বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর জাতীয় নির্বাচনে কিছু ইস্যু থাকে, যা সব দলের কাছেই সমানভাবে সমাদৃত হয়। ‘অভিবাসন’ ইস্যুটি সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। উগ্র-ডানপন্থীদের কাছে ইস্যুটি অতিমাত্রায় জনপ্রিয় হওয়ায় প্রায় দুই যুগেরও অধিক কাল ধরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের জাতীয় সংসদে তারা ক্ষমতার প্রায় কাছাকাছি যেতে সক্ষম হয়েছে। অনেক দেশে উগ্রবাদীরা পার্লামেন্টে ভারসাম্য দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে সমর্থ হয়েছে। সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, জার্মানী, ফ্রান্স এবং বেলজিয়াম ছাড়াও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই প্রবণতা অত্যন্ত প্রকট হওয়ায় মধ্য ও বামপন্থীরা ছাড়াও উদারপন্থী দলগুলো রাজনীতিতে টিকে থাকতে উগ্রবাদীদের প্রবণতায় গা ভাসাতে বাধ্য হচ্ছে। স্বাভাবিক কারণেই ইউরোপের বহুল পরিচিত মানবিক গণতন্ত্রের ধারা বিঘ্নিত হচ্ছে! তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে উগ্র-মৌলবাদের বিস্তার লাভের মত প্রায় একই ধারায় ইউরোপেও বিস্তার লাভ করছে উগ্রবাদ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে ইউরোপ মানবিক আদর্শের পথে ধাবিত হয়েছিল, তা যেন একটু একটু করে সেই পূর্বাবস্থায় ফিরে যাচ্ছে! নির্বাচনের রাজনীতিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর প্রবণতাও ঠিক ইউরোপের ধারায় ধাবমান বললে অত্যুক্তি করা হবে না। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পশ্চিমা পুঁজিবাদের আশির্বাদপুষ্ট উগ্রমৌলবাদের উত্থান ইউরোপের উগ্র-ডানপন্থীদের মতই লক্ষণীয় এবং একই মানসিকতায় ধাবমান। যে কারণে রাজনীতিতে টিকে থাকার স্পৃহায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদার, মধ্য ও বামপন্থী দলগুলোর মৌলবাদের সাথে আপোষকামী গা ভাসানোর প্রবণতাও কারো দৃষ্টি এড়ায় না!

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও উপরের কথাগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক; বিশেষ করে আগামী নির্বাচনের কারণে। প্রাচীন আমল থেকেই বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের ভিত্তি নির্মাণ হয়েছিল সুফিবাদ সংস্কৃতির প্রভাবযুক্ত এক মানবিক ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্য দিয়ে। পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে সেই অনুশীলিত ধর্মীয় অনুশাসনের আধুনিক রূপান্তরই হচ্ছে “ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ”, যা পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সাথে সমার্থক নয়। বাহাত্তরে বাংলাদেশে ও তারও পূর্বে ভারতের সংবিধান রচনা ধর্মনিরপেক্ষতার আলোকে হলেও, রাষ্ট্রীয় অনুশীলনে তা একটু একটু করে কমতে শুরু করেছে বিগত বছরগুলোতে। ধর্মচর্চায় ব্যক্তিস্বাধীনতার চূড়ান্ত অনুমোদনই হচ্ছে, “ধর্মনিরপেক্ষতা”, যা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা থেকে ধর্ম-শাসনকে বিচ্ছিন্ন করার অনুমোদন দেয়। ধর্মীয় মৌলবাদ বাংলার ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সংজ্ঞাকে বিকৃত ও মনগড়া ব্যাখ্যার মাধ্যমে পশ্চিমা ধর্মনিরপেক্ষতা এবং নাস্তিকতার সাথে তুলনা করার যে হীনপ্রচেষ্টা দেখিয়েছে, তা মিথ্যার বেসাতি ছাড়া আর কিছুই নয়! সব ধর্মের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পূর্ণাঙ্গ রূপই হচ্ছে আমাদের এ অঞ্চলের ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ’, যা পাশ্চাত্যের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সংজ্ঞা এবং চর্চা থেকে আলাদা। ১৯৭২ সালে  জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছিলেন, “ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। তাতে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্ম-কর্ম করার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আমরা আইন করে ধর্মকে নিষিদ্ধ করতে চাই না এবং করব না। মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে। তাদের বাধা দিবার ক্ষমতা এই রাষ্ট্রের কারো নেই। হিন্দুরা তাদের ধর্ম পালন করবে, কারো বাধা দিবার মতো ক্ষমতা নেই। বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম পালন করবে, খ্রিস্টানরা তাদের ধর্ম পালন করবে। তাদের কেউ বাধা দিতে পারবে না। আমাদের শুধু আপত্তি হলো, ধর্মকে কেউ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে না। ২৫ বছর আমরা দেখেছি ধর্মের নামে জুয়াচুরি, ধর্মের নামে বেঈমানী, ধর্মের নামে অত্যাচার, খুন, ব্যভিচার বাংলাদেশের মাটিতে চলেছে। ধর্ম অতি পবিত্র জিনিস। পবিত্র ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা চলবে না। যদি কেউ বলে যে ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়েছে- আমি বলব, ধর্মীয় অধিকার খর্ব করা হয়নি। সাড়ে সাত কোটি মানুষের ধর্মীয় অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা করেছি” (গণপরিষদের ভাষণ, ১২ অক্টোবর ১৯৭২)।

পঁচাত্তর পরবর্তী প্রতিটি নির্বাচনে স্বাধীনতাবিরোধী চক্র, বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ভোটযুদ্ধে যে অপপ্রচার চালিয়েছিল, তার প্রধান অংশজুড়েই ছিল ভারতের সাথে ঐতিহাসিকভাবে এই দলটির বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা। ভারত বিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়িয়ে অনেকবারই স্বাধীনতাবিরোধী এই চক্রটি বোকা বানিয়েছে বাংলার জনগণকে। তাদের অপপ্রচারগুলো ছিল এমন যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিক্রি করে দেবে প্রতিবেশী দেশ ভারতের কাছে। ভারতের প্রতি নতজানু নীতির কারণে আওয়ামী সরকার বিএসএফ দ্বারা সীমান্ত হত্যা বন্ধ করতে তো পারবেই না, বরং তা বহুগুণে বেড়ে যাবে। বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যানুযায়ী তিস্তার পানি আনতে পারবে না। ছিটমহল সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। তিন বিঘার যে অধিকার বাংলাদেশের রয়েছে, সে অধিকার আওয়ামী সরকার আদায় করতে পারবে না ভারতের কাছ থেকে। ভারতের প্রতি নতজানু রাজনীতির কারণে ভারতীয় পরিবহণকে বাংলাদেশের ভিতরে শুল্কমুক্ত বিচরণের অনুমতি দিয়েছে… ইত্যাদি। তবে ভোটের রাজনীতিতে এই স্বাধীনতাবিরোধী দুষ্টচক্রটি সবচেয়ে বেশি যে প্রচারণা চালিয়ে বাংলাদেশের সহজ সাধারণ মানুষের মনে অমূলক ভীতির সঞ্চার ঘটিয়েছে এবং মহামূল্যবান ভোটগুলো হাতিয়ে নিয়েছে, তা হলো-আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে এই দেশ আর মুসলমানদের থাকবে না, মসজিদে উলুধ্বনি শোনা যাবে, আযানের ধ্বনি উচ্চারণ হবে না, সবাইকে জোর করে হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হবে ইত্যাদি। স্বভাবতই সরল ধর্মপ্রাণ বাংলাদেশী মুসলমানেরা ভীত হয়েছে এবং আওয়ামী বিদ্বেষী মনোভাবে জামায়াত-বিএনপিকে ভোট দিয়েছে।

নব্বই পরববর্তীতে আওয়ামী লীগ চারবার ক্ষমতায় এসেছে এবং বর্তমানেও আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পদ্মার পানি বন্টন চুক্তি হয়েছে। ছিটমহল সমস্যার সমাধান হয়েছে। তিন বিঘা জমিও বাংলাদেশ ফেরত পেয়েছে। শুল্কমুক্ত ভারতীয় পরিবহণের অনুমতি ভারত পায়নি। সীমান্তে হত্যার প্রবণতা প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের মাঝে ইতিবাচক বোঝাপড়া পূর্বের যেকোন সময়ের চেয়ে বেশি বলেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। তিস্তার পানি বন্টনে আওয়ামী সরকারের কূটনীতি এতোটাই ইতিবাচক যে, যেকোন সময়ই এই চুক্তি হয়ে যাবে বলে শোনা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ের মাধ্যমে ভারত এবং মিয়ানমারের কাছ থেকে বাংলাদেশ ফিরে পেয়েছে সাগরের বিশাল এলাকা। অর্থাৎ জামায়াত-বিএনপি যে প্রপাগান্ডাগুলো পঁচাত্তরোত্তর নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে, সেগুলো খুব সুক্ষ্ম এবং সুন্দর ইতিবাচক রাজনৈতিক জবাব মহাজোট সরকার ইতিমধ্যে দিয়েছে।

স্বাধীনতাবিরোধীরা ভারতবিদ্বেষী অবস্থানে থেকে সুবিধা করতে না পেরে এখন বিভিন্ন পন্থায় ভারতপ্রেমী হওয়ার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি স্বাধীনতার পক্ষের সরকারকে আবারো চেষ্টা হচ্ছে ‘নাস্তিক’ সরকার আখ্যা দেয়ার। মৌলবাদীরা ব্লগারদের নাস্তিক হিসেবে সিল মেরে দেয়ার যে অপচেষ্টা করেছিল, তাতে তারা অনেকাংশেই সফল হয়েছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলোর সহযোগিতায় এবং মদদে শুরু করেছিল ব্লগার, বিদেশী এবং লেখক হত্যা, যার পক্ষে মানুষের এক ধরণের নিরব সমর্থনও তারা আদায় করতে পেরেছিল। বিগত বছরগুলোতে জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ সরকার যথেষ্ট সফল হয়েছে। জঙ্গিবাদ দমনে সরকারের পদক্ষেপগুলোকে জামায়াত-বিএনপি জোট আওয়ামী সরকার কর্তৃক মুসলাম নিধণ কর্মকাণ্ড হিসেবে অপপ্রচার করেছে। ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার এবং বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বাম দলগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীন রাজনীতিও মৌলবাদের অগ্রযাত্রাকে যথেষ্ট উৎসাহিত করেছে।

‘ধর্মভিত্তিক রাজনীতি’ মূল ধর্মের সৌন্দর্য্যকেই শুধু নষ্ট করে না, সেই সাথে কলুষিত করে সমাজ, দেশসহ গোটা জাতিকে। আদর্শিক রাজনীতির অভাবে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির অনুপ্রবেশ ঘটেছে এ দেশেরই বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠীর হাত ধরে। একাত্তরবিরোধী শাসকরা ধর্মকে ব্যবহার করেছে তাদের অপকর্মগুলোকে প্রতিষ্ঠা দিতে। ধর্মের আড়াল না পেলে অনেক ‘নষ্টামী’ করা থেকে হয়ত তাদের বিরত থাকতে হতো। শাসকদের ধর্মের দোহাইগুলোর যোগানদাতা হিসেবে একচ্ছত্র ঠিকাদারী নিয়েছিল একাত্তরের পরাজিত শক্তি জামায়াতে ইসলাম। সরকারের উচিত হবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রেণির বুদ্ধিজীবীদের সাথে নিয়ে মৌলবাদ প্রতিহতের পন্থাগুলোকে খুঁজে বের করা। নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগ ছাড়াও সরকার ও প্রশাসনের মধ্যে ঢুকে পড়া জামায়াত-বিএনপির সদস্যদের খুঁজে বের করা অত্যন্ত জরুরী। মহাজোট সরকারের অভূতপূর্ব উন্নয়নকে দীর্ঘস্থায়ী করতে এবং জাতির পিতার সোনার বাংলাদেশ গড়ার পূর্বশর্ত হিসেবে বাংলাদেশ থেকে জামায়াত-বিএনপির অপরাজনীতি দূরীকরণের কোন বিকল্প নেই!

সাব্বির খানবিশ্লেষক, লেখক ও সাংবাদিক

১৬ Responses -- “স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষের ‘নির্বাচন-২০১৮’”

  1. Mahmood Hussain

    সাব্বির খান সৌভাগ্যবান যে আলহাজ্ব এ এস এম ওয়হিদুল হকের মতো স্বশিক্ষিত একজন ব‍্যক্তি মতামত দিয়েছেন। তিনি যে এ বিষয়ে যথেষ্ট লেখাপড়া করেছেন তা-ও অনুমেয়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে কোন মৌলবাদীর মন্তব্য নেই। তার অর্থ দাঁড়াচ্ছে জ্ঞানী বা লেখাপড়া করা লোকের পিছনে ওঁরা লাগতে সাহস পায় না।
    এ বিষয়ে আরও লেখা চাই।
    এ আলোচনা চলতে থাকুক।
    শুভকামনা রইল।

    Reply
  2. mak

    ১৯৯১ ও ২০০১ সালে জনগণ বিএনপিকে ক্ষমতায় এনেছিল। তাহলে জনগণ একাত্তরের পরে দুইবার বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানিয়ে ফেলেছিল। সুতরাং জনগণই দেশের আসল শত্রু। বন্ধু শুধু আওয়ামী লীগ।

    Reply
  3. সাব্বির খান

    সূধী,

    এই প্রথম আমার কোন লেখার নীচে অনেকগুলো সুচিন্তিত, বস্তুনিষ্ঠ এবং একাডেমিক আলোচনা হতে দেখলাম। লেখার আগে পড়াশুনা করতে হয়েছে কিছুটা শেখার জন্য। তারপর লিখেছি। আর এপর্যায়ে লেখার পরে আবারো কিছু শেখার সুযোগ করে দেয়ার জন্য অংশগ্রহণকারী আলোচকদের কাছে কৃতজ্ঞ। আপনাদের সবার সুস্থ্যতা ও মঙ্গল কামনা করছি। ধন্যবাদ।

    বিনীত-
    সাব্বির খান (মূল প্রবন্ধের লেখক)

    Reply
    • সরকার জাবেদ ইকবাল

      উষ্ণ অভিনন্দন সাব্বির খান। আরও লিখুন। আমরা বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ এবং দেশ গঠনমূলক লেখা বেশি বেশি চাই। কিন্তু, কিছু কিছু লেখকের একপেশে এবং তোষামোদী ধরনের লেখা ভিষণভাবে মানসিক পীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর, বিডিনিউজ যখন সেগুলোকে আশকারা দেয় তখন আর দু:খ রাখার জায়গা থাকে না। শুভ কামনা।

      Reply
  4. Alhaj A.S.M. Wahidul Islam

    ধর্মনিরপেক্ষতা অর্থ ধর্মহীনতা নয়। এর অর্থ বিশ্বাসের দিক দিয়ে সকল ধর্ম সমভাবে এক বা সমানও নয়। ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থ সকল ধর্মের লোকের প্রতি সমান আচরণ। ধর্মের কারণে কারও প্রতি অবিচার না করা, অসাম্য, বিভেদ সৃষ্টি না করা। আল্লাহ ধর্মের কারণে কারও প্রতি তাঁর করুণা বর্ষণে কার্পন্য করেন না। যদিও তাঁর কাছে ধর্ম একটিই। তবু তিনি শুধু তাঁর মনোনীত ধর্মের অনুসারীদের উপরই কৃপা করেন না। যারা তাঁকে মান্য করে তাদেরকে যেমন তিনি পালন করেন, তেমনি যারা তাঁকে মানে না, বিশ্বাস করে না, তাদেরকেও তিনি পালন করেন, জীবিকা প্রদান করেন। তিনি আস্তিক, নাস্তিকসহ সকল ধর্মের লোকদের পালনকর্তা এবং ক্রমোন্নতিদাতা রব। শুধু মানুষই নয়, জগতে যারা বাস করে তারা সবাই তাঁর পরিবার। তিনি এই পরিবারের একমাত্র কর্তা। আল খালকু আয়ালুল্লাহ। অর্থ– সৃষ্ট সব কিছুই তাঁর পরিবার। পবিত্র কোরআনে অন্যত্র বলেছেন, জগতের সব কিছুই সকল মানুষের জন্য সৃষ্ট। শুধু মুসলমানের জন্য সৃষ্ট বলা হয়নি, বলা হয়েছে সকল মানুষের জন্য। বিশ্বপ্রকৃতির সব কিছুই সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষ সমভাবে ভোগ করছে। এ ব্যাপারে মুসলমান অমুসলমানে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। আর এটাই তো হল ধর্মনিরপেক্ষতা।

    সকল মানুষ একই সম্প্রদায়ভূক্ত– আল কোরআন। সূর্য আলো ও উত্তাপ দেয় সকলের জন্য। ধর্মের বা বিশ্বাসের কারণে এখানে কোনো পক্ষপাতিত্ব হয় না। চন্দ্র কিরণ দেয় সকল মত ও পথের লোকের জন্য। এতে কোনো তারতম্য হয় না। বাতাস থেকে আস্তিক-নাস্তিক সবাই শ্বাস গ্রহণ করে থাকে। পানীয় জল সকল প্রকার ধার্মিক ও অধার্মিকের পিপাসা নিবারণ করে। উৎপন্ন ফসল সকলের খাদ্য। এমনকি যত উপকারী বস্তু আছে তা ভেদাভেদশূন্যভাবে সকল মানুষের জন্য ব্যবহৃত হয়। আর যত ক্ষতিকর জিনিস তা সকলেরই ক্ষতি সাধন করে। ঔষধের ক্রিয়া ধর্মবর্ণগোত্রনির্বিশেষে মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। আর এরই নাম ধর্মনিরপেক্ষতা।

    ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বলতে বোঝায় রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের জন্য সমান ব্যবহার। চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানি করলে মুসলমান হোক বা অমুসলমান হোক সবারই একই প্রকার শাস্তি হবে। সকল ধর্মের লোককে একই হারে খাজনা দিতে হবে। সকল ধর্মের লোকই রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাজে যোগ্যতানুযায়ী চাকুরী পাবে। মুসলমান হিসেবে বিশেষ কোনো সুবিধা ভোগ করবে না। ধর্মানুযায়ী কর্মের বিচার স্বয়ং আল্লাহ করবেন। ধর্মের বিচার মানুষ করবে না। রাষ্ট্র করবে জাগতিক কাজের বিচার। রাষ্ট্র কখনও কোনো ধর্মের ইজারাদার হতে পারবে না। মসজিদ, মন্দির, গীর্জা ইত্যাদি থাকবে নিজ নিজ ধর্মসম্প্রদায়ের হাতে। তারা এই সব উপাসনালয়ের তত্বাবধান করবে। সরকার এর উপর হস্তক্ষেপ করবে না। কোনো বিশেষ ধর্মাবলম্বীকে কোনো প্রকার বিশেষ সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হবে না। সকল ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীর সঙ্গে সমান ন্যায়বিচার ও ব্যবহার করবে। আল্লাহর দান বৃষ্টির মতো। বৃষ্টি যখন নামে তখন সবার জন্যই রহমত হয়। আল্লাহর সৃষ্ট আগুন মুসলমানের আমিষ এবং হিন্দুর নিরামিষ রাঁধতে তারতম্য করে না। আগুনে হাত দিলে মোল্লা, পুরোহিত বা পাদ্রীর হাত সমভাবে পুড়ে যাবে। এই হল ধর্মনিরপেক্ষতা। এই নিরপেক্ষতা আল্লাহর বিধান। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন অর্থাৎ সকল জগতের স্রষ্টা ও পালনকর্তা। তিনি শুধু রাব্বুল মুসলেমীন নন। অতএব, কোনো বিশেষ ধর্ম কোনো রাষ্ট্রের ধর্ম হতে পারে না। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ধর্মের বেলায় তো রাষ্ট্রধর্ম হওয়ার প্রশ্নই উঠে না।

    রাষ্ট্রধর্ম ব্যবস্থাটি ধর্মনিরপেক্ষতার উল্টো। আল্লার সৃষ্ট প্রকৃতি বা বিধান এহেন মতবাদ সমর্থন করে না। মহানবী (সা:) মদিনার সনদে সকল ধর্মের লোকের সমঅধিকার স্বীকার করেছেন। মুসলমান, ইহুদি এবং পৌত্তলিকদেরকে এক উম্মত বলেছেন। এ থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত। ইসলাম প্রকৃতিসম্মত ধর্ম, অর্থাৎ দ্বীনে ফিতরাত। অতএব, আমাদেরকে প্রকৃতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেতে হবে। সংকীর্ণতা ইসলামে নেই। আমাদেরকে আল্লাহর গুণে গুণান্বিত হতে হবে। আল্লাহ সালাম, তাই আমরা হব শান্তি প্রিয়। আল্লাহ মুমেন, এজন্য আমাদেরকে বিশ্বাসী হতে হবে। আল্লাহ রহিম, তাই আমাদেরকে রহম দীল হতে হবে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলকে সমভাবে কর্মভেদে দান করতে হবে। এই রুপে আল্লার যত গুণ আছে সেই সব গুণের বিকাশ ঘটাতে হবে আমাদের জীবনে। আমাদের আকাশের ন্যায় উদার এবং বাতাসের ন্যায় সর্বজনীন হতে হবে। সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে উঠতে হবে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকলের প্রতি সমান আচরণ করতে হবে। আল্লাহ যেমন– আস্তিক, নাস্তিক, ধার্মিক, অধার্মিক সবাইকে সমভাবে লালন পালন করেন, তেমনি আমাদেরকেও পক্ষপাতশূণ্য হয়ে সকল মত ও পথের লোকের সঙ্গে সমান ব্যবহার করতে হবে। আর এই হল সত্যিকারের ধর্মনিরপেক্ষতা, অর্থাৎ ধর্মের কারণে পক্ষপাতিত্ব না করে সবার প্রতি পক্ষপাতহীন সমান আচরণ করা।

    এই বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে আল্লারই সিফাতের বিকাশ ঘটছে। পবিত্র কোরআন বলে, তুমি যেদিকেই তাকাবে আল্লার মুখমণ্ডল (গুণাবলীর বিকাশ) দেখতে পাবে। আল্লাকে চর্মচক্ষে দেখা যায় না। আল্লাহকে দেখতে হবে তাঁর কর্মের মধ্যে। বিশ্বপ্রকৃতির মধ্যে, তাঁর সৃষ্টির মধ্যে তাঁকে দর্শন করা যায়। আর এ জন্যই জগতকে বলা হয় আলম। আলম ‘ইলম’ শব্দ থেকে উৎপন্ন। জগতকে আলম এজন্যই বলা হয় যে, আলমকে দেখলে আলীম খোদাকে জানা যায়। হাদিসে বলা হয়েছে, যে নিজেকে চিনতে পেরেছে সে আল্লাহকেও চিনতে পেরেছে। যে কোনো সৃষ্টিকে লক্ষ্য করলে আমরা আল্লাহর গুণাবলীর বিকাশ দেখতে পাই। দেখতে পাই, তিনি দানের বেলায় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ।

    Reply
    • সরকার জাবেদ ইকবাল

      ধর্মনিরপেক্ষতার এমন বস্তুনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য (Authentic) ব্যাখ্যা আগে কখনও পাইনি। অশেষ ধন্যবাদ জনাব ওয়াহিদুল ইসলাম। আশা করি ধর্মান্ধ ও উগ্রবাদীরা এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে।

      Reply
    • Sumit Mazumdar

      Sri Wahidul Islam: I was deeply touched by your perspective on secularism and secular governance. You make it very clear that there is no conflict between wisdom and faith. Thank you, Sir!

      Reply
  5. সেলিম

    ভোট হলেই তো ভোটের প্রশ্ন আসবে।
    বাংলাদেশে এক সময় ভোট হতো- এটা এখন ইতিহাস।

    Reply
  6. সজল কান্তি

    ভোটের অধিকার নিয়ে যদি কিছু লিখতেন! বর্তমানে কি ভাবে ভোট হচ্ছে তা নিয়ে যদি কিছু লিখতেন! খুলনা গাজীপুরে কিভাবে ভোট হলো! ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের মতে গাজীপুরের নির্বাচনে ৪৬% ভোটকেন্দ্রে অনিয়ম হয়েছে এটা নিয়ে যদি লিখতেন! স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও যদি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন করতে না পারি তাহলে দায় কার যদি লিখতেন! স্বাধীনতার পক্ষ বিপক্ষ করে দেশটা কতটা পেছালো তা নিয়ে যদি লিখতেন! ভোট নামের তামাশা কবে বন্ধ হবে যদি লিখতেন! আশেপাশের সব দেশ যদি নিরপেক্ষ সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারে আমরা কেন পারি না যদি লিখতেন!

    Reply
  7. Mute Spectator

    ধর্মনিরপেক্ষতা এখন একটি শব্দ মাত্র সারাবিশ্বে। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ যে সময় হয়েছিল তখন ধর্মনিরপেক্ষতা শব্দটির একটি ব্যাপক সামাজিক সাংস্কৃতিক অর্থ ছিল যা লেখক উল্লেখ করেছেন। স্নায়ুযুদ্ধের পর সাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্ল্যাটফর্ম ভেঙ্গে যায়, ধর্মীয় উগ্রতা একটি আদর্শ হিসাবে শূন্যস্থান পূরণ করে। ভারতে ডানপন্থীদের উত্থান হাজার বছরের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তালিবান, আলকায়েদা, আইসিস, ওহাবী মওদুদীবাদ ইত্যাদি নানা ঘরানা ইসলামকে সুফিবাদ থেকে বিযুক্ত করতে সমর্থ করেছে। ধর্ম পালন এখন রেজিমেন্টেশনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পোশাক-আসাক, খাওয়া-দাওয়া, চালচলন সবকিছুতেই উগ্রতাকে গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়েছে। এমন এক সংস্কৃতির জন্ম দেয়া হয়েছে যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা নামক শব্দটিকে যাদুঘরে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভারতে বিজেপি মানুষকে এটা বিশ্বাস করাতে তৎপর যে ধর্মনিরপেক্ষতা একটি ভুল ধারণা যা সংবিধানে থাকা উচিৎ না। সাধু মহারাজা আর বাবাদের দাপট এখন ভারতের সমাজে। আমরা সংবিধান থেকে জিয়া এরশাদের আনা সামরিক ফরমানের সংশোধনী বাতিল করতে পারি না, কেন? জনমতের চাপে। এর জন্য যে রাজনৈতিক সংস্কৃতিক লড়াই দরকার এবং যারা এটা করবেন বলে ৫২ সাল থেকে সিদ্ধান্ত হয়ে আছে তাঁরাই এখন ফরমান জারি করেন এই বলে যে পহেলা বৈশাখে বিকেল পাঁচটার পর সবাইকে ঘরে ফিরে যেতে হবে।

    সুতরাং দীর্ঘ সময় ব্যাপী একটা আদর্শিক লড়াই বিশ্বের বিশাল ক্যানভাসে চালিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশে একটা ভোটের লড়াইয়ের মাধ্যমে এর সুরাহা হবে না।

    Reply
  8. জয় আহমেদ

    আমার বয়স ১৮ চলছে…ইন্টার ২য় বর্ষে পড়ছি.। এই লেখা পড়ে অনেক কিছু সম্পর্কে জানতে এবং বুঝতে পারলাম। স্বাধীনতা বিরোধীদের চরিত্র এবং তাদের মিথ্যা প্রোপাগান্ডা গুলো সম্পর্কেও অবগত হলাম… লেখককে অনেক ধন্যবাদ!

    Reply
  9. সরকার জাবেদ ইকবাল

    অত্যন্ত নিরীক্ষাধর্মী এবং তথ্যনির্ভর লেখা। পড়ে ভাল লাগলো, বিশেষ করে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র যে অপব্যাখ্যা হয়েছে তার বিশ্লেষণটি চমৎকার। ধর্মনিরপেক্ষতা যে নাস্তিকতার প্রতিশব্দ নয় বরং সকল ধর্মের প্রতি সমান সম্মান প্রদর্শন করার মাধ্যমে ধর্মীয় মূল্যবোধকেই প্রতিষ্ঠিত করে- এ কথাটি জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করা গেলে ধর্মীয় সন্ত্রাস কমে আসবে বলে আমার ধারণা।

    Reply
  10. লতিফ

    কোন শব্দ যদি দুটো বিপরীতমূখী ব্যাখ্যা গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখে, তাহলে সমস্যাটা বুঝতে সেই শব্দের মূলে যেতে হবে। ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দের মূল হল ধর্ম, ফলে যেভাবেই ব্যাখ্যা করেন না কেন, ধর্মের আশ্রয় ছেড়ে সেই শব্দ সাবালক হয়ে উঠতে পারবে না। ইংরেজি সেক্যুলার শব্দের গ্রহণযোগ্য প্রতিশব্দ হতে পারত লৌকিকতা। লৌকিকতার মূলে আছে লোক বা মানুষ, সেখান থেকে লৌকিক, অর্থাৎ মানুষের আচরণ― সেটা ইহজাগতিক হতে বাধ্য। মানুষ কী বিশ্বাস করে অথবা করে না, তারচেয়ে বড় সত্য তার আচরণ, সেখানেই তার পরিচয় যাকে সে আঁকড়ে ধরে। রাষ্ট্র লৌকিকতার চর্চাকে নিশ্চিত করবে― এই এক ঘোষণা ধর্ম নিরপেক্ষতা নিয়ে যে বিতর্ক সেটার সমাপ্তি টানতে পারে।

    Reply
    • সরকার জাবেদ ইকবাল

      জনাব লতিফ, সবিনয়ে বলছি, সেক্যুলারিজম-এর প্রতিশব্দ হিসেবে লৌকিকতাকে গ্রহণ করা হলে ধর্মনিরপেক্ষতার অর্থকে সীমিত করে ফেলা হয়। কেননা, লৌকিকতার বিষয়টি ষোলআনা ইহজাগতিক, আর, ধর্মনিরপেক্ষতা ইহজাগতিক সীমা অতিক্রম করে অলৌকিক বা পারলৌকিক সীমানায় পরিব্যাপ্ত। কাজেই, আমার মনে হয় লৌকিক আচার-আচরণকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি সকল ধর্মের আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে ‘প্রোমোট’ করাও জরুরি। তা না হলে সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতার বিষবাষ্প থেকেই যাবে।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—