ইতালিতে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো- তার ফলাফল দেশটিতে একটি ঝুলন্ত পার্লামেন্টের সমূহ সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কোন রাজনৈতিক দল অথবা জোটই এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি যাতে তারা সরকার গঠন করতে পারে। এই নির্বাচনে মূলত পপ্যুলিস্ট এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক দলগুলো সবচেয়ে ভালো ফলাফল করেছে। ফলাফলে মধ্য-ডানপন্থী জোট পেয়েছে ৩৭% ভোট এবং ২৬০ জন সংসদ সদস্য।

ফাইভ স্টার মুভমেন্ট পেয়েছে ৩২ দশমিক ৬৮% ভোট এবং ২২১ জন সংসদ সদস্য। মধ্যবামপন্থীদের পক্ষে পড়েছে ২২ দশমিক ৮৫% ভোট ও তাদের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ১১২ জন এবং লিবারি ই উগালি পেয়েছে ৩ দশমিক ৩৯% ভোট ও ১৪ জন সংসদ সদস্য তাদের দলের। ইতালিতে সরকার গঠনের জন্য দেশটির সংসদে ৩১৬ জন সংসদ সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন হয়।

অনেকেই ধারণা করছেন যে ফাইভ স্টার মুভমেন্ট এবং অ্যান্টি-ইমিগ্রেশন লীগের মতো কট্টর ডানপন্থীদের মধ্যে কিংবা ডেমোক্রেটিক পার্টি ও অন্যান্য ডানপন্থীদের মধ্যে সমাঝোতো হতে পারে। এই নির্বাচনের ফলাফলে যে সরকার গঠিত হবে তাদের স্থায়িত্ব নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়। অপরদিকে বিশ্লেষকরা বলছেন ইতালিতে নির্বাচনের এই ফলাফলের ভিত্তিতে এমন জোটগত সরকার গঠিত হতে পারে যাদের মূল লক্ষ্যই থাকবে নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার।

ইতালির পুঁজিপতিরা চেয়েছিল এমন একটি শক্তিশালী সরকার যারা আবারো কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের সুবিধা কর্তন করবে এবং শ্রমিকদের অধিকার সঙ্কুচিত করবে, যারা পতিত ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধার করতে পারবে এবং ২০০৮ এর অর্থনৈতিক মন্দার ফলে সৃষ্ট বন্ধ্যা অর্থনীতিকে সচল করতে পারবে। অতীতে তারা ভরসা হিসাবে বেছে নিয়েছিল ডেমোক্রেটিক পার্টিকে এবং এবার তারা বেছে নিতে চেয়েছিল সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেরলুসকনিকে। কিন্তু নির্বাচনী হিসাব সবকিছু পাল্টে দিল। এই নির্বাচনে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে এসব প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর ক্ষেত্রে। এর মুল কারণই হলো এসব দলগুলো অতীতে যে কৃচ্ছ্রতাসাধন ঘটেছে তার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। তাই জনগণ তাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

মধ্য-ডানপন্থী জোট মূলত গঠিত হয়েছিল বেরলুসকনির ফরজা ইতালিয়া এবং সাভালিনির অ্যান্টি-ইমিগ্রেশন লীগের সমন্বয়ে। এই অ্যান্টি-ইমিগ্রেশন লীগকে নর্দান লীগ হিসাবে ডাকা হয় এবং এরা অতি-ডানপন্থী, বর্ণবাদী, বিভেদকামী এবং অভিবাসনবিরোধী। তারা ইতালির উত্তরাঞ্চলকে দেশের বাকী অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায় এবং তাদের মতে দক্ষিণাঞ্চলের অধিবাসীরা অলস ও অপদার্থ। তারা আফ্রিকা এবং এশিয়া থেকে যাওয়া অভিবাসীদের ফেরত পাঠাতে চায়। তারা ‘ইতালি শুধু ইতালিয়ানদের’ এই উগ্র-জাতীয়তাবাদী স্লোগান তুলে সারা দেশ থেকে ১৭.৬% ভোট নিজেদের পকেটে নিতে সক্ষম হয়েছে। অথচ ২০১৩ সালে তাদের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৪%। এদিকে বেরলুসকনির ফরজিয়া ইতালিয়া ২০১৩ সালে পেয়েছিল ২১.৫% ভোট আর এবার পেয়েছে ১৪% ভোট।

বেরলুসকনির ‘রাষ্ট্রনায়কোচিত’ ভাবমূর্তি এখন আর ইতালীর জনগণ গ্রহণ করছে না। ইতালির শ্রমিকশ্রেণি তাদের দুর্দশার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ইউরোকে দায়ী করছে। সুতরাং যারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে আছে তাদেরকে ইতালির অধিকাংশ জনগণ সমর্থন করছে না। সঙ্কট এমন তীব্রমাত্রায় পৌঁছেছে যে ঐ দেশের জনগণ পরিবর্তন চাইছে। এমনকি যারা উগ্র নীতি প্রস্তাব করছে তাদেরকে বেছে নিতেও তাদের কুণ্ঠাবোধ হচ্ছে না। তাই বেরলুসকোনির মডারেট চরিত্র তাদের কাছে পাত্তা পাচ্ছে না।

অপরদিকে সাভালিনি উগ্র-জাতীয়তাবাদী স্লোগান তুলেছে এবং তার দলের অভিপ্রায় তারা সরকার গঠন করলে হাজার হাজার অভিবাসীদের দেশে ফেরত পাঠাবে। ইতালিতে বেকারত্ব যেভাবে বাড়ছে তাতে অনেকেই ভেবেছে অভিবাসীদের ফেরত পাঠালে তাদের জন্য পরিস্থিতি ভালো হবে। সবচেয়ে দু:খজনক ব্যাপার এই যে ইতালিতে এমন কোন বামপন্থী শক্তি নেই যে তারা জনগণকে বোঝাতে সক্ষম হবে যে এই ধরনের বিভেদকামী নীতি প্রকৃতার্থে শ্রমিকশ্রেণিকেই দুর্বল করে তুলবে। এই সুযোগে এই বর্ণবাদী গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছে।

নির্বাচনী প্রচারনার সময় বেরলুসকনি বারবার ঘোষণা করেছেন মধ্য-ডানপন্থিরা সরকার গঠন করলে তিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু তাদের জোট নির্বাচনে সরকার গঠনের জন্য একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। আবার অন্যদিকে তার দলও প্রত্যাশিত ফল লাভ করেনি। তাই যেহেতু লীগ জোটের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছে তাই নাটাই এখন তাদের হাতে। তাই এই জোটের ভবিষ্যৎ এখন সাভালিনি এবং তার দলের হাতে।

ফাইভ স্টার মুভমেন্ট প্রত্যাশার চেয়ে ভালো ফলাফল করেছে। তারা ২০১৩ সালে পেয়েছিল ২৫.৫%। এবার তারা ৩২% এর বেশি ভোট পেয়েছে। তারা প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর ব্যর্থতা থেকে এই সফলতা পেয়েছে। তারা সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে দক্ষিণাঞ্চলে এবং তরুণদের। দক্ষিণে তাদের প্রাপ্ত ভোট অঞ্চলভেদে কোথাও ৪৫% আবার কোথাও ৫৫%। আর তারা তরুণদের ভোট পেয়েছে ৪৩%। ইতালিতে যে পুঁজিবাদের সংকট চলছে তার সবচেয়ে বড় শিকার দক্ষিণাঞ্চল এবং তরুনরা। ইতালিতে এখন বেকারত্ব ভয়াবহ আকারে বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার মারাত্মক। সরকারী হিসাবেই এই বেকারত্বের হার ১১%। আবার অঞ্চলভেদে কোথাও এই হার ৩০%। ফাইভ স্টার মুভমেন্ট কৃচ্ছ্রতাসাধনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নে ইতালির অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল এবং এই প্রশ্নে গণভোটের দাবিও তুলেছিল। তারা দুর্নীতিবিরোধী প্রচারণাও চালিয়েছিল। মুলত প্রচলিত পুরানো ব্যবস্থার তথাকথিত বিরোধিতাই তাদের জনপ্রিয়তার মূল কারণ। কিন্তু তারা ইতালির পুঁজিবাদেরই একটি অঙ্গ। তাইতো তারা ট্রেড ইউনিয়নের বিপক্ষে। তাই প্রকৃত সঙ্কট থেকে উত্তরণ কতটুকু তারা ঘটাতে পারে তাও প্রশ্নসাপেক্ষ।

তবে ইতালির নির্বাচনে নব্য-ফ্যাসিবাদের পক্ষে বেশি একটা ভোট পড়েনি। এই ধরনের দলগুলোর ভরাডুবি ঘটেছে। ২০১৩ সালে দুইটি ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠী ৯ লাখ ২০ হাজার (০.২৭%) ভোট পেয়েছিল । এবার তারা ভোট পেয়েছে ৪ রাখ ২৯ হাজার (১.৩২%)। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় ইতালিতে নব্য-ফ্যাসিবাদের তথাকথিত হুমকি কত দুর্বল। যদিও এইসব নব্য-ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীগুলো বামপন্থি এবং অভিবাসীদের ওপর চোরাগোপ্তা হামলা অব্যাহত রেখেছে।

ইতালির নির্বাচনে সবচেয়ে বিপর্যয় ঘটেছে ক্ষমতাসীন মধ্য-বামপন্থীদের।  এর সবচেয়ে বড় কারণ ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী মাত্তেও রেনজির দাম্ভিকতা। এই জোট ২০১৩ সালেও ২৯.৫% ভোট পেয়েছিল। এবার তা ২৩% এর নিচে চলে গিয়েছে। আর রেনজির দল ডেমোক্রেটিক পার্টি পেয়েছে ১৮.৭% ভোট। অথচ ২০১৪ সালের ইউরোপীয়ান নির্বাচনে এই দল ৪০% এর বেশি ভোট পেয়েছিল। কিন্তু তারপর থেকেই তাদের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। ২০১৬ সালে তারা যে সংবিধান সংশোধনের প্রচেষ্টা চালায় ইতালির ৬০% জনগণ তার বিপক্ষে ভোট দিয়ে রুখে দেয়। বিশেষ করে ইতালির দক্ষিণাঞ্চলের জনগন, শ্রমজীবী নাগরিক  এবং তরুণরা তাদেরকে প্রত্যাখান করে। রেনজির দলের এই বিপর্যয়ের মূল কারণ তার নেওয়া কৃচ্ছ্রতাসাধনের নীতি। এছাড়া তাঁর সময়ে অর্থনীতিও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং বেকারত্ব বাড়ে। রেনজি দলের মধ্যে ক্ষমতা আরো কেন্দ্রীভূত করার লক্ষ্যে ইতালির সাবেক কমিউনিস্ট পার্টি থেকে তাঁর দলে আসা সংসদ সদস্যদের কোনঠাসা করে। তখন তারা একটি নতুন রাজনৈতিক দল লিবারি ই উগালি (মুক্ত এবং সমতা) গঠন করে, যারা এবার ১৪টি সংসদ সদস্য পেয়েছে। এবারের নির্বাচনের বিপর্যয় রেনজির দলকে আবারও ভাঙ্গনের মুখে ফেলতে পারে বলে অনেকে ধারণা করছেন।

প্রখ্যাত মার্কসবাদী তাত্ত্বিক আন্তেনিও গ্রামসির দেশ ইতালির বিপ্লবী বামপন্থীদের নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোট খুবই সামান্য। বামপন্থী দল সিনিস্ত্রা রিভিল্যুজিনিরিয়া মাত্র সাড়ে ৩২ হাজার ভোট পেয়েছে। আর পার্টিও কমিউনিস্টা পেয়েছে ১ লাখ তিন হাজার (০.৩২%) ভোট। অথচ একসময় ইতালিতে শক্তিশালী বামপন্থী ঐতিহ্য ছিল। ইতালিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির ২ মিলিয়ন পার্টি সদস্য ছিল। ১৯২০-৩০ এর দশকে তাদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের ক্ষমতা ছিল। কিন্তু তা আজ সোনালী অতীত। নানা ধরনের বিচ্যুতি আর সময়োপযোগী কর্মসুচী না নিতে পারার কারণে তাদের আজকের এই দুর্বল অবস্থান। বরঞ্চ তাদের স্থান দখল করেছে ফাইভ স্টারের মত পপ্যুলিস্ট কিংবা উগ্র-ডানপন্থী দলগুলো।

ডেমোক্রেটিক পার্টির দুর্বলতা এবং রেনজির পতন ইতালিয়ান বুর্জোয়াদের সামনে বড় সমস্যা সৃষ্টি করেছে। কেননা এই শক্তিটিই এতদিন তাদের প্রতিনিধিত্ব করছিল। অবশ্য এখন যারা ক্ষমতায় আসবে তারাও তাদেরই নীতি অনুযায়ী চলবে। এই ব্যবস্থাকে তারা এড়াতে পারবে না। তাই কৃচ্ছ্রতাসাধনের নীতিও বহাল থাকবে। বহাল থাকবে জনগনের জীবনযাত্রা আর শ্রমিকশ্রেণির ওপর আক্রমণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—