আমাদের রাষ্ট্রে যে শিক্ষা ব্যবস্থাটি চালু আছে তার কাঠামোটি তৈরি করেছে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কর্তৃক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চার্টার নবায়নে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য স্যার চার্লস উডের নেতৃত্বে একটি কমিটিকে দায়িত্ব প্রদান করা হয়। ১৮৫৪ সালে চার্লস উডের কমিটি তার রিপোর্ট দেয়, যেটাকে আমরা উড’স ডেসপ্যাচ (টীকা-১) নামে চিনি।

কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে কোম্পানি গণশিক্ষাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে এবং সেই অনুযায়ী তার সাংগঠনিক কাঠামোকে বিন্যস্ত করে। Department of Public Instruction নামে একটি বিভাগকে রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার সার্বিক দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়। একই সাথে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্তও উডের কমিটির মাধ্যমেই আসে। শিক্ষাকে সার্বজনীন অধিকার হিসেবে স্বীকৃতির বিষয়টি একটি ধারাবাহিক বিবর্তন হিসেবে বর্তমান পর্যায়ে এসেছে।

তবে এর সাংগঠনিক কাঠামোটি মোটামুটি অভিন্নই থেকেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যবস্থাপনা সরাসরি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে ছিল। আর উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থাপনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট গঠনে রাষ্ট্রের ভূমিকা মুখ্য হলেও সেগুলি স্বাধীনভাবেই বিকশিত হতে থাকে। অপরপক্ষে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার অর্থায়নে বেসরকারি অংশীদারিত্বকে উৎসাহিত করা হয়। তবে সেগুলির সার্বিক নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে থাকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও তার উত্তরসূরি ব্রিটিশরাজকে গণশিক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উপর দাঁড় করানোর কৃতিত্ব দিতে হবে।

তবে এটা সত্য যে, ঔপনিবেশিক সরকার শিক্ষার মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত সীমিত একটি লক্ষ্য অর্জন করতে চেয়েছে যেন সে’টি সাম্রাজ্যের কর্তৃত্বের জন্য হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়।
ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর এই কাঠামোটিকে স্বাধীন রাষ্ট্রের উপযোগী করে বিন্যস্ত করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। পাকিস্তান পর্যায়ে জাতীয় শিক্ষার নীতি, কাঠামো ও ব্যবস্থাপনা নির্ধারণের জন্য মোট পাঁচটি কমিশন গঠিত হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রটির রাজনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণে যে অনিশ্চয়তা ছিল তারই প্রতিফলন ঘটে শিক্ষা সংক্রান্ত কমিশনগুলির রিপোর্টে। অধিকাংশ রিপোর্ট অর্থবহ আলোচনায় আসার আগেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। সর্বাধিক আলোড়ন সৃষ্টি করে সেনাশাসক জেনারেল আইয়ুব খানের শাসনামলে শিক্ষা সচিব এস এম শরীফের নেতৃত্বে গঠিত শরীফ কমিশনের রিপোর্ট।

পূর্ব বাংলার গণমানুষের আকাঙক্ষার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ না হওয়ায় সেই রিপোর্টের সুপারিশসমূহ পরিত্যক্ত হয়। তবে ১৯৫২’র রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এবং ১৯৬২’র শিক্ষানীতি বিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ব বাংলার জনসাধারণ শিক্ষা বিষয়ে তাদের আকাঙ্ক্ষাকে মূর্ত করে তোলে। তাই মুক্তিযুদ্ধের পর আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার রূপ কী হবে সে সম্পর্কে রাষ্ট্রের নির্মাতাদের কাছে সুস্পষ্ট বার্তা ছিল। বিভিন্ন সময়ে গঠিত জাতীয় শিক্ষানীতির সুপারিশে এবং শিক্ষা সংক্রান্ত মৌলিক সিদ্ধান্তসমূহে রাষ্ট্রের শিক্ষা বিভাগের কাঠামোতে অনেক পরিবর্তন এসেছে।  বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার সৃষ্টি তেমনই মৌলিক একটি সিদ্ধান্ত।

১৯৮০ সালে যখন সিভিল সার্ভিসের ক্যাডারগুলি পুনর্বিন্যাস হয় তখন শিক্ষাকে ক্যাডার সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। রাষ্ট্রের একটি একক শক্তিশালী সেবাদানকারী বাহিনী সৃষ্টিই ছিল এই সার্ভিস গঠনের উদ্দেশ্য। জনশিক্ষা দপ্তরের মহাপরিচালকের অধীন পরিচালিত রাষ্ট্রের প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা এবং উচ্চ শিক্ষার সাথে যুক্ত সকল প্রথম শ্রেণির পদকে এই সার্ভিসের অধীনে নিয়ে এসে একটি বিশেষায়িত সার্ভিস গঠনের প্রচেষ্টা নেওয়া হয় (টীকা-২)। জনশিক্ষা দপ্তরকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরে উন্নীত করা হয় । নবগঠিত এই সার্ভিসে পূর্বতন এডুকেশন সার্ভিসের অধীন সরকারি কলেজের শিক্ষকরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার সার্বিক দায়িত্ব এই সার্ভিসের উপর ন্যস্ত হলেও এই দুই সেক্টরে কখনই বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে সদস্য নিয়োগ দেওয়া হয় নি। যার ফলে জনমানসে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার বলতে সরকারি কলেজের শিক্ষক পরিচয়টি ভাস্বর হয়ে ওঠে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ক্যাডার তালিকাভুক্ত পদগুলিতে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগদান এবং উচ্চতর পদের সোপান সৃষ্টি অত্যাবশ্যক। দীর্ঘ সময়েও সেই কাজগুলি সম্পন্ন করা হয় নি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নামে পৃথক মন্ত্রণালয় সৃষ্টির পর মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর সৃষ্টি হয়েছে। সাম্প্রতিককালে মাধ্যমিক অধিদপ্তর সৃষ্টির প্রচেষ্টাও দেখা যাচ্ছে (টীকা-৩)। কিন্তু এ সকল অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কর্মীবাহিনী যোগানের বিষয়টি ক্রমশ অস্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের অধীন কর্মরত সরকারি কলেজের শিক্ষকরা উচ্চ শিক্ষার বিস্তরণের সাথে সরাসরি যুক্ত হলেও উচ্চ শিক্ষার নীতি নির্ধারণ ও ব্যবস্থাপনায় প্রান্তিক ভূমিকা পালন করছেন। আমাদের প্রজাতন্ত্রে উচ্চশিক্ষার বিরাজমান অবস্থা, সেখানকার সমস্যা, এর বিকাশের সম্ভাবনা ইত্যাদি পর্যালোচনার দাবি রাখে। উচ্চ শিক্ষার ইতিবাচক বিকাশে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের ভূমিকা সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তাও পরখ করে দেখা দরকার। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমন্বয়হীনতা দূরীকরণে এই সার্ভিসটি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারবে বলে সংশ্লিষ্টরা বিশ্বাস করেন।

আইয়ুব খানের শাসনামলে শরীফ কমিশনের সুপারিশকে পূর্ববাংলার ছাত্র-জনতা শিক্ষা সংকোচন নীতি হিসেবে দেখেছে। বৈষম্যের বিরূদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবেই বাংলাদেশের সৃষ্টি। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে গণপরিষদের সদস্যগণ দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন:

“সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের প্রতি যে ম্যান্ডেট দিয়েছেন সে ম্যান্ডেট মোতাবেক আমরা, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, আমাদের সমবায়ে গণপরিষদ গঠন করে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র ঘোষণা করছি”

এর পর জাতীয় সংবিধানের প্রস্তাবনায় অন্যান্য তিনটি নীতির সাথে সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে গৃহিত হয়। এর ব্যাখ্যায় বলা হয়:

“আমাদের রাষ্ট্রের অন্যতম মূল লক্ষ্য হইবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।”

শিক্ষাক্ষেত্রে বিশাল কর্মযজ্ঞ ছাড়া সংবিধানের এই নির্দেশ প্রতিপালন করা সম্ভব নয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু খুব দ্রুত কয়েকটি পদক্ষেপ নেন। বৈষম্যহীন ও বিজ্ঞাননির্ভর সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা চালু করার জন্য তিনি প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। ১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করে অধ্যাদেশ জারি হয়। দেশের সকল (৩৭ হাজার) প্রাথমিক বিদ্যালয়কে রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয় (টীকা-৪)। একই সাথে রাষ্ট্রযন্ত্রকে বিভিন্ন পেশায় বিন্যস্ত করে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অধীন নিয়ে আসার জন্য সুপারিশ প্রণয়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর মোজাফফর আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ‘পে অ্যান্ড সার্ভিসেস কমিশন’ গঠন করা হয়। এরই সমান্তরালে আমরা দেখতে পাই, অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব নিযুক্ত করতে।

ড. কুদরত-ই-খুদার কমিশন ১৯৭৪ এর ৩০ মে রিপোর্ট দেয়। রিপোর্টে আরও অনেক বিষয়ের সাথে প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এবং মাধ্যমিক শিক্ষাকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়। সংবিধানের নির্দেশ (টীকা-৫) অনুযায়ী অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষার সুপারিশ করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের কারণে কুদরত-ই-খুদা কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন কিছুটা মন্থর হয়ে পড়ে। তবে এই রিপোর্টের চেতনাকে পরবর্তী সকল সরকারই গ্রহণ করেছে।

স্বাধীনতার পর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ভিত রচনায় অধিক মনোযোগের কারণে সকলের জন্য উচ্চ শিক্ষায় সুযোগ সৃষ্টির বিষয়টি সামনে আসতে পারে নি। চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি এই দায়িত্ব পালন করে আসছিল। সরকারি ও বেসরকারি কলেজে স্নাতক পর্যায়ের কোর্সগুলি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছিল। অল্প কয়েকটি কলেজেই স্নাতক কোর্সের পাঠ দেয়া হত। সাধারণভাবে কলেজগুলি স্নাতক (পাশ) কোর্সের দায়িত্ব পালন করত। জেনারেল এরশাদের সরকার ১৯৮৩ সালে মজিদ খানের নেতৃত্বে এবং ১৯৮৭ সালে প্রফেসর মফিজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে পৃথক দু’টি শিক্ষা কমিশন গঠন করে। মজিদ খান কমিশনের রিপোর্ট তৎকালীন ছাত্রসমাজ প্রত্যাখ্যান করে। এটি তেমনটা আলোর মুখ দেখে নি। মফিজউদ্দীন কমিশন উচ্চ শিক্ষার জন্য কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পেশ করে (টীকা-৬) :

ক. প্রতি বৃহত্তর জেলায়, বিভাগীয় শহরে এবং রাজধানীতে একটি করে কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীতকরণ,
খ. দুটি অধিভুক্তি দাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং প্রথম ডিগ্রি প্রদানকারী সকল সাধারণ কলেজকে উক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় আনয়ন,
গ. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের জন্য নীতি ও বিধিমালা প্রণয়ন এবং কার্যকরণ,
ঘ. সরকার কর্তৃক বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের পূর্ণ বেতন ও ভাতাদি প্রদান

এখানে লক্ষ্যনীয় যে, জেনারেল এরশাদের সরকার শিক্ষাকে জাতীয়করণের ক্ষেত্রে প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সেটিকে উচ্চ শিক্ষার দিকে পরিচালিত করেন। কিন্তু সেই কাজটি করা হয় মানের সাথে সমঝোতা করে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের জন্য নীতি ও বিধিমালা প্রণয়ন এবং বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের পূর্ণ বেতন ও ভাতাদি প্রদান- কমিশন ঘোষিত এই দু’টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মুখ দেখে নি। অথচ এই সময়ে শতাধিক মানহীন বেসরকারি কলেজকে তার পূর্ণ জনবলসহ সরকারি কলেজে রূপান্তর করা হয়। কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার পরিকল্পনা বেশি দূর অগ্রসর হতে পারে নি।

জেনারেল এরশাদের শাসনে বাস্তবায়ন না হলেও তার পতনের অব্যবহিত পরে বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে ডিগ্রি দানকারী বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি হয় (টীকা-৭) । একই সময়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। দূরশিক্ষণের জন্য উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ও স্থাপন করা হয়। ২০০১ সালে বেগম জিয়ার দ্বিতীয় মেয়াদে জগন্নাথ কলেজ, বিএম কলেজ, কারমাইকেল কলেজের ন্যায় শ্রেষ্ঠ সরকারি কলেজগুলিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হলেও বিএম এবং কারমাইকেল কলেজের রূপান্তরে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার বাঁধা প্রদান করে। ফলে সেই প্রকল্পটি সাময়িকভাবে স্থগিত হয়।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে দেশজুড়ে উচ্চ শিক্ষার অবিশ্বাস্য প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। নীতিমালা অনুসরণ না করে উচ্চ শিক্ষার অনুমতি দেওয়ায়  মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই সময়ে এসএসসি এবং এইচএসসির ন্যায় পাবলিক পরীক্ষায় পাসের হারও অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। এখানেও মানের সাথে সমঝোতার প্রশ্নটি প্রায়শ উত্থাপিত হচ্ছে।

২০০৯ সালে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হয়েই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিক্ষার উন্নয়ন নিয়ে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্রতী হন। সেই লক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০১০ প্রণীত হয়। পাশাপাশি উচ্চ শিক্ষার মান ও এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কারের প্রস্তাবনা আসে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজসমূহকে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ন্যস্ত করার পরামর্শ প্রদান করা হয়। এ বিষয়ে বিস্তারিত গবেষণা পরিচালনা করা হয় নি। তবে এ বিষয়ে পরামর্শ দিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃক অধ্যাপক মো. মোহাব্বত খানের নেতৃত্বে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠিত হয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে মোহাব্বত খানের কমিটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে যে রিপোর্ট পেশ করেছে তাতে ১৯ টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কলেজসমূহের অধিভুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক রূপরেখা দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরাও তাদের প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন। সম্প্রতি এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে ঢাকা শহরের সাতটি সরকারি কলেজের অধিভুক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যস্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে।

ব্যবস্থাপনার ধীর গতি, শিক্ষার্থীদের পরিচয়ের সঙ্কটের পাশাপাশি নানামুখি আন্দোলনও আমরা দেখতে পাচ্ছি। এই অবস্থায় সামগ্রিক বিষয়টি পর্যালোচনার দাবি রাখে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অর্থায়ন হয়ে থাকে মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রম। এই প্রতিষ্ঠানটিকে অর্থ উত্তোলন ও ব্যয়ের ক্ষমতা দিয়ে আইন করা হয়েছে। স্বাধীনভাবে অর্থ উত্তোলনের ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির মধ্যে অতিরিক্ত আয়ের প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি ব্যতিক্রমী বৈশিষ্ট্য হল বিশ্ববিদ্যালয়টির কর্তৃত্বে শ্রেণিকক্ষ শিক্ষকদের অংশগ্রহণ নেই। শুরুতে বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হলেও ধীরে ধীরে তা শূন্যতে নেমে আসে।

উচ্চ শিক্ষায় অব্যবস্থাপনা ও মানের সাথে সমঝোতার বিষয়টি কেবলমাত্র জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সীমাবদ্ধ নেই। সাম্প্রতিক সময়ে অসংখ্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অনেক নতুন নতুন বিষয় খোলা হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ এবং নতুন বিষয় খোলার ক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয় যে, পুরাতন চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পর নতুন করে প্রায় শ’খানেক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন হয়েছে, কোনোটিকেই ১৯৭৩ এর অধ্যাদেশের আওতায় আনা হয় নি। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকে অনেক বেশি করে সচিবালয়ের মুখাপেক্ষী থাকতে হয়। তাই উচ্চ শিক্ষার সংস্কারে যে কোনো পদক্ষেপ নিতে গেলে সব দিক বিবেচনা করে অগ্রসর হওয়া উচিত। নইলে মানের উন্নয়নের পরিবর্তে নতুন নতুন জটিলতা দেখা দিতে পারে।

উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সকলের জন্য নাকি কেবল মেধাবীদের জন্য এই বিতর্ক সমাজে রয়েছে। তত্ত্বীয় জ্ঞান নির্ভর উচ্চ শিক্ষার কতটুকু বিস্তার হওয়া উচিত সেই বিতর্কও আছে। কারিগরি শিক্ষা ও পেশাভিত্তিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও বিস্তর আলাপ-আলোচনা হয়ে থাকে। এত কিছু সত্ত্বেও কোনো বিবেচক ব্যক্তি সাধারণ মানুষের সন্তানদের উচ্চ শিক্ষা লাভের অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন না। বাংলাদেশে উচ্চ শিক্ষার উল্লেখযোগ্য অংশ সরবরাহ করছে সরকারি কলেজসমূহ। সরকারি কলেজগুলির জনবল বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত। কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও বিসিএস পরীক্ষার নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনসাধারণের আস্থা রয়েছে। একটি একক সার্ভিসের সদস্য হওয়ার কারণে এই পেশার জনবলকে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে সুবিধা রয়েছে। তাই উচ্চ শিক্ষার সংস্কারে এই পেশাটিকে যথোপযুক্তভাবে ব্যবহার করতে পারলে রাষ্ট্র লাভবান হবে।

কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হল, এই সম্ভাবনা সত্ত্বেও কাজ হচ্ছে সম্পূর্ণ বিপরীত। জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০১০-এ প্রতিটি উপজেলায় একটি করে সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করা হয়েছে (টীকা-৮) । নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠার বিকল্পটি ব্যবহার না করেই অতীতের ন্যায় বেসরকারি কলেজ জাতীয়করণের পথেই আমরা অগ্রসর হয়েছি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণে শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টি প্রাধান্য না পেয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের আকাঙক্ষা পূরণই একমাত্র ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যে ৪২ টি কলেজের জনবল বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে আত্তীকৃত হয়েছে।

আরও ২৮২ টি কলেজ সেই প্রক্রিয়ায় অপেক্ষমান। সংশ্লিষ্ট কলেজগুলির জনবল ক্যাডার বহির্ভূত রেখে বিধি তৈরি করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনাটিকে সঠিকভাবে অনুসরণ না করলে উচ্চ শিক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।  আমরা লক্ষ্য করছি, জাতীয় শিক্ষানীতি এবং অন্যান্য জাতীয় কমিটিসমূহের পরামর্শগুলি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। খণ্ডিতভাবে অনুসরণ করার ফলে সমস্যা ও সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে। উচ্চ শিক্ষার বিস্তারে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কলেজগুলি সিংহভাগ দায়িত্ব পালন করলেও বেসরকারি কলেজও অনেকটা এগিয়ে এসেছে। জাতীয় শিক্ষানীতিতে বেসরকারি কলেজের উন্নয়নের জন্য নিন্মলিখিত পরামর্শগুলি দেওয়া হয়েছে:

সরকারি অনুমোদন ও আর্থিক সহায়তাপ্রাপ্ত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ইবতেদায়ি মাদরাসা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদরাসা ও কলেজের জন্য মেধাভিত্তিক ও উপযুক্ত শিক্ষক নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারি কর্মকমিশনের অনুরূপ একটি বেসরকারি শিক্ষক নির্বাচন কমিশন গঠন করা হবে।

ক. বেসরকারি শিক্ষক নির্বাচন কমিশন এর মাধ্যমে দ্রুত এবং যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নির্বাচন করে এলাকাভিত্তিক ও প্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগদানের ব্যবস্থা করা হবে;

খ. বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদেরকে সুনির্দিষ্ট যোগ্যতার নিরিখে (উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন, মৌলিক গবেষণা কর্ম, শিক্ষাদান পদ্ধতি উন্নয়ন ইত্যাদি) প্রতিযোগিতামূলকভাবে উচ্চতর পদে নিয়োগ প্রদান করা হবে, যেমন প্রভাষক হতে সহকারী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক হতে সহযোগী অধ্যাপক এবং সহযোগী অধ্যাপক হতে অধ্যাপক পদে। বেসরকারি শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত বিধিমালার আওতায় এ ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হবে। বেতনবৃদ্ধি সফল প্রশিক্ষণ ও উচ্চতর যোগ্যতা অর্জনের সাথে সম্পর্কিত হবে। বৃহত্তর পরিসরে শিক্ষকদের মৌলিক সুবিধাদি নিশ্চিত করে অন্যান্য সুবিধাদি অর্জিত যোগ্যতার সাথে সম্পর্কিত করা হবে ;

গ. বেসরকারি মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষক নিবন্ধনের জন্য বর্তমানে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ ((NTRCA) নামক একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা রয়েছে। পৃথক বেসরকারি শিক্ষক নির্বাচন কমিশন গঠন করা হলে NTRCA এর আবশ্যকতা থাকবে না ফলে একে বিলুপ্ত করা হবে;

ঘ. সকল পর্যায়ের সকল ধারার সকল স্তরের এমপিও ভুক্ত শিক্ষকগণের চাকুরি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় বদলিযোগ্য হবে। সরকারি প্রয়োজনে এমপিও ভুক্ত শিক্ষকদেরকে সমধারার সমস্তরের প্রতিষ্ঠানে সমপর্যায়ের পদে বদলী করা হবে;

ঙ. সকল পর্যায়ে সকল ধারার শিক্ষকদের নিয়মিত বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক হবে। এ লক্ষ্যে বিদ্যমান প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হবে।

শাসকদল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বিগত দু’টি নির্বাচনি ইশতেহারেও (টীকা-৯) বেসরকারি কলেজসমূহের উন্নয়ন এবং সেখানকার জনবল নিয়োগে কমিশন গঠনের প্রস্তাবনা রয়েছে। এই অঙ্গিকারগুলি বাস্তবায়নের গুরুত্ব অনেক। আমরা যেহেতু সকল নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে চাচ্ছি, রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানের সুষম বিকাশ ছাড়া সেটা সম্ভব নয়। বেসরকারি কলেজের জনবল বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে আত্তীকরণের ফলে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার গঠনের মূল লক্ষ্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

১৯৮০ সালে ক্যাডার সৃষ্টির পর এটিকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন ছিল। ১৯৮৪ সালে প্রশাসনিক সংস্কারে বিগ্রেডিয়ার এনামুল হক খানের কমিটির রিপোর্টে (টীকা-১০) শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরসমূহের বিস্তারিত কার্যবিবরণী দেওয়া হয়। রিপোর্টে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের অধীন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের কাজের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সেখানে চার্টার অব ডিউটিতে বলা হচ্ছে:

“K. To initiate introduction of new courses/subjects in government educational institutions and creation of additional required post with provisions for other necessary facilities for the purpose.”

স্পষ্টতই এই নির্দেশনা বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের অধীন পরিচালিত অধিদপ্তরের স্বায়ত্তশাসনের মাত্রা নির্দেশ করে। আমরা দেখেছি ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী শাসনামলে ডিপিআই দপ্তরকে স্বাধীনভাবে পদ ও প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি করতে।

এনাম কমিটির সুপারিশগুলির একটি অন্যতম পরামর্শ ছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পদগুলি বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সদস্য দিয়ে পূরণ করা।

“20. The committee further recommends that to facilitate both horizontal and vertical movement of the members of the BCS (Education) and for ensuring efficiency in education administration and management 50% sacntioned posts of the Ministry of Education should be filled up and kept reserved for the members of the BCS (Education). The similar provisions have been made in the Ministry of Foreign Affairs and Law and Parliamentary Affairs Division of the Ministry of Law and Land Reform to ensure professional expertise service at the policy making level of the Ministry.” (টীকা-১১)

কমিটির এই গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ অনুসরণ করা হয় নি। একই সময়ে (১৯৭৯) বহুল আলোচিত SSP Order (টীকা-১২) জারি হয়। সেই আদেশে প্রজাতন্ত্রের উপ সচিব ও তদূর্ধ্ব পদসমূহে নিয়োগের জন্য সকল ক্যাডারসমূহের সদস্যদের জন্য উন্মুক্ত পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল। ট্র্যাজেডি হল যে, আইন থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী দীর্ঘ দশ বছরে সেই আইনের প্রয়োগ হয় নি। সচিবালয়ে একটি একক পেশার নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থেকেছে। এর পর ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসলে প্রাক্তন সচিব এ টি এম শামসুল হকের নেতৃত্বে গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন ২০০০ সালের ৩০ মে ‘একুশ শতকের জনপ্রশাসন’ নামে তিন খ-ের একটি প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে বলা হয়েছে:

“সরকারের উপ-সচিব, যুগ্ম-সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিবের সমন্বয়ে সচিবালয়ে সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট পুল (এসএমপি) গঠন করতে হবে। উপ-সচিব পদে নিযুক্তি হবে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) কর্তৃক পরিচালিত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ভিত্তিতে। মন্ত্রণালয়ের/বিভাগসমূহের গুচ্ছের উপ-সচিব পদের জন্য সকল ক্যাডারের সিনিয়র স্কেলভুক্ত এবং ন্যুনতম ৮ বছরের চাকুরির অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাগণ পরীক্ষা দেয়ার যোগ্য হবেন। এর ফলে সচিবালয়ে সকল ক্যাডারের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং প্রতিভাবান কর্মকর্তাদের দ্রুত পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি হবে।” (টীকা ১৩)

শামসুল হক কমিশন জনপ্রশাসনে বিদ্যমান ব্যবস্থা পাল্টে সার্ভিসগুলিকে তিনটি গুচ্ছে পুনর্বিন্যাস করার পরামর্শও দিয়েছেন। উদ্দেশ্য, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও বিশেষজ্ঞ জ্ঞানকে লালন করা।

বিভিন্ন কমিশনসমূহের সুপারিশে প্রতিনিধিত্বের এই বিষয়টি কোনো সর্ভিসের বৈষয়িক প্রাপ্তির নিরিখে দেখলে চলবে না। এর সাথে দায়িত্ব ও পেশাদারিত্বের সম্পর্ক রয়েছে। জাতীয় স্বার্থের চেয়ে পেশাগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে আমাদের দেশে প্রশাসনিক সংস্কারগুলি সম্পন্ন হচ্ছে না। ক্যাডার সার্ভিস হিসেবে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা এখন যে সেবা দিচ্ছে তা শ্রেণিকক্ষে যান্ত্রিকভাবে পাঠদান এবং পরীক্ষা নেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। শিক্ষা ক্যাডার নিয়ন্ত্রিত জাতীয় শিক্ষাক্রম ও টেক্সটবুক বোর্ড, শিক্ষা বোর্ডসমূহ, জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্তৃত্ব দিন দিন শিথিল করা হচ্ছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করলেও সিলেবাস ও কারিকুলাম প্রণয়ন, অ্যাকাডেমিক ব্যবস্থাপনা, পরিদর্শন, জনবল পুনর্বিন্যাাস- কোনো বিষয়েই বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের স্বাধীন পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ নেই। মন্ত্রণালয়ের ছুটির তালিকা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের ক্যালেন্ডার তৈরি করার পর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা, ফরম পূরণ ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে ছুটির মধ্যে।

লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর ভর্তি, ফরম পূরণ, পরীক্ষা গ্রহণ ইত্যাদি কাজের জন্য কোনো সরকারি জনবল সৃষ্টি করা হয় নি। এখানে একটি জোড়াতালির পরিবেশ বিরাজ করছে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারকে একটি শক্তিশালী সার্ভিস হিসেবে গড়ে তুলে তার নিয়ন্ত্রণে উচ্চ শিক্ষার সমন্বয়ের দায়িত্ব আরো বেশি করে আরোপ করলে সুফল পাওয়া যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সায়ত্ত্বশাসনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকারি কলেজের পরিচালনায় কীভাবে আরও বেশি করে স্বাধীনতা দেওয়া যায় সেটিও আমাদের ভাবতে হবে।

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের এখন যে সম্পর্ক সেটা কেবলমাত্র শিক্ষার্থী ভর্তি ও পরীক্ষা গ্রহণের মত কার্যকলাপকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলি নিজেরাও নানা সঙ্কটে রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ইনস্টিটিউটগুলিকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা আছে। সেখানকার গবেষণা হতে ফলাফল নিয়ে বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে হবে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত শিক্ষকগণ গবেষণা করছেন ব্যক্তিগত উদ্যোগে। গবেষণার সুযোগ-সুবিধাকে একটি নিয়মিত কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। প্রয়োজনে শিক্ষা ক্যাডারের জন্য একটি স্বতন্ত্র গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়া যেতে পারে। একটি পর্যায়ক্রমিক পদ্ধতিতে শিক্ষা ক্যাডার নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয়ও নির্মাণ করা যেতে পারে। এমন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সকল সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হতে পারে। অপেক্ষাকৃত নামি প্রতিষ্ঠানগুলিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা হলে মেধাবী শিক্ষাবিদগণ এই পেশায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন।

আমাদের রাষ্ট্রে সুপারিশ তৈরি করার চেয়ে কঠিন কাজ হল তা বাস্তবায়ন করা। কলেজ জাতীয়করণের নিয়ে সাম্প্রতিক জটিলতা তার বড় প্রমাণ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার প্রায় পুরোটাই রাষ্ট্র সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে। জাতীয় শিক্ষানীতি, ২০১০-এ প্রাথমিক শিক্ষায় বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণকে নাকচ করা হয়েছে (টীকা-১৪)। বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় এই ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই। তবে উচ্চ শিক্ষায় রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে গেলে একই পদ্ধতি কাজ করবে না। এখানে স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের বিকাশের বিকল্প নেই। তারপরও মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের একটি সবল উপস্থিতির প্রয়োজন রয়েছে।

সচিবালয়ে ফাইলভিত্তিক প্রশাসনের সনাতন কাঠামোয় উচ্চ শিক্ষার প্রকৃত যত্ন সম্ভব হবে না। ফাইল অবশ্যই থাকবে। তবে তা শ্রেণিকক্ষ শিক্ষকতার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হলে দৃষ্টিভঙ্গিগত অগ্রগতি সাধিত হবে। সদ্য স্বাধীন দেশে অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব নিযুক্ত করে বঙ্গবন্ধু তার অভিপ্রায় পরিষ্কার করেছেন। উচ্চ শিক্ষায় সঠিক ফল পেতে হলে আমাদেরকেও বিশ্ববিদ্যালয় ও মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট যোগ্য ব্যক্তিদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

টীকা
১. Charles Wood Halifax (Viscount), Education (India): Despatch from the Court of Directors of the East India Company, to the Governor General of India in Council on the Subject of the Education of the People of India (no. 49, Dated the 19th July 1854). ‎East India Company.

২. BCS (Reorganization) Order, 1980; S.R.O. 286.L/80 Ed (IC)/SII-92-80-92, Dated: 01/09/1980

৩. জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০, শিক্ষা মন্ত্রণালয়,

৪.পৃষ্ঠা: ৬৪ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ওয়েবসাইট: http://www.dpe.gov.bd/

৫. অনুচ্ছেদ ১৭, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান

৬. বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি।

৭. National University Act 1992, Bangladesh Gazette Extraordinary, 21th October 1992

৮. অধ্যায় ২৭: শিক্ষা প্রশাসন, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০; পৃষ্ঠা: ৬৬

৯. দিন বদলের সনদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইশতেহার-২০০৮ ও এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ, নির্বাচনী ইশতেহার-২০১৮, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

 

১০. Report ofthe Martial Law Committee on Organisational Set Up, Phase 2, Volume 14

১১. Report ofthe Martial Law Committee on Organisational Set Up, Phase 2, Volume 14, Page 6

১২. Senior Service Pool Order, 1979

১৩. একুশ শতকের জনপ্রশাসন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন, জুন, ২০০০

১৪. অধ্যায় ২: প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা, জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০; পৃষ্ঠা: ০৪

Responses -- “উচ্চ শিক্ষার সঙ্কট ও সম্ভাবনা: প্রেক্ষিত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার”

  1. ফাতিহুল কাদির সম্রাট

    ধন্যবাদ প্রিয় জিয়া আরেফিন আজাদ। উচ্চশিক্ষা আজ উচ্চমাত্রায় দূষণ ও সমস্যার শিকার। আপনার এই লেখা এক্ষেত্রে আলোর পথ দেখাবে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—