১৯শে সেপ্টেম্বর, ১৯৯০ সন। দিল্লী বিশ্ববিদ্যালয়ের দেশবন্ধু কলেজের ছাত্র রাজীব গোস্বামী গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহননের চেষ্টা করেছিল মন্ডল কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন চেষ্টার প্রতিবাদে। ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় তখন ভিপি সিং-এর জোট সরকার। কম্যুনিস্ট থেকে বর্ণবাদী, হিন্দুত্ববাদী এমনকি আঞ্চলিক দল – মশলামুড়ির ভিপি সিং সরকারের জোটে ছিলনা এমন কেউ নেই। কাজেই ক্ষমতার কোন সমীকরণে তিনি ১৯৮০ সালের মন্ডল কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন করতে গিয়েছিলেন তা হয়তো রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ব্যাপার কিন্তু তার পরিণতিতে সারা ভারত জুড়ে যে আগুন জ্বলে উঠেছিল তা সহজে নেভেনি। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল অশোক কুমার ঠাকুর বনাম ভারত প্রজাতন্ত্র নামে একটি জনস্বার্থ মামলায়। আর তারপরে আসে ভারতীয় সুপ্রীম কোর্টের সেই যুগান্তকারী রায়- “সংরক্ষণ কোন স্থায়ী ব্যবস্থা হতে পারে না। সংরক্ষণের নামে আসলে সংরক্ষিতকে আরো পশ্চাতে ঠেলে দেয়া হয়”’ তারপরেও জাতপাত এবং ব্যাপক আর্থ-সামাজিক বৈষম্যের প্রেক্ষিতে ভারতের শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে কোটা ব্যবস্থা এক অনস্বীকার্য বাস্তবতা।

পাকিস্তান তো এ বিষয়ে আরেক কাঠি সরেস-পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে মেধা ও যোগ্যতার বিচারে মাত্র ৭.৫ ভাগ লোক চাকরী পায়। তেলা মাথায় তেলের মত পাকিস্তানের সবচেয়ে অগ্রসর জনগোষ্ঠী পাঞ্জাবীদের জন্য ৫০% সংরক্ষিত।
সম্প্রতি ঢাকায় ছাত্ররা রাস্তায় নেমে এসেছে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবীতে। কোটা মানেই জনগোষ্ঠীর কিছু অংশকে বিশেষ সুবিধা দেয়া আর সেই সাথে যোগ্যদের জায়গা কিছুটা সংকুচিত হয়ে যাওয়া। স্বাভাবিকভাবেই যোগ্যদের মনে অসন্তোষ দানা বাধে। প্রাক-৭১, পশ্চিম পাকিস্তানিরা জনসংখ্যার ৫৬.৪ ভাগ হওয়া সত্বেও আমাদের দাবিয়ে রাখতে চাইছিল কোটা দিয়ে। কিন্তু এক মহান পুরুষের এক অঙ্গুলি হেলনেই বিফল হয়ে গেছে তাদের কুটকৌশল। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শগুলোর একটি ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য। আর তাই স্বাধীন দেশের ঊষালগ্নে কোটার মাধ্যমে দেশের অনগ্রসর এবং পশ্চাদপদ মানবগোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা দেয়া ছিল আমাদের কর্তব্য। বলাবাহুল্য আমরা এই ছোট ভূখন্ডের মানুষগুলিকে এক কাতারে নিয়ে আসতে প্রতিবেশী দেশগুলোর চাইতে অনেক বেশী সফল। কিন্তু জনসংখ্যার অতি ক্ষুদ্র অংশকে ব্যাপক বিশেষ সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে কি আমাদেরকে সেই পুরানো দিনে ফিরিয়ে নিয়ে হবে না? পাঠক, কোটা ব্যবস্থার বিরোধিতা নয় , তার সংস্কারই আমাদের সবার চাওয়া যদি হয় তবে সেই কোটা কি জনসংখ্যার অনুপাতে হওয়া উচিত নয়? পৃথিবীর সব দেশেই কোটা অনুন্নত এবং অনগ্রসর জাতি বা নৃগোষ্ঠীর জন্য। ত্রিশ লক্ষ শহীদ হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে যদিও সনদধারী মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা মোট বর্তমান জনসংখ্যার দুভাগও নন। তাঁদের পোষ্যদের জন্য ত্রিশ ভাগ কোটা কি একটু বেশী হয়ে যায় না? মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠতম সন্তান এবং তাদের অবদানকে আমরা চিরকাল মনে রাখব। শুধু মনেই রাখব না , আমাদের আচার কর্মে আমরা তা দেখাব। তবে তাঁদের পোষ্যদের জন্য কোটা একটু কমিয়ে দিলে, যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁরা অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন সেই নির্ভীক মানুষদের প্রতি আমাদের যোগ্য সম্মান দেখানো হবে। আর যদি আমরা তা না করি তবে প্রতি বছর প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বাড়ানোর যে ভাইরাস জন্ম নিয়েছে তা আর কমবে না। হয়ত আপনাদের মনে পড়বে এক অতি উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ দিয়ে সুবিধা নিতে চেয়েছিলেন। আমরা যদি এই সংস্কারটুকু না করি, এই রোগে আগামীতেও অনেকে আক্রান্ত হবেন।

এমন এক সময় ছিল যখন হাওড় অঞ্চল বা দুর্গম চরাঞ্চল থেকে জেলা শহরে আসতেই বেলা শেষ হয়ে যেত। আজ যোগাযোগ ব্যবস্থা এমন, ঢাকা থেকে দেশের দূরতম প্রান্তেও ১২ ঘন্টায় যাওয়া সম্ভব। আজ দেশের প্রতিটি শিশু সে যে এলাকারই হোক, এখন সে পোলিও টিকার আওতায়। আজকের বাস্তবতায় জেলা কোটা কতটুকু যৌক্তিক?

কিন্তু কোটার সংস্কার চেয়ে যারা আগুন জ্বালায়, দেশের উন্নয়ন কামনায় তাদের কতটুকু সদিচ্ছা আছে আমার তা নিয়ে প্রশ্ন জাগে। এদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস এক চিরভাস্বর ইতিহাস, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেই ইতিহাসের পথিকৃত। কিন্ত কোনো আন্দোলনেই কখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে হামলা বা তার প্রাণনাশের চেষ্টা হয়নি। নিজের শিক্ষককে মেরে আপনারা আসলেই কি কিছু অর্জন করতে পারবেন? সাধারণ শিক্ষার্থী আর মধ্যরাতে ছাত্রী হলে হামলা হলেই কি আন্দোলন থেমে যাবে ? না কখনো গিয়েছে?
সরকারী সিদ্ধান্তের সুশৃংখল বিরোধিতা করা এবং করতে পারাটাই গনতন্ত্রের সৌন্দর্য। যারা তা বুঝেনা, জাতীয় সম্পদ নষ্ট করে তাদের আন্দোলনের কতটুকু অধিকার আছে তাও বিবেচ্য বিষয়। আজ যে আগুন জ্বলছে এবং উল্টোপাল্টা কথা বলে যাঁরা সেই আগুনে ঘি ঢালছেন , সেই আগুন কি তাঁরা নেভাতে পারবেন? মনে রাখবেন, নগরে আগুন লাগলে দেবালয় রক্ষা পায়না।

সৌরিন দত্তবহুজাতিক সংস্থায় কর্মরত।

Responses -- “কোটা নিয়ে কয়েক ফোটা”

  1. Md. Rafiqul Islam

    দুই লক্ষাধিক পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৫০০০ এর ভিতর যারা টিকে তারা অত্যন্ত মেধাবী সন্দেহ নেই। কিন্তু যিনি সিরিয়ালে ২৫০ তম আর যিনি ৪৫০০ তম তারা দুইজন কি সমান মেধাবী?

    কোটা ধারীরা যদি মেধাবী হয়ে থাকেন, সেই ক্ষেত্রে কোটা তুলে দিলে তাদের ক্ষতি কোথায়?

    Reply
  2. হাবীব ফারুকী

    কোটা নিয়ে আমারও এক সময় ক্ষোভ ছিল। বিশতম বিসিএস আর চব্বিশ তম বিসিএস দুই দলের আমলে আমার ভাইবা পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। চট্টগ্রাম থেকে আসা এক বেকার যুবকের পক্ষে বিসিএস ভাইবা পরীক্ষা দেয়া অনেক কঠিন। যে আত্মীয়ের বাসায় উঠে ছিলাম উনি রাত দেড়টা পর্যন্ত পরিবারের ঠিকুজির হিসাব নিয়ে একটা বালিশ আর চাদর দিয়ে ড্রইং রুমের ফ্লোরে থাকতে দিলেন। ভোরে নাস্তা না করেই বের হলাম পিএসসির উদ্দেশ্যে । এত কষ্ট আর বেদনার মধ্যে চাকরিটা যখন হলো না তখন মন খারাপ করে ছিলাম। এর মধ্যে গুজব শুনছিলাম অনেক কিছুই। টাকা দিয়ে আর দলবাজি করে অনেকে চাকরি বাগিয়ে নিয়েছে। একদলের ঢাবির সাংস্কৃতিক সম্পাদক নাকি ভাইবাতে পেয়েছেন দুইশতে একশ নব্বই। আরো অনেক কিছুই। কিন্তু এর কোন সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ হয়নি। তখন মুক্তিযোদ্বা কোটা ছিল না। পত্রিকার পাতায় দেখতাম জাতির সূর্য সন্তানদের করুণ কাহিনী। কেউ ঠেলা চালাচ্ছেন কেউ রিকশা।কন্যাদায়গ্রস্থ বীর মুক্তিযোদ্বার করুণ কাহিনী। আওয়ামী লীগ সরকার মুক্তিযোদ্বার কোটা চালু ও ভাতা প্রদান চালু করলে এই সব পরিবার কিছু সচ্ছলতা পাচ্ছে। কিন্তু এখন যে ভাবে কোটা কমানোর কথা বলা হচ্ছে তাতে এই মাটির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের অপমান করার সামিল। আবার পুর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার নীল নকসা। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই। লাইনে দাঁড়িয়েই এঁদের সন্তানদের যে চাকরি হচ্ছে তার পরিসংখ্যান কি আপনাদের কাছে আছে? নাকি তাদের বাড়ি থেকে ডেকে এনে চাকরি দিচ্ছেন। অন্যান্য সকল প্রার্থীদের নূন্যতম যোগ্যতার সমান হলেই কি তবে চাকরি মিলছে? তিরিশের শুভংকরের ফাঁকি হচ্ছে গোটা দশেক মুক্তিযোদ্বা সন্তান সন্ততির প্রার্থী খুজঁতে গিয়ে নিয়োগকর্তা চশমা ভেঙে ফেলছেন। বীর সেনানীদের কোন ধরনের অপমান জাতি মেনে নেবে কি?

    Reply
  3. Mute Spectator

    উদ্ভট একখানা প্রবন্ধ। কোটা সংস্কার বা যুক্তিযুক্ত করণের পক্ষে লিখে পরমুহুর্তেই
    কল্পিত অভিযোগে আন্দোলনকারীদের ধোলাই। তিনটা ঘটনা ছাড়া এই আন্দোলন
    অনুকরণ করার মত সুশৃংখল হয়েছে। তিনটে ঘটনা হল;
    ১) প্রথম দিন বিনা উস্কানিতে পুলিশের সার্জিকেল স্ট্রাইক, যার জন্য ডিএমপি কমিশনার গভীর রাতে ছাত্রছাত্রীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
    ২) হলে হলে আন্দোলনকারীদের ‘চোরা মাইর’, কে করেছে তা সবাই জানে।
    ৩) ভিসি’র বাসায় আক্রমণ, যার সাথে আন্দোলনকারীদের দূরতম সম্পর্ক নেই।
    লেখকের কথায় মনে হয় আন্দোলনকারীরা এটি করেছে। সংসদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য লেখক কি শোনেন নাই? কিংবা ঢাবি ভিসির?

    Reply
    • Md.Ja.....

      আপনার সাথে আমিও বলতে চাই কারা ভিসির বাসায় হামলা করল? সাধারণ ছাত্রীর রগ কাটলো এবং নির্যাতন করল? তাদের কি আদৌ বিচারের মুখোমুখি করা হবে?

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—