফেরত পাঠাব। আমার দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতি ছিল, বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীকে আমি সবরকম সহযোগিতা করব। আমার তৃতীয় প্রতিশ্রুতি ছিল শেখ মুজিবকে আমি পাকিস্তানের কারাগার থেকে বের করে আনব। আমি আমার তিনটি প্রতিশ্রুতিই পূরণ করেছি। শেখ সাহেব তাঁর দেশের জনগণকে একটিই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন- তিনি তাদের স্বাধীনতা এনে দেবেন। তিনি তাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। জবাবে বঙ্গবন্ধু তার বক্তব্যে বলেছিলেন, আমাকে বলা হয়েছে ভারতের সঙ্গে আপনার কিসের এতো মিল? আমি বলেছি ভারতের সঙ্গে আমার মিল হচ্ছে নীতির মিল। আমি বিশ্বাস করি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতায়। শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীও তাই বিশ্বাস করেন। আমাদের এই মিল হচ্ছে আদর্শের মিল, বিশ্বশান্তির জন্য।

সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতি সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু একই দিনে দেশে ফিরে রমনার বিশাল জনসমুদ্রে আবারও বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে আর তার ভিত্তি বিশেষ কোনও ধর্মীয়ভিত্তিক হবে না। রাষ্ট্রের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা।’ এদিন তিনি তার ভাষণে ধর্ম নিরপেক্ষতার ওপর বেশি জোর দেন।

৭২-এর সংবিধানে ধর্মের নামে রাজনৈতিক দল গঠন নিষিদ্ধ করা হয়েছিল কিন্তু ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ধর্মপালন ও প্রচারের অবাধ স্বাধীনতা ছিল। বাংলাদেশের মতো অনগ্রসর মুসলমানপ্রধান দেশের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক আদর্শের এই স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে ছিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ।

বঙ্গবন্ধুর এই নীতি আদর্শ ভারতের সঙ্গে তাঁর আদর্শিক মিল ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সব কিছুই সেদিন বঙ্গবন্ধুর শত্রুদেরকে তটস্থ করে তুলেছিল। আর এই নীতি আদর্শই কাল হয়ে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু ডেকে এনেছিল। সেদিন থেকেই আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় ষড়যন্ত্রকারীরা তৎপর হয়ে উঠেছিল। বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষ নীতি অবলম্বন করায় মধ্যপ্রাচ্য বঙ্গবন্ধুর উপর ক্ষেপে ছিল।  যেহেতু মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে পাকিস্তানের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল সে ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর হত্যার পেছনে তাদের সংশ্লিষ্টতা অস্বাভাবিক না। তুরস্কও বঙ্গবন্ধুর বিপক্ষে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রচারনা চালিয়ে পাকিস্তানকে সাহায্য করেছে। ১৯৭১ এ পাকিস্তানকে অস্ত্র সাহায্য দিয়েছে তুরস্ক। বর্তমান অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের স্মৃতি অম্লান বইয়ে সে ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে। তুরস্কের বর্তমান কার্যকলাপও লজ্জাজনকভাবে বাংলাদেশের বিপক্ষে।

তারা জানত বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রেখে কোনওভাবেই তার আদর্শকে দমন করা যাবে না এই কারণেই তাদের উদ্দেশ্য ছিল সুনির্দিষ্টভাবে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা এবং পরবর্তীতে যারা তার নীতি আদর্শকে বাস্তবায়ন করতে পারে এরকম সবাইকেই দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং সেই কাজটাই সুচারুভাবে করেছে আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় খুনি চক্র মিলে।

আমার এই মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু হয়ত বলবেন বেগম ফজিলাতুন্নেছাকে মেরে তাদের কী লাভ ছিল! ঘাতকদের তালিকায় বঙ্গবন্ধুর পরেই উনার নামটা ছিল। কারণ বেগম মুজিব শুধু একজন গৃহবধূ ছিলেন না রাজনীতিতে যথেষ্ট পরিপক্ক ছিলেন, বঙ্গবন্ধু যখন জেলে ছিলেন তখন বিভিন্ন সময় উনি দলীয় নেতাদের সঙ্গে বসে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন এর প্রমাণ মেলে একটা ভিডিওচিত্রে। যারা ডেভিড ফ্রস্টের সঙ্গে আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারটা দেখেছেন তারা দেখে থাকবেন প্রমাণটা।

৮ অগাস্ট ২০১৭ সালে বঙ্গজননী শেখ ফজিলাতুন্নেছার জন্মদিনে স্মৃতিচারণে তাঁর সুযোগ্য কন্যা বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের মতো সাথী পেয়েছিলেন বলেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার সংগ্রাম আর মুক্তিযুদ্ধে সফল হতে পেরেছিলেন। তিনি বলেন, শেখ ফজিলাতুন্নেসা এতসব অবদান জানতে পেরেই সম্ভবত ঘাতকরা তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল।”

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভয়েস অব আমেরিকার সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে বলেন, ৬ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ৭ই মার্চ বক্তৃতার বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছিলেন।  বঙ্গবন্ধু যখন এক তরফা স্বাধীনতার ঘোষণা (Unilateral Declaration of Independence) এর ধারণাটা পরিবারের সদস্যদের সামনে উপস্থাপন করলেন, তখন মহীয়সী বেগম ফজিলাতুন্নেসা বললেন, ‘না, এটা তুমি করতে পারবে না। ছয় দফার মধ্যে দিয়ে তুমি বাঙালি হৃদয়ে যে স্থায়ী আসন বানিয়েছ, তোমার এ ঘোষণা তাদের কি ক্ষতির সম্মুখীন করবে-ভেবে দেখেছ? পাকিস্তানি আর্মি ওঁৎ পেতে বসে আছে তোমার এ ঘোষণার জন্য। ওরা এক তরফা স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে তোমাকে তো মারবেই, তোমার প্রিয় বাঙালি জাতিকেও  শেষ করে দেবে।’

বেগম মুজিবের কথা শুনে বঙ্গবন্ধু নাকি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে পাইপ ধরালেন। তখনই তিনি একতরফা স্বাধীনতার ঘোষণার ধারণা থেকে সরে এলেন। ভয়েস অব আমেরিকার সাথে শেখ হাসিনার সেদিনের স্মৃতিচারণা থেকে এ বিষয়টি নতুন করে বেরিয়ে এসেছে।

বেগম মুজিব না থাকলে শেখ মুজিব আজকের ‘মহামানব মুজিব’ হয়ে উঠতেন কি না, সন্দেহ। বেগম মুজিবের অনেক সিদ্ধান্ত বঙ্গবন্ধু বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিতেন। রাজনীতিবিদের সঙ্গে সংসার করতে করতে তিনি নিজেও পাকা রাজনীতিবিদ হয়ে উঠেছিলেন। এজন্যই ১৫ অগাস্ট উনাকে জীবন দিতে হয়েছে।

মোট কথা সেদিন যাঁদেরকে হত্যা করা হয়েছে প্রায় প্রত্যেকেই খুনিদের তালিকায় ছিলেন দু’একজন ছাড়া।  যাঁদের সেদিন খুন করা হয়েছে এরা বেঁচে থাকলে পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর নীতি আদর্শ নিয়ে কাজ করতে পারত এইজন্যই তাদেরকে বাঁচতে দেয়া হয়নি। বঙ্গবন্ধুর ভাই বলেছিলেন, “আমাকে কেন মারবেন আমি তো রাজনীতি করি না আমি ব্যবসা বাণিজ্য করে খাই।” কিন্তু তাঁকেও কোন ছাড় দেওয়া হয়নি, ছাড় দেওয়া হয়নি বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র রাসেলকেও। খুনিদের ভয় ছিল বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও তাঁর বংশধর নিয়ে আর বঙ্গবন্ধুর অনুসারী আত্মীয়-স্বজন এদের নিয়ে। তাঁদের কেউ বেঁচে থাকলে ভবিষ্যতে  সমস্যা হবে। এইজন্য শেখ মনি, আবদুর রব সেরনিয়াবত- কেউই রক্ষা পাননি এমনকি শেখ মনির অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীও না। একই কারণে বঙ্গবন্ধুর দুই অন্তঃসত্ত্বা দুই পুত্রবধূকেও হত্যা করা হয়েছিল সেদিন। কারণ তারা বেঁচে থাকলে ভবিষ্যতে সন্তান প্রসব করলে এই সন্তানেরাও একদিন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে কাজ করবে। এই ভয়েই তারা সেদিন তাঁদেরকে রেহাই দেয়নি যদিও তাঁদের কোন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল না।

চার জাতীয় নেতা এঁরাও খুনিদের তালিকায় প্রথম থেকেই ছিলেন কিন্তু ১৫ অগাস্টে তাদেরকে হত্যা করা হয়নি অন্য কারণে, না হলে তাদেরকেও সেদিন ছাড় দেয়া হতো না। আপনারা ডেভিড ফ্রস্টের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎকারের কথা নিশ্চয় মনে করতে পারেন। সেখানে ডেভিড ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুকে প্রশ্ন করেছিলেন-

ডেভিড ফ্রস্ট: তারা বলে, আপনি জানেন, আপনার মহান ক্ষমতা আছে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবার। আবার সেই পুরানো কথা- ‘ক্ষমতা কলুষিত করে, নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কলুষিত করে নিরঙ্কুশভাবে।‘ আপনি কীভাবে বন্ধ করবেন ক্ষমতার দূষণ?

শেখ মুজিবুর: আপনি জানেন যে যদি ইয়াহিয়ার মত একজন মানুষ দুর্ঘটনাক্রমে ক্ষমতায় আসে সে কলুষিত হতে পারে, কিন্তু যদি একজন মানুষ একটা পদ্ধতির মধ্য দিয়ে, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে, ভোগান্তির মধ্যে দিয়ে, লড়াই/যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসে তাঁকে আপনি যত ক্ষমতায় দেন না কেন সে কলুষিত হবেনা। যতদূর পর্যন্ত আমার দল ও আমি নজরে রেখেছি, আমার সব নেতারা জেল খেটেছে, আমার সব নেতারা তাঁদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে, তাঁদের অনেকেই তাঁদের পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছে। ২৪ বছর পর তাঁরা ক্ষমতা পেয়েছে। তাঁরা যদি নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পায়, দুর্নীতির কোনও সুযোগ সেখানে নেই, কারণ তারা একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসেছে। ইয়াহিয়া খান এবং অন্যান্যদের মত যারা, বর্বর বাহিনী এবং বন্দুকের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, তাদের মত না। আমার জনগোষ্ঠি বন্দুক দিয়ে ক্ষমতায় আসেনি। কিন্তু একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসেছে, একটা সংগ্রামের মাধ্যমে; শুধু তাই না, অনেক কিছু উৎসর্গ/বলিদান করেই তাঁরা স্বাধীনতা অর্জন করেছে এবং তাঁদের দেশের জন্য ও জনগনের জন্য ভালবাসা আছে। আমার নেতাদের উপর এবং আমার দলীয় কর্মীদের উপর আমার আস্থা আছে।

উপরের এই কথাগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসবিদরা মনে না রাখলেও খুনিরা মনে রেখে ছিল এবং তারা জানত যে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ অনুসারীরা তাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।  আপনারা জানেন বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার ২১ জন সদস্য খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিল। চার জাতীয় নেতার ক্ষেত্রে খুনিরা চেষ্টা করেছিল তাদেরকে চাপের মুখে রেখে, ভয় দেখিয়ে লোভ দেখিয়ে মোস্তাকের মন্ত্রিসভায় নিয়ে আসতে বা সে সরকারকে সমর্থন দিতে, কিন্তু তারা সফল হয়নি। তখন হত্যা পরিকল্পনাকারীরা খুনিদের দিয়ে তেসরা নভেম্বর চার জাতীয় নেতাকে জেলের মধ্যে হত্যা করায়।

শুধু চার জাতীয় নেতার মধ্যে নয় বঙ্গবন্ধুর পর হত্যা পরিকল্পনাকারীদের প্রথম লক্ষ্য ছিল তাজউদ্দিন আহমেদ নিচের কথাগুলোতে তার প্রমাণ পাবেনঃ

“১৯৭১ সালে মুজিব ইয়াহিয়ার বৈঠকের রুদ্ধশ্বাস দিনগুলোর কথা। ভুট্টো এসেছেন ঢাকায়। আমরা কজন সাংবাদিক তাঁর সাথে দেখা করার অনুমতি পেয়েছি। আমাদের বেশি কিছু বলতে চাইলেন না। আমাদের উপস্থিতি ভুলে গিয়ে তাঁর এক সহকর্মীকে উর্দুতে বলে উঠলেন: আলোচনা বৈঠকে আমি মুজিবকে ভয় পাইনা। ইমোশনাল অ্যাপ্রোচে মুজিবকে কাবু করা যায়। কিন্তু তাঁর পিছনে ফাইল-বগলে চুপচাপ যে ‘নটোরিয়াস’ লোকটি দাঁড়িয়ে থাকে তাকে কাবু করা শক্ত। দিস তাজউদ্দীন, আই টেল ইউ, উইল মাইট বি ইউর মেইন প্রবলেম।

আমি সঙ্গে সঙ্গে কথাটি নোট বুকে টুকে নিলাম। তখন বুঝতে পারিনি, কথাটি একদিন কত বড় ঐতিহাসিক সত্য হয়ে দাঁড়াবে।” [তথ্যসূত্রঃ ইতিহাসের রক্ত পলাশ : পনেরই আগস্ট পঁচাত্তর – আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী ]

তাজউদ্দীন আহমেদ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর যোগ্য সহযোগী। তিনি ছাড়া বাংলাদেশের সৃষ্টি হত কিনা ভেবে দেখার বিষয়। কিন্তু তিনি কখনই বঙ্গবন্ধুকে ছাড়িয়ে নেতা হতে চাননি। ছায়ার মত বঙ্গবন্ধুর সাথে থেকে কাজ করে গেছেন। তাজউদ্দীন কে পাকিস্তানি শাসকেরাও ভয় পেতেন।

এরপর হত্যা পরিকল্পনাকারীদের পালের গোদা জুলফিকার আলী ভুট্টো তাজউদ্দীন আহমেদকে ভোলেনি। সে তার বাংলাদেশি এবং আন্তর্জাতিক চর দিয়ে প্রতিশোধটা ঠিকই নিয়েছে।

অ্যান্থনি মাসকারেনহাস ১৫ অগাস্ট যারা সরাসরি খুনে অংশ নিয়েছিল তাদের একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন। সেখানে খুনিদের স্বীকারোক্তি এখানে উদ্ধৃত হল-

অ্যান্থনি মাসকারেনহাস: তোমরা মুজিবকে শোধরানোর জন্য চেষ্টা করেছিলে কিনা?

রশিদ: না, আমি কোনও চেষ্টা করিনি। কারণ আমি ছিলাম সেনাবাহিনীর জুনিয়র কর্মকর্তা আমার কোনও সুযোগ ছিল না তাকে সঠিক পথে পরিচালিত হওয়ার কথা বলা।

অ্যান্থনি মাসকারেনহাস: এই পরিস্থিতিতে তুমি কি তাঁকে পদত্যাগ করতে বলতে পারতে না? নাকি এটা খুব জরুরি ছিল তাঁকে হত্যা করা?

রশিদ: তিনি ছিলেন সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু।  তিনি একজন প্রশাসক ছিলেন না। তার চমৎকার ক্ষমতা ছিল জনগণকে নিয়ন্ত্রণে রাখার। তিনি জীবিত থাকলে আমাদের পক্ষে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন হতো। কেননা তিনি ছিলেন অনেক অভিজ্ঞ রাজনীতিক। তিনি যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করতেন না।

অ্যান্থনি মাসকারেনহাস: এই কারণেই কি তোমরা তাঁকে হত্যা কর?

রশিদ: হ্যাঁ, এ কারণেই তাকে হত্যা করি। আমার তাকে মারতেই হত।

আব্দুল গাফফার চৌধুরী লিখেছেন, “মাইকেল বার্নস (বৃটিশ লেবার দলের এম.পি, বঙ্গবন্ধুর বন্ধু ছিলেন) আমাদের জানালেন ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগ একটি সূত্র জানতে পেরেছে জেলে বন্দী তাজউদ্দিন আহমেদসহ জাতীয় নেতাদের হত্যার একটা চেষ্টা চলছে। ব্রিটিশ সরকার সরাসরি এ ব্যাপারে কিছু করতে পারে না। তবে বাংলাদেশের কোন প্রতিনিধিত্ব স্থানীয় নেতা ব্রিটিশ সরকারকে এ ব্যাপারে অনুরোধ জানালে বিষয়টি পার্লামেন্টে উত্থাপন করে জেলে নেতাদের অবস্থা জানার জন্য বাংলাদেশের তৎকালীন সরকারের উপর চাপ দিতে পারে এবং জেলে বন্দি নেতাদের জন্য ব্যবস্থা করতে পারে। এ কথা শোনার পর আমরা ছুটে যাই অক্সফোর্ডে ড. কামাল হোসেনের কাছে। তিনি বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রী ছিলেন এবং ব্রিটেনের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের খুবই পরিচিত। তার কথায় ব্রিটিশ সরকার গুরুত্ব দেবে। কিন্তু কামাল হোসেনের কাছে গিয়ে তাকে সব কথা জানাতেই তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, ‘না, না, এসব গুজবে কান দেবেন না। আমরা এসব কথা বলাবলি করলে ওরা সত্যি সত্যি নেতাদের মেরে ফেলবে।” [তথ্যসূত্রঃ সময় এখন.কম ৩রা জুন ২০১৮।]

এরপরও কী আমার বয়োজ্যেষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু বলবেন যে খুনিরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে চায়নি?

আমি সকল মুক্তিযোদ্ধার প্রতি অনুরোধ রাখবো আপনাদের সবারই ভক্ত গুণগ্রাহী আছে। অতএব আপনারা যখন কিছু বলেন একটু ভেবেচিন্তে বলবেন। তা নাহলে আপনাদের এই মতবাদগুলো সংক্রামিত হতে থাকবে এবং তাতে খুনিদের অপরাধকে লঘু করে দেখা হবে। কিন্তু আমাদের কোনওভাবেই সে সুযোগ নেই।

১৭ Responses -- “ঘাতকরা নাকি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে চায়নি!”

  1. Shamsul Alam

    Had they delete the dream of Sheikh Mujib by killing the full family with Banga Bandhu ? His dream holds all the Bengali’s heart. So Bangla is today full of Mujib.

    Reply
  2. abdullah

    এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের আশিভাগ শিক্ষিতমূর্খের ধারণা বাকশাল একটা স্বৈরাচারি শাসন ব্যবস্থা। তাদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এই বাকশাল জুজু নিয়ে আসেন তাদের বক্তৃতায় বয়ানে। এমনকি বর্তমান শাসনব্যবস্থাকেও অনেকে তুলনা করেন সেই আদলে। আফসোসের ব্যাপার হচ্ছে খোদ আওয়ামী লীগের প্রচুর নেতাকর্মী বাকশাল বলতে আসলে কি বোঝায় তা জানেন না। তারা তাদের প্রতিপক্ষের খোঁচা নিরবে সহ্য করেন এবং মনে মনে রুষ্ট হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপর। কী এক পাপের বোঝা যেন চাপিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

    এই বিভ্রান্তির নেপথ্যে কিছু মুখরোচক উপাদানও আছে। যেমন তাজউদ্দিন আহমেদের একটি উক্তির কথা শোনা যায়, তিনি নাকি বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর বলেছিলেন বাকশালই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু ডেকে এনেছে। কিংবা বঙ্গবন্ধু এই বাকশাল অবলম্বন করার সময় তিনি বুঝেছিলেন বঙ্গবন্ধু তার মৃত্যু ডেকে এনেছেন। কথাটা যদি সত্যিও হয়, তাহলে বলতে হবে তাজউদ্দিন ভুল বলেননি। তবে তার এই উক্তি যে ছলে প্রয়োগ করা হয়, সেভাবেও মোটে কথাটা তিনি বলেননি। আরও আছে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এমএজি ওসমানীর বিখ্যাত উক্তি। তিনি নাকি সংসদে দাড়িয়ে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু আপনি ভুল করছেন। আমি আর আপনার সঙ্গে নেই। ঠিক কেন ওসমানীর এই প্রলাপ, সেটা আমি আসলেই ধরতে পারিনি।

    যা হোক, ফিরে আসি বাকশালে। বঙ্গবন্ধু এটাকে বলেছিলেন দ্বিতীয় বিপ্লব। প্রথম বিপ্লব ছিলো মুক্তিযুদ্ধ। যার বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা। সেটা ছিলো বাঙালীর রাজনৈতিক মুক্তি। আর বাকশাল কর্মসূচী দিয়ে বঙ্গবন্ধু বাঙালীর অর্থনৈতিক মুক্তির সূচনা করতে চেয়েছিলেন। এই অর্থনৈতিক শৃংখলটা বাধা ছিলো বিভিন্ন পরাশক্তি আর দাতা দেশের কাছে। স্বাধীনতার পর তিনটি বছর তিনি সবার দরজায় গেছেন। হাত পেতেছেন। কিন্তু সবার একটাই শর্ত। আমার দালালি করো। আমেরিকা, রাশিয়া, সৌদি আরব, চীন সবার একই শর্ত। বিশ্বব্যাংকের ঋণ, দাতা দেশগুলোর ঋণের সঙ্গে কি শর্ত জুড়ে ছিলো তা আগেই ভিন্ন ভিন্ন আলোচনায় উল্লেখ করেছেন অনেকেই, আমিও করেছি। যুদ্ধবিধস্ত দেশটার উপর প্রকৃতির কেন এত রোষ ছিলো সেটাও এক জিজ্ঞাসা। হয় খরা, নয় বন্যা। দুটোরই অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়া দুর্ভিক্ষ। এটাও ভোলা চলবে না গোটা বিশ্বজুড়ে তখন চলছিলো এক ভয়াবহ আর্থিক মন্দা।

    তার উপর দেশে চলছিলো অন্য এক অরাজকতা। জনগনের মুক্তি, সর্বহারার মুক্তির জন্য চীনপন্থী কমিউনিস্টরা চালাচ্ছিলো তাদের ধারার বৈপ্লবিক কর্মসূচী। সেটার মধ্যে প্রধান ছিলো পাটের গুদামে আগুন দেওয়া। ব্যাংক লুট করা। প্রান্তিক অঞ্চলের পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করে অস্ত্র লুট করা। স্বাধীনতার পর তিন বছরে তখনকার অর্থমানে দুইশো কোটি টাকার পাট পোড়ানো হয়েছে। এই পাট ছিলো বাংলাদেশের একমাত্র অর্থকরী পন্য যা রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতো এই দেশ। ছিলো জাসদ। তারা শ্লোগান দিতো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের। এটা ঠিক কোন বৈজ্ঞানিকদের সমাজতন্ত্র সেটা তারা ঠিকমতো বোঝাতে না পারলেও তাদেরও কাজ ছিলো সর্বহারা পার্টির মতোই। ব্যাংক লুট করো, গুদামে আগুন দাও, দেশ অচল করো। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা শূন্যের নীচে চলে গেলে দেশে সর্বহারার বিপ্লব হবে, তারা সব পয়সাওয়ালাদের মেরেকেটে এই বিপ্লব ঘটাবে। আর তাদের শাসন করবে বিপ্লবী নেতারা। কী সারকাজমিক অর্গাজম!

    বঙ্গবন্ধু ঠিক করলেন এভাবে চলতে পারে না। ন্যামের সদস্য কিউবার কাছে পাট বিক্রি করেছেন। সেটা যুক্তরাষ্ট্র বেয়াদবি হিসেবে নিয়েছে কারণ তাদের চোখে কিউবা কমিউনিস্ট দেশ, অতএব দুই জাহাজ বোঝাই চাল ও খাদ্যশস্য তারা ফিরিয়ে নিয়ে সাগরে ঢেলে দিলো। বঙ্গবন্ধু বুঝলেন স্বনির্ভর হওয়ার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে তিনি সমাজতন্ত্রওয়ালাদেরও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র শেখানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। দ্বিতীয় বিপ্লব হলো সেই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র যার মূল উপাদান গণতন্ত্রের মোড়কে অর্থনৈতিক সমাজতন্ত্র। অর্থাৎ সমবায় পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন হবে, কৃষকরা মিলিতভাবে জমি চাষ করে ফসল ফলাবেন। তাদের নায্য দাম দিয়ে সেই ফসল দেশজুড়ে বিপনন করা হবে।

    বাকশাল কি স্বৈরাচারি শাসন ব্যবস্থা? মোটেই না। এটা ছিলো বহুদলীয় শাসনব্যবস্থা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাংলার মানুষের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে জিতেছিলো আওয়ামী লীগ। সেই নির্বাচিত সাংসদরাই মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং স্বাধীনতার পর স্বাধীন দেশের জাতীয় সংসদে বসেছেন, নতুন সংবিধান দিয়েছেন। এরপর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনেও সংখ্যাগরিষ্ঠ সিট আওয়ামী লীগই পেয়েছে। তখন বিরোধী দল বলতে ছিলো ন্যাপ ভাসানী, ন্যাপ মোজাফফর,বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং জাসদ। ভাসানী নির্বাচনে বিশ্বাস করতেন না। করলে জামানত হারাতেন নিঃসন্দেহে। সত্তরে তিনি যেমন ভোটের আগে ভাত চেয়েছেন। স্বাধীনতার পর করলেন শুধু অনশন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের জন্য অনশন। মুসলিম বাংলা গঠনের জন্য অনশন। আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তার অনশন ছিলো অহরহ। আর জাসদ কি করতো তাতো বলা হয়েছে। আর মুক্তিযুদ্ধ শেষে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিলো বলে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, পিডিপি ছিলো নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল।

    তো স্বনির্ভরতার দ্বিতীয় বিপ্লবে বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন জাতীয় ঐক্যের। ভাসানী ন্যাপ এবং জাসদ প্রত্যাখ্যান করলো তার ডাক। ভাসানী যদিও তার শিষ্য মুজিবকে ডেকে আশীর্বাদ করলেন। তবে দলীয়ভাবে এর বিরুদ্ধে থাকলেন। জাতীয় ঐক্যের ডাকে সাড়া দিলো মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগের মিত্রশক্তি ন্যাপ মুজাফফর এবং সিপিবি। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ মুজাফফর এবং সিপিবির সম্মিলিত রূপ ছিলো বাকশাল। যার পূর্ণাঙ্গ অর্থ বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। এখানে আওয়ামী কথাটা জনতা অর্থে ব্যবহৃত। চার বিরোধী দলের দুটো শাসনতন্ত্রে। আর দুটো বিরুদ্ধ অবস্থানে। স্বৈরাচারি হলো কীভাবে!

    বাকশালের মূল এসেন্স ছিলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ। ছোট ছোট সেলে গোটা দেশকে ভাগ করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু তার এই পরিকল্পনায়। মানুষের শরীর যেমন বিভিন্ন কোষে তৈরি তেমনি বাকশালও। প্রতিটি সেলের মূল ক্ষমতায় কৃষক, শ্রমিক এবং সাধারণ জনতা। প্রশাসক হিসেবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যাদের সহযোগী সেনাসদস্য এবং আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। দেশের প্রতিটি জেলার জন্য একজন করে গভর্নর নির্বাচিত করা হলো। এবং এই গভর্নরদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো বাকশাল কর্মসূচি পরিচালনার জন্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেই গভর্নরদেরই শপথ নেওয়ার কথা ছিলো বঙ্গবন্ধুর কাছে। বাকশাল শুরু হতে পারেনি। বাংলাদেশে কখনও বাকশাল কায়েম করা যায়নি। এটি পরিকল্পনা হিসেবেই ছিল। বাস্তবায়নের আগেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে বাকশালকে অংকুরেই বিনাশ করা হয়।

    বাকশাল, বাংলাদেশ কৃষক স্রমিক আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

    কী ছিল বাকশাল, এ নিয়ে যাদের আগ্রহ তারা তা শুনতে পারেন খোদ বঙ্গবন্ধুর মুখেই। সাক্ষাতকারটি নিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা-সাংবাদিক আবীর আহাদ:

    বঙ্গবন্ধু, আপনার রাজনৈতিক চিন্তাধারার মূলনীতি বা লক্ষ্য কি?

    আমার রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা ধ্যান ও ধারণার উৎস বা মূলনীতিমালা হলো গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এই চার মূলনীতিমালার সমন্বিত কার্যপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি শোষণহীন সমাজ তথা আমার দেশের দীনদুখী শোষিত বঞ্চিত শ্রমজীবি মেহনতী মানবগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকার ও তাদের সমষ্ঠিগত প্রকৃত ‘গণতান্ত্রিক একনায়কতান্ত্রিক’ শাসন প্রতিষ্ঠাকরণই আমার রাজনৈতিক চিন্তাধারার একমাত্র লক্ষ্য।

    বঙ্গবন্ধু, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র কি একযোগে বা পাশাপাশি চলতে পারে?

    যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমাদের দেশে প্রচলিত আছে তাকে সংখ্যালঘু ধনিক শোষকদের গণতন্ত্র বলাই শ্রেয়। এর সাথে সমাজতন্ত্রের বিরোধ দেখা দেয় বৈকি। তবে গণতন্ত্র চিনতে ও বুঝতে আমরা ভুল করি। কারণও অবশ্য আছে। আর তা হলো শোষক সমাজ গণতন্ত্র পূর্ণভাবে বিকাশলাভ করুক তা চায় না। এবং গণতন্ত্রকে কিভাবে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার হাতিয়ারে পরিণত করা যায়- এখানে চলে তারই উদ্যোগ আয়োজন। এভাবেই প্রকৃত গণতন্ত্রকে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। সাধারণ অজ্ঞ জনগণই শুধু নয়- তথাকথিত শিক্ষিত সচেতন মানুষও প্রচলিত আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গণতন্ত্রকে সঠিকভাবে বুঝতে অক্ষম। এরা ভাবে যে ভোটাভুটিই হলো গণতন্ত্র। একটু তলিয়ে দেখে না প্রাপ্তবয়স্ক মোট জনসংখ্যার কত পার্সেন্ট ভোট দিলো, কোন শ্রেনীর লোকেরা নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হলো, কারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলো, ক্ষমতাসীনরা কোন পদ্ধতিতে তাদের শাসন করছে, সাধারণ জনগণ কতোটুকু কি পাচ্ছে। সুতরাং আমি আমার অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি- প্রচলিত গণতন্ত্রের বদৌলতে সমাজের মাত্র ৫% লোকের বা প্রভাবশালী ধনিকশ্রেনীর স্বৈরাচারী শাসন ও বল্গাহীন শোষণকার্য পরিচালনার পথই প্রশস্ত হচ্ছে। অর্থাৎ প্রচলিত গণতন্ত্রের মারপ্যাচে সমাজের নিম্নতম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর শাসন ও প্রভাব প্রতিপত্তি, সর্বপ্রকার দূর্নীতি শোষন অবিচার অত্যাচার ও প্রতারণায় সমাজের সর্ববৃহত্তম অজ্ঞ দুর্বল মেহনতী কৃষক-শ্রমিক সাধারণ মানব গোষ্ঠীর (শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ) মৌলিক মানবাধিকার ও তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব হচ্ছে। তারা বঞ্চিত হচ্ছে।

    প্রকৃত গণতন্ত্র বলতে আমি এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বুঝি, যে ব্যবস্থায় জনগনের বৃহ্ত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের বৃহত্তর কল্যাণের নিমিত্তে তাদের জন্য, তাদের দ্বারা এবং তাদের স্বশ্রেণীভুক্ত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সরকার প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে তাদেরই প্রকৃত শাসন ও আর্থসামাজিক মৌলিক অধিকার সংরক্ষিত হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থা প্রচলিত গণতান্ত্রিক উপায়ে অর্জিত হতে পারে না। কারণ প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজনৈতিক ও আর্থ সামাজিক ক্ষেত্রে চলে অর্থ সম্পদের অবাধ ও মুক্ত প্রতিযোগিতা। এক্ষেত্রে দরিদ্র জনসাধারণের পক্ষে এ জাতীয় আর্থ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়া কোনো প্রকারেই সম্ভব না। একমাত্র সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতিই এদেরকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহনের কার্যকরী নিশ্চয়তা দিতে পারে-তাদের আর্থ সামাজিক মৌলিক মানবাধিকার ও তাদের প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এজন্য আমি মনে করি প্রকৃত গণতন্ত্রের আরেক নাম সমাজতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের মধ্যেই প্রকৃত গণতন্ত্র নিহিত। এজন্যেই আমি গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছি। আমি মনে করি প্রকৃত গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের ভেতর কোনো বিরোধ নেই।

    অনেকে বলেন ‘বাকশাল’ হলো একদলীয় বা আপনার স্বৈরতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার একটি অপকৌশল- এ সম্পর্কে আপনি পরিষ্কার মতামত দিন।

    সাম্রাজ্যবাদের অবশেষ পুঁজিবাদী সমাজসভ্যতা ও শোষক পরজীবিদের দৃষ্টিতে ‘বাকশাল’ তো একদলীয় শাসনব্যবস্থা হবেই। কারণ বাকশাল কর্মসূচীর মধ্যে দিয়ে আমি সাম্রাজ্যবাদের প্রতিনিধি বহুজাতিক পুঁজিবাদী শোষক, তাদের সংস্থা সমূহের লগ্নিকারবার এবং তাদের এদেশীয় সেবাদাস, এজেন্ট, উঠতি ধনিক গোষ্ঠীর একচেটিয়া শোষণ ও অবৈধ প্রভাবপ্রতিপত্তি-দুর্নীতি-প্রতারণার সকল বিষদাঁত ভেঙ্গে দেবার ব্যবস্থা করেছি। এজন্য তাদের আঁতে ঘাঁ লেগেছে, বাকশাল ও আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করে বেড়াচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদীশক্তি শাসকরা এদেশে গোপনে অর্থ যোগান দিয়ে তাদের সেবাদাস ও এজেন্টদের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক কার্যক্রমকে বানচাল করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তারা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, সভাসমিতি এমনকি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে আমার সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে। কল-কারখানা, অফিস-আদালত, শিল্প-প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন থানায় তাদের ভাড়াটে চরদের দিয়ে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, গণহত্যা, অসামাজিক কার্যকলাপ ও সাম্প্রদায়িক তৎপরতা চালাচ্ছে। প্রতিদিন তাদের ষড়যন্ত্রের খবরা-খবর আমার কানে আসছে।

    প্রচলিত গনতান্ত্রিক বৈষম্য, শোষণ-দূর্নীতিভিত্তিক সমাজকে, দেউলিয়া আর্থসামাজিক ব্যবস্থা, জরাজীর্ণ প্রশাসন ও অবিচারমূলক বিচার ব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটিত করে একটি শোষণহীন, দূর্নীতিহীন, বৈষম্যহীন ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক সাম্যবাদী সমাজ বিপ্লবের পথ রচনা করেছি। এই সমাজ বিপ্লবে যারা বিশ্বাসী নন, তারাই বাকশাল ব্যবস্থাকে একদলীয় স্বৈরশাসন ব্যবস্থা বলে অপপ্রচার করছেন। কিন্তু আমি এ সকল বিরুদ্ধবাদীদের বলি, এতোকাল তোমরা মুষ্ঠিমেয় লোক, আমার ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ দুখী মেহনতী মানুষকে শাসন ও শোষণ করে আসছো। তোমাদের বল্গাহীন স্বাধীনতা ও সীমাহীন দূর্নীতির মধ্য দিয়ে ব্যক্তিসম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার অবাধ ও মুক্ত প্রতিযোগিতার হোলিখেলায় আমার দুখীমানুষের সব আশা-আকাংখা-স্বপ্ন-সাধ ধুলায় মিশে গেছে। দুখী মানুষের ক্ষুধার জ্বালা ব্যথা বেদনা, হতাশা-ক্রন্দন তোমাদের পাষাণ হৃদয়কে একটুও গলাতে পারেনি। বাংলার যে স্বাধীনতা তোমরা ভোগ করছো, এই স্বাধীনতা, এই দেশ, এই মাটি ঐ আমার দুখী মেহনতী মানুষের সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা, আন্দোলন সংগ্রাম এবং জীবন মৃত্যুর বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে তোমাদের অবদান কতটুকু আছে, নিজেদের বুকে একবার হাত দিয়ে চিন্তা করে দেখো। বরং অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছো। বিদেশী শাসক-শোষকদের সহায়তা করেছো। নিজের ঘরে থেকে ভাইয়ের ঘর পুড়িয়েছো, মানুষকে হত্যা করেছো। মা-বোনদের লাঞ্ছিত করেছো, আরো কি না করেছো! এসবই করেছো ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের ঘৃন্য লক্ষ্যে।

    আমার দেশের মাত্র ৫ পার্সেন্ট লোক ৯৫ পার্সেন্ট লোককে দাবিয়ে রাখছে, শাসন-শোষণ করছে। বাকশাল করে আমি ওই ৯৫ ভাগ মানুষের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক শাসন ও অর্থনৈতিক মুক্তির ব্যবস্থা করেছি। এতকাল মাত্র ৫ ভাগ শাসন করেছে, এখন থেকে করবে ৯৫ ভাগ। ৯৫ ভাগ মানুষের সুখ-দুঃখের সাথে ৫ ভাগকে মিশতে হবে। আমি মেশাবোই। এজন্য বাকশাল করেছি। এই ৯৫ ভাগ মানুষকে সংঘবদ্ধ করেছি তাদের পেশার নামে, তাদের বৃহত্তর কল্যাণে, তাদের একক দল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশালে। মূলত বাকশাল হচ্ছে বাঙালীর সর্বশ্রেণী সর্বস্তরের গণমানুষের একক জাতীয় প্লাটফর্ম, রাজনৈতিক সংস্থা, একদল নয়। এখানে স্বৈরশাসনেরও কোনো সুযোগ নেই। কারণ বাঙালী জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত বা সমষ্ঠিগত শাসন ব্যবস্থায় কে কার উপর স্বৈরশাসন চালাবে? প্রত্যেক পেশার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে শাসন পরিষদ গঠন করা হবে। কোনো পেশা বা শ্রেণী অন্য পেশার লোকদের ওপর খবরদারী করতে পারবে না। যে কেউ যিনি জনগনের সার্বিক কল্যাণের রাজনীতিতে তথা সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তিনি এই জাতীয় দলে ভিড়তে পারবেন।

    যারা বাকশালকে একদলীয় ব্যবস্থা বলেন, তাদের স্মরণ করতে বলি, ইসলামে ক’টি দল ছিলো? ইসলামী ব্যবস্থায় একটি মাত্র দলের অস্তিত্ব ছিলো, আর তা হলো খেলাফত তথা খেলাফতে রাশেদীন। মার্কসবাদও একটি মাত্র দলের অনুমোদন দিয়েছে। চীন, রাশিয়া, কিউবা, ভিয়েতনাম কিংবা অন্যান্য ইসলামী রাষ্ট্রে কতটি করে দল আছে? এইসব ইসলামী রাষ্ট্রসমূহকে বাদ দাও, ওখানে মহানবীর ইসলাম নেই। বস্তুত প্রকৃত গণতন্ত্র বা সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই একটি একক জাতীয় রাজনৈতিক সংস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়। একটি জাতীয় কল্যাণের অভিন্ন আদর্শে, ব্যাপক মানুষের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে একটি মাত্র রাজনৈতিক সংস্থার পতাকাতলে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। কিন্তু বহুদলীয় তথাকথিত গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় কোনোভাবেই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব নয়। সেখানে বহুদলে জনগণ বহুধা বিভক্ত হতে বাধ্য। আর বিচ্ছিন্ন, বিভক্ত, পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক দলের দ্বন্দ্বসংঘাত, হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানির রাজনীতি দিয়ে জাতির বৃহত্তর কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কোনোভাবেই অর্জিত হতে পারে না। ইতিহাস সে সাক্ষ্য দেয় না। আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও তাই বলে।

    বাকশাল, বাংলাদেশ কৃষক স্রমিক আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

    বঙ্গবন্ধু, বাকশালের মূল লক্ষ্য বা এর কর্মসূচী সম্পর্কে কিছু বলুন…

    বাকশালের মূল লক্ষ্য তো আগেই বিশ্লেষণ করেছি। তবে এক কথায় আমি যা বুঝি তা হলো একটি শোষণহীন, দূর্নীতিমুক্ত সমাজ ও শোষিতের গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠাকরণ। বাকশাল কর্মসূচীকে আমি প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করেছি। এক. রাজনৈতিক, দুই. আর্থসামাজিক, তিন. প্রশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থা।

    এক. রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় প্রত্যেক পেশাভিত্তিক লোকদের জাতীয় দল বাকশালে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা রেখেছি। এবং পর্যায়ক্রমে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রত্যেকটি নির্বাচনী এলাকায় জাতীয় দলের একাধিক প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হবে। জনগণ তাদের মধ্যে থেকে একজনকে নির্বাচিত করবেন। প্রেসিডেন্ট জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। জাতীয় দলের সদস্য যে কেউ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। প্রেসিডেন্ট পদাধিকার বলে জাতীয় দলের চেয়ারম্যান হবেন। প্রেসিডেন্ট জাতীয় সংসদের আস্থাভাজন একজনকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন। প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে মন্ত্রীদের নিয়োগ করবেন। সংসদ সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের অনাস্থায় প্রেসিডেন্টকে অপসারিত করতে পারবেন। মন্ত্রীসভা প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় সংসদের কাছে দায়ী থাকবেন। স্থানীয় থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সর্বস্তরের জনগণের প্রতিনিধিত্ব প্রত্যক্ষভাবে বজায় থাকবে।

    দুই. আর্থসামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে বাধ্যতামূলক বহুমূখী গ্রাম-সমবায় প্রকল্প। এর মাধ্যমে গ্রামীন আর্থব্যবস্থায় উন্নয়ন বা স্বনির্ভর-স্বাধীন গ্রামীন ব্যবস্থা, বিশেষ করে ভূমিসংস্কারের প্রয়োজনীয় ও কার্যকরী ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূমিহীন কৃষকদের পুনর্বাসন তথা কৃষকদের হাতে জমি হস্তান্তর, উৎপাদন বৃদ্ধি ও সাম্যভিত্তিক বন্টন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ। ভারী শিল্পকারখানা, পরিত্যক্ত সম্পত্তি, বৈদেশিক বানিজ্য, ব্যাংক, বীমা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি জাতীয়করণ করে জনগণের যৌথ শেয়ার মূলধনে নতুন নতুন কৃষিজাত শিল্প ও অন্যান্য শিল্প কলকারখানা ও সংস্থা প্রতিষ্ঠা। সীমিত ব্যক্তিমালিকানাকে উৎসাহদানের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ব্যক্তিমালিকানাধীন সংস্থাসমূহ যাতে জনসাধারণ ও তাদের শ্রমিকদের শোষণ করতে না পারে তার ব্যবস্থা থাকবে।

    তিন. প্রশাসনিক কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রনালয়, কর্পোরেশন ও বিভাগগুলোর পুনর্বিন্যাস ও পুনর্গঠন তথা মাথাভারী প্রশাসনের উচ্ছেদ সাধন। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে জেলা গভর্নর ও থানা প্রশাসনিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশের সকল মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ইউনিয়ন পরিষদ, মহকুমা ও বিভাগীয় প্রশাসনকে তুলে দেয়া হচ্ছে। জেলা ও থানাগুলো জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হবে। গ্রাম সমবায় পরিষদ সদস্যদের ভোটে থানা পরিষদ গঠিত হবে। তবে থানা পরিষদের প্রশাসক/চেয়ারম্যান ও জেলা গভর্ণর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন। থানা প্রশাসক/চেয়ারম্যানরা ও জেলা গভর্ণররা জনগণ, স্ব স্ব পরিষদ ও প্রেসিডেন্টের কাছে দায়ী থাকবেন। গ্রাম সমবায় পরিষদ থানা পরিষদের কাছে, থানা পরিষদ জেলা পরিষদের কাছে দায়ী থাকবে। গ্রাম সমবায় পরিষদ, থানা পরিষদ, জেলা পরিষদ- এরপরই থাকবে জাতীয় সরকার। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে জাতীয় সরকারের প্রশাসনিক ক্ষমতাকে বিপুলভাবে বিকেন্দ্রিকরণ করে প্রশাসনকে জনগণের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছি। প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র, স্টিলফ্রেম গতানুগতিক বা টাইপড চরিত্রকে ভেঙ্গে গুড়ো করে দেবার ব্যবস্থা নিয়েছি। সরকারী কর্মচারীরা এখন থেকে জনগণের সেবক।

    বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টকে রাজধানীতে বহাল রেখে হাইকোর্ট বিভাগকে আটটি আঞ্চলিক বিভাগে বিকেন্দ্রিকরণের ব্যবস্থা নিয়েছি। তবে সুপ্রিমকোর্টের অধিবেশন বছরে অন্তত একবার করে প্রতিটি আঞ্চলিক বিভাগে (হাইকোর্ট) বসবে। জেলা আদালতসমূহ বহাল থাকবে। প্রতিটি থানাতে থাকবে একাধিক বিশেষ ট্রাইবুনাল। প্রত্যেকটি আদালতে যে কোনো মামলা ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে মিমাংসা করতে হবে। গ্রামে থাকবে একাধিক শালিস বোর্ড। শালিস বোর্ড গঠিত হবে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে। শালিস বোর্ড চেয়ারম্যান থাকবেন সরকার নিয়োজিত বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটরা। এভাবে সুষ্ঠু, ন্যায় ও দ্রুততর গণমুখী বিচারকার্য সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বিচার বিভাগের ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রিকরণ করা হয়েছে।

    বঙ্গবন্ধু, অনেকে বলেন, আপনি নাকি কোনো একটি পরাশক্তির চাপের মুখে বা তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বাকশাল কর্মসূচী দিয়েছেন এবং এ ব্যবস্থা নাকি সাময়িক কালের জন্য করেছেন- এ বিষয়ে আপনি অনুগ্রহ করে কিছু বলবেন কি?

    কারো প্রেশার বা প্রভাবের নিকট আত্মসমর্পন বা মাথা নত করার অভ্যাস বা মানসিকতা আমার নেই। এ কথা যারা বলেন, তারাও তা ভালো করেই জানেন। তবে অপপ্রচার করে বেড়াবার বিরুদ্ধে কোনো আইন নেই, তাই উনারা এ কাজে আদাজল খেয়ে নেমেছেন। করুন অপপ্রচার। আমি স্বজ্ঞানে বিচার বিশ্লেষণ করে, আমার অভিজ্ঞতার আলোকে, আমার দীনদুখী মেহনতী মানুষের আশা-আকাঙ্খা বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে আমি বাকশাল কর্মসূচী দিয়েছি। আমি যা বলি, তাই করে ছাড়ি। যেখানে একবার হাত দেই সেখান থেকে হাত উঠাই না। বলেছিলাম এদেশকে মুক্ত করে ছাড়বো, মুক্ত করেছি। বলেছি শোষণহীন দুর্নীতিমুক্ত সমাজতান্ত্রিক বাংলা গড়বো, তাই করে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ। কোনো কিন্তুটিন্তু নাই, কোনো আপোষ নাই।

    বঙ্গবন্ধু, বাকশাল বিরোধীমহল অর্থাৎ ঐ ৫% সংখ্যায় অতি নগণ্য হলেও তাদের হাতেই রয়েছে বিপুল সম্পদ। তাদের সাথে রয়েছে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদী শক্তির যোগসাজশ। তাদের পেইড এজেন্টরাই রয়েছে প্রশাসনিক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার কেন্দ্রে। তাদের কায়েমী স্বার্থের উপর আপনি আঘাত হানতে যাচ্ছেন, এই অবস্থায় তারা চোখ মেলে, মুখ গুজে বসে থাকবে বলে আপনি মনে করেন? তারা তাদের অবস্থান নিরাপদ ও সংহত করার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে না?

    আমি জানি তারা বসে নাই। ষড়যন্ত্র চলছে। প্রতিদিনই ষড়যন্ত্রের উড়ো খবর আমার কাছে আসে। সাম্রাজ্যবাদ ও তার পদলেহীরা এসব ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। গোপন পথে অঢেল অর্থ এ কাজে লাগাবার জন্য বাংলাদেশে আসছে। সুকৌশলে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ চলছে। অপপ্রচার চলছে। আমি জাতির বৃহত্তর কল্যাণে এ পথে নেমেছি। জনগণ সমর্থন দিচ্ছে। তাই ষড়যন্ত্র করে, বাধার সৃষ্টি করে, হুমকি দিয়ে আমাকে নিবৃত্ত করা যাবে না। আমার কাজ আমি করে যাবোই।

    হয়তো শেষ পর্যন্ত ওরা আমাকে মেরে ফেলতে পারে। পরোয়া করি না। ও মৃত্যু আমার জীবনে অনেকবার এসেছে। একসিডেন্টলি আজো আমি বেঁচে আছি। অবশ্যই আমাকে মরতে হবে। তাই মৃত্যু ভয় আমার নেই। জনগন যদি বোঝে আমার আইডিয়া ভালো, তাহলে তারা তা গ্রহণ করবে। আমার কর্মসূচী বাস্তবায়ন করবে। আমার একটা বড় স্বান্তনা আছে, যুদ্ধের সময় আমি জনগনের সাথে থাকতে পারিনি। জনগণ আমারই আদেশ ও নির্দেশে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। আজকের এই শোষণমুক্ত সমাজতন্ত্র বা অর্থনৈতিক মুক্তির বিপ্লবে আমি যদি নাও থাকি, তাহলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার বাঙালীরা যে কোনো মূল্যে আমার রেখে যাওয়া আদর্শ ও লক্ষ্য একদিন বাংলার বুকে বাস্তবায়িত করে ছাড়বে ইনশাল্লাহ।

    _

    পুনশ্চ: আজকে বাকশালকে গালি দিয়ে একদল সর্বহারার বিপ্লবের কথা বলে, চীনের আদলে কিউবার আদলে, আরেকদল বলে ইসলামী বিপ্লবের কথা, ইরানের আদলে। জানতে ইচ্ছা সেগুলা একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বলে এই বিপ্লবীরা মানেন কিনা? জানেন কিনা? সেখানে গনতন্ত্র নেই স্বীকার করেন কিনা? বাকশাল ছিলো একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যার অর্থনৈতিক অংশটুকু ছিলো সমাজতান্ত্রিক। এটাই ইমপ্রোভাইজেশন, এটাই বিপ্লব। তাজউদ্দিন কেন ভুল বলেননি সেটা উপরের সাক্ষাতকারেই আছে। বঙ্গবন্ধু নিজেও জানতেন তার এই বৈপ্লবিক পদক্ষেপ সহজভাবে নেবে না কোনো পরাশক্তি। এমনকি ভারতও না। তাকে মেরে ফেলে হবে সেটাও তিনি জানতেন!

    Reply
  3. Rashed Ahmed

    যুক্তিনির্ভর লেখা। ভালো লাগলো। হেনরি কিসিনজার যে জার্মানি থাকে জানা ছিল না।

    Reply
  4. AB Siddique

    Thanks Mr.Joarder. Mind that conspirators wanted to keep Pakistan United after killing .Still they are active under different political affiliations. You can easily understand who are they.

    Reply
  5. Momtajul Ferdous Joarder

    ধন্যবাদ আপনার তথ্যের জন্য। সমস্ত অপকর্ম শেষ হয়ে গেলে মাওলানা ভাসানী তাঁর ন্যাপ পার্টিকে বিএনপিতে বিলুপ্ত করেন। তাহলে তো বাংলাদেশের রাজনীতিকে একজন রাজনীতিবিদ হিসাবে সবথেকে কলুষিত করেছে ভাসানী। ভাসানী চরিত্র সম্পর্কে কিছু আভাষ অবশ্য বঙ্গবন্ধুর কারাগারের রোজনামচায় পাওয়া যাবে।

    Reply
      • abdullah

        এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের আশিভাগ শিক্ষিতমূর্খের ধারণা বাকশাল একটা স্বৈরাচারি শাসন ব্যবস্থা। তাদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে প্রায়ই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা এই বাকশাল জুজু নিয়ে আসেন তাদের বক্তৃতায় বয়ানে। এমনকি বর্তমান শাসনব্যবস্থাকেও অনেকে তুলনা করেন সেই আদলে। আফসোসের ব্যাপার হচ্ছে খোদ আওয়ামী লীগের প্রচুর নেতাকর্মী বাকশাল বলতে আসলে কি বোঝায় তা জানেন না। তারা তাদের প্রতিপক্ষের খোঁচা নিরবে সহ্য করেন এবং মনে মনে রুষ্ট হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপর। কী এক পাপের বোঝা যেন চাপিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

        এই বিভ্রান্তির নেপথ্যে কিছু মুখরোচক উপাদানও আছে। যেমন তাজউদ্দিন আহমেদের একটি উক্তির কথা শোনা যায়, তিনি নাকি বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর বলেছিলেন বাকশালই বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু ডেকে এনেছে। কিংবা বঙ্গবন্ধু এই বাকশাল অবলম্বন করার সময় তিনি বুঝেছিলেন বঙ্গবন্ধু তার মৃত্যু ডেকে এনেছেন। কথাটা যদি সত্যিও হয়, তাহলে বলতে হবে তাজউদ্দিন ভুল বলেননি। তবে তার এই উক্তি যে ছলে প্রয়োগ করা হয়, সেভাবেও মোটে কথাটা তিনি বলেননি। আরও আছে মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এমএজি ওসমানীর বিখ্যাত উক্তি। তিনি নাকি সংসদে দাড়িয়ে বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু আপনি ভুল করছেন। আমি আর আপনার সঙ্গে নেই। ঠিক কেন ওসমানীর এই প্রলাপ, সেটা আমি আসলেই ধরতে পারিনি।

        যা হোক, ফিরে আসি বাকশালে। বঙ্গবন্ধু এটাকে বলেছিলেন দ্বিতীয় বিপ্লব। প্রথম বিপ্লব ছিলো মুক্তিযুদ্ধ। যার বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা। সেটা ছিলো বাঙালীর রাজনৈতিক মুক্তি। আর বাকশাল কর্মসূচী দিয়ে বঙ্গবন্ধু বাঙালীর অর্থনৈতিক মুক্তির সূচনা করতে চেয়েছিলেন। এই অর্থনৈতিক শৃংখলটা বাধা ছিলো বিভিন্ন পরাশক্তি আর দাতা দেশের কাছে। স্বাধীনতার পর তিনটি বছর তিনি সবার দরজায় গেছেন। হাত পেতেছেন। কিন্তু সবার একটাই শর্ত। আমার দালালি করো। আমেরিকা, রাশিয়া, সৌদি আরব, চীন সবার একই শর্ত। বিশ্বব্যাংকের ঋণ, দাতা দেশগুলোর ঋণের সঙ্গে কি শর্ত জুড়ে ছিলো তা আগেই ভিন্ন ভিন্ন আলোচনায় উল্লেখ করেছেন অনেকেই, আমিও করেছি। যুদ্ধবিধস্ত দেশটার উপর প্রকৃতির কেন এত রোষ ছিলো সেটাও এক জিজ্ঞাসা। হয় খরা, নয় বন্যা। দুটোরই অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়া দুর্ভিক্ষ। এটাও ভোলা চলবে না গোটা বিশ্বজুড়ে তখন চলছিলো এক ভয়াবহ আর্থিক মন্দা।

        তার উপর দেশে চলছিলো অন্য এক অরাজকতা। জনগনের মুক্তি, সর্বহারার মুক্তির জন্য চীনপন্থী কমিউনিস্টরা চালাচ্ছিলো তাদের ধারার বৈপ্লবিক কর্মসূচী। সেটার মধ্যে প্রধান ছিলো পাটের গুদামে আগুন দেওয়া। ব্যাংক লুট করা। প্রান্তিক অঞ্চলের পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের হত্যা করে অস্ত্র লুট করা। স্বাধীনতার পর তিন বছরে তখনকার অর্থমানে দুইশো কোটি টাকার পাট পোড়ানো হয়েছে। এই পাট ছিলো বাংলাদেশের একমাত্র অর্থকরী পন্য যা রপ্তানী করে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতো এই দেশ। ছিলো জাসদ। তারা শ্লোগান দিতো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের। এটা ঠিক কোন বৈজ্ঞানিকদের সমাজতন্ত্র সেটা তারা ঠিকমতো বোঝাতে না পারলেও তাদেরও কাজ ছিলো সর্বহারা পার্টির মতোই। ব্যাংক লুট করো, গুদামে আগুন দাও, দেশ অচল করো। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা শূন্যের নীচে চলে গেলে দেশে সর্বহারার বিপ্লব হবে, তারা সব পয়সাওয়ালাদের মেরেকেটে এই বিপ্লব ঘটাবে। আর তাদের শাসন করবে বিপ্লবী নেতারা। কী সারকাজমিক অর্গাজম!

        বঙ্গবন্ধু ঠিক করলেন এভাবে চলতে পারে না। ন্যামের সদস্য কিউবার কাছে পাট বিক্রি করেছেন। সেটা যুক্তরাষ্ট্র বেয়াদবি হিসেবে নিয়েছে কারণ তাদের চোখে কিউবা কমিউনিস্ট দেশ, অতএব দুই জাহাজ বোঝাই চাল ও খাদ্যশস্য তারা ফিরিয়ে নিয়ে সাগরে ঢেলে দিলো। বঙ্গবন্ধু বুঝলেন স্বনির্ভর হওয়ার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে তিনি সমাজতন্ত্রওয়ালাদেরও বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র শেখানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। দ্বিতীয় বিপ্লব হলো সেই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র যার মূল উপাদান গণতন্ত্রের মোড়কে অর্থনৈতিক সমাজতন্ত্র। অর্থাৎ সমবায় পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন হবে, কৃষকরা মিলিতভাবে জমি চাষ করে ফসল ফলাবেন। তাদের নায্য দাম দিয়ে সেই ফসল দেশজুড়ে বিপনন করা হবে।

        বাকশাল কি স্বৈরাচারি শাসন ব্যবস্থা? মোটেই না। এটা ছিলো বহুদলীয় শাসনব্যবস্থা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাংলার মানুষের পূর্ণ সমর্থন নিয়ে জিতেছিলো আওয়ামী লীগ। সেই নির্বাচিত সাংসদরাই মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং স্বাধীনতার পর স্বাধীন দেশের জাতীয় সংসদে বসেছেন, নতুন সংবিধান দিয়েছেন। এরপর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনেও সংখ্যাগরিষ্ঠ সিট আওয়ামী লীগই পেয়েছে। তখন বিরোধী দল বলতে ছিলো ন্যাপ ভাসানী, ন্যাপ মোজাফফর,বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এবং জাসদ। ভাসানী নির্বাচনে বিশ্বাস করতেন না। করলে জামানত হারাতেন নিঃসন্দেহে। সত্তরে তিনি যেমন ভোটের আগে ভাত চেয়েছেন। স্বাধীনতার পর করলেন শুধু অনশন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধের জন্য অনশন। মুসলিম বাংলা গঠনের জন্য অনশন। আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তার অনশন ছিলো অহরহ। আর জাসদ কি করতো তাতো বলা হয়েছে। আর মুক্তিযুদ্ধ শেষে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিলো বলে মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, পিডিপি ছিলো নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল।

        তো স্বনির্ভরতার দ্বিতীয় বিপ্লবে বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন জাতীয় ঐক্যের। ভাসানী ন্যাপ এবং জাসদ প্রত্যাখ্যান করলো তার ডাক। ভাসানী যদিও তার শিষ্য মুজিবকে ডেকে আশীর্বাদ করলেন। তবে দলীয়ভাবে এর বিরুদ্ধে থাকলেন। জাতীয় ঐক্যের ডাকে সাড়া দিলো মুক্তিযুদ্ধের সময় আওয়ামী লীগের মিত্রশক্তি ন্যাপ মুজাফফর এবং সিপিবি। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ মুজাফফর এবং সিপিবির সম্মিলিত রূপ ছিলো বাকশাল। যার পূর্ণাঙ্গ অর্থ বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ। এখানে আওয়ামী কথাটা জনতা অর্থে ব্যবহৃত। চার বিরোধী দলের দুটো শাসনতন্ত্রে। আর দুটো বিরুদ্ধ অবস্থানে। স্বৈরাচারি হলো কীভাবে!

        বাকশালের মূল এসেন্স ছিলো ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ। ছোট ছোট সেলে গোটা দেশকে ভাগ করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু তার এই পরিকল্পনায়। মানুষের শরীর যেমন বিভিন্ন কোষে তৈরি তেমনি বাকশালও। প্রতিটি সেলের মূল ক্ষমতায় কৃষক, শ্রমিক এবং সাধারণ জনতা। প্রশাসক হিসেবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যাদের সহযোগী সেনাসদস্য এবং আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। দেশের প্রতিটি জেলার জন্য একজন করে গভর্নর নির্বাচিত করা হলো। এবং এই গভর্নরদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো বাকশাল কর্মসূচি পরিচালনার জন্য। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেই গভর্নরদেরই শপথ নেওয়ার কথা ছিলো বঙ্গবন্ধুর কাছে। বাকশাল শুরু হতে পারেনি। বাংলাদেশে কখনও বাকশাল কায়েম করা যায়নি। এটি পরিকল্পনা হিসেবেই ছিল। বাস্তবায়নের আগেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে বাকশালকে অংকুরেই বিনাশ করা হয়।

        বাকশাল, বাংলাদেশ কৃষক স্রমিক আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

        কী ছিল বাকশাল, এ নিয়ে যাদের আগ্রহ তারা তা শুনতে পারেন খোদ বঙ্গবন্ধুর মুখেই। সাক্ষাতকারটি নিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধা-সাংবাদিক আবীর আহাদ:

        বঙ্গবন্ধু, আপনার রাজনৈতিক চিন্তাধারার মূলনীতি বা লক্ষ্য কি?

        আমার রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা ধ্যান ও ধারণার উৎস বা মূলনীতিমালা হলো গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এই চার মূলনীতিমালার সমন্বিত কার্যপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি শোষণহীন সমাজ তথা আমার দেশের দীনদুখী শোষিত বঞ্চিত শ্রমজীবি মেহনতী মানবগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকার ও তাদের সমষ্ঠিগত প্রকৃত ‘গণতান্ত্রিক একনায়কতান্ত্রিক’ শাসন প্রতিষ্ঠাকরণই আমার রাজনৈতিক চিন্তাধারার একমাত্র লক্ষ্য।

        বঙ্গবন্ধু, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র কি একযোগে বা পাশাপাশি চলতে পারে?

        যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমাদের দেশে প্রচলিত আছে তাকে সংখ্যালঘু ধনিক শোষকদের গণতন্ত্র বলাই শ্রেয়। এর সাথে সমাজতন্ত্রের বিরোধ দেখা দেয় বৈকি। তবে গণতন্ত্র চিনতে ও বুঝতে আমরা ভুল করি। কারণও অবশ্য আছে। আর তা হলো শোষক সমাজ গণতন্ত্র পূর্ণভাবে বিকাশলাভ করুক তা চায় না। এবং গণতন্ত্রকে কিভাবে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার হাতিয়ারে পরিণত করা যায়- এখানে চলে তারই উদ্যোগ আয়োজন। এভাবেই প্রকৃত গণতন্ত্রকে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। সাধারণ অজ্ঞ জনগণই শুধু নয়- তথাকথিত শিক্ষিত সচেতন মানুষও প্রচলিত আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গণতন্ত্রকে সঠিকভাবে বুঝতে অক্ষম। এরা ভাবে যে ভোটাভুটিই হলো গণতন্ত্র। একটু তলিয়ে দেখে না প্রাপ্তবয়স্ক মোট জনসংখ্যার কত পার্সেন্ট ভোট দিলো, কোন শ্রেনীর লোকেরা নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হলো, কারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় গেলো, ক্ষমতাসীনরা কোন পদ্ধতিতে তাদের শাসন করছে, সাধারণ জনগণ কতোটুকু কি পাচ্ছে। সুতরাং আমি আমার অভিজ্ঞতার আলোকে বলছি- প্রচলিত গণতন্ত্রের বদৌলতে সমাজের মাত্র ৫% লোকের বা প্রভাবশালী ধনিকশ্রেনীর স্বৈরাচারী শাসন ও বল্গাহীন শোষণকার্য পরিচালনার পথই প্রশস্ত হচ্ছে। অর্থাৎ প্রচলিত গণতন্ত্রের মারপ্যাচে সমাজের নিম্নতম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর শাসন ও প্রভাব প্রতিপত্তি, সর্বপ্রকার দূর্নীতি শোষন অবিচার অত্যাচার ও প্রতারণায় সমাজের সর্ববৃহত্তম অজ্ঞ দুর্বল মেহনতী কৃষক-শ্রমিক সাধারণ মানব গোষ্ঠীর (শতকরা প্রায় ৯৫ ভাগ) মৌলিক মানবাধিকার ও তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব হচ্ছে। তারা বঞ্চিত হচ্ছে।

        প্রকৃত গণতন্ত্র বলতে আমি এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বুঝি, যে ব্যবস্থায় জনগনের বৃহ্ত্তর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের বৃহত্তর কল্যাণের নিমিত্তে তাদের জন্য, তাদের দ্বারা এবং তাদের স্বশ্রেণীভুক্ত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত সরকার প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে তাদেরই প্রকৃত শাসন ও আর্থসামাজিক মৌলিক অধিকার সংরক্ষিত হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থা প্রচলিত গণতান্ত্রিক উপায়ে অর্জিত হতে পারে না। কারণ প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাজনৈতিক ও আর্থ সামাজিক ক্ষেত্রে চলে অর্থ সম্পদের অবাধ ও মুক্ত প্রতিযোগিতা। এক্ষেত্রে দরিদ্র জনসাধারণের পক্ষে এ জাতীয় আর্থ প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়া কোনো প্রকারেই সম্ভব না। একমাত্র সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতিই এদেরকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহনের কার্যকরী নিশ্চয়তা দিতে পারে-তাদের আর্থ সামাজিক মৌলিক মানবাধিকার ও তাদের প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এজন্য আমি মনে করি প্রকৃত গণতন্ত্রের আরেক নাম সমাজতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের মধ্যেই প্রকৃত গণতন্ত্র নিহিত। এজন্যেই আমি গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছি। আমি মনে করি প্রকৃত গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের ভেতর কোনো বিরোধ নেই।

        অনেকে বলেন ‘বাকশাল’ হলো একদলীয় বা আপনার স্বৈরতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠার একটি অপকৌশল- এ সম্পর্কে আপনি পরিষ্কার মতামত দিন।

        সাম্রাজ্যবাদের অবশেষ পুঁজিবাদী সমাজসভ্যতা ও শোষক পরজীবিদের দৃষ্টিতে ‘বাকশাল’ তো একদলীয় শাসনব্যবস্থা হবেই। কারণ বাকশাল কর্মসূচীর মধ্যে দিয়ে আমি সাম্রাজ্যবাদের প্রতিনিধি বহুজাতিক পুঁজিবাদী শোষক, তাদের সংস্থা সমূহের লগ্নিকারবার এবং তাদের এদেশীয় সেবাদাস, এজেন্ট, উঠতি ধনিক গোষ্ঠীর একচেটিয়া শোষণ ও অবৈধ প্রভাবপ্রতিপত্তি-দুর্নীতি-প্রতারণার সকল বিষদাঁত ভেঙ্গে দেবার ব্যবস্থা করেছি। এজন্য তাদের আঁতে ঘাঁ লেগেছে, বাকশাল ও আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করে বেড়াচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদীশক্তি শাসকরা এদেশে গোপনে অর্থ যোগান দিয়ে তাদের সেবাদাস ও এজেন্টদের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক কার্যক্রমকে বানচাল করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। তারা বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, সভাসমিতি এমনকি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে আমার সরকারের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে। কল-কারখানা, অফিস-আদালত, শিল্প-প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন থানায় তাদের ভাড়াটে চরদের দিয়ে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, গণহত্যা, অসামাজিক কার্যকলাপ ও সাম্প্রদায়িক তৎপরতা চালাচ্ছে। প্রতিদিন তাদের ষড়যন্ত্রের খবরা-খবর আমার কানে আসছে।

        প্রচলিত গনতান্ত্রিক বৈষম্য, শোষণ-দূর্নীতিভিত্তিক সমাজকে, দেউলিয়া আর্থসামাজিক ব্যবস্থা, জরাজীর্ণ প্রশাসন ও অবিচারমূলক বিচার ব্যবস্থাকে সমূলে উৎপাটিত করে একটি শোষণহীন, দূর্নীতিহীন, বৈষম্যহীন ও প্রকৃত গণতান্ত্রিক সাম্যবাদী সমাজ বিপ্লবের পথ রচনা করেছি। এই সমাজ বিপ্লবে যারা বিশ্বাসী নন, তারাই বাকশাল ব্যবস্থাকে একদলীয় স্বৈরশাসন ব্যবস্থা বলে অপপ্রচার করছেন। কিন্তু আমি এ সকল বিরুদ্ধবাদীদের বলি, এতোকাল তোমরা মুষ্ঠিমেয় লোক, আমার ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ দুখী মেহনতী মানুষকে শাসন ও শোষণ করে আসছো। তোমাদের বল্গাহীন স্বাধীনতা ও সীমাহীন দূর্নীতির মধ্য দিয়ে ব্যক্তিসম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার অবাধ ও মুক্ত প্রতিযোগিতার হোলিখেলায় আমার দুখীমানুষের সব আশা-আকাংখা-স্বপ্ন-সাধ ধুলায় মিশে গেছে। দুখী মানুষের ক্ষুধার জ্বালা ব্যথা বেদনা, হতাশা-ক্রন্দন তোমাদের পাষাণ হৃদয়কে একটুও গলাতে পারেনি। বাংলার যে স্বাধীনতা তোমরা ভোগ করছো, এই স্বাধীনতা, এই দেশ, এই মাটি ঐ আমার দুখী মেহনতী মানুষের সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা, আন্দোলন সংগ্রাম এবং জীবন মৃত্যুর বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে তোমাদের অবদান কতটুকু আছে, নিজেদের বুকে একবার হাত দিয়ে চিন্তা করে দেখো। বরং অনেক ক্ষেত্রে স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছো। বিদেশী শাসক-শোষকদের সহায়তা করেছো। নিজের ঘরে থেকে ভাইয়ের ঘর পুড়িয়েছো, মানুষকে হত্যা করেছো। মা-বোনদের লাঞ্ছিত করেছো, আরো কি না করেছো! এসবই করেছো ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের ঘৃন্য লক্ষ্যে।

        আমার দেশের মাত্র ৫ পার্সেন্ট লোক ৯৫ পার্সেন্ট লোককে দাবিয়ে রাখছে, শাসন-শোষণ করছে। বাকশাল করে আমি ওই ৯৫ ভাগ মানুষের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক শাসন ও অর্থনৈতিক মুক্তির ব্যবস্থা করেছি। এতকাল মাত্র ৫ ভাগ শাসন করেছে, এখন থেকে করবে ৯৫ ভাগ। ৯৫ ভাগ মানুষের সুখ-দুঃখের সাথে ৫ ভাগকে মিশতে হবে। আমি মেশাবোই। এজন্য বাকশাল করেছি। এই ৯৫ ভাগ মানুষকে সংঘবদ্ধ করেছি তাদের পেশার নামে, তাদের বৃহত্তর কল্যাণে, তাদের একক দল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশালে। মূলত বাকশাল হচ্ছে বাঙালীর সর্বশ্রেণী সর্বস্তরের গণমানুষের একক জাতীয় প্লাটফর্ম, রাজনৈতিক সংস্থা, একদল নয়। এখানে স্বৈরশাসনেরও কোনো সুযোগ নেই। কারণ বাঙালী জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত বা সমষ্ঠিগত শাসন ব্যবস্থায় কে কার উপর স্বৈরশাসন চালাবে? প্রত্যেক পেশার নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে শাসন পরিষদ গঠন করা হবে। কোনো পেশা বা শ্রেণী অন্য পেশার লোকদের ওপর খবরদারী করতে পারবে না। যে কেউ যিনি জনগনের সার্বিক কল্যাণের রাজনীতিতে তথা সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার রাজনীতিতে বিশ্বাসী, তিনি এই জাতীয় দলে ভিড়তে পারবেন।

        যারা বাকশালকে একদলীয় ব্যবস্থা বলেন, তাদের স্মরণ করতে বলি, ইসলামে ক’টি দল ছিলো? ইসলামী ব্যবস্থায় একটি মাত্র দলের অস্তিত্ব ছিলো, আর তা হলো খেলাফত তথা খেলাফতে রাশেদীন। মার্কসবাদও একটি মাত্র দলের অনুমোদন দিয়েছে। চীন, রাশিয়া, কিউবা, ভিয়েতনাম কিংবা অন্যান্য ইসলামী রাষ্ট্রে কতটি করে দল আছে? এইসব ইসলামী রাষ্ট্রসমূহকে বাদ দাও, ওখানে মহানবীর ইসলাম নেই। বস্তুত প্রকৃত গণতন্ত্র বা সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বার্থেই একটি একক জাতীয় রাজনৈতিক সংস্থা থাকা বাঞ্ছনীয়। একটি জাতীয় কল্যাণের অভিন্ন আদর্শে, ব্যাপক মানুষের সার্বিক মুক্তির লক্ষ্যে একটি মাত্র রাজনৈতিক সংস্থার পতাকাতলে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। কিন্তু বহুদলীয় তথাকথিত গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় কোনোভাবেই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব নয়। সেখানে বহুদলে জনগণ বহুধা বিভক্ত হতে বাধ্য। আর বিচ্ছিন্ন, বিভক্ত, পরস্পর বিরোধী রাজনৈতিক দলের দ্বন্দ্বসংঘাত, হিংসা-বিদ্বেষ ও হানাহানির রাজনীতি দিয়ে জাতির বৃহত্তর কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কোনোভাবেই অর্জিত হতে পারে না। ইতিহাস সে সাক্ষ্য দেয় না। আমার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও তাই বলে।

        বাকশাল, বাংলাদেশ কৃষক স্রমিক আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

        বঙ্গবন্ধু, বাকশালের মূল লক্ষ্য বা এর কর্মসূচী সম্পর্কে কিছু বলুন…

        বাকশালের মূল লক্ষ্য তো আগেই বিশ্লেষণ করেছি। তবে এক কথায় আমি যা বুঝি তা হলো একটি শোষণহীন, দূর্নীতিমুক্ত সমাজ ও শোষিতের গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠাকরণ। বাকশাল কর্মসূচীকে আমি প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করেছি। এক. রাজনৈতিক, দুই. আর্থসামাজিক, তিন. প্রশাসনিক ও বিচার ব্যবস্থা।

        এক. রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনায় প্রত্যেক পেশাভিত্তিক লোকদের জাতীয় দল বাকশালে অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা রেখেছি। এবং পর্যায়ক্রমে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রত্যেকটি নির্বাচনী এলাকায় জাতীয় দলের একাধিক প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হবে। জনগণ তাদের মধ্যে থেকে একজনকে নির্বাচিত করবেন। প্রেসিডেন্ট জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। জাতীয় দলের সদস্য যে কেউ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন। প্রেসিডেন্ট পদাধিকার বলে জাতীয় দলের চেয়ারম্যান হবেন। প্রেসিডেন্ট জাতীয় সংসদের আস্থাভাজন একজনকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন। প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে মন্ত্রীদের নিয়োগ করবেন। সংসদ সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের অনাস্থায় প্রেসিডেন্টকে অপসারিত করতে পারবেন। মন্ত্রীসভা প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় সংসদের কাছে দায়ী থাকবেন। স্থানীয় থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সর্বস্তরের জনগণের প্রতিনিধিত্ব প্রত্যক্ষভাবে বজায় থাকবে।

        দুই. আর্থসামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে বাধ্যতামূলক বহুমূখী গ্রাম-সমবায় প্রকল্প। এর মাধ্যমে গ্রামীন আর্থব্যবস্থায় উন্নয়ন বা স্বনির্ভর-স্বাধীন গ্রামীন ব্যবস্থা, বিশেষ করে ভূমিসংস্কারের প্রয়োজনীয় ও কার্যকরী ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূমিহীন কৃষকদের পুনর্বাসন তথা কৃষকদের হাতে জমি হস্তান্তর, উৎপাদন বৃদ্ধি ও সাম্যভিত্তিক বন্টন ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ। ভারী শিল্পকারখানা, পরিত্যক্ত সম্পত্তি, বৈদেশিক বানিজ্য, ব্যাংক, বীমা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ইত্যাদি জাতীয়করণ করে জনগণের যৌথ শেয়ার মূলধনে নতুন নতুন কৃষিজাত শিল্প ও অন্যান্য শিল্প কলকারখানা ও সংস্থা প্রতিষ্ঠা। সীমিত ব্যক্তিমালিকানাকে উৎসাহদানের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ব্যক্তিমালিকানাধীন সংস্থাসমূহ যাতে জনসাধারণ ও তাদের শ্রমিকদের শোষণ করতে না পারে তার ব্যবস্থা থাকবে।

        তিন. প্রশাসনিক কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রনালয়, কর্পোরেশন ও বিভাগগুলোর পুনর্বিন্যাস ও পুনর্গঠন তথা মাথাভারী প্রশাসনের উচ্ছেদ সাধন। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে জেলা গভর্নর ও থানা প্রশাসনিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে দেশের সকল মহকুমাকে জেলায় উন্নীত করা হয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রিতার কারণে ইউনিয়ন পরিষদ, মহকুমা ও বিভাগীয় প্রশাসনকে তুলে দেয়া হচ্ছে। জেলা ও থানাগুলো জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হবে। গ্রাম সমবায় পরিষদ সদস্যদের ভোটে থানা পরিষদ গঠিত হবে। তবে থানা পরিষদের প্রশাসক/চেয়ারম্যান ও জেলা গভর্ণর জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হবেন। থানা প্রশাসক/চেয়ারম্যানরা ও জেলা গভর্ণররা জনগণ, স্ব স্ব পরিষদ ও প্রেসিডেন্টের কাছে দায়ী থাকবেন। গ্রাম সমবায় পরিষদ থানা পরিষদের কাছে, থানা পরিষদ জেলা পরিষদের কাছে দায়ী থাকবে। গ্রাম সমবায় পরিষদ, থানা পরিষদ, জেলা পরিষদ- এরপরই থাকবে জাতীয় সরকার। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে জাতীয় সরকারের প্রশাসনিক ক্ষমতাকে বিপুলভাবে বিকেন্দ্রিকরণ করে প্রশাসনকে জনগণের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েছি। প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র, স্টিলফ্রেম গতানুগতিক বা টাইপড চরিত্রকে ভেঙ্গে গুড়ো করে দেবার ব্যবস্থা নিয়েছি। সরকারী কর্মচারীরা এখন থেকে জনগণের সেবক।

        বিচার বিভাগের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টকে রাজধানীতে বহাল রেখে হাইকোর্ট বিভাগকে আটটি আঞ্চলিক বিভাগে বিকেন্দ্রিকরণের ব্যবস্থা নিয়েছি। তবে সুপ্রিমকোর্টের অধিবেশন বছরে অন্তত একবার করে প্রতিটি আঞ্চলিক বিভাগে (হাইকোর্ট) বসবে। জেলা আদালতসমূহ বহাল থাকবে। প্রতিটি থানাতে থাকবে একাধিক বিশেষ ট্রাইবুনাল। প্রত্যেকটি আদালতে যে কোনো মামলা ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে মিমাংসা করতে হবে। গ্রামে থাকবে একাধিক শালিস বোর্ড। শালিস বোর্ড গঠিত হবে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে। শালিস বোর্ড চেয়ারম্যান থাকবেন সরকার নিয়োজিত বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটরা। এভাবে সুষ্ঠু, ন্যায় ও দ্রুততর গণমুখী বিচারকার্য সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বিচার বিভাগের ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রিকরণ করা হয়েছে।

        বঙ্গবন্ধু, অনেকে বলেন, আপনি নাকি কোনো একটি পরাশক্তির চাপের মুখে বা তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বাকশাল কর্মসূচী দিয়েছেন এবং এ ব্যবস্থা নাকি সাময়িক কালের জন্য করেছেন- এ বিষয়ে আপনি অনুগ্রহ করে কিছু বলবেন কি?

        কারো প্রেশার বা প্রভাবের নিকট আত্মসমর্পন বা মাথা নত করার অভ্যাস বা মানসিকতা আমার নেই। এ কথা যারা বলেন, তারাও তা ভালো করেই জানেন। তবে অপপ্রচার করে বেড়াবার বিরুদ্ধে কোনো আইন নেই, তাই উনারা এ কাজে আদাজল খেয়ে নেমেছেন। করুন অপপ্রচার। আমি স্বজ্ঞানে বিচার বিশ্লেষণ করে, আমার অভিজ্ঞতার আলোকে, আমার দীনদুখী মেহনতী মানুষের আশা-আকাঙ্খা বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে আমি বাকশাল কর্মসূচী দিয়েছি। আমি যা বলি, তাই করে ছাড়ি। যেখানে একবার হাত দেই সেখান থেকে হাত উঠাই না। বলেছিলাম এদেশকে মুক্ত করে ছাড়বো, মুক্ত করেছি। বলেছি শোষণহীন দুর্নীতিমুক্ত সমাজতান্ত্রিক বাংলা গড়বো, তাই করে ছাড়বো, ইনশাল্লাহ। কোনো কিন্তুটিন্তু নাই, কোনো আপোষ নাই।

        বঙ্গবন্ধু, বাকশাল বিরোধীমহল অর্থাৎ ঐ ৫% সংখ্যায় অতি নগণ্য হলেও তাদের হাতেই রয়েছে বিপুল সম্পদ। তাদের সাথে রয়েছে আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদী শক্তির যোগসাজশ। তাদের পেইড এজেন্টরাই রয়েছে প্রশাসনিক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতার কেন্দ্রে। তাদের কায়েমী স্বার্থের উপর আপনি আঘাত হানতে যাচ্ছেন, এই অবস্থায় তারা চোখ মেলে, মুখ গুজে বসে থাকবে বলে আপনি মনে করেন? তারা তাদের অবস্থান নিরাপদ ও সংহত করার জন্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে না?

        আমি জানি তারা বসে নাই। ষড়যন্ত্র চলছে। প্রতিদিনই ষড়যন্ত্রের উড়ো খবর আমার কাছে আসে। সাম্রাজ্যবাদ ও তার পদলেহীরা এসব ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। গোপন পথে অঢেল অর্থ এ কাজে লাগাবার জন্য বাংলাদেশে আসছে। সুকৌশলে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপ চলছে। অপপ্রচার চলছে। আমি জাতির বৃহত্তর কল্যাণে এ পথে নেমেছি। জনগণ সমর্থন দিচ্ছে। তাই ষড়যন্ত্র করে, বাধার সৃষ্টি করে, হুমকি দিয়ে আমাকে নিবৃত্ত করা যাবে না। আমার কাজ আমি করে যাবোই।

        হয়তো শেষ পর্যন্ত ওরা আমাকে মেরে ফেলতে পারে। পরোয়া করি না। ও মৃত্যু আমার জীবনে অনেকবার এসেছে। একসিডেন্টলি আজো আমি বেঁচে আছি। অবশ্যই আমাকে মরতে হবে। তাই মৃত্যু ভয় আমার নেই। জনগন যদি বোঝে আমার আইডিয়া ভালো, তাহলে তারা তা গ্রহণ করবে। আমার কর্মসূচী বাস্তবায়ন করবে। আমার একটা বড় স্বান্তনা আছে, যুদ্ধের সময় আমি জনগনের সাথে থাকতে পারিনি। জনগণ আমারই আদেশ ও নির্দেশে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। আজকের এই শোষণমুক্ত সমাজতন্ত্র বা অর্থনৈতিক মুক্তির বিপ্লবে আমি যদি নাও থাকি, তাহলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার বাঙালীরা যে কোনো মূল্যে আমার রেখে যাওয়া আদর্শ ও লক্ষ্য একদিন বাংলার বুকে বাস্তবায়িত করে ছাড়বে ইনশাল্লাহ।

        _

        পুনশ্চ: আজকে বাকশালকে গালি দিয়ে একদল সর্বহারার বিপ্লবের কথা বলে, চীনের আদলে কিউবার আদলে, আরেকদল বলে ইসলামী বিপ্লবের কথা, ইরানের আদলে। জানতে ইচ্ছা সেগুলা একদলীয় শাসন ব্যবস্থা বলে এই বিপ্লবীরা মানেন কিনা? জানেন কিনা? সেখানে গনতন্ত্র নেই স্বীকার করেন কিনা? বাকশাল ছিলো একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যার অর্থনৈতিক অংশটুকু ছিলো সমাজতান্ত্রিক। এটাই ইমপ্রোভাইজেশন, এটাই বিপ্লব। তাজউদ্দিন কেন ভুল বলেননি সেটা উপরের সাক্ষাতকারেই আছে। বঙ্গবন্ধু নিজেও জানতেন তার এই বৈপ্লবিক পদক্ষেপ সহজভাবে নেবে না কোনো পরাশক্তি। এমনকি ভারতও না। তাকে মেরে ফেলে হবে সেটাও তিনি জানতেন!

  6. kamal

    যে মুক্তিযোদ্ধা বলেছে যে, খুনিরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে চায়নি সে কি জেনারেল জিয়া? তা’না হলে জাতিয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা অথবা সে খুনিদের দলের কোন সদস্য নিশ্চয়!

    Reply
    • Momtajul Ferdous Joarder

      না সে এর কোনটাই না। একজন সৎ মুক্তিযোদ্ধা, ভাল মানুষ। শুধু বোঝার ভুল বা খতিয়ে না দেখার দুর্বলতা হয়ত। উনিও কোথাও পড়েছিলেন। অনেক পত্রিকাতো এরকম লেখে। আমার সাথে কথকপোথনের পর উনি ভুল বুঝতে পেরেছেন এবং আমার লেখার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

      Reply
  7. লতিফ

    চীন খুব ভালোমতই জড়িত ছিল। তাদের জড়ানোর শুরুটা মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই। মাওলানা ভাসানীকে ভারতে পাঠানোর সিদ্ধান্তটা চীনের। চীনের দুইজন কর্তার সাথে সাক্ষাতের পরে ভাসানী ভারতে গমন করেন এবং মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা হন। এর পরেই মাওবাদী সেনাকর্তা যথাক্রমে ডালিম, নূর চৌধুরী ও মতিউর রহমান পাকিস্তান থেকে ‘পালিয়ে’ ভারতে আসে। নূর চৌধুরী যুদ্ধের পুরো সময়জুড়ে ওসমানীর এডিসি হিসাবে কাজ করে। জুলাইয়ে বাঙালি কুটনীতিক খাজা কায়সারের মধ্যস্থতায় চীন-মার্কিন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হলে চীন জাতিসংঘের সদস্য হয়। তখন হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তান সফর করে এবং গোপন পরিচয়ে চীনে গমন করে। এরপরেই আরও তিনজন মাওবাদী সেনাকর্তা, যথাক্রমে তাহের, মনজুর এবং জিয়াউদ্দীন ‘পালিয়ে’ ভারতে আসে। এই ছয়জন কোন না কোনভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত। এর মধ্যে মনজুর এবং মতিউর পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল এবং খুনিদের লাগাতার ক্যু চেষ্টায় বিরক্ত হয়ে তাদেরকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চাকুরি থেকে বহিষ্কার করেন জিয়া। তখন মনজুর এবং মতিউর জিয়া হত্যায় জড়িত হয়। দেশ স্বাধীনের পরে তাহের সেনাবাহিনীর মধ্যে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা গঠন করেন। তার পরামর্শে জিয়াউদ্দীন হলিডে পত্রিকায় সরকারের বিরুদ্ধে কলাম লিখে চাকুরিচ্যুত হন এবং সরাসরি সর্বহারা পার্টিতে যোগদান করেন। মাওলানা ভাসানী হক কথা এবং এনায়েত উল্লাহ খান হলিডে পত্রিকা দিয়ে ক্যামোফ্লাজ তৈরী করেন। কুমিল্লা ব্রিগেডের ব্রিগেড কমাণ্ডার থাকা অবস্থায় তাহেরের অধীনে ডালিম চাষাবাদে যুক্ত হয়। ওদিকে আরেক মাওবাদী অবসরপ্রাপ্ত সবিচ মাহবুবুল আলম চাষীও কুমিল্লায় চাষাবাদ শুরু করে। তাহের পরে সেনাবাহিনীর চাকুরি ছেড়ে দিয়ে খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রণালয়ের অধীনে ড্রেজিং অধিদপ্তরের পরিচালক পদে যোগদান করেন। বিস্ময়কর ঘটনা হল তাহেরকে সবাই জাসদের জানলেও তিনি কোনদিন জাসদে যোগদান করেন নি। তিনি আমৃত্যু সরকারি চাকুরি করে গেছেন। সৈনিক সংস্থা ছিল ব্যাকআপ সংগঠন, যাকে কার্যকর হতে দেখা যায় ৭ই নভেম্বরে। ২রা নভেম্বর রাতের অপারেশনটা ছিল মূলত খুনিদের বঙ্গভবন থেকে খেদানো। খালেদ, রক্ষীবাহিনীর নুরুজ্জামান এবং শাফায়াত জামিল নেতৃত্ব দিলেও সেটাতে সায় ছিল জিয়ার এবং পরিকল্পনার অংশ হিসাবে জিয়াকে অন্তরীন রাখা হয়। খালেদ মোশাররফকে সেনাবাহিনী প্রধান হওয়ার টোপটা গিলাতে সক্ষম হয় হলিডের এনায়েতউল্লাহ খান এবং বিচিত্রার শাহাদৎ হোসেন। এনায়েত উল্লাহর মতো শাহাদৎও মাওবাদী। খালেদ সেনাপ্রধান হয়ে গেলে জিয়া যোগাযোগ করেন তাহেরের সাথে। তাহের বিপ্লব করে বসেন এবং খালেদ নিহত হন। কিন্তু তা সত্ত্বেও জিয়া তাহেরের কোলে গিয়ে বসেন নি। তাহেরের ভাই ভারতের রাষ্ট্রদূত অপহরণের ঘটনায় নিহত হলে ভারতকে সন্তুষ্টু করতে তাহেরের ফাঁসির বন্দোবস্ত করেন জিয়া। সমস্ত অপকর্ম শেষ হয়ে গেলে মাওলানা ভাসানী তাঁর ন্যাপ পার্টিকে বিএনপিতে বিলুপ্ত করেন।

    Reply
    • hafiz mohammed

      আরও কিছু আপনার কাছ থেকে জানার জন্য অপেক্ষায়ে থাকলাম, অগ্রিম শুভেচ্ছা আর অনেক অনেক ধন্যবাদ রইল।

      Reply
    • Momtajul Ferdous Joarder

      রহমান ভাই বঙ্গবন্ধুর উপর অনেক প্রতিবেদন আমি লিখেছি, আমার ফেসবুকে গেলেই দেখতে পাবেন। আমার আইডি Momtajul Ferdous Joarder এবং bd news ডটকমের ব্লগেও এ নিবন্ধগুলোর বেশ কয়েকটা আছে। বঙ্গবন্ধুর উপর অবশ্যই আরও প্রতিবেদন ভবিষ্যতে লিখব। সেক্ষেত্রে আপনাদের শুভ কামনা আমাকে শক্তি যোগাবে।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—