২০০৯ সালে ভূমিধ্বস বিজয়ের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠিত হবার পর থেকেই ক্রমশ এক ধরণের নৈরাশ্যবাদিতায় আক্রান্ত হতে থাকে বিএনপির নেতাকর্মীরা। যত দিন যেতে থাকে এ নৈরাশ্যবাদিতার মাত্রা বাড়তে থাকে যা অচিরেই পরিণত হয় নিয়তিবাদীতায়। ফলে,আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের দুর্ণীতি এবং নানা অপকর্মের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলবার পরিবর্তে মনোজাগতিকভাবে তারা যেন কোন এক অজানা নিয়তির জন্য অপেক্ষা করতে থাকে, যে এসে আওয়ামী লীগকে সরিয়ে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে বিএনপিকে।
বর্তমানে এ নিয়তিবাদিতা চূড়ান্তভাবে জেঁকে বসেছে বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল, সব স্তরে। মাঠ পর্যায়ের বিএনপির যেকোন নেতাকর্মীর সাথে কথা বললে যে চিত্র পাওয়া যায় তাহল তাঁরা প্রায় সবাই এক বাক্যে বিশ্বাস করে বসে আছেন যে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে কোন আন্দোলনের দরকার নেই। আওয়ামী লীগের কর্মফলের কারণেই  নিয়তির অমোঘ বিধানে তাদেরকে একদিন ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হবে।
নিয়তির অমোঘ বিধানের কথা বললেও সেই নিয়তি বলতে তারা অনেকেই বাস্তবতা বিবর্জিত, সেনা হস্তক্ষেপের আশা করে বসে আছেন। ২০০৯ সালের দিকে তাঁদের মাঝে এ বিশ্বাস এত প্রবল হয়ে উঠেছিল যে কোন কোন কেন্দ্রীয় নেতাও সেসময় আবেগ চেপে রাখতে না পেরে বলে ফেলেছিলেন আরেকটি ১৫ই আগস্ট আসন্ন। এরই ফলশ্রুতিতে বিডিআর বিদ্রোহের সময় অনেক বিএনপি নেতাকর্মীর মাঝে একটা চাপা উল্লাস পরিলক্ষিত হয়।
এছাড়া বিএনপির অনেক সমর্থক মনে করেন হেফাজতের মত চরম দক্ষিণপন্থার উত্থানেও সরকারের পতন ঘটতে পারে। এর বাইরে তাঁরা আশা করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এ ধরণের বাইরের চাপ। এমনকি কেউ কেউ এমন কল্পনার জগতে ডুব দিয়েছেন যে তাঁরা মনে করছেন যে ভারতের মোদী সরকারও ভবিষৎতে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে।
এ ধরনের নানা কাল্পনিক জগতে ডুবে থাকা মাঠ পর্যায়ের যেকোন কর্মী সমর্থককে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় তাঁরা নিজেরা কেন আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন না, তাঁদের সবার  কাছ থেকে সাধারণত যে উত্তরটি পাওয়া যায় তাহল পুলিশ তাঁদের কোন অবস্থাতেই রাস্তায় দাঁড়াতে দিচ্ছে না, পুলিশ প্রযুক্তিগতভাবে অনেক উন্নত এখন, ফলে এ পুলিশের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে রাস্তায় আন্দোলন করা সম্ভব নয় ইত্যাদি। এছাড়া আন্দোলনে জেল,মামলা ইত্যাদির ভয়ও রয়েছে।
অর্থাৎ, পুলিশের ভয়ে ভীত হয়ে তাদের দলীয় প্রধানের মুক্তির দাবীতে ন্যূনতম প্রতিবাদও জানাতে পারছে না বিএনপি। আর এ দাঁড়াতে না পারা থেকেই বিএনপি তার ভবিষ্যত নিয়তির হাতে ছেড়ে দিয়ে বসে আছে। বর্তমানে বিএনপির কার্যক্রম এতটাই নগন্য যে এরশাদের ঘরোয়া রাজনীতির সময়েও আওয়ামী লীগ, সিপিবি প্রমুখ দল এর চেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল।
বস্তুত, ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বিএনপির রাজনীতি পরিচালিত হচ্ছে এ নিয়তিবাদের উপর নির্ভর করে। এ নিয়তিবাদিতার কারণেই দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া গ্রেফতার হবার পরেও ন্যূনতম আন্দোলন তো দুরের কথা, দেশের কোথাও সে অর্থে তারা একটি প্রতিবাদ মিছিল বা সমাবেশ  করতে চায়নি বা পারেনি।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের সময় তৎকালীন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ফরহাদ ১৯৮০ সালে নারায়ণগঞ্জে এক জনসভায় আবেগবশত বলে ফেলেছিলেন বাংলাদেশে আফগান স্টাইলে বিপ্লব করা হবে। সেসময় মাত্র সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্থানে প্রবেশ করেছে বাম সরকারকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সাহায্য করবার জন্য। অতিরিক্ত সতর্ক জিয়া সরকার তখন ফরহাদকে বন্দী করে প্রথমে মৃত্যুদণ্ড এবং পরবর্তীতে তা রদ করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। সিপিবির মত একটি ছোট রাজনৈতিক দলও সেসময় যেভাবে দেশব্যাপী মিছিল, মিটিং, দেয়াল লিখন ইত্যাদি করে তার ছিটেফোঁটা উদ্যোগও বিএনপির মত দল থেকে এখন পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয় নাই।
শুধু এবারই নয়, ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের ১/১১ এর ছদ্ম “সামরিক শাসনের” সময় যখন বেগম জিয়া প্রথমবারের মত বন্দী হলেন তখনো এ দলের নেতাকর্মীদের তাদের নেত্রীর মুক্তির দাবীতে মিছিল, মিটিং করতে দেখা যায় নাই। তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়াসও তাদের মাঝে পরিলক্ষিত হয় নাই।
বরং, খালেদা জিয়াকে বন্দী রেখে সেসময় সাইফুর রহমান, আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া, মেজর (অবঃ) হাফিজের মত বাঘা বাঘা বিএনপি নেতারা উদ্যোগ নিয়েছিলেন বেগম জিয়াকে বহিস্কার করে নতুনভাবে দল গড়ে তোলার। এ উদ্যোগের সাথে সেসময় সামিল হয়েছিলেন তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী। প্রয়াত খন্দকার দেলোয়ার হোসেনসহ কিছু কর্মী সমর্থক তখন দলকে টিকিয়ে রাখবার জন্য সাহসী ভূমিকা না রাখলে বিএনপি আজকে সাংগঠনিকভাবে যে অবস্থায় রয়েছে সে অবস্থায় থাকত কিনা সন্দেহ।
কিন্তু, খালেদা জিয়া মুক্ত হবার পর সাইফুর রহমান, মান্নান ভুঁইয়ার মত শীর্ষস্থানীয় হাতে গোণা দুই-একজন বাদে বাকি সবাইকে “ক্ষমা” করে দিয়ে আবার দলে ফিরে আসার সুযোগ দেন। শুধু তাই নয়, সাইফুর রহমান এবং মান্নান ভুঁইয়া মারা যাবার পর বিএনপির নেতাকর্মীরা উদারতা দেখিয়ে তাঁদের জানাযাসহ মৃত্যু-পরবর্তী অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতায় যোগ দেন।
এখানে অপ্রাসঙ্গিক হলেও একটি বিষয় উল্লেখ না করলে নয়। এটি দল হিসাবে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি বুঝতে সহায়ক হবে। বাম দল হিসাবে পরিচিত বাসদ ভেঙ্গে কয়েক বছর আগে মুবিনুল হায়দার চৌধুরী, শুভ্রাংশ চক্রবর্তী এবং আব্দুল্লাহ সরকারের নেতৃত্বে বাসদ (মার্কসবাদী) নামে আরেকটি দল গঠন করা হয়।
আব্দুল্লাহ সরকার যখন মারা যান তখন অপর বাসদের (খালেকুজ্জামান) নেতা কমরেড খালেকুজ্জামানসহ কোন নেতাকর্মী আব্দুল্লাহ সরকারের শেষকৃত্যে অংশগ্রহণ করতে আসেন নাই। বাম রাজনৈতিক প্লাটফরম থেকে ক্রমাগত উন্নত সংস্কৃতি ও মননের কথা বলে যাওয়া এবং এর পাশাপাশি তাঁদের ভাষায় আওয়ামী লীগ, বিএনপির মত বুর্জোয়া দলগুলোর সংস্কৃতিগত দৈন্যের বিরুদ্ধে উচ্চকিত থাকা ব্যক্তিবর্গ থেকে এ ধরনের হীনমন্যতায় তখন অনেককেই স্তম্ভিত হয়েছিলেন।

বিএনপি, আওয়ামী লীগের মত দলগুলোর কাছে যেহেতু আদর্শের চেয়ে ভোটের হিসাবটা মুখ্য তাই তারা সাধারণত নেতাকর্মীর সংখ্যা বাড়াবার হিসাবে বেশি ব্যস্ত থাকেন। খালেদা জিয়া হয়ত এ ভাবনা থেকেই ১/১১ এর হোতাদের সাথে যারা হাত মিলিয়েছিলেন তাঁদের অধিকাংশকে ক্ষমা করে দিয়ে দলে সক্রিয় হবার সু্যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু যে বিষয়টা তিনি তখন বুঝতে সক্ষম হন নাই সেটা হল সংখ্যা ভোটের রাজনীতিতে সহয়ায়ক হলেও আন্দোলনের রাজনীতিতে সহায়ক নাও হতে পারে; বিশেষত সেই সমস্ত ব্যক্তিবর্গ যারা দলের সবচেয়ে দুর্দিনে নেত্রী এবং দলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
এ সমস্ত ব্যক্তিবর্গ আজকে দলকে নৈরাশ্যবাদিতা এবং নিয়তিবাদের দিকে ঠেলে দেবার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করলেও এ নিয়তিবাদিতার উৎস কিন্তু তাঁরা নন। বর্তমানের এ নিয়তিবাদিতার উৎস বুঝতে হলে, আমাদের চোখ ফেরাতে হবে দলটির জন্ম এবং বিকাশ প্রক্রিয়ার দিকে।

বিএনপির জন্ম প্রক্রিয়া নিয়ে যে মিথটি তৈরি করা হয়েছে তাহল বিএনপি হল সেনা- ছাউনি জাত দল। এ দল গঠনের মূল উদ্দেশ্য হল রাষ্ট্র কাঠামোয় সেনা আমলাতন্ত্রের স্বার্থ রক্ষা করা। অর্থাৎ, সেনা আমলাতন্ত্রের বেসামরিক মুখপাত্র হিসাবে কাজ করবার জন্য বিএনপি গঠন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ, জাসদ, সিপিবি, ন্যাপ (মো) প্রমুখ দলের দীর্ঘদিনের প্রচারণার ফলে জনগণের একটা বড় অংশের পাশাপাশি বিএনপি সমর্থকদের একটি অংশও এটি বিশ্বাস করেন। এ প্রচারণার ব্যাপ্তি এত গভীরে যে বিভিন্ন একাডেমিক গবেষকও বিএনপির জন্ম প্রক্রিয়াকে এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন।
উল্লেখ্য যে, উপরে উল্লিখিত দলগুলো শুধু প্রচারণার অংশ হিসাবে নয়, তাদের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই বিএনপি সম্পর্কে তারা এটি বিশ্বাস করেন। বিএনপি নেতৃবৃন্দ এবং বিএনপি ঘেঁষা বুদ্ধিজীবিদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হল এ মিথটির বিপরীতে তাঁদের দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গ্রহণযোগ্যভাবে জনগণের একটি বড় অংশের মাঝে বিএনপির গঠন প্রক্রিয়ার বিষয়টি তুলে ধরতে না পারা। আদর্শগত এবং বুদ্ধিবৃত্তিগত প্রবল দৈন্য অবশ্য দলটির জন্মলগ্ন থেকেই ছিল, যা থেকে বিএনপি আজো উত্তরণ ঘটাতে পারেনি।
এ কথা সত্য যে জিয়াউর রহমান উর্দি পরে দল গঠন করেছিলেন এবং এ দল গঠন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্র কাঠামোকে কাজে লাগিয়েছিলেন। তবে, এ দলটি গঠিত হয়েছিল ক্যান্টনমেন্টের বাইরে, সিভিলিয়ায়ন এলাকায়। কিছু সেনা অফিসারের এ দল গঠন প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্টতা এবং সমর্থন থাকলেও পুরো সেনা ছাউনির সমর্থন জিয়া পাননি। বরং সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশই জিয়ার দল গঠন প্রক্রিয়ার বিরোধী ছিল। এ বিরোধিতার কারণ মূলতঃ দুটো। এর একটি হল জিয়ার সফলতায় তাঁর প্রতি ব্যক্তিগত ঈর্ষা এবং অপরটি, আদর্শগত।
আদর্শগত কারণে বিরোধিতাকারিরা মূলতঃ দুটো ভাগে বিভক্ত ছিল। প্রথমোক্ত ভাগে ছিলেন যারা ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী তাঁরা; অন্য কথায় বলতে গেলে এরা মূলতঃ আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রতি সহানুভুতিসম্পন্ন ছিলেন। আদর্শগত বিরোধিতাকারিদের আরেকটি অংশ কর্নেল (অবঃ)তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সমর্থক ছিলেন।
সেনাবাহিনীর সহায়তায় অভ্যুথান (তাহেরের ভাষায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব) সংগঠিত করে জাসদকে ক্ষমতায় আনবার জন্য তাহের সেনা সদস্যদের নিয়ে ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে এ সৈনিক সংস্থা গঠন করেছিলেন। বস্তুত, এ সৈনিক সংস্থা ক্ষমতা দখলের জন্য যে অভ্যুথান তাহেরের নেতৃত্বে পরিচালনা করে তারই ফসল হল জিয়ার ক্ষমতা দখল। অভ্যুথানের পর তাহের জিয়ার হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে মনে করেছিলেন তিনি নেপথ্যে থেকে জিয়ার মাধ্যমে জাসদের “বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের” ধারণা বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করবেন।
কিন্তু ক্ষমতা দখল করে জিয়া একদিকে যেমন দ্রুত গোপন সামরিক বিচারের মাধ্যমে তাহেরকে ফাঁসী দিয়ে তাঁর নিজের ক্ষমতা সংহত করতে উদ্যোগ নেন, তেমনি পাশাপাশি, মুসলিম লীগের রাজনৈতিক চেতনাকে ক্ষমতার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণার জন্ম দিয়ে। জিয়া বুঝতে পেরেছিলেন সেসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে নানাবিধ কারণে প্রবল অজনপ্রিয় আওয়ামী লীগের ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়াতাবাদী চেতনার ভিত্তিতে তিনি তাঁর রাজনীতিকে এগিয়ে নিতে পারবেন না।
ধর্মনিরপেক্ষ,অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ এবং জাসদের প্রতি সহানুভূতি সম্পন্ন সেনা অফিসাররা জিয়ার হাত ধরে মুসলিম লীগ ধারার রাজনীতির পুনর্বাসনের বিরোধী ছিলেন। অপরদিকে, জিয়ার মত মুসলিম লীগ বা ইসলামপন্থার রাজনীতিতে যারা বিশ্বাস করতেন তাঁদের একটা বড় অংশও জিয়ার রাজনৈতিক সাফল্যে ঈর্ষান্বিত ছিলেন। এর বড় প্রমাণ হল একই ধারার রাজনীতিতে বিশ্বাসী হয়েও জেনারেল এরশাদ কর্তৃক পরবর্তীতে বিএনপি সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল।
সেনা আমলাতন্ত্রের হাতে ৭৫ পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দল হচ্ছে বিএনপি। এত ক্ষতি হওয়া সত্বেও বিএনপির কর্মী/সমর্থকদের নিয়তিবাদী মননের সবচেয়ে আশ্চর্য ব্যাপার হল মনোজাগতিকভাবে এর সেনা নির্ভরতা। অনুমান করা হয় সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অংশের বিরোধিতার ফলে জিয়া সরকারের বিরুদ্ধে কম পক্ষে ১৯ টি ব্যর্থ অভ্যুত্থান ঘটে। জিয়ার কঠিন হাতে এ অভ্যুত্থান দমন করবার ফলে অভ্যুত্থান পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় জিয়া সরকার কর্তৃক সহস্রাধিক সেনা সদস্যের প্রাণহানি ঘটে।

জিয়াউর রহমানকে শেষ পর্যন্ত প্রাণ দিতে হয় তাঁর বিরুদ্ধে সংঘঠিত ২০তম সেনা অভ্যুথানে।পরবর্তী সময়ে জেনারেল এরশাদ থেকে জেনারেল নাসিম এবং ১/১১ এর জেনারেল মঈন প্রত্যেকটি সেনা “অভ্যুত্থান” সংগঠিত হয় বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে।
জেনারেল এরশাদ এবং জেনারেল মঈনের অভ্যুত্থানে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বিএনপি। এ দুই জেনারেল চেয়েছিলেন দল হিসাবে বিএনপিকে দুর্বল বা শেষ করে দিতে। এ থেকে একটি বিষয় পরিস্কার যে সেনা আমলাতন্ত্রের একটি বড় অংশের নানা সময়ে বিরাগভাজনের শিকার হতে হয়েছে বিএনপিকে। কিন্তু তা সত্ত্বেও দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান যেহেতু তাহেরের অভ্যুত্থানের ফসল হিসাবে ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেজন্যই হয়ত বিএনপির কর্মী/সমর্থকরা এমন একটা ইলিউসনে ২০০৯ সাল থেকে বসবাস করছেন যে, কোন এক শক্তি এসে তাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে।
প্রবল ধীশক্তির অধিকারী জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করবার সাথে সাথে বুঝতে পারেন যে, তাঁকে অচিরেই মতাদর্শিকভাবে তাঁর পক্ষ এবং বিপক্ষ দুই ধরনের সেনা সদস্যদের তরফ থেকেই প্রবল বিরোধিতার মুখোমুখি পড়তে হবে। তিনি আরো বুঝতে পারেন শুধুমাত্র কিছু সেনাসদস্যের সমর্থনের উপর ভিত্তি করে তিনি ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন না। ক্ষমতায় টিকে থাকতে হলে ন্যূনতম একটা গণভিত্তি লাগবে আর এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দল গঠন।
জিয়ার দল গঠনের উদ্যোগের সাথে যারা সামিল হয়েছিলেন তাঁদেরকে দু’টি ভাগে বিভক্ত করা যায়। এর একটি হল বিভিন্ন দলের সুবিধাবাদী ব্যক্তিবর্গ, যাদের মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি করে নানা প্রকার অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সুবিধা আদায়। এর পাশাপাশি আমলাতন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে, অর্থের লোভ এবং ভয় দেখিয়েও কিছু লোককে জিয়া দলে ভিড়ান।
অপর ক্যাটাগরির ব্যক্তিবর্গ জিয়ার দল গঠন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছিলেন জিয়ার মাধ্যমে ডান এবং দক্ষিণপন্থার রাজনীতির যার আপাত অবসান ১৯৭২ সালে হয়েছিল বলে অনেকে ভেবেছিলেন সেটি ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা দেখে। এরা এসেছিলেন মূলত মুসলিম লীগসহ বিভিন্ন “ইসলামপন্থী” রাজনৈতিক দল ও “পিকিংপন্থী” আইনী এবং বেআইনী বাম দলসমূহ থেকে। তবে, বিএনপির কর্মীদের মূল অংশটা এসেছিল ন্যাপ (ভাসানী) থেকে।
সিপিবি এবং ন্যাপ (মো) যেমন তাদের নিজ নিজ দল বিলুপ্ত করে ১৯৭৫ সালে বাকশালে যোগ দিয়েছিল, সেই একই ধারা অনুসরণ করে তৎকালীন অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল ন্যাপ (ভাসানী) নেতা মশিউর রহমান যাদু মিয়া তাঁর দলকে বিলুপ্ত করে জিয়ার দলে যোগ দেন। বস্তুত, যাদু মিয়ার সমর্থন ছাড়া বিএনপি বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দল হয়ে উঠত কিনা সন্দেহ। ন্যাপের (ভাসানী) বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মীর বিএনপিতে যোগদানের ফলে এটি মূলধারার দল হয়ে ওঠে, যে সুবিধাটি জেনারেল এরশাদ পান নাই। কোন প্রধান রাজনৈতিক দল এরশাদের জাতীয় পার্টিতে বিলুপ্ত না হবার ফলে এটি রাজনীতিতে কখনই মূলধারা হয়ে উঠতে পারে নাই।
তবে, যাদু মিয়ার নেতৃত্বে ন্যাপের নেতা/কর্মীদের বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে বিএনপি একটি শক্তিশালী দল হিসাবে গড়ে উঠলেও জিয়া শঙ্কিত হয়ে ওঠেন দলীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু যাদু মিয়ার হাতে রয়েছে এ উপলব্ধি থেকে। যাদু মিয়া যদি কখনো তাঁর কর্মীদের নিয়ে দল থেকে বের হয়ে যান তাহলে দলের ভবিষ্যত কি হবে এ ভাবনা জিয়াকে পেয়ে বসে।

বিএনপি গঠনের অল্প দিনের মাথায় হঠাৎ করে ৫৪ বছর বয়সী যাদু মিয়া অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং মারা যান। যাদু মিয়ার পরিবারের ঘনিষ্ঠ অনেকেই এটিকে স্বাভাবিক মৃত্যু মনে করেন না এবং এদের কেউ কেউ একে ষড়যন্ত্রমূলক মৃত্যু বলে দেখেন। যদিও এদের কেউই জিয়াকে এ মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন না, তবে এ মৃত্যুর মাঝ দিয়ে জিয়ার জন্য দলের উপর নিজের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়।
দলের উপর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলেও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে দলছুট ব্যক্তিদের নিয়ে গড়ে ওঠা এ দলটি কোনদিন ক্ষমতাচ্যুত হলে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলতে পারবে কিনা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ জিয়া তা চিন্তা করে যেতে পারেন নাই। ফলে, জিয়া নিহত হবার পরে বিএনপি যখন এরশাদ কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হয় তখন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে না তুলে মওদুদ আহমেদসহ দলটির অনেক নেতা-কর্মী উর্দি পরা নেতৃত্বই জাতির ভবিষ্যত মনে করে সামরিক সরকারের সাথে হাত মেলান।
পরবর্তীতে, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন পনের দলীয় জোটের সাথে আন্দোলনে শরীক হলেও বিএনপির দুর্বলতা ধরা পড়ে যখন আন্দোলনের তুঙ্গ মুহূর্তে ১৯৮৬ সালে হঠাৎ করে আন্দোলন বন্ধ করে আওয়ামী লীগ, সিপিবিসহ কিছু দল নির্বাচনে চলে যায়। আওয়ামী লীগ পদত্যাগ করে আবার আন্দোলন শুরু না করা পর্যন্ত বিএনপি তার সহযোগীদের নিয়ে এরশাদ বিরোধী তেমন কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে নাই যা কিনা সরকারের পতন ঘটাবে। অপরদিকে, ১৯৯৬ সালে এককভাবে আন্দোলন করে আমরা আওয়ামী লীগকে বিএনপি সরকার ফেলে দিতে দেখেছি।

শুরু থেকেই কারো উপর নির্ভর করে ক্ষমতা দখল বা আন্দোলন করবার ফলে এককভাবে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার সংস্কৃতি বিএনপির মাঝে গড়ে ওঠে নাই। তাই ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে জামায়াত তার যুদ্ধাপরাধী নেতৃত্বকে মুক্ত করবার জন্য আন্দোলন গড়ে তোলে যা পরবর্তীতে পেট্রোল বোমা নির্ভর সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে পরিণত হয়—বিএনপি নেতৃত্ব তার কর্মীদের নিয়ে এ আন্দোলনের অনুগামী হয়।
জনসমর্থন না থাকায় সরকার কঠোর হাতে পেট্রোল বোমা নির্ভর সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন দমন করে ফেলে। পাশাপাশি, যুদ্ধাপরাধী নেতৃত্বের অনেকের ফাঁসী হয়ে যাওয়ায় এবং সরকারের দমন নীতির ফলে জামায়াত সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পরায় আন্দোলন থেকে দুরে সরে যায়। এমতাবস্থায়, খালেদা জিয়া গ্রেফতার হলে নিয়িতিবাদ নির্ভর বিএনপি নেতৃত্বকে অনেকটাই “Waiting for Godot” বা “গডোর প্রতীক্ষা”এর মত প্রতীক্ষা করা ছাড়া আর কোন ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে না।

এখন পর্যন্ত বাস্তবতা হচ্ছে, দলীয় প্রধান বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে প্রেরণ করবার পর বিএনপির যে পরিমাণ নেতাকর্মী রাস্তায় নেমেছেন, আশির দশকে সিপিবি একাই এর চেয়ে বেশি কর্মী রাস্তায় নামাতে পারত, যদিও সিপিবির পিছনে কখনই তেমন কোন জনসমর্থন ছিল না। এমনকি খালেদা জিয়ার আমলে স্বৈরাচারী এরশাদ যখন বন্দী ছিলেন, তখন পাঁচ বছরের পুরো সময়টাই জাতীয় পার্টির মত একটি দল তাদের নেতাকে মুক্ত করবার জন্য কম বেশি রাস্তায় ছিল।

১৯৭৮ সালের ১লা সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠা হবার পর থেকে বিএনপি এখন তার দলীয় ইতিহাসে সবচেয়ে সঙ্কটময় সময় অতিক্রম করছে। এমতাবস্থায়, বিএনপি যদি নিয়তির উপর নির্ভর করে থেকে মাঠের আন্দোলন (সন্ত্রাস নয়) গড়ে তুলতে না পারে এবং সঙ্কট উত্তরণের জন্য শুধুমাত্র আইনি লড়াই ও ফেসবুক এক্টিভিজমের উপর নির্ভর করে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে দলটির পরিণতি মুসলিম লীগ বা শেরে বাংলা ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির মত হলে বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না।
 

 

সাঈদ ইফতেখার আহমেদশিক্ষক, স্কুল অব সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিস, আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেম, পশ্চিম ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

১৬ Responses -- “নিয়তিবাদী বিএনপি”

  1. লতিফ

    বাংলাদেশে যে কোন রাজনৈতিক দলের সাফল্য/ব্যর্থতা আলোচনায় সবচে অগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল সমাজের ভেতরে চলমান অর্থনীতি। বঙ্গবন্ধু বাকশালের মাধ্যমে যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির দিকে বাংলাদেশকে ধাবিত করতে চেয়েছিলেন, কলোনিয়াল প্রশাসন ব্যবস্থাকে ভাঙতে চেয়েছিলেন, জিয়ার উত্থান তার বিপরীতে― এটা পুঁজিবাদের পথ এবং কলোনিয়াল প্রশাসনিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার পথ। পরিহাস বলি কি যাই বলি, জিয়ার সেই পথে সাংগঠনিকভাবে যে শক্তিটি তাঁর পাশে ছিল, তাঁদের নব্বইভাগ ভাসানী ন্যাপ থেকে আসা― যাদের মননে মার্কস, লেনিন ও মাও সে-তুঙ। এর বিপরীতে ছিলেন সাইফুর রহমান এবং অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলগণ, যাঁরা পুঁজিবাদের পথিক, কিন্তু সেটা অন্ধের হাতি দর্শনের মতো করে বুঝা পুঁজিবাদ। ফলে সমাজের স্বাভাবিক গতির কারণে পুঁজিবাদের যে বিকাশ হতে পারত সাবলিল, সরকারের নীতির আনুকুল্য থাকা সত্ত্বেও সেই বিকাশ হয়েছে বিকৃত। বাংলাদেশ বিকৃতভাবে পুঁজিবাদ বিকাশের এক জ্বলন্ত উদাহরণ, সেজন্য দেশের সবচে বড় পুঁজিপতিও এখানে মানসিকভাবে দেউলিয়া। জিয়ার সৈনিকদের বড় অংশকে দেখবেন হয় তারা বহুজাতিক পুঁজির দালালি করছে (লোকাল এজেণ্ট) অথবা সরকারের পুঁজির ঠিকাদারি। ভাসানীর সৈনিকদের এই সমস্যাটা ছিল না। তাঁরা ছিলেন নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে আসা পুঁজিরস্পর্শহীন একঝাঁক তরুণ, সেজন্য গণঅভ্যুত্থানের ত্যাগ স্বীকারে তাঁদের মনে কোন দোলাচল ছিল না। পুঁজির স্পর্শে ফুল যেখানে ক্রয়যোগ্য পণ্য, সেখানে মানুষ তো নস্যি। ভাসানীর সৈনিকরা জিয়ার সৈনিকে রূপান্তরিত হলেও অতীতের সেই সোনালী স্বপ্নকে ভুলতে পারেন নি, সেজন্য মাঝে মধ্যেই তাদের মধ্যে গণঅভ্যুত্থান ফাল দিয়ে ওঠে। বিএনপির উচিত ছিল পুঁজিবাদ বিকাশের স্বাভাবিক গতিধারা নিশ্চিত করা, ওটাই তাদের নিয়তি নির্দ্ধারিত পথ। অপরদিকে বাকশালের লিগেসি থাকার কারণে আওয়ামী লীগের জন্য পুঁজিবাদের পথে পা ফেলাটা ছিল কঠিনতম বিষয়, কিন্তু তারা সেটা করেছে এবং তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক শক্তির যে পুনর্বিন্যাস ঘটে চলেছে নদীর তলদেশের স্রোতে, সেখানে আওয়ামী লীগ এক অাস্থার প্রতীক। অথচ শুরুটা করেছিল বিএনপি। তাহলে বিএনপি কী করতে পারে? বিকৃত পুঁজিবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করা অথবা পুঁজিবাদকে শৃঙ্খলমুক্ত করা। বিএনপি ওই পথে না হাঁটলে তারা বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তখন নতুন সামাজিক শক্তির সমর্থনে নতুন রাজনৈতিক শক্তির আবির্ভব ঘটবে।

    Reply
  2. আশিকুর রহমান

    লেখার নিরপেক্ষতা ধরে রাখতে গিয়ে বিএনপি’র হাত ধরে বিভিন্ন সময়ে রাজাকার পুনর্বাসনের ব্যাপারটা কিন্তু এড়িয়ে গেলেন যেটা চোখে লেগেছে। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের অনেক লোক আছে যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতি পছন্দ করেন না। বিএনপি কিন্তু তাদের সমর্থনও কোনোদিন পাবে না কারণ স্বাধীনতাবিরোধীদের সাথে দহরম মহরম।

    গঠনকালীন সময়ে আওয়ামী আদর্শের বিরোধিতাই বিএনপি’র মূল চেতনা হলেও সেটাই তাদের একমাত্র আদর্শ নয়। যদি শুধুমাত্র আওয়ামী বিরোধীদের মন জয় করার জন্যই ধর্মনিরপেক্ষতা থেকে সরে আসাটা জিয়া’র লক্ষ্য হতো তাহলে চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীদের ক্ষমতায় আনার দরকার পড়তো না। তার ক্ষমতাকালীন পুরোটা সময়ই পাকিস্তানপন্থী পারপাস সার্ভ করেছে। একইভাবে ঘৃণিত জামাতকে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে বিএনপি’র রাজনীতি।

    এসব কারণেই প্রশ্ন থেকে যায়, বিএনপি কি শুধুই পরনির্ভরশীল একটা দল নাকি স্বাধীনতাবিরোধীদের পারপাস সার্ভ করার একটা ফ্রন্ট মাত্র।

    Reply
    • সরকার জাবেদ ইকবাল

      “মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের অনেক লোক আছে যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতি পছন্দ করেন না। বিএনপি কিন্তু তাদের সমর্থনও কোনোদিন পাবে না কারণ স্বাধীনতাবিরোধীদের সাথে দহরম মহরম।” – একদম খাঁটি কথা বলেছেন। তবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি পছন্দ করি না বিষয়টি তেমন নয়; আওয়ামী লীগের বিপথগামিতা দেখে আহত হই।

      Reply
  3. Bongo Raj

    জিয়াকে নানান মনগড়া তথ্য উপাত্য দিয়ে হিরো বানানোর গুপ্ত চেষ্টা যতই করা হোক না কেন, লেখার মাঝে আপনা আপনিতেই যেই সত্যটা বেরিয়ে এসেছে তা দিয়েও জিয়া স্বাধীনতার পক্ষের লোক ছিল না প্রমাণ করা যায়। যেমন লেখকের লেখা নিচের অংশটা-
    “অপরদিকে, জিয়ার মত মুসলিম লীগ বা ইসলামপন্থার রাজনীতিতে যারা বিশ্বাস করতেন তাঁদের একটা বড় অংশও জিয়ার রাজনৈতিক সাফল্যে ঈর্ষান্বিত ছিলেন।” এই বাক্য যে সত্যি তাতে ভুল নেই (আজ তা হাতে হাতে প্রমাণিত), মুসলিম লীগের রাজনীতিতে বিশ্বাস করা লোক স্বাধীনতার পক্ষের লোক কোনোভাবেই হতে পারে না।

    অন্য ফ্যাক্টর, জিয়াকে ধরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে নিয়ে আসার পর (জিয়া নিজ থেকে বেতার কেন্দ্রে গিয়েছেন বিএনপিও বলে না), স্বাধীনতার ঘোষণাটি পড়তে দেওয়া হয়। এর বাইরে স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়া বীরের মত যুদ্ধ করে পাকি কুত্তাদের ১ টাকেই মেরেছে এমন একটা লেখা, প্রমাণ আছে কি? না কোথাও নাই কেন? তাহলে জিয়াকে স্বাধীনতার পক্ষের লোক কোনোভাবেই বলা যেতে পারে না।

    উপরের দুটো পয়েন্টকে যথোপযুক্ত জবাব দিয়ে খণ্ডাতে না পারলে, জিয়ার বানানো রাজনৈতিক দলটা বাংলাদেশে রাজনীতি করার সু্যোগটাও তো পাবার কথা নয়!! তবে হ্যাঁ, বিএনপি যারা করেন তারা, একটা পাগলেও যদি আওয়ামী লীগ বিরোধী, ভারত বিরোধী আর একটু খানি রসের আশ্বাস দিয়ে (যদিও বেআইনি রসের আশ্বাস পেলেও ৯৯% বাঙ্গালীর জিবেই জল আসে) রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে থাকে, তার পিছনে লাইন দেবেই।

    তাই বিএনপি নিয়ে মহাকাব্য লেখাটা বাতুলতা। আওয়ামী লীগ নিজেকে শুদ্ধ না করলে, ভারতের কংগ্রেসের মত অবস্থা হবে তাতে কোনও ভুল নেই, কিন্তু তার অনেক আগেই বিএনপি বিলুপ্ত হবে এতেও ভুল নেই!!

    Reply
    • লতিফ

      ২৬শে মার্চ রাতে কর্ণেল জানজুয়া রশিদকে ধরে আনা এবং মেরে ফেলার কৃতিত্ব জিয়ার। ৮ম ইস্ট-বেঙ্গলের বিদ্রোহের নেতৃত্বও তাঁর। ৮ম ইস্ট বেঙ্গল গঠনের দিক থেকে নতুন, পাকিস্তানে চলে যাওয়ার সিডিউলের কারণে অস্ত্র তেমন ছিল না, তা সত্ত্বেও ওই বিদ্রোহকে সাহসী বলতে হবে। যুদ্ধের ইতিহাস থেকে দেখা যাচ্ছে, কেবল ২য় ইস্ট বেঙ্গল ছাড়া সকল বেঙ্গলের কমাণ্ডিং অফিসার ছিল পাকিস্তানি। কিন্তু ২য় ইস্ট বেঙ্গলের বাঙালি অধিনায়ক বিদ্রোহ করতে অস্বীকার করেন। যাহোক, চট্টগ্রামে যুদ্ধ চলেছে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত, জিয়া (এপ্রিলের চার তারিখে সিলেটে ওসমানীর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে যোগদানের সময়টুকু বাদে) এবং শওকতের নেতৃত্বে সেই যুদ্ধ হয়েছে। এরপর ১১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক হিসাবে অক্টোবর পর্যন্ত যুদ্ধ করেছেন, সফল অপারেশন আছে, ব্যর্থতাও আছে। অক্টোবরে মেজর তাহের ওই সেক্টরের দায়িত্ব নেয়ার পরেও অবস্থার কোন পরিবর্তন হয় নি। জিয়া ছিলেন কনভেনশনাল যোদ্ধা, তার জন্য যে ধরণের সমরসজ্জা দরকার, সেটা কোন সেক্টরেই ছিল না, ফলে একটা সময় এসে তিনি ব্রিগেড গঠনের উদ্যোগ নেন, ওসমানী ছিলেন এই মতের সমর্থক। ২ নম্বর সেক্টরে গেরিলা যুদ্ধের কৌশল নেওয়া হয়, যার অধিনায়ক ছিলেন মেজর খালেদ মোশাররফ। কিন্তু জিয়ার ব্রিগেড গঠনের উদ্যোগ দেখে তিনি এবং সফিউল্লাহ উভয়েই ব্রিগেড গঠনের পেছনে দৌড়াতে শুরু করেন। ফলে অক্টোবরের পরে এই তিন সেনানায়কের একমাত্র কাজ হয়ে পড়ে ব্রিগেড গঠন।

      Reply
      • Bongo Raj

        জনাব লতিফ
        আপনার কমেন্টা অনেক আগ্রহ নিয়ে বার বার পড়ে দেখলাম। আপনার লেখাতেও প্রমাণ হয় যে, ২৬ মার্চ ঘিরেই জিয়ার কার্যকলাপ প্রায় শেষ হয়ে যায়। অক্টোবর পর্যন্ত যুদ্ধ করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন তা কিন্তু জিয়ার বীর গাঁথা যুদ্ধের কোন প্রমাণ হয় না। ১৯৭১ এর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিভিন্ন লেখা পড়ে সহজেই বোঝা যায় যে, ২৬ মার্চ ঘিরে জিয়ার কার্যকলাপ যা ছিল একই সময়ে তার চাইতে বেশী ছিল মেজর মীর শওকতের। তাছাড়া, ২য় ইস্ট বেঙ্গলের বাঙালি অধিনায়ক বিদ্রোহ করেন নাই বলে, জিয়া মার্চের পর মোটামোটি নিরব ছিলেন তার excuse হতে পারে না। তারপরও অনুরোধ, জিয়ার বীর গাঁথা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অন্য কোন তথ্য থাকলে পেশ করুন, বাধিত হবো।

  4. modi kohen

    ফকরুল বলেই দিয়েছে তাদের বয়স হয়ে গিয়েছে/ তাদের পক্ষে রাজপথে নামা আর সম্ভবপর নয়/ যুবদল ও ছাত্রদল উভয়কে রাস্তায় নামতে হবে/ আর রিজভী দশ/বারো জন নিয়ে ভোর বেলা হঠাৎ হঠাৎ মিছিল করছে/

    Reply
  5. kawser

    `১৯৯৬ সালে এককভাবে আন্দোলন করে আমরা আওয়ামী লীগকে বিএনপি সরকার ফেলে দিতে দেখেছি’ এটা সত্যের চরম অপলাপ। তখন জামায়াত ইসলামী, জাতীয় পার্টিকে নিয়ে আন্দোলন করেছিল। এ ধরনের মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার কেন প্রয়োজন হলো লেখকের। এমনকি ১৯৮৬ সালে এরশাদের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার ক্ষেত্রে সিপিবির নাম লিখলেও জামায়াতের নামটি কৌশলে এড়িয়ে গেলেন কেন, বুঝতে পারলাম না।

    Reply
  6. Mute Spectator

    প্রবন্ধটি দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। লেখকের সব কথার সাথে একমত হওয়া কারো পক্ষেই সম্ভব না কারণ সকল পক্ষ সম্পর্কেই তিনি হয় ভুল নতুবা অর্ধসত্য বলেছেন। এতে মানুষ বিভ্রান্ত হবে। হাতের কাছের ইতিহাস বই ঘাটলে বা যে কোন দলের সিনিয়র নেতার সাথে কথা বললে বা সে সময়ের পত্রিকা দেখলেই এই লেখার দুর্বলতা ধরা পরবে। দুটো কারণে ক্ষমতাশীল দল নির্বাচনে হারে। একটি হচ্ছে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা আর একটা হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের রণনীতি আর আদর্শের বিরোধী আদর্শ আর রণনীতি বেশি পপুলার হয়। যে সব দেশে আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত কোয়ালিটি নির্বাচন হয় সেইসব দেশের সরকার পরিবর্তনের ধারা লক্ষ্য করলে তা বোঝা যায়। যেমন ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা কিম্বা ইউরোপের দেশগুলো। এখন পর্যন্ত দেশে নানা কারণে এন্টি আওয়ামীলীগ ভোট বেশি। বিএনপি মনে করে এই ভোট তারা পাবে। সুতরাং এরা সুূষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দেশে ও বাইরে জনমত সৃষ্টি করছে, এতে ভুলটা কোথায়? এই মুহুর্তে বিএনপি আন্দোলন করলে নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিএনপি’র যে লাভ হবে না তা সবাই বোঝে। আন্দলনের চেয়ে এই কৌশলটাকে এরা বেশি উপযোগী মনে করছে। ভোটের পরই বোঝা যাবে কোনটা ঠিক ছিল। তবে খোদা না করুন কোন মৌলবাদী দল আওয়ামী লীগের বিকল্প হওয়ার পুর্ব পর্যন্ত বিএনপিই প্রধান দক্ষিণপন্থী দল থাকবে। রাজনীতি কিন্তু ক্রিকেটের চেয়েও বেশি Game of uncertainty.

    Reply
  7. সৈয়দ আলী

    বিএনপি’র জন্ম আমলা-নির্ভর হলেও ঐতিহাসিকভাবে বিএনপি ও জিয়া একটি জনপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। জিয়া চরম দক্ষিণপন্থীদের বশে রেখে দল পরিচালনা করেতে পারলেও তার মৃত্যুর পরে দক্ষিণপন্থীরাই ক্ষমতাবান হয়ে উঠে এবং এখান থেকেই বিএনপি’র সামান্য অগ্রসর ভূমিকার মৃত্যু ঘটে। ২০০১ সালে ক্ষমতাসীন বিএনপি তারেক-খালেদার নেতৃত্বে একটি জামাতি লেজুড়ে পরিণত হয়। শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী করায় জিয়া যতো নিন্দিত ও জনপ্রিয়তাহীন হয়েছিলো, তারেক-খালেদার আচরন বিএনপিকে আরো হীনবল করে। বিএনপি তার মূল শক্তি যুবদলকে হারায় ও তারেকের বশংবদ পেশীবাজদের উত্থান ঘটায়।
    ২০০৮ সালেরও আগে মইনুর শাসনকালেই বিভিন্ন ইতর পদ্ধতিতে বিএনপিকে ক্ষীয়মান করা হয়। এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ক্ষয়িষ্ণু বিএনপিকে মামলা-হামলা দিয়ে সফলভাবে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেয়। তারেক-খালেদার অবিমৃশ্যকারিতা ও রাজনৈতিক নির্বোধিতা বিএনপিকে মূলহীন দলে পরিণত করেছিলো, এবার আওয়ামী লীগের ক্লিনিক্যাল আক্রমনের পর তৃণমূল থেকে বিএনপি অপসারিত হয়।

    Reply
  8. শুভ্র

    দলকানা গাফফারীয়, জাফরীয় ধারার বিপরীতে নিরপেক্ষ মুক্তবুদ্ধিতার চমৎকার উদাহরণ। বিডিনিউজে মাঝে মাঝে দু’একজন নিরপেক্ষ বুদ্ধিমান লেখকের লেখা প্রকাশিত হতে দেখিয়া বিডিনিউজের একটি নির্দিষ্ট দলমুখীতার সন্দেহাতীতার বিষয়ে সংশয় আসিয়া যায়।

    Reply
  9. সরকার জাবেদ ইকবাল

    চমৎকার বিশ্লেষণ! ব্রিটিশ-ভারতে মুসলিম লীগ ছিল ভারতীয় মুসলমান বিশেষত বঙ্গীয় মুসলমানদের প্রাণের প্রতিষ্ঠান। কিন্তু, এই মুসলিম লীগই ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চরমভাবে ধিকৃত হয়। কেননা, এ দেশের মানুষ আর ধর্মভিত্তিক রাজনীতি পছন্দ করলো না। তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিতে উজ্জীবিত হয়ে দেশ স্বাধীন করার জন্যে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। বিএনপি এই ঐতিহাসিক বাস্তবতাটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে, তারা মুসলিম লীগের মতো আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে – এটাই স্বাভাবিক।

    তবে আওয়ামী লীগকে ধোয়া তুলসিপাতা মনে করার কোন কারণ নেই। কেননা, বর্তমান আওয়ামী লীগ আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় স্থিত নেই; তাদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক আলামত ঢুকে পড়েছে যা ঘুনপোকার মতো পুরো ‘ভবন’টিকেই একদিন ধ্বসিয়ে দিতে পারে।

    একটি পরামর্শ: আপনার লেখাগুলো প্রায়শ দীর্ঘ হয়ে থাকে। ফলে, ঐ পরিসর দেখে পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলি। কিন্তু, আপনার লেখা কিছুতেই ‘মিস’ করতে চাই না। তাই, ধৈর্য ধরে মনোযোগ দিয়ে পড়লাম। আগামীতে পর্ব-১ পর্ব-২ এভাবে ভাগ করে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করছি। অবশ্য, এ কাজটি বিডিনিউজ-ও করতে পারে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—