বাঙালির বারো মাসে চোদ্দ পার্বণ বইমেলা নিয়ে এখন বাঙালিরই মুখ ভার। ঠাঁই নাড়া হওয়ার ভাগ্য বুঝি এই অভাগা বই মেলার এখনো ঘুচলো না। সেই কবে থেকে হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোনোখানে ঘুরে মরছে আমাদের সাধের বইমেলা। কথায় বলে, মা বেড়াল বাচ্চার জন্ম দেওয়ার পর সন্তানকে সাত বার নাকি ঠাঁই নাড়া করে। আমাদের বড়ো সাধের এই বইমেলাটির দশা ও কি সেই বেড়াল ছানারই মতো?

পরিবেশের দোহাই দিয়ে বইমেলাকে ময়দানের ঠাঁই হারাতে হয়েছে। আজ ময়দানে বইমেলা বন্ধ হয়ে যাওয়ার এতো বছর পর একবারও কী আমাদের ভেতরে এই ভাবনা মাথা চাড়া দেয়, বইমেলা ময়দানে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পরিবেশ জগতে কতোখানি ইতি উতি ঘটলো?

বইমেলা ওই কটা দিনের মেয়াদে যদি ময়দানেই হতো, মেট্রো রেলের দৌলতে যে জায়গাটির সঙ্গে আমাদের গোটা রাজ্যের যোগাযোগ ব্যবস্থার একটা সুন্দর সংযোগ রয়েছে, তাহলে কী পরিবেশের একটা বিরাট ক্ষতি হয়ে যেতো? যে ক্ষতিটার হাত থেকে এখন ময়দান থেকে বইমেলা সরে যাওয়ার পর আমরা নিস্তার পেয়ে গেছি?

গত দশকে যখন বইমেলাকে কেন্দ্র করে কল্লোলিনী তিলোত্তমার ফুসফুস , আমাদের সাধের ময়দানে পরিবেশ দূষণ নিয়ে গেলো গেলো রব উঠেছিল, সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত গোটা শহরের পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে এই ময়দানে বইমেলা বন্ধ করা ছাড়া আমরা আর কি এতোটুকু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে পেরেছি?

ফ্রাঙ্কফুট বা দিল্লির প্রগতি ময়দানের বইমেলার থেকে আমাদের কলকাতা বইমেলার ফারাকটা সবদিক থেকে রয়েছে। ঢাকার একুশে বইমেলার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে বরংচ কলকাতা বইমেলার আদলের বেশ কিছু মিল আছে। ময়দানের বইমেলাতে যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধার পাশাপাশি মেলা প্রাঙ্গনের বিরাট চৌহদ্দির একটা বড় রকমের সুবিধা আমরা ভোগ করেছি।

তাই সেখানে সত্যিকারের বই পড়ুয়া মানুষ যেমন এসে ঘোরাফেরা করে, কেনাকাটি করে আনন্দ পেয়েছেন, লিটল ম্যাগাজিনের মানুষজন যেমন উপভোগ করেছেন, তেমনই হুজুগে মানুষজনও আনন্দ পেয়েছিলেন।

মেলা, তা বইয়ের ই হোক বা অন্য কোনো কিছুর, তাতে কেবল অনুরাগীরাই আসবেন, অন্যেরা আসবেন না— এমন একপেশে ভাবনা তো ভাবা যায় না। তাই যেকোনো মেলার সার্বজনীনতার মতোই আমাদের বইমেলা ও তার সার্বিক চরিত্রটা খুব ভালো ভাবেই মেলে ধরতে পেরেছিল।

যাঁরা ময়দানের বইমেলা বন্ধে পরিবেশের দোহাই দিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন, পরবর্তী সময়ে আমরা দেখতে পেলাম , তাঁদের ভিতরে একটা বিরাট অংশের মানুষের সঙ্গেই একটা সুনির্দিষ্ট দলীয় রাজনীতির ঘনিষ্ঠ সংশ্রব রয়েছে। তাই ময়দান থেকে সল্ট লেক স্টেডিয়াম, সেখান থেকে মিলনমেলা প্রাঙ্গন, আবার এই বছর নতুন করে সল্ট লেক করুণাময়ী, যেখানে যোগাযোগ ব্যবস্থার একটা চরম সমস্যা— এসবে মেলার সেই আগের দিনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য কতোখানি বজায় রইলো?

বিকিকিনির কি আদৌ উন্নতি ঘটলো? রাজ্যের সব প্রান্তের, সব অংশের মানুষ যদি সহজে সেখানে যেতেই না পারেন, তাহলে কি উপযোগিতা রইলো বইমেলার? বই পাগল মানুষেরা যদি যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যার কারণে দাপিয়ে বেড়াতেই না পারলেন মেলাতে, তাহলে কিসের মেলা? কাদের মেলা?

বইমেলা এলেই এই প্রশ্নটা বার বার জাগে। কিসের মেলা? কাদের মেলা? এই মেলায় যতোজন আসেন তাঁদের প্রত্যেকের জীবনের সঙ্গে বইয়ের সম্পর্ক ঠিক কতোটুকু? যাঁরা বইমেলাকে বার বার ঠাঁই নাড়া করেন, তাঁদের জীবনের সঙ্গেই বা ‘বই’ বিষয়টির সম্পর্ক কতোটুকু? বইমেলা করলেই পরিবেশ দূষণ, আর হাজারো রকমের রাজনৈতিক সমাবেশ কলকাতা শহরের প্রাণকেন্দ্রের আনাচে কানাচে করলে কোনো রকম পরিবেশ দূষণের অভিযোগ ওঠে না। তাহলে কি সেদিন যাঁরা ময়দানে বইমেলাকে ঘিরে আপত্তি জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন, তাঁরা কেবল সেই সময়ের রাজ্য সরকারের প্রতি তাঁদের রাজনৈতিক অসূয়ার কারণেই অমনটা করেছিলেন? রাজনৈতিক বিদ্বেষের ছোঁয়াচ এসে পড়েছিল বইমেলার উপরে? কে দেবে এই প্রশ্নের উত্তর? কিন্তু পরিস্থিতির নিরিখে মানুষের মনে তো আজ এসব কথা জমছে।মানুষ তো উত্তর খুঁজছে।

কলকাতা বইমেলা জন্মলগ্ন থেকে যৌবন প্রাপ্তির কাল পর্যন্ত দলীয় রাজনীতির নিগড়ে তেমন একটা বাঁধা পড়েনি কোনোদিন। কলকাতা বইমেলার বিকাশপর্বে রাজ্যে ক্ষমতায় ছিলেন বামপন্থীরা। মেলার চেহারা চরিত্রে একটা প্রগতিশীল ছাপ থাকলেও সেখানে দলীয় রাজনীতির দাপট প্রায় ছিল নাই বলা যেতে পারে। ১৯৯৭ সালে বিধ্বংসী আগুনে বইমেলা পুড়ে গিয়েছিল। সেই দগ্ধ বই মেলাকে দু একদিনের ভিতরেই পুনর্গঠিত করতে যে ভূমিকা সেই সময়ে নিয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন উপমুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তা কল্পনাতীত।

সেই কাজ করে কিন্তু বুদ্ধদেববাবু বিন্দুমাত্র রাজনৈতিক মাইলেজ নেন নি। পোড়া বইমেলাকে আবার তার আগের জায়গাতে ফিরিয়ে দেওয়াটা যেন তিনি একান্ত ভাবেই তাঁর নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেছিলেন।কেবল মনে করাই না। সেই নৈতিক দায়িত্বটা নীরবে অথচ দীপ্ত ভঙ্গিমাতে পালন ও করেছিলেন তিনি।

বাংলার সংস্কৃতি জগতে বুদ্ধদেববাবুর একটা নিজস্ব পরিচয় আছে।ব্যক্তি জীবনে তিনি কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যর ভাইপো। গ্রন্থকীট হিসেবে তাঁকে চিহ্নিত করা হলে কিছু ভুল বলা হবে না।একাধিক মৌলিক গ্রন্থের রচয়িতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কিন্তু পরবর্তীকালে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করেও কলকাতা বইমেলাকে তাঁর দল সিপিআই ( এম) এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দেননি, যেমনটা আজকে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূল কংগ্রেসের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করছেন। এখন প্রতি বছরই বই মেলাতে মুখ্যমন্ত্রী মমতার একাধিক ভাষাতে গড়ে দশ থেকে পনেরটা বই প্রকাশিত হয়। মমতা আদৌ উর্দু ভাষা জানেন, তেমন কোনো প্রমাণ এ রাজ্যের মানুষ পায়নি। তবুও প্রতিবছরই বই মেলাতে প্রকাশিত একাধিক উর্দু বইয়ের ভেতরেও তার লিখিত মৌলিক বই বলে দাবি করা থাকে।

প্রশ্ন হলো, এইসব বইগুলোকে তাঁর মৌলিক বই বলে দাবি করা হলেও মমতা কি আদৌ উর্দু জানেন? কলকাতা বইমেলা তার বইকেন্দ্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেলে এখন সম্পূর্ণ কর্ত্রীভজা মেলাতে রূপান্তরিত হয়েছে। এমনটা কিন্তু আমাদের মেলা আগে ছিল না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—