পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে চাঁদ-সূর্য এবং অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রকে আমরা গোলাকার দেখি। কিন্তু পৃথিবীকে দেখি সমতল। অনেক সময় কাছে থেকে কোনো বিষয়কে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হয় না।

তাই দূর থেকে পর্যবেক্ষণ অনেক কার্যকরী। রাষ্ট্রধর্ম বাতিল সংক্রান্ত রিট মামলাটি হাই কোর্টে খারিজ হওয়ার প্রেক্ষিতে নানা মুনি নানা মত প্রকাশ করছেন। ধর্ম যেখানে ইস্যু, দৃষ্টি সেখানে আচ্ছন্ন হতে বাধ্য। সেদিকে না তাকিয়ে প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতের বাবরি মসজিদ-রাম জন্মভূমি মামলার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে পারি।

উগ্র হিন্দু করসেবকদের দ্বারা ১৯৯২ সালে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার আগে সেটি ৫০০ বছর অযোধ্যার এক পাণ্ডববর্জিত এলাকায় দণ্ডায়মান ছিল। ভগবান রামের জন্মভূমি অযোধ্যা হিন্দু ধর্মালম্বীদের জন্য পবিত্র স্থান। সেখানে মসজিদটির নির্মাণ বৈধ, না অবৈধ সেটা নিয়ে বিতর্ক শুরু করা হয় বিট্রিশ শাসনের শেষ দিক থেকে। ১৯৪৯ সালে প্রথম সেখানে মসজিদের ভিতর একটি বিগ্রহ স্থাপন করা হয়।

এরপর কোর্টের স্থগিতাদেশে সেখানে বড় ধরনের কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা হয় নি। তবে, নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পূজা-অর্চনা চলছিল। রাজীব গান্ধির মৃত্যুর পর ভারতে একটি রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়। সেই শূন্যতা পূরণে তৎপর হয়ে ওঠে ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলি। মূলত বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে রাম মন্দির নির্মাণের দাবিকে সামনে নিয়েই নতুন রাজনৈতিক শক্তি বিজেপির আবির্ভাব হয়। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ সকলেরই জানা। উপমহাদেশে জুড়ে তার অভিঘাত পড়ে। হাজার হাজার নিরীহ মানুষ হত্যা হয়, অসংখ্য ধর্মীয় স্থাপনা ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয। তবে ১৯৪৯ সালে শুরু হওয়া বাবরি মসজিদের মালিকানা নিয়ে মামলাটি চলতে থাকে।

২০১০ এর অক্টোবরে এলাহাবাদ হাই কোর্টে তিন সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ বাবরি মসজিদ ও তৎসংলগ্ন এলাকা নিয়ে একটি রায় দেয়। বিচারপতি সুধির আগারওয়াল, বিচারপতি ডি ভি শর্মা এবং বিচারপতি এস ইউ খানের বেঞ্চ একটি বিভক্ত রায়ে সম্পত্তিটি তিন ভাগে বিভক্ত করে দুই ভাগ দু’টি হিন্দু ধর্মীয় সংগঠন নির্মোহি আখড়া ও রামলালাকে বরাদ্দ করে এবং একাংশ দেওয়া হয় মামলার বিবাদী সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডকে।

৪০০০ পৃষ্ঠার এই রায়টিতে অনেকগুলি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় রয়েছে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনের স্বাক্ষ্য ও সাহায্য নেওয়া হয়েছে। তদন্ত ও অনুসন্ধান নিয়ে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগেও চরম অনৈক্য দেখা দেয়। ফরেনসিক রিপোর্টের বিশুদ্ধতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বলা বাহুল্য, ঐতিহাসিক ও গবেষকদের একদল চরম ধর্মানুরাগের পরিচয় দেন।

বার বার বিশেষজ্ঞ পরিবর্তন ও এবং তাদের মনোনয়নকে ঘিরে বিতর্ককে দেখলেই এ সংক্রান্ত উত্তেজনার গভীরতা উপলব্ধি করা সম্ভব হবে। ভারতীয় ইতিহাস কংগ্রেস Indian History Congress (IHC) এর সর্বশেষ ডিসেম্বর, ২০১৫ এর রেজুলেশন দেখলেই আমরা সঙ্ঘ পরিবারের দলীয় ঐতিহাসিকদের সাথে পেশাদার ইতিহাসবেত্তাদের দৃষ্টির পার্থক্যটা বুঝতে পারব।

ঐতিহাসিকদের একাংশের পার্টিজান ভূমিকার কারণ সহজেই অনুমেয়। কিন্তু আসল মজা আছে বিচারকদের রায়ে। রায়ের সর্বসম্মত অংশে তারা ‘বিশ্বাস’-কে রাম জন্মভূমি প্রশ্নের প্রধান ভিত্তি হিসেবে মেনে নেন। এবং সেই ভিত্তিতে বাবরি মসজিদের ঠিক কেন্দ্রিয় মিনারটির নিচেই ভগবান রামের জন্ম এই ডিক্রিও তারা জারি করেন। স্বভাবতই ৭০ একর জমির সবচেয়ে স্পর্শকাতর এলাকা, সেই মসজিদ ও তার কেন্দ্রিয় মিনারটার মালিকানা দেওয়া হয় সেখানকার দখলদারদের হাতে। অবশ্য তিন বিচারপতির পর্যবেক্ষণে কিছু ভিন্নমতও আছে।

বিচারপতি শর্মার মতে, বাইরের চত্বর এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদের ভিতরের এলাকা দু’টাই পূজারিদের প্রাপ্য। বিতর্কিত এলাকাটি (কেন্দ্রিয় মিনারের নিচের ভূমি) যে ভগবান রামের ‘নিখুঁত জন্মভূমি’ এ নিয়ে তার ন্যুনতম সংশয় নেই।

বিচারপতি আগারওয়ালের মতে, ‘কেন্দ্রিয় মিনারের নিচে বিতর্কিত ভূমিটি হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী ভগবান রামের জন্মভূমি।’

(area covered under the central dome of the disputed structure is the birthplace of Lord Rama as per faith and belief of Hindus.)

যদিও এই ধরনের ধারনার সাথে বিচারপতি খান একমত হন নি, তিনিও কেন্দ্রিয় মিনারটির নিচের ভূমি হিন্দুদের বরাদ্দ করার চূড়ান্ত ডিক্রি প্রদান করেন। তিনি তার রায়ে লেখেন, “১৯৪৯ সালের কয়েক দশক আগে থেকে হিন্দুরা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, ভগবান রামের জন্মস্থানটি ঠিক কেন্দ্রিয় মিনারের নিচেই অবস্থিত।”

ডিক্রি সংক্রান্ত আলোচনার বাইরে বিচারপতি খান বহু ইতিহাস ও ঘটনা পরম্পরার উদ্ধৃতি দেন। তিনি ইসলামের ইতিহাসের ঐতিহাসিক হুদায়বিয়ার সন্ধির উদাহরণ টানেন। ছয় হিজরিতে (৬২৮ খ্রিস্টাব্দ), মক্কার অদূরে হুদায়বিয়া নামক স্থানে মুসলমান হজযাত্রীদের হজ না করে আপসরফা করে ফিরে যাওয়ার ঐতিহাসিক ঘটনাটি তিনি উল্লেখ করেন একটি শুভ চিন্তা ও ব্যক্তিগত কৈফিয়ৎ হিসেবে। তিনি এই রায়টিকে ভবিষ্যত ভারতের শান্তির জন্য ক্রয় করা এক দলিল হিসেবে দেখতে অনুরোধ করেন।

বিষয়টা কী দাঁড়াল? ২০১০ সালে মামলাটির রায়ের দুই দিন আগে আমি ভারতে অবকাশ শেষে দেশে ফিরি। রায়টিকে ঘিরে কিছু আতংক ছিল। রায়ের পর কোলকাতার মুসলমানদের মধ্যে স্বস্তির একটি ছাপ দেখতে পাওয়া যায়। এর মধ্যে ভারতে, পাকিস্তানে ও বাংলাদেশে অনেক জল গড়িয়েছে।

গত ডিসেম্বরে সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের নেতারা রামলালা নেতাদের সাথে ৭০ একরের বিতর্কিত এলাকাটি ভাগ করে আপসে মসজিদ ও মন্দির নির্মাণের বিষয়ে অনেকদূর ঐক্যমতে পৌঁছেছেন। হিংসা সৃষ্টির উপাদান হিসেবে বাবরি মসজিদ ইস্যুর গুরুত্ব হ্রাস পেয়েছে। সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে নিয়ে আসা হয়েছে, গো-মাংস। আর দৈনন্দিন বিবাদের বিষয় তো আছেই। আজকে, বাংলাদেশের হাইকোর্টে রাষ্ট্রধর্ম সংক্রান্ত মামলাটিকে আমি দেখছি এলাহাবাদ হাই কোর্টের বিচারকদের চশমা দিয়ে। এত উত্তপ্ত একটি মামলায় এলাহাবাদ হাই কোর্টের সম্মানিত বিচারকরা কেবল পেশাদারি বিচারকের জায়গায় নিজেকে আবদ্ধ রাথতে পারেন নি।

তারা ভারতীয় সংবিধান ও তাদের শপথের সাথে কোনো বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন কি না সেটা বলার মত যোগ্যতা আমার হয় নি। বাংলাদেশের বিচারকরা কতটুকু পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন সেটাও আলোচনা করবে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ।

তবে, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ যে আমাদের কাছে একটি বোঝা তা দৃশ্যমান হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—