লোকসভাতে ভি পি সিং সরকারের উপর আস্থাভোট চলছে। আবেগ মথিত বক্তৃতা দিচ্ছেন গীতা মুখোপাধ্যায়। ধরা গলাতে অনেক কথা ঠিক মতো শুনতেও পাওয়া যাচ্ছে না দর্শক আসন থেকে। কান্নায় বুজে আসছে সাংসদের গলা।লোকসভা জমজমাট। অধ্যক্ষের আসনে উড়িষ্যার সাংসদ রবি রায়।
তিনি একবার ইংরেজিতে, একবার বাংলায় , তো আর একবার হিন্দি, পরেরবারই ওড়িয়ায় আবেদন করে চলেছেন- মিসেস মুখার্জী চুপ করুন। শান্ত হন। গীতা মুখার্জীর গলা যেন আবেগে ততো বুজে আসছে। জাতীয় রাজনীতিকে প্রেক্ষিতে রেখে তাঁর নির্বাচনী এলাকা পাঁশকুড়ার একটি সমস্যাকে তিনি তুলে ধরছিলেন সংসদে।
বক্তৃতা দিয়ে বসলেন গীতা মুখার্জী। দর্শকাসন থেকে দেখা গেল তৎক্ষণাৎ প্রায় ত্রস্ত গতিতে তাঁর দিকে ছুটে গেলেন বিরোধী বেঞ্চ থেকে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। গীতাদির পাশে বসে মৃদু স্বরে তাঁকে কিছু বলছেন, এটা দূরের দর্শক আসন থেকে বোঝা গেল। সংসদের অধিবেশনে তো যা ভবিতব্য , তাইই হলো। পরাজিত হলো ভিপি সিং সরকার। ফেরার পথে গীতাদিকে জিজ্ঞাসা করলাম- হঠাৎ রাজীব গান্ধী পাশে এসে বসে কী বললেন?
একগাল হেসে গীতাদির উত্তর- কি বললেন জানিস, এতো না চ্যাঁচালেই কি চলছিল না? ভুলে গেছো, কদিন আগে হার্টের বড় সমস্যা ধরা পড়েছে? এই বক্তৃতাকে গীতাদি অভিহিত করেছিলেন ‘শেষ বক্তৃতা’ হিসেবে।
বস্তুত পরের নির্বাচনে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবারই ইচ্ছা ছিল না তাঁর। নন্দগোপাল ভট্টাচার্য কার্যত গীতাদির জীবনের শেষ নির্বাচনে খানিকটা তাঁর সঙ্গে ‘আপনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলে আমি রাজনীতি ছেড়ে দেবো’ গোছের হুমকি দিয়ে জীবনের শেষ নির্বাচনে দাঁড়াতে তাঁকে বাধ্য করেছিল। কারণ, ‘৯১ সালে বাইপাস অপারেশনের পর গীতাদির শরীর একদমই ভালো যাচ্ছিল না। তার উপরে নিজের পাঁশকুড়া এবং দলীয় সাংসদ ইন্দ্রজিৎ গুপ্তর খড়গপুর , এই দুটি লোকসভা কেন্দ্রই কার্যত গীতা মুখার্জীকে দেখতে হতো। সাংসদ হিসেবে খ্যাতির শীর্ষে থাকা ইন্দ্রজিৎ গুপ্ত নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র খড়গপুরের জন্যে বিন্দুমাত্র সময় দিতেন না। এই শারীরিক ধকলেই ওভাবেই হঠাৎ আবার গীতা মুখার্জীর ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক এবং সব শেষ।
সাংসদ জীবনের বক্তৃতার ভিতরে এই ‘শেষ বক্তৃতা’কে বিশেষ রকমের গুরুত্ব দিতেন গীতা মুখার্জী, যেমনটা গুরুত্ব দিতেন বিধায়ক হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভাতে দেওয়া ফারাক্কা বাঁদের ওপর দেওয়া একটি বক্তৃতাকে। ‘শেষ বক্তৃতা’র বিষয়টি গীতা মুখার্জীর নির্বাচনী কেন্দ্র পাঁশকুড়ার এক মহিলার হার্ট অপারেশনের জন্য বরাদ্দ কেন্দ্রীয় সাহায্য নিয়ে গড়িমসি সংক্রান্ত হলেও বক্তৃতাটির অন্তনির্হিত বক্তব্য ছিল কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক।  
ছোটবেলার শিক্ষিকা পারুল নন্দীর সাথে গীতা মুখার্জী
কেন্দ্রে বন্ধু সরকার ক্ষমতাসীন থাকা স্বত্ত্বেও সমস্ত রকম সরকারী নিয়ম মেনে আবেদন করার পরও একজন হার্টের রোগীর চিকিৎসার জন্যে বরাদ্দ টাকা পাঠাতে কেন্দ্রের টালবাহনার ভিতর দিয়ে গীতা মুখার্জী সেদিন বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় সরকার, তার রাজনৈতিক বিন্যাস শক্তপোক্ত বা নড়বড়ে যাই হোক না কেন, যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামো রক্ষার ক্ষেত্রে কেন্দ্রের সদিচ্ছার অভাবটা কোথায় লুকিয়ে রয়েছে। গীতা মুখার্জীর সেদিনের সেই ভাষণের প্রাসঙ্গিকতা আজও তাই হারিয়ে যায়নি।
আজও বহু রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকেই, বিশেষ করে তিনি যদি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের লোক না হন, তাঁকে এই ফেডারেল স্ট্রাকচার নিয়ে সরব হতে দেখা যায়।মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে মানিক সরকার- সকলের ক্ষেত্রেই এই ঘটনা ঘটে চলেছে। গীতা মুখার্জী সেদিন এই যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর পরিপূর্ণ মর্যাদা দেওয়ার কথাই লোকসভাতে আবেগ মথিত কণ্ঠে বলেছিলেন।
কেবল রাজীব গান্ধী নয়,  মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে সেই সময়ের বিজেপি সাংসদ দীপিকা চিকলিয়ার সঙ্গে এমনটাই ছিল গীতা মুখার্জীর সম্পর্ক। সঙ্কীর্ণ দলীয় রাজনীতির উর্ধ্বে উঠে গীতাদি যেভাবে সকলের হয়ে উঠতে পেরেছিলেন তা বামপন্থী শিবির তো বটেই, অবাম শিবিরেরও কেউই এমনভাবে সর্বজনমান্য এবং সর্বজনগ্রাহ্য হয়ে উঠতে পারেন নি। সংসদের সেন্ট্রাল হলে এই দৃশ্য প্রায়ই দেখা গেছে যে- গীতা মুখার্জীর অত্যন্ত সাধারণভাবে পড়া , কিছুটা ধোপদুরস্ততাহীন শাড়িটা নিজের হাতে পরিপাটি করে দিচ্ছেন বিজেপি সাংসদ দীপিকা চিকলিয়া।
গীতাদি বলতেন- একমাত্র রাজমাতা বিজয়রাজে সিন্ধিয়া ছাড়া প্রত্যেকের সঙ্গে দলমতের উর্ধে উঠে আমার একটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক আছে। বিজয়রাজের দাম্ভিকতা আর আদভানির ‘শ্রুডনেস’-কে মন থেকে অপছন্দ করতেন গীতা মুখার্জী।
বাইপাস সার্জারি হবে গীতা মুখার্জীর। রাজনৈতিকভাবে ও আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় নানা টানাপড়েন। উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরুর মুখে। গীতা মুখার্জী প্রথমে ভর্তি হলেন অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সাইন্সে। অগ্রজাপ্রতিম গীতাদির বাইপাস হবে শুনে ছুটে এলেন রাজীব গান্ধী। প্রায় পয়তাল্লিশ মিনিট রইলেন গীতাদির ঘরে।
উপসাগরীয় যুদ্ধ  থেকে বিশ্বনাথ মুখার্জীর স্বাস্থ্য- সব নিয়ে প্রাণখোলা আলোচনা হলো। কী অপূর্ব ছিল সেদিন দেশের জাতীয় রাজনীতির সৌজন্যের আবহাওয়া। বিদায় নেওয়ার আগে রাজীব ব্যক্তিগতভাবে গীতা মুখার্জীর চিকিৎসার যাবতীয় ব্যয়ভার পর্যন্ত বহন করতে চেয়েছিলেন। এমনটাই ছিল ব্যক্তি রাজীব গান্ধীর ব্যক্তি গীতা মুখার্জীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।
তবে এআইআইএম এসে শেষ পর্যন্ত গীতা মুখার্জীর বাইপাস অপারেশন হলো না। সেখানে উনি চিকিৎসক কলের তত্ত্বাধানে ছিলেন।অজানা কারণে কল একটু খারাপ ব্যবহার করলেন গীতাদির সঙ্গে। পত্রপাঠ সেই হাসপাতাল ছেড়ে বেরিয়ে চলে এলেন গীতাদি। ভর্তি হলেন এসকর্টসে ডাঃ নরেশ ত্রেহানের তত্ত্বাবধানে। অপারেশনের পরও রাজীব গান্ধী এসেছেন তাঁর গীতাদিকে দেখতে। সেবারও গীতাদির কেবিনে একান্তে তাঁর প্রিয় গীতাদির সঙ্গে প্রায় ঘণ্টা দেড়েক। সেই বছরই অক্টোবরে মারা গেলেন বিশ্বনাথবাবু। ভারতের ছাত্র আন্দোলনের ওই কিংবদন্তী মজা করে বলতেন- জানিস, তোর গীতাপিসির দাঁত দেখে আমি প্রথম ওঁর প্রেমে পড়েছিলাম!
ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর কলকাতার রাস্তায় দাঙ্গা রুখতে গীতা মুখার্জীর এক অনন্য সাধারণ মানবী রূপ আমরা দেখেছিলাম। সামগ্রিকভাবেই বামপন্থীরা সেদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন দাঙ্গা রুখতে। তবুও গীতাদি যেন ছিলেন একটু বেশি রকমের অন্য রকমের। কোনো প্রচার মাধ্যমের আলোর সামনে নয়, যেভাবে ‘৯২ এর ৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকেই তিনি মধ্য কলকতার ট্যাংড়া অঞ্চলে একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তাঁর সেই সাহস, মমতা, ধৈর্য, স্নেহ- কোনো শব্দ দিয়ে তাকে প্রকাশ করা সম্ভবপর নয়।
ওই সময়কালে ট্যাংড়ার বেঙ্গল পটারিজ তুলে দেওয়ার প্রতিবাদে রাজনৈতিক আন্দোলন চলছে। গীতাদির দল সিপিআই যেহেতু ওই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত, তাই সেই সময়কালটাকে ওঁর ট্যাংড়া অঞ্চলে একটু বেশিই যাতায়াত ছিল। ঐতিহাসিক বাবরি ধ্বংস হচ্ছে এই খবর পাওয়া মাত্রই অন্য বামপন্থী রাজনৈতিক নেতারা যেভাবে যা উদ্যোগ নিতে শুরু করুন, না কেন অকুতোভয় গীতা মুখার্জী কিন্তু তাঁর গুটিকয় একান্ত অনুগামী, তাঁরা হয়তো সবাই তাঁর রাজনৈতিক দলেরও নয়, তাঁদেরকে নিয়ে পথে নেমে পড়েন।
আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন ছেচল্লিশের দাঙ্গার কথা।কোনো রকম নিরাপত্তার পরোয়া না করে ছুটে যান রাজাবাজার অঞ্চলে সংখ্যালঘু মানুষদের ভিতরে। সেখানে সমস্ত গণতান্ত্রিক শক্তিকে একত্র করে যেকোনো মূল্যে দাঙ্গা রোখার সংকল্প নেন। শীতের রাত।এখনো মনে আছে তাঁর গায়ে একটা ঘিয়ে রঙের কার্ডিগান। তার উপর জড়ানো ছাই রঙের একটা শাল। আমি একটু সকালের দিকে গিয়েছিলাম বলে সোয়েটার পড়ে যাইনি। আমাকে তিনি বাড়ি ফিরতে দিলেন না।বললেন- মাকে ফোন করে দে। আজকে আমার সঙ্গে থাকবি। নিজের শালটা গায়ের থেকে খুলে আমাকে দিয়ে বললেন; পড়ে নে।অমন অপার মাতৃস্নেহের সাক্ষাৎ প্রতিমূর্তি জীবনে গর্ভধারিণী ব্যতীত আর কোথাও পাইনি।
দাঙ্গা রুখতে সে এক অনন্য সাধারণ ভূমিকা গীতা মুখার্জীর। একেবারে ভূমিস্তরের বামকর্মীদের সঙ্গেও যেমন ঠিক তাঁদেরই মতো একজন কর্মী হয়ে সদাসতর্ক প্রহরীর ভূমিকা পালন করছেন, আবার প্রয়োজন মতো সরাসরি যোগাযোগ করছেন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে, তেমন সমন্বয় রাখছেন নিজের দলের নেতৃত্ব কিংবা বাম দলের অন্যান্য নেতৃত্বের  সঙ্গে আবার পরক্ষণেই একটি পরিবারকেও বাঁচাবার সম্ভাবনা দেখা দিলে কোনোরকম দ্বিধা সঙ্কোচ না করে সরাসরি যোগাযোগ করছেন বিরোধীদল কংগ্রেসের নেতৃত্বের সঙ্গেও।
পাঠক মনে রাখবেন, সেদিন কিন্তু আজকের মতো মোবাইল ছিল না আর যোগাযোগ বলতে কেবল নির্ভর করতে হতো ল্যান্ড লাইনের উপরেই। মানুষের স্বার্থে নিজের দল বা বিরোধীদল- কারো সঙ্গেই যোগাযোগ নিয়ে গীতা মুখার্জীর ভিতরে বিন্দুমাত্র ছুৎমার্গ ছিল না।মানুষই ছিল তাঁর কাছে এক এবং একমাত্র অগ্রাধিকার। আর রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভিতরে জ্যোতি বসু ছাড়া গীতা মুখার্জীর মতো সব দলের সব রকমের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বুঝি কী বাম, কী অবাম কোনো রাজনৈতিক দলেরই অন্য কারোর ছিল না।
গীতা মুখার্জীর দল সিপিআই জরুরি অবস্থার সমর্থক ছিল। তবে অনেকেই হয়তো জানেন না যে, ওঁদের দলের জাতীয় কর্মসমিতির যে বৈঠকে জরুরি অবস্থাকে সমর্থনের প্রস্তাব নেওয়া হয়, সেই বৈঠকে ওই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন বিশ্বনাথ মুখার্জী এবং গীতা মুখার্জী। পরবর্তী সময়ে এইচ ডি দেবেগৌড়া সরকারে যোগ দেওয়ার প্রশ্নেও তীব্র বিরোধিতা ছিল গীতা মুখার্জীর। জরুরি অবস্থার বিরোধিতা করলেও দলের প্রতি আনুগত্যের ক্ষেত্রে গীতা মুখার্জীর ভূমিকা ছিল প্রশ্নাতীত। তাই জরুরি অবস্থা নিয়ে মানসিক যন্ত্রনা সয়েও তাঁকে কাজ করতে হয়েছিল জরুরি অবস্থার অন্যতম খলনায়ক বংশীলালের সঙ্গে। এই বংশীলালের সঙ্গে জরুরি অবস্থার সময়ে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে গীতা মুখার্জী তাঁর জীবনের সবথেকে বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা বলে বর্ণনা করতেন। তবে তিনি বিশ্বাস করতেন- বংশীলালের জরুরি অবস্থার সময়কালের বহু দুরভিসন্ধি তিনি নানা কায়দায় আটকে দিতে পেরেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ছিল গীতা মুখার্জীর ঠোঁটস্থ। কীভাবে এটা সম্ভব হলো? মা মরা মেয়ে গীতাকে রবীন্দ্রনাথের সাহচর্য দিতেন বাবা লালু বাবু।তাই ছোটবেলাতেই বাবার মুখে শুনে শুনেই রবীন্দ্রনাথ প্রায় মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল গীতার। কী সংসদে, কী রাজনৈতিক সভায়, কী বিদেশে, কী গুরুগম্ভীর সেমিনারে গীতা মুখার্জী বক্তৃতা করছেন, অথচ রবীন্দ্রনাথ থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছেন না- এমনটা ভাবাই যায় না।জীবনের একদম শেষ দিকে বাইপাস সার্জারির পর বক্তৃতায় রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করতে হলে আগে একবার লিখে নিতেন। মজা করে বলতেন- হার্ট অপারেশন করতে গিয়ে ব্রেনের কলকব্জা বোধহয় গোলমাল করে দিয়েছে। তাই পাছে ভুল না হয়, সেইজন্যে আগে লিখে নিই।
শেষ দিকে তাঁর সংসদে দেওয়া অসংখ্য বক্তৃতার সঙ্গে এইসব রবীন্দ্র উদ্ধৃতি, তাঁর নিজের হাতে লেখা- আমার এক অমূল্য সম্পদ। অনেকেই হয়তো জানেন না শম্ভু মিত্রের নাটকের দলে গীতা মুখার্জীর অভিনয় পর্যন্ত করেছিলেন । ‘বাঁশরী’ ছিল সেই নাটকের নাম।নাটকটি শান্তিনিকেতনে পর্যন্ত অভিনীত হয়েছিল। নাটক দেখে প্রতিমা দেবী বলেছিলেন- ‘এই মেয়ের তো রাজনীতির দলে নয়, শান্তিনিকেতনে থাকা উচিত।’
‘বাঁশরী’ নাটকে কেমন করে পা বেঁকিয়ে হেঁটে অভিনয় শিখিয়েছিলেন শম্ভু মিত্র, গীতা মুখার্জী অনেক বেশি বয়সেও তা আমাদের অভিনয় করে দেখিয়েছিলেন। আমি তাঁর রাজনৈতিক দলের চার আনা সদস্যও নই। বামপন্থায় বিশ্বাসী এক ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে যে প্রশ্রয় তাঁর কাছ থেকে পেয়েছিলাম তা আমার জীবনের এক দুর্লভ সৌভাগ্য।সতীর্থদের সঙ্গে তো বটেই কট্টর বিরোধী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে গীতা মুখোপাধ্যায়ের যে অনাবিল ভালোবাসার সম্পর্ক দেখেছি- তা আজকের দিনে কেমন রূপকথা মনে হয়।
মমতাকে দেখেছি বামপন্থীদের কোনো কথাতে খুব রেগে গিয়ে ঝাঁজালো অনুযোগ করতে তাঁর গীতাদির কাছে।আবার চিরন্তন মাতৃপ্রতিমা স্বরূপ গীতা মুখার্জীকে দেখেছি শান্ত গলায় বলতে- তুই ওসব পাত্তা না দিয়ে নিজের মতো থাক।গীতাদির স্নেহের অনাবিল স্রোতধারাতে কে ছিলেন না? তাঁর ভাসুরজি কল্যাণী মুখার্জী কুমারমঙ্গলমের ছেলে রঙ্গরাজন কুমারমঙ্গলম ( গীতাদির স্নেহের ‘থাম্বি’) থেকে বাম সাংসদ মহম্মদ সেলিম, এঁদের প্রতি তাঁর একটা অপত্যটান ছিল।
গীতা মুখার্জীর জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কাজ হলো সংসদে মহিলা সংরক্ষণ নিয়ে যৌথ সংসদীয় কমিটির সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন এবং মহিলাদের জন্যে ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের সুপারিশ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও এই যৌথ সংসদীয় কমিটির সভা ছিলেন। তিনি মাত্র একদিন এই কমিটির বৈঠকে যোগ দেওয়ায় গীতা মুখার্জী তাঁকে স্নেহের বকুনি ও দিয়েছিলেন। আর মমতাও বোধহয় এই একমাত্র বামপন্থী ব্যক্তিত্ব গীতা মুখার্জী- যাঁকে শুধু শ্রদ্ধাই করতেন না, অন্তর দিয়ে ভালোওবাসতেন। তাই মমতা এনডিএ জামানাতে রেলমন্ত্রী থাকাকালীন শিয়ালদহ স্টেশন থেকে কাটিহার এক্সপ্রেস ( এখন নাম হাটে বাজারে) উদ্ধোধনের সময়ে গীতা মুখার্জীকে কেবল আমন্ত্রণই জানান নি, একসঙ্গে পতাকা নেড়ে গাড়িটির যাত্রা সঙ্কেত দিয়েছিলেন।
এখন কেবলই মনে হয় ম্যারি হপকিন্সের সেই গান- ‘দাউ দ্যাট ডেইজ হাজ গন।’ গীতা মুখার্জীর স্বপ্ন ছিল ৩৩ শতাংশ মহিলা সংরক্ষণ সংসদে।নিষিদ্ধ পল্লীর মহিলারা এই বিলের দাবিতে তাঁকে রক্ত দিয়ে চিঠি লিখেছিলেন। গীতা মুখার্জীর সেই স্বপ্ন কি স্বপ্নই থেকে যাবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—