অসংযম কি আনন্দ দেয়? দেয় হয়তো, তবে নিশ্চিতভাবেই তা অমিতানন্দ, যা সামষ্টিক স্বার্থে নির্ধারিত সদাচারের সীমানা মানে না। এহেন আনন্দ লাগামহীন, ফলে নিজের আনন্দকে নিশ্চিত করতে গিয়ে সে অন্যের আনন্দকে ব্যাহত করতে ছাড়ে না। ব্যক্তি সেখানে সমষ্টিকে দেখে না, নিজেকেই জ্ঞান করে অমিতশক্তি। পক্ষান্তরে সংযম যে আনন্দ দেয়, তা অন্যের আনন্দকে নিরানন্দে পরিণত করে না। কেননা সংযমের নিয়ন্ত্রক সদাচার, আর অসংযমের নিয়ন্ত্রক অজাচার। নজরুলের বহুশ্রুত ঈদ-আগমণী-ধ্বনি ‘রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’; পঙক্তিটিকে আমরা এই দৃষ্টিকোণ থেকেই লালন করতে চাই। ধ্যানে ও জ্ঞানে তাকে এভাবেই হৃদয়ে ধারণ করতে চাই।

কিন্তু পারি না। কেন পারি না, তার কারণ বলেও শেষ করতে পারি না। প্রথম কারণ, আমরা সবাই রোজা রাখি না। রোজার অর্থ সংযম বা ঢাল। কেন রোজা রাখি না তারও নানা কারণ। কিন্তু যে কারণেই হোক, রোজাই যদি না রাখলাম তাহলে ‘খুশির ঈদ’ পেলাম কী করে? অন্তত তা তো নজরুলের কাব্যযুক্তির ধোপে টেকে না।

ধর্মের কথা না বলে আমি আগে কবির কথা বলছি, কবিতার কথা বলছি। পাশাপাশি ধর্মের কথাও বলতেই হবে। কেননা ঈদ একটি ধর্মীয় বিধান থেকে উদ্ভূত সাংস্কৃতিক আচার বা রিচ্যুয়াল। রোজা মানে সংযম : দেহের ও মনের। রোজা না করা মানে সেই দ্বিবিধ সংযম পালন না করা। রমজানের রোজা পালন যে করেনি, তার কাছে রমজান বা রোজা আসেওনি; ফলে শেষও হয়নি। রমজানের রোজা শুরু বা শেষ যার কাছে হয়নি, তার কাছে ‘খুশির ঈদ’ আসারও কোনো পথ নেই। অথচ অপ্রিয় হলেও সত্য, একালে তেমন রোজাহীনদের কাছেই এই আনন্দ দৃশ্যত ব্যাপকতর হয়ে উঠছে। তারা রোজা পালন না করে কেবল ইফতারের ভুরিভোজই করে না, পোশাকি আনন্দে সেজে-গুজে অমিত নৃত্যানন্দে পকেট খালি করে কেনাকাটাও করে। কেনাকোটায় তারা জুড়িহীন, সংযমহীন। তেমন অসংযমী ক্রেতার আধিক্যের কারণেই পুরো রমজান মাস জুড়ে পণ্যসভ্যতাবাহী হাটবাজারগুলো রমরমা হয়ে ওঠে অচিন্তিতপূর্ব। এক টাকার পণ্য হয় দশটাকা। আবার পণ্যের মানের চেয়ে আড়ং-ভড়ংই বেশি। সেই পণ্য উচ্চবিত্তের পকেট খালি করতে পারে না, কেননা তার বিত্তের সরবরাহ নিত্যচলমান; তার কোনো শেষ নেই। পণ্যবাজার শুধু খালি করতে পারে সীমিতবিত্তধারীর আয়ের পকেট। সীমিতবিত্তের যা কিছু বিত্ত তা শোষণ করে পণ্যব্যবসায়ী আরো বিত্তবান হয়। সমাজে শ্রেণিবৈষম্য বাড়ে, সম্পদ বণ্টনে অসাম্য ব্যাপকতর হয়। ধনতন্ত্র এ পথেই সম্পদের পাহাড় সাজায়। তা কোনদিন সাধারণ মানুষের কাজে আসে না। বরং বেশির ভাগ বিদেশি ব্যাংকে জমা থাকে। একসময় সে-ও তার অবৈধ সম্পদের অধিকার হারায়।

না, এমনটি তো হতে দেয়ার কথা নয়। উচিতও নয়। রোজার বিধান যে মহামানবের মাধ্যমে এসেছে তিনি তো তেমনটি করেননি। তিনি চলনে-বলনে পোশাকে-আশাকে আহারে-পানীয়ে পরম মিতাচারী। তিনি আহার করতেন পাকস্থলী সামান্য অপূর্ণ রেখে, যা চিকিৎসাবিদ্যা অনুসারে সর্বাধিক স্বাস্থ্যসম্মত। নিজের পোশাক ছিঁড়ে গেলে সেলাই করে পরতেন, তালি লাগাতেন। আমাদের রাজা-বাদশাহদের মতো জুতা-পোশাকের জাদুঘর বানাতেন না। আমরা তাঁর মতো হতে না পারলেও অন্তত তাঁকে অনুসরণ করতে পারি। তাঁর কথামত উদ্বৃত্ত আয়ের সামান্য অংশ প্রকৃত বিত্তহীনকে দিতে পারি। তবে তারও আগে সীমালঙ্ঘন না করার ব্রত রপ্ত করতে পারি। তাহলেই সংযমের অনুশীলক হতে পারি; রোজাও পালন করতে পারি। সুস্থ মানুষ রোজা রেখে বিপন্ন হয়েছেন এমন কোনো নজির নেই। জীবন বিপন্ন হলে রোজা সঙ্গতকারণে ভাঙারও বিধান আছে। অসুস্থ ব্যক্তির জন্যে রোজা বাধ্যতামূলক নয়। তার জন্যে পালনযোগ্য অন্য পথ আছে। সুস্থ মানুষ অসুস্থতার ভান করলে চলবে না। তাতে পুরো সমাজটাই ভানসর্বস্ব হয়ে উঠবে।

অথচ আমরা বাস করছি তেমন ভানসর্বস্ব সমাজেই। পৃথিবীতে কত কোটি মুসলমান? তাঁদের মধ্যে কতজন ভানহীন ঈমানদার? না, এই হিসাব আমাদের জানা নেই। আমাদের জানামতে, আমরা খাই বেশি, দেখাই বেশি; কিন্তু মহানবীর জীবনযাপনকে অনুসরণ করতে ভয় পাই। আমরা রোজা না রেখে ইফতার করি; আর রোজাদার না হয়েও ঈদের আনন্দে জেল্লাদার হয়ে উঠি। রাস্তাঘাট বন্ধ করে যানজট বাড়াই। মহাসড়ক থেকে নগর-সড়ক বা অলিগলি কিছুই বাদ রাখি না। এভাবেই নিজের সংযমী হওয়ার রাস্তাও নিজেই বন্ধ করি। শুধু বাংলাদেশ-ই নয়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের সর্বত্র মানুষ যেখানে অবৈধ বিত্তলোভী ও ক্ষমতালোভী হয়ে উঠেছে, সেখানেই এমন লাগামহীন অসংযম চলছে। স্মর্তব্য, উচ্চারণ মাত্রেই যেমন উপাসনা নয়, রিচুয়্যাল মাত্রেই তেমন ধর্মাচার নয়।

যেখানে নি:শ্বাস, বিশ্বাস, কর্ম ও কর্মফলের মধ্যে সংযমী সমন্বয় নেই, সেখানে সামষ্টিক স্বার্থের অর্জন নেই। এই ধরনের ধর্মধারীরা আসলে কপটাচারী। ইসলামের পরিভাষায় মোনাফেক। মোনাফেক দিয়ে ইসলাম রক্ষা করা যায় না, যেমন অমানুষ দিয়ে মানবতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

ইসলাম প্রকৃত মানবতার ধর্ম। প্রকৃত মুসলমান একজন মোমিন, একজন ইনসানে কামেল : একজন সফল মানুষ। তিনি সংযমী, সদাচারী ও সামষ্টিক স্বার্থের রক্ষক। তিনি নিজের ভিতর নিজের স্রষ্টাকে লালন করেন। তিনি অন্যের ভিতরও সেই স্রষ্টার অস্তিত্ব বিরাজমান দেখেন। কেননা ইসলাম বলে, স্রষ্টা সর্বত্র বিরাজমান। তাই মোমিন কখনো হন্তারক নন, বরং সতর্ক সংযমী। শান্তির ধর্ম ইসলাম এ-কারণেই সর্বাধিক সংযমী। সেই সংযমের প্রকৃত প্রশিক্ষণ রোজা। যে বিশ্বাসী হয়েও তা করে না, তার জন্যে কোনো বৈধ অর্জন নেই। অর্জন নেই তো আনন্দও নেই।

না, নজরুল মিথ্যে বলেননি। রমজানের রোজার শেষে অবশ্যই ঈদ আসে। সংযমের ঈদ। আসুন সংযমী মানুষ হই, সেই আনন্দকে সংযতভাবে অস্বাদন করি। তাহলে এই মাটির পৃথিবীও হয়ে উঠবে প্রকৃত আনন্দলোক।

১৫-১৬.০৬.২০১৮ 

মুহম্মদ নূরুল হুদাকবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

Responses -- “সংযম নেই তো আনন্দ নেই”

  1. সোহেল

    আসলেই মানুষের মাঝে এখন সংযম নিয়ে খুবই কম গবেষণা দেখা যায় , এটার শিক্ষা কি আমরা ভুলে যাচ্ছি যার ফলে আমরা এখনও মানুষ হতে পারছিনা ফলে সর্বত্র অশান্তি ।

    Reply
  2. মাহ্মুদুল হাসান

    ইসলামের কোথায় বলে যে স্রষ্টা সর্বত্র বিরাজমান?

    Reply
    • Mohammad Nurul Huda

      অনুগ্রহ করে ‘আয়াতুল কুরসি’-র বাংলা অনুবাদ ও ব্যাখ্যা পড়ুন। আপনার প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবন। ভালো থাকুন।

      Reply
  3. সরকার জাবেদ ইকবাল

    অসাধারণ! কপটতা আর সততার এমন তুলনামূলক লেখা কোনদিন পড়িনি। লেখককে অভিনন্দন। আশা করি অনেকেই উপকৃত হবেন।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—