[মার্চ সংগ্রামের মাস মার্চ সশস্ত্র যুদ্ধ শুরুর মাস মার্চ স্বাধীনতার মাসযে মানুষটির নামে এবং যার প্রেরণায় লক্ষকোটি বাঙালি ঝাপিয়ে পরেছিল স্বাধীনতা যুদ্ধে, সে মানুষটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বঙ্গবন্ধুই প্রথ এবং একমাত্র নেতা যে সমগ্র বাঙালি জাতিকে এক মন্ত্রে এক মঞ্চে দাঁড় করাতে সক্ষম হয়েছিলেন তাই প্রশ্ন হচ্ছেনেতা হিসেবে কেমন ছিলেন তিনি? কিইবা ছিল তার নেতৃত্বের গুণাবলী? এই দিকগুলির সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণই এ লেখার প্রধান উদ্দেশ্য]  

নেতাদের থাকে কল্পনা শক্তি। তারা দেখেন স্বপ্ন। সে স্বপ্ন সাধারণ মানুষের জন্য। নেতাদের থাকে সাহস, প্রতি পদক্ষেপে দেয় নির্ভীকতার পরিচয়। মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করাই তাদের জীবনের লক্ষ্য। সমাজকে উদ্বুদ্ধ করার মাঝে তাঁরা সমগ্র জাতিকে করে অনুপ্রাণিত। আবেগ ও ভালবাসা দিয়ে সাধারন মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে বটে, তবে যুক্তি-তর্ক ও তথ্যের মাঝে জনগনের আশা-আকাংক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যায় অভীষ্ট লক্ষে। তারা নিরহংকারী এবং বিনয়ী। তাদের চিন্তা, কথা ও কাজে পরিলক্ষিত হয় এক গভীর সমন্বয়। তাই প্রতিটি পদক্ষেপে প্রকাশ পায় মূল্যবোধের ইন্টিগ্রিটি। আর এসব মাপকাঠিতে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান কোথায়?

বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল সুচিন্তিত ও সুপরিকল্পিত। ১৯৫৫ সালে তিনিই প্রস্তাব করেন দলের নাম আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে আওয়ামী লীগে পরিবর্তনের জন্য (It was due to Mujib’s initiative that in 1955 the word ‘Muslim’ was dropped from the name of the party to make it sound secular – Banglapedia: National Encyclopedia of Bangladesh) ।

এটি নিঃসন্দেহে একটি ভিশনারি পদক্ষেপ। এই পরিবর্তন শুধু একটি শব্দ বর্জন করাই নয়, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে প্রচলিত হয় গণতান্ত্রিক প্রেক্ষাপটে প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনা, জন্ম নেয় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত সমাজের এক নতুন রাজনৈতিক ধারা। আর তা হচ্ছে রাজনীতিতে ধর্ম নিরপেক্ষতার সংযোজন। সেদিন বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন ভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সমন্বয়ে এক নতুন সামাজিক বন্ধনের। বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে বোঝা যায় এর মর্ম ও তাৎপর্য।

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরাধীনতা থেকে মুক্তির প্রয়াসে ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু ও তার দল ঐতিহাসিক ছয় দফা প্রস্তাব পেশ করে এবং বাস্তবায়নের দাবি করেন। এটি একটি সুচিন্তিত ও সুনির্দিষ্ট দাবী, যার মাঝে অন্তর্নিহিত ছিল সাধারণ মানুষের আশা আকাঙক্ষা, যা ছিল বাঙালি জাতির আত্ননিয়ন্ত্রণের পথে এক বলিষ্ট পদক্ষেপ। পাকিস্তানের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আপস করেননি ছয় দফার সাথে। শুধু তাই নয়, ৩রা জানুয়ারি ১৯৭১ নব নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ছয় দফার উপর শপথ করান। এই ঘটনাকে অর্থনীতিবিদ নুরুল ইসলাম এভাবে তুলে ধরেন: “All the members of Parliament were called upon to solemnly swear an oath that they would never betray the masses who had entrusted them to realise the six-points programme” (Islam, p. 96, 2005 Making of a Nation – Bangladesh: an Economist’s Tale, The University Press Limited)। এর মাঝে পুনরায় পরিলক্ষিত হয় বঙ্গবন্ধুর ইন্টিগ্রিটি বা নেতৃত্ব প্রদানের ভিশনারি দিকটি। নিঃসন্দেহে, ইন্টিগ্রিটি বর্জিত বঙ্গবন্ধু হয়তো সেদিন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রি হতে পারতেন, তবে বাংলার মানুষের নেতা হতে পারতেন না।

এরপর আসে ৭ মার্চ, ১৯৭১। একজন শ্রেষ্ঠ নেতার সমস্ত গুণাবলীর সমন্বয়ে বঙ্গবন্ধু উঠে আসেন মঞ্চে। উঠে আসেন বাঙালি জাতির বৃহত্তর চিত্রটি অঙ্কনের প্রয়াসে এবং উপহার দেন জাতির আত্ননিয়ন্ত্রণের নকশা। এক বিশাল জনগোষ্ঠির সামনে তুলে ধরেন বাংলার গত ২৩ বছরের ইতিহাস; ব্যাখ্যা করেন সেদিনের পরিস্থিতি এবং সেই সাথে নির্দেশনা দেন ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার। দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উচ্চারণ করেন বাঙালি জাতির ভিশন – ‘বাংলার মানুষ মুক্তি চায়’। তবে এ মুক্তি শুধু অর্থনৈতিক মুক্তিই নয়, রাজনৈতিক মুক্তিও বটে। তাই ভিশনের পাশাপাশি উচ্চারণ করেন মিশণের বাণী – ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’।

স্বাধীনতার এ স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন অনেক পূর্বেই। ষাটের দশকের শুরুতে  নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিংহ ও খোকা রায়ের সাথে এক বৈঠকে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘…গণতন্ত্র- স্বায়ত্তশাসন এসব কিছুই পাঞ্জাবিরা দেবে না। কাজেই স্বাধীনতা ছাড়া বাংলার মুক্তি নেই। …স্বাধীনতাই আমার চূড়ান্ত লক্ষ্য’ (সাপ্তাহিক একতা, ১৯  আগস্ট ১৯৮৮)।

৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ সনে আশারামবাড়ি হয়ে বঙ্গবন্ধুর আগরতলা যাওয়াও ছিল একই উদ্দেশে আর তা হচ্ছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয় ‘… the Awami League supremo Sheikh Mujibur Rahman arrived in Agartala secretly to meet Sachindralal Singha, the chief minister of  Tripura, to seek assistance for a possible independence campaign’ (Bhaumik, 2016, p. 13: The Agartala Doctrine, Oxford University press)।

পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে ত্রিপুরার চিফ মিনিস্টার বলেন, ‘This (Agartala visit) was no surprise visit, we were expecting him’।

সেই সাথে তিনি আরো যোগ করেন, ‘Mujib made it clear that ‘Bengalis could no longer live with honour and hope with Pakistan and therefore he was seeking help for the liberation of his people’ (Bhaumik, 2016, p. 14: The Agartala Doctrine, Oxford University press)।

এরপরও যদি কেউ বলে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা চাননি, তা হবে তাদের ইতিহাসজ্ঞানের আভাবের সমতুল্য।

৭ মার্চের মঞ্চে বঙ্গবন্ধু একজন conscious competent (নেতৃত্বের এমন এক পর্যায়, যেখানে নেতৃত্ব প্রদানের গুণাবলী চেষ্টা ও সাধনের মাঝে অর্জিত হয়) নেতা থেকে রূপান্তরিত হন একজন unconscious competent (এমন এক পর্যায়, যেখানে নেতৃত্ব প্রদানের গুণাবলী নেতাতে সহজাতভাবে উদয় হয়) নেতাতে। তাইতো সেদিনের ‘অফ-দি-কাফ’ ভাষণ ছিল বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। আবেগ ও ভালবাসা দিয়ে, সেইসাথে সাহস জুগিয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষের সাথে এক বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন করতে সমর্থ হন। আর এর মাঝে তিনি বাংলার জনগণকে ‘আপনারা’ (‘আজ দুঃখ ও ভারাক্রান্ত মনে ‘আপনাদের’ সামনে উপস্থিত হয়েছি’) থেকে ‘তোমরা’ (‘‘তোমাদের’ উপর আমার অনুরোধ রইলো’) বলে সম্মোধন করার অধিকার অর্জন করেন। আর সমগ্র জনগণ থেকে যে এই অধিকার অর্জন করতে পারেন, সেই তো প্রকৃত নেতা।

এটা আজ আর কারো অজানা নয় যে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সর্বকালের (গত ২৫০০ বছরের) শ্রেষ্ঠ ভাষণের একটি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বিশ্বজুড়ে। সম্প্রতি প্রকাশিত We Shall Fight on the Beaches নামের গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে এ ভাষণটি। ২০১ পাতা ছাপা এ ভাষণের শিরোনাম – The Struggle this Time is the Struggle for Independence। বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণার উৎস হলেও, শুধুই স্বাধীনতার মাঝে সীমাবদ্ধ নয়; এ ভাষণ জাতির দিক-নির্দেশনার উৎস হয়ে থাকবে যুগ যুগ ধরে। সে কারণেই আজও ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ভাষণ পাঠ সকলের অত্যাবশ্যক।

স্বাধীনতার ঘোষণার সময় (টাইমিং) নিয়ে অনেকে মনে করেন বঙ্গবন্ধু আরো অনেক পূর্বেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে পারতেন। স্বাধীনতার ঘোষণাতেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের কৌশলগত দিকটি ফুটে উঠে। ঘোষণাটি আসে যুদ্ধের ঘোষণার মাঝে: ‘Pak Army suddenly attacked E.P.R. base at Philkhana and Rajarbagh police, killing citizens …’ যার উল্লেখ আছে রবার্ট পেইনের Massacre গ্রন্থে। বঙ্গবন্ধু এ ডাক দিয়েছিলেন পাকবাহিনীর আক্রমণের পর পর। এটা করা হয়েছিল কৌশলগত কারণে, যাতে বিশ্ববাসী বাঙ্গালির স্বাধীকার সংগ্রামকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করতে না পারে।  আমাদের স্বাধীকার সংগ্রাম কেন বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত হতে পারতো তা বোঝার জন্য ১৯৭০-৭১’ এ যুক্তরাষ্ট্র আর পাকিস্তানের সম্পর্ক, স্নায়ুযুদ্ধকালীন আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বাংলা-পাক-ভারত উপমহাদেশ সম্পর্কিত নিক্সন ও কিসিঞ্জারের psyche বোঝা বিশেষ প্রয়োজন। এই পরিসরে  বিস্তারিত লেখা সম্ভব নয়, তাই শুধু কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করছি। যুক্তরাষ্ট্র আর পাকিস্তানের সম্পর্ক তখন তুঙ্গে। ইয়াহিয়ার মাধ্যমে নিক্সন ও কিসিঞ্জার চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে ব্যস্ত তখন। তাদের  ব্যক্তিগত এবং রাষ্ট্র পর্যায়ে সম্পর্কের পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে গ্যারি ব্যাসের সম্প্রতি (২০১৩ সন) প্রকাশিত গ্রন্থ The Blood Telegraph’ এ। নিক্সনের পছন্দের মানুষের সংখ্যা ছিল খুব কম।

উল্লেখ্য, পছন্দের কয়েকজনের মধ্যে ইয়াহিয়া খান একজন (গ্যারি ব্যাস, ২০১৩, The Blood Telegraph, p. 7)। সেই সময়ের জিও-পলিটিক্যাল প্রেক্ষাপটে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়াই ছিল নিক্সন ও কিসিঞ্জারের প্রধান লক্ষ্য। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালিদের কী হবে বা হতে পারে ইয়াহিয়ার বর্বর শাসনে, তাতে তাদের কোন মাথাব্যথা ছিল না। কিসিঞ্জার বলে – “No one has [yet] understood what we did in India-Pakistan and how it saved the China option which we need for the bloody Russians. Why would we give a damn about Bangladesh?

উত্তরে নিক্সন বলে – ‘We don’t’ (গ্যারি ব্যাস, ২০১৩, The Blood Telegraph, p. ৩৪২)। শুধু তাই নয়, যে কোন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সংহতি রক্ষার ক্ষেত্রে নিক্সন ছিল বদ্ধপরিকর। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ ও বাঙালির সম্পর্কে তাদের ধারণা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের বারবার ব্যখ্যা দেওয়া সত্যেও কিসিঞ্জারের ধারণা ছিল আওয়ামী লীগ ও বাঙালি রাজনৈতিকভাবে বাম (কিসিঞ্জার বলে – “Mr President, … the Bengalis… are by nature left’ (গ্যারি ব্যাস, ২০১৩, The Blood Telegraph, p. 87)। নিক্সন প্রশাসনের এই ধরনের মন-মানসিকতার প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর যে কোন একটি ভুল টার্ন আমাদের স্বাধীকার আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন হিসেবে চিহ্নিত করে নস্যাৎ করে দিতে পারতো যুক্তরাষ্ট্র, চীন সহ বেশ কিছু রাষ্ট্রে। যে কারণে নস্যাৎ হয়েছে আয়ারল্যান্ডের IRA আন্দোলন, স্পেনের Basque Country আন্দোলন, এবং তামিল টাইগারদের স্বাধীকার আন্দোলন।

আমার রাজনৈতিক পর্যালোচনায়, বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠা বঙ্গবন্ধুর সর্বশেষ ভিশনারি পদক্ষেপ। সারা জীবন যে মানুষটি ওয়েস্টমিনস্টার স্টাইলের গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিল, সে কি কারণে বাকশাল পদ্ধতি প্রণয়ন করেন? আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি? কোন রাজনৈতিক,  অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এই পদক্ষেপটি নেয়া হয়? এটা আমাদের এবং বিশেষ করে আমাদের প্রজন্মের জানা ও বোঝার বিশেষ প্রয়োজন।

তখন দেশ রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন হয়েছে মাত্র। চারিদিকে ধ্বংস আর অভাবের ছাপ। তবে নব গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা সীমাহীন এবং সেটাই হয়তো স্বাভাবিক। ঠিক সেই সময় বৃহত্তর বিরোধী দল হিসেবে জাসদ (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) আত্নপ্রকাশ করে। তাদের কাছে মার্ক্সের সমাজতন্ত্র তত বৈজ্ঞানিক বলে মনে হয়নি। তাইতো জাসদের সমাজতন্ত্রের আগে প্রয়োজন হয় ‘বৈজ্ঞানিক’ নামক এক বিশেষণের। তখন জাসদের গণবাহিনী বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে এবং শহরতলীতে সৃষ্টি করে  এক ত্রাসের রাজত্ব। ক্ষুদে ব্যবসায়ীদের উপর অত্যাচার, কৃষকের উপর জুলুম, থানা আক্রমণ ও অস্ত্র লুট, গুপ্ত হত্যা – এসব ছিল প্রতিদিনকার ঘটনা।

উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক হটকারিতার মধ্য দিয়ে নব্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ব্যহত করা। এটা যে হটকারিতা ছিল তা স্পষ্ট হয়ে যায় যখন দেখি ১৯৭৫ পর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের লেবাস ছেড়ে দলের নেতাদের কেউ রাতারাতি ধর্মের নামে  রাজনীতির ঝাণ্ডা উড়ায়, কিংবা সামরিকতন্ত্রের বীর সৈনিকরূপে আত্নপ্রকাশ করে, এবং কেউ কেউ আবার মন্ত্রীত্বের শপদ নেয় রাজাকার-আল বদরদের সাথে একি কাতারে। তখন সুযোগ বুঝে গোপনে সাহায্যের হাত এগিয়ে দেয় স্বাধীনতা বিরোধী চক্র। এখানে উল্লেখ্য, মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী  কমিউনিস্ট পার্টির একাংশ বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে এবং স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করেন। অর্থ ও অস্ত্রের জন্য তারা পাকিস্তানের কাছে ধরনা দেন। ১৯৭৪ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ‘আমার প্রিয় প্রধানমন্ত্রী’ সম্বোধন করে চিঠি লেখেন। চিঠির ভাষা ছিল এমন- ‘আমার প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, পুতুল মুজিব চক্র এখন জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। এই চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য অর্থ, অস্ত্র ও ওয়্যারলেস সরঞ্জাম প্রদানের আবেদন জানাচ্ছি।’ (সোহরাব হাসান, , আগস্ট ০৮, ২০১৬, প্রথম আলো)।
সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশের ধ্বংসস্তুপের উপর বসে যখন বঙ্গবন্ধু সরকারের দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতির প্রচেষ্টায় মনোনিবেশ করার কথা, তখন অভ্যন্তরীণ প্রতি বিপ্লবীদের সামলাতেই ব্যস্ত থাকতে হয়। সেই সাথে ১৯৭৪’এর বন্যা, খাদ্যাভাব এবং পি এল ৪৮০ অধীনে মার্কিন সরকারের নানা অজুহাতে প্রায় নয় মাস ঝুলিয়ে রেখেও খাদ্য সামগ্রী সরবরাহ না করা। ফলে দেশ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে। ঠিক এসময় বাকশাল চালুর প্রক্রিয়া শুরু হয়। দেশের ভিতরের প্রতিবিল্পবীদের প্রতিহত করে, প্রশাসনকে দুর্নীতিমুক্ত করে এং সেই সাথে বহির্বিশ্বের উপনিবেশিক শক্তিকে সামলিয়ে, সর্বস্তরে স্বাধীনতার মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তি লাভই ছিল এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য। তৎকালীন প্লানিং কমিশনের উপ প্রধান নূরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন এবং কোন এক  ঘরোয়া আলোচনার সময় বাকশালের ব্যাপারে তার নিজস্ব হতাশার কথা জানান।

উত্তরে বঙ্গবন্ধু কি বলেছিলেন তা তিনি এভাবে তুলে ধরেনঃ ‘বঙ্গবন্ধু অবাক হন at the inability or unwillingness to appreciate what he had said in his speech about the economic crisis and the political  chaos gripping the country. This situation, বঙ্গবন্ধুর ভাষায়, required drastic solution. After very serious thoughts he (Bangabandhu) had decided that the proposed system (BAKSAL) was the only answer to the deep socio-political malaise facing the country…  Therefore, … policies that were beyond comprehension (of many) were the prerogative of the leader who had the ultimate responsibility to the people (Islam, 2005, p.158, Making of a Nation – Bangladesh: an Economist’s Tale, The University Press Limited)।

এখানে বলা প্রয়োজনে বাকশাল ছিল একটি সাময়িক ব্যবস্থা। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন: ‘এটা অস্থায়ী (ব্যবস্থা), সময় এলে এটা সরিয়ে নেওয়া হবে’ (প্রথম আলো, অগাস্ট ২০১৭, তোয়াব খান, Press Secretary to Bangabandhu)।

দুর্ভাগ্য সেদিনের সেই শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী সমাজ বিষয়টি সঠিকভাবে অনুধাবনে ব্যর্থ হয়। আজও তার প্রায়শ্চিত্ত করছি আমরা। জাতি আজ জাতীয় মূলধারার বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত। ব্যহত হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ, বিকৃত হয়েছে স্বাধীনতার ইতিহাস, সেই সাথে মানবতা ও স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির পুনর্গঠিত হবার রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্ট হয়েছে। বাকশাল পদ্ধতি বজায় থাকলে (স্বল্পকালীন সময়ের জন্য হলেও) স্বাধীনতার প্রতিবিপ্লবীদের প্রতিহত করে, জাতীয় মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করা সম্ভব হত।

শামস রহমানঅস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক

Responses -- “বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ”

  1. সেলিম

    বেশ সুন্দর একটি লেখা। লেখককে ধন্যবাদ।
    দেশকে এগিয়ে নিতে হলে বাকশালের বিকল্প নেই। বহুদলীয় গণতন্ত্র আর মত প্রকাশের স্বাধীনতা উন্নয়নকে বাধাগ্রস্থ করে। এ কারণেই বহুদলীয় গণতন্ত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করে বঙ্গবন্ধু একদলীয় বাকশাল ও সংবাদপত্র বন্ধ করে (চারটি বাদে) দিয়েছিলেন। এটা আজও প্রাসঙ্গিক।

    Reply
  2. Faruk Kader

    বঙ্গবন্ধূর বিশ্বাষ ছিল ঘূনে ধরা শাষন-ব্যবস্থা ভেঙ্গে স্বাধীন দেশের উপযুক্ত একটি শাষন-ব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে বাকশাল এক বিপ্লবী পদক্ষেপ (প্রথম আলো পত্রিকায় মহিউদ্দিন আহমদের উপসম্পাদকীয়, ১৫ই আগষ্ট, ২০১৭)। একেই তিনি দ্বীতিয় বিপ্লব বলেছিলেন। বঙ্গবন্ধূ বাকশাল বা তার দ্বীতিয় বিপ্লবের লক্ষ্য হিসেবে চারটি বিষয় নির্দিষ্ট করেন: জাতীয় ঐক্য, দুর্নীতি দমন, উৎপাদন বৃদ্ধি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধি প্রতিরোধ (‘শতাব্দী পেরিয়ে’, হায়দার আকবর রনোর আত্মজীবনি, ২০০৫)। তৎকালীন প্ল্যানিং কমিশনের উপ প্রধান অধ্যাপক নূরুল ইসলামের সাথে কথা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধূ বাকশালকে সে সময় বিরাজমান গভীর সামাজিক-রাজনীতির সমস্যার সমাধান হিসেবে উপস্থাপিত করেন (বঙ্গবন্ধূ:নেতা ও নেতৃত্ব, অধ্যাপক শামস রহমান)। বঙ্গবন্ধূর ঘোষিত দ্বীতিয় বিপ্লবের চার লক্ষ্যের মধ্যে সমাজতন্ত্র বা শোষিতের গনতন্ত্রের স্থান ছিলনা।

    স্বরণ করা যায় যে মাত্র ১৩ মিনিটের এক অধিবেশনে আলাপ আলোচনা ব্যাতিরেকেই বঙ্গবন্ধূ সংসদে বাকশাল বিষয়ক ৪র্থ সংশোধনী সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পাশ করিয়ে নেন। এ সংশোধনীতে বঙ্গবন্ধূকে আজীবন রাষ্ট্রপতি হিসাবে ঘোষনা করে তার হাতে শাষনতান্ত্রিক বিষয়ক সর্বময় ক্ষমতা (যেমন সংসদে গৃহীত বিলে ভেটো দেয়া, বিচারকদের চাকুরীচ্যূত করা ইত্যাদি) ন্যাস্ত ও এক দলীয় শাষনব্যাবস্থা কায়েম করা হয়। এ সংশোধনের মাধ্যমে নির্বাচিত সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী রাষ্ট্রপতিকে সাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতাচ্যূত্ বা Impeach করার সম্ভাবনাও তিরোহিত হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের প্র্রথম প্র্রধান মন্ত্রী প্রয়াত তাজুদ্দিন ৪র্থ সংশোধনীর বিরোধী ছিলেন। সংশোধনীর পাশের পর তাজুদ্দিন আক্ষেপ করে এরকম বলেছিলেন, “বঙ্গবন্ধূ নিজেও মারা যাবেন, আর আমাদেরকেও মারার ব্যাবস্থা করে যাচ্ছেন”। বাকশাল প্রবর্তনের সমর্থক মস্কোপন্থী বুদ্ধিজীবি সংবাদ সম্পাদক সন্তোষ গুপ্ত হায়দার আকবর রনোকে আক্ষেপ করে বলেন, “গনতন্ত্র তো শেষ হয়ে গেল”! যারা তার এই পদক্ষেপে হতাশ হয়েছিলেন, তাদেরকে আশ্বস্ত করে বঙ্গবন্ধূ বলেছিলেন, “এটা সাময়িক ব্যাবস্থা; সঠিক সময়ে আবার ফিরে যাব ওয়েষ্টমিন্সটার স্টাইলের গনতন্ত্রে”।
    দ্বীতিয় বিপ্লব ও হাতে ন্যাস্ত বিশাল ক্ষমতায় বঙ্গবন্ধূর অগাধ আস্থা ছিল। কিন্তু ইতিমধ্যে তাজুদ্দিনের মত দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সহকর্মীকে বঙ্গবন্ধূ হারিয়েছেন। বাকশাল কার্যকরী ও কেন্দ্রীয় কমিটির ৯৫% নেতা ই ছিল আওয়ামী লীগের: এর মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধে দূর্নীতির সংশ্লীষ্টতার অভিযোগ ছিল; একটি গ্রুপ মুশতাকের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধূর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। একদলীয় শাষনব্যাবস্থার সমর্থক মস্কো পন্থী নেতাদের মধ্যে ছিলেন মাত্র কয়েক জন: অধ্যাঃ মোজাফফর আহমদ, কমরেড ফরহাদ ও মতিয়া চৌধূরী। দ্বীতিয় বিপ্লব ঘোষনার পর বঙ্গবন্ধূ চীনপন্থী বাম ও কম্যূনিষ্ট নেতা ও কর্মীদের বাকশালে অন্তর্ভূক্ত করার উদ্যোগ নেন। এ ব্যাপারে ওয়ার্কাস পার্টির নেতা হায়দার আকবর রনোর সাথে তার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বঙ্গবন্ধূ রনোকে বলেন, “আমি ঠিক করেছি সমাজতন্ত্র করে ফেলব। বিয়ের প্রথম রাতে বিড়াল মারার গল্প জানিস। আমি অলরেডী লেট। আর দেরী নয়। তোরা চলে আয় আমার দলে”। মনে হতে পারে সমাজতন্ত্র, দূর্নীতি ও শোষন মুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় দলীয় নেতা কর্মীর চেয়ে ত্যাগী বাম নেতাদের উপর বঙ্গবন্ধূর আস্থা বেশী ছিল, যদিও চীন পন্থী বাম নেতারা আশ্বস্ত হয় নাই। তারা বাকশাল থেকে দুরেই ছিল। আগেই বলেছি, বঙ্গবন্ধূর দ্বীতিয় বিপ্লবের চার লক্ষ্যের মধ্যে সমাজতন্ত্র ছিলনা। সেদিনের শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবি সমাজ একদলীয় বাকশালকে সংশয়ের সাথেই দেখেছিলেন। তারপরও অনেক বুদ্ধিজীবি অনিচ্ছা সত্বেও বাকশালে যোগ দেন। কিছু বুদ্ধিজীবি যেমন কবি শামসুর রহমান ও সাংবাদিক নির্মল সেন বঙ্গবন্ধূর প্র্রতি অগাধ ভালবাসা সত্বেও এই গড্ডলিকা প্রবাহে শামিল হন নাই। এখন তাদের কথাই মানুষ বেশী স্বরণ করে।
    দ্বীতিয় বিপ্লবের মাধ্যমে দূর্নীতি ও শোষন মুক্ত বাংলাদেশ গড়ার ব্যাপারে বঙ্গবন্ধূর আবেগ ও দায়বদ্ধতা ছিল। কিন্তু প্রায়োগিক ধ্যান ধারনা ছিল সহজ সরল। হতে পারে তার দৃষ্টিভঙ্গী এ রকমই ছিল। বাকশাল বঙ্গবন্ধূকে আকাশচুম্বী ক্ষমতা দিয়েছিল, যা তাকে একজন নিঃসঙ্গ মানুষে পরিণত করে। তিনি একা কতটুকু করতে পারতেন! বাকশাল পদ্ধতি কায়েম থাকলে (অল্প কিছুদিনের জন্য হলেও), বর্তমান বাংলাদেশের অনেক সমস্যাই থাকতনা, এটা আমার মনে হয় অভিলাষী ভাবনা ছাড়া আর কিছু নয়।

    Reply
  3. Fazlul Haq

    There is a saying in Bangla that “If you want to understand a person of Sixteen Ana calibre; then you have to have at least a calibre of Eleven Ana.” So to understand the political and leadership quality of Bangobondhu we have to acquire some standard of political knowledge.

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—