মাস কয়েক আগে কৌতুহল জন্মালো একুশ পদক কীভাবে কোন পদ্ধতিতে কোন যোগ্যতায় দেওয়া হয়।

বিষয়টি তার আগে আমার বিন্দুমাত্র জানা ছিল না। অত:পর মনে হলো বিষয়টা তো সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট। কিন্তু পাবনাতে তাদের তো কোন অফিস নেই। জেলা প্রশাসক অবশ্য সব মন্ত্রণালয়ের সাথেই যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্ব প্রাপ্ত। কিন্তু তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম না কারণ ইতিমধ্যে মনে পড়ে গেলো শিল্পকলা একাডেমী তো ঐ মন্ত্রণালয়েরই। সুতরাং শিল্পকলা কার্যালয়ে ফোন করলাম।
ফোন ধরলেন সেখানকার কর্মকর্তা কন্যা প্রতিম সৌমী মুঞ্জুরী খান, ভাল সঙ্গীত শিল্পীও বটে। ফোন ধরেই সৌমী বলল, কাকা, কী ব্যাপার?

বললাম, একুশ পদক সংক্রান্ত কোন সার্কুলার বা কোন তথ্য তোমার জানা আছে
কী?

সৌমী জানালো, ওয়েব সাইটে একটি ফর্ম পাওয়া যাবে-ডাউনলোড করে দেখে প্রিন্ট করে নিন। বললাম আমার প্রিন্টার নেই কাজটি তোমার অফিস থেকেই করো এবং কয়েক কপি সম্ভব হলে সন্ধ্যায় প্রেস ক্লাবে পৌঁছে দিও।

সৌমী নিজেই এসে প্রেসক্লাবে ঐ দিনই সন্ধ্যায় ৩/৪ কপি ফরম দিয়ে গেল। বাসায় প্যাকেটটি এনে খুলে পড়লাম। বহু রকমের তথ্য তাঁরা চান। পূরণ করা বেশ ঝক্কির ব্যাপার।
সুপরিচিত এবং মঙ্গলাকাংখী পাবনা বিজ্ঞান ও পযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্জ অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলামকে ফোন করে অনুরোধ জানালাম বাসায় একটু সময় করে আসতে। তিনি জানতে চাইলেন কী ব্যাপারে তাঁকে ডাকছি! তা না বলে বললাম আসুন তো। তিনি ঐ দিনই বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাসায় ফেরার পথে পাবনা বেলতলা রোডে  আমাদের বাসায় এলেন।

সহধর্মিনী পূরবীর সাথে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিলাম। কুশল বিনিময়ের পর পূরবী চলে গেলেন চা-জল খাবার আনতে। আমি ফরমটির একটি কপি ওনার হাতে দিয়ে ভাল করে দেখতে বললাম। উনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে বললেন,“দাদা, এটা তো কোন দরখাস্ত নয়। কেউ আপনার নাম প্রস্তাব করবে-তার ঘর আছে। ফর্মে উল্লেখিত তথ্যগুলি নিখুঁতভাবে দিতে হবে। সুতরা আমি আগামীকাল এই ফরমের ফটো কপি করে এনে রেখে দেব আপনি তা পূরণ করে দেবেন। বাদ থাকবে টাইপ করা, সে দায়িত্ব আমার।

বললাম, আর ফর্ম প্রিন্ট করা? তার দরকার নেই কারণ আমার কাছে ৩/৪ কপি আছে।

আনোয়ার সাহেব বললেন, সাংবাদিকতায় যদি সুপারিশ করা যায় তবে আপনার প্রাপ্তি নির্ঘাত। কারণ এ ব্যাপারে আপনার দীর্ঘকাল যাবত দেশজোড়া খ্যাতি।

যাহোক, নানা সংশয় নিয়ে ওনার প্রস্তাবে সম্মত হয়ে বললাম, পূরণ করে আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ে আগামী কাল গিয়ে দিয়ে আসব এই তো?

আপত্তি জানিয়ে আনোয়ার সাহেব বললেন, আপনি পূরণ করে রাখবেন। আমি কাল সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে নিয়ে যাব।

পরদিন তিনি সকালে যথারীতি এসে পূরণ করা ফর্মটি নিয়ে গিয়ে টাইপ করিয়ে সন্ধ্যায় এলেন বাসায়।

বললেন, যা যা সংশোধন করতে হয় করে দিন। কাল ফাইন্যাল টাইপ করিয়ে আমি না হয়
প্রস্তাবক হিসেবে সই করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেব।

এই বলে ফর্ম নিয়ে চলে গেলেন। সন্ধ্যার আগেই তিনি আবার ফর্মটি নিয়ে চলে এসে জানালেন, মন্ত্রণালয় মনে করে জেলা প্রশাসক সুপারিশ করলে ভাল হবে। কারণ সাংবাদিক সংক্রান্ত বিষয় তারাই ভাল জানেন। শিক্ষকেরা তো সাংবাদিকদের নয় শিক্ষা, সংস্কৃতি প্রভৃতি
বিষয়ে ভাল জানেন। সুতরাং আপনি আগামীকাল সকালে জেলা প্রশাসককে পৌঁছে দিলেই উনি নিশ্চয়ই প্রস্তাবক হিসেব সই স্বাক্ষর করে পাঠাবেন। পরদিন তাই করলাম সম্ভবত: অক্টোবর ১৭ এর ২৭ কিংবা ২৮ তারিখে।

প্রস্তাব পৌঁছানোর শেষ তারিখ সম্ভবত: ছিল ৩০ বা ৩১ অক্টোবর। অর্থাৎ শেষ মুহূর্তে এই প্রস্তাবটি পাঠানো হয়।

পরে, একদিন আনোয়ার সাহেবকে বললাম, ইতিমধ্যে অষ্ট্রোলিয়াতে আমার নাতনির বিয়ের দিন তারিখ স্থির হয়েছে। বড় ছেলে প্রবীর ও পুত্রবধূ অপর্ণার মেয়ে ঈহিতার (ডাক নাম বাঁধন) বিয়ে ২০১৮ সালের ২১ জানুয়ারি। ভিসাও করে পাঠিয়েছে প্রবীর যার মেয়াদ এক বছর। সুতরাং ফেব্রুয়ারিতে হয়তো আসতে দেবে না আমাদের। মেডিকেল চেক আপ ও চিকিৎসাদির জন্য হেলথ ইন্সিওরেন্সও করে রেখেছেন।

শুনে আনোয়ার সাহেব বললেন, আপনি এসে নিজ হাতে নিলেই সবচাইতে ভাল হবে তবে নেহায়েত যদি না আসতে পারেন তবে আপনার প্রতিনিধি হিসেবে পদকটি কে গ্রহণ করবেন তাঁর নাম ও বিবরণ ফর্মে উল্লেখ করে দিলে ভালো হতো।

বললাম, হ্যাঁ, ছোট ছেলে ঢাকায় থাকে- প্রলয় কুমার মৈত্র-তাঁর নাম-ফোন নম্বর প্রভৃতি
দিয়েছি।

মিটে গেল। এ ব্যাপারে আর কোন খোঁজ খবর নেইনি বা নেওয়ার অবকাশও পাইনি। মেজ মেয়ে কুমকুম গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে ধানমণ্ডির পপুলার জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হলো আইসিইউতে। অত:পর দেড় মাস সেখানে থাকার পর বঙ্গবন্ধু
শেখ মুজিব হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। মৃত্যুর সাথে কঠিন লড়াই করে প্রায় তিন মাস পরে সে একটু সুস্থ হয়ে উঠতেই চলে এলাম অস্ট্রেলিয়া। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে পদকের বিষয়ে কোন কিছু জানানো হয়নি বা জানতে চাওয়ার অবকাশও পাইনি।

এদিকে গত ২৬ জানুয়ারী সন্ধ্যায় পূরবী, প্রলয় ও আমি রওনা হলাম সিডনির উদ্দেশ্যে। ঢাকা বিমানবন্দর যাবার পথে জানলাম প্রলয়কে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ২৫ জানুয়ারি দুপুরে ফোন করে আমার জন্ম তারিখ জানতে চেয়েছিল।

প্রলয়ও জানতো না বা তাকে বলার কথা খেয়ালও ছিল না তাকে জানাতে যে আমার অনুপস্থিতিতে পদকটি (যদি মনোনীত হই) গ্রহণ কে করবে সেক্ষেত্রে তার নাম দেওয়া হয়েছে বা এ ব্যাপারে আদৌ কোন প্রস্তাব কেউ সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছেন। গোটা বিষয়টিই তার অজানা ছিল। ফলে প্রলয়ও আর কিছু বুঝে উঠতে না পেরে শুধু জিজ্ঞেস করেছিল-কেন?

উত্তরে তাঁরা বলেন, এমনিতেই।

যা হোক ঐ খবর তৎক্ষণাৎ অধ্যাপক আনোয়ার সাহেবকে ফোন করে জানিয়ে তাঁকে বললাম, মাঝে মাঝে খোঁজখবর নিয়ে যেন আমাকে ই-মেইলে জানান।

ঐক্য ন্যাপের সভাপতি জননেতা পংকজ ভট্টাচার্য্যকেও খবর দিয়ে অনুরূপ অনুরোধ জানিয়ে চলে এলাম বিমানবন্দরে। পরদিন (১৭ জানুয়ারি) গভীর রাতে সিডনী পৌঁছালাম।
এ পর্যন্ত কারও কাছ থেকেই আর কোন খবর নেই। ফলে বিষয়টি সবাই ভুলেই গিয়েছিলাম। আশাবাদী কখনো খুব একটা ছিলাম না। যেটুকুও বা ছিলাম- কোন মহল থেকেই কোন খবর না পাওয়াতে ধরে নিয়েছিলাম যে মনোনীত হওয়া যায় নি। তা নিয়ে কোন ক্ষোভও ছিল না।
ফেব্রুয়ারি মাস এসে গেল। লেখালেখি শুরু করলাম। আবার এরই মধ্যে এসে গেল বাংলাদেশ-শ্রীলংকার বহু-আকাঙ্খিত টেস্ট ম্যাচ। ৮ ফেব্রুয়ারি এখানকার দুপুর থেকে টেস্ট ম্যাচ দেখে শুরু করলাম। বিকেল থেকে বইমেলায় লাইভ আগ্রহ সহকারে দেখছিলাম।

টিভিতে বই মেলার দৃশ্যগুলি দেখতে দেখতে হঠাৎ টিভি স্ক্রলে এবারের একুশে পদক প্রাপ্তদের নামের তালিকা দেখতে পেলাম। দেখা গেল ঐ তালিকায় সাংবাদিকতায় আমার নাম। ইতিমধ্যে দেখতে দেখতে পূরবী, প্রবীর, অপর্না-সবাই এসে দেখে নানা জনকে ফোনে জানাতে শুরু করে। যা হোক এবাবেই অস্ট্রেলিয়ায় বসে তাৎক্ষণিকভাবেই খবরটি জানা গেল।

কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই, সহকর্মী লাইলা খালেদা, তারপর ঐক্য ন্যাপের সভাপতি জননেতা পংকজ ভট্টাচার্য্য এবং পাবনা প্রেস ক্লাবের সভাপতি অধ্যাপক শিবজিত নাগের অভিনন্দন বার্তাও পেয়ে গেলাম ইমেইলে।

মুহূর্তেই ফেসবুক পেইজে বহু পোস্ট আর অসংখ্য কমেন্ট আসতে শুরু করলো বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য থেকে । পরিবারের সবাই এমন সর্বজনীন প্রতিক্রিয়ায় অভিভূত।
ব্যক্তিগতভাবে আমি যা ভাবছি-তা যথেষ্ট এলোমেলো। সাংবাদিকতায় একুশে পদক সম্ভবত: এই প্রথম ঢাকার বাইরে এলো। আমার সাংবাদিকতা শুরু ১৯৪১ সাল থেকে জেলা প্রতিনিধি/সংবাদদাতা হিসেবে। কাজ করেছি মেলেটের, কলকাতার সত্যযুগ, ঢাকার সংবাদ, অবজার্ভার, নিউ নেশান ও ডেইলি স্টারে। রিপোর্টিং বাদ দেই ২০০০ সাল থেকে। অত:পর কলাম লেখার জীবন শুরু এবং আজও তা চলমান। আমার সাংবাদিকতা দেশের রাজনীতি-বিছিন্ন নয়। বরং স্বচ্ছ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গী ও আদর্শ-ভিত্তিক।

অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষতা গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী, সমাজতান্ত্রিক ও বিশ্বজনীন। এগুলির ক্ষেত্রে সর্বদা আপোষহীন থাকতে সচেষ্ট থেকেছি। একুশে পদক প্রাপ্তি আমার যেন দায়িত্ব বাড়িয়ে দিলো অনেক বেশি। দেশের কাছ থেকে সারাজীবন অনেক কিছু পেয়েছি- এবার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও পেলাম। পদকটি বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার ফল- তাদের
আমার প্রতি অসীম ভালবাসার ও শ্রদ্ধাবোধের ফল-যা এতদিন এমন করে বুঝি নি।
এখন স্পষ্টভাষায় বলি এই ঘটনা আমাকে নতুন করে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করলো নীতি ও আদর্শের প্রতি অবিচল থেকে যেন সাংবাদিকতা বাকী জীবনটুকু চালাতে পারি- সক্রিয় রাজনীতিতেও যেন অংশ নিয়ে দেশকে ভাল রাখার দায়িত্ব অধিকতর পালন করতে পারি।

এই প্রাপ্তি ও অনুভূতি আমাকে দেশবাসীর প্রতি নতুন করে দায়বদ্ধ করলো- দায়বদ্ধ দেশের দেশপ্রেমিক মিডিয়াগুলির প্রতিও। বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষকে সশ্রদ্ধ অভিনন্দন।

(সিডনী থেকে)

রণেশ মৈত্রলেখক, রাজনীতিবিদ।

One Response -- “একুশে পদক প্রাপ্তির ইতিকথা ও প্রতিক্রিয়া”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—