যে সময়টায় তিনি এই সাক্ষাৎকারটি দিয়েছিলেন, এরপর কয়েকমাস অতিক্রান্ত। এর মধ্যে সৌদি আরবে বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তনের ঘোষণা এসেছে।

সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বিন আবদুল আজিজ আল-সৌদ বলেছেন, তাঁর দেশ মধ্যপন্থী ইসলামের পথে ফিরে যাবে। সৌদি আরব আগে এই আদর্শেই পরিচালিত হতো এবং সব ধর্ম ও পুরো বিশ্বের জন্য উন্মুক্ত ছিল।

গত ২৪ অক্টোবর রিয়াদে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ সম্মেলনে সৌদি যুবরাজ এই প্রতিশ্রুতি দেন। কট্টরপন্থা মোকাবিলায় সৌদি আরব আরও কিছু করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘কট্টরপন্থী আদর্শের সঙ্গে যুঝতে গিয়ে জীবনের ৩০টা বছর সময় আমরা নষ্ট করব না আর।’ যুবরাজ আরও বলেন, ‘আমরা খুব শিগগির কট্টরপন্থার অবসান ঘটাব।’

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে টুইন টাওয়ার হামলা হওয়ার পর থেকে মৌলবাদ ও সন্ত্রাস মোকাবিলা এবং সন্ত্রাসে অর্থায়ন বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য পশ্চিমা রাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে সুন্নি ইসলামের ওয়াহাবি মতাদর্শের রাজতন্ত্র সৌদি আরব। যে দেশে কট্টরপন্থী সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা প্রচণ্ড ক্ষমতাধর এবং দেশজুড়ে তাঁর ব্যাপক প্রভাব সেই দেশে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি গোটা বিশ্বে উৎসুকের জন্ম দিয়েছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে হঠাৎ করেই ৩২ বছর বয়সী যুবরাজ বিন সালমানকে সৌদি সিংহাসনের উত্তরাধিকার মনোনীত করেন বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল-সৌদ। অনেকেই তাঁকে আধুনিক সৌদি রাজতন্ত্রের মুখ বলে মনে করেন।

পাঁচশ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে মিশর ও জর্দানের সঙ্গে স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক জোন গঠনের ঘোষণাও দিয়েছেন ৩২ বছর বয়সী এ যুবরাজ।

সৌদি আরবের যুবরাজ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশটিকে তেল নির্ভর অর্থনীতি থেকে বের করে আনতে ‘ভিশন: ২০৩০’ ঘোষণার মাধ্যমে অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। গত মাসে নারীদের গাড়ি চালানোর ওপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় পরিচালিত এ দেশটি। বিশ্ববাজারে তেলের দাম পড়ে যাওয়ার পর নিজেদের পরিবর্তিত অর্থনীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাকে বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের সামনে তুলে ধরার জন্য এ উদ্যোগ নিয়েছে দেশটি।Saudia economy

যদিও কেউ কেউ এ কথাও বলছেন যে, নতুন শহরের নকশা, বড় বড় পরিকল্পনা—পুরোটাই লোক-দেখানো। ইয়েমেন আর কাতারের সঙ্গে যুদ্ধে নিজের ভাবমূর্তি খুইয়ে এখন তা মেরামতির চেষ্টা যুবরাজের। আসল সৌদি থাকবে সৌদিতেই। কিন্তু পুরোটাই থাকবে কি? যদি এই ‘ভিশন ২০৩০’ আংশিক সাফল্যও পায়, তা হলে তার টানেই সমাজে একটা খোলা হাওয়া ঢুকতে বাধ্য। তখন হয়তো ‘ভিশন ২০৩০’-এর পূর্ণ সাফল্যের যেটুকু বাকি থাকবে, সেটা হাসিল করে দেবে যুবসমাজ। তাদের তরুণ রক্ত গ্রহণ করবে বহির্বিশ্বের নতুনত্ব। সেই নতুনত্ব সংক্রামক, রোখা মুশকিল। তার ওপর তাতে যদি থাকে সমাজ বদলের হাতছানি!

মোহাম্মদ বিন সালমান আল সৌদ (জন্ম ৩১ আগস্ট ১৯৮৫) হলেন সৌদি আরবের যুবরাজ, উপপ্রধানমন্ত্রী এবং পৃথিবীর সবচেয়ে কমবয়সী প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। তিনি আল সৌদ রাজদরবারের প্রধান এবং অর্থনৈতিক ও উন্নয় ন বিষয়ক কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। তার পিতা বাদশাহ সালমানের পরেই তাঁর ক্ষমতা বিবেচনা করা হয় , ২০১৭ সালের ২১ জুন মুহাম্মদ বিন নায়েফকে যুবরাজের পদ থেকে অপসারণ করা হয় এবং তার স্থলে মুহাম্মদ বিন সালমানকে যুবরাজ মনোনীত করা হয় একই সঙ্গে রাজকীয়  ফরমানের মাধ্যমে নায়েফকে তার সব পদ থেকে অপসারণ করে তার সকল ক্ষমতা মুহাম্মদ বিন সালমানকে দেয়া হয়।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট-এ তাঁর এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। এই নবীন নেতা সাক্ষাৎকারটিতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে সৌদি আরবের ভূমিকা ও বিশ্বরাজনীতি সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরেন। সৌদি এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আগ্রহীদের সাক্ষাৎকারটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ তুলে ধরা হলো।

দ্য ইকোনমিস্ট: প্রথমেই সম্প্রতি কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডের প্রসঙ্গে আসা যাক। সৌদি আরবে সন্ত্রাসী হামলার পর এত বছর পর কেন এই বিষয়টি সামনে এলো? আপনি কেন  শিয়া ধর্মবিশ্বাসীদের ওপর এই  দণ্ড কার্যকর করলেন?

সালমান: প্রথমত, তাদের আদালতে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিচারিক প্রক্রিয়ায় দণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং তাদের বিচার কার্যক্রমের তিনটি স্তর অতিক্রম করতে হয়েছে। তাদের অধিকার ছিল একজন আইনজীবী নিয়োগের এবং এই আইনজীবীরা বিচার প্রক্রিয়ার প্রতিটি স্তরে ভূমিকা পালন করেছেন। আদালতের দরজা সকল গণমাধ্যমকর্মী ও সাংবাদিকদের জন্য উন্মুক্ত ছিল, এবং বিচার কার্যক্রমের সকল বিবরণ জনগণের জানার জন্য প্রকাশ করা হয়েছিল। আদালত কোনওভাবেই কে শিয়া বা সুন্নি তা বিবেচনায় নেয়নি। তারা একটি অপরাধ পর্যালোচনা করে বিচারিক পদ্ধতি মেনে তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীর বিরুদ্ধে দণ্ড ঘোষণা করেছে এবং তারই আলোকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

দ্য ইকোনমিস্ট: কিন্তু এই মৃত্যুদণ্ডের কারণে ইরানে সহিংস প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে সেখানে আপনাদের দূতাবাসে আক্রমণ পরিচালিত হয়েছে। আপনি বাহরাইন ও সুদানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। আঞ্চলিক পর্যায়ে এই উত্তেজনা বৃদ্ধির ফলাফল কী হতে পারে বলে মনে করেন?

সালমান: ইরানে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ আমাদের বিস্মিত করেছে। সৌদি আরবের একজন নাগরিক যে সৌদি আরবে একটি অপরাধমূলক তৎপরতা চালিয়েছে, প্রচলিত আইন অনুযায়ী সৌদি আদালতে তার বিচার ও শাস্তি হয়েছে। এটা আদালতের একটি সিদ্ধান্ত। ইরানের সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক কী? এই ঘটনা শুধু এটাই  প্রমাণ করে যে ইরান এ অঞ্চলের দেশগুলির উপর তার খবরদারি বজায় রাখার ব্যাপারে আগ্রহী।

দ্য ইকোনমিস্ট: অযৌক্তিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে আপনি কী উত্তেজনা সৃষ্টিতে ভূমিকা পালন করেননি?

সালমান:  বিষয়টিকে আরেকভাবে দেখুন। আমরা যদি এটাকে ভয়  করি, তাহলে তারা আরও বেপরোয়া হবে। কল্পনা করুন যদি কোনো সৌদি কূটনীতিক বা তার পরিবারের কোনো সদস্য বা শিশু ইরানে আক্রান্ত হয়, তখন ইরানের ভূমিকা আরও কঠিন হবে। আমরা বরং ইরানকে এমন একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করেছি। সৌদি মিশনে আগুন জ্বলছে এবং তা ইরানি সরকার দেখতে পাচ্ছে। যদি একটি শিশু অথবা একজন কূটনীতিক, কিংবা তাদের পরিবারের সদস্যদের উপর আক্রমণ করা হয় , তাহলে কি ঘটতে পারে? সে ক্ষেত্রে আমাদের প্রকৃত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়তে হবে এবং তা বাড়বে।

দ্য ইকোনমিস্ট:: আপনি কি ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে দ্বন্দ্বের বিরোধিতা করছেন? কারণ কী এই কার্যক্রম এবং তার ফলাফল?

সালমান: আমি মনে করি না যে এই কার্যক্রমের কারণে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়বে। যেহেতু ইরানের বাড়াবাড়ি চরম পর্যায়ে উপনীত হয়েছে, এখন আমরা কঠোর না হলে তারা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। তাদের রেশ টেনে ধরা কঠিন হবে। আমরা শুধু আমাদের বিরুদ্ধে গৃহীত পদক্ষেপের মোকাবেলা করবার জন্য যতটুকু করার তা-ই করছি।

দ্য ইকোনমিস্ট: আপনাদের দুই দেশের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ কী সম্ভব?Saudia Crown Prince

সালমান: এটি এমন একটা বিষয় যে বিষয়ে আগে-ভাগেই কিছু অনুমান করা সম্ভব নয়। এ ব্যাপারে আগ বাড়িয়ে কেউ কাউকে প্ররোচিত করাটা সুবিবেচনাপ্রসূত হবে না। সৌদি আরবে ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বাধলে শুধু এ অঞ্চলেই বিপর্যয়  নেমে আসবে না, গোটা বিশ্বেই এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমরা কোনো মতেই এই ধরনের কোনো কিছু ঘটতে দিতে পারি না।

দ্য ইকোনমিস্ট: আপনি কি মনে করেন ইরান আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু?

সালমান: তেমনটি আমরা আশা করি না।

দ্য ইকোনমিস্ট: ইয়েমেনে আপনি একটা অনাবশ্যক ঝামেলা সৃষ্টি করেছেন বলে অনেকেই মনে করছেন। ইয়েমেনের ওপর একটা যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছেন। আপনি ইয়েমেনের যুদ্ধের স্থপতি। তো এই যুদ্ধ কখন শেষ হবে?

সালমান: প্রথমত আমি ইয়েমেনে শক্তিপ্রয়োগের স্থপতি নই। আমরা প্রাতিষ্ঠানিক একটি দেশ। ইয়েমেনের অভিযান পরিচালনাটা একটি যৌথ সিদ্ধান্ত। এর সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় , প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় , গোয়েন্দা সংস্থা, মন্ত্রী পরিষদ এবং নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত কাউন্সিল-সকলের সুপারিশের ভিত্তিতে গৃহীত একটি সিদ্ধান্ত। সকলের মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে মহামান্য বাদশাহ চূড়ান্ত নির্দেশ প্রদান করেন। মহামান্য বাদশাহ যে নির্দেশ দেন, প্রতিরক্ষার মন্ত্রী হিসেবে আমি তাঁর সিদ্ধান্ত বাস্তবায় ন করি মাত্র। আমি কোন হুমকি যে আমি দেখতে জমা দিতে হবে। এবং যে কোনো ধরনের হুমকি দেখতে পেলে আমি তা জানাব এবং মোকাবেলা করার প্রস্তুতি নেব।

দ্য ইকোনমিস্ট: সিদ্ধান্তটি কিন্তু গ্রহণ করা হয়েছিল আপনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হওয়ার পর পরই। এই অপারেশন কবে নাগাদ শেষ হবে বলে আপনি আশা করছেন?

সালমান:  এটা সত্য যে আমি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হবার পর সিদ্ধান্তটি হয়েছিল, আমাদের মহান বাদশাহ দায়িত্ব গ্রহণের প্রাক্কালে হুথি বিদ্রোহীদের রাজধানী সানার সকল ক্ষমতা করায়ত্ত করার অপচেষ্টার কথা আমরা কীভাবে ভুলে যাব? এর সঙ্গে আমার মন্ত্রী হওয়ার সম্পর্ক নেই বরং এর জন্য হুতিরাই দায়ী। হুথিরা যা করেছে এর জন্য সম্ভাব্য সব কিছুই করা হবে। আমার ভূপৃষ্ঠ জুড়ে মিসাইল বসানো আছে যা সীমান্ত থেকে মাত্র ৩০-৫০ কিলোমিটার দূরে। এই ক্ষেপণাস্ত্রের পরিসর ৫৫০ কিলোমিটার দূরে পর্যন্ত আঘাত হানতে পারে। এসব মিসাইল মিলিশিয়া বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই মিলিশিয়ারা সীমান্তে মহড়া দিচ্ছে এবং তারা যুদ্ধপরিকল্পনার অংশ হিসেবেই কাজ করছে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আমার সীমান্তে এই মিলিশিয়ারা যুদ্ধপরিকল্পনার অংশ হিসেবে এডেনে তাদের নিজের লোকদের বিরুদ্ধে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পৃথিবীর এমন কোনো দেশ আছে যে এই ধরনের অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত মিলিশিয়া বাহিনীকে মেনে নেবে? বিশেষ করে যারা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ উপেক্ষা করছে এবং আমাদের জাতীয়  স্বার্থের জন্য সরাসরি হুমকিতে পরিণত হয়েছে। এর আগে ২০০৯ সালেও তাদের সঙ্গে আমাদের খারাপ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। কর্তৃক পরিচালিত সেই কার্যক্রমগুলি কোনও বিরোধিতা ছাড়াই সমর্থন পেয়েছিল। এই অপারেশন কোনো রকম বিরোধিতা ছাড়াই জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিল দ্বারা সমর্থিত ও পরিচালিত হয়েছিল।

দ্য ইকোনমিস্ট: অপারেশন যখন শুরু হয়েছিল তখন, অনেকেই আশা করেছিলেন এটি দ্রুত শেষ হবে। দশ মাস অতিক্রান্ত হলো, আপনি কি তবে সামরিক ঘোড়দৌড়ের মধ্যেই আছেন?

সালমান:  না, আসলে এটার পেছনে অনেকগুলো উদ্দেশ্য ছিল। অপারেশন ‘ডেসিসিভ-স্টর্ম’-এর প্রথম উদ্দেশ্য ছিল  মিলিশিয়াদের মূল ক্ষমতার উৎসগুলোকে নিষ্ক্রিয় করা। তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা বিশেষত তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ অন্তত ৯০ ভাগ ধ্বংস করা। তারপর আমরা ইয়েমেনের একটি রাজনৈতিক সমাধান প্রক্রিয়া শুরু করেছিলাম, যা একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পর্যায়। আমাদের সব প্রচেষ্টা রাজনৈতিক সমাধানের উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা আমাদের ভূমি মিলিশিয়াদের তৎপরতার জন্য অবারিত করে দেব। তাদের অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে যে প্রতিদিন রাজনৈতিক সমাধানের সুযোগ তারা পাবে না, বরং এ সুযোগ হাতছাড়া করলে তারা পায়ের তলার মাটি হারিয়ে ফেলবে।

দ্য ইকোনমিস্ট: এতে কত সময় লাগতে পারে?

সালমান: অভিজ্ঞ জেনারেল থেকে কনিষ্ঠ সৈনিক, যুদ্ধের ময়দানে কেউই আগেভাগে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারে না। আজ আমরা দায়েশ দেখছি, কিন্তু কখন তারা পরাজিত হবে এ ব্যাপারে কেউ ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারবে না। কিন্তু আমি যা বলতে পারি দশ মাস আগে এডেনের অর্ধেকও সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল না, এবং বর্তমানে ৮০ ভাগ ইয়েমেনি ভূমি বৈধ সরকার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই যে, আজ বিশ্বের কাছে হুথিসের চরিত্র এবং তাদের গোপন খেলার রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। বিশেষ করে যে সব খেলা তারা মানবিক সাহায্যের নামে করছে।

দ্য ইকোনমিস্ট: আপনি অর্থনীতির দায়িত্বে আছেন, এবার বাজেট প্রসঙ্গে কথা বলা যাক। প্রতি ব্যারেল তেল ৩৫ ডলার। গত বছর আপনার বাজেট ঘাটতি ছিল জিডিপির শতকরা ১৫ ভাগ। সৌদি আরব কী তবে অর্থনৈতিক সংকটের মখোমুখি?

সালমান: আমরা এই সংকট থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছি। আমরা ৮০ ও ৯০ দশকের থেকেও এখন এগিয়ে আছি। আমাদের আছে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল রিজার্ভ। আমরা এ বছর তেল বহির্ভূত রাজস্ব ২৯% বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছি। সৌদি আরবের অর্থনীতি সম্পর্কে বেশিরভাগ লোকের যা ধারণা সে তুলনায়  ঘাটতি ও খরচের বিষয়ে আমরা অনেক ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছি। আমাদের পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি আছে। যার কিছু আমরা ঘোষণা করেছি, বাকিটা আমরা নিকট ভবিষ্যতে ঘোষণা করব। আমাদের ঋণের পরিমাণ জিডিপির শতকরা ৫ ভাগ মাত্র। কাজেই শক্তিশালী হওয়ার সব উপাদান আমার আছে, অনেক সেক্টরে আমাদের তেল-বহির্ভূত রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে। সর্বপরি আমাদের একটি বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক আছে।

দ্য ইকোনমিস্ট: আপনি তেল-বহির্ভূত রাজস্ব বৃদ্ধি করবেন কিভাবে? ভ্যাট ও আয়কর প্রবর্তনের মাধ্যমে?Oil

সালমান: আমরা আয়কর ও সম্পদ করমুক্তকরণের পথে এগোচ্ছি। আমরা ভ্যাট এবং অপরাধকর (অপরাধমূলক কর হচ্ছে কিছু জিনিস যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর বলে বিবেচিত হয়, উদাহরণস্বরূপ অ্যালকোহল এবং তামাক, ক্যান্ডি, ওষুধ, নরম পানীয়, দ্রুত খাবার, কফি ইত্যাদির উপর ধার্য কর)সহ নাগরিক দ্বারা সমর্থিত কর বা ফি সম্পর্কে কথা বলছি। এসব থেকে পর্যাপ্ত রাজস্ব অর্জন সম্ভব, তবে এটাই একমাত্র রাজস্ব খাত নয়। আমাদের খনিগুলোতে অনেক সুযোগ রয়েছে, যেমন-বিশ্বের ৬%-এরও বেশি ইউরেনিয়ামের মজুদ আমাদের রয়েছে, রয়েছে অনেক অব্যবহৃত সম্পদ। মক্কাতে আমাদের চার মিলিয়ন বর্গমিটার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জমি রয়েছে, যেগুলোর বাজারমূল্য অনেক। আমরা এসব সম্পদকে বিনিয়োগযোগ্য সম্পদে রূপান্তরিত করতে পারি। আমরা বিশ্বাস করি আমরা আগামী পাঁচ বছরে তেলসম্পদ বহির্ভূত রাজস্বের পরিমাণ ১০০ বিলিয়র ডলারে উন্নীত করতে পারব।

দ্য ইকোনমিস্ট: আপনি ভ্যাট কবে নাগাদ চালু করবেন?

সালমান: আমরা ২০১৭-এর শেষ নাগাদ এটি চালু করব এবং আমরা তা দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা করব।

দ্য ইকোনমিস্ট: রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য আপনি কি বেসরকারিকরণের দিকে ঝুঁকবেন?

সালমান: স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাখাত, সামরিক খাতের কিছু কিছু অংশ, যেমন সামরিক শিল্প এবং কিছু রাষ্ট্রীয়  মালিকানাধীন কোম্পানি। এতে করে সরকারের  ওপর চাপ কিছুটা কমবে এবং ভাল মুনাফা তৈরি করতে পারে।

দ্য ইকোনমিস্ট: আপনি কি সৌদি আরামকোর শেয়ার বিক্রির কথা ভাবছেন? (সৌদি আরামকো হচ্ছে সৌদি আরবের জাতীয় পেট্রোলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি, যা বর্তমানে সৌদি আরবের তেল কোম্পানি হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে)

সালমান: বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করা হচ্ছে এবং আমরা বিশ্বাস করি যে পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি এ ব্যাপারে অত্যন্ত উৎসাহী। আমি বিশ্বাস করি এটি সৌদি বাজারের স্বার্থে, আরামকোর স্বার্থে, আরও স্বচ্ছতার স্বার্থে এবং দুর্নীতির বিপরীতে, যদি তেমন কিছু থেকে থাকে, তা মোকাবেলায় আরামকো ভূমিকা পালন করতে পারে।

দ্য ইকোনমিস্ট: আপনি বলেছিলেন যে, সৌদি আরবের অর্থনীতির বহুমুখী চ্যালেঞ্জগুলোর অন্যতম হলো তেল থেকে দূরে সরে যাওয়া। এর বিপরীতে কোন খাত অগ্রাধিকার পাবে বলে মনে করেন?

সালমান: তেলখনি খাতে ভর্তুকি প্রক্রিয়ায় সংস্কার দরকার। মাত্র ২০ ভাগ মধ্যম ও নিম্ন আয়ের মানুষ সরকারি ভর্তুকি থেকে উপকার পায়। আমাদের লক্ষ্য ৮০ শতাংশ মানুষ এবং আমরা তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের চেষ্টা করছি। তারা যথেষ্ট রাজস্ব প্রদান করে। যা আমি আপনাকে আগে বলেছিলাম, অব্যবহৃত সম্পদ, যেমন ধর্মকেন্দ্রিক পর্যটন প্রসারিত করা, যেমন মক্কা ও মদিনায় পর্যটক সংখ্যা এবং তীর্থযাত্রীদের সংখ্যা বৃদ্ধি। এ ক্ষেত্রে উভয় শহরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জমি বরাদ্দ আরও বাড়াতে হবে।

দ্য ইকোনমিস্ট: এবারের বাজেটে আপনি অনেক কিছুর দাম বাড়িয়েছেন করেছেন, কিন্তু বিদ্যুৎ, পেট্রোলে কিন্তু এখনও অনেক ভর্তুকি দিয়ে চলেছেন। সব কিছুর উপর থেকে ভর্তুকি সম্পূর্ণরূপে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে কি?

সালমান: জ্বালানির ক্ষেত্রে আমরা মুক্ত বাজারে পৌঁছাতে চাই, কিন্তু কম আয়ের মানুষদের জন্য কিছু ভর্তুকি কর্মসূচি চালু রয়েছে। শুধু জ্বালানির দাম কমানোর মধ্য দিয়ে নয়, বরং নানা ভাবে আমরা এই ভর্তুকি সমন্বয় করি। আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ নিয়ে কাজ করছি, যেমন: উমুলুজ ও উজ শহরের কাছে আমাদের উত্তর জেদ্দায় একটি অসাধারণ এলাকা রয়েছে, সেখানে প্রায় ১০০টি প্রবাল দ্বীপ রয়েছে। এসব স্থানের তাপমাত্রাও আদর্শ, জেদ্দার থেকে পাঁচ থেকে সাত ডিগ্রী ঠাণ্ডা। এটা অনাবাদি জমি, আমি সেখানে শেষ আটটি ছুটি কাটিয়েছি। আমি সৌদি আরবে এইরকম দুর্লভ ভূখন্ডের সন্ধান পেয়ে বিমোহিত হয়েছি, এবং এই ভূখণ্ডটি সংরক্ষণ করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এর দৈর্ঘ ৩০০ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ২০০ কিলোমিটার। এটি এমন এক দুর্লভ সম্পদ যা অন্যান্য রাষ্ট্রীয় রাজস্ব তহবিলের বাইরে অনেক বেশি সম্পদের যোগান দিতে পারে।

আমাদের এমন আরও অনেক অব্যবহৃত সম্পদ রয়েছে মক্কা, মদিনার গ্রামাঞ্চলে ও শহর এলাকায়। উদাহরণ হিসেবে জেদ্দার কথা বলা যেতে পারে। এর আয়তন প্রায় পাঁচ মিলিয়ন বর্গ মিটার, সমুদ্র সৈকতের ঠিক সামনে, জেদ্দার প্রাণকেন্দ্রে। এটি বর্তমানে বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী দ্বারা পরিচালিত। শুধু এই জমির বাজার মূল্যই প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার। সমস্ত কাঠামো এবং ভবন স্থানান্তর বাবাদ এখানে ব্যয় হবে ৩০০ মিলিয়ন ডলার। এটি অব্যবহৃত থাকা নিঃসন্দেহে একটি বড় অপচয়। অব্যবহৃত সম্পদ ব্যবহার করে মুনাফা তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে উন্নয়নের ধারা সৃষ্টি করবে, এই বিশাল কাজ শুরু করার কথা আমরা বলছি। আমরা আশা করছি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে, রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ৪০০ বিলিয়ন ডলারের সমতুল্য নতুন সম্পদ যোগ করতে পারব।

Saudia changing economy

দ্য ইকোনমিস্ট: এসব সম্পদ কি আপনি বেসরকারিকরণ করবেন? এ জন্য তহবিল সংগ্রহ করতে হবে, এগুলো প্রকল্পে পরিণত করতে হবে, কোম্পানিতে রূপায়িত করার ব্যাপার আছে, এবং তারপর পাবলিক আইপিওতে পরিণত করতে হবে, এটা কি সৌদি আরবের ‘থ্যাচার বিপ্লব’?

সালমান: অবশ্যই। আমাদের অনেক অব্যবহৃত অমূল্য সম্পদ আছে এবং আমাদের কাছেও বিশেষ কিছু ক্ষেত্র রয়েছে যা খুব দ্রুত সম্প্রসারণ করা সম্ভব। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে যে, পানির ক্ষেত্রে আমরা দরিদ্রতম দেশগুলির অন্যতম। আমাদেরই একটি ডেইরি কোম্পানি সৌদি আরবের অনেক কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটি, যার ওমানের বাজারে যাদের ৮০% শেয়ার রয়েছে। কুয়েতি বাজারে তাদের শেয়ার শতকরা ২০ ভাগেরও বেশি। ৪০ ভাগেরও বেশি শেয়ার রয়েছে আমিরাতের বাজারে। মিশরে, যেখানে নীল নদ রয়েছে, সেখানেও তাদের শতকরা ১০ ভাগ শেয়ার রয়েছে। এটা তো গেল একটা কোম্পানির কথা। এ ছাড়া আমাদের বিভিন্ন দুগ্ধ, ও কৃষি কোম্পানি রয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টরেও একই সম্ভাবনা রয়েছে। খনি খাত, তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল সেক্টরসহ আরও অনেক বিশাল সম্ভাবনাময় খাত বিকশিত হবার প্রবল সুযোগ আছে।

দ্য ইকোনমিস্ট: এর জন্য বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এক হিসেবে দেখা গেছে, ২০৩০ সাল নাগাদ অন্তত ৪ ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে হবে। এই টাকা কোত্থেকে আসবে?

সালমান: এই হিসেবটা সৌদি সরকারের নয়, ম্যাকিনসে নামক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। আমরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে উচ্চাভিলাষী এবং কিছু ক্ষেত্রে রক্ষণশীল হওয়ার চেষ্টা করছি। যাহোক, ম্যাকিনসের সঙ্গে আমাদের সরকারের অনেক যৌথ গবেষণা রয়েছে। বিভিন্ন উৎস থেকে আমরা সম্ভাব্য বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করব। এর মধ্যে রয়েছে সৌদি বিনিয়োগকারী, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তহবিল, জিসিসি (উপসাগরীয়  সহযোগিতা পরিষদ) তহবিল এবং আন্তর্জাতিক তহবিল।

দ্য ইকোনমিস্ট: কেন একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী এখন সৌদি আরবে বিনিয়োগ করবেন?

সালমান: এটা লাভের প্রশ্ন। এবং এই লাভের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছি। একই সঙ্গে আমরা বিনিয়োগবান্ধব নিয়ম-নীতি তৈরি করছি যাতে তাদের বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। বিদেশি বিনিয়োগের জন্য সৌদি আরব নতুন কোনো দেশ নয়। ইতিমধ্যে সৌদি বাজারে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির বৃহত্তম প্রতিষ্ঠান বোয়িং, এয়ারবাস, জিই, জিএম, সোনি, সিমেন্সসহ প্রায় প্রতিটি জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানই রয়েছে। পৃথিবীর নামকরা সব ব্যাংকের শাখাও সৌদিতে রয়েছে। কাজেই আমিই প্রথম সৌদি আরবে বিনিয়োগের দ্বার উন্মোচন করছি না, বরং যে দ্বার ইতিমধ্যেই খোলা রয়েছে, সেটাকে আরও সুগম করছি মাত্র।

দ্য ইকোনমিস্ট: একটি চ্যালেঞ্জ নিয়ে আমরা এখনও আলোচনা করিনি তা হলো সৌদি যুবজনগোষ্ঠীর সংখ্যা: আপনার দেশের জনসংখ্যার ৭০ ভাগের বয়স বয়স ৩০ বছরের নিচে। আপনি এই বিপুল যুব-জনগোষ্ঠীর জন্য কিভাবে কাজের সুযোগ সৃষ্টি করবেন?

সালমান: বেসরকারি খাতে আমাদের চাকরির অনেক সুযোগ রয়েছে। খনি খাতে কর্মসংস্থানের একটি বিরাট সুযোগ সৃষ্টি করবে, হজ করতে আসা তীর্থযাত্রীদেরকে সহায়তার যে কর্মসূচি, সেটিও অনেক কর্মসংস্থান ঘটাবে। নতুন বিনিয়োগও চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করবে। আমরা মনে করি, আমাদের বেকারত্ব না বেড়ে বরং পরবর্তী কয়েক বছরে তা কমবে এবং দেশের জন্য একটি ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে। তাছাড়া আমাদের দেশে এখন প্রায় দশ বিলিয়ন বিদেশি শ্রমিক চাকরির বাজার দখল করে আছে। প্রয়োজন হলে এই পদগুলোও আমি সৌদি নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত করতে পারি। যদিও আমি এজন্য বেসরকারি খাতকে চাপ প্রয়োগ করতে চাই না। তবে এটা শেষ অবলম্বন হতে পারে।

দ্য ইকোনমিস্ট: আপনি বিদেশিদের নিয়োগে বাধা দেবেন?

সালমান: আমরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার চেষ্টা করছি, যদি আমরা সবদিক সামাল দিয়ে উঠতে পারি তাহলে তার দরকার হবে না। কিন্তু সেটা ব্যর্থ হলে বেসরকারি খাতের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে বাধ্য হব। যেমনটি করা হয়েছিল, ‘সৌদিকরণ কর্মসূচি’র সময়।

দ্য ইকোনমিস্ট: আপনার বর্ণনা মতে, আপনি বেশ কিছু পরিবর্তনের কথা বলেছেন, যেমন-তেল-বহির্ভূত খাতে রাজস্ব সূচনা, ভর্তুকি হ্রাস, বেসরকারি খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ইত্যাদি। এসব অনেকগুলো উপায়ে সৌদি অর্থনীতি এবং বিরাজমান সৌদি সামাজিক ব্যবস্থার পুনর্গঠনের এক নতুন প্রস্তাব। এই ব্যাপক পরিবর্তন কী অতি রক্ষণশীল সৌদি সমাজে সংঘাত সৃষ্টি করবে না?

সালমান: এটা সব কিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। এর ফলে সব কিছু বদলে যাবে এমনও নয়। আমাদের নিজস্ব কিছু ব্যাপার রয়েছে যা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ; এটা আমাদের কাছে যেমন মত প্রকাশের স্বাধীনতার বহিঃপ্রকাশ, পাশাপাশি মানবাধিকারের জন্য আমাদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সৌদি সমাজে নিজস্ব কিছু সমস্যা, মূল্যবোধ এবং নীতিমালা রয়েছে এবং আমরা আমাদের নিজস্ব চাহিদা অনুসারে উন্নতি লাভের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ৫০ বছর আগের পরিস্থিতি আর আজকের পরিস্থিতি মোটেও এক নয়। পঞ্চাশ বছর আগে আমাদের একটি সরকার পরিচালন ব্যবস্থা পর্যন্ত ছিল না। কিন্তু এখন আমাদের সক্রিয় সংসদ আছে, সংসদে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীর প্রতিনিধিত্ব আছে, নারীরা ভোট দিতে এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে। আজ আমরা অগ্রগতি করছি আমাদের নিজস্ব চাহিদা অনুযায়ী, আমাদের নিজস্ব গতি অনুযায়ী, এবং এটা অন্য কোনো মডেলের প্রতিক্রিয়া হিসাবে নয় ।

দ্য ইকোনমিস্ট: কিন্তু আপনি কি বিশ্বাস করেন যে অধিক প্রতিনিধিত্ব ছাড়া আরও করারোপ করতে পারবেন?

সালমান: না, কোনো করারোপ হবে না।

দ্য ইকোনমিস্ট: কিন্তু আপনি কর প্রবর্তন করছেন।

সালমান: আমরা করের বিভিন্ন ধরন নিয়ে কথা বলছি, আমরা ভ্যাট সম্পর্কে কথা বলছি, এটি কোনো মৌলিক পণ্যসামগ্রীতে প্রয়োগ করা হবে না; এটি আনুষঙ্গিক হতে হবে। ভ্যাট মৌলিক পণ্যের উপর হবে না। যেমন পানি, ডেইরি, দুধ ইত্যাদি।

দ্য ইকোনমিস্ট: তাহলে এসব পণ্য ভ্যাটের আওতা থেকে বাদ দেওয়া হবে?

সালমান: কোনো সন্দেহ নেই, এর দ্বারা মূল্য প্রভাবিত হয়।

দ্য ইকোনমিস্ট: আচ্ছা! কিন্তু প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো ছাড়া এ ধরনের করারোপ করতে পারবেন?

সালমান: আবারও বলছি, একটি বিষয়ের সঙ্গে অপরটি সম্পর্কিত নয়। এটি জনগণের বিরুদ্ধে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এটি সৌদি আরবের সিদ্ধান্ত। জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে এমন সরকারের সিদ্ধান্ত। সংস্কারমূলক এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে আমরা অনেক আলাপআলোচনা ও কর্মশালা করি। এতে অনেক মানুষ প্রতিনিধিত্ব করে ও মতামত দেয়।

দ্য ইকোনমিস্ট: বৃহত্তর সামাজিক সংস্কার সম্পর্কে আপনার ভাবনা কি? আপনি কীভাবে একটি সমৃদ্ধ আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করবেন, যেখানে একটি উজ্জ্বল পর্যটন শিল্প থাকবে, উন্নত স্বাস্থ্য-পরিচর্যাকেন্দ্র থাকবে, আধুনিক শিক্ষা কেন্দ্র থাকবে, যদি না সেখানে নারীরা অনুমতি ছাড়া গাড়ি চালাতে না পারে, অবাধে চলাফেরা করতে পারে?

সালমান: নারীরা এখন অবাধে চলাচল করতে পারেন। তারা ব্যবসা খাতে কাজ করছেন।

দ্য ইকোনমিস্ট: কিন্তু এ জন্য তাদের পরিবারের সদস্যদের অনুমতি নিতে হয়।

সালমান: এটা ভিন্ন বিষয়। যখন আপনি অনুমতি নিয়ে কথা বলছেন, তখন আপনি এমন নারীদের কথা বলছেন যারা একটি নির্দিষ্ট বয়সে পৌঁছায় নি। যারা নিজেদের দায়িত্ব নিতে এখনও সক্ষম হয়নি। এর সঙ্গে নিজস্ব একটি সামাজিক ও ধর্মীয় রীতি-নীতির ব্যাপার আছে। এর কিছু জিনিস আমরা পরিবর্তন করতে পারি। আবার কিছু জিনিস চাইলেও বদলাতে পারি না। কিন্তু আমি আপনাদের গ্যারান্টি দিচ্ছি যে সৌদি নারীদের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বা এগিয়ে যাওয়ার পথে কোনো বাধা নেই।REPRESENTATIVE IMAGE: A woman uses her mobile phone in a cafe in Riyadh, Saudi Arabia October 6, 2016. Picture taken October 6, 2016. REUTERS/Faisal Al Nasser/File photo

দ্য ইকোনমিস্ট: তাহলে কেন সৌদি আরবের নারীকর্মীর হার মাত্র ১৮% কেন, যা পৃথিবী সর্বনিম্ন হারের একটি?

সালমান: সৌদি আরবের সংস্কৃতিতে নারীদের অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণের রেওয়াজ নেই। অর্থনৈতিক কাজে নারীদের অংশগ্রহণে আগ্রহী করে তুলতে আরও সময় প্রয়োজন। বাস্তবতা হচ্ছে, সৌদি নারীদের একটি বড় অংশ বাড়িতে সময় কাটায়। কর্মজীবী নারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে তারা এখনও অভ্যস্ত হয়ে উঠেনি। এর জন্য সময় প্রয়োজন।

দ্য ইকোনমিস্ট: আপনি কি মনে করেন যে সৌদি আরবের নারীদের বেশিরভাগ যদি শ্রমবাজারে যুক্ত হয়, তাহলে সৌদি আরবের জন্য ভালো হবে?

সালমান: এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে সহায়ক বড় হাতিয়ারগুলোই অব্যবহৃত। এবং আমাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ভীতিকর অবস্থানে পৌঁছে গেছে। শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ এই উভয় সমস্যা মোকাবেলায় সহায়ক হবে।

দ্য ইকোনমিস্ট: যাদের বয়স ত্রিশ বা তার চেয়ে কম সেই ৭০% সৌদি নাগরিকের একজন হচ্ছেন আপনি। আপনার হাতে রয়েছে দেশের প্রতিরক্ষা ও অর্থমন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব, আপনি নানাভাবে সৌদি আরবের নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছেন। আসলে আপনি কোন ধরনের সৌদি আরব নির্মাণ করতে চান?

সালমান: আমি, একইসঙ্গে ৭০ ভাগ জনগোষ্ঠী সেই সৌদি আরব চায়, যেটি তেলের উপর নির্ভরশীল একটি দেশ হবে না। যেটি হবে ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী অর্থনীতির একটি সৌদি আরব; স্বচ্ছ আইনের সৌদি আরব; যার বিশ্বের বুকে খুব শক্তিশালী অবস্থান থাকবে। যেখানে যে কোনো নাগরিকের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের সুযোগ থাকবে, বিকশিত হওয়ার মতো ইতিবাচক পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। টেকসই একটি উন্নয়ন প্রক্রিয়া চালু থাকবে যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিকের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে। যে সৌদি আরব বিশ্বের বাজার ব্যবস্থায় উৎপাদন ও যোগানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং বিশ্ব যে সব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন সেগুলো মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।  সৌদি আরবের একজন যুবক হিসেবে আমার এবং সৌদি আরবের অন্যান্য মানুষের অনেক স্বপ্ন আছে, সেসব স্বপ্ন সমন্বয় ও বোঝাপোড়ার মাধ্যমে বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাব একটি উন্নত সৌদি আরব প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাব।

দ্য ইকোনমিস্ট: আপনি সৌদি আরবের জন্য খুবই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন, যদিও আমরা একটি বিপজ্জনক সময়ে বসবাস করছি, বিশেষ করে এ অঞ্চলে অনেক বছর ধরে একটা ভয়ঙ্কর অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। পরস্পরবিরোধী এই দুই সত্যকে অর্থাৎ স্বপ্ন ও বাস্তবতাকে আপনি কীভাবে মেলাবেন?

সালমান: আপনি ব্রিটেন থেকে এসেছেন, এবং আমি চার্চিলের একজন অনুরাগী। চার্চিল বলেছিলেন, সংকটের সময়ই সুযোগ আসে। যখনই আমি কঠিন পরিস্থিতি বা আঞ্চলিক সংকট দেখি তখনই আমি চার্চিলের ওই উক্তিটি মনে করি। আমি এ অঞ্চলের চ্যালেঞ্জ বা সংকটকে এভাবেই দেখি।

দ্য ইকোনমিস্ট: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ার পর এই অঞ্চলের সঙ্কট কি আরও জটিল হয়ে উঠেছে?

সালমান: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যা করতে চেয়েছে, সেটা আমরা বুঝি। আমেরিকা নানা ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়েছে। সংকট নিরসনে সব ধরনের মার্কিন উদ্যোগকে আমরা সহায়তা করার চেষ্টা করেছি। আমরা নিজস্ব মতামত প্রকাশ করার চেষ্টা করি। আমার কাছে মনে হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের কাজটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও মহৎ। যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে তারা বিশ্বের এক নম্বর এবং সে অনুযায়ী তাদের আচরণ করা উচিত।

দ্য ইকোনমিস্ট: তারা কি যথযথ ভূমিকা পালন করতে পারছে না?

সালমান: আমরা উদ্বিগ্ন যে এখনও অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক কিছুই ঘটতে পারে।

দ্য ইকোনমিস্ট: আপনি কি তাদের কারণে হতাশ?

সালমান: আমরা বুঝি। আমরা উপলব্ধি করি যে, আমরাও তাদের যে সমস্যা সেই সমস্যার অংশ এবং আমরা সচেষ্ট থেকেছি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি তাদের উপর চাপিয়ে না দিতে। আমরা আমাদের বিষয়গুলো তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে যথেষ্ট উদ্যোগ নিতে পারিনি। তবে আমার বিশ্বাস ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই এর পরিবর্তন হবে।

দ্য ইকোনমিস্ট: সৌদি আরব কি এই অঞ্চলে নতুন ধরনের নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করছে?

সালমান: এই অঞ্চলে আমরা মিত্রদের সঙ্গে একযোগে কাজ করছি। আমরা সবাই মিলে আঞ্চলিক সমস্যা ও চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করছি। আমরা এবং উপসাগরীয় সহযোগী সংস্থা (গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল-জিসিসি)-ভুক্ত দেশ, মিশর, তুরস্ক, সুদান, মধ্য আফ্রিকা, উত্তর আফ্রিকার দেশ, পশ্চিম আফ্রিকার দেশ, পূর্ব এশীয়  দেশ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি ও পাকিস্তান। আমরা সম্মিলিতভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার চেষ্টা করছি। কারণ এই চ্যালেঞ্জগুলি আমাদের সকলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং সম্মিলিতভাবে তা মোকাবেলা করতে হবে। আমরা ইতিবাচক উদ্যোগের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে চাই।

দ্য ইকোনমিস্ট: পাঁচ বছর আগে আরব বসন্ত শুরু হয়েছিল। নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে এই ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’ পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হলো। পরের পাঁচ বছর কেমন হবে বলে মনে করেন, ভালো বা খারাপ?

সালমান: আমরা উপলব্ধি করেছি যে, আমরা এমন একটি সমস্যার অংশ যেটা নিয়ে আমরা আমাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তাদের উপর চাপিয়ে দিইনি। আমাদের যুক্তিগুলো তাদের পৌঁছানোর যথাযথ প্রচেষ্টার যথেষ্ট অভাব ছিল। আরব বসন্তটি ছিল একটি প্রকৃত পরীক্ষা, কর্তৃত্ববাদী সরকার থাকবে না নমনীয় সরকার থাকবে? জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী সরকার থাকবে, নাকি যা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না এমন সরকার থাকবে। আরব বসন্তে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না-এমন শাসকদের পতন হয়েছে। অন্যান্য শাসনব্যবস্থার পরিণতিও আমরা দেখেছি।

দ্য ইকোনমিস্ট: সৌদি রাজ পরিবার কি সাধারণ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে?

সালমান: আমরা একটি জাতীয় প্রক্রিয়ার অংশ; আমরা স্থানীয় উপজাতি, দেশের অঞ্চলের প্রতিনিধি হিসেব গত তিনশত বছর ধরে একসঙ্গে কাজ করছি।

দ্য ইকোনমিস্ট: সম্মানিত যুবরাজ, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

সালমান: আপনাকেও ধন্যবাদ। এখানে আসার জন্য এবং প্রশ্নগুলো করার জন্য আমি আনন্দিত। আমরা সব সময় বন্ধুদের কাছ থেকে গঠনমূলক সমালোচনা আশা করি। আমরা যদি ভুল করি তবে আমাদের শুনতে হবে যে আমরা ভুল। কিন্তু যদি আমরা ভুল না করি, তাহলে আমাদের বন্ধুদের কাছ থেকে সমর্থন আশা করি। আমি সবাইকেই অনুরোধ করব আপনি যা বিশ্বাস করেন, তা অকপটে বলার জন্য। আমরা তা সব সময়ই করি। আবারও ধন্যবাদ।

Responses -- “সৌদির আরবের নয়া রাজনীতি: প্রিন্স সালমান আল সৌদ এর জবানিতে”

  1. তারিকুল বাশার

    অচিরেই যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করে অনেকগুলো বন্ধুকে হারাবে, যারা আবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শত্র“ হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করবে। ব্যাপারটা কিন্তু একেবারেই সহজ এবং স্বাভাবিক। যেমন ইরানের শাহ ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু। তখন ইরান ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের বন্ধুরাষ্ট্র। কিন্তু ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানের ক্ষমতায় পরিবর্তন হওয়ায় সেই ইরানই হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রধান শত্র“। একইভাবে তুরস্কের সাথে ইসরাইলের বন্ধুত্ব থাকলেও তুরস্কে ইসলামপন্থী দলের ক্ষমতারোহণের ফলে ইসরাইলের সাথে বন্ধুত্ব কমে গেছে বরং তুরস্ক হয়ে উঠছে ইসরাইলের প্রতিপক্ষ। সুতরাং মুসলিম বিশ্বে আজ যেই পরিবর্তনের ঢেউ, সেই পরিবর্তনের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের ক্ষমতার যে পালাবদল তা নিশ্চিতভাবেই ইসলামপন্থীদের উত্থান, যারা পাশ্চাত্যের প্রতিপক্ষ হিসেবেই আবির্ভূত হবে। তার মানে মুসলিম দেশসমূহের ওপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্ব হারাবে। এদিকে পাশ্চাত্যের প্রতিপক্ষ হিসেবে অনেকগুলো মুসলিম দেশের উত্থানে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের নেত্বত্বে পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাব খুব দ্রুত হ্রাস পাবে। অপর দিকে মুসলিম দেশসমূহে ইসলামপন্থীদের উত্থানে সারা বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে দ্রুতগতিতে নবজাগরণ ছড়িয়ে পড়বে। যার ফলে প্রায় সকল মুসলিম দেশেই যুক্তরাষ্ট্রের তাঁবেদার নেতারা ক্ষমতাচ্যুত হবেন এবং সেই স্থান ইসলামপন্থীরা দখল করবে। ফলে পুরো মুসলিম বিশ্বই পাশ্চাত্যের হাতছাড়া হয়ে যাবে এবং পাশ্চাত্যের প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হবে। আর মুসলিম দেশসমূহ যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রকে নেতা মানবে না, সেহেতু যুক্তরাষ্ট্র অটোমেটিক্যালি তার নেতৃত্ব হারিয়ে ফেলবে। এদিকে মুসলমানদের হাতে তেল, গ্যাসসহ অতি মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ থাকার কারণে মুসলমানরাই হয়ে উঠবে বিশ্বরাজনীতি এবং অর্থনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক। এ অবস্থায় জনতার প্রতিরোধে ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্র পালিয়ে আসতে বাধ্য হবে। ফলে ইরাক-আফগানিস্তান দখলদারমুক্ত হবে এবং তারা ইরান-তুরস্ক-মিসরের নেতৃত্বাধীন মুসলিম দেশসমূহের জোটে যোগ দেবে। ফিলিস্তিন এবং কাশ্মীরের স্বাধীনতা আন্দোলন বেগবান হবে। ফিলিস্তিনকে স্বাধীনতা দিতে ইসরাইল যে কেবল বাধ্য হবে তা নয় বরং ইসরাইলের অস্তিত্বই বিপন্ন হবে। এ অবস্থায় ওআইসি এবং আরব লিগ একটি শক্তিশালী এবং কার্যকরী সংস্থা হিসেবে আবির্ভূত হবে। অপর দিকে মুসলিম দেশগুলোর সাথে ল্যাটিন আমেরিকার কট্টর যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী দেশ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, চিলি, ভেনিজুয়েলা, নিকারাগুয়া, কিউবা, পেরু ইত্যাদির সম্পর্ক আরো বৃদ্ধি পাবে। এদের সাথে আবার দুই বৃহৎ পরাশক্তি রাশিয়া এবং চীনের সহযোহিতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এবং পাশ্চাত্যের বিরুদ্ধে বিশাল একটি জোট গড়ে উঠবে। সুতরাং বিশ্বরাজনীতি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায় অত্যাসন্ন।

    Reply
  2. বেলায়েত হোসেন

    ইউরোপে বাস করতেন এমন তিনজন সৌদি যুবরাজ গত কয়েকবছরে নিখোঁজ হয়েছেন। এরা তিনজনই সৌদি সরকারের সমালোচক ছিলেন। এরা হলেন যুবরাজ সুলতান বিন তুর্কী বিন আব্দুল আজিজ, যুবরাজ তুরকি বিন বান্দার এবং যুবরাজ সৌদ বিন সাইফ আল-নাসর। প্রমাণ রয়েছে যে এই তিনজনকেই অপহরণ করা হয়েছে এবং বিমানে করে সৌদি আরবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তারপর থেকে এদের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।
    বিবিসির তদন্তে বলা হয়, ২০০৩ সালের ১২ জুন অপহৃত হন ভিন্ন মতাবলম্বী সৌদি রাজপুত্র সুলতান বিন তুর্কী বিন আব্দুল আজিজ। তাকে অপহরণ করে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে বলে কয়েকজন পশ্চিমা সাক্ষী দিয়েছেন। এরা সুলতানের সফর সঙ্গী ছিলেন।
    সফরসঙ্গীরা জানান, এরা ভেবেছিলেন বিমানে চড়ে তারা ফ্রান্স থেকে মিশরে যাচ্ছেন। কিন্তু প্রাইভেট জেট বিমান অবতরণ করে সৌদি আরবে। এরপর থেকে যুবরাজের কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সুলতানের ‘অপরাধ’ কি? জানা যায়, ২০০২ সালে ইউরোপে চিকিৎসার জন্য এসে সুলতান সৌদি সরকারের মানবাধিকার রেকর্ড, যুবরাজ ও কর্মকর্তাদের দুর্নীতির সমালোচনা করে কিছু সাক্ষাৎকার দেন এবং কিছু সংস্কারের আহ্বান জানান।
    উল্লেখ্য, ১৯৩২ সালে সৌদি আরবে বাদশাহ আবদুলআজিজ ইবনে সৌদ ক্ষমতাসীন হবার পর থেকেই দেশটি রাজতন্ত্র এবং এখানে ভিন্নমত সহ্য করা হয় না।
    রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ বিবাদের কারণে যুবরাজ তুরকি বিন বান্দারকে জেল খাটতে হয়েছে। ছাড়া পাবার পর তিনি প্যারিসে পালিয়ে যান এবং সৌদি আরবে সংস্কার দাবি করে ইউটিউবে ভিডিও ছাড়েন। তখন দেশে ফেরার জন্য তার ওপর চাপ দেয়া হয়। একই সময় যুবরাজ সৌদ বিন সাইফ আল-নাসর নামের আরেক জন যুবরাজেরও একই পরিণতি হয়। তিনি ইউরোপের ক্যাসিনো এবং ব্যয়বহুল হোটেল পছন্দ করতেন। ২০১৪ সালে তিনি সৌদি রাজতন্ত্রের সমালোচনা করে টুইট করতে শুরু করেন। যেসব সৌদি কর্মকর্তা মিশরের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মোরসিকে উৎখাত করায় সমর্থন দিয়েছিলেন, তাদের বিচার দাবি করেন সৌদ বিন সাইফ। যুবরাজ খালেদ যিনি এখনো জার্মানিতে আছেন, আশংকা করছেন তাকেও একদিন জোর করে রিয়াদে নিয়ে যাওয়া হবে। খালেদ জানান, সৌদি রাজপরিবারের সমালোচনা করেছে এমন ওই পরিবারের চারজন সদস্য ইউরোপে ছিল। তিনজনকে অপহরণ করে সৌদি আরবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শুধু আমিই বাকি। আমি নিশ্চিত যে এরপর আমার পালা। তারা যদি পারতো এতদিনে কাজটা করেও ফেলতো। আমি খুবই সাবধানে থাকি, তবে এটা আমার স্বাধীনতার মূল্য।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—