আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি, তার প্রতিটি ভবনে একটি করে বিশেষ সিঁড়ি বা এলিভেটর রয়েছে। সেই সাথে টয়লেটগুলোতে রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। আর এইসব পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে মূলত প্রতিবন্ধীদের জন্য। যারা হুইল চেয়ারে চলাফেরা করেন তাদেরকে এই এলিভেটরগুলোতে অগ্রাধিকার দেয়া হয়।

বিষয়টি শুধু আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, এই দেশের প্রতিটি রেলস্টেশন, বাস, কনভিনিয়েন্ট স্টোর কিংবা সুপারমলগুলোতে প্রতিবন্ধীদের সুযোগ-সুবিধা দেয়ার এই নিয়ম চালু রয়েছে।

বাস কিংবা ট্রেনে বিশেষ আসনে তাদের  অগ্রাধিকার। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা কিংবা চাকুরিতে যোগ্যদের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য সুযোগ রয়েছে।

আর এইসব নিয়ে কথা বলছিলাম আমার কিছু জাপানি ও অন্যদেশী সহপাঠিদের সাথে। কোটা বিষয়টি তাদের কাছে অপরিচিত শব্দ হলেও রিজারভেশন শব্দটি তাদের কাছে পরিচিত। কোটা আমাদের দেশে বর্তমানে জোরেশোরে শোনা গেলেও বিদেশীদের কাছে বিশেষ সুবিধাকে বুঝানো হচ্ছে।

আমার চীনের সহপাঠি কাই লু বলছিলেন, তাদের দেশে চাকুরিক্ষেত্রে কোন কোটা ব্যবস্থা না থাকলেও প্রতিবন্ধীদের বিশেষ সুবিধা পাওয়ার কথা বলেন।

জাপানি সহপাঠি ইকেদে মিচিরি   বলছিলেন, আমাদের দেশে প্রতিবন্ধীদের সবক্ষেত্রে আগে সুবিধা দেয় হয়। তবে পড়াশুনা কিংবা চাকুরিতে প্রতিবন্ধীরা যোগ্যতার বিনিময়ে নিজেদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করার সুযোগ পায়।

তবে কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা নেয়ার সময় কিছু বিশেষ সুবিধা দেয়, যেমন বিশেষ কক্ষে পরীক্ষার ব্যবস্থা নেয়া। সম্ভবত এইগুলো হলো ফিজিক্যাল ডিজাবলিটিসদের জন্য বিশেষ সুবিধা।

আমার পাশে বসা শিনিচি কুরোদা বলছিলেন, যদি কেউ কোন চাকুরি না পায় তবে সরকার বিশেষ ভাতা দেয়ার ব্যবস্থা করে।   যাতে করে তারা সমাজের উপর বোঝা না হয়।  

কথাগুলো শুনে সত্যি অন্যরকম ভাল লাগা তৈরি হলো।   আমাদের দেশে কোটা ব্যবস্থার সাথে এই দুই দেশের প্রতিবন্ধীদের জন্য সুবিধা দেয়ার কথা মিললেও অন্যক্ষেত্রে মিলেনি।  তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আদিবাসী, নৃগোষ্ঠি ও নারী কোটার প্রয়োজন রয়েছে।   একই সাথে স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান রাখা মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারকে স্বচ্ছলভাবে চলাফেলা করতে দিতে আমাদের সবার দায়িত্ব রয়েছে। শুধু তাই নয়, মুক্তেযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা, সরকারি পরিবহন যেমন বাস-ট্রেন ফ্রি করে দেয়া।  এটা দিয়েও আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের যোগ্য মর্যাদা দিতে পারবো না।    তাদের সন্তানদের জন্য চাকুরি-বিধিতে বিশেষ সুবিধা দেয়ার বিষয়টি নিখাঁদ আবশ্যিক।  তবে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাড়ে চড়ে তাদের দৌহিত্র প্রজন্মকে সুবিধা দেয়ার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

ধরুন আপনি পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর সদস্য কিংবা আপনার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। প্রান্তিক অঞ্চল কিংবা শারীরিক অক্ষমতায় আপনার শত ইচ্ছে থাকার পরও আপনি এগিয়ে যেতে পারছেন না অথবা আপনার যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা বাবার সংসারের দায়িত্ব আপনাকে নিতে হবে। এইসব দেখে শুনে আপনি ছোটকাল থেকে পড়াশুনা করে এগিয়ে আসলেন। শত বাঁধা পেরিয়ে স্কুল, কলেজ পাশ করলেন।   জীবিকা নির্বাহের জন্য আপনাকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা জরুরি।  এই অবস্থায় প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় এগিয়ে যাওয়া অনেক কারণে আপনার সমস্যা। আপনি মনে করছেন, যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার সুযোগ পান তাহলে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করে দেশে ভাল একটা চাকুরি করার সম্ভাবনা থাকে। সব কিছু ছাপিয়ে আপনাদের এগিয়ে নেয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় কোটা ব্যবস্থায় আপনি পড়াশুনা করার সুযোগটি পেলেন।

কথা ছিলো, আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে ভালভাবে পড়াশুনা করবেন, ভাল ফলাফল করে নিজের যোগ্যতায় একটা চাকুরিতে ঢুকবেন। যে উদ্দেশ্যে সরকার আপনাদের কোটাতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দিলেন, ঠিক সেই জায়গাটিতে আপনি যেতে পারলেন না।  আপনার বাবা যে যুদ্ধাহত কিংবা আপনি যে পশ্চাৎপদ প্রান্তিক অঞ্চল থেকে উঠে এসে পড়াশুনার সুযোগ পাচ্ছেন সেই কথাটিও আপনি ভুলে গেলেন।

যে ছাত্রটি আপনার ক্লাসে দিনরাত খেটে পড়াশুনা করলো, চাকুরির জন্য জুতার তলা ক্ষয়ে ফেললো, তাকে ফেলে আপনি সেফ পৌত্রিক অধিকার কিংবা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির অজুহাতে আপনি আপনার ক্লাসের সেরা ছাত্রকে টপকিয়ে চাকুরি বাগিয়ে নিলেন। চাকুরি নেয়ার পর আপনি ভুলে গেলেন, আপনার মুক্তিযোদ্ধা বাবা/নানা কিংবা আপনার সেই অনগ্রসরমান এলাকাকে। ঠিক, এভাবে আপনি ৫৬ শতাংশ চাকুরি কোটায় সুযোগ নিয়ে নিজেদের দাবি করলেন শ্রেষ্ঠ হিসেবে।

 

প্রশ্ন হলো কোটা ব্যবস্থা কেন আপনাদের জন্য দেয়া হয়েছে? যেখানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী আপনার চেয়ে ভাল ফলাফল করেও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারছে না সেখানে কেবল আপনাদের কোটাতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেয়ার পরও কেন আপনারা নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারছেন না? উচ্চশিক্ষা নেয়ার পরও কেন আপনারা অন্যের অনুগ্রহ গ্রহণ করবেন?

না, এটা আমাদের উপলব্ধি নয়। দেশের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠি কিংবা যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের এগিয়ে নিতে তাদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের কোন বিকল্প নেই। শিক্ষার আলোর মাধ্যমে পিছিয়ে থাকা প্রান্তিক অঞ্চলের জনগোষ্ঠিকে আলোকিত করা সম্ভব।  আর এই উদ্দেশ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোটা ব্যবস্থা থাকার বিপক্ষে কেউ মত দেবে না।

কিন্তু যাদেরকে কোটাতে সুযোগ দেয়া হলো, যাদেরকে তার পিছিয়ে থাকা সমাজটাকে এগিয়ে নেয়া সুযোগ দেয়া হলো তারা তাদের যোগ্যতা দেখাতে ব্যর্থ হলেন। একটি ছেলে বা মেয়ে কোটাতে ভর্তি হওয়ার পরও যদি নিজেদের মেলে ধরতে না পারে তাহলে আমি বলবো, কোটায় চাকুরি সুবিধা তাদের মেধা শাণিত করতে অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে।

কোটায় চাকুরির নিশ্চয়তার স্বপ্নে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে গা ছেড়ে পড়াশুনা করেছে। আর তাদের জন্য ৫৬ শতাংশ বরাদ্দ কেন হবে শুনি?

যারা নিজেদের অবস্থান বুঝার যোগ্যতা রাখে না তাদের জন্য কেন বিশেষ সুবিধার পসরা সাজাতে হবে শুনি? এরা তো জীবনটাকে উপলব্ধি করতেই জানলো না, কেবল কোটায় বিভোর হয়ে তারা বখে গেল তখন কি এই রাষ্ট্রের কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না? কোটা অবশ্যই থাকবে, তবে তা কখনো ৫৬ ভাগ নয়।  কোটার সংস্কার অবশ্যই জরুরি।  কোনক্রমেই দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠিকে পিছিয়ে ফেলে নয়।

যারা কোটাবিরোধী আন্দোলনে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছেন, তাদের জন্য রইলো ঘৃণা।  যারা রাজনৈতিক সুবিধা দেয়ার জন্য জ্বালাও পোড়াও করছেন তারা কখনো মানবিক নয়। এটা নিঃসন্দেহে অপরাধ। এই রাষ্ট্র যেমন তাদের কাছ থেকে ভাল কিছু আশা করতে পারে না তেমনি কোটার পক্ষ নিয়ে  শিক্ষার্থীদের উপর হামলাও গ্রহণযোগ্য নয়।

এইদেশের ঐতিহ্য সব সময় ‘রক্তাক্ত রাজপথ’ হবে, তা আমি মানতে নারাজ। অহিংস আন্দোলনে সহিংসতা কখনোই ভাল কিছু আনে না।  যৌক্তিক আন্দোলনের যৌক্তিক সমাধান প্রত্যাশা করছি। একই সাথে সবকিছুতে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সংস্কারও প্রত্যাশা করছি।  রাজনৈতিক মতাদর্শের বলিতে সাধারণ অধিকার আদায়ের ভাষাগুলো যেন হত্যা না করা হয় সেই দিকেও আমাদের সোচ্চার থাকা প্রয়োজন।

নাদিম মাহমুদজাপানের ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত

Responses -- “জাপানের চিঠি: আমাদের কোটা ও তাদের কোটা!”

  1. গাজী সুলতান

    ভালই লাগলো। লেখককে ধন্যবাদ জানাই। আবু রায়হান -এক মন্তব্য সমর্থন করছি।

    Reply
  2. আবু রায়হান

    ধন্যবাদ নাদিমকে । কথাগুলো আরও বাস্তবনির্ভর হলে ভাল হত। যে তথ্যগুলো আশা করছিলাম, ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ।

    Reply
  3. মোঃ রাজিব খান

    মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের জন্মদাতা। আমার মতে, তাদের প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তার পদমর্যাদা এবং সন্মানী দেওয়া হোক। সেই হিসাবে তাদের সন্তানেরা সরকারী কিছু সুযোগ সুবিধা পাবে এটাই সাভাবিক। কিন্তু তাদের ঘাড়ে চড়ে নাতি পুতিরা সুবিধা ভোগ করবে এটা কোনভাবে মেনে নেওয়া যায় না। রাজাকারের সন্তানেরা যদি যুদ্ধাপরাধী হিসাবে বিবেচিত না হয় তাহলে, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানেরাও মুক্তিযোদ্ধা নয়। কিন্তু তারা তাদের পিতার ভাল কর্মের জন্য কিছু সুযোগ সুবিধা পাবার অধিকার রাখে। কিন্তু নাতি পুতিরা কোনভাবেই অধিকার রাখে না। কোটা ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলতে গেলে বলতে হয় যে, অযোগ্যকে চাকুরী দিয়ে মেধাবীদের রাস্তায় ঘুরানো কি ধরনের সিদ্ধান্ত তা বলতে গেলে বলার ভাষা হারিয়ে ফেলি। এগুলো অনুর্বর মস্তিষ্কের কর্মকাণ্ড ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না বলে আমার মনে হয়।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—