মানিক সরকার। অনন্য এক রাজনীতিবিদ। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন দুই দশক ধরে। নিজ রাজ্যের অধিপতি হলেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে গোটা দেশ জুড়ে। সহজ-সরল জীবন যাপন এবং সততার জন্য সকল মহলেরই শ্রদ্ধার পাত্র তিনি।

সর্বদা সাদা পাঞ্জাবি এবং পায়জামা পড়া মানিকবাবু শুভ্রতার এক মূর্ত প্রতীক হিসেবে বিচরণ করছেন ত্রিপুরার রাজনীতিতে। তাঁর মতো ক্লিন ইমেজের রাজনীতিবিদ খুব কমই আছেন ভারতে!

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নীতিভ্রষ্ট হননি! অপব্যবহার করেননি ক্ষমতার। চলাফেরা করেন সাধারণের মতো। মুখ্যমন্ত্রী বলে, কোনও দম্ভ নেই তাঁর, পরিবারেরও কেউ এনিয়ে দাপট দেখায়নি কখনো। প্রচলিত আছে, আজ পর্যন্ত তাঁর স্ত্রী ব্যবহার করেননি সরকারী গাড়ি।

উপরতলায় বসে রাজনীতি করেন না। সে কারণে পুরো রাজ্যই তাঁর নখদর্পনে। ধর্মনগর থেকে সাব্রুমের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অলিগলি তাঁর চিরচেনা! সমাজের সকলস্তরের মানুষের সঙ্গেই আছে সখ্যতা।

ছাত্রাবস্থায় প্রতিবাদ করতে গিয়ে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। শুধুই এগিয়ে চলার গল্প। মার্কসবাদী কমিউনিস্ট ভাবধারার কর্মী থেকে আজ নিজেকে অধিষ্ঠান করেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। পলিটব্যুরোর এই সদস্য দলের জন্য যেমন নিবেদিতপ্রাণ তেমনই সাধারণেরও সুখ-দুঃখের সাথী। মুখ্যমন্ত্রীর প্রাপ্ত ভাতার প্রায় পুরোটাই তিনি ব্যয় করেন দলের জন্য, জনকল্যাণে। সর্বশেষ মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার দিন তাঁর অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৯৩০ ভারতীয় রুপি। আজকের দিনে যা সত্যিই বিস্ময় জাগানিয়া।

স্বাধীনতার বন্ধু হিসেবে বাংলাদেশেও তিনি ব্যাপক সমাদৃত। ভিনদেশের নাগরিক হয়েও আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পালন করেছেন অকৃত্রিম বন্ধুর ভূমিকা। শুধু একাত্তর সালেই নয়, বিগত ২০ বছর ধরে ক্ষমতার মসনদে থাকা এই মানুষটিকে বাংলাদেশের বন্ধু হিসেবেই জানেন সকলে।

সম্প্রতি ভারত ভ্রমনকালে সজ্জন, সদালাপি, সাহিত্য ও সংস্কৃতিবান্ধব এই মুখ্যমন্ত্রীর মুখোমুখি হয়েছিলাম। দীর্ঘ আলাপচারিতায় রাজনীতি, সমাজভাবনাসহ নানা প্রসঙ্গে কথা হয় তাঁর সাথে। প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরই তিনি দিয়েছেন সাবলীলভাবে। আশ্রয় নেননি ভনিতার! আসন্ন নির্বাচনসহ গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় নিয়ে সাজানো হয়েছে এই সাক্ষাৎকথন!

পরাজয়ের শঙ্কা নেই, আবারো উড়বে লাল পতাকা!

মুখোমুখি হতেই আগামী নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম। হাসিমুখেই জবাব দিলেন, পরাজয়ের শঙ্কা নেই। বললেন, বিগত বিশ বছরে এমন কিছু করিনি যার জন্য পরাজিত হতে হবে। মানুষের সুখে, দুঃখে পাশে ছিলাম। প্রতিহিংসার রাজনীতি কখনো করিনি। লাল ঝাণ্ডা হাতে থাকা এই কমরেড নির্বাচন নিয়ে যেনো নির্ভার! বললেন, “ত্রিপুরাবাসীর প্রতি আমার অগাদ বিশ্বাস আছে, তারা অতীতেও ভুল করেনি, ভবিষ্যতেও করবেনা। যতই ওরা পাল্টে দেওয়ার বুলি আওড়াক না কেন, দেশবাসী তাদের পাল্টানোর নমুনা দেখেছে। ওরা সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করবে কিন্তু ত্রিপুরাবাসী যথেষ্ট সচেতন; প্রলোভনের ফাঁদে আশাকরি তারা পা দেবেনা। এখানকার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সম্প্রীতির, বিভেদ বা বিভাজন ত্রিপুরার মানুষ পছন্দ করেনা। আমাদের দলের বিশেষ কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই, আমরা জনগনের জন্য রাজনীতি করি। জনগণই আমাদের শক্তি। তারা পাশে আছে। অলীক প্রতিশ্রুতি দিয়ে ত্রিপুরার জনগণকে বোকা বানানো যাবেনা। পুনরায় নির্বাচিত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র!”

অন্যান্য রাজ্যে ত্রিপুরার মতো অবস্থায় নেই দল? নির্বাচনে কি এর প্রভাব পড়বে?

পশ্চিম বাংলায় তো আমাদের দীর্ঘদিন একটা সরকার ছিলো। আমাদের দল তাতে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। সেখানে দল পরিচালনায় ত্রুটি দুর্বলতা কিছুই ছিলনা- এটাতো মনে করার কোন কারণ নেই। এর সঙ্গে ওখানে বড় ধরনের একটা ষড়যন্ত্রও ছিলো। কারণ হচ্ছে আমাদের এই সরকারটা একটা শ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করার চেষ্টা করছিলো প্রথম থেকেই। যেটা বিপরীত মেরুতে থাকা শ্রেণীর স্বার্থে ঘা দিচ্ছিল এবং তারা এটাও দেখছিলেন যে এই সরকারের অস্তিত্ব, কর্মধারা শুধু এই রাজ্যের ভৌগলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ থাকছে না। এটা দেশের অন্যান্য রাজ্যের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষন করতে সক্ষম হচ্ছে এবং এটা জাতীয় রাজনীতিকেও প্রভাবিত করছে। এরকম পরিস্থিতিতে এই সরকারকে চলতে দেওয়া যায়না। দীর্ঘদিনই ধরেই সরকারকে সরানোর চেষ্টা চলছিল এবং ভেতরের বাইরের যে ষড়যন্ত্রীরা তারাও এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। আমারতো বলতে বাধা নেই, এতে আমাদের দেশের বাইরের যে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি তাদেরও নানাভাবে ভূমিকা এরমধ্যে ছিলনা এটা বেমালুম একেবারে বলা যাবেনা। এটাও ছিলো। সবমিলিয়ে একটা পরিমণ্ডল তৈরি হয়েছে তাতে ওখানের সরকার থেকে আমাদের সরে যেতে হলো।

নতুন একটা দল সেখানে ক্ষমতায় আসলো। তাতে তো আমরা নিশ্চয়ই একটু দুর্বল হলাম। এটার প্রতিফলন আমাদের জাতীয় রাজনীতিতেও পড়লো। এর ফলে আমাদের যে সঞ্চয় এর সংখ্যাটাও কমলো। ভারতবর্ষে আমি পেছনে যাওয়ার কথা বলছি না, ধরুন এই দুই-তিন বছরের যে ঘটনাক্রম যদি পর্যালোচনা করেন আপনি আনবায়াসড ওয়েতে, তাহলে এই যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আক্রমণগুলো গরীব মধ্যবিত্ত শ্রমজীবী মানুষের বিরুদ্ধে একের পর এক নেমে আসছে, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর যে আন্দোলন হচ্ছে, শ্রমিকদের আন্দোলন বলুন, কৃষকদের আন্দোলন বলুন- তাদের অধিকার রক্ষার যে সংগ্রাম, তাদের হয়ে কথা বলার যে বিষয় সংসদের ভেতরে হোক, বাহিরে হোক, তাতে আমরাই সামনের সারিতে আছি। আমাদের দেশের একতা, সংহতিকে নষ্ট করার একটা পরিকল্পিত প্রয়াস চলছে।

আমাদের রাষ্ট্রের যে সংহতির মূল ভিত্তি ধর্ম নিরপেক্ষতার আদর্শ সেটাকে দুর্বল করার চেষ্টা হচ্ছে। তাতে সংখ্যায় লঘুরা আক্রান্ত হচ্ছেন, দলিত অংশের মানুষরা আক্রান্ত হচ্ছেন, এটার বিরুদ্ধেও সংসদের ভেতরে-বাইরে আমরা প্রতিবাদমুখর। তাহলে এই বিষয়গুলি যদি আমরা একসাথে বলি, হতে পারে সংসদীয় ক্ষেত্রে সংখ্যার হিসেব নিকেশ থেকে আমাদের সংখ্যাটা হয়তো কমেছে আগের তুলনায়; কিন্তু আন্দোলন সংগ্রামের ক্ষেত্রে আমাদের যে ভূমিকা সেই ভূমিকা কিন্তু হ্রাস পায়নি বরং এটার ধারাবাহিকতা এবং তীব্রতা বাড়ছে। তো এরকম পরিস্থিতি তো থাকবে না। এর পরিবর্তন হবে এবং এটার রিফ্লেকশন সংসদীয় রাজনীতিতে আগামী দিনে ঘটবেনা এটা মনে করার কারন নেই, ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। আর ত্রিপুরার কথা যদি ধরেন, বিগতদিনের যে ইতিহাস সেটা দলের অগ্রগতির ইতিহাস এবং সেই অগ্রগতিতা ধারাবাহিকভাবে অর্জিত হয়েছে। হুট করে আজকের অবস্থায় আসেনি দল। ইতিহাস আমাদের পক্ষে, তাই পরাজয়ের শঙ্কা নেই। সময় এখন নতুন প্রত্যয়ে এগিয়ে যাওয়ার। ইতিহাস গড়ার।

আসন্ন নির্বাচন প্রসঙ্গে বলুন।

১৯৭৮ সালে এই রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার প্রথম আসে, তা থেকে শুরু করে এখন অবদি চলছে। শুরু থেকে এই সরকারকে সহ্য করতে পারছেনা এমন একটি শক্তি আছে। নানাভাবে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুৎ করার উদ্দেশ্যেই তারা কাজ করে যাচ্ছে। তারা স্রেফ ক্ষমতায় আসার জন্য আমাদের সহ্য করতে পারছে না। নানা ধরনের চক্রান্ত ষড়যন্ত্র হয়েছে, চলেছে। এগুলো মোকাবেলা করেই ত্রিপুরার মানুষ বার বার বামফ্রন্টকেই নির্বাচিত করে সরকারে পাঠিয়েছে। কেননা তারা দেখেছে, বামফ্রন্ট যা বলে তা করার চেষ্টা করে। যা বলেনি তার চাইতে বেশি করার চেষ্টা করে। প্রতিশ্রুতির বাইরেও কাজ করার চেষ্টা করে। যদি দেওয়া প্রতিশ্রুত কাজ করতে কোথাও অসুবিধা হয়- ‘কেন এটা হলো’, ‘সমস্যাটা কোথায়’, তার ব্যাখ্যা দেয়। মানুষের কাছে কোনও জিনিস লুকোয়না। কেন লুকোয়না? কারণ মানুষইতো ভোট দিয়ে সরকারে পাঠিয়েছে। সব বিষয়েই জনগণের জানার অধিকার আছে।

“সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে মানুষের জন্য কাজ করা। তার কাছে লুকানোর কি আছে? স্বচ্ছতা আছে, কেমন ট্রান্সপারেন্সি আছে, ফলে এই সরকারটা সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষতি হতে পারে অকল্যাণ হতে পারে রাজ্যের অগ্রগতিতে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে এরকম কোনও কাজ আজ পর্যন্ত করেনি। এইযে অভিজ্ঞতা তার কারণেই দেখা যাচ্ছে, এত ষড়যন্ত্র চক্রান্ত নানা বাধা সত্বেও বার বারই মানুষ ভোট দিয়ে এই সরকারকে সাহায্য করছে, ভোটকে সামনে রেখে নানাজন নানা দিক থেকে কথাবার্তা বলছেন। মানুষ কিন্তু ঠিকই এরমধ্যে অতীতের ঘটনাবলি মনে রাখছেন। একে অপরকে সতর্ক থাকার কথা বলছেন। তবে সবকথার মূলকথা এই সরকারের উপর মানুষের আস্থা আছে। ভোটের মাধ্যমেই সেটা প্রমাণিত হবে।

ভোট নিয়ে কোনও শঙ্কা আছে?

যাদের জনগণের উপর বিশ্বাস নেই তারাই ভোট নিয়ে শঙ্কিত থাকে। এটা আসলে মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো, মানুষের উপর যদি আপনি বিশ্বাস হারান তাহলেই তার অধিকার হরণ করার আপনি চেষ্টা করবেন। ভোট হচ্ছে, নানা দল ভোটে দাঁড়াবে। যার যার কথা সে সে বলবে। আর সাধারণ ভোটার যারা, আমরা আমাদের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে তাদের বলা কথাগুলোকে মিলিয়ে নেব এবং এর থেকে আমি সিদ্ধান্ত নেবো কাকে ভোট দিলে বা সমর্থন করলে আমার সুবিধে হবে অথবা অসুবিধে হবে এটাইতো ভোটের মূল কথা। গণতন্ত্রের মূল কথা। এই জায়গাটাতে আপনি যদি আমাকে ভোট দিতে না চান তাহলে কি দাঁড়াচ্ছে? তাহলে বোঝা যাচ্ছে, আপনি আমাকে বিশ্বাস করছেন না, যে আমি আপনাকে ভোট দেবো। তাহলে আমি আপনাকে ভোট দেবো না এর কারণটা কী? তাহলে বুঝতে পারছেন আমি যা বলছি আমি তো তা করছি না। কাজেই এ কারণে লোকটা আমাকে ভোট দেবেনা;  আর তাকে ভোট দিতে দিলে এই ভোটটা আমার বিরুদ্ধে যাবে, এই কারনেই তো ভোটের অধিকার হরণ করা হচ্ছে। সমস্যাটাতো এই জায়গায়। যাদের জনগণের উপর আস্থা নেই তারাই ভাওতাভাজি, জোরজবরদস্তির চেষ্টা করে। তবে, জনগণ কিন্তু তাদের ঠিকই চিনে।

বর্তমানে একটা রাজনৈতিক বিমুখতা তৈরি হচ্ছে, কারণ কি?

এটা ইন্টারন্যাশনাল ফেনোমেনা। সোভিয়েত রাশিয়ার বিপর্যয়ের পর নতুন নিউ লিবারেল ইকোনমি পলিসি এসেছে। তারপরে সেটা হচ্ছে রাইট ওয়ার্কশিট, তাদের যে পরিকল্পিত প্রচার ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে এবং তাদের যারা এমপ্লয়েড ইনটেলিজেন্সি এদের যে লেখালেখি এসব দিয়ে নবীন প্রজন্মকে রাজনৈতিক বিমুখ করতে, আত্মকেন্দ্রিক করে দাও, সেলফ সেন্ট্রিক করে দাও।  ধনী দরিদ্র কেন? এগুলো নিয়ে যেন মাথা না ঘামায় তাহলেই তাদের সুবিধে হবে। এই ফেনোমেনা সবদেশে, পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে। এই মুহূর্তে এটা একটা সমস্যা কিন্তু এটা কাটিয়ে ওটা যাবে।

কারণ, ছেলে যখন সবকিছু করার পর একটা গান বেঁধেছে, ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’। তার মানে কি, তোমাকে তো তোমার মত থাকতে দিচ্ছেনা কেউ। তুমি কি না খেয়ে থাকতে চাও? তুমি কি বিনা রোজগারে সারাজীবন বাবার কাছ থেকে পয়সা নিয়ে চলতে চাও? তাতো হবে না। তোমাকে খেতে হবে, পোশাক বানাতে হবে। তোমাকে রোজগার করতে হবে। তোমাকে বিয়ে-সাদি করতে হবে। ছেলে পুলে হলে তাদেরকে দেখতে হবে। এটাতো ভালোমতো করতে পারছো না, তাহলেতো তোমার মতো চলতে পারছো না, এইযে না পাড়া এ থেকেইতো প্রশ্নগুলো আসবে। কাজেই ঐ যে গান বেঁধেছে -এটা উদ্দেশ্যমূলক, শুনতে ভালোই লাগে; কিন্তু আলটিমেটলি তুমি চাইলে তোমার মতো থাকতে পারবে না। কাজেই এটাই তোমাকে নিয়ে যাবে আরেকটা স্রোতে।

তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, জীবন থেকে সংগ্রামকে আলাদা করার কোনও সুযোগ নেই। সমস্ত প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে মানুষ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবে এটাই হচ্ছে সভ্যতার ইতিহাস। কাজেই এটাকে আটকাবে কে? কার ক্ষমতা আছে? সময় লাগতে পারে, ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। আলটিমেটলি জীবনই সফল হয়। এটাই হচ্ছে মূল কথা।

রাইট উইং পলেটিক্সটা যখন যাচ্ছে তার পেছনে ইকোনমি তার পক্ষে দাঁড়িয়ে, ভাওতাভাজি তো হবেই। কাজেই এতে মুষড়ে পড়লে চলবে না। কাউন্টার অফেনসিভেও যাচ্ছে মানুষ। এটাই আশার কথা।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আপনার অবদান আছে, মনে পড়ে সেইসব দিনের কথা?

তখনতো আমরা কলেজে পড়ি। ৭১ ছিল আমার কলেজ জীবনের শেষ বছর। ঐ সময় আমি ইমোশনালি চার্জড হয়েছিলাম। বয়স কম তো, চোখের সামনে দেখছি সমস্ত কিছু; এই বয়সে ঘরে বসে থাকা যায়না। এজন্য বাংলাদেশ সরকার আমাকে সম্মানিত করেছেন, এইযে সম্মান যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমাকে ডেকে নিয়ে এটা দেওয়া হয়েছে, আমি এই সম্মানকে ব্যক্তিগত মনে করিনা। সমস্ত ত্রিপুরা রাজ্যের মানুষকে সম্মান করা হয়েছে এর মাধ্যমে। কেননা ত্রিপুরার মানুষ ভূমিকা না নিলে আমি একলা কী করতে পারতাম? হয়তো কিছুই করতে পারতামনা।

তিনি বলেন, আপনাদের দেশের সরকার এইযে সম্মান দিয়েছেন এটা শুধু ভারতবর্ষের মানুষকে সম্মান জানান নি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষকে সম্মান জানিয়েছেন। এটা হচ্ছে স্বীকৃতি, শ্রদ্ধার নিদর্শন এবং ভুলে না যাওয়া, তোমাকে আমার মনে আছে। আমি তোমাকে ভুলে যাইনি, এটা সহজ ব্যাপার না। এইযে ঘটনা এটার মধ্য দিয়ে কিন্তু আত্মিক বন্ধন দৃঢ় হয়। বন্ধুত্বের ভাতৃত্বের সম্পর্কটা সুদৃঢ় হয়, সুনিবিড় হয় এবং এটাই থাকবে। বাংলাদেশ এখানে উদারতা, মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছে এবং এটা কনটিনিউ করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে অনেককেই দেওয়া হচ্ছে। আমাদের দেশের অনেকেই পেয়েছেন। ত্রিপুরার অনেককে ডেকে নিয়ে সম্মানিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম আজও আমায় আপ্লুত করে। চোখের সামনে দেখেছি লক্ষ লক্ষ মানুষ এসেছেন। ঘর নাই, বাড়ি নাই, থাকা খাওয়ার জায়গা নাই। কিচ্ছু নাই। এর মাঝেও তারা লড়ছেন। ন্যাচারেলি সেই সময় আমরা মানে উদ্দীপিত যুবক, বয়স আমাদের কম টগবগে রক্ত, আমরা কি বসে থাকবো? এটা হতে পারে? তারপর আমি বামপন্থী ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বসে থাকার তো কোনও প্রশ্নই আসেনা। সেই আরকি।

কেন্দ্রীয় সরকার সম্পর্কে আপনার অভিমত?

আমাদের দেশে এখন যে সরকার চলছে, এটাতো হচ্ছে- বলছে এনডিএ সরকার। মানে ন্যাশনাল ডেমক্রেটিক অ্যালায়েন্স। তার প্রধান শক্তি হচ্ছে বিজিপি মানে ভারতীয় জনতা দল। ভারতীয় জনতা দলের প্রাণ-ভ্রমরা হচ্ছে আর এস এস, তাদের সমস্ত জিনিসটাই এটা মোটামুটি আমাদের দেশের মানুষের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে, এরাই গোটা দেশটাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে ধরুন যা যা ঘটছে এগুলোতে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে তাদের ভূমিকাতো অস্বীকার কেউ করতে পারবে না। এটা মানুষ এখন বুঝতে পারছেন। যার ফলে মানুষের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে।

সততায় অবিচল থাকার মূল মন্ত্রটা কি?

যে দলের সাথে যুক্ত আছি সে দলটা হচ্ছে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি মার্কসবাদী। তার যে নীতি, তার যে আদর্শ, তার যে সাংগঠনিক কর্মধারা, তার যে শৃঙ্খলা এগুলোর বাঁধনে থেকেই তো আমাদের কাজ করতে হয়। এই পার্টি আমাকে যে শিক্ষা দিয়েছে, সেই শিক্ষায় পুরোপুরি শিক্ষিত হয়ে গেছি আমি তো দাবি করতে পারবো না, এটাকে অনুসরণ করার চেষ্টা করছি এবং যেটা আপনি বললেন কি করে আপনি এটা মেনটেইন করছেন- এসব কিছুর কৃতিত্ব, ক্রেডিট আমার পার্টির। পার্টিই আমাকে কীভাবে সৎ থাকতে হয় সেটা শিখিয়েছে। আমি যদি পার্টির সঙ্গে যুক্ত না হতাম তাহলে আমি কোথায় যেতাম, ছিটকে যেতাম; কে আমার খবর নিতো? আদর্শের বরখেলাপ করে কেউ এগুতে পারেনা, টিকে থাকতে পারেনা।

নির্বাচনে বিজিপির প্রভাব?

ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই পুরো দেশ দখল করতে চাচ্ছে বিজেপি। একটা রাজনৈতিক দলের সেই অভিলাষ থাকাটা কিন্তু দোষের কিছু নয়। তবে, তারা যে পদ্ধতিতে সেটা করছে সেটা একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা। অন্যদল থেকে এমএলএ ভাগিয়ে আনা, কেনা যেমন অনৈতিক তেমনই গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য দুঃখজনক।

যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিজিপি ক্ষমতায় এসেছিল, তা তারা পূরণ করেনি। তারা মূলত বিত্তশালীদের পক্ষে কাজ করছে। ক্ষমতার যাওয়ার আগে তারা কৃষকদের বলেছিলো দেড়গুণ দামে পণ্য কেনার কথা, এখন বিক্রিই করা যাচ্ছেনা। গত ৩ বছরে প্রায় ১৩ হাজার কৃষক আত্মহত্যা করেছেন। তারা বলেছিলো, বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফেরৎ আনবে ১শ দিনের মধ্যে এবং ১৫ লক্ষ টাকা করে প্রতিটি পরিবারে তা বন্টন করা হবে। এখন বলছে আনা যাবেনা। আসলে এসব ভাওতাভাজি। তাদের ফাঁকা বুলি আর অলীক প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে মানুষ আজ সচেতন। ত্রিপুরাবাসী ভোটের মাধ্যমেই এর জবাব দেবে।

অপূর্ব শর্মালেখক, সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—