বেগম খালেদা জিয়া এখন কারাগারে। বাস্তবতা তাই। ফলে তা এড়িয়ে কথা বলা যাবেনা। যারা এই মামলার রায়ের ব্যাপারে নাখোশ তাদের কথাই বলি আগে। মামলাটির মেরিট বিবেচনা করেছেন আপনারা? কীভাবে এই মামলার রায় তাঁর দিকে যাবে? আসামী বা মামলার সাথে জড়িত থাকা মানুষগুলোর কথা ভাবুন একবার।

এরা যখন সরকারে ছিলো তাদের ভূমিকা ভাবুন একবার। কথায় আছে সন্তান যদি মানুষ না হয়, তবে তার দায় মা বাবাকেই পোহাতে হয়। যারা সরকারে থাকেন বা গদিতে বসেন তাদের কাছে সন্তান তুচ্ছ হতে হয়। সে কাজটা করেননি বেগম জিয়া। শুধু করেননি বললেই হবেনা তাঁর গুণধর পুত্র ঢাকার রাজপথে যে হত্যালীলা চালিয়েছিল তাতে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির স্ত্রী উড়ে গিয়েছিলেন, ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।

সে সময় তাদের সরকার সেই অপকর্ম ঢাকার জন্য জজ মিয়া নাটকের অবতারণা করেছিলেন। সে নাটক টেকেনি। যাই হোক । মূলকথা হলো এই মামলার প্রমাণ ও সাবুদে খালাস পাওয়ার আসলে কোন কারণ ছিলোনা।

আর একটা বিষয় বিএনপি ভুলে যাচ্ছে। এই মামলাটি  হয়েছিল এক এগারোর সময়। সেই সময় আওয়ামী লীগ সরকারে ছিলো না। বরং সেসময় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছিল। সবাই জানেন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো ধোপে টেকেনি। তাঁর ঘুষ নেবার ঘটনা বা টাকা নেয়ার যে গল্প সেগুলো ক্রমেই উবে যায়।

এধরণের অভিযোগ থাকলে খালেদা জিয়াও নিশ্চয়ই ফেঁসে যেতেন না। তাঁর ফেঁসে যাওয়া একদিনের ঘটনা না। বহু বছর ধরে বহু ঘটনা, আদালতে যাওয়া না যাওয়া, আইনজীবীদের বাহাস- সব হয়েছিল। সুযোগ ছিলো অভিযোগ খণ্ডনের। সরকারের চাপ এড়িয়ে ও সত্য প্রমাণ করা যেতো। কিন্তু না পারার কারণ কী? সেটা কেন বুঝতে চাচ্ছেন না তারা? মনে আছে যখন পরিবেশ একটু গরম আর মাঠ উত্তপ্ত হয়েছিল তখন তারা গঠনমূলক পথে না গিয়ে জ্বালাও-পোড়াও আর মানুষ মারার পথ বেছে নিয়েছিল। সে উদ্দেশ্য বা সেই  অভিযান মানুষের মনে সাময়িক ভয় জাগালেও শেষ পর্যন্ত টিকেনি। না টিকবার কারণও তারা জানেন।  ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বার্ন  ইউনিটের সেই অসহ্য দৃশ্য মানুষ ভোলেনি।

মূলত দীর্ঘসময় ধরে বিএনপির মোটিভেশন প্রক্রিয়া কাজ করেনি জনমনে। কারণ মানুষ এখন রাজনীতি বিমুখ। এই বিমুখতার কারণগুলো বিশ্লেষণ করলেও তারা সমাধানের পথ পেতেন। করেননি বলেই আজ রিজভী সাহেবকে ফুঁপিয়ে কাঁদতে হয়েছে। ম্লানমুখে ফিরতে হয়েছে মীর্জা ফখরুলসহ অন্যান্যদের।

আমরা সবাই জানি একধরনের এককেন্দ্রিকতা চলছে দেশে। এখন যেটা বুঝতে হবে সেই অচলায়তন আর এই মামলা একসূত্রে গাঁথা কি না? গাঁথা হলেও বিএনপি সেটা প্রমাণ করতে পারেনি। তাদের বদ্ধমূল ধারণা মানুষ তাদের সাথে আছে। কোন মানুষ? এটা মানি দেশের প্রান্তিক শ্রেণী নামে পরিচিত গরীব ও সাধারণ মানুষের মনে বিএনপির একটা বিশেষ জায়গা আছে। কিন্তু তারা তো রাজনীতি বোঝেন না। তাদের মনে যে ভারতভীতি, তাদের অন্তরে যে আওয়ামী বিরোধিতা কিংবা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সংশয় সেটা কি শুধু কথা আর গায়ের জোরে ব্যবহার করা সম্ভব? খালেদা জিয়া একলা হবার পথ মূলত নিজেই তৈরি করেছেন। তাঁর আপোসহীন ভূমিকা বা মনোভাব এককালে খুব কাজে আসতো। কারণ তখন সরকারে ছিলো এরশাদ।

এরশাদ একজন সামরিক শাসক। তাঁর কোন দল ছিলোনা। গদিতে বসে দল বানানো আর সে দল নিয়ে দেশশাসন আইয়ূব খান করেছিলেন।  নয় বছর পর তাঁকে হটিয়ে দিয়েছিল জনগণ। এরশাদ ও নয় বছরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু যে ড্যামেজ এরশাদ করে দিয়ে গেছেন তার ভুক্তভোগী মূলত বিএনপি। তাদের গঠন আদর্শ এবং পথ প্রায় একধরনের। তফাৎ ছিলো কেবল মুখের। সেই মুখ হিসেবে এরশাদের যে গ্রহণযোগ্যতা বা ভূমিকা সেটি অনেক জায়গায় বিএনপির বিকল্প হবার কারণ মানুষ একসময় এ দুই দলের ভেতর আর কোন ফারাক দেখেনি। আর আওয়ামী লীগের বড় প্লাসপয়েন্ট তাদের অতীত। তাদের ইতিহাস।

যাদের মাথার ওপর বঙ্গবন্ধু ও তাজ উদ্দিনের মত নেতার ছায়া আছে তাদের অনেক দোষ এমনিতেই ঢাকা পড়ে যায়। তারা সরকারে থেকে এখন ভালো খেললেও আসলে আওয়ামী লীগ মাঠের দল। আর সেই মাঠ তারা কোনদিন ছাড়েনি। অন্যদিকে বিএনপি মাঠে কতটা দুর্বল আর অগোছালো তা বিরোধী দলে আসলেই বোঝা যায়। বেশ কিছুসময় সরকারের বাইরে থাকার ফলে তাদের অঙ্গ সংগঠনগুলো ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে।

শীর্ষ নেতাদের মুখের দিকে তাকান। কে বিশ্বাস করবে  মওদুদ আহমেদকে? তাঁর জন্মলগ্ন থেকে আজ অবদি রাজনীতি হচ্ছে দলবদলের। আনুকূল্য আর তোষামোদীতে ব্যস্ত নেতারা এখন তাই মাইক্রোফোন সর্বস্ব।  ধারণা করি সরকারে থাকার সময় একধরণের নিশ্চয়তাবোধ আর গ্যারান্টি বিএনপিকে এমন জায়গায় এনে ফেলেছে যখন তার আসলে পয়েন্ট অফ নো রির্টানে থাকাটাই নিয়তি ।

তারপরও আমরা মনে রাখবো। খালেদা জিয়া এদেশের কয়েক দফা দেশশাসনে থাকা প্রধানমন্ত্রী। তাঁকে সম্মান জানানো ফরজ। যেসব মিডিয়া ‘খালেদার পাঁচ বছরের জেল’ এই শিরোনামে খবর করেছে, তাদের জন্য করুণা হয়। কারণ কোনদিন যদি আবার তাঁর ভাগ্য ফেরে এরাই তাঁকে দেবীর আসনে বসাবে। এখন সামাজিক মিডিয়া বিশাল গুরুত্ববাহী। সেখানে যৌক্তিকভাবে কথা বলার মানুষ বিএনপির খুব একটা নাই।

কারণ তাদের আমলে তারা দেশ মুক্তিযুদ্ধ আর ইতিহাস নিয়ে এমন সব কথা বলেছে যা মানুষ নিতে পারেনি। তাদের আমলে রাজপথে যেসব হামলা হতো বা আইনকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল মানুষ তাও মনে রেখেছে। একজন আমাকে ঠাট্টা করে বলছিলেন, রায় কেমনে তাদের বিরুদ্ধে যায়? আমি বললাম কেন? তার উত্তর যে দলে গয়েশ্বর রায় থাকে রায় তো তাদের দিকে যাবার কথা। এই শ্লেষেও সত্য আছে। গয়েশ্বর রায়ের মত নেতারা অহেতুক মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে তর্ক করেন। যে বিষয় মীমাংসিত তাকে সামনে এনে মানুষের মনে ঘৃণা তৈরি করে বেশীদিন টেকা যায়না।

তারপরও যারা ইনবক্সে কৌতুক করে খালেদা জিয়ার জন্য কান্নারত নেতাদের ছবি পাঠান তাদের একটা কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। এক এগারোর সময় যখন দু নেত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল তখন মানুষের একাংশ মিষ্টি বিতরণ করতেও দ্বিধা করেনি। মানুষ এমনই।

আজ যারা শেখ হাসিনার জন্য মায়াকান্না কাঁদছেন তাই তাদের দেখেও ভয় পাই। এটাতো মানতে হবে খালেদা জিয়া একজন জনপ্রিয় নেত্রী। তিনি বারবার ভোটে দাঁড়িয়ে অনায়াসে জিতে আসেন। তাঁকে ঘিরে থাকা মানুষের চোখে পানি আসতেই পারে। আমরা একমত হবো কি হবো না,  সেটা ভিন্ন বিষয়। কিন্তু কারো দুর্দিনে কৌতুক করা অমানবিক। বাংলাদেশের মানুষের মন এমন তারা কঠিন সময়ে ঐকবদ্ধ থাকে। চরম দুশমনকেও একলা পেয়ে মারতে পারেনা। এই স্বভাব আমাদের প্রকৃতিজাত। কোনভাবেই মানুষকে হিংসাপ্রবণ কিংবা প্রতিশোধপ্রবণ বলা যাবেনা। কিন্তু বিএনপি সুসময়ে সেটা বোঝেনি।

এদিক থেকে বরং বেশী কথা বলা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের খাঁটি কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন এখনো বেশ কয়েকটা স্তর আছে। সেই স্তর মানে উচ্চ আদালত বা আপিলের জায়গাগুলো পার হলে তখন যেন বিএনপি হতাশ হয়। কথাটা ফেলনা না। আইনি লড়াইয়ের জন্য বিএনপিতে আইনজীবীর অভাব নাই। এখন তাদের ক্যারিশমা বা অভিজ্ঞতা ঝলসে উঠুক। কিন্তু তারা যদি সত্যকে চাপা দিতে যান তাহলেই বিপদ।

এদিকে ইতোমধ্যে বিলেতে অঘটনের খবর দেখেছি আমরা। লন্ডনে আমাদের হাইকমিশন অফিস ঘেরাও করে ভাঙ্চুর করে বঙ্গবন্ধুর ছবিকে অপমান করলেই মুক্ত হবেন খালেদা জিয়া? এই অরাজকতা বা এই অরাজকেরা এটা বুঝছেন না, খালেদা জিয়ার জীবনের বড় ভুলগুলোর একটি বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদিনকে অপমান করা।

সেদিন জন্মদিন পালনের যে নাটক এবং ঢাউস সাইজের কেক কাটা, সে কেক ছিলো রক্তমাখা। আজ সেই শোণিতধারার পাপ কাউকে ছেড়ে কথা বলছেনা। তাই এ ধরনের হানাহানি বন্ধ করা দরকার। বিদেশে দেশের রাজনীতি ও দেশের দলবাজী বজায় রেখেছে বড় দুই দল। এর কারণ তারাই ভালো জানেন। এরা বছর ধরে যার যার খুশি মতো রাজনীতির নামে দলবাজী করেন। আর কঠিন সময়ে এভাবে দেশ ও জনকের মতো বিষয়কে অপমান করতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সবাই জানেন লন্ডনে কেন এটা ঘটেছে। এখন এর কারণে তাদের কি র্দুভোগ পোহাতে হয় সেটাই দেখার বিষয়।

খালেদা জিয়া একা জেলে যাননি। উপমহাদেশের বহু বিখ্যাত নেতাদের কপালে কারাবাস জুটেছিল । ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরু পরিবারের সুসন্তান সুদর্শন রাজীব গান্ধীও ফেঁসেছিলেন বোর্ফস কেলেঙ্কারীতে। নেওয়াজ শরীফ ভূগেছেন। ভুগেছিলেন দেশ বিদেশের বহুনেতা। কিন্তু মুক্তির পথ একটাই। ধৈর্য আর সংগ্রাম। খালেদা জিয়া জেলে যাবার মূহূর্ত থেকে আজ পর্যন্ত খালি তিনি কী খাবেন, কোথায় থাকবেন কী সুবিধা পাবেন- এগুলো শুনছি। অথচ নেহেরু জেলে ছিলেন বলে রচিত হয়েছিল ‘লেটারস টু ডটার’ এর মত অসামান্য গ্রন্থ। নেলসন ম্যান্ডেলার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন কারাগার প্রধান।

বঙ্গবন্ধুর জীবনের একটি ঘটনা এমন, তিনি মুক্ত হয়ে বলেছিলেন আমি জানতাম আমার মুক্তির দিন সমাগত। প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছিলেন- তাঁকে যে পত্রিকাটি পড়তে দেয়া হতো তার বিভিন্ন জায়গা থাকতো কাঁচি দিয়ে কাটা। মানে সেগুলো ছিলো তাঁকে নিয়ে, তাঁর মুক্তি নিয়ে চলমান ঘটনার খবর। বঙ্গবন্ধু কৌতুক করে বলেছিলেন, সেই সব ফাঁক দিয়ে প্রথমে একটা দুটো আঙ্গুল বেরুতো। পরে একসময় তাঁর মুখও বেরিয়ে আসতে শুরু করলে তিনি বুঝে গিয়েছিলেন মুক্তি সমাগত।

আমাদের দুর্ভাগ্য তেমন রাজনীতি বা রাজনীতিক আর জন্মায়না দেশে। মানুষ হয়তো একসময় খালেদা জিয়ার বন্দিদশার কথাও ভুলে যাবে। কারণ তার হাতে সময় কম। তবে এটা বলি প্রতিশোধ যেন রাজনীতির নির্ণায়ক হতে না পারে। তাহলে আমাদের জাতীয় ঐক্য বা সমঝোতা কোনদিনও সম্ভব হবেনা।

সরকারী দলের সহনশীলতা আর বিএপনির আত্মশুদ্ধির বাইরে কোনও পথ দেখিনা। এটাও মানতে হবে একদল বসে আছে সুযোগ নিতে। পারুক না পারুক, তারা চায় অসহনীয় পরিবর্তন। তাদের কাম্য সরকারের পদ। সরকারে গিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে। তাদের না পারার অতীত হাতের কাছে থাকলেও আমরা বুঝিনা।

দেশ ও জাতি সবার উপরে থাকলে সবাইকে এখনই এর মর্ম বুঝে সাবধান হতে হবে। খালেদা জিয়া কোনদিন এভাবে জেলে যাবেন, তিনি তো বটেই আমরাও ভাবিনি। কিন্তু রাজনীতিতে সব সম্ভব।

আজ যে রাজা কাল সে ফকির বলেই নজরুল লিখেছিলেন , ‘চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়’। যে পাপ বা যে অতীত আজ এই হাল করেছে তার দিকে ফিরে তাকানো আর শুদ্ধ অভিযানের বিকল্প নাই। মনে রাখতে হবে দেশের পতাকা, সঙ্গীত, শহীদ আর ইতিহাসেরও কিন্তু শক্তি আছে। সময়মত সে তা দেখালেও আমরা বুঝতে পারিনা।

সবার ওপরে বাংলাদেশ- এই সত্যে রাজনীতি যদি প্রতিশোধস্পৃহা ও জঙ্গিবাদ-মৌলবাদ থেকে বেরিয়ে না আসে, কারো জীবনে শান্তি আসবেনা। খালেদা জিয়ার এই কারাবাস কী আবার তাঁকে ফিরিয়ে আনবে? না এই অধ্যায়ের এখানেই ইতি ঘটবে?

অজয় দাশগুপ্তকলামিস্ট।

Responses -- “খালেদা জিয়ার কারাবাস: প্রত্যাবর্তনের পথ আছে, না এই শেষ অধ্যায়?”

  1. Azadi Hasnat

    প্রধানমন্ত্রীর নামে কয়েকশ কোটি টাকার ১৩টি মামলা অটো নিষ্পত্তি করা হয়েছে সরকারি ক্ষমতাবলে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—