নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা ও প্রসারের দাবি নিয়ে প্রতিবছর পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। পর্যালোচিত হয় নারীর অবস্থা ও অবস্থানের বিভিন্ন দিক।  আজকের বাংলাদেশে নারীর অবস্থানে একটি গুণগত পরিবর্তন লক্ষণীয়।

আর্থিকভাবে অগ্রসরমান বাংলাদেশে বিভিন্ন পেশায় নারীর অংশগ্রহণ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী দক্ষতার সাথে অংশ নিচ্ছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান ভূমিকা বাংলাদেশের উন্নয়নের বাস্তব ভিত্তি তৈরি করছে।

তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর বর্ধিত অংশগ্রহণ সমাজ রাষ্ট্র ও পরিবারের ক্ষমতা কাঠামোয় তেমন পরিবর্তন আনছে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর অবস্থানে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া গতানুগতিক অধঃস্তন ধারা বিরাজ করছে। সমাজের আন্তঃসম্পর্ক প্রক্রিয়ায় কোনও পরিবর্তন আনছে না। অংশগ্রহণের সাথে অংশীদারিত্বের ব্যাপক ব্যবধান রয়ে যাচ্ছে।

অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা প্রকৃত অর্থে নারীর ক্ষমতায়নের বাস্তব প্রয়োগ ঘটাচ্ছে না। স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন তথা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকল ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর সমঅংশগ্রহণ। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের স্লোগান নির্ধারণ করেছে- ‘রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন: জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা, আসন সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি এবং নির্বাচনী এলাকা পুনর্নির্ধারণ’।

বাংলাদেশের নারী সমাজের সুদীর্ঘ চার দশকের অধিক সময় ধরে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করে যাচ্ছে। আরো পেছনের দিকে তাকালে আমরা দেখি বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের বীর কন্যা প্রীতিলতার রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বিষয়ে ঐতিহাসিক উক্তি।

তিনি বলেন, ‘আমারও অধিকার আছে দেশের জন্য বলিদানের’। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের ইতিহাসও আমাদের আছে। মুক্তিযুদ্ধসহ সকল রাজনৈতিক-গণতান্ত্রিক সংগ্রামে নারীর অংশগ্রহণ ছিল, কিন্তু ক্ষমতার কাঠামোতে নারী সমাজের অংশীদারিত্ব নেই।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সর্বপ্রথম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর কাছে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি দেয়। রাজনীতিতে নারী পুরুষের অসম অবস্থানের বাস্তবতায় প্রয়োজন ছিল ইতিবাচক পদক্ষেপ, নারীর জন্য সংরক্ষিত আসন।

যা সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে এবং এটি একটি সাময়িক ব্যবস্থা। এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নারী সমাজ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেবেন, নিজস্ব নির্বাচনী এলাকা গড়ে তুলবেন। রাজনীতির মূলধারায় যুক্ত হবেন।

আমরা জানি যে বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে উল্লেখ রয়েছে, ‘জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করিবার ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হবে’ (অনুচ্ছেদ ১০)। আরো নির্দেশ করা হয়েছে, ‘প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে’ (অনুচ্ছেদ ১১)। সংবিধানের এই ধারার নির্দেশে জনগণের অর্ধেক অংশ নারীর সংসদে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নারীর সংরক্ষিত আসন বিষয়ক বিশেষ বিধান রাখা হয় এবং বলা হয় এটি একটি সাময়িক ব্যবস্থা। এই সংরক্ষিত আসনে নারী পরোক্ষভাবে সাধারণ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দ্বারা মনোনীত হবেন।

এক্ষেত্রে ১৯৭৩ সাল থেকে নারী আন্দোলনের সুস্পষ্ট দাবি ছিল সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন পরোক্ষ নয় সরাসরি নির্বাচন হতে হবে। সরকার ও সকল রাজনৈতিক দল এই বিষয়ে নারী আন্দোলনের দাবীর সাথে ঐক্যমত পোষণ করে, যার প্রতিফলন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইস্তিহারে লক্ষ্য করা যায়। একইভাবে ১৯৯৭ ও ২০১১ এর নারী উন্নয়ন নীতিতে উল্লেখ করা হয়, সংরক্ষিত নারী আসনে প্রত্যক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা ও সংরক্ষিত আসন বৃদ্ধির মাধ্যমে জাতীয় সংসদে ও রাজনীতিতে মহিলাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।

এই নীতির প্রেক্ষিতে ২০০০ সালে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসন সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি, সরাসরি নির্বাচন বিষয়ে একটি খসড়া বিল পেশ করে। পরে সেই আলোকে ২০১৭ সালে সংবিধান সংশোধন (সপ্তদশ) খসড়া বিল মহিলা পরিষদ পেশ করেছে। এই নীতির বাস্তবায়ন, আমরা দেখি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায়।

কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে একই ব্যবস্থা বিদ্যমান। সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যরা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত না হয়ে সংসদ সদস্যের দ্বারা মনোনীত হচ্ছেন। ফলে তাদের জনগণের কাছে জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা প্রদর্শন করতে হচ্ছে না। স্ব স্ব রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাছে তাঁরা দায়বদ্ধ থাকছেন। মনোনীত নারী সদস্যদের একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকা না থাকায় তাঁরা সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনে জটিল বাস্তবতার সম্মুখীন হচ্ছেন। তাদের কোন নির্বাচনী এলাকা গড়ে ওঠছে না। সংরক্ষিত আসনের সাময়িক ব্যবস্থা নারীর মূলধারার রাজনীতিতে অংশগ্রহণের প্রক্রিয়া হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারছে না।

২৯ জানুয়ারি ২০১৮ অনুষ্ঠিত মন্ত্রীপরিষদের সভায় নারী আন্দোলনের দাবির বিপরীতে সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন ব্যবস্থা আরো ২৫ বছর থাকবে এই মর্মে সংবিধান (সপ্তদশ সংশোধন) আইন ২০১৮ এর খসড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে ৭০ বছর ধরে বাংলাদেশে নারী জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনীত হয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে, যা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ।

নারী পুরুষের সমতা ও ক্ষমতায়ন বিষয়ে সরকারের এতো দিনের গৃহীত সকল নীতি, পরিকল্পনা এর সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে এটি সিডও সনদ এর সম-অধিকার, সম সুযোগ, সম ফলাফল অর্থাৎ সমতার নীতির বিপরীতমুখী সিদ্ধান্ত। আমরা জানি জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজি বাস্তবায়নে সরকারের রয়েছে বিশেষ উদ্যোগ।

সপ্তম পঞ্চমবার্ষিকী পরিকল্পনায় এসডিজি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কর্মসূচি গৃহীত হচ্ছে। এসডিজি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন লক্ষ্য। যেখানে বলা হয়েছে কেউ পেছনে থাকবে না। সরকার যখন এই এসডিজি বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে, তখন নারীর সংরক্ষিত আসনের এই ঘোষণা অযৌক্তিক ও নারী-পুরুয়ের সমতার চেতনার পরিপন্থি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালের ৮ মার্চ ঘোষণা করেন,  ‘নারীর সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার অবদান নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন।  সংসদে সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ৪৫ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করা হবে। তারা সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন।’

এবারের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই উক্তির আইনগত ভিত্তি রচিত হোক এই দাবী নারী আন্দোলনের।

Responses -- “৮ মার্চের দাবি : নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন”

  1. সরকার জাবেদ ইকবাল

    “এই সিদ্ধান্তের ফলে ৭০ বছর ধরে বাংলাদেশে নারী জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনীত হয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে, যা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে একটি পশ্চাৎমুখী পদক্ষেপ।” আমি আপনার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। এটি পুরুষ-শাসিত সমাজে নারীকে অবদমিত রাখার আরও একটি সুগভীর চক্রান্ত।

    তাছাড়া, নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি এখনও অনেকটাই পুরুষের অনুগ্রহ-নির্ভর রয়ে গেছে। যেমন, এনজিওগুলো কর্মীবাহিনীর ৪০% ভাগ নারীর মাধ্যমে পূরণের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু, অনেক ক্ষেত্রেই ৩০%-৩৫% ভাগের উপরে উঠতে পারছে না। ফলে, যোগ্য নারীকর্মী না পাওয়ার কারণে অপেক্ষাকৃত অযোগ্য নারীকর্মী দিয়ে পদগুলো পূরণ করতে হচ্ছে যা অনুগ্রহেরই নামান্তর মাত্র। তাই, প্রকৃত অর্থে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য নারীকে আরও বেশি উদ্যোগী, উদ্যমী, পরিশ্রমী এবং আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে হবে যাতে তারা পুরুষের মুখাপেক্ষী না থেকে স্বীয় যোগ্যতায় নিজের জায়গা করে নিতে পারে।

    Reply
  2. hafij

    নারীর ক্ষমতায়ন তো অনেক এগিয়েছে, কিন্তু নারী মলেস্ট,নারী নির্যাতন কমছে না কেন?

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—