তখন আমরা কেবল জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত করেছি। এটা জানার ইচ্ছা, সেটা করার ইচ্ছা, হরমোন সদা জাগ্রত। মহাজগতের রহস্য আমাদেরকে হাতছানি দিচ্ছে।

আমরা জেনেছি যে ‘আমরা এক পাগল-করা বিশ্ব পেয়েছি। আমরা চারদিকে যা দেখছি তার অর্থোদ্ধার করতে চাই এবং জানতে চাই, এই বিশ্বের প্রকৃতি ঠিক কী, এখানে আমাদের স্থান কোথায় এবং এই বিশ্ব আর এই আমরা কোথা থেকে এলাম। এই বিশ্ব আমরা ঠিক যেভাবে দেখছি সেটাই বা কেন।’ (-হকিং, ‘আ ব্রিফার হিস্ট্রি অব টাইম’, ২০০৫)

তখন ঢাকায় হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র বিজ্ঞান সংগঠন। শোনা গেল, রাতের আকাশে সেসব রহস্যের গিঁট ধরা আছে। আমরা দৌঁড়লাম রাতের আকাশ দেখে এমন বিজ্ঞান সংগঠনের খোঁজে। কে যেন বলল একটা অস্পষ্ট নাম, কোনো এক বিজ্ঞানীর বই পড়তে হবে। ওমর খৈয়ম তখন আমাদের করোটিতে “অস্তি নাস্তি শেষ করেছি দার্শনিকের গভীর জ্ঞান / বীজগণিতের তত্ত্বকথা যৌবনে মোর ছিলোই ধ্যান”। আমি তখন উচ্চমাধ্যমিকের কোঠায়। ১৯৯১’তে ন্যু-মার্কেটে হাঁটতে হাঁটতে জীনাত বুক সাপ্লাইতে পেলাম এক অত্যাশ্চর্য গ্রন্থ – এ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম, কী এক বিজ্ঞানীর লেখা বই। বইটি কিনে এনে পড়তে গিয়ে মনে পড়ল, এই তো সেই হকিং যাঁর অস্পষ্ট নাম শুনেছিলাম কোনো বয়স্যের কাছে। সেই থেকে স্টিফেন হকিং হয়ে গেলেন আমাদের সময়কার নায়ক। তাঁর সকল বক্তৃতা, গ্রন্থ গোগ্রাসে গেলা শুরু হল। ‘অ্যাস্ট্রফিজিক্স’ বা জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান শব্দটাই আমাদের প্রজন্ম শিখল হকিং এর হাত ধরে। আমরা তখন বুঝে গেছি, কসমোলজিই জ্ঞানের মূল চাবিকাঠি।

দর্শনের ব্যাপার স্যাপার আমরা তখন জানি বলেই মনে করছিলাম। সক্রাতেস-প্লেটো-অ্যারিস্টটল এসব নাম আমরা জানি তখন, গ্রিক দর্শনের আকর্ষণীয় বিষয়গুলো পড়েছি। গণিত সম্পর্কে ঔৎসুক্য আছে। কার্ল সেগানের নাম আগে থেকেই জানা, পড়া। তিনিই তো এই অত্যাশ্চর্য গ্রন্থের ভূমিকা লিখে দিয়েছেন। তখন আমরা রিলেটিভিটি শিখতে শুরু করেছি কেবল, মনে নানান প্রশ্ন, অনেক দ্বিধা। এমন দ্বিধা জরোজরো মুহূর্তে আমরা যখন ‘ব্রিফ হিস্ট্রি’ বইটা খুলে পড়া শুরু করি, শুরুতেই মিথের ধাক্কা – এক বৃদ্ধা কোনো এক বিজ্ঞানীর বক্তব্যে বলছেন, শোনো হে ছোকড়া, এর সবটাই কাছিম। আর সবচেয়ে ওপরের কাছিমের পিঠেই সমতল জগৎ, তুমি ছোকড়া কিছুই জান না! এই মিথের জগতের পর হকিং নিয়ে যাচ্ছেন গ্রিকদের জগতে, তারপর টলেমী-কেপলার-গ্যালিলিও-ন্যুটন হয়ে তিনি পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব কী। তিনি বলছেন, বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব হল একরকমের মডেল – “একটা থিওরি তখনই ভাল থিওরি যখন তার দুটো শর্ত পূরণ হয়। মাত্র গুটিকয়েক প্যারামিটার আছে এমন একটি মডেল যদি অনেকগুলো পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে পারে এবং ভবিষ্যতের কয়েকটি পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে তার সার্থক ভবিষ্যদ্বাণী থাকে।” আইনস্টাইন বলেছিলেন ‘বিশ্বকে যে কেন বোঝা যায় সেটাই বোধগম্য নয়।’ আর হকিং জবাবে বলেছেন, ‘বিশ্বকে বোঝা যায় তার কারণ বিশ্ব বৈজ্ঞানিক রীতিনীতি মেনে চলে, অর্থাৎ বিশ্বের আচরণকে মডেল করা সম্ভব।’ এইরকম মডেলগুচ্ছের প্রথমটি হলো ১৬৮৭ সালে প্রদত্ত নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্র। এই মহাকর্ষ শক্তির ফলে গাছের আম মাটিতে পড়ে এবং গ্রহ-নক্ষত্র যার যার নিজস্ব কক্ষপথে অধিষ্ঠিত থাকে। কাছে-দূরের ভর বিশিষ্ট সকল বস্তুই মাধ্যাকর্ষণের আওতায় পড়ে, তাই এই আইনের নাম বিশ্বজনীন মহাকর্ষ সূত্র। দ্বিতীয় যে মডেলটি আমরা পাই তা হলো বৈদ্যুতিক ও চুম্বকীয় ধর্মাবলি সম্পর্কে আমাদের মডেল।

এই মডেল একাধিক বিজ্ঞানীর হাতে পরিপক্কতা পেয়েছে। বিশেষ করে, মাইকেল ফ্যারাডে প্রচুর সংখ্যক পর্যবেক্ষণ করে পদার্থের বৈদ্যুতিক ধর্ম ও চুম্বকের মধ্যে একটা যোগসূত্র স্থাপন করেন। চৌম্বক বলরেখার আবিষ্কার ফ্যারাডের অমর কীর্তি। হালের আমলে কণাজগতের স্ট্যান্ডার্ড মডেল একটা দারুন সার্থক মডেল। এই মডেলগুলোর সীমাবদ্ধতা থাকলেও এরা জগৎ সম্পর্কে আমাদের ভৌত-বাস্তবতা নির্মাণ করে। বৈজ্ঞানিক তত্ত্বকে মডেল হিসেবে কল্পনা করবার মত ব্যাপার, যার অস্তিত্ব আমাদের মন ভিন্ন অন্য কোথাও নেই, আমাদের নবীন মননের কাছে নতুন ছিল। বলা যায়, এর পর থেকে হকিং থেকে আর চোখ ফেরানো যায়নি। বইটি পড়ার সময় উত্তেজনায় ঘুম হত না। ব্ল্যাক-হোল,  কসমোলজি, আনসার্টেন্টি প্রিন্সিপল, সিংগুলারিটি, নো-হেয়ার থিওরেম,ভার্চুয়াল কণা – কী সব উত্তেজনা আর বিচিত্র শব্দ আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভেতর খেলা করত।

হকিং এর ‘ব্রিফ হিস্ট্রি’ মহাজগতের অপার রহস্য বিষয়ে আমাদের চোখ খুলে দিয়েছিল। থার্ড মিলেনিয়ামের একদম গোড়ার দিকে এইরকম একটা জনবোধ্য গাইড আমাদের দরকার ছিল। কেন যে জনবোধ্য সেটাও পরিষ্কার নয়। যদিও বিজ্ঞানের বই হিসেবে এটি বিক্রয়ের প্রায় সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে -এক কোটির বেশি বিক্রি হয়েছে। হকিং নিজেই সংশয় প্রকাশ করেছিলেন যে পাঠক পড়ে  বুঝেছে কি? বোঝার কথা নয়, বইটা যথেষ্ট কঠিন। কসমোলজি এবং এর বিবিধ অনুষঙ্গ এবং প্রায়শই কনফারেন্স জাতীয় বিজ্ঞানীদের সম্মেলনে কী ধরনের আলোচনা হয়, কী কী চ্যালেঞ্জ তাঁরা সামনে আনেন, ইত্যাদি নিয়েও আলোচনা আছে। এই বইটিতে তাঁর ‘নো-বাউন্ডারি কন্ডিশন’ বা ‘সীমানাহীনতার শর্ত’ নিয়েও প্রথম জনবোধ্য আলোচনা হয়। এই তত্ত্বটি নিয়ে পরবর্তীতে বিজ্ঞানীদের খুব একটা শোরগোল করতে দেখা না গেলেও হকিং এর সবচেয়ে আলোচিত অবদান কৃষ্ণবিবর বিকিরণ নিয়ে দারুন আলোচনা আছে।

কৃষ্ণবিবর যেখানে আলোও শুষে নিচ্ছে সেখানে কোয়ান্টাম ক্রিয়া ব্যবহার করে কৃষ্ণবিবর থেকে কীভাবে বিকিরণ নির্গত হতে পারে সেটা একটা দারুন তাত্ত্বিক বিষয়। হকিঙের এই তত্ত্বকে পরে আরো অনেকে, যেমন বেকেনস্টাইন, সম্প্রসারণ করেন। এবং কৃষ্ণবিবর বিকিরণের ফর্মুলাটির নামই এখন ‘হকিং-বেকেনস্টাইন ফর্মুলা ফর ব্ল্যাকহোল রেডিয়েশন’। পরবর্তীতে ‘ব্রিফ হিস্ট্রি’র একাধিক ‘ভার্সন’ বেরিয়েছে – ইলাস্ট্রেটেড ব্রিফ হিস্ট্রি, ব্রিফার হিস্ট্রি ইত্যাদি। কিন্তু তবু ‘আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম’ সবকালের সেরা একটা বিজ্ঞান গ্রন্থ। এই গ্রন্থেই তো হকিং তাঁর সেই বিখ্যাত আকাঙ্ক্ষা জানিয়েছিলেন – “আমরা যদি একটা চূড়ান্ত তত্ত্ব কখনো আবিষ্কারও করি তাহলে সময়ের সাথে সেটা, শুধু কিছু বিজ্ঞানীদের জন্য নয়, সবার জন্যই মোটা দাগে বোধগম্য হয়ে উঠবে। তখন আমরা সকলেই – দার্শনিক, বিজ্ঞানী এবং আমজনতা নির্বিশেষে – সবাই এই মহাজগৎ এবং আমরা কেন অস্তিত্ববান সেই বিষয়ক আলোচনায় প্রবৃত্ত হতে পারব।  আমরা যদি এর উত্তর পেয়ে যাই তাহলে সেটাই হবে মানবপ্রজ্ঞার সর্বোত্তম বিজয় –  কারণ তাহলেই আমরা বুঝতে পারব ঈশ্বরের মন।” এ যেন এক বিপন্ন বিস্ময়! ঈশ্বরের মন! তাকেও বোঝা সম্ভব এই সব খানকয়েক মডেল দিয়ে? আইনস্টাইন বলেছিলেন, ঈশ্বর পাশা খেলেন না, অর্থাৎ ভৌতবাস্তবতার বিষয়ে সম্ভাবনার স্থান সীমিত। বিংশ শতাব্দীতে তাঁরই যোগ্য উত্তরসূরী হকিং একেবারে ঈশ্বরের মন বুঝতে চাইছেন। এটা কি জ্ঞান জগতে কোয়ান্টাম তত্ত্বের আধিপত্যের নির্ণায়ক?

হকিং প্রথম থেকেই চিরন্তন প্রশ্নগুলি দ্বারা তাড়িত হয়েছিলেন। ছাত্রাবস্থায়, আমরা জানি, তিনি তাঁর বান্ধবীকে বোঝাচ্ছেন তিনি সবকিছুর ব্যাখ্যাকারী এক তত্ত্বের সন্ধানে আছেন। থিওরি অফ এভ্রিথিং তাঁর পুরো জীবন জুড়ে এক বড় অধ্যায়।  অনেক পরে তাঁর শেষতম কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইনে’ (২০১০) [এই বইটি নিয়ে একটি ভাল আলোচনার জন্য দেখুন আমার প্রবন্ধ ‘ঈশ্বর-ভাবনা, গোল্ডফিশের বাস্তবতা ও হকিংয়ের ‘গ্র্যান্ড ডিজাইন’, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ৭ই নভেম্বর, ২০১০]

তিনি বইটি শুরুই করেছিলেন তিনটি প্রশ্ন দিয়ে: ১. মহাবিশ্ব শূন্য নয় কেন? ২. আমাদের সত্তার রহস্য কী? ৩. আমরা ঠিক এইরকম ভৌতবিধি দেখি কেন, কেন অন্যরকম নয়? তিনি বলেছেন ‘এটিই হলো জীবন, মহাবিশ্ব এবং সবকিছু সম্পর্কে চূড়ান্ত প্রশ্ন’ এবং এর উত্তর তিনি দেবার চেষ্টা করেছেন ঐ বইয়ে, এবং অন্যত্রও, তাঁর প্রায় সকল গ্রন্থ, ও বক্তৃতায়। তিনি আরো বলেছেন, ‘বিশ্বকে গভীরভাবে বুঝতে হলে শুধু কীভাবে এটি আচরণ করছে তা জানাই যথেষ্ট নয়, জানতে হবে কেন ঠিক ঐভাবেই বিশ্বের বিবর্তন হচ্ছে।’ আর এই বোধের একদম গোড়ায় রয়েছে থিওরি অফ এভ্রিথিং বা সবকিছুর তত্ত্ব। এটা এমন একটি বা একগুচ্ছ সমীকরণ বা মডেলের সমাহার যা দৃশ্যমান মহাবিশ্বের প্রায় সকল প্রপঞ্চকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হবে। সবকিছুর তত্ত্ব বিষয়ে তাঁর ফ্যাসিনেশন ছিল প্রবাদ-প্রতিম। ১৯৮০ সালের ২৯শে এপ্রিল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের লুকাসিয়ান প্রফেসরশিপ গ্রহণের প্রাক্বালে তিনি এক অনবদ্য বক্তৃতা প্রদান করেন। সেখানে তিনি বলেন,

“অদূর ভবিষ্যতে, বলা যায় [বিংশ] শতাব্দীর শেষ প্রান্তে, তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে আমি এখানে আলোচনা করতে চাই। এর মাধ্যমে আমি বোঝাতে চাচ্ছি যে আমরা সম্ভবত ভৌত মিথস্ক্রিয়াসমূহের একটি পূর্ণাঙ্গ, সংগতিপূর্ণ ও একীভূত তত্ত্ব পাব – যা সকল সম্ভাব্য পর্যবেক্ষণের সাথে সংগতিপূর্ণ হবে। …এর পূর্বে আমরা অন্তত দুবার ভেবেছিলাম যে আমরা সর্বশেষ সমন্বয় সাধনের একেবারে দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছি। [বিংশ] শতাব্দীর প্রথমে এটা ধারণা করা হয়েছিল যে, সবকিছুই কন্টিনুয়াম মেকানিক্সের বদৌলতে ব্যাখ্যা করা যাবে। এর জন্য যা দরকার তা হল স্থিতিস্থাপকতা, সান্দ্রতা, পরিবাহিতা প্রভৃতির মাত্র কিছু সংখ্যক গুণাংক পরিমাপ করা। এই ধারণা ধূলিস্যাৎ হয় পারমাণবিক গঠন ও কোয়ান্টাম বলবিদ্যার আবিষ্কারের ফলে। আবার ১৯২০’র শেষদিকে ম্যাক্স বর্ন গটিনগেনে সমাগত একদল বিজ্ঞানীর উদ্দেশ্যে বলেন, ‘পদার্থবিজ্ঞান বলতে আমরা যা বুঝি তা ছ’মাসেই পূর্ণ হবে’। সেটা হয়েছিল ইলেকট্রনের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণকারী পল ডিরাকের ‘ডিরাক সমীকরণ’ আবিষ্কারের কিছু পরে।  আশা করা হচ্ছিল, তখন পর্যন্ত জানা অপর একটিমাত্র মৌলিক কণা প্রোটনের গতিপ্রকৃতিও অনুরূপ আরেকটি সমীকরণ নিয়ন্ত্রণ করবে। কিন্তু নিউট্রন ও অন্যান্য নিউক্লিয় বলসমূহের আবিষ্কার একেও নিরাশ করে’ (-‘তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের পরিসমাপ্তি কি গোচরীভূত?’, স্টিফেন হকিং, অনুবাদ ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, বাংলা একাডেমি বিজ্ঞান পত্রিকা, ২০ বর্ষ ১ম সংখ্যা, অক্টোবর ১৯৯৩)।

প্রথম দিকে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার সাথে কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মেলবন্ধন ঘটিয়ে সবকিছুর তত্ত্বের সন্ধানে থাকলেও বিজ্ঞানীদের সে দৃষ্টিভঙ্গী বদলাতে থাকে বিশ শতকের শেষের দিকে এসে। ঐ বক্তৃতায়ও সেই বিষয়টি উঠে এসেছিল বক্তৃতাটির একদম শেষের দিকে যেখানে তিনি কণাজগতের পরম-প্রতিসম ধারণার প্রয়োগ ঘটিয়ে একটি তত্ত্বের কথা বলেছিলেন। ২০১০ সালে হকিং তাঁর সহ-লিখিত ‘গ্র্যান্ড ডিজাইন’ গ্রন্থে লিখেছেন,

“সবকিছুর তত্ত্বকে অবশ্যই সুসংহত হতে হবে এবং আমরা যেসব রাশির মান পর্যবেক্ষণ করতে পারি তাঁদের সম্পর্কে অবশ্যই সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা রাখতে হবে। আমরা দেখেছি যে, (নাস্তি থেকে মহাবিশ্ব সৃষ্টির জন্য) মহাকর্ষ-জাতীয় বলের অবশ্য-প্রয়োজন। এবং মহাকর্ষকে ব্যাখ্যাকারী তত্ত্বকে (পর্যবেক্ষণমূলক রাশির) সসীম মান ভবিষ্যদ্বাণী করতে হলে তাকে অবশ্যই প্রকৃতির বলসমূহ এবং বস্তুকণার মাঝে পরম-প্রতিসম হতে হবে। এম-থিওরি মহাকর্ষের (এখন পর্যন্ত জানা) সবচেয়ে সার্থক তত্ত্ব যা একইসাথে পরম-প্রতিসম। এই তত্ত্ব যদি সসীম হয় – যা এখনো প্রমাণিত হয়নি – তাহলে এই তত্ত্ব এমন এক বিশ্বের নকশা দেবে যে বিশ্ব নিজেই নিজেকে তৈরি করতে সক্ষম। আমরা অবশ্যই সেই বিশ্বের বাসিন্দা, কারণ এ ছাড়া আর কোনো সুসংহত নকশা নেই। এই এম-থিওরিই সেই একীভূত তত্ত্ব যা আইনস্টাইন খুঁজছিলেন। আমরা যারা প্রকৃতির কিছু মৌলকণার এক (আশ্চর্য) সমাহার, সেই আমরা, যে আমাদের এবং এই মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রণকারী আইনকানুনকে বোঝার ব্যাপারে এতদূর অগ্রসর হয়েছি, সেটা আমাদের জন্য এক বিরাট বিজয়। কিন্তু সবচেয়ে আলৌকিক ব্যাপার বোধহয় এই যে, কেবল বিমূর্ত যুক্তির প্রয়োগে আমরা এমন এক অসাধারণ তত্ত্ব পেয়েছি যা এই অপূর্ব বৈচিত্র্যময় বিপুলা বিশ্বের সার্থক ব্যাখ্যা দান করে। পর্যবেক্ষণের সাহায্যে যদি এই তত্ত্বের সত্যিই প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সেটা হবে গত তিন হাজার বছরের পুরনো এক মহাজিজ্ঞাসার সার্থক সমাপ্তি। আর তাহলেই বলা যাবে যে আমরা বিশ্বের মূল নকশাটি খুঁজে পেয়েছি।” (-উদ্ধৃত, ‘অপূর্ব এই মহাবিশ্ব’, এ এম হারুন-অর-রশীদ ও ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী, প্রথমা প্রকাশন, ২য় সং, পৃষ্ঠা ১১৩, ২০১২)

আলোচনা করছেন হকিং

চিরন্তন এসব প্রশ্নের সুরাহা করতে গিয়ে তিনি মহাবিশ্বের কার্যপ্রণালিতে নকশা খুঁজে পেয়েছেন। এবং সেই সুবাদে বিজ্ঞানীরা মাল্টিভার্সের বহুবর্ণিল তত্ত্ব-তালাশে ব্যস্ত আছেন। হকিং মহাবিশ্বের জন্মমূহুর্তের মাহেন্দ্র ক্ষণ নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। ‘বিগ ব্যাং’ ক্ষণটির বর্ণনায় তাঁর আগ্রহ ছিল। স্ফীতির দৃশ্যপটের প্রয়োগের মাধ্যমে বিগ ব্যাং আদি ‘সিঙ্গুলারিটি’ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যায় কিনা সেটা নিয়ে তিনি ‘ব্রিফ হিস্ট্রি’ পর্যায়ে আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু তাঁর অপর মূল্যবান গ্রন্থ ‘নাটশেল’ (দ্য ইউনিভার্স ইন আ নাটশেল, ২০০১) এ তিনি স্ট্রিং থিওরি এবং/অথবা হলোগ্রাফিক ইউনিভার্স সংক্রান্ত আলোচনায় ব্যাপৃত হয়েছেন।  বিন্দুবৎ মৌলিক কণা যখন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কম্পমান সূত্র হয়ে যায় তখন বাস্তবতার নানান পরতা খুলে যায় –একটা জিনিসকে যদি আমরা চারদিক (তিনটি স্থান, একটি সময়) থেকে দেখি তখনকার বর্ণনার তুলনায় যদি আমরা ১০-কিংবা-১১ দিক দিয়ে দেখি স্বভাবতই বর্ণনার খুঁটিনাটি বাড়বে। যত বেশি প্যারামিটার দিয়ে একটা জিনিস দেখা যায় তত তার খুঁটিনাটি বোঝা যায়। এই বহুমাত্রিকতা বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্বে অনাবিল সৃজনশীলতা আমদানি করেছে। সেদিক থেকে দেখলে পুরনো কসমোলজি ছিল অনেকটাই একবগ্‌গা, হকিং কিন্তু নিজে ঐ প্রজন্মেরই মানুষ যাঁরা জেনারেল রিলেটিভিটি শাসিত অ্যাকাডেমিক সময়কালের মানুষ। তিনি শিক্ষা নিয়েছেন রজার পেনরোজ, ডেনিস সিয়ামা, ফ্রেড হয়েলদের হাতে। কিন্তু আধুনিককাল স্ট্রিং থিওরির কাল। ঐ কালের সাক্ষী হিসেবে হকিং দুটো অসাধারণ বই তৈরি করেছেন – একটি জর্জ এলিসের সাথে ‘লার্জ স্কেল স্ট্রাকচার অব দ্য ইউনিভার্স’ (১৯৭৩) এবং অন্যটি ওয়ের্নার ইজরেলের সাথে যুগ্ম সম্পাদনায় ‘থ্রি হান্ড্রেড ইয়ার্স অব গ্রাভিটেশন’ (১৯৮৭)।  প্রথমোক্ত বইটি হকিং এর প্রথম রচনা, দ্বিতীয়োক্ত বইটি আইজাক ন্যুটনের ‘প্রিনসিপিয়া ম্যাথমেটিকা’ গ্রন্থের ত্রিশততম বছর উদ্‌যাপন উপলক্ষে সঙ্কলিত। গ্রাভিটেশন বিষয়ে উল্লেখযোগ্য প্রায় সকল বিশ্বনন্দিত বিশেষজ্ঞ এই বইতে প্রবন্ধ লিখেছেন। গ্রাভিটেশন বিষয়ক বিশ্ব বিজ্ঞান সাহিত্যের এক উল্লেখযোগ্য সংকলন এটি।

হকিং এর সবচেয়ে বড় অবদান কৃষ্ণবিবর সংক্রান্ত তাঁর গবেষণায়। কৃষ্ণবিবর তৈরি হতে পারে অতিভারী নক্ষত্রের (সূর্যের তুলনায় ২০-৩০ গুণ বা তারও বেশি ভারী) অন্তিম সময়ে সংঘটিত মহাকর্ষীয় পতনের মাধ্যমে। প্রতিটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় অঞ্চলে গ্যাসীয় বস্তুর এবং অন্যান্য নক্ষত্রের মহাকর্ষীয় পতনের ফলেও দানবীয় কৃষ্ণবিবরের অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা এখন সম্যক অবহিত। কিন্তু কৃষ্ণবিবর বস্তুটি বড় বিচিত্র। তাকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যায় না, কেননা তার আকর্ষণ ভেদ করে আলোকরশ্মিও বেরুতে পারেনা। তার অস্তিত্ব জানা যায় কেবল পরোক্ষ পর্যবেক্ষণ থেকে। কিন্তু মজার বিষয়, হকিং দেখালেন, কোয়ান্টাম ক্রিয়া ব্যবহার করে এহেন কৃষ্ণবিবরের ঘটনা দিগন্তের ঠিক বাইরে থেকে একরকম বিকিরণ নির্গত হতে পারে। এর নাম হকিং বিকিরণ। এদিকে আরো এক মজার ব্যাপার আছে। কৃষ্ণবিবর থেকে কিছু বেরুতে পারেনা সে বোঝা গেল, কিন্তু ওর মধ্যে যেসব তথ্য গিয়ে পড়ছে তার কী হবে? সে তথ্য কি এই মহাবিশ্ব থেকে পুরোপুরি উধাও হয়ে যাবে? হকিং এ প্রশ্নের উত্তরে কিছুটা কৌতুক করেই বলেছেন, ‘এখানে আমার কথা হল কৃষ্ণবিবর যতখানি বলা হয় অতো কাল নয়। এটা এমন কোনো অনন্ত কারাগারও নয়, আগে যেমন মনে করা হত। ব্ল্যাক হোল থেকে জিনিস বেরিয়ে আসতে পারে – এই বিশ্বেই এবং সম্ভবত অন্য বিশ্বেও। কাজেই আপনার যদি মনে হয় আপনি ব্ল্যাক হোলে আছেন, আশা হারাবেন না, বেরুনোর পথ আছে’ (- স্টিফেন হকিং, ‘ব্ল্যাক হোলস্‌: দ্য বিবিসি রীথ লেকচার্স্‌, ২০১৬)।

এছাড়া আরও প্রশ্ন আছে – কৃষ্ণবিবরের কেন্দ্রে যে ‘সিঙ্গুলারিটি’ থাকে তার চরিত্রই বা কী? সেখান দিয়ে কি সুড়ঙ্গ কেটে (ওয়র্মহোল) অন্য কোনো মহাবিশ্বে বা এই মহাবিশ্বেরই অন্য কোনো অংশে চলে যাওয়া সম্ভব? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন হকিং এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীরাও [ভাল সাধারণ আলোচনার জন্য দেখুন – ‘কৃষ্ণবিবর’, অভীক রায়, প্রকৃতি-পরিচয়, ২০১৮]। এই সংক্রান্ত হকিং এর গবেষণাকে আরো সম্প্রসারিত করেন জ্যাকব বেকেনস্টাইন (১৯৪৫-২০১৫) এবং ব্ল্যাক-হোল এনট্রপির যে ফর্মুলাটি বহুল প্রচলিত সেটার নামও হকিং-বেকেনস্টাইন ফর্মুলা। শুনেছি, হকিং এর একান্ত ইচ্ছা এই সমীকরণটি তাঁর এপিটাফে লেখা থাকবে।

শোনা যায়, হকিং এর একান্ত ইচ্ছা ছিল ব্ল্যাক-হোল এনট্রপির এ সমীকরণটি তাঁর এপিটাফে লেখা থাকবে

হকিং বলেছেন (দ্য গ্র্যান্ড ডিজাইন), ‘প্রকৃতির ভৌত বিধিসমূহ এমন এক সিস্টেম উপহার দিয়েছে যা অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে সমন্বিত বা ফাইন- টিউন্ড্। এই ভৌত বিধিগুলির সামান্য পরিবর্তন ঘটালেই আমাদের  অতি পরিচিত এই জীবনের অস্তিত্বই নস্যাৎ হয়ে যায়। কাজেই ভৌতবিধিসমূহে একাদিক্রমে যদি এইসব কাকতালীয় সমাপতন না থাকত, তবে মানুষ এবং এইরকম অন্যান্য প্রাণীর অস্তিত্ব কোনোদিনই সম্ভব হতো না। এই ধরনের বিশ্বকে তাই বলে ‘গোল্ডিলক্সের বিশ্ব’।’ এর ব্যাখ্যায় তিনি ‘মাল্টিভার্স তত্ত্ব’ বা বহুবিশ্বের তত্ত্বকেই সামনে এনেছেন। এই তত্ত্ব, যা আসলে অ্যালান গুথের ‘ইনফ্লেশনারি থিওরি’ বা স্ফীতির তত্ত্বের সম্প্রসারিত রূপ, অনুযায়ী আমাদের দৃশ্যমান বিশ্ব একমাত্র বিশ্ব নয়। এটা ছাড়াও আছে আরো বহু বিশ্বে যেখানে ভৌতবিধিগুলি এবং/অথবা ভৌত প্যারামিটারগুলির (যেমন আলোর দ্রুতি বা ইলেকট্রনের চার্জ) মান অন্যরকম। ফলে সেই বিশ্বগুলিতে বুদ্ধিমান সত্তার আবির্ভাব নাও হতে পারে, কিংবা অন্যরকম হতে পারে। এই বহুবিশ্বের মাঝে আমাদের মহাবিশ্বটিতে ভৌত প্যারামিটারগুলির মান এমন যে তারা চিন্তাশীল সত্তার অস্তিত্বের জন্য উপযোগী। বহুবিশ্বের তত্ত্ব এখন অন্যান্য বিজ্ঞানীদের কাছেও এক দারুন আকর্ষণের ব্যাপার।  এই শতাব্দীতে আমরা এই বিষয়ে আরো অগ্রগতি দেখতে পাব।

হকিং তাঁর নিয়মিত গবেষণা-বিষয় – কোয়ান্টাম গ্রাভিটি এবং তজ্জনিত মহাবিশ্বের আদি দশার নানাবিধ সিনারিও – নিয়ে কাজ করলেও তাঁর একটা বড় সুবিধা ছিল অন্য বিজ্ঞান-গবেষকদের মত তাঁর প্রচলিত টিচিং-লোড ছিল না। বিগত দশকে তিনি বিজ্ঞানের জনবোধ্যতা বিষয়ে ব্যাপক কার্যক্রমে নিবেদিত ছিলেন। বিশেষ করে, পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হবার সুবাদে তাঁর যেন এক দূরাগত দৃষ্টি আয়ত্বে এসেছিল। একটা মানসিক এবং ধী-গত উচ্চতা থেকে তিনি মানব প্রজাতিকে দেখবার প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন। পৃথিবী নামক গ্রহের বাসযোগ্যতা, সুস্বাস্থ্য, পারিবেশিক বিপর্যয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বহির্বিশ্বের ধীমান জীব সম্পর্কে আমাদের নানাভাবে সাবধান করে বক্তব্য দিয়েছেন। এই বিষয়ে আমার প্রিয় উক্তি যেটা দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকার সাক্ষাৎকারে তিনি ২০১১ সালে বলেছিলেন,  ‘আমার মনে হয় না আগামী এক হাজার বছরের বেশী মনুষ্যপ্রজাতি টিকে থাকতে পারবে, যদি না আমরা মহাকাশে উড়ে যাই। একটি গ্রহে ঘটার মতো অনেক দুর্ঘটনাই আছে। তবে আমি আশাবাদী। আমরা নক্ষত্রজগতের দিকে উড়ে যাব। উই উইল রিচ আউট টু দ্য স্টারস্‌।’

‘মাই ব্রিফ হিস্ট্রি’ (২০১৩) নামের একটি অতিক্ষুদ্র আত্মজীবনীতে হকিং তাঁর জীবনের একটা সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত এঁকেছেন। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন বর্গাদার কৃষক পরিবার। তাঁর বাবা ছিলেন ক্রান্তীয় ওষুধ বিষয়ক গবেষক। সাধারণ কিন্তু ভালমানের স্কুল জীবন পার করে ১৯৬২ সালে তিনি কেমব্রিজে স্নাতকোত্তর ছাত্র হিসেবে যোগদান করেন। আমরা কল্পনা করতে পারি যে এক একুশ বছরের যুবক যখন তাঁর ডাক্তারের কাছে জানতে পারে যে তাঁর আয়ু আছে মাত্র বছর দুয়েক, তাঁর মনে তখন কী রকম বেদনা খেলা করে! একজনের মোটর নিউরন অসুখ করেছে, কিংবা একজন পুরো জীবনটাই হুইলচেয়ারে কাটিয়েছেন – এই কথাটি বললেই সেই জীবনের দৈনন্দিন কষ্টগুলো বোঝা যায় না। হকিং এর জীবন নিয়ে ‘দ্য থিওরি অব এভ্রিথিং’ বলে যে অসাধারণ মানবিক গুণসম্পন্ন চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়েছে সেখানে দেখা যায় অসুস্থ অবস্থায় হকিং স্বাভাবিক খাবার খেতে গিয়ে গলায় খাবার আটকে চোক্‌ করছেন, সেই কষ্ট ঐ মুভিটি না দেখলে বোধ করি কখনোই বোঝা যেত না।  তারপর যখন সেই যুবক চলৎশক্তিহীনভাবে জীবনের বাকি পঞ্চান্ন বছর কাটালেন তার কী বক্তব্য থাকতে পারে জীবন সম্পর্কে? হকিং লিখেছেন, ‘সময়টা দারুন ছিল – বেঁচে থেকে তত্ত্বীয় পদার্থবিদ্যায় গবেষণা করবার জন্য। আমি খুশী হব যদি  মহাবিশ্ব সম্পর্কে জানার চেষ্টায় আমার কিছুমাত্র অবদান থাকে’।  জীবনে তিনি যা চেয়েছেন তাই করেছেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা কোনো বাধা হতে দেননি। তিনি বলেছেন, তিনি এক পূর্ণ এবং পরিতৃপ্ত জীবন পেয়েছেন।

রজার পেনরোজ তাঁর এই অতি বিখ্যাত ছাত্রটি সম্পর্কে লিখেছেন (‘মাইন্ড ওভার ম্যাটার’, দ্য গার্ডিয়ান ১৪ মার্চ ২০১৮), ‘শারীরিক অক্ষমতা সত্বেও [হকিং] প্রায় সর্বক্ষণই জীবন সম্পর্কে ইতিবাচক ছিলেন। তিনি ভালবাসতেন কাজ করতে, অন্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গ, সৃজনকলা, এবং বিখ্যাত হবার ফলে প্রচুর ভ্রমণ। … তিনি বৈজ্ঞানিক বোধ বাড়ানোর কাজে নিয়োজিত ছিলেন।’ জনবোধ্য বিজ্ঞান বিষয়ক গ্রন্থ রচনায়ও তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য, এবং ব্যবসা-সফল, যার বড় একটা কারণ তাঁর হুইলচেয়ার বন্দি জীবন। একজন হুইলচেয়ারে বন্দি হয়ে আছে, শুধু কয়েকটি প্রত্যঙ্গ চালাতে পারছেন অথচ চিন্তাভাবনা প্রবল প্রতিভাধরের, সেটা আমজনতার নজর কাড়ে বইকি। অত্যন্ত উঁচুদরের পদার্থবিদ হওয়া সত্ত্বেও তিনি সকলের বোধগম্যতার সীমায় এসে সহজ করে বই লিখছেন এটা এক অসাধারণ গুণ। সহজ কথা যায় না বলা সহজে, অথচ হকিং ঠিক সেই কাজটাই করে গেছেন।  ধান গবেষককে হঠাৎ যদি জিজ্ঞেস করা হয় ভাই ভাত কী এটা একজন কৃষককে বা শ্রমিককে বোঝান, তবে সেটা খুব কঠিন হয়ে যায়। কেননা তিনি হয়ত ভাতের রাসায়নিক, কৃষিজ কিংবা পুষ্টিগুণ সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল। কিন্তু সাধারণ কথায় এসব গুণাগুণ সংক্ষেপে বোধগম্য ভাষায় তুলে ধরতে পৃথক দক্ষতার প্রয়োজন হয়। হকিং তাঁর ব্যক্তিগত উচ্চতা থেকে নেমে এসে সাধারণ মনের জন্য ভেবেছেন, লিখেছেন। তাঁর লক্ষ্যই ছিল বিজ্ঞানের বিষয়গুলি নিয়ে যেন সাধারণ মানুষ আলোচনা করতে পারে।

আমরা যারা তাঁর বই পড়ে জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনায় আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম, সেই আমাদের প্রজন্মের জন্য এবং আমাদের আগুপিছু অন্য প্রজন্মের জন্যও তিনি ছিলেন এক নায়ক। স্টিফেন হকিঙের হাত ধরেই আমরা এবং অন্যেরা বিশ্বজগতের বিবিধ রহস্যে প্রবেশ করেছি। হূমায়ুন আহমেদের ‘মহাবিজ্ঞানী ফিহা’ বলতে যে ফিগার চোখে ভেসে ওঠে, আমাদের জন্য তিনি ছিলেন স্টিফেন হকিং। মহাবিশ্ব সংক্রান্ত চিন্তাভাবনা ছিল এই মানুষটির মজ্জাগত। ইউনিভার্স সংক্রান্ত বিষয়াদি ভাবতে ভাবতেই তিনি বিশ্বান্তরিত হয়ে গেলেন। পুরো মানবজাতির জন্য তাঁর অঙ্কের সমীকরণগুলি তিনি রেখে গেছেন আর দিয়ে গেছেন অনবদ্য গ্রন্থসমূহ। ওমর খৈয়ামের মত অজ্ঞেয় সুরে বলতে হয়: পৃথিবীর থেকে সাত আকাশের বিস্তৃতি বহুদূর/ শনিগ্রহের দুয়ার পেরিয়ে পথরেখা বন্ধুর/ সবই তো বন্দি আমার জ্ঞানের সীমানার বন্ধনে/ তবু অজ্ঞাত মৃত্যু এবং ভাগ্যলিপির সুর।

এখন দেখা যাক, ঈশ্বরের মনের দেখা তিনি পান কিনা।

Responses -- “হকিং এর হাত ধরে ব্রহ্মাণ্ডের পাঠ”

  1. লতিফ

    পদার্থবিজ্ঞানের পটভূমিতে দাঁড়িয়ে তিনি দর্শনকে যেখানে নিতে পেরেছেন, দার্শনিকরা সেখানে পৌঁছাতে পারলে বিশ্বে বড় ধরনের চাঞ্চল্য আসতো।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—