Feature Img

tanvir-fবিডিনিউজের ৭ই মের খবরে দেখলাম রাজউক গুলশানে অবস্থিত শিশু-কিশোরদের বিনোদন পার্ক ‘ওয়ান্ডারল্যান্ড’ ভেঙে ফেলতে শুরু করছে। রাজউকের মেজিস্ট্রেট বিডিনিউজকে বলেছেন, “এটা রাজউকের জায়গা। সবার জন্য উন্মুক্ত শিশু পার্ক করার জন্য ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে বরাদ্দ দিয়েছিলো। কিন্তু এই নিয়ম না মেনে সিটি কর্পোরেশন বেসরকারিভাবে লিজ দেয়।”

ঢাকা শহরে নিয়ম বহিভূর্তভাবে যে অগণিত স্থাপনা রয়েছে এবং সুষ্ঠু নগর পরিকল্পনার স্বার্থে সেগুলো যে ভেঙে ফেলা প্রয়োজন তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু এত এত অবৈধ ভবন-দালানকোঠা বাদ দিয়ে পার্কের মতো খোলা জায়গা যখন রাজউকের ভাঙচুরের তালিকায় অগ্রাধিকার পায়, তখন সেটা বেশ অবাক করার মতো ঘটনা বটে। ১৯৯০ সালে ওয়ান্ডারল্যান্ড কাজ শুরু করে এতদিন কীভাবে টিকে ছিলো সে প্রশ্নও আমাদের মনে আসে বৈকি। খবরে আরও যেটা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তা হলো- রাজউক জমি ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে লিজ দিয়েছিলো, সিটি কর্পোরেশন নিয়ম না মেনে বেসরকারীভাবে পার্ক করার জন্য লিজ দেয়ায় তারা তা ভেঙে ফেলতে শুরু করছে। অর্থাৎ এখানে রাজউকের কর্তৃত্ব ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের চেয়ে বেশি।

আমি নগর পরিকল্পনায় সামান্য পড়াশোনা এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ ও থাকার সুবাদে দেখেছি যে একটি শহরে নগর কর্তৃপক্ষের হাতেই সাধারণত নগর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ভার নিয়োজিত থাকে। সেখানে ঢাকা শহর (বাংলাদেশের অন্য বড় শহরগুলোরও প্রায় একই অবস্থা) একমাত্র ব্যতিক্রম। এখানে সিটি কর্পোরেশনের ওপর কর্তৃত্ব করে রাজউক! একটা শহরে নগর কর্তৃপক্ষকে সহায়তার জন্য রাজউকের মতো পরিকল্পনা ও উন্নয়ন সহযোগী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থাকতেই পারে। কিন্তু তাদের কাজগুলো হওয়া উচিত নগর কর্তৃপক্ষের সাথে সমন্বয় করে, তাদের পাশ কাটিয়ে নয় এবং তাদের কাজের জন্য নগর কর্তৃপক্ষের কাছেই দায়বদ্ধ হওয়া উচিত। রাজউকের মতো একই শহরে নগর কর্তৃপক্ষের প্যারালাল কোন নগর প্রতিষ্ঠান পৃথিবীর আর কোন শহরে আছে কিনা আমি জানি না।

টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩ এর যে ধারায় ডিআইটি বা রাজউক সৃষ্টি হয়েছিল, সেখানে ডিআইটিকে মূলত একটি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (development authority) হিসেবে গঠন করা হয়েছিল। ১৯৫৮ সালে আইন সংশোধন করে এর উপর পরিকল্পনার (planning) ভার ন্যস্ত করা হয়। কিন্তু সে অনুযায়ী এর প্রাতিষ্ঠানিক কোন পরিবর্তন আজও করা হয় নি! ফলে কোন প্রাতিষ্ঠানিক এবং কাঠামোগত সংস্কার ছাড়াই (পরিকল্পনার ক্ষেত্রে) ঢাকা মহানগরীর পরিকল্পনা প্রণয়ণ, উন্নয়ন এবং বিল্ডিং নিয়ন্ত্রণের জন্য রাজউক একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী সংস্থা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এতগুলো দায়িত্ব একসাথে নিলেও রাজউক তার আগের মূল দায়িত্ব অর্থাৎ ভূমি বা প্লট উন্নয়নের দিকেই বেশী মনোযোগী। ফলশ্রুতিতে রাজউক খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আমাদের এ পর্যন্ত যে সব মাস্টার প্ল্যান উপহার দিয়েছে তার সিকিভাগও বাস্তবায়ন হয় নি। পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দিকটি উপেক্ষা রেখে প্লট উন্নয়ন এবং বিল্ডিং নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে রাজউকের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ রয়েছে।

রাজঊক বা ডিআইটির সম্ভাব্য এ পরিণতির কথা উপলব্ধি করে স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি অর্ডিন্যান্স ১৯৭৪’ পাস করা হয়েছিল, যেখানে ডিআইটিকে সরিয়ে ‘কলকাতা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’র মত আরও অধিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্থা গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্ত্ত রাজনৈতিক ডামাডোলে পড়ে এ অধ্যাদেশটি কালক্রমে বিলুপ্ত হয়ে যায়। ১৯৮১ সালে কনসালটেন্ট প্রতিষ্ঠান শাঙ্কল্যান্ড কক্স ‘ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড প্ল্যান’-এর যে রিপোর্ট প্রকাশ করে তাতে ঢাকা মহানগরীর পরিকল্পনা ও উন্নয়নের জন্য দুটি পৃথক সংস্থা গঠনের সুপারিশ করা হয়। এর একটি ছিল ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’, যা ডিআইটিকে সরিয়ে ভূমি উন্নয়ন এবং নিয়ন্ত্রণ করবে। অন্যটি ছিল ‘ঢাকা মেট্রোপলিটন প্ল্যানিং অথরিটি’- যার কাজ হবে পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, নাগরিক সুবিধা প্রদানকারী বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং ভূমি উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণের কাজ তদারকি করা। কিন্ত্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ রিপোর্ট কখনো গৃহীত হয় নি।

যে উদ্দেশ্য নিয়ে রাজউক গঠন করা হয়েছিল তা আজ মোটামুটিভাবে ব্যর্থ বলা যায়। এর সমাধানে ‘ঢাকা ইন্টিগ্রেটেড প্ল্যান’(১৯৮১)-এর রিপোর্টে ঢাকা মহানগরীর পরিকল্পনা (planning) ও উন্নয়নের (development) জন্য পৃথক দুটি কর্তৃপক্ষ গঠনের যে পরামর্শ দেয়া হয়েছে, তা বিবেচনা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে নতুন আর কোন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি না করে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনকে মহানগরীর পরিকল্পনা এবং রাজউককে সিটি কর্পোরেশনের তদারকিতে শুধু উন্নয়নের ভার দেয়া যেতে পারে। সিটি কর্পোরেশনগুলোর জনবল ও দক্ষতাও সেভাবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।

ড. তানভীর ইসলাম: নগর পরিকল্পনাবিদ ও সহকারী অধ্যাপক, জ্যাকসনভিল স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র।

Responses -- “রাজউকের কর্তৃত্ব এবং আমাদের নগর পরিকল্পনা”

  1. সুমন রহমান

    রাজউক সরকারি প্রতিষ্ঠান হলেও শুধুমাত্র লাভজনক-মুখরোচক কাজ (প্লট / ফ্ল্যাট) করতে এবং সময়ের জনপ্রিয় কাজ (কখনও পাকিং লট, কখনও অনস্ট্রীট পাকিং, …) করে বাহবা কুড়ানোর চেষ্টা করে। বেসিক প্লানিং ও প্লান বাস্তবায়নের কাজ থেকে অনেক দূরে থাকে…………. । আবাসন পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের জন্য এন-এইচ-এ; এইচ-এস-ডি; এ সব প্রতিষ্ঠান কেবল কাগজেই রয়েছে।

    Reply
  2. শেখ মোহাম্মাদ এজাজ

    মন্তব্য:
    ১। লেখককে তথ্য সম্বলিত প্রয়োজনীয় বিষয়টি নিয়ে লেখার জন্য ধন্যবাদ।

    ২। জমির মালিক যদি রাজউক/জনগণ হয় তাহলে তার উচিৎ সিটি কর্পোরেশন এর বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ (Breach of Lease contract) দায়ের করা (যদি না এর মধ্যে Lease term শেষ হয়ে থাকে)। রাজউক এ ব্যপারটি পাশ কাটিয়ে কেন আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ ওয়ান্ডারল্যন্ডেকে দোষী বানিয়েছে তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। Electronic media তে প্রকাশিত খবরে কিছু তথ্য অজানা রয়ে গেল।

    ৩। মনে হচ্ছে রাজউক এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ উভয়ে কিছু জনগুরুত্বপূর্ণ তথ্য যথাযথ ভাবে জনগণকে অবহিত (Public consultation/Public notice) করছেনা । উচ্ছেদ সংক্রান্ত ব্যাপারে কোন পরিস্থিতিতে কী কী আইন কখন প্রয়োগ করা হচ্ছে তা জানা প্রয়োজন।

    ৪। জনগন/রাজউক এর জমি কাকে কিভাবে কী কী শর্তে লিজ দেয়া হচ্ছে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়া প্রয়োজন। জনগনের জমি লিজ দেয়া না দেয়ার ব্যপারে যথাযথ ভাবে Public consultation/Public notice করা/দেয়া হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা দরকার।

    ৫। ঢাকা শহরসহ অন্যান্য বড় শহরগুলোতে যথাযথ/টেকসইভাবে ভুমি উন্নয়ন/ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উন্নয়ন সংস্থার(রাজউক, কেডিএ ইত্যাদি) প্রয়োজনীয় ক্ষমতা (regulatory compliance) বৃদ্ধি করত: টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট-১৯৫৩ কে পূণ:সংশোধন করা প্রয়োজন।

    Reply
  3. MAU Masud

    শুধু তা নয়, রাজউক একটি রেগুলেটরি বডির মতো কাজ করছে।

    Reply
  4. সুলতান

    তানভীর ভাই,
    আপনার মতো চিন্তা করার সময় কি আমাদের সরকার বা সরকারী কর্মকর্তাদের আছে? তারা আছে নিজেদের নিয়ে। বাংলাদেশে নগর পরিকল্পনাবিদদের অবস্থা যেমন সঙ্গীন, নগর পরিকল্পনার অবস্থাও আরও করুন। ডেভেলপমেন্ট অথিউরিটি গুলোতে টাকা দিয়ে অথবা সিস্টেম করে সব প্লান পাশ করা যায়। মাস্টার প্লান বলেন আর ড্যাপ বলেন সবই আছে শুধু দেখানোর জন্য।

    Reply
  5. এ.কে.এম ওয়াহিদুজ্জামান

    তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আজম খানের উদ্যোগে রবার্ট ম্যাকফারলেন কে দিয়ে ১৯৫৮ সালে যে মাস্টার প্ল্যান করানো হয়েছিলো সেটির ওপর প্রথম আঘাত করে ডিআটি (বর্তমান রাজউক)। সেই মাস্টার প্ল্যানে নবাবপুর রোড সোজা উত্তরদিকে প্রলম্বিত হবার কথা ছিলো। কিন্তু পুরাতন বৃটিশ সেনানিবাস এলাকায় (পল্টন) আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা মোহাজের শিল্পপতিদের বেশ কিছু বাড়ি তাতে ভাঙ্গতে হতো। এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এলেন তৎকালীন ডিআইটি চেয়ারম্যান মাদানী সাহেব। রাস্তা বন্ধ করে তৈরী হলো বায়তুল মোকাররম মসজিদ। অর্থ যোগালেন আব্দুল লতিফ বাওয়ানীর নেতৃত্বে মোহাজের শিল্পপতিরা।

    এরপর ধাপে ধাপে পুরো মাষ্টার প্ল্যানটির বারোটা বাজিয়েছে এই প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা জীবনে নগর পরিকল্পনা পাঠের একটি অংশ ছিলো। ম্যাকফারলেনের মাস্টার প্ল্যানটি দেখে বুঝতে পেরেছিলাম যে, আমরা কত সুচারুভাবে একটি ভাল জিনিসকে নষ্ট করতে পারি।

    Reply

Leave a Reply to এ.কে.এম ওয়াহিদুজ্জামান Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—