বৈশাখ এলেই মনে হয় আমরা নবীনতা পাচ্ছি! আমরা আমাদের পুনর্গঠিত করে সতেজ হয়ে উঠছি। আনকোরা হয়ে নতুন হয়ে উঠছি এবং ভবিষ্যতকে আলিঙ্গন করছি। বৈশাখ এলেই এক ধরনের প্রাণশক্তি পেয়ে দূরে ঠেলে দিই জড়তা-পঙ্কিলতা-ভেদবুদ্ধি-সংকীর্ণতা ও অকল্যাণ। আমরা প্রসারিত হতে চাই, পরিব্যাপ্ত হতে চাই বৈশাখের ঊষালোকে ও রৌদ্ররাগে।
বাংলা নববর্ষ উদ্যাপন এই সময়ে এসে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে একটি সংহত ও সমৃদ্ধ অবস্থান তৈরি করেছে। সে-কারণে ১লা বৈশাখ শুধু নিছক একটি তারিখ নয়, একটি জীবনবাদী উৎসবে পরিণত হয়েছে। এই উৎসবের রং আলাদা, এই উৎসবের দৃষ্টিভঙ্গিও আলাদা। এই উৎসব এ-দেশের মানুষ নিজের ঘরের উৎসব হিসেবে বিবেচনা করে, একান্ত আপন ভেবে কাছে টেনে নেয়। এই উৎসবের উত্থান ও বিকাশ হয়েছে এদেশেরই পূর্বসূরী মানুষের শ্রম ও জীবন-সংগ্রামের উৎসধারা থেকে ও দীর্ঘদিনের পথ-পরিক্রমায়। সংগ্রাম-আন্দোলন ও জাগরণে। এই উৎসব আমাদের এক জীবনচেতনারই বহিঃপ্রকাশ ও উন্মীলন। যেখানে ধর্ম-বর্ণ ও সম্প্রদায়ের বিভেদ ও সংকীর্ণতা নেই, নেই বিভাজনের কূটকৌশল। এমন উৎসব মানবিকতায় যেমন উজ্জ্বল, তেমনি উদার ও যুক্তি নির্ভরতায় মহিমাময় জীবনকেই প্রকাশিত করে।
দিন দিন বাংলা নববর্ষ আয়োজনের বিস্তৃতি ঘটছে। বাঙালির আপন উৎসব হিসেবে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে। এই উৎসব এখন বাঙালির সর্বজনীন উৎসবের গৌরব নিয়ে দেদীপ্যমান। এর সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য গণমানুষের সর্মথনে আগের চেয়ে বেড়েছে। এখন নগর-শহর-বন্দর-পাড়া ও মহল্লাায় বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। শুধু দেশে নয় দেশের বাইরে অন্যান্য দেশেও যেখানে বাংলাদেশের মানুষ বসবাস করে, সেখানেও যূথবদ্ধ হয়ে বিভিন্নভাবে বাংলা নববর্ষ পালন করা হয়ে থাকে। এদেশে উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত ও শিক্ষিতজনের মত গরীব কৃষক-মজুর ও অন্যান্য শ্রেণির অনেকে বাংলা নববর্ষ উৎসবের আমেজে হয়তো সেভাবে বরণ করতে পারেন না, সেটাও আমরা মনে রাখি।
দূরবর্তী ইতিহাসের কথা বাদ দিয়ে নিকটবর্তী সময়ের কথা বলি–গত শতাব্দীর পঞ্চাশ ও ষাট দশকে যে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তারই ভিত্তিমূলে এ-ভূখণ্ডের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের চেতনা বিকশিত হয়েছিল, এই চেতনার ভিত্তিতেই আমরা সকল ধর্মের মানুষ ধর্মীয় বিবেচনার বাইরে এসে যূথবদ্ধ হয়ে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়ে একটি স্বাধীন দেশের মর্যাদা অর্জনে সক্ষম হই। মুক্তিযুদ্ধের মূলভূমির অন্যতম ধারা ও আকাঙ্ক্ষা ছিল যে পয়লা বৈশাখকে আমাদের সংস্কৃতির একটি ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব হিসেবে গড়ে তুলবো, বিকশিত করবো; এরই ধারাবাহিকতা ও পরিপূরক হিসেবে এই নববর্ষ বরণের আয়োজন দিনকে দিন আরও উল্লেখযোগ্যভাবে উজ্জ্বল হচ্ছে। আমরা এই উজ্জ্বলতাকে ম্লান ও ধূসর হতে দিতে পারি না। এই উজ্জ্বলতা আমাদের মানবিক অবস্থানকেই স্পষ্ট করে থাকে।
পয়লা বৈশাখে আমরা নতুন পোশাক পরি। ভিন্ন স্বাদের দেশীয় খাবারের মুখোমুখি হই। ঘর থেকে বের হই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে, বন্ধু-বান্ধবের সাথে। মাঠে যাই, সড়কে দাঁড়াই, খোলা প্রান্তরে গান শুনি, আড্ডা দিই, মেলায় যাই আর সামাজিক বন্ধনে নিজেদের সংহত করি, নিজেদেরকেও উন্মোচিত করি আনন্দ ও মানবিকতায়। আমাদের ভুললে চলবে না ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়েছে ধর্মীয় বিভাজনে। আর এই বিভক্তির পরিণামে কত হিংসাশ্রিত ঘটনা ঘটেছে, হত্যা হয়েছে, রক্তপাত ঘটেছে, মানুষ হয়েছে বাস্তুচ্যুত। নারীর প্রতিও হয়েছে  জুলুম।  এখনো সেই ভেদবুদ্ধির লোকেরা সময় সময় বিভেদরেখা টেনে নিয়ে রাজনীতির নামে ক্ষমতার লোভে মানুষের মানবিকতাকে হিমাঙ্কের নিচে নামিয়ে আনতে চায়। এর বিপরীতে থেকে পয়লা বৈশাখের উৎসব মানুষে মানুষে ভালোবাসার বন্ধনকে দৃঢ় করতে ভূমিকা রাখছে। আর এ-কারণেই কালজ্ঞশক্তির লোকেরা পয়লা বৈশাখের উৎসবের বিরুদ্ধে কখনো কখনো তর্জন-গর্জন করতে থাকে কিন্তু মানুষের শুভবোধের কাছে তা হয়ে পড়ে অসাড়! সেকারণে পয়লা বৈশাখের উৎসবকে আমাদের সচেতনভাবেই রক্ষা ও বিকশিত করতে হবে।
বাঙালিজীবন পালটে যাচ্ছে, শুধু নাগরিক জীবনই নয়, পালটে যাচ্ছে আমাদের গ্রামীণ জীবনও। উনিশ শতক থেকে বিংশ শতাব্দীতে এসে বিশেষত এই ভূখণ্ডে পরাধীনতার শৃংখল মুক্তির পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তি ও সুষম সমাজের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মানুষ লড়েছে, তারই বিজয়ী পরিণতি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চার দশকের বেশি সময় পার হওয়ার পরও ক্রমবর্ধমান বেকার সমস্যা, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, মূল্যবোধের ভাঙন ও রাজনৈতিক দিশাহীনতা বাংলাদেশের মানুষের জীবনকে করে তুলেছে অস্থির। এই অস্থিরতার মধ্যে থেকেও বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের সামর্থ্য ও সুযোগের মধ্যে থেকে কিছুটা আনন্দ জীবনেরই প্রয়োজনে ভাগাভাগি করে নেওয়ার প্রেষণায় পয়লা বৈশাখের উৎসবকে কাছে টেনে নিচ্ছে।
আমরা জানি, আগে গ্রামে মোড়লনির্ভর শাসনের এক ধরনের নিয়ন্ত্রণ ছিল, তার পরিবর্তে এখন রাজনৈতিক দল ও নেতা নির্ভর এবং প্রশাসনিক ক্ষমতানির্ভর নিয়ন্ত্রণ জোরালো হয়েছে। গৃহ নির্মাণে পরিবর্তন এসেছে, পরিবর্তন হয়েছে যাতায়াত ব্যবস্থায়, রাস্তাঘাট পৌঁছে গেছে বিভিন্ন পরিধিতে। বয়স্ক ব্যক্তি এখন আর সংসারের কর্মকর্তা নেই, যৌথ পরিবার ভেঙেছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় বেড়েছে, সেইসাথে বেড়েছে কোচিং সেন্টার। টিভি-চ্যানেল ও ইন্টারনেটের প্রভাব এবং বিস্তারও বেড়েছে। ধর্মীয় সভা-মাহফিল ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিস্তারও ঘটেছে। নারীরা ঘর থেকে বেরিয়ে গার্মেমেন্টস ও অন্যান্য পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। বহু শ্রমজীবী মানুষ বিদেশে কর্মরত থেকে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছেন। জমির উৎপাদনশক্তি বাড়ছে, জমি চার ফসলীতে পরিণত হয়েছে। এসব অভিঘাত ব্যক্তিজীবনে, পারিবারিক জীবনে, সমাজজীবনে ও সাংস্কৃতিক জীবনে প্রভাব ফেলছে। তবুও এসবের মধ্যেও পয়লা বৈশাখের উৎসব আমাদের জীবনকে ঐকসূত্রে গেঁথে প্রসারিত করছে। আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার ঐকভূমি রচনায় ভূমিকা রাখছে।
ব্যক্তি, লেখক-শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী, সংগঠন, রাজনৈতিক দল, সরকার ও রাষ্ট্র গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সচেতন ভূমিকা রাখার মধ্যে দিয়ে আপন সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক সংরক্ষণ ও বিকাশে ভূমিকা পালন করতে পারেন। এখানে উদাহরণ দিই–ষাট দশকে ‘ছায়ানট’ ঢাকার রমনার বটমূলে বাংলা নববর্ষ বরণের যে ধারা প্রবর্তন করেছিল, তারই বৈভবে আজ বাংলা নববর্ষ বরণ ও উৎসব আরও বিস্তৃত ও অলোকসামান্য হয়ে উঠেছে। আমরা যদি বাংলা নববর্ষ বরণ ও উৎসবকে আরও মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যেতে চাই, আরও জীবনমুখী করতে চাই, তাহলে সজাগ ভূমিকাও প্রয়োজন।
সরকার বাংলা নববর্ষ বরণ ও উৎসবে এখন উৎসব-বোনাস প্রচলন করেছেন, তা এই নববর্ষ বরণ ও উৎসবের সাথে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করছে নিঃসন্দেহে। আমরা বাংলা নববর্ষ বরণ ও উৎসবে এখন নতুন পোশাক পরি, আর সেসব পোশাকের রং ও ধরন আমাদের দেশের একান্ত নিজস্বশৈলীতে গড়া। আমরা শাড়ি পরি, পাঞ্জাবি পরি, ফতুয়া পরি। অনেক ধরনের পোশাকে নিজেদের দেশ ও প্রকৃতির ছবি অংকন করে পরে থাকি। এই ধরনের পোশাক আজ আমাদের এই উৎসবের একটি উপকরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরফলে বাজারে অর্থনৈতিক প্রবাহে তা ভূমিকাও রাখছে।
আমরা আমাদের বাংলা নববর্ষের উৎসবে বিশেষ খাবারের আয়োজন করে থাকি, তাতে আমাদের খাবারের তালিকায় ঐতিহ্যবাহী খাবার যুক্ত হয়ে থাকে। ইদানিং এই ঐতিহ্যের আলোকে মাটির বাসন-কোসন ব্যবহারও হচ্ছে। এসব এক ধরনের সাংস্কৃতিক ভিন্নতা নিয়ে আমাদের সংস্কৃতিকে শিকড় পর্যায়ে উজ্জ্বল করছে।

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে এখনো শহর-বন্দর ও গ্রামে মেলা বসে থাকে । এইসব মেলায় হাতে বানানো জিনিস বিক্রি হয় ও বিভিন্ন আনন্দেরও আয়োজন থাকে, যা আমাদের চিরায়ত বাংলার চিত্রকে ব্যঞ্জনাময় করে তোলে। আমাদের লোকসংস্কৃতির বাককেন্দ্রিক, বস্তুকেন্দ্রিক, অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক, খেলাধূলাকেন্দ্রিক ও অঙ্কনকেন্দ্রিক ঐতিহ্যবাহী এক বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে, তা অনেক ক্ষেত্রে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ছে। বাংলা নববর্ষ বরণ ও উৎসবে এইসব ঐতিহ্যবাহী বিশাল ভাণ্ডার উন্মোচন করে এইসবের সৌন্দর্যের সাথে নতুন প্রজন্মকে আনন্দের সাথে পরিচয় করে দেওয়া দরকার। এই ক্ষেত্রে শিল্পকলা একাডেমি, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান সচেতন ভূমিকা পালন করতে পারে। আমরা নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য তৎপর নই। নির্ভরতা বিদেশের ওপর অর্থনৈতিকভাবে, সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক থেকেও। এ পরনির্ভর মানসিকতার কারণে আমরা নিজেদের দিকে তাকাই না, নিজের সম্পদ ও সম্ভাবনার দিকেও তাকাই না। এমনিভাবে লোক-সংস্কৃতির গভীরে প্রবেশ করি না, লোক-সংস্কৃতিকে জীবনের আহ্বানে সম্পর্কিত করি না, লোক-সংস্কৃতিকে সচেতনভাবে নির্বাচনও করি না।
বাংলা নববর্ষ বরণ ও উৎসবে একটি নতুন ও আলাদা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আযোজন লক্ষ করা গেল। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ থেকে শুরু করে বিভিন্ন উন্মুক্ত মাঠে মাঠে ও বড় পরিসরে সাংস্কুতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বিভিন্ন বয়সের মানুষকে নতুন ও বিভিন্ন রঙের পোশাক পরে সেসব অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে দেখা গেছে। মুক্ত বাতাসে ও উদার আকাশের নিচে গিয়ে প্রকৃতির সান্নিধ্যকে আরও নিবিড়ভাবে টেনে নিয়ে গানের সুরে অবগাহন করার জন্য নিজেকে উন্মুক্ত করে দেয়। আর কোনো উৎসবে মানুষ এতটা গানের কণ্ঠলগ্ন হয় না! এই বৈশিষ্ট্য বাংলা নববর্ষ বরণ ও উৎসবকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। এইসব অনুষ্ঠানে তথাকথিত আধুনিক গানের নামে অনেক স্থূল ও বৈচিত্র্যহীন গান ইদানিং গাইতে দেখা যায়, এই প্রবণতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের সচেতন থাকা দরকার। গান নির্বাচনে আমাদের বিশাল ভাণ্ডার থেকে গান নির্বাচিত করতে হবে, যা জীবনমুখি রুচি নির্মাণে ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলা নববর্ষে আর একটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য হলো ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ও দোকানে ‘হালখাতা’ উদযাপন। সাজিয়ে গুছিয়ে পরিপাটি করে গ্রাহকদের দাওয়াত দেওয়া, মিষ্টিমুখ করানো ও ইত্যাদির আয়োজন করা হয়। নতুন করে হিসেব খোলা হয়, লেনদেন হয়, বকেয়া পরিশোধ করা হয়। এই ঐতিহ্য বেশ পুরনো ও উদ্দীপক, বিশেষত ব্যবসা সংশ্লিষ্ট মানুষের কাছে। এই ঐতিহ্যের ধারা কিছুটা ম্রিয়মাণ হলেও অনেকের কাছে এখনো বেশ গুরুত্ব বহন করে থাকে। এই ধারাটি আরও উজ্জ্বল হওয়া প্রয়োজন।

বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দৈনিক-সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন সমূহ ও অনলাইন ম্যাগাজিন বিশেষ সংখ্যা বের করে থাকে, এই উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে আজ। তবে এই উদ্যোগ আরও প্রসারিত হওয়া উচিত। আমাদের কবিতা, গল্প-উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক ও অন্যান্য লেখা নিয়ে সমৃদ্ধ বৈশাখ বিশেষ সংখ্যা বের হওয়ার প্রচেষ্টা আরও জোরালো হওয়া উচিত। আমরা চাই  বাংলা নববর্ষে বাংলা সাহিত্যের স্বাদ বাংলাদেশের পাঠকেরা সংহত অবস্থায় খুঁজে পাক।
দেশের বেশির ভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করেন, তাঁদের নিত্যদিনের জীবন প্রবাহের সাথে বাংলা সন ও তারিখ জীবন্ত। বিশেষত কৃষিজীবীরা বাংলা সন ও তারিখ নিজেদের ভেবে সারা বছর ব্যবহার করে থাকেন । অন্যদিকে সরকার, রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক সংগঠন, গণমাধ্যম, কবি-লেখক-শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মীদের কাছে বাংলা সন ও তারিখ অনেকাংশে মৃত এবং বছরের অন্যান্য সময়ে বিচ্ছিন্ন ও অবহেলিত! অথচ বাংলা সন ও তারিখ থেকে উৎসারিত বলেই বাংলা নববর্ষ আমরা উৎসব হিসেবে বরণ করছি আনন্দে ও উৎসবের বিভিন্ন আমেজে ব্যক্তিগত, পারিবারিক, বিভিন্ন সামাজিক পরিসরে!
বাংলা সন ও তারিখ যুগ যুগ ধরে এদেশের বেশিরভাগ মানুষের জীবন প্রবাহের সাথে সম্পর্কিত হয়ে আছে, সেই সন ও তারিখ বাঙালির জীবনের অনেকক্ষেত্রে গৌরবের সাথে যুক্ত করতে পারিনি, যদিও বাঙালি হিসেবে আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছি, তার পরও চার দশকের বেশি সময় পার হতে চললো! রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্বাধীনভাবে নিজেদের জীবনের বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্য সংহত করার সুযোগ পাওয়ার পরও আমরা সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারিনি অনেকক্ষেত্রে! আর সে কারণে বেশির ভাগ বাঙালির কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকার কথা থাকলেও বাংলা সন ও তারিখ আজও সরকারি উদ্যোগে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত নয়! আর সেই কারণে বাংলা সন ও তারিখ অনুযায়ী বাংলাদেশে এখনো বাজেট প্রণয়ন, অর্থবছর, শিক্ষাবর্ষ,অনুষ্ঠান-সভা-দিবস ইত্যাদি নির্ধারিত হয় না। বাংলা সন ও তারিখ যদি উল্লিখিত পর্যায়ে আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে পারি তাহলে বাংলা নববর্ষ উদযাপন আরও কাছের মনে হবে, বাঙালির ভিত্তিমূল আরও শক্তিশালী হবে, বাঙালির সংস্কৃতি আরও সম্মুখবর্তী হবে।
বাংলাদেশে একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস অসাম্প্রদায়িক দিবস হিসেবে এদেশের মানুষ পালন করছেন, তা বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে বিশেষ ভূমিকাও রাখছে। আমাদের ইতিহাস-ভূগোল-সমাজ-ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐক্যভূমির ওপর বাংলা নববর্ষ উদযাপন ও উৎসব যদি আরও দৃঢ়ভাবে দাঁড় করিয়ে বিকশিত করা যায়, তাহলে আমরা আরও মানবিক হতে পারবো, যুক্তিবাদী হয়ে ঊঠতে পারবো, বৈষম্য ও বিভেদ কমিয়ে এনে জীবনের সৌন্দর্য উন্মুক্ত করতে পারবো। বাংলা নববর্ষ সেই সাহস, শক্তি ও স্বপ্ন দেখায়।

 

গোলাম কিবরিয়া পিনুকবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক

One Response -- “বৈশাখের প্রাণশক্তি ও কিছু বিবেচনাবোধ”

  1. সরকার জাবেদ ইকবাল

    সময়ের অগ্রসরতায় আর বিবর্তিত যুগ-চেতনার অনিবার্য ধারায় সংস্কৃতি চর্চায় পরিবর্তন আসতেই পারে; যেমন করে তামাশা, যাত্রা, মঙ্গলগীত, ঘটপুজা, পালাগান, কবির লড়াই, পটগান, নবান্ন, হাতেখড়ি, ‘দুস্তি’ (দুই গ্রামের দুই ছেলের মধ্যে বন্ধুত্ব স্থাপন), ইত্যাদি অনেক চর্চাই বিলীন হয়ে গেছে কিংবা পরিবর্তিত রূপ পরিগ্রহ করেছে।

    আমি বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদেরকে অভিনন্দন জানাই যে তারা পরিবর্তিত আকারে (বরং বৃহৎ পরিসরে!) হলেও বৈশাখি মেলার সনাতন ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে। আমি এটাও বিশ্বাস করি যে, এই চেতনাই আমাদেরকে বাঙালি চেতনা তথা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত রাখবে।

    একটি ছোট্ট স্মৃতি সহভাগ (শেয়ার) করার লোভ সামলাতে পারছি না। ১৯৬৭ সাল। ক্লাস থ্রিতে পড়ি। মেলা বসেছে শাসনগাছা (কুমিল্লা) রেললাইনের পাড় ধরে। তিনবন্ধু মিলে গেলাম মেলা দেখতে। দেখি একলোক ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে হাওয়াই মিঠাই বানাচ্ছে, টপাটপ তুলে নিচ্ছে আর গোল্লা গোল্লা করে সাজিয়ে রাখছে। ভীষণ লোভ হলো। দুই বন্ধুর কাছে কোন পয়সা ছিল না। আমার কাছে এক পয়সা ছিল। ভয়ে ভয়ে জানতে চাইলাম, একটা হাওয়াই মিঠাইয়ের দাম কত? লোকটি জানালো, এক পয়সা দিয়ে টিকেট কিনতে হবে, ভাগ্যে যা ওঠে তাই পাবো। এক পয়সা দিয়ে টিকেট কিনলাম। পানিতে ভেজাতেই ‘৩’ সংখ্যাটি ভেসে উঠলো। তিনবন্ধু তিনটি হাওয়াই মিঠাই হাতে নিয়ে মহাখুশিতে বাড়ীর পথে হাঁটা দিলাম। মনে হয় সেই স্বাদ এখনও ঠোঁটে লেগে আছে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—