২৫ মার্চ যাতে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালিত হয় সে জন্য নির্মূল কমিটি দীর্ঘদিন আন্দোলন করে আসছিল। ব্যক্তিগত পর্যায়ে আমি ও শাহরিয়ার কবির এক দশক এ নিয়ে নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলেছি, দেশি-বিদেশি সেমিনারে বলেছি, লেখালেখিও বাদ যায়নি। কিন্তু কোন ফল হয়নি।

২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্মূল কমিটি এ উপলক্ষে একটি সেমিনারের আয়োজন করেছিল। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন একজন আলোচক। আমার বক্তব্যে, ২৫ মার্চের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে জুনায়েদ আহমদের বইটির কথা তুললাম। পাকিস্তান থেকে ১৯৭১ সালের ওপর তার একটি বই বেরিয়েছে। সেটি সরকারিভাবে সবখানে বিলি করা হচ্ছে। পুরো বইটি কষ্ট কল্পনায় ঠাসা। বললাম, ‘এগুলো লেখার সাহস তারা পায় যেহেতু সরকার নির্বিকার। সরকার ‘বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস’ পালন করে অথচ গণহত্যার মতো একটি বিষয় পালন করতে চায় না। কিন্তু নিজেদের আবার দাবি করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার হিসেবে।’

তোফায়েল আহমেদ মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। জুনায়েদের বইটি চেয়ে নিলেন। শাহরিয়ার বইটি যোগাড় করেছিল। আমি তোফায়েল ভাইয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছিলাম, ‘সংসদ চলছে, আপনি সংসদে যান, বিষয়টি তুলুন।’

তোফায়েল আহমেদ তাঁর বক্তৃতায় বললেন, ‘আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা অথচ এ কথা আমারও মনে হয়নি। এটি তো হতে পারে না। আমি এখনই সংসদে গিয়ে এ প্রসঙ্গ তুলছি।’

PM-Perliament (1)
‘ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ, মিথস এক্সপ্লোডেড’ বইটির মিথ্যাচার নিয়ে সংসদে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

সভা শেষ। আমি বইমেলায় চলে এসেছি। কিছুক্ষণ পর আবার তোফায়েল আহমেদের ফোন পেলাম। উত্তেজিত সুরে বললেন, তিনি প্রসঙ্গটি সংসদে তুলেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী তার সমর্থনে বক্তব্য দিয়ে বলেছেন, ২৫ মার্চ ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালিত হবে। স্পিকার জানিয়েছেন, একটি দিন এ বিষয়ে শুধু আলোচনা হবে। নির্ধারিত দিন শিরিন আখতারের প্রস্তাব অনুযায়ী আলোচনা হলো এবং ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালিত হবে বলে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিভাবে পাস হলো। অচেনা জুনায়েদ আহমদ বিখ্যাত হয়ে গেলেন। কারণ সবাই জুনায়েদের বই বা মিথ্যার গুদামের কথা উল্লেখ করে বক্তৃতা করেছিলেন।

ড. জুনায়েদ আহমদের বয়স ৬২। করাচির ন্যাশনাল ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টস-এর চেয়ারম্যান। কনসালটেন্সি হিসেবে তিনি বইটি লিখেছেন। নাম ‘ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ : মিথস এক্সপোজড’। পরিশিষ্টসহ প্রায় ৪০০ পাতার বই। মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারে কাদের মোল্লা, নিজামীর ফাঁসি হলে আইএসআই [পাকিস্তানের কুখ্যাত সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা] এই বইটি লেখার দায়িত্ব দেয় তাকে। বইটি প্রকাশের পর করাচিতে ঘটা করে এর প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। তারপর আইএসআই ইসলামাবাদে সমস্ত বিদেশি দূতাবাসে তা প্রেরণ করে। বাংলাদেশ হাইকমিশন বইটি পেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শাহরিয়ারকে বইটি দেয়। সে সূত্রে বইটি আমরা পাই। আইএসআই বই নির্মাণ করেছে একটি কারণে। বাংলাদেশে মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার গণহত্যাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। গণহত্যাকারী হিসেবে পাকিস্তান আবার পরিচিত হচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে এ বইটি নির্মাণ করে তারা বলতে চাইছে, গণহত্যার সঙ্গে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। কী ইতিহাস নির্মাণ করল পাকিস্তান তা এবার দেখা যাক।

কৃতজ্ঞতা স্বীকারে লেখকের বক্তব্য পরিষ্কার- “I am most grateful to my parents who brought me up as a Muslim and a proud Pakistani, having complete faith in Tawheed, love for our beloved prophet (PBUH), and the two nation theory which led to the creation of Pakistan.”

যিনি পাকিস্তানের অখণ্ডতা ও দ্বিজাতি তত্ত্বে বিশ্বাস করেন তার দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে তা অনুমেয়।

২.

গ্রন্থটি আটটি অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রথম অধ্যায় ‘মিথ্যা এবং গালগল্পের সমাহারে সৃষ্টি বাংলাদেশের’ [ক্রিয়েশন সব বাংলাদেশ আমিড মিথস অ্যান্ড ফেবলস]। জুনায়েদ জানাচ্ছেন, বাংলাদেশের সৃষ্টি সম্বন্ধে কতগুলো গালগল্প ও মিথের সৃষ্টি হয়েছে যেখানে পাকিস্তানকে দোষী করা হয়েছে। নিরীহ বাঙালিদের গণহত্যার জন্য দায়ী করা হয়েছে পাকিস্তানি বাহিনীকে অথচ মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় বাহিনীকে ‘ক্লিনচিট’ দেয়া হয়েছে। পাকিস্তান আর এর সামরিক বাহিনীকে দোষী করা হয়েছে। লেখকের আসলে এটিই মূল বিষয়। সামরিক বাহিনীকে দোষারোপ। পাকিস্তান এটি মানতে পারে না। জেনারেলরা তাদের মা বাপ।

“The exaggerated narratives accuse the Pakistani Armed Forces of gruesome massacre of innocent  Bangalis, giving a clean chit to Mukti Bahini and the Indian armed forces.  Self prompted Narratives are generated to defame Pakistan and it’s military to protect the Indian-supported Mukti Bahini from their heinous crimes.”

এই মিথ এবং ফেবেলস্ কী? সেটি তিনি প্রথমে পয়েন্ট আকারে দিয়েছেন- [বাঙালিরা কী কী কারণে অভিযোগ করেছে]

১. পশ্চিম পাকিস্তান সোনার বাংলা [পূর্ব পাকিস্তান] শোষণ করেছে।
২. পূর্ব পাকিস্তানে কোন উন্নয়ন হয় নি।
৩. আগরতলা মামলা পশ্চিম পাকিস্তানীদের মস্তিষ্ক প্রসূত।
৪. পশ্চিম পাকিস্তানীরা তাদের সংস্কৃতি চাপিয়ে দিয়েছিল।
৫. পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ বাঙালিদের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানিরা অপারেশন সার্চ লাইট চালিয়েছিল।
৬. পাকিস্তানি সেনারা ৩০ লক্ষ নিরীহ বাঙালিকে হত্যা করেছে।
৭. পাকিস্তানি সৈন্যরা সুনির্দিষ্টভাবে হিন্দুদের হত্যা করেছে।
৮. পূর্ব পাকিস্তানে ভায়োলেন্স সৃষ্টির একমাত্র দায়িত্ব পাকিস্তানি সেনাদের।
৯. ভারতীয় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ছিল মানবিক এবং তার লক্ষ্য ছিল একটি রাজনৈতিক সমাধান।
১০. ভারতীয় সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ ছিল তাৎক্ষণিক, পরিকল্পিত নয়।
১১. ৯৩,০০০ সৈন্য আত্মসমর্পণ করেছিল ভারতীয় যুদ্ধবন্দি হওয়ার জন্য।
১২. পাকিস্তানি সৈন্যরা বাঙালি মেয়েদের ধর্ষণ করেছিল।
১৩. ভারতকে আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহ সমর্থন করেনি। তবুও তারা জয়ী হয়েছে। এবং তিনি দেখাতে চেষ্টা করেছেন এ সব অভিযোগ সত্য নয়। এগুলি মিথ এবং ফেবলস্।
১৪. পাকিস্তানি পৃষ্ঠপোষতায় কাশ্মিরি মুজাহিদিনরা ১৯৭১ সালের ৩০ জানুয়ারি ভারতীয় ফকার ফ্রেন্ডশিপ বিমানটি হাইজ্যাক করেছিল।

এরপর প্রতিটি পয়েন্ট বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

১. আওয়ামী লীগ দুই অংশের বৈষম্যের বিষয়টি ভালোভাবে তুলে ধরতে পেরেছিল। এই মিথের সৃষ্টি করা হয়েছিল যে, এখানে একসময় দুধ ও মধুর নহর প্রবাহিত হতো। এখানে পাঞ্জাব ছাড়া পাকিস্তানের বাকি অংশের উপরি কাঠামো একই রকম ছিল। পাঞ্জাব ব্রিটিশ আমল থেকেই গড়ে তোলা হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানে সব সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ধ্বংসলীলার সৃষ্টি করত। ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরের ধাক্কা পূর্ব পাকিস্তান কখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি।

সুতরাং পশ্চিম পাকিস্তান সোনার বাংলা-কে শোষণ করেনি।

২. পূর্ব পাকিস্তানে কোন উন্নয়ন হয়নি এবং এই দোষ পশ্চিমের- এটি ঠিক নয়। দ্বিতীয় রাজধানী হয়েছে, জুট মিল হয়েছে। আইয়ুব খানের সময়ও সেনা উন্নয়ন হয়েছে। জুনায়েদ উল্লেখ করতে ভুলে গেছেন, সংসদ ভবন সম্পূর্ণ করা হয়নি, আদমজী, ক্রিসেন্ট পাটকলগুলি ব্যক্তি উদ্যোগে হয়েছিল কারণ পাটের কেন্দ্র পূর্ব পাকিস্তান। এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের দাম ছিল। আইয়ুব আমলে মন্ত্রীসভায় অর্ধেক পূর্ব পাকিস্তানের ছিল। সচিবদের অনেকে পূর্ব পাকিস্তানের ছিলেন না এটি ঠিক নয়।

পূর্ব পাকিস্তানে পণ্যের দাম বেড়েছিল ‘হিন্দু মারওয়ারিদের’ কারণে যারা পণ্য মজুদ রাখত দাম বাড়াবোর জন্য। এর পেছনে রাজনীতি ছিল কারণ তারা অখণ্ড ভারত চাইতেন।

মারওয়ারিদের সংখ্যা কতজন ছিল এবং কী জন্য তারা মজুদ করত তা তিনি উল্লেখ করেননি। পাকিস্তানে থেকে তারা অখণ্ড ভারত আন্দোলন করবে এবং পাকিস্তানি আইএসআই চুপ করে বসে থাকবে সে রকম চমৎকার পরিস্থিতি নিশ্চয় পূর্ব পাকিস্তানে তখন বিরাজ করেনি। ১৯৭১ সালের মধ্যে, জুনায়েদের মতে, সামরিক বেসামরিক প্রশাসনে বাঙালিরা অন্তর্ভুক্ত ছিল। সরকারে রাষ্ট্রদূতের মতো সম্মানজনক পদে ও ছিল তারা এবং তারা, “Exploited on many occasions for personal gains betraying Pakistan.”   সংখ্যাতত্ত্ব উদ্ধৃত করলে এবং হলে বোঝা যাবে জুনায়েদের ভাষ্য কতটা অতিরঞ্জিত।

Myths exploded
পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর পৃষ্ঠপোষকতায় লেখা জুনায়েদ আহমদের বই

৩. ভাষা নিয়ে পশ্চিমের বিরুদ্ধে বাঙালিদের ক্ষোভ আছে। পাকিস্তানের কোন প্রদেশের ভাষা উর্দু নয়, কিন্তু ভারতে মুসলমানদের ভাষা ছিল উর্দু, মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান হয়েছিল। সুতরাং ‘লিংগুয়া ফ্রাংকা’ (কমন লাঙ্গুয়েজ) হিসেবে তো উর্দুকেই মেনে নেয়া উচিত ছিল। দুর্বল রাজনীতিবিদরা বিষয়টি ‘হ্যান্ডেল’ করতে পারেননি। আসলে দু’প্রদেশে সাংস্কৃতিক বিনিময় ছিল। ষড়যন্ত্রকারীরাই সাংস্কৃতিক বিভাজনের বিষয়টি বড় করে তুলেছিল। আন্ত:বিবাহও দু’প্রদেশে প্রীতির সঞ্চার করেছিল।

আমি পাকিস্তানের নীতি নির্ধারকদের যখন সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম তখন তারা সবাই সাংস্কৃতিক প্রভেদের কথা বলেছিলেন এবং কিশোর বয়স থেকেই তাদের মধ্যে বাঙালিদের সম্পর্কে যে হীন ধারণা দেয়া হতো তা বলেছেন। বেনজীর ভুট্টো বলেছিলেন, “আমার বাবা উপলব্ধি করেছিলেন যে, বাঙালিদের প্রতি যথেষ্ট অবিচার করা হয়েছে, সেই ভাষা প্রশ্নের সময় থেকে। জানেন ’আমি যখন ছোট তখন থাকতাম পিন্ডিতে। আমাদের পাশাপাশি থাকতেন খাজা শাহাবুদ্দীন ও বগুড়ার মোহাম্মদ আলী। আমরা প্রায়ই যেতাম সেখানে, তাঁরাও আসতেন। তাঁরা আমার মাকে বলেছিলেন আফসোস করে, ‘জান নুসরাত, ওরা আমাদের পাকিস্তানি মনে করে না। কিন্তু কেন? আমরা তো অন্য সকলের মতোই পাকিস্তানের জন্য লড়াই করেছি। অথচ সবাই এমন ভাব করে যেন আমরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক।’

“আমাদের স্কুলগুলোতেও ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই ধরনের কথা বলা হতো। বাঙালিরা ভাত খায়, ছোট খাট্টো। আমরা গম খাই, লম্বা চওড়া। বর্ণবিদ্বেষী মনোভাব একেবারে। ছোট হলেও আমি বুঝতাম, এ ধরনের মনোভাব অন্যায়। বড় হয়ে বুঝলাম, বাঙালিরা কী বলতে চায়।”

রবীন্দ্রনাথে নিষেধাজ্ঞা, নজরুল ও অন্যান্যদের কবিতার মুসলমানিকরণ, সাজ পোশাক হিন্দুদের মতো- এসব কথা অবশ্য জুনায়েদের মনে নেই। টিপ পরা হয় হিন্দুদের কারণে, কথাও তো বলা হয়েছিল।

৪. আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যুক্ত ছিল আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনী। ২৫ মার্চ ১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব যে ভারত চলে গেলেন, র’য়ের সৃষ্টি, স্পেশাল ফ্রন্টিয়ার ফোর্স ও মুক্তি বাহিনীর একই সঙ্গে সৃষ্টি এ তত্ত্বই প্রমাণ করে।

গণহত্যার সম্মুখীন হয়ে যে নেতৃত্ব দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছে তার উল্লেখ অবশ্য নেই। র’-এর সৃষ্টি ১৯৭১-এর আগে সেটিও তিনি ভুলে গেছেন।

৫. শেখ মুজিবুর রহমানকে জাতীয় মুক্তিদাতা বলা হয়। এটি ঠিক নয়। সব সময় তিনি নির্বাচন চাইতেন এবং মানুষের আবেগকে পুঁজি করে। ভারতীয় উৎস থেকে তিনি টাকা পেতেন এবং যা দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাবু করতেন যারা বৈধ টাকা ব্যবহার করতেন। পশ্চিম পাকিস্তান মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে রাজি ছিল না, ভারতের সঙ্গে তার অবৈধ ও ষড়যন্ত্রমূলক সম্পর্ক ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় জড়িত থাকার জন্য। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চালানো যায়নি প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ বিশেষ করে ভুট্টোর চাপে। মুজিব দীর্ঘদিন পাকিস্তানকে বিভক্ত করার জন্য ভারতের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। মুজিব কখনও যুদ্ধক্ষেত্রে ছিলেন না। ভারতের সঙ্গে ১৯৭২ সালে চুক্তি করেছিলেন, বাকশাল করেছিলেন। তাঁর আমল ছিল দুর্নীতিতে ভরা। ঢাকা থেকে দু’লক্ষ মানুষকে বিতাড়িত করা হয়েছিল এবং ৫০ হাজারকে ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছিল। মানুষ সেইসব ক্যাম্পে যাওয়ার থেকে মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করত। ১৯৫০ দশকে এই জাতীয় মুক্তিদাতা মন্ত্রী ছিলেন এবং ‘নেপোটিজম ও ফান্ডের’ অপব্যবহারে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ মন্ত্রীরাও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভারতে সুশিক্ষিত মুক্তিবাহিনী তাকে হত্যা করে। ওরা ছিল জাতীয় মুক্তিদাতার সৈন্য।

যেভাবে বিষয়টিকে জুনায়েদ সাজিয়েছেন তার কোনটিই সত্য নয়। দেশ বিভাগ যদি অপরাধ হয় তাহলে প্রথমে জিন্নাহ্কে অভিযুক্ত করা উচিত যিনি ভারত বিভাগ করেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সময় থেকেই পাকিস্তানি বিশেষ করে পাঞ্জাবিরা বাঙালিদের ভারতীয় চর বলে অভিযুক্ত করেছে। যারা মুজিবকে খুন করেছিলেন তারা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন বাধ্য হয়ে এবং তারা ছিলেন ‘কাকুল শিক্ষিত’, ভারতীয় সামরিক সংস্থা কর্তৃক প্রশিক্ষিত নয়। ১৯৪৭ সালের পর থেকে পাকিস্তান প্রশিক্ষিত সামরিক বাহিনী রাজনীতিবিদদের হত্যা ও বেসামরিক শাসন উৎখাত করেছে এবং এখনও সে প্রক্রিয়া পাকিস্তানে অব্যাহত। ভারতে এ ধরনের বর্বরতা কখনও ঘটেনি।

৬. বেসামরিক মানুষ হত্যার জন্য অপারেশন সার্চ লাইটের পরিকল্পনা করা হয়েছিল এটা ঠিক নয়। ইয়াহিয়া খান জাতীয় অধিবেশন স্থগিত করার পর থেকেই আওয়ামী লীগ কর্মীরা দা-কুড়াল লাঠিসোটা নিয়ে তৈরি ছিল। তখন থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে সব কিছু হয়েছে মুজিবের নির্দেশে। বিহারিদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তা বলার নয়। বাঙালি সৈন্যরা বিদ্রোহ করে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিক ও তাদের পরিবারকে কাপুরুষের মতো হত্যা করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়তো আর পড়ালেখার জায়গা ছিল না- “But serving as the training ground for terrorist defying human civilization progress from medieval barbarity.” [পৃ. ৯]

বিশ্ববিদ্যালয় হলগুলো থেকে আর্মিদের দিকে গুলি ছোঁড়া হয়েছে। অর্থাৎ অপারেশন সার্চ লাইট বলে কিছু ছিল না।

সাহেবজাদা ইয়াকুব যিনি ১৯৭১ সালের একটা সময় পর্যন্ত সেনাবাহিনীর দায়িত্বে ছিলেন তিনি বলে গেছেন, কীভাবে অপারেশন ব্লিস ও অপারেশন সার্চ লাইটের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সব ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি অফিসাররাই তাদের বাঙালি সহকর্মীদের হত্যা করেছিলেন। একমাত্র চট্টগ্রাম ছাড়া, কারণ, চট্টগ্রামে সেনা অফিসার জিয়াউর রহমানকে বন্দরের দিকে পাঠানো হয়েছিল অস্ত্র খালাসের জন্য। তিনি পাকিস্তানি ওপরঅলার নির্দেশে বন্দরের দিকে গিয়েছিলেন এবং বাধা পেয়ে ফিরে আসেন। সে কারণে, চট্টগ্রামের কিছু বাঙালি অফিসার বেঁচে গিয়েছিলেন এবং ফিরে এসে পাকিস্তানি ওপরঅলাদের হত্যা করতে পেরেছিলেন। জিয়া এক সময় পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ভালো অফিসার ছিলেন, কাকুলে প্রশিক্ষিত। বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলেন জিয়া এবং ১৯৭৫-এর পর পাকিস্তানি ধারার শাসন প্রবর্তন করেন বাংলাদেশে। অপারেশন সার্চ লাইট হয়নি- এ ধরনের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে কী মন্তব্য করা যেতে পারে?

৭. ১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ নিহত ও দু’লক্ষ ধর্ষিত হয়েছে এ অতিরঞ্জিত ভাষ্য প্রচার করেছে বাংলাদেশ ও ভারত। এই মিথ্যের সৃষ্টি করেছে ‘প্রাভদা’। ২৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে এক প্রতিবেদনে ‘প্রাভদা’ জানায়, বাংলাদেশে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছেন।

এ সংখ্যা নিয়ে পাকিস্তানি রাজনীতির ধারকবাহক খালেদা জিয়াই প্রশ্ন তুলেছেন, জুনায়েদ তো কোন ছার! বর্তমানে যে হিসেব নিকেশ হচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে নিহতের সংখ্যা ছিল ৩০ লাখেরও বেশি আর ধর্ষিতার সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ।

৮. পাকিস্তানি বাহিনী শুধু হিন্দুদের টার্গেট করেছিল সেটি মোটেই সত্য নয়। পাকিস্তান টার্গেট করেছিল টেররিস্ট বাহিনীদের। শর্মিলা বোস লিখেছেন, পাকিস্তানিরা হিন্দুদের ভারতে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিল, যারা পালাচ্ছিল মুক্তি বাহিনীর ভয়ে। এ সম্পর্কে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

৯. পূর্ব পাকিস্তানে যে ভায়োলেন্স হয়েছে তার জন্য পাকিস্তানি বাহিনী দায়ী নয়। এর জন্য দায়ী মুক্তি বাহিনী

“trained Mukti Bahini terrorists are merciless and unremorseful killers, where inhuman methods find little parallel in civilized human history.” [পৃ. ১১]

প্রশ্ন ওঠে মুক্তিবাহিনী তাহলে কাদের জন্য লড়াই করছিল, পাকিস্তানিদের জন্য?

“After 25th March,  non-Bengalis, rarely Bengalis were taken to buildings to be burnt alive in thousands and guillotined in Jute mills, turning the river waters red, choked with rotting human corpses, young women were subjected to gang rapes, the unlucky ones who survived were damned to endure numbered existences as a sex slaves. The mantra of the rapists were simple, succumb to rape or be vandalized with throats slit and innards pulled out (eyes gouged and body flesh sliced) for an excruciatingly painful death. The pregnant women or their unborn babies hoisted on bayonets as trophies of savagery.” [পৃ. ১১]

এমনই করেছিল আওয়ামী লীগ কর্মী ও মুক্তিবাহিনী।

পাকিস্তানিরা যা করেছিল ঠিক তারই বর্ণনা দিয়েছেন জুনায়েদ এবং লিখেছেন যে ৩০ লক্ষ মারা গেছে।

আগে বলেছেন, তা মিথ ও তারা ছিলেন বিহারি। এ কারণেই আমি প্রস্তাব করেছিলাম, গণহত্যার ওপর ডাকটিকেট তৈরির জন্য। এবং ৪৬ বছর পর গণহত্যার ওপর ডাকঘর ৭১টি ডাকটিকেট প্রকাশ করেছে। পাকিস্তানিদের এ ধরনের মিথ্যাচারের জবাব দেয়ার জন্যই মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও গণহত্যা জাদুঘর গড়ে তোলা হয়েছে।

১০. প্রচার করা হয়েছে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য ভারতীয় বাহিনীর হস্তক্ষেপ ছিল মানবিক। এটি মোটেই মানবিক ছিল না বরং তা ছিল পরিকল্পিত ও জঘন্য আক্রমণ পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে। আর এই পরিকল্পনা করা হয়েছিল আওয়ামী লীগের সম্মতিতে যা পরিচিত আগরতলা ষড়যন্ত্র নামে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের সঙ্গে যোগসাজশ ছিল র’য়ের এবং অপারেশন সার্চ লাইট শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ভারতে আগরতলায় ইঁদুরের মতো গর্তে পালিয়েছিল। ইয়াহিয়া দূরদর্শী ছিলেন তাই তিনি ভারতীয় পুতুলদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চাননি।

“The Awami League leadership and the Mukti Bahinis were mere pawns in the ‘grand master’s golden plan.” [পৃ. ১২]

এমন মিথ্যাচার তথ্য দিয়ে খণ্ডন করেও লাভ নেই।

১১. বলা হয়ে থাকে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ ছিল স্বতস্ফূর্ত, পরিকল্পিত নয়। এটি ডাহা মিথ্যা কথা। ভারতীয় সামরিক বাহিনীর পরিকল্পনা যদি করে থাকে তা অনেক পরে। বাঙালিরা কখনও বলেনি ভারতীয় সাহায্য ছিল স্বতস্ফূর্ত।

১২. ৯৩০০০ পাকিস্তান সৈন্য আত্মসমর্পণ করেছে বলা হয় যা সত্য নয়। পাকিস্তানি সৈন্যদের সংখ্যা ছিল তারই হিসাব মতে ৪৫,০০০। ঠিকই আছে। বাকীরা ছিল সরকারের বেসামরিক সদস্য। আমরা বলি ৯৩ হাজার আত্মসমর্পণ করেছিল।

১৩. ভারতকে আন্তর্জাতিক শক্তিরা সমর্থন করেনি। এই বিষয়গুলোই আবার বিস্তারিত করা হয়েছে। পাঠক, জুনায়েদকে পেলে জিজ্ঞাসা করা যেত, আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহের কেউ-ই সমর্থন না করত তা’হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো? ভারত তো তখন এখনকার ভারত ছিল না। জুনায়েদ যে অভিযোগগুলি করেছে তা কতটুকু সত্য ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে?

পরবর্তী তিনটি অধ্যায়ে পাকিস্তানের জন্ম, বিখণ্ডীকরণের শুরু, ভারতীয় কলাকৌশল আলোচিত হয়েছে। এখানে পূর্বের উল্লিখিত বিষয়গুলি, বা বলা যেতে পারে, প্রথম অধ্যায়ের বিস্তৃতিকরণ।

পাকিস্তানের জন্ম-এর মূল বক্তব্য হলো- হিন্দুদের কারণে পাকিস্তানের সৃষ্টি। এবং ব্রিটিশ সরকার তাতে সহায়তা করেছে। দ্বিতীয় অধ্যায় ‘বিখণ্ডীকরণের শুরু’-এর মূল বক্তব্য হলো-

বাংলাদেশের অসন্তোষের যে কারণসমূহ সব সময় বলা হয় তা সত্য নয়। ব্রিটিশ আমল থেকেই বাংলাদেশ পিছিয়ে ছিল। কয়েক বছরে পাকিস্তান তাকে কত এগিয়ে নেবে? তারপরও নিচ্ছিল। যেমন- সেখানে জুটমিল, ক্যাডেট কলেজ, কাগজের কল ইত্যাদি স্থাপিত হচ্ছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের সদিচ্ছা সত্ত্বেও বৈষম্য কমছিল না তবে, আগের তুলনায় হ্রাস পাচ্ছিল। বৈষম্য যে ছিল, জুনায়েদ তা এই অধ্যায়ে মেনে নিচ্ছেন। লিখছেন, এই বৈষম্যে বাঙালিরা খুশি ছিল না। কিন্তু ভারত এই সুযোগ নিয়েছে।

ভারত কীভাবে সুযোগ নিয়েছে? তৃতীয় অধ্যায়ে তাই বর্ণিত হয়েছে। এই অধ্যায়ের উপ অধ্যায়ের শিরোনামগুলি দেখলেই স্পষ্ট হবে বিষয়টিকে কীভাবে উপস্থাপন করেছেন জুনায়েদ। তার মতে, ঐতিহাসিকভাবেই ভারতীয় হিন্দু নেতৃত্বের মূল লক্ষ ছিল সাম্রাজ্য স্থাপন করা বা ভারতীয় আধিপত্য। ১৯৪৭ সালের পর ভারত যে দেশীয় রাজ্যগুলি ‘দখল’ করে নিল এটি তার উদাহরণ। এ কারণে, ভারতের সঙ্গে চার প্রতিবেশীদের সম্পর্ক অবিশ্বাসের।

‘পাকিস্তান ভারতের হস্তক্ষেপ’, এ অধ্যায়ের প্রথম লাইনটিই কেমন মিথ্যা দেখুন। ১৯৬৫ সালে ভারত পাকিস্তানের কাছে পরাজিত হওয়ার পর ভারত তার নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত হয়ে উঠল। ১৯৬৫ সালে কি ভারত পাকিস্তানের কাছে পরাজিত হয়েছিল? পাকিস্তানই ছিল পরাজয়ের মুখে যে কারণে তাসখন্দ চুক্তি হয়েছিল। যা হোক সেটি মূল বিষয় নয়। মূল বিষয় হচ্ছে, ভারত প্রতিশোধ নেয়ার জন্য ‘পূর্ব পাকিস্তান’ কে বেছে নেয়। তারা হস্তক্ষেপ করতে থাকে।

জুনায়েদের মতে, “The creation of Bangladesh is generally perceived as a consequence of west Pakistanis,  partisans policies towards East Pakistan, without any acknowledgement of the Indian involvement. An effort has been made in this book to explore the Indian role in the dismemberment of Pakistan. On numerous occasions, the Indian and Bangladesh leadership and intellectuals have also accepted and regretted Indian involvement.” [পৃ. ১১৪]

পাকিস্তান হওয়ার পর থেকে আমরা শুনে আসছি, ভারতের পররাষ্ট্র নীতির মূল লক্ষ্য পাকিস্তান ধ্বংস। পূর্ব পাকিস্তানে গণতন্ত্র, ভাষা, সংস্কৃতির জন্য যে সব আন্দোলন সেগুলি ভারতের সৃষ্টি। সেই কাঠামোয় জুনায়েদের একটি উপ-অধ্যায়ের নাম- ‘দি বেঙ্গলি মার্জিনাইলেইজেশন অ্যান্ড ইন্ডিয়ান কনস্ট্রাকট’। শুধু তাই নয়, বিদেশি গণমাধ্যমও ভারত দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। “The international media, influenced by the Indian government and the Indian media, published the Indian concocted ideas of the suppression of the people of East Pakistan.” [পৃ. ১২৩]

১৯৭১ সালে শরণার্থীদের বিষয়ে উপ-বিভাগ হলো- ‘রিফিউজি কনানড্রাম অ্যান্ড ইন্ডিয়ান প্রপোগান্ডা।’ ‘মিস্ট্রি অব দি ইস্ট পাকিস্তান রিফিউজিস’।

এই অধ্যায়ের উপসংহার পড়লে একটি বিষয়ে একমত হবেন যা পরে উল্লেখ করছি। জুনায়েদের মতে, প্রশিক্ষণের পর মুক্তিবাহিনীর চরমপন্থিরা পূর্ববঙ্গে প্রবেশ করে এবং সন্ত্রাস শুরু হয়। চরমপন্থিরা বিশাল এক গণহত্যা শুরু করে। তাদের এ ধরনের হত্যা সমর্থন করে ভারতীয় সরকার। “The extremists of Mukti Bahini entered in East Bengal after getting initial training and thus a reign of terror was unleashed. The extremist launched a massive genocidal campaign. Their indiscriminate killing campaign was overtly and covertly supported by the Indian establishment.”

বর্তমানে রোহিঙ্গা বিতাড়ণের পর অং সান সুচি ও তার সামরিক জান্তারা কী বলছেন আর আমরা কী দেখছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসী প্রচার কী ছিল আর বিশ্ব কী দেখেছে। সুতরাং, পাকিস্তান, যারা গণহত্যা চালিয়েছে তাদের প্রচার এমনটিই হওয়া স্বাভাবিক।

পঞ্চম অধ্যায়টি পড়া খুব আমোদজনক। এর শিরোনাম ‘১৯৭১ এর বিদ্রোহ’। প্রথমে নির্বাচনের এবং নির্বাচন পরবর্তী সময়ের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। মুজিব কেন ছয় দফার কথা তুলে ধরেছিলেন তাও বলা হয়েছে এবং সাজানো হয়েছে এর মূল পরিকল্পনাই ছিল পাকিস্তান ভাঙ্গা। এক্ষেত্রে ইয়াহিয়ার আর কী করার থাকতে পারে, সামরিক বাহিনী ব্যবহার করা ছাড়া। এবং সেটি করতে তারা বাধ্য হয়েছে কারণ বাঙালিরা, যারা পাকিস্তানের প্রতি অনুগত তাদের সম্পদ লুট ও নষ্ট করছিল, হত্যা করছিল। এখানে তারা একটি সত্য স্বীকার করেছে যে, শেখ মুজিব ২৫ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। জিয়াউর রহমান ২৭ মার্চ ‘প্রবাসী সরকার’ গঠনের ঘোষণা দেন।

জুনায়েদ এরপর বিশদভাবে অপারেশন সার্চলাইট আলোচনা করেছেন। যাহোক এরপর বিদ্রোহ শুরু হলো। পূর্বাংশের যুদ্ধ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

উপসংহারে জুনায়েদ লিখেছেন, পাকিস্তান ভাঙ্গার দায় বেশিরভাগ মুজিব ও ভুট্টোর। কিন্তু, তিনি ভুট্টোর আগে ভালো বিশেষণ খরচ করে মুজিবের নামের আগে ‘বিশ্বাসঘাতক’ শব্দটি যোগ করেছেন,সামরিক বাহিনীর কোন দায় নেই

“However, the impetuous Bhutto and the unfaithful Mujib share considerable blame for the disintegration of the country.”

আমি প্রায় ৩০ জন পাকিস্তানি নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে যে আলোচনা করেছিলাম তাতে অধিকাংশের মত ছিল এরকম- মুজিব ভুট্টো ইয়াহিয়া, মুজিব ইয়াহিয়া ভুট্টো-পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য দায়ী। এখানে মুজিব ভুট্টো আছেন কিন্তু ইয়াহিয়া বা সেনাবাহিনী সেই। কারণ, বইটি তারা লিখিয়েছে।

25-March-ed-
অমিয় তরফদারের তোলা ‘রিকশায় তিনটি লাশ’ ছবিটিকেও মুক্তিবাহিনির হত্যাযজ্ঞ বলে বইয়ে লিখেছেন জুনায়েদ

এর পরের দুটি অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ নিয়ে যা আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক নয়। সবচেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে ১৪টি ছবি যা ২২২ পৃষ্ঠার পর ছাপা হয়েছে। ১-২ নং ছবি মুক্তিবাহিনীর। তাতে আমাদের আপত্তি নেই, ৩নং ছবির ক্যাপশন, ইপিআর ৬ জনকে হত্যার পর জনতা পাকিস্তানি সৈন্যের কাটা মুণ্ডু প্রদর্শন করেছি। এই ছবিটি ছাপা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় খুব সম্ভব নিউজ উইক বা টাইম পত্রিকায়। যুদ্ধের আগের ছবি এটি নয়। ৪-৭ নং ছবি আমরা সচরাচর পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার নিদর্শন হিসেবে ছাপি। এখানে ক্যাপশন দেয়া হয়েছে- ‘মুক্তি বাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানিদের ক্ষতবিক্ষত লাশ টেনে নিচ্ছে’, ‘একটি রেলস্টেশনে মুক্তিবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ’, ‘১৯৭১ সালে মুক্তিবাহিনীর যত্রতত্র হত্যা’, ‘শকুন ছিঁড়ে খাচ্ছে লাশ।’ ‘মুক্তিবাহিনীর যত্রতত্র হত্যা।’

আসলে এগুলি সবই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার ছবি। ৮-১১ নং ছবি মুক্তিবাহিনীর কর্তৃক রাজাকাদের নিগ্রহ, সেগুলি ঠিকই আছে। কিন্তু শেষের তিনটি ছবি আবার সেই একই কাহিনী, পাকিস্তানি গণহত্যা দেখানো হয়েছে মুক্তিবাহিনীর গণহত্যা হিসেবে। অমিয় তরফদারের তোলা রিকশায় তিনটি লাশ- সেই বিখ্যাত ছবিটিও আছে। রিকশায় গুলিতে নিহত চালক ও যাত্রী।

এ বইটি আমাদের একটি উপকার করেছে। এই বই প্রকাশের ফলেই বাংলাদেশ সরকারের টনক নড়েছে এবং সরকার ঘোষণা করেছে এখন থেকে জাতীয়ভাবে গণহত্যা দিবস পালন করা হবে ২৫ মার্চ।

মুনতাসীর মামুনলেখক ও গবেষক

Responses -- “মুক্তিযুদ্ধ ও আইএসআইয়ের প্রতিশোধ প্রচেষ্টা”

  1. M. Emad

    Like the ‘ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ : মিথস এক্সপোজড’ – Junaid Ahmed, several ‘1971 projects’ by Pakistan Army-ISI are in pipeline. Bangladesh idiot Muktijoddho Ministry/ government sleeping.

    Reply
  2. M. Emad

    ‘ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ : মিথস এক্সপোজড’ author Junaid Ahmed visited Bangladesh for ‘interview and collecting information’ before writing the book. Find out who helped Junaid in Bangladesh.

    Reply
  3. শরিফ

    বইটার নাম ভুল। আই এস আই এর সম্পর্কের দালিলিক প্রমান দিলে আরো ভালো হতো।

    Reply
  4. Ahmed

    ISI এর ঘৃণ্য propaganda এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্যে Sir কে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—