বাংলা ভাষা অনার্য বাহুল্য সঙ্কর জনগোষ্ঠি কথিত সংস্কৃতজাত একটি ভাষা। এটি সংস্কৃত ভাষা থেকে প্রাকৃত, অবহটঠহ, অপভ্রংশ, আদি বাংলা ও মধ্য বাংলা ও আধুনিক বাংলা ইত্যাদি পর্যায় অতিক্রম করে বর্তমান রূপ পরিগ্রহ করেছে। বাংলা ভাষা বিবিধ প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রক্রিয়ার উপজাত হিসেবে ভাষা-সংসর্গিক প্রক্রিয়ায় কালক্রমে সৃষ্টি হয়েছে। এটির উদ্ভব, বিকাশ ও পরিপুষ্টি হয়েছে ভারতবর্ষের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে।

এটির উদ্ভবকাল থেকে পরিপুষ্টি পর্যন্ত কালে ভারতবর্ষের এই দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের সীমারেখা এখনকার মতো অলঙ্ঘ্য আন্তর্জাতিক সীমারেখা দ্বারা বিভক্ত ছিলো না। তখন সীমারেখা রাজনৈতিক ও সামরিক কারণে পরিবর্তিত হলেও, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিস্তৃতির ব্যাপারে সেই সীমারেখা ছিলো শিথিল। সেজন্য বাংলা ভাষার একান্নবর্তী ও যুগপৎ বিকাশ, উন্নয়ন ও পরিপুষ্টি এখনকার মতো ভূ-রাজনৈতিক সীমারেখা দ্বারা বাধাগ্রস্হ হয়নি।

কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পরিসমাপ্তিতে এতদাঞ্চলে ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে। ফলে ১৯৪৭ সালের ১৫ অগাস্ট দেশবিভাগ ও ১৯৫৬ সালে ভারতের অভ্যন্তরে ভাষাভিত্তিক সীমা পুনর্নির্ধারণ ইত্যাদি কারণে বাংলাভাষী জনগোষ্ঠি বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ, যেমন-পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, ঝাড়খণ্ড ইত্যাদি দেশ ও প্রদেশে পরিব্যপ্ত হয়ে পড়েছে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সুযোগ বৃদ্ধির ফলে গত শতাব্দি থেকে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। উপমহাদেশের বাইরে এরূপ বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠির আধিক্য লক্ষ্য করা যায় ইংল্যাণ্ড, আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা, সউদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রভৃতি দেশে।

 এসব অবস্থার মধ্যেও বাংলাদেশের ভাষা শহীদ দিবসের দিন ২১ ফেব্রুয়ারিকে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের অঙ্গ-সংস্থা ইউনেস্কো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে এ দিবসটি জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোতে যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। পরবর্তীতে ২০০৯ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৪তম অধিবেশনে বাংলাকে জাতিসঙ্ঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করার আহবান জানানো হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালের ২১ ডিসেম্বর ও ২০১০ সালের ১১ই জুন যথাক্রমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা রাজ্যের বিধান সভা বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে অন্তর্ভূক্তের জন্য বাংলাদেশের দাবিকে সমর্থন করে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাব গ্রহণ করে এবং প্রস্তাবটি জাতিসংঘে উপস্থাপনের জন্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারকে অনুরোধ করে।

বাংলাদেশ ও ভারতের দু’টি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরা কর্তৃক একযোগে বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসাবে চালু করার দাবির বিষয়টি ইঙ্গিত করে যে-রাজনৈতিক বিভক্তির মধ্যেও ভাষার প্রশ্নে বাংলাদেশ ও ভারতের বাংলা ভাষাভাষী প্রধান রাজ্যগুলোর মধ্যে ঐকমত‍্য রয়েছে। বাংলা ভাষার প্রশ্নে এই ঐতিহাসিক ঐকমত‍্যটি আরো একটি বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে যে-বাংলা ভাষাভাষী ভারতীয় রাজ্যগুলো বাংলা ভাষার মর্যাদার প্রশ্নে হিন্দি ভাষার কাছে ছাড় দিতে রাজি নয়। এ ধরনের একটি অভাবনীয় ঐতিহাসিক ঘটনা প্রমাণ করে যে ভূ-রাজনৈতিক সীমারেখা দ্বারা বিচ্ছিন্ন নানা ধর্ম, বর্ণ, পেশা ও মর্যাদার জনগোষ্ঠি বাংলা ভাষার মাধ্যমে একসূত্রে গ্রথিত আছে।

বাংলাভাষী অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহ ভূ-রাজনৈতিক সীমারেখা দ্বারা বিভক্তির ফলে, বাংলা ভাষা দেশ ও অঞ্চলভেদে নানারূপ ভাষা পরিস্থিতিতে বিরাজিত রয়েছে এবং দেশ ও অঞ্চলভেদে বাংলা ভাষা নানান রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার আওতায় পরিবর্তিত হচ্ছে। কাজেই দেশ ও অঞ্চলভেদে বাংলা ভাষার অবয়ব, মর্যাদা ও প্রায়োগিকতার নানা মাত্রা বিরাজিত রয়েছে। কাজেই দেশ ও অঞ্চল ভেদে ভিন্নতর ভাষার সাথে প্রতিযোগিতায় বাংলা ভাষার অবয়ব, মর্যাদা ও প্রায়োগিকতার যথার্থতাকে প্রমাণ করতে হচ্ছে। ফলে দেশ ও অঞ্চল ভেদে বাংলা ভাষা নানারূপ ভাষা-সংসর্গ পরিস্থিতির আওতায় পরিবর্তিত হচ্ছে। কোথাওবা অন্য ভাষার তুলনায় বাংলা অতিথর, আবার কোথাওবা অধিথর অবস্থানে রয়েছে। বাংলা ভাষার কর্ষণ ও বিকাশে বাংলাদেশে উপযুক্ত রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাংবিধানিক পরিবেশ বিরাজিত থাকলেও, পৃথিবীর অন্যান্য দেশ বা অঞ্চলে সেরূপ রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাংবিধানিক পরিবেশ বিরাজিত নেই।

ভারতের কয়েকটি রাজ্য, যেমন-পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় বাংলা ভাষা কর্ষণ ও বিকাশে অনুকূল পরিবেশ বিরাজিত থাকলেও, নানান সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতাকে মোকাবেলা করে বাংলা ভাষাকে টিকে থাকতে হচ্ছে। আবার আসাম ও ঝাড়খণ্ড ইত্যাদি রাজ্যে বাংলা ভাষা বিকাশের প্রতিকূলে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ বিদ্যমান রয়েছে। আবার উপমহাদেশের বাইরে পশ্চিম এশিয়া ও পাশ্চাত্য দেশসমূহে যথেষ্ট সংখ্যক বাংলা ভাষাভাষী অভিবাসিত থাকলেও, বাংলা ভাষা চর্চার ক্ষেত্রে উপযুক্ত পরিবেশ বিদ্যমান নেই। বাংলাদেশে বাংলা ভাষাচর্চা ও বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ বিদ্যমান রয়েছে। কিন্তু এই উপযুক্ত পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে বাংলা ভাষাকে বিকাশ ও উন্নয়নের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। যে কারণে ইংরেজি, আরবি ও হিন্দি ইত্যাদি ভাষার ভাষিক আধিপত্যবাদের কবলে নিপতিত হয়ে বাংলা ভাষার চর্চা ব্যাহত হচ্ছে।

কোন ভাষার গঠন, মর্যাদা ও প্রায়োগিকতাকে উৎসাহিত বা বাধাগ্রস্ত করতে প্রয়োজন একটি  ভাষানীতির। বাংলা ভাষাভাষী অধ্যুষিত দেশ বা অঞ্চলে বাংলা ভাষার অুনুকূলে বা প্রতিকূলে বিচ্ছিন্নভাবে ভাষানীতি বিষয়ক কিছু ব্যবস্থা নিতে দেখা গেছে, কিন্তু কোথাও বাংলা ভাষার চর্চা ও বিকাশে পূর্ণাঙ্গ কোন ভাষানীতি প্রণয়ন করতে দেখা যায়নি।

ভাষানীতির আওতায় প্রবর্তিত এসব রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কোথাও কোথাও বাংলা ভাষাভাষীদের মধ্যে অসন্তোষ বা আন্দোলন উসকে দিয়েছে, যেমন-আসামের শিলচরে বাংলা ভাষার মর্যদার লড়াইয়ে আন্দোলনে শহীদ হওয়ার বিষয়টি এর একটি উদাহরণ; তদ্রুপ ঝাড়খণ্ডে বাংলা ভাষাভাষীদের হিন্দি ভাষাভাষী হিসাবে চিহ্নিত করার ফলে সেখানে অসন্তোষ বিরাজিত রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—