সক্রিয় রাজনীতি করার ইচ্ছে কখনও হয়নি। ছোটবেলা থেকেই রাজনীতিবিমুখ হয়ে বেড়ে উঠতে শুরু করি। তবে খুব বেশী দিন রাজনীতি থেকে নিজকে দূরে সরিয়ে রাখা যায়নি। স্বৈরশাসক এরশাদের পতন ও একানব্বই নির্বাচনে বিএনপির জয়ের ফলে রাজনীতি চর্চার প্রতি ক্রমশ আগ্রহী হয়ে উঠি। তবে সক্রিয় রাজনীতিতে আকর্ষণ বোধ করিনি। আগেও না, এখনো না।

স্বৈরশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পতনের পর একানব্বই সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হল। নির্বাচনের আগে ও পরের সময়টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল খুবই উত্তপ্ত ছিল। একদিকে এরশাদের পতনের চূড়ান্ত ঘণ্টা বাজছে, অন্যদিকে তৎকালীন মার্কিনী প্রেসিডেন্ট জর্জ  বুশ ইরাকে হামলার হুমকি দিচ্ছে।

১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণায় বেশ কিছু রেকর্ড করা গান বাজতে শুনতাম। সেই সময়টি আমরা নিম্ন মাধ্যমিক স্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে যাই। “যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই” গানটি বেশি বেশি করে বাজতে শুনতাম। আমাদের গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের সামনে ছিল নির্বাচনী ক্যাম্প। সেই নির্বাচনী ক্যাম্পে ভোর থেকে সকল নীরবতাকে ছিন্ন করে অসাধারণ গানটি বেজে উঠতে।

ঠিক তখন থেকেই মনের ভিতর কয়েকটি প্রশ্ন বারবার জেগে উঠত। নিশ্চিত করেই বলতে পারি সেইগুলিই ছিল আমার জীবনে প্রথম রাজনৈতিক প্রশ্ন।

প্রশ্নগুলি ছিল “যে মানুষটি বিশাল একটি জনগোষ্ঠীকে স্বাধীন ভূমি দিয়েছে সেই মানুষটিকে কারা মেরে ফেলল? কেন মেরে ফেলল? মানুষটির কি কোন ভুল ছিল? কেন আজো বিচার হয়নি?” তখনও জানতে পারিনি, কেবল বঙ্গবন্ধুকে নয় তাঁর পরিবারের সবাইকে রাতের অন্ধকারে হত্যা করা হয়েছে।

আমাদের গ্রামীণ পারিবারিক পরিবেশে রাজনীতি নিয়ে টুকটাক আলোচনা হত। গ্রামের মুরুব্বিরা বঙ্গবন্ধুকে শেখ সাব বলেই ডাকতেন। আস্তে আস্তে জানলাম, বঙ্গবন্ধু ছাত্র বয়স থেকেই রাজনীতি-ঘেঁষা মানুষ।  

স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে যখন কলেজে আসলাম, তখন বিএনপি ক্ষমতায়। গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকায় মানুষের কথা বলা ও চিন্তা প্রকাশের ক্ষেত্রটি সহজ হয়ে ওঠে। ফলে পঁচাত্তর থেকে নব্বই পর্যন্ত বাংলাদেশের যে গৌরবময় ইতিহাসটিকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেটি ক্রমশ আলোতে আসতে লাগল। যে “রাজাকার” শব্দটি শুনিয়ে আমাদেরকে ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ানো হত, আমাদের প্রজন্ম সেই রাজাকারদের ক্রমশ চিনতে শুরু করি।

চারটি ঘটনায় বিএনপির সরকারের সেই সময়টি আলোচিত ছিল। দিনাজপুরের ইয়াসমিন হত্যা, সার কেলেঙ্কারি, বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার প্রভাবে বছরব্যাপী ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন ও সর্বশেষ মাগুরার উপনির্বাচন।

তখন ভোরের কাগজ সর্বাধিক প্রচলিত জাতীয় দৈনিক। আব্দুল গাফফার চৌধুরীর কলাম ভোরের কাগজ ও জনকণ্ঠে প্রকাশিত হত। এটি নিশ্চিত করেই বলতে পারি, আব্দুল গাফফার চৌধুরীর রাজনৈতিক কলাম সেই সময়ে সবচেয়ে বেশি পঠিত কলাম ছিল। রাজনৈতিক কলামের প্রতি প্রেমিকার মত ভালবাসাটি ঠিক তখন থেকেই। গাফফার চৌধুরী লেখার মাধ্যমেই ধীরে ধীরে টুঙ্গি পাড়ার এক কিশোরের বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার ইতিহাসটি জানা হল।

এটি সহজেই অনুমেয় যে সেই সময় থেকেই বাংলাদেশ জন্মের পেছনে আওয়ামীলীগ তথা বঙ্গবন্ধুর অতুলনীয় ভূমিকার কথা আমাদের প্রজন্ম জানতে শুরু করে। তবে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে সক্রিয় রাজনীতির চিন্তাকে মনে স্থান দেয়নি। রাজনীতি করার জন্য যে শিক্ষা, ত্যাগ, নিষ্ঠা ও ক্যারিয়ারের নিশ্চয়তার ঝুঁকি নেওয়ার জন্য রাজনৈতিক যোগ্যতা থাকা দরকার, সেটি ছিল না।

আজকাল আওয়ামী লীগ কিংবা দলটির অঙ্গ সংগঠনের নেতা কর্মী হতে তেমন স্ক্রিনিং টেস্টের দরকার হয় না। আওয়ামী লীগ এমন নমনীয় প্রক্রিয়ায় নেতাকর্মী নির্বাচন করবে সেটি আগে বুঝতে পারলে নিজের স্বার্থপর চরিত্রটিকে লালন করেই রাজনীতি করা যেত। যদি বুঝতে পারতাম, রাজনীতি করে ধন সম্পদের মালিক হওয়া যায়, প্রভাবশালী হওয়া যায়, মানুষ ভয় পায় তাহলে রাজনীতিকে ক্যারিয়ার হিসাবে নিতে আমাদের কোন অসুবিধা হত না। যদি জানতে পারতাম, বড় নেতাদের সাথে একটি সেলফিই আপনাকে নেতা বানিয়ে দিবে তাহলে নিজের পরিবার পরিজনকে দেশে রেখে বিদেশে স্বদেশ ও স্বজাতি বিচ্ছিন্ন জীবনের কষ্ট বছরের পর বছর বহন করতে হত না।

২.

বর্তমান সময়ের ছাত্রলীগের মত করুণ অবস্থা আগে ছিল না। এখন ছাত্রলীগের রাজনীতি ছাত্রলীগের হাতে নেই। কেন্দ্রে যেমন কোন মন্ত্রী কিংবা সাংগঠনিক নেতার হাতে ছাত্রলীগ নানান গ্রুপে বন্দী, ঠিক তেমনি মাঠ পর্যায়েও জেলা ছাত্রলীগ কোন না কোন স্থানীয় এমপি কিংবা জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর পকেটে বন্দী। ছাত্রলীগ দৃশ্যত একটি পাপেটে রূপান্তরিত হয়েছে। কোন ছাত্রলীগের নেতার  নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে প্রয়োগ করার যে সামর্থ্য নেই, সেটি অনুমেয়। ছাত্রলীগের কোন না কোন গ্রুপ কোন না কোন মূল দলের নেতাদের গ্রুপে। তারা যে মূল দলের নেতাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য বাস্তবায়ন করছে সেটি এখন ওপেন সিক্রেট।  তাদের রাজনৈতিক ও নৈতিক সাহসের মেরুদণ্ড নড়বড়ে।

ছাত্রলীগের ভিতরে  যে রাজনৈতিক কালচারটি তৈরি হচ্ছে সেটির প্রভাব বহুমাত্রিক। এটি কেবল ছাত্রলীগকে দুর্বল করবে, তা নয়, সেটি আওয়ামী লীগ ও দেশের জন্যও হুমকি হিসাবে সামনে আসবে। ছাত্রলীগ যদি সংগঠনটির আদর্শিক কর্মকাণ্ড করতে ব্যর্থ হয়, নিজস্বতা সুরক্ষা করতে না পারে, সেটির মূল্য দেশ ও জাতিকে দিতে হবে। বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের যেটুকু অবশিষ্ট আছে, সেটি ছাত্রলীগ ছাড়া টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। ছাত্রলীগ যদি নিজের শরীর থেকে ক্যান্সারকে না সরায়, নিজের মেরুদণ্ড সোজা করে রাজনীতি না করে, সেটির মূল্য পুরো জাতিকে দিতে হবে।

আজকাল গণমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়, অমুক জেলার শিবিরের নেতা ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছে এবং আওয়ামীলীগের কোন না কোন নেতা সেই অনুপ্রবেশকারীকে ছাত্রলীগে প্রবেশ করিয়েছে। দেশের বহু জায়গায় অনুপ্রবেশকারীদের ঠ্যালায় পরীক্ষিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা কোণঠাসা, অনেকে ক্ষেত্রে এলাকা ছাড়ার ঘটনাও ঘটছে। ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কাঠামোতে যে একটি ঋনাত্নক মিউটেশন ঘটছে, সেটি অস্বীকার করা মানেই হচ্ছে,সত্যকে অস্বীকার করে সংগঠনের ভিতরে সমস্যাগুলিকে জিইয়ে রাখা। সংগঠনটিকে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করা।

কোটা পদ্ধতি বিরোধী আন্দোলনটি ছাত্রলীগের চোখ খুলে দেওয়ার কথা। কোটা পদ্ধতি সংস্কার একটি যৌক্তিক দাবী। সেটির আন্দোলনের নেতৃত্ব দিবে সাধারণ ছাত্ররা, শিবিরের সাথে মিশে ছাত্রলীগের পদ-পদবী ওয়ালা নেতারা কেন?

ফলে কোটা পদ্ধতি সংস্কার আন্দোলন ছাত্রলীগের জন্য সমুদ্রসম পাঠ। ছাত্রলীগের ভিতরের একটি ক্ষুদ্র অংশই সেই আন্দোলনকে উস্কে দিচ্ছে। খোঁজ নিয়ে দেখুন তাদের রাজনৈতিক পরিচয়। ছাত্রলীগের ভিতরে উস্কানি দাতারা স্রেফ অনুপ্রবেশকারী। ওরা সময় ও প্রেক্ষাপটের সুযোগে তাদের ভিতরের ল্যাঞ্জা বাহির করে ফেলছে এবং ভবিষ্যতেও সমন্বিতভাবে ব্যাপক হারে তা করবে

একটি উদাহরণ দেই। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কোরিয়াতে পিএইচডি করতে এসেছেন। তাদের বড় একটি অংশ আওয়ামী লীগের সময়ে নিয়োগ পাওয়া। দুঃখজনক হলেও সত্য, রাজনৈতিক চিন্তা চেতনায় তাদের বড় একটি অংশ শিবিরপন্থী। দেশে থাকতে হয়ত তারা ছাত্রলীগ নামটি ব্যবহার করেছে। চাকুরী নেওয়ার সময় হয়ত আওয়ামী লীগের কোন না কোন বড় নেতার সুপারিশ তারা পেয়েছে। এমতাবস্থায় যদি ছাত্রলীগকে আওয়ামী লীগের নেতাদের ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহৃত হওয়ার পদ্ধতি থেকে কেন্দ্র ও জেলা পর্যায়ে রক্ষা না করা যায়, তবে ছাত্রলীগ সাংগঠনিক ও আদর্শিক ভাবে দুর্বল হয়ে পরবে। অনুপ্রবেশের দরজা প্রশস্ত থেকে প্রশস্ততর হয়ে উঠবে। সেটির প্রভাব পড়বে  রাষ্ট্রের উপর, দলের উপর এবং ব্যক্তি শেখ হাসিনার উপর। প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের নাটবল্টু কেন ঢিলা হয় সেটি ছাত্রলীগকে বুঝতে হবে।

আওয়ামী লীগ ও দলটির অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনে অনুপ্রবেশ ও ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশ চারিত্রিক ভাবেই ভিন্ন। কোন শিবিরপন্থী ব্যক্তি যখন ছাত্রলীগে প্রবেশ করে রাজনীতি করতে চায়, সেটির প্রভাব খুব গভীরে গিয়ে পড়বে। কোন এক সময় তারাই আওয়ামী লীগে যাবে। তখন আর স্বীকার করা যাবে না যে তিনি আওয়ামী লীগার নয়।

পরিশেষে বলতে চাই, ছাত্রলীগের মত এমন একটি সংগঠনে রাজনীতি করার ইচ্ছে হয়ত আমার মত বহু ছাত্ররই ছিল। তারাও হয়ত আমার মত স্রেফ ব্যক্তি স্বার্থের কারণে সেই পথে আসেনি। তবে বহু বন্ধুবান্ধবকে তৃণমূলের ছাত্রলীগের সাথে কঠিন প্রেমে আবদ্ধ থাকতে দেখেছি। সংগঠনের জন্য নিজের ক্যারিয়ার কেবল নয়, নিজের জীবনকেও ঝুঁকিপূর্ণ করেছে।

২০০১ বিএনপি-জামায়েত জোট ক্ষমতায় আসার পর প্রথম যে সংগঠনটির উপর নির্যাতন শুরু হয় সেটি হল ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের উপর একটি কাঠামোগত নির্যাতন চলেছিল দীর্ঘ পাঁচটি বছর। সেই সময়টি আমি তৃণমূলের ছাত্রলীগের বন্ধুবান্ধবদের দুরবস্থা দেখেছি। অগণিত মামলা হামলাকে মোকাবেলা করতে হয়েছে। জেলে যেতে হয়েছে। দেখছি, বিকালে ছাত্রদলের নেতার হাতে চড়চাপড় খেয়ে ছাত্রলীগের নেতাকে সন্ধ্যায় টিউশনিতে যেতে। কারণ আয় বন্ধ হয়ে গেলে আরও বড় বিপদ।

একটি বাস্তব চিত্র দিয়েই লেখাটি শেষ করতে চাই।

ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন প্রাক্তন সেক্রেটারির মতে ছাত্রলীগ এতিম সংগঠন। আমারও মূল্যায়ন তাই। ফেবুতে উনার এই মন্তব্যটি দেখে আমার তাৎক্ষনিক একটি কথা মনে পরে গেল।

২০০১ সালের নির্বাচনের সপ্তাহ খানেক পরে একটি গণমামলার হাজিরা দিতে প্রায় সত্তর থেকে আশি জন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী জেলা শহরে আসে। যাদের অধিকাংশই ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল। রাতে জেলা শহরের এক নেতার বাসায় সভা হয়। বেশ কয়েকজনের কাছে জানতে চাইলাম, “রাতে খেয়েছ? ঘুমাবে কোথায়?” কয়েকজন জানালো, আমরা জেলা শহরে প্রথমবার এসেছি। এখানে আমাদের কোন আত্নীয় স্বজন নেই। রাতে কলা রুটি খেয়ে রেল স্টেশনে ঘুরে রাতটি কাঠিয়ে দিব। জামিনের জন্য সকাল সকাল কোর্টে যেতে হবে।

কিছুটা দূরে হঠাৎ করেই একজন চিৎকার করে উঠল। অমুক(থানা কমিটির নেতা) চাচা কই? আমাদের খাওয়ার টাকা দিল না যে? রাতে কোথায় ঘুমাব? উনি কেন চলে গেলেন? পাঁচ বছরে তো উনি কম কামায়নি।

কিন্তু নেতা তাঁর কর্মীদের ফেলে ঘুমানোর জন্য চলে গেলেন হোটেলে। আজ নেতা নেতাই আছেন। বেড়েছে রাজনৈ্তিক ক্ষমতা, অর্থ, পদবি সহ আরও কত কি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ছাত্রলীগের প্রেমে পড়া সেই নেতা কর্মীদের অনেকেই এখনো আগের মতই আছে। কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসা করছে, কেউ এনজিওতে কাজ করছে। নির্যাতিত ছাত্রলীগের কর্মীরা কেউ আওয়ামী লীগের আজকের রাজনীতিতেই নেই। দল ক্ষমতায়। মধ্যস্তরে নেতা আমদানি করা হচ্ছে বিএনপি থেকে, জামায়েত শিবির থেকে অথবা কোন সুবিধাবাদী গ্রুপ থেকে।

এমতাবস্থায় ছাত্রলীগকে ঢেলে সাজান, সংগঠনটির সংস্কার জরুরি।  কঠিন হস্তে অনুপ্রবেশকারীদের প্রবেশ বন্ধ করুন। তা না হলে আওয়ামী লীগকে একদিন চরম মূল্য দিতে হবে।   

বিজন সরকারভাষা গবেষক; রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

Responses -- “ছাত্রলীগে সংস্কার জরুরি”

  1. লতিফ

    ছাত্রলীগে এই সমস্যা অনেক পুরোনো। ১৯৪৮ সালে বঙ্গবন্ধুর হাতের ছোঁয়ায় এর জন্ম, তিনি তখন ছাত্রলীগ করতেন না, মুসলিম লীগের তরুণ নেতা। পরবর্তীকালে ষাটের দশকে সিরাজুল আলম খান যখন এর হাল ধরেন, তখন ছাত্রলীগ বঙ্গবন্ধুর ইশারাতে চলত, কারণ সিরাজ ছিলেন তাঁর অনুগত। বরাবর সম্মেলন ছাড়া কমিটি হয়েছে এবং বড় কোন নেতার আশীর্বাদ ছাড়া কেউ সামনে আসতে পারেনি। জাসদের জন্মের সময় যে ছাত্রলীগ ভাগ হল, সেখানে ছাত্রলীগের চেয়ে সিরাজুল আলম খান, রব, শাহজাহান সিরাজ এরাই মূল ভূমিকা রেখেছে, অপরদিকে ফজলুল হক মণি। আবার সেই অংশে রাজ্জাক সাহেবের চ্যালা ছিল শফিউল আলম প্রধান, যাকে পরের কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক করা হয় এবং সেই প্রধান শেখ মণির সমর্থক সাতজন ছাত্রলীগ নেতাকে হত্যা করে। তখন পর্যন্ত ছাত্রলীগ নামে স্বাধীন সংগঠন। জিয়ার সময় সব ছাত্রসংগঠনকে বড় দলের লেজুর করে দেয়া হয়। তা সত্ত্বেও রাজ্জাকের প্রভাব অনেক বেশি ছিল এবং ১৯৮৩ সালে তিনি বাকশালের জন্ম দিলে তাঁর অনুগতরা জাতীয় ছাত্রলীগ করে। শেখ হাসিনার সংগ্রামের সময় মূলত তাঁর অনুগত কেউ ছিল না ― কেউ তোফায়েলের, কেউ আমুর, কেউ জলিলের। তলে তলে ওবায়দুল কাদের আরেক দল পোষ্য তৈরী করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকদের বেশিরভাগ ওবায়দুল কাদেরের অনুসারী। নব্বই দশকে যেমন ওবায়দুল কাদের, বর্তমান সময়ে সেরকম লিয়াকত শিকদার। এটা চলতেই থাকবে। কেবল ছাত্রলীগ না, সকল ছাত্র সংগঠনে একই অবস্থা।

    Reply
    • সরকার জাবেদ ইকবাল

      গাবতলীর খালেক সাহেবই যথার্থ বলেছিলেন, “আমি তো সরকার পার্টি করি, সরকার যদি পার্টি বদলায় আমার কি দোষ?”

      Reply
  2. ওমর ইবনে ইউসুফ (বাদল)

    লেখক বুঝালেন যে, ছাত্রলীগের নিজেদের কোন আলাদা দল নেই, তারা রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে যাচ্ছে, তারা আওয়ামীলীগ নেতা কেন্দ্রিক হয়ে আছে এবং সেটা থেকে বেড়িয়ে আসতে বলতেছেন। বেশ ভালো কথা। আবার বলেছেন, “কোটা আন্দোলন” যৌক্তিক আন্দোলন কিন্তু সেখানে ছাত্রলীগ নেতৃত্ব দিবে কেন(?)!!

    একদিকে একটা যৌক্তিক ছাত্র আন্দোলনে ছাত্রলীগ নেতৃত্ব দিলে বলবেন তারা অনুপ্রবেশকারী (জামাত-শিবির) আবার আওয়ামীলীগের নেতাদের সাথে থাকলে বলবেন “নেতা কেন্দ্রিক ছাত্রলীগ”! এটা কি পরস্পর বিরোধী কথা না??
    তাহলে ২টা প্রশ্ন থাকেঃ-
    ১) ছাত্রলীগ যারা করেন তারা কি ছাত্র না? যদি ছাত্র হয়ে থাকেন তবে-
    ২) ছাত্রলীগ কি তাহলে সাধারন ছাত্রদের পক্ষে ন্যায্য কথা বলবে না?? (যে ন্যায্য দাবিটা ছাত্রলীগের নিজেরও)। আমরা সাধারন ছাত্ররা তো মনে করি ছাত্রলীগ ছাত্র অধিকার বিষয়ে সকল আন্দোলনের শুরুর থেকে নেতৃত্ব দিবে।

    লেখক আওয়ামীলীগের ভালো চায় বিধায় কথাগুলো লিখেছেন কিন্তু লেখকের মনে রাখতে হবে মাননীয় মতিয়া চৌধু্রীও যেমন দলের ভালো চায় তেমনি জনাব ওবায়দুল কাদের স্যারও দলের ভালো চান তবে দুয়ের মাঝে বিচক্ষণতার ব্যাপক ফারাক আছে। একজন মতিয়া চৌধুরী ভালো চেয়ে (গণহারে রাজাকারের বাচ্চা বলে) ভুল করে দলকে ডুবাতে ব্যস্ত আরেকজন কাদের দলকে রক্ষায় ব্যস্ত।

    সুতরাং কলম লেখকদের প্রতি বিনীত অনুরোধ, আপনারা কোন দলের অন্ধভক্ত না হয়ে (মতিয়া চৌদুরীদের মতো) দলের সঠিক ভুলগুলো ধরিয়ে দিতে সাহায্য করে জনগণের পক্ষে লিখুন। দল সাধারণ জনগণের পাশে থাকলে জনগণও দলকে ক্ষমতায় রাখবেন।
    যে দেশের অবহেলিত রাস্তায় ধানক্ষেত বানিয়ে সাধারণ জণগন প্রতিবাদ জানাতে পারে সেই দেশের মানুষ আর বোকা নেই। সবাই আমরা একযোগে শিক্ষিত হচ্ছি, বিচক্ষণ হচ্ছি। দেশ উন্নত হচ্ছে। মানুষ এখন সব বুঝে। ছাত্রছাত্রীরাও সব বুঝে। তাই কে তেল দেয় আর কে সাজেশন দেয় তা বুঝতে কারো সমস্যা হয়না।

    Reply
  3. সরকার জাবেদ ইকবাল

    একটি পুরনো গল্প আবারও বলি, – তিনটি শিশু সন্তানেরই অনর্গল সর্দি ঝরছে। বাবা নিয়ে গেলেন ডাক্তারের কাছে। সবকিছু দেখেশুনে ডাক্তার লিখলেন, “Remove the refrigerator from home.” ছাত্রলীগের কোন দোষ নেই। আমি হলে এক্ষেত্রে লিখতাম, – Remove the leaders from the party.

    ১৯৮৪ সালের কথা। কিছুদিন যাবত মোটর সাইকেল গড়বড় করছিল। নিয়ে গেলাম মেকানিকের কাছে, বললাম, সার্ভিসিং করে দাও। কিছুক্ষণ পর মেকানিক জানালো, “স্যার, সার্ভিসিং-এ কাম অইবো না, ওভারহলিং করা লাগবো।” ওভারহলিং শুধু ছাত্রলীগকে করলেই হবে না, আওয়ামী লীগকেও করতে হবে। শীর্ষ নেতারা যত তাড়াতাড়ি বিষয়টি বুঝতে পারবেন ততই মঙ্গল।

    Reply
  4. Mute Spectator

    ১) আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক জনাব ওয়বায়দুল কাদের বলেছেন ছাত্রলীগকে নতুন মডেলে গড়ে তোলা হবে। সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করাই শ্রেয় নয় কি?

    ২) আওয়ামীলীগ ও বিএনপি যখন ক্ষমতায় থাকে তখন ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের ক্ষমতাকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে আদৌ কোন পার্থক্য আছে কি?

    ৩) আওয়ামীলীগ ও এর শুভাকাঙ্খীরা কেন ধরে নিচ্ছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনটি মহা অন্যায় কাজ? অল্প কিছু ছাত্রলীগ সমর্থক এতে যোগ দিয়েছে। এটা ভুল ধারণা।

    ৪)দল ক্ষমতায় থাকলে ছাত্রনেতারা ব্যাঙ্কের মালিক হয় কেন? হেলিকপ্টারে মফঃস্বল সফরে যায় কেন?

    ৫) দল ক্ষমতায় থাকলে মেধায় হলে সিট পেলেও বাধ্যতামুলক ছাত্র লীগে নাম লেখাতে হয়, অনবাসিক ছাত্ররা ছাত্রলীগের মিছিলে না থাকলে পরীক্ষায় অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া, ছাত্রদল শিবির বানিয়ে দেওয়া ইত্যাদি কারণে কিছু সাধারণ ও কিছু ভিন দলীয় ছাত্র রাতারাতি বাধ্য হয়ে ছাত্রলীগ হয়ে যায় কৌশলগত কারণে। নেতারা তখন জোয়ার দেখে আত্মহারা থাকে। আদর্শ যায় বিসর্জনে। আবার মূল দল ক্ষমতার বাইরে থাকলে ছাত্র ফ্রন্টকে গণতন্ত্রের সৈনিক হিসাবে গুলির মুখে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। নতুন মডেল তৈরি করার সময় এগুলো বিবেচনায় রাখা উচিৎ। ছাত্রদের লাঠিয়াল বানানো বা স্পয়েল করা কোনটাই কাম্য হতে পারে না।

    Reply
    • সৈয়দ আলী

      এর কারনটি কি জানেন? ছাত্ররাজনীতিতে আর রাজনীতি নেই। ভবিষ্যৎের দিকে তাকিয়ে উদ্দীপ্ত করার মতো ইস্যু নেই। জাতীয়তা, স্বাধীনতা ও সমাজ বিরোধী হুমকি নেই। দ্রোহের ডাক নেই।
      এখন ছাত্র-রাজনীতি অর্থোপার্জনের হাতিয়ার। নেতারা এক্সিকিউটিভ।

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—