নারী দিবস, এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সময় এখন নারীর : উন্নয়নে তারা, বদলে যাচ্ছে গ্রাম-শহরের কর্ম-জীবনধারা’। জেনে নেই নারীর অবস্থান কেমন বিশ্বজুড়ে-

• প্রাইমারী স্কুলে ছেলে শিশুর চেয়ে মেয়ে শিশুর জায়গা করে নেবার সম্ভাবনা কম সারা বিশ্বজুড়ে ।

• পৃথিবীর ৪০ ভাগের চেয়ে কম দেশ তার ছেলে ও মেয়ে শিশুকে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সমান অধিকার দেয়। মাত্র ৩৯ ভাগ দেশে মেয়ে ও ছেলে শিশুরা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সমান অনুপাতে প্রবেশ করতে পারে।

• ৭৬ মিলিয়ন শিক্ষিত নারীর মধ্যে ৫৪ মিলিয়ন-ই বসবাস করে মাত্র নয়টি দেশে

• পৃথিবীব্যাপি সকল কর্মযজ্ঞের পরও ৩১ মিলিয়ন মেয়ে শিশু এখনো স্কুলের সীমানার বাইরে।
• সমগ্র পৃথিবীজুড়ে ৭৭৪ মিলিয়ন নিরক্ষর মানুষের তিন ভাগের দুই ভাগ হচ্ছে নারী

• পৃথিবীর সকল গবেষকের মাত্র ২৯ শতাংশ নারী ।

• গবেষণা বলে, মায়েদের প্রতি এক বছর বেশী বিদ্যালয়ে কাটানো সময় ৫-১০ শতাংশ শিশুমৃত্যু কমিয়ে দিতে পারে।

গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে নারী দিবসের প্রতিপাদ্যকে যদি পর্যালোচনা করা হয়, দেখা যাবে নারী দিবস উদযাপনেও এসেছে অনিবার্য পরিবর্তন। গত শতাব্দী শেষ দিকে এমনকি এই শতাব্দীর শুরুতেও নারীর নিরাপত্তা, নারীর জন্য শান্তি ছিল আলোচনার টেবিলে । এই শতাব্দীর প্রথম দশক লিঙ্গ সমতা জোরালো জায়গা করে নিয়েছিল, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, নারীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে আলোচিত হয়েছে । চলতি দশক নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর জন্য বিনিয়োগ, নারীর কর্মযজ্ঞ, অর্থনীতিতে নারীর অবদান নিয়ে সোচ্চার ।

এই দিবসটি উদযাপনের পেছনে নারীর জন্য মজুরি বৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিপাদ্য । নারীর জন্য শিক্ষার যে সঙ্কুচিত পরিসংখ্যান পৃথিবীর বহু দেশে আজও বিদ্যমান। ১৯০৮ সালে প্রথম জার্মানিতে ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে আয়োজিত হয় নারী সমাবেশ। সে সময়ের থেকে এখনকান নারী শিক্ষার অবস্থা খুব বেশি এগোয়নি। পৃথিবীর নিরক্ষর মানুষদের তিন ভাগের দুই ভাগই নারী ।

গণপরিবহনের বিভীষিকা সামলে নারী যখন অফিসে আদালতে কর্মযজ্ঞে উপস্থিত তখন সে কেমন থাকে? বিনয়ের সাথে আমার পুরুষ সহকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলতে চাই, নারীকে কর্মী হিসেবে দেখতে হবে । কিন্তু লিঙ্গীয় অবস্থানের কারণে নারীর প্রাত্যহিক প্রয়োজনকে কর্ম পরিকল্পনায় মেইনস্ট্রিম করতে না পারলে নারীর জন্য কোন কর্মস্থলই সংবেদনশীল হবে না ।

যেমন, নারী তার মিন্সস্ট্রেশন এর সময়কালের মধ্য দিয়ে যাবে, এটা ন্যাচারাল, প্রতিটি কর্মস্থলেই এই সংক্রান্ত প্রয়োজনকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই অ্যাড্রেস করতে হবে । গর্ভবতী নারী বা স্তন্যদায়ী মা কর্মক্ষেত্রে অলস- সেটা না ভেবে, ভাবতে হবে সে তার কাজের সাথে সাথে আরেক অতীব গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে সংশ্লিষ্ট ।

বাংলাদেশ যখন মধ্য আয়ের দেশে আগুয়ান তখন সরকারকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নির্দেশ দিতে হবে যেন প্রত্যেক কর্মস্থলে একটা নির্দিষ্ট সংখক নারী শ্রমিক বা কর্মচারী থাকে এবং এ সংক্রান্ত মনিটরিং জোরদার করতে হবে । আমি অনেক কর্মস্থলের মালিক এবং উঁচুপদের লোকজনকে বলতে শুনেছি, আমরা কোন নারী রিক্রুট করি না । গর্ভবতী নারী/স্তন্যদায়ী/শিশু সন্তানের মায়েদের জন্য ডে-কেয়ার সেন্টারের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

যদি কোনও কর্মস্থল আকারে ছোট হয় তবে পার্শ্ববর্তী কর্মস্থলের সাথে তাদের একযোগে কাজ  করতে হবে যাতে তারা ডে-কেয়ার সেন্টার শেয়ার করতে পারে । আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, এতে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন, কিন্তু মনে রাখতে হবে মধ্য আয়ের পরিপ্রেক্ষিতে সর্বোপরি যে বিনিয়োগ তার তুলনায় এই বিনিয়োগ নগণ্য । আর সরকারকে বলছি, সরকারের এই নির্দেশনা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিবে অনেক দূর । শিক্ষায় বিনিয়োগ যেমন ফল দেয় অনেক সময় পরে কিন্তু জোরালো ভাবে, তেমনি সকল কর্মস্থলে ডে-কেয়ারের বিনিয়োগও ফল দিবে একটু সময় নিয়ে কিন্তু জ্যামিতিক হারে ।

আমি বলবো বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে তাদের সিএসআর নিয়ে এগিয়ে আসতে এই উদ্যোগে । নারীর জন্য একটা সংবেদনশীল, নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য কর্মস্থল তাকে কেবল ভালো কর্মীই বানায় না, তাকে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করে যা তার কর্মস্পৃহাকে বাড়িয়ে দেয় অনেকগুণ ।

নারী দিবসে নারীকে নিয়ে কথা বলতে গেলে, কলম ধরলে একটা পর্যায়ে বিষণ্ণতা ছেঁকে ধরে। সবমেহেরের বোন আমরা … নারী কবে নিরাপদ শহর পাবে, গ্রাম পাবে, গঞ্জ পাবে, রেল স্টেশন পাবে …জানিনা । সরকার কত কি করছে, মেয়েদের স্কুলে নিয়ে যাবে বলে, তারপরও বাল্যবিবাহ বন্ধ হচ্ছে … আমরা পারছিনা । আমরা নিদারুণভাবে ব্যর্থ । সমাজ যদি না চায় তবে আইন বলেন, অনুশাসন বলেন, বৃত্তি বলেন কোন পন্থায়ই কাজ হবে না । সমাজ চায় না কেন? কারণ সমাজ নিরাপত্তা দিতে পারছে না … সমাজের কাছে সহজ সমাধান ‘বিয়ে দিয়ে দাও’ । সমাজকেই ঘুরে দাড়াতে হবে, রুখে দাড়াতে হবে … সবাই মিলে ভাবুন , এগিয়ে আসুন। অন্যথায় ভয়াবহ বিপদ সমাসন্ন । সময় এখন নারীর : উন্নয়নে তারা … নারীকে বাধা দিলে উন্নয়ন বাধা পাবে, হারিয়ে যাবে সম্ভাবনা ।

মাসুমা বিল্লাহজনসংখ্যাবিদ।

One Response -- “সময় এখন নারীর: নারীকে বাধা মানে উন্নয়নকে বাঁধা, সম্ভাবনাকে হারিয়ে ফেলা”

  1. সরকার জাবেদ ইকবাল

    সহমত পোষণ করছি। প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। নারী সুবিধা প্রত্যাশী (অনুগ্রহ প্রার্থী?), আর, পুরুষ সুবিধায় ছাড় দিতে নারাজ। এই দু’টি অবস্থানই আপত্তিকর। নারীকে তার অধিকারের দাবীতে আরও বেশি সোচ্চার হতে হবে এবং পুরুষকে নারীর অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। তাহলেই শুধু ন্যায্যতাভিত্তিক একটি জেণ্ডার-সংবেদনশীল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—