আবার ১৬ ডিসেম্বর ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে কোটি কোটি হৃদয়ে আনন্দ আর অশ্রুর বন্যা বইয়ে দিয়ে গেল, আবারও মনে পড়ল ৪৬ বছর আগের সেই উদ্দাম আনন্দ আর অশ্রুস্রোত।

“যে দেখেনি বুঝবে না সে এমন কেয়ামত ছিল,

কেয়ামতেই জাতির স্বাধীনতার নেয়ামত ছিল”।

কেমন হত যদি তখনকার আটকে পড়া পাকিস্তানিদেরকে বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে দাস হিসেবে বিতরণ করত, মুক্তিযোদ্ধারা  পুরুষদেরকে বিক্রি করে দিত আর নারীদেরকে যৌনদাসী হিসেবে রেখে দিত, বলত – ‘আল্লাহ বলেছেন?’  কি হয় যদি কোনো দেশে বিজয়ী সরকার পরাজিত দেশের নারী পুরুষকে দাস-দাসী বানিয়ে বিজয়ী সৈন্যদের মধ্যে বিতরণ করে?  তারা দাসীদেরকে ইচ্ছেমতো বিছানায় নিয়ে যায়, বাজারে বিক্রি করে বা বন্ধুদেরকে ‘উপহার’ দেয়?

চিরকাল ইসলাম বিদ্বেষীরা (যাদের চোখে ইসলাম মুসলিমের সব কিছুই খারাপ) ও ইসলামের সমালোচনাকারীরা (যারা অনেক পড়াশোনা করে দলিলের ভিত্তিতে ভদ্রভাবে ইসলাম-মুসলিমের সমালোচনা করেন) অভিযোগ করে এসেছে, ইসলাম যদি শান্তির ধর্মই হয় তবে দাসপ্রথা উচ্ছেদ করল না কেন।  অভিযোগটা যৌক্তিক।

বলাই বাহুল্য মাত্র দু’আড়াইশ বছর আগেও পশ্চিমা অনেক দেশ আইন করে এটা বন্ধ করার আগে এ বর্বর প্রথা চালু ছিল, এমনকি গির্জাগুলো পর্যন্ত দাস-ব্যবসা করত। অথচ কোরান সেই ১৪০০ বছর আগেই দাসপ্রথা শেকড় থেকে উচ্ছেদ করেছিল।   পরে মুসলিম রাজারা ইসলামের নামেই নানারকম শরিয়া আইন ও হাদিস বানিয়ে ধূর্তভাবে দাসপ্রথাকে আবার প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এই দুটো পদ্ধতিই দেখব আমরা এখন।

নবীজীর (স) পর বহু শতাব্দী ধরে বহু দেশ বিজয়ের ফলে মুসলমানরা অসংখ্য দাস-দাসীর মালিক হয়েছিল। মাত্র সাতজন সাহাবী মুক্ত  করেছিলেন ৩৯,২৫৯ জন দাস-দাসীকে (সূত্র ৪)।  হাকিম বিন হাজাম একাই মুক্ত করেছিলেন ২০০ জনকে (সূত্র ৫)।  কিন্তু এই শতাব্দী-প্রাচীন কুপ্রথাকে কোরান হঠাৎ একদিন বিপ্লব করে উচ্ছেদ করলে ভেঙে পড়ত ফ্রি-শ্রম ভিত্তিক অর্থনীতি, জনগণ হয়ে পড়ত বিভ্রান্ত আর অসংখ্য দাস-দাসী হয়ে পড়ত নিরাশ্রয় অন্নহীন।  কারণ জনগণ যদি মনের দিক থেকে তৈরি না হয় তবে যে কোনো ভাল জিনিসও জোর করে চাপিয়ে দিলে ফল খারাপ হতে বাধ্য।  সে-জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বিপ্লবের চেয়ে বিবর্তনই ভাল,  অতীত-বর্তমানে এর বহু উদাহরণ আছে।

দাসদের ওপরে অনিয়ন্ত্রিত অত্যাচার হত ইসলাম আসার আগে।  যেহেতু যুদ্ধবন্দিনীরা ছিল দাসী, তাই এদের সাথে শোয়া বিজয়ী মুসলিম-সৈন্যদের জন্য প্রথম দিকে জায়েজ ছিল (সূত্র ২২, ২৬, ২৯)।   (ড: আসগর আলী ইঞ্জিনিয়ার, আমীর আলি, হারুন ইয়াহিয়া, ড: এডিপ ইউকসেল প্রমুখ বিশেষজ্ঞরা অবশ্য দাবি করেন, দাসীর সাথে শোয়ার ব্যাপারটা বুঝবার ও অনুবাদের গোলমাল, কোরান কখনো একে অনুমতি দেয়নি। কিন্তু উনারা মেইনস্ট্রিম নন)।

যাই হোক, যুদ্ধবন্দিনীদের দূর দেশে পাঠিয়ে দাসের হাটে বিক্রিও করা হত (সূত্র ২৩)।   কোরান (ক) প্রথমে দাসদের সাথে দুর্ব্যবহার করা বন্ধ করেছে। তারপরে (খ) কিছু অধিকার দিয়ে জনগণের মন-মানসে দাসদের ‘মানুষ’ ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেছে, তারপরে (গ) তাদের মুক্তির ব্যবস্থা করেছে এবং সবশেষে (ঘ) দাসপ্রথার শেকড় কেটে দিয়ে পুরো উচ্ছেদের বিধান দিয়েছে।

কোরান যদি দাসপ্রথার পক্ষে থাকত তবে দাসের ওপর শতাব্দী প্রাচীন অনিয়ন্ত্রিত অত্যাচার নিয়েই সন্তুষ্ট থাকত।কিন্তু আমরা দাসপ্রথার বিরুদ্ধে এক উদ্বিগ্ন কোরানকে দেখতে পাই যে কিনা কারণে হোক অকারণে হোক, যুক্তিতে হোক বাহানায় হোক, যেসব ব্যাপারের সাথে দাসপ্রথার কোনোই সম্পর্ক নেই সেগুলোকেও প্রয়োগ করেছে দাসমুক্তির জন্য। যেমন:

১।  সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ হলে দাস-দাসীদের মুক্তি দাও (সূত্র ১১)।

২। রমজানে রোজা না রাখলে বা রোজা রাখার প্রতিজ্ঞা ভাঙলে, ক্ষতিপূরণ হিসেবে দাস-দাসীদের মুক্তি দাও (সূত্র ২)।

৩। রোজা অবস্থায় হঠাৎ আল্লা-রসুলের প্রতি খারাপ কথা মুখ দিয়ে বের হয়ে গেলে দাস-দাসী মুক্তি দাও (সূত্র ২৫)।

৪। জাকাতের পয়সা দিয়ে দাস-দাসী কিনে তাদের মুক্তি দিতে পারো (সূত্র ২৭)।

৫। কোনও গর্ভবতীকে আঘাত করে কেউ গর্ভপাত ঘটালে দাস-দাসী মুক্তি দিয়ে ক্ষতিপূরণের রায় দিতে পারে আদালত (সূত্র ৩)।

৬। ক্রীতদাসদের বলা হয়েছে ‘ভাই’, অর্থাৎ দাসীরা বোন।  একই খাবার-পোশাক দিতে বলেছেন নবীজী(স), সাধ্যাতীত কাজ দিতে

নিষেধ করেছেন, আরো অনেক ভালো কথা আছে (সূত্র ১৫)।

৭। দাসীদের মুক্ত করে বিয়ে করার চাপও দিয়েছে ইসলাম, একেবারে দ্বিগুণ সওয়াবের কথা বলে উদ্বুদ্ধ করেছে (সূত্র ১৪, ১৮, ১৯)।

৮।  মৃত্যুশয্যায় সাহাবীদের প্রতি দাসদের জন্য নবীজীর (স.) উৎকণ্ঠিত নির্দেশ অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী।

যদিও একটি ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মুসলিম দাসদেরই মুক্ত করার কথা বলেছে কোরান (সূত্র ৬), তবু সব মিলিয়ে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায়  ১৪০০ বছর আগে এ এক অসাধারণ বিপ্লব। এতসব পদক্ষেপ নেবার পর গণমানসে যখন দাসদের ভাবমূর্তি ধীরে ধীরে ‘হুকুম পালনকারী পশু’ থেকে ‘হুকুম পালনকারী মানুষ’- এ উন্নীত হল তখন এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, দাসপ্রথার একেবারে শেকড়ে মরণাঘাত হানল কোরান।

কি সেই মরণাঘাত ?  কোন সূরা, কোন আয়াত ?  ইসলামের প্রথমদিকে মক্কার, না শেষের দিকে মদিনার আয়াত সেটা ?

এবারে আবেগবর্জিত হয়ে অংক করা যাক। ১৪০০ বছর আগের আরবভূমি – চারদিকে শুধু গোত্র আর গোত্র – পরস্পরের সাথে লড়াই ঝগড়া লেগেই আছে। কেউ স্বগোত্রের কাউকে হারাতে চায় না কারণ সদস্য সংখ্যাই গোত্রের শক্তি, তাই সাধারণভাবে স্বগোত্রের কাউকে দাস বানাবার সামাজিক সংস্কৃতিও নেই। দাসের একমাত্র উৎস যুদ্ধবন্দীরা। যুদ্ধবন্দী যদি না থাকে তাহলে দাসও থাকবে না। কোরান আঘাতটা হেনেছে সেখানেই – সূরা মুহম্মদ আয়াত ৪।  সংশ্লিষ্ট অংশ:-

“…যখন তাদেরকে পূর্ণরূপে পরাভূত কর তখন তাদেরকে শক্ত করে বেঁধে ফেল। অতঃপর হয় তাদের প্রতি অনুগ্রহ কর, না হয় তাদের নিকট হতে মুক্তিপণ লও…।”

পরিষ্কার হুকুম, যুদ্ধবন্দীদেরকে মুক্তি দিতে হবে মুক্তিপণ নিয়ে বা না নিয়ে। ব্যাস, চ্যাপ্টার ক্লোজড। আয়াতটা মদীনায় অবতীর্ণ।

কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে পরে ইসলামের এই মানবাধিকারকে সম্পূর্ণ উল্টে দেয়া হল।  দাস-দাসীর ওপরে এমন অনেক হাদিস আছে যেগুলো ওপরে দেখানো মানবিক সুত্রগুলোর বিরোধী, স্বভাবতই সেগুলো স্বার্থের জন্য বানানো।

শরিয়া আইন বানানো হয়েছে – “যুদ্ধবন্দিনী হওয়া মাত্র নারীদের পূর্বের বিবাহ বাতিল হইবে” (সূত্র ঝ)।  ওরা ওদের ধর্মমতে বিয়ে করেছে, তুমি তাদের বিয়ে বাতিল করার কে?   মতলবটা পরিষ্কার, বন্দীনি ধর্ষণ।  বিজয়ী সৈন্যেরা বলছে–“আমরা যুদ্ধের গণিমত হিসেবে প্রাপ্ত রমণীদের সাথে আজল (নারী-দেহের বাইরে বীর্যপাত) করিতাম (সূত্র ৭)।  এমন হাদিসও আছে-কিছু সৈন্য বন্দিনীদের স্বামীদের সামনেই তাদের ধর্ষণ করত, কিছু সৈন্য “তাহা পছন্দ করিত না” ( সূত্র ৩২)। কিন্তু এ হাদিসটা ঠিক নয়, এর উল্টো হাদিস আছে সহি মুসলিমে।

অনুবাদ বিশেষে হাদিস নম্বরগুলোর কিছু ব্যত্যয় ঘটে।  আমরা খেয়াল করিনা, শরীয়া আইন বানানো হয়েছে হাদিস সংকলনের আগে, সেজন্যই আমরা অন্যায় আইনগুলোর সমর্থনে ‘জাল হাদিস’ দেখতে পাই। যে হতভাগী দাসীগুলোর  একই সাথে দুই, তিন, বা দশ-বারো জন মনিব ছিল, কিভাবে কাটত তাদের দিন-রাত ?

দু’একটা নয়, ছয় ছয়টা হাদিস এবং হানাফি আইন বলছে দাসীদের একসাথে কয়েকজন মনিবের প্রথা ছিল এবং মনিবদের অধিকার ছিল তাদের পারস্পরিক সম্মতিতে ঐ দাসীদের সাথে শোয়ার (সূত্র ৯)।   নবীজীর চোখের সামনে এ অনাচার হয়েছে তা আমরা বিশ্বাস করি না, এ-সব হাদিস পুরুষতন্ত্রের স্বার্থে পরে বানানো হয়েছে।  কে জানে কত লক্ষ লক্ষ হতভাগিনীর জীবন শুধু এর-ওর-তার বিছানায় কেটেছে।  একটা সূত্র দিচ্ছি, সহি বুখারী ভল্যুম ৩ হাদিস ৬৯৮, এটা আছে হাদিস ৬৯৭, ৬৯৯, ৭০১ ও ৭০২-তেও :-

“আল্লাহ’র নবী (দঃ) বলিয়াছেন যদি কেউ কোন এজমালি (যার অনেক মালিক আছে) দাস-দাসীকে নিজ অংশ থেকে মুক্ত করে এবং তাহার কাছে পুরো মুক্তি দেবার মত যথেষ্ট অর্থ থাকে তাহলে তাহার উচিত কোন ন্যায়পরায়ন লোক দ্বারা সেই দাস-দাসীর উপযুক্ত মূল্য নির্ধারণ করা, এবং তাহার অংশীদারদের তাদের অংশের মূল্য দিয়া সেই দাস-দাসীকে মুক্ত করিয়া দেয়া।  তাহা না হইলে সে শুধু সেই দাস-দাসীকে আংশিক মুক্ত করিল।” এর সাথে হানাফি আইনটা মিলিয়ে নিলে পরিষ্কার হবে :- “অংশীদার (মালিকগণ) পরস্পরের সম্মতিক্রমে ক্রীতদাসীকে দৈহিকভাবে উপভোগ করিতে পারিবে” (সূত্র ১)।

আশ্চর্য নয়, মুসলমানদের অমঙ্গল এসেছে তাদেরই আচরণ থেকেই (সূত্র ২৮)।   এবারে আমরা দেখব সূরা মুহাম্মদ আয়াত ৪ লঙ্ঘন করে কি নির্মম নৃশংস পদ্ধতিতে দাসপ্রথাকে পুন:প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে:-

 

১. “দাসী (স্ত্রীর) গর্ভ থেকে যে সন্তান জন্মগ্রহণ করে, সে মালিকের গোলাম হয়” (সূত্র ১০)।  বিয়ে করা দাসীর বাচ্চা-ই যদি গোলাম হয় তবে বিয়ে না-করা দাসীর বাচ্চারা তো গোলাম হবেই।  এতে দাসপ্রথা কখনোই বন্ধ হবে না।

২. ট্যাক্স দেয়া বড্ড কষ্ট, চিরকাল মানুষ এটা ফাঁকি দিতে চেয়েছে। আর ফাঁকির পদ্ধতিটা “হালাল” হলে তো কথাই নেই।  দেখুন শরিয়া আইন :

“অন্যান্য সম্পত্তির ওপরে জাকাত থাকলেও ক্রীতদাস-সম্পত্তির ওপরে জাকাত নেই” (সূত্র ১২)।  অর্থাৎ দাস-ব্যবসায়ে টাকা খাটানোকে উৎসাহিত করে দাসপ্রথাকে শক্তিশালী করা হলো।

৩. ক্রীতদাস যদি মালিক ও আল্লাহকে ঠিকমত মেনে চলে তাহলে তার দ্বিগুণ সওয়াব হবে (সূত্র ১৩ ও ১৪)।   অর্থাৎ মালিককে একেবারে

আকাশে তুলে দাসের মনে আরও একটা শেকল পরানো হল, মালিক অত্যাচারী হলেও সে বিদ্রোহের কথা চিন্তাও করবেনা।

৪.  এটা একটা মারাত্মক কথা। এবং মর্মান্তিক। যদি কোন দাস বা দাসী তার মালিকের কাছ থেকে পালিয়ে যায় তবে ফিরে না আসা পর্যন্ত

তার কোন ইবাদত কবুল হবে না (সূত্র ২১)।  এই নিয়মে দাসপ্রথাকে একেবারে চরম শক্তিশালী করে তোলা হল।

৫. এমনকি মুক্ত করে দেবার পরও দাস-দাসীরা প্রাক্তন মালিকের কাছে অদৃশ্য মালিকানায় বাঁধা থাকত, অন্য কারো সাথে বন্ধুত্ব করা পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল।   করলে হুমকি ছিল তাদের কোনো ইবাদত কবুল হবে না – সূত্র ২০।

৬. মালিকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে তা অবৈধ, সেটা ব্যভিচার হবে (সূত্র ৩৫)।

৭. যদিও দ্বিগুণ সওয়াবের কথা বলে দাসীদের মুক্ত করে বিয়ে করায় উদ্বুদ্ধ করেছে ইসলাম (সূত্র ১৪, ১৮, ১৯) কিন্তু পরে দেখা গেল, কারো কাছে স্বাধীন নারীকে বিয়ে করার পয়সা থাকলে দাসীকে বিয়ে করাকে (হানাফী মতে) মাকরূহ ও (শাফি’ মতে) হারাম করা হয়েছে (সূত্র ৮)।

“যেমনভাবে দাস-দাসীদের মার, তেমনভাবে স্ত্রীদের মারবে না।   তারপর (অর্থাৎ স্ত্রীদের মারার পর) রাতে তাদের সাথে শোবে”(সূত্র ২৪)  এবং পরকীয়া ছাড়া স্ত্রী-প্রহারকে নবীজী (স) কখনো বৈধতা দেননি (সূত্র ৩৩ ও ৩৪), এসব হাদিস আমরা বিশ্বাস করি না।   আমরা বিশ্বাস করি যা তিনি স্ত্রীর ব্যাপারে সুস্পষ্ট বলেছেন, হুবহু উদ্ধৃতি:- “DO NOT BEAT THEM, AND DO NOT REVILE THEM”  অর্থাৎ “তাহাদিগকে প্রহার করিবে না, এবং তাহাদিগকে অপমান-নিগ্রহ করিবে না” – সহি আবু দাউদ হাদিস ২১৩৯।  হ্যাঁ, এই হলেন শান্তির দূত, হিংস্রতা মারপিটের তথাকথিত “নবী” নন।  বৌ পিটিয়ে কোনো জাতি উন্নতি করতে পারে?  তাও অনেক সময় বাচ্চাদের সামনে?  লজ্জার কথা !

দাসীদের বিয়ে করাকে প্রথমে উৎসাহিত করা হলেও নবীজীর (স) পরে আইন হয়েছে:- “হজরত ইমাম শাফেয়ী ও  অন্যান্য ইমামের মতে ইহুদী বা খ্রিস্টান দাসী বিয়ে করা সর্বাবস্থায় অবৈধ” (সূত্র ১৭)।  (ইমামেরা লিখেছিলেন অল্প, তাঁদের পরে তাঁদের ছাত্রেরা ও ছাত্রদের ছাত্ররা ইমামদের নামে নিজেদের বহু আইন ঢুকিয়ে দিয়েছে – বিস্তারিত দেখুন আমার বই – “শরিয়া কি বলে, আমরা কি করি”-তে)।

মওলানা মওদুদি বলেছেন:- “ইসলামি আইন অনুসারে যুদ্ধবন্দির নিজের দেশ যদি মুক্তিপণ দেয় তবে বন্দিরা মুক্ত হইবে। বন্দি-বিনিময়ও চলিবে। এই দুই উপায় না থাকিলে যুদ্ধবন্দিরা দাস-এ পরিণত হইবে” (সূত্র ৩০)।   তাঁর তাফহীমুল কুরআন বইতে সূরা নিসা আয়াত ২৪-এর ব্যাখ্যাতেও তিনি এসব বলেছেন, ওটাও ইন্টারনেটে পাওয়া যায়।

ড: জাকির নায়েকও কম যান না – ইসলামে দাসপ্রথা এবং বন্দিনী ধর্ষণের সমর্থনে তাঁর সবচেয়ে বড় যুক্তি হল ওই প্রথা আমেরিকার গুয়ান্তানামো বে’ কারাগার থেকে অনেক ভালো।  আপনারাই বলুন, এ কোনো যুক্তি হল?  এখানে লিংক দেয়া নিষেধ, তবে বক্তৃতাটা ইউটিউবে পাওয়া যায়।   কিন্তু তিনি অন্তত: একটা দরকারী কথা বলেছেন যা মওদুদী বা ডঃ ফওজান বলেন নি; তা হল – ওসব অতীতের ব্যাপার, এখন আর ওগুলো প্রয়োগ করা যায় না।  আসলে নবীজীর (স) পরে মুসলিম ক্ষমতাশালীদের কোরান-বিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রমাণ আছে মওদুদী- ইমাম গাজ্জালী সহ অনেক দলিলে – এবং সাহাবীর এই কথায়:- “হে ভাতিজা ! তুমি তো অবগত নও রসুলুল্লাহ (দঃ)-এর ইহকাল ত্যাগের পর আমরা কি কি বিপরীত কার্য করিয়াছি”- সূত্র ৩১? (বইটা হারিয়ে গেছে, কেউ পৃষ্ঠাটা স্ক্যান পাঠালে ভাল হয়)।

মর্মবাণী : কোরানের কিছু হুকুম শুধু মুসলিমের জন্য, কিছু সারা  মানবজাতির জন্য, কিছু পুরুষের ও কিছু নারীর জন্য, কিছু সেই সমাজের জন্য ও কিছু চিরকালের।  পরিস্থিতির পরিবর্তন হবার ফলে কিছু হুকুম নবীজীর (স) জীবদ্দশাতেই পরিবর্তন করা হয়েছে – প্রিন্সিপল্স্ অব ইসলামিক জুরিস্প্রুডেন্স − ডঃ হাশিম কামালী পৃঃ ৩২৫ ইত্যাদি।  সামাজিক-পারিবারিক শান্তি প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি কোরানে যথেষ্ঠই আছে, সমস্যা হয় যখন আমরা কোরানের হুকুমগুলোর গতিময়তা উপেক্ষা করে সেই সমাজের তাৎক্ষণিক হুকুমকে শ্বাশ্বত মনে করে বর্তমানে প্রয়োগ করি।

 

নিবন্ধ সূত্র:-

১।           চ-এর পৃষ্ঠা ২৩১।

২।           খ-এর আইন নং ১৬৬৯, ১৬৭৪, ১৬৮১, ইত্যাদি।

৩।          গ-এর হাদিস নং ২৬৩০ এবং ২৬৩১।

৪।           ক-এর পৃষ্ঠা ১২৫৭।

৫।           ঘ-এর ভল্যুম ৩, হাদিস নং ৭১৫।

৬।          সুরা নিসা, ৯২।

৭।            গ-এর হাদিস নং ২৪৩৪ ও ২৪৩৫ ; ঘ-এর ৩য় খণ্ড, হাদিস ৭১৮ ও অন্যান্য।

৮।          ক-এর পৃষ্ঠা ২৪২।

৯।           ঘ-এর ভল্যুম ৩, হাদিস নং ৬৯৭, ৬৯৮, ৬৯৯, ৭০১, ৭০২, ৭০৩ ও ৭০৪।

১০।         ক-এর পৃষ্ঠা ২৪২।

১১।         ঘ-এর ভল্যুম ৩, হাদিস নং ৬৯৫ ও ৬৯৬।

১২।         ঘ-এর ভল্যুম ২, হাদিস নং ৫৪২ ও ৫৪৩ এবং গ-এর হাদিস নং ১১০৮।

১৩।        গ-এর হাদিস নং ২৩৮৮।

১৪।         ঘ-এর ভল্যুম ৪, হাদিস নং ২৫৫।

১৫।         গ-এর হাদিস নং ২৩৮৯ থেকে ২৩৯১-এর অংশ ও ২৬১৭।

১৬।        সৌদি ইনফরমেশন এজেন্সি, ইণ্ডিপেণ্ডেণ্ট সৌদি নিউজ

১৭।         ক-এর পৃষ্ঠা ২৪২।

১৮।        ঘ-এর ভল্যুম ৩, হাদিস নং ৭২০, ভল্যুম ৭, হাদিস নং ২০।

১৯।         গ-এর হাদিস নং ২৩৮৬।

২০।         ঘ-এর ভল্যুম ৩, হাদিস নং ৯৪ ও ভল্যুম ৪, হাদিস নং ৪০৪।

২১।         ছ-এর পৃষ্ঠা ৩৭৭।

২২।         সুরা আল মুমিনুন, আয়াত ৫, ৬, ৭।

২৩।        জ-এর ভল্যুম ৩, পৃষ্ঠা ১১২।

২৪।         গ-এর হাদিস নং ২৪৬৮।

২৫।         খ-এর আইন নং ১৬৭৫।

২৬।        সুরা আল্-আহযাব, আয়াত ৫২।

২৭।         খ-এর আইন নং ১৯৩৩ (৫)।

২৮।        ক-এর পৃষ্ঠা ২৬৭।

২৯।         সুরা আল্ মা’আরিজ, আয়াত ২৯, ৩০, ৩১।

৩০।        মুনির কমিশনের সামনে মওদুদির বক্তব্য, পৃষ্ঠা ২২৫, রিপোর্টটা ইন্টারনেটে পাওয়া যায়।

৩১।        ঞ-এর পৃষ্ঠা ২৯৭, হাদিস নং ১৫০৫।

৩২।        ট-এর হাদিস নং ১১-এর ২১৫০।

৩৩।       ঠ-এর পৃষ্ঠা ৮৫২, ধারা ১৩২২ – বিশ্লেষণ।

৩৪।        ড-এর পৃষ্ঠা ১৭১।

৩৫।  সহি আবু দাউদ, হাদিস ২০৭৩।

(ক)             বাংলায় কোরাণ শরীফের অনুবাদ – মওলানা মুহিউদ্দীন খান।

(খ)              ইসলামী আইন –  আয়াতুল্লাহ আল্ উজামা সৈয়দ আলী আল্ হুসায়নী আল্ সীস্তানী।

(গ)              বাংলায় সহি বোখারীর সঙ্কলন – মুহম্মদ আবদুল করিম খান।

(ঘ)              সহি বোখারীর ইংরেজী অনুবাদ  – ডঃ মুহম্মদ মহসীন খান, মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়।

(ঙ)             হাদিস সঙ্কলনের ইতিহাস –  মওলানা মুহম্মদ আবদুর রহীম।

(চ)              হানাফি আইন হেদায়া  – ইংল্যাণ্ডের ব্যারিস্টারী স্কুলে পড়ানো হয়।

(ছ)              রুহুল কোরাণ  –  মওলানা আবদুদ দাইয়ান।

(জ)             “ক্যাসাসুল আম্বিয়া”র অনুবাদ  – মওলানা বশিরুদ্দীন ও মওলানা বদিউল আলম।

(ঝ)             ঊমদাত আল্ সালিক  – ইমাম শাফি’র আইন নং o.৯.১৩, পৃঃ ৬০৪।

(ঞ)             সহি বোখারীর বাংলা অনুবাদ – মওলানা আজিজুল হক (বইটা আপাতত: কাছে নেই)।

(ট)              সহি সুনান আবু দাউদ  –  ইণ্টারনেট সংস্করণ।

(ঠ)              বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন ৩য় খণ্ড।

(ড)             রিয়াদুস্ সালেহীন  – আল্লামা ইমাম নববী।

হাসান মাহমুদওয়ার্ল্ড মুসলিম কংগ্রেসের উপদেষ্টা বোর্ডের সদস্য, মুসলিমস রিফর্ম মুভমেন্ট ও আমেরিকান ইসলামিক লিডারশিপ কোয়ালিশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য

১৩ Responses -- “বিজয় দিবস ও কোরানের দাসপ্রথা উচ্ছেদ”

  1. Enamul Khair

    লিখাটি নিঃসন্দেহে তথ্যবহুল, তবে উপস্থাপন আরও বর্ণিল হওয়ার দরকার ছিল……।।

    Reply
  2. ehsanul haque

    বর্তমানে ইসলাম বিরোধীরা দাসপ্রথা সম্বন্ধে হাদিসগুলো দেখিয়ে ইসলামে পংকিলতা প্রমাণ করছে। আপনি তার সঠিক ব্যাখ্যা দিয়ে ইসলামকে কলুষতা মুক্ত করেছেন।কেউ এরকম সুন্দর ব্যাখ্যা দিতে পারেনি ।আল্লহ আপনাকে ভালো রাখুন।

    Reply
    • ehsanul haque

      বর্তমানে ইসলাম বিরোধীরা দাসপ্রথা সম্বন্ধে হাদিসগুলো দেখিয়ে ইসলামে পংকিলতা প্রমাণ করছে। আপনি তার সঠিক ব্যাখ্যা দিয়ে ইসলামকে কলুষতা মুক্ত করেছেন।কেউ এরকম সুন্দর ব্যাখ্যা দিতে পারেনি ।আল্লহ আপনাকে ভালো রাখুন।
      ডিসেম্বর ২২, ২০১৭

      Reply
  3. হান্নান

    “কোরানের কিছু হুকুম শুধু মুসলিমের জন্য, কিছু সারা মানবজাতির জন্য, কিছু পুরুষের ও কিছু নারীর জন্য, কিছু সেই সমাজের জন্য ও কিছু চিরকালের।”
    – শুনে ভাল লাগলো। এতদিন জানতাম, দোলনা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব কিছু কুরানে আছে। এই গ্রন্থ সর্বকালের জন্য, আল্লাহ থেকে প্রেরিত। কুরান না কী পৃথিবী সৃষ্টির আগেই লিপিবদ্ধ হয়েছিলো। কুরান-কে নিয়ে কোন প্রশ্ন করা যাবে না। কিন্তু আসল ঘটনা যে কী, সেটা এখন বোঝা যাচ্ছে। ‘কিছু চিরকালের’ বলার আগে কয়েকবার চিন্তা করা কি উচিত নয়? যেখানে পৃথিবীটা প্রতিমূহুর্তে পরিবর্তনশীলতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।

    কুরানকে নিয়ে অলরেডি অনেক প্রশ্ন উঠে গেছে। বিশেষ করে, বিজ্ঞান বিষয়ক জ্ঞানে কুরান যোজন যোজন দূরে।

    যেহেতু দাস প্রথাকে হারাম বলা হয় নি, তাই এই সম্পর্কে কুরান বা হাদিসের বাণীকে সময়ের কাছে পরাস্থ বলা যায়। তার মানে নবী এবং আল্লাহ তখনকার মানুষের মানস জগতের কাছে হার মেনে গিয়ে আপোসের পথে হেঁটেছেন। সর্বশক্তিমান এবং রসূলের জন্য তবে এটা খুবই সুখপ্রদ ছিল না। তারা এত এত ক্রীতদাসদের প্রতি অমানবিক আচরণ স্বচক্ষে দেখা সত্ত্বেও তাদের উদ্ধারে হার্ডলাইন নিতে ব্যর্থ হয়েছেন, অন্যায়-অনাচারকে তাতক্ষণিকভাবে নির্মূল করতে পারেন নি। এটা ইসলাম ধর্মের ব্যর্থতা এবং সীমাবদ্ধতা, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

    আশ্চর্য হই শুনে যে, “আমরা কোরানের হুকুমগুলোর গতিময়তা উপেক্ষা করে সেই সমাজের তাৎক্ষণিক হুকুমকে শ্বাশ্বত মনে করে বর্তমানে প্রয়োগ করি।”
    – কোরানের হুকুমগুলোর গতিময়তা কী সেটা আরেকটু ব্যাখ্যা করলে ভাল হতো। সময়ের সীমাবদ্ধতাকে গতিময় করে তুলতে পারে আগামী প্রজন্মের চিন্তা-দর্শন এবং দৃষ্টিভঙ্গি।

    Reply
  4. Hasan Mahmud

    ইতিহাসের প্রতিটি দাস/দাসীর সাথে, দুর্ভাগ্যক্রমে, জড়িয়ে আছে একেকটি যুদ্ধজয় …. – লেখক।

    Reply
  5. মাহবুবুল

    আরব ও অনারব দাস সাহাবীদের উপস্থিতি ইসলামের বিশ্বজনীনতার চিহ্ন বহন করে।একে করেছে সার্বজনীন ও বিশ্বময়। হাবশি সাহাবী বিলাল ইবনে রাবাহ-
    দাস থাকাবস্থায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। এ কারণে তার পৌত্তলিক মনিব তার উপর নির্যাতন চালায়। পরবর্তীতে তিনি ইসলামের প্রথম মুয়াযযিন হওয়ার সম্মান লাভ করেন।
    দাস ওয়াহশি ইবনে হারব-অমুসলিম থাকাবস্থায় তিনি উহুদের যুদ্ধে মুহাম্মদ (সা) এর চাচা ও মুসলিম সেনাপতি হামযাকে হত্যা করেন। পরবর্তীতে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। রিদ্দার যুদ্ধে তিনি মুসলিমদের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ মুসায়লিমাকে হত্যা করেন।
    আন নাহদিয়া-দাস থাকাবস্থায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তার মনিবের কাছ থেকে এজন্য তিনি নির্যাতনের সম্মুখীন হলেও নিজ বিশ্বাসে অটল থাকেন। পরবর্তীতে আবু বকর তাকে কিনে মুক্ত করে দেন।
    লুবাইনা-দাস থাকাবস্থায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনিও তার মনিবের কাছ থেকে একারণে নির্যাতনের সম্মুখীন হন এবং বিশ্বাসে অটল থাকেন। আবু বকর তাকে কিনে মুক্ত করে দেন।
    উম্মে উবাইস-দাস থাকাবস্থায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। মনিবের নির্যাতন ভোগ করার পরও তিনি বিশ্বাস ত্যাগ করেননি। আবু বকর তাকে কিনে মুক্ত করে দেন। তিনি আল নাহদিয়ার কন্যা ছিলেন।
    হারিসা বিনতে আল মুয়াম্মি-দাস থাকাবস্থায় তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। একারণে তিনি নির্যাতনের সম্মুখীন হন। নির্যাতনের আধিক্যের কারণে তার দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। আবু বকর পরবর্তীকালে তাকে কিনে মুক্ত করে দেন।

    Reply
  6. বেলায়েত

    ৬২২ খ্রিস্ট্রাব্দে মদীনায় হিযরতের অব্যাবহিত পর মহানবী (সা.) পারস্পরিক দ্বন্দ্বে লিপ্ত বিভিন্ন গোত্র-উপগোত্র ও ধর্মমতের জনগোষ্ঠীকে একই বিধিবদ্ধ আইনের অধীনে আনার জন্য প্রণয়ন করেন ‘মদীনা সনদ’ (The Charter of Madinah)| এটাই ইতিহাসের প্রথম লিখিত সংবিধান। এর পূর্বে শাসকের মুখোচ্চারিত কথাই ছিল রাষ্ট্রীয় আইন। ‘জোর যার মুল্লুক তার’ এটাই ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের শাসনীতি। ইতিহাস প্রমাণ করে এই ঐতিহাসিক সনদ বিভিন্ন সমপ্রদায়ের মধ্যে বিবাদমান কলহ ও অন্তর্ঘাতের অবসান ঘটিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সমপ্রীতি, প্রগতি ওভ্রাতৃত্ববোধের পরিবেশ সৃষ্টি করে। উগ্র সামপ্রদায়িকতা, গোত্রীয় দম্ভ, ধর্ম বিদ্বেষ ও অঞ্চল প্রীতি মানবতার শত্রু ও প্রগতির অন্তরায়। মদীনা সনদ এ দুষ্ট ক্ষতগুলোকে মুছে ফেলে এবং সামাজিক নিরাপত্তা, অসামপ্রদায়িক চেতনা ও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করে। সনদের প্রতিটি ধারা পর্যালোচনা করলে মহানবী (সা.)-এর মানবাধিকার ঘোষণার প্রকৃষ্ট পরিচয় প্রতিভাত হয়। ১২১৫ সালের ম্যাগনা কার্টা, ১৬২৮ সালের পিটিশন অব রাইট ১৬৭৯ সালের হেবিয়াস কর্পাস অ্যাক্ট, ১৬৮৯ সালের বিল অব রাইটস এবং ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিতসার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (Universal Declaration of Human Rights) এর চৌদ্দশত বছর আগে মানবতার ঝাণ্ডাবাহী মহানবী (সা.) সর্বপ্রথম মানুষের আর্থ-সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অধিকার ঘোষণা করেন। পরস্পর বিরোধী ধর্ম সমপ্রদায়ের মধ্যে মহানবী (সা.) কর্তৃক সম্পাদিত এ সনদ সমগ্র মানবমণ্ডলী ও অখণ্ড মানবতার এক চূড়ান্ত উত্তরণ।

    দাসপ্রথা উচ্ছেদ
    সমাজে মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ (সা.) তৎকালীন সমাজে প্রচলিত দাসপ্রথা উচ্ছেদে সাহসী ভূমিকা রাখেন। বিশ্ব ইতিহাসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-ই প্রথম যিনি দাসপ্রথার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেন। তখনকার যুগে গোটা গ্রিস ও রোমান সাম্রাজ্য দাসপ্রথার ওপর গড়ে উঠেছিল। খ্রিস্টজগত ও আরব সমাজেও ছিল দাসপ্রথার অবাধ প্রচলন,[৩] প্রভুগণ নিজেদেরকে মালিক-মনিব মনে করে দাসদের শ্রমকে শোষণ করতেন, তাদের দ্বারা অমানুষিক পরিশ্রম করাতেন। পণ্যদ্রব্যের মত হাটবাজারে তাদের বিক্রি করা হত। মানুষ হিসেবে তাদের কোন অধিকার ছিল না। শতাব্দী প্রাচীন দাস প্রথার অবসান কল্পে মহানবী (সা.) বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং দাস মুক্তিকে সওয়াবের উপায় হিসেবে চিহ্নিত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) এর গৃহীত পদক্ষেপ দাসদেরকে মানুষের মর্যাদায় অভিষিক্ত করে। মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন, কারো করতলগত হওয়াটা তার মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। দাস মুক্তিতে উজ্জীবিত করার লক্ষ্যে মহানবী (সা.) ঘোষণা দেন:
    «أَرِقَّاءَكُمْ أَرِقَّاءَكُمْ، أَطْعِمُوْهُمْ مِمَّا تَأْكُلُوْنَ، وَاكْسُوْهُمْ مِمَّا تَلْبَسُوْنَ، وَإِنْ جَاءُوْا بِذَنْبٍ لَّا تُرِيْدُوْنَ أَنْ تَغْفِرُوْهُ فَبِيْعُوْا عِبَادَ اللهِ وَلَا تُعَذِّبُوْهُمْ».
    ‘ক্রীতদাসগণ তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, কাজেই তোমরা যা আহার করবে তাদেরকে তাই আহার করতে দেবে এবং তোমরা যা পরিধান করবে তাদেরকেও সেরূপ পরিধান করাবে। তারা যদি ক্ষমার অযোগ্য কোন অপরাধ করে থাকে, তা হলে তাদের মুক্ত করে দাও; তাদের শাস্তি দিও না।’[৪]
    «مَنْ أَعْتَقَ رَقَبَةً مُّسْلِمَةً، أَعْتَقَ اللهُ بِكُلِّ عُضْوٍ مِّنْهُ عُضْوًا مِّنَ النَّارِ، حَتَّىٰ فَرْجَهُ بِفَرْجِهِ».
    ‘যে ব্যক্তি কোন মুসলমান দাসকে দাসত্ব হতে মুক্ত করবে, (আযাদকৃত দাসের) প্রত্যেকটি অঙ্গের বিনিময়ে আল্লাহ তার (মুক্তি দানকারীর) প্রত্যেক অঙ্গকে দোযখের আগুন হতে মুক্তি দান করবেন।’[৫]
    রাসূলুল্লাহ (সা.) কেবল ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত হননি, নিজে দাস মুক্ত করে বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। সাহাবায়ে কিরাম (রাযি.)ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাতের অনুসরণ করে দাস মুক্তিতে অংশ গ্রহণ করেন। এভাবে দাসগণ মানবাধিকার ফিরে পেয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন। রাসূলুল্লাহ (সা.) ক্রীতদাস যায়দ ইবন হারিসাকে সেনাপতি নিযুক্ত করেন। হযরত আনাস (রা.), হযরত সালমান ফারসী ও সুহাইব রূমী (রা.) এবং অপরাপর ক্রীতদাসগণ সামাজিক মর্যাদা লাভ করে সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খিদমত আনজাম দেন। গতকালের ক্রীতদাস আজকের সেনাপতি, আগামীকাল রাষ্ট্রপ্রধান, যাদের দ্বারা নুতন ইতিহাস সৃষ্টি হয়।
    শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা
    প্রাচীনকাল হতে শ্রমিকদের প্রতি মালিকপক্ষ মজুরি নির্ধারণ, অতিরিক্ত শ্রম আদায়, মজুরি প্রদানে গড়িমসি, লভ্যাংশ প্রদানে অনীহা প্রভৃতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে আসছেন। এতে করে শ্রমজীবি ও পুঁজি মালিকদের মধ্যে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ, শ্রমিক অসন্তোষ, লে-আউট, ভাংচুর ও ধর্মঘটের মতো সহিংসতার প্রাদুর্ভাব ঘটে। উৎপাদন ব্যাহত হয়ে জাতীয় অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্থ হয়। রাসূলুল্লাহ (সা.) শ্রমিক ও মালিকের অধিকার ও পারস্পরিক দায়িত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট নীতিমালা পেশ করেন। প্রতিটি শ্রমিক তার দক্ষতা অনুসারে ন্যায্য পারিশ্রমিক পাবে। এখানে পীড়ন ও শোষণের অবকাশ নেই। কর্মের পারিতোষিকনির্ধারণ ব্যতিরেকে কোন শ্রমিককে নিয়োগ না করার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা রয়েছে। কাজ অনুপাতে মজুরী না দেয়া ইসলামে নিষিদ্ধ। তিনি শ্রমিক-মালিক সম্পর্কে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্করূপে চিহিৃত করেন। মহানবী (সা.) বলেন, ‘শ্রমিককে শ্রমজনিত ঘাম শুকানোর আগেই অবিলম্বে তার পারিশ্রমিক প্রদান কর। শ্রমিকদের তাদের কাজের লভ্যাংশ দাও। কেননা আল্লাহর শ্রমিকদের বঞ্চিত করা যায় না। শ্রমিকদের পারিশ্রমিক ও ঋণ পরিশোধ নিয়ে ধনী ব্যক্তিদের টালবাহানা করা যুলুম।’ (বুখারী, মুসলিম, ইবন মাজাহ, মুসনাদ আহমদ)। মালিকের বিনিয়োগকৃত প্রতিষ্ঠান ও কারখানার আসবাব পত্র, যন্ত্রপাতি, উৎপাদিত পন্য, কাঁচামাল ইত্যাদী শ্রমিকের নিকট আমানত স্বরূপ| সেগুলোর চুরি, আত্মসাৎ, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও ক্ষয়ক্ষতি করা নিষিদ্ধ। চুক্তির ধারা অনুসারে যথাযথভাবে কাজ সম্পাদন করা শ্রমিকের কর্তব্য। মহানবী (সা.) বলেন, কোন লোকের অধীনস্থ শ্রমিক স্বীয় মালিকের সম্পদের রক্ষক এবং সে তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।
    «أَلاَ كُلُّكُمْ رَاعٍ وَّكُلُّكُمْ مَسْئُوْلٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ».
    ‘সাবধান! তোমরা প্রত্যেকে রক্ষক এবং তোমাদের প্রত্যেকেই স্বীয় অধীনস্থ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।’[৬]

    বর্ণ-গোত্রীয় বৈষম্যের অবসান
    রাসূলুল্লাহ (সা.) মানুষের মনন ও মানসিকতায় এ কথা চিত্রায়িত করতে সক্ষম হন যে, সৃষ্টিজগতে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান, সম্মানের যোগ্য ও ভালবাসার পাত্র হল মানুষ।[৭] এ কারণে রাসূলুল্লাহ (সা.) গুরুত্ব সহকারে বলেন,
    «اَلْـخَلْقُ عِيَالُ اللهِ، فَأَحَبُّ الْـخَلْقِ إِلَى اللهِ مَنْ أَحْسَنَ إِلَىٰ عِيَالِهِ».
    ‘সমস্ত সৃষ্টিজগত (মাখলূক) আল্লাহ তাআলার পরিবার। সুতরাং মাখলুকের মধ্যে আল্লাহ তাআলার নিকট সে-ই সর্বাপেক্ষা প্রিয়, যে আল্লাহর পরিবারের সঙ্গে ন্যায় আচরণ করে।’[৮]
    মানবতার উচ্চ মর্যাদা, আল্লাহর নৈকট্য ও সৃষ্টজগতের প্রতি ন্যায়পূর্ণ আচরণের গুরুত্ব প্রকাশের জন্য এর চেয়ে আর কী সুন্দর ভাষা হতে পারে?
    রাসূলুল্লাহ (সা.) সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে আদর্শ সমাজ গড়ে তোলেন। বংশ কৌলীন্য ও আভিজাত্যের গৌরবের পরির্বতে মানবতার ভিত্তিতে সমাজ বন্ধন সুদৃঢ় করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা দেন, ‘আরবের ওপর অনারবের, অনারবের ওপর আরবের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। সব মানুষ একে অপরের ভাই। সব মানুষ আদমের বংশধর আর আদম মাটি হতে তৈরি। তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তি শ্রেষ্ঠ যার মধ্যে খোদাভীতি প্রবল।’[৯]
    রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এ ঘোষণা ছিল তৎকালীন সমাজের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ ও দ্রোহ। কারণ বংশ কৌলিন্য ও রক্তের মর্যাদা ছিল সামাজিক আভিজাত্যের ভিত্তি। তিনি ঈমানদারদের সুভ্রাতৃত্বের বন্ধনে সুদৃঢ় করে এক অখণ্ড দেহ সত্তায় পরিণত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন,
    «اَلْـمُسْلِمُوْنَ كَرَجُلٍ وَّاحِدٍ، إِنِ اشْتَكَىٰ عَيْنُهُ، اشْتَكَىٰ كُلُّهُ، وَإِنِ اشْتَكَىٰ، رَأْسُهُ اشْتَكَىٰ كُلُّهُ».
    ‘সকল মুমিন এক মানব দেহের মত, যদি তার চোখ অসুস্থ হয় তখন তার সর্বাঙ্গ অসুস্থ হয়ে পড়ে, আর যদি তাঁর মাথা ব্যথা হয় তখন তার সমস্ত দেহই ব্যথিত হয়।’[১০]
    এই পৃথিবীতে সব মানুষই যে আল্লাহর দৃষ্টিতে সমান, কৃষ্ণ-শ্বেত, ধনী-নির্ধন সকলই যে আল্লাহর সৃষ্ট মানুষ, সব মানুষই যে পরস্পর ভাই ভাই, ধর্মীয় ও কর্মীয় অধিকার যে সব মানুষেরই সমান-এ কথা বলিষ্ট কন্ঠে ঘোষণা করেন এবং স্বীয় কর্মে ও আচরণে প্রমাণ করেন ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। এ কারণে ইসলামে সকলের জন্য স্বীকৃত হয়েছে ন্যায় বিচারের অধিকার। অবিচার ও নানা স্বার্থপরতার কঠিন নিগড়ে মানুষ ছিল অসহায় বন্দী। রাসূলুল্লাহ (সা.)-ই সর্বপ্রথম ঘোষণা করেন মানুষের মুক্তি-বাণী। সারা জীবনের সাধনায় তিনি প্রতিষ্ঠিত করেন এমন এক সমাজ, যে সমাজে মানুষের মধ্যে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা পায়, ব্যক্তি ও জাতি-গোত্র পায় পূর্ণ স্বাধীনতার আস্বাদন| মানুষ সমাজের বুকে মানুষ রূপে শির উঁচু করে দাঁড়াবার সুযোগ লাভ করে। মানব জাতির প্রতি ইসলামের বৈপ্লবিক অবদানের মধ্যে মানুষের প্রতি ন্যায় বিচারই হল অন্যতম।[১১]
    সমাজ জীবনে মানুষ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। তাই পারস্পরিক সহানুভূতি, ভ্রাতৃত্ব, সমঝোতা প্রভৃতি সদাচরণ সমাজে অন্যায় ও যুলুমের অবসান ঘটায় এবং ক্রমান্বয়ে মানব সভ্যতাকে গতিশীল করে তোলে। তাই দেখা যায় মানুষ যখন পারস্পরিক সমঝোতা ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তিতে অখন্ড ভ্রাতৃসমাজ গঠন করেছে তখন তাঁরা অগ্রগতি ও শান্তির উচ্চমার্গে পৌঁছে গেছে। আর যখনই বিভেদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তখনই পতন হয়েছে অনিবার্য পরিণতি। ইতিহাসের ঘটনা পরম্পরা এরূপ অসংখ্য দৃষ্টান্তে ভরা। বর্ণবাদ মানবতার জন্য এক বিরাট অভিশাপ। বর্ণ বৈষম্যের (Apartheid) ছোবল থেকে মানবতাকে মুক্তকরার জন্য তিনি ঘোষণা করেন,
    «يَا أَيُّهَا النَّاسُ! اتَّقُوا اللهَ، وَإِنْ أُمِّرَ عَلَيْكُمْ عَبْدٌ حَبَشِيٌّ مُجَدَّعٌ فَاسْمَعُوْا لَهُ، وَأَطِيْعُوْا مَا أَقَامَ لَكُمْ كِتَابَ اللهِ».
    ‘হে জনগণ! আল্লাহকে ভয় কর। কোন কর্তিত নাসা কাফ্রি গোলাম তোমাদের আমীর নিযুক্ত হলে, তিনি যদি তোমাদের আল্লাহর কিতাব অনুসারে পরিচালিত করেন, তবে তাঁর কথা শুনবে এবং আনুগত্য করবে।’[১২]
    কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস হযরত বেলাল রা. কে মদীনার মসজিদের মুয়াযিযন নিয়োগ করে তিনি বর্ণবাদের সমাধি রচনা করেন।
    তৎকালীন আরবদেশে গোত্রীয় আভিজাত্য ছিল মাত্রাতিরিক্তি। বংশীয় অহংবোধ দুষ্ট কীটের মতো মানুষের মনুষ্যত্বকে দংশন করে। মহানবী (সা.) আরবের সে লালিত গোত্রীয় অপসংস্কৃতি উচ্ছেদ করে সমাধিকার নিশ্চিত করেন। তাঁর মতে মানুষের মর্যাদার মাপকাঠি তাকওয়া ও সচ্চরিত্র; আর গোত্রীয় অহংবোধ অন্ধকার যুগের কুসংস্কার। তিনি তাঁর আযাদকৃত গোলাম যায়েদ ইবন হারিসা (রা.)-এর সাথে আপন ফুফাত বোন যয়নাব বিনত জাহাশ (রা.)-এর বিয়ে সম্পাদন করে সমধিকারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এ বিয়ে কোরায়শদের গোত্রীয় আভিজাত্য ও বংশীয় অহংবোধের প্রতি ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। রাসূলুল্লাহ(সা.)-এর এ শিক্ষার ভূমিকা কালজয়ী ও বিশ্বজনীন। এর আবেদন আন্তর্জাতিক ও অসামপ্রদায়িক।

    নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা
    জাহিলী যুগে আরবদেশে কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া হত কারণ কন্যা সন্তান জন্মদান করা ছিল তাদের জন্য সামাজিকভাবে অমর্যাদাকর। পিতা তার ঔরসজাত কন্যার নিষ্পাপ মুখ দেখতেও রাজী ছিল না। কেবল আরবে নয় সারা দুনিয়ায় বিশেষত চীনা, গ্রীসীয়, রোমান ও ভারতীয় সমাজে প্রচন্ড ধরনের লিঙ্গ বৈষম্য ছিল। নারীদের অপবিত্র মনে করা হতো এমনকি মানুষরূপেও গণ্য করা হতো না। সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র ও যৌনতৃপ্তি সাধনের অনুষঙ্গীই ছিল নারী। প্রাচীন ইউরোপীয় সমাজে নারী ছিল সকল পাপের মূল (Root of all evil), নরকের দরজা (Door of the Hell) অথবা শয়তানের মুখপাত্র (Organ of Devil) প্রাচীন ভারতীয় সমাজে স্বামীর মৃত্যুর পর নারীর বেঁচে থাকার অধিকার ছিল না। স্বামীর জলন্ত চিতায় আত্মাহুতি দেওয়া ছিল তার সামাজিক ও ধর্মীয় কর্তব্য।[১৩]
    ইসলাম পুত্র সন্তান ও কন্যা সন্তানের মধ্যে কোন পার্থক্য নিরূপন করাকে পাপ হিসেবে বিবেচনা করে। সন্তান মাত্রই পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ও আদরের ধন। প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থায় যেহেতু কন্যা সন্তানের জন্মকে ঘৃণার চোখে দেখা হতো। এ অবস্থা পরিবর্তনের জন্য মহানবী (সা.) কন্যা শিশু লালনকে উৎসাহিত করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) সমাজ হতে কন্যা সন্তান জীবন্ত সমাহিত করার মত বর্বর রীতি উচ্ছেদ সাধন করেন সফলতার সাথে। তিনি নিজে কন্যা সন্তানদের সাথে সমতা ও হৃদ্যতাপূর্ণ আচরণ করেছেন সারা জীবন, অন্যদেরকেও কন্যাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন তাগিদপূর্ণ ভাষায়। যে ব্যক্তি তিনটি মেয়ে অথবা তিনটি বোন লালন-পালন করবে, সুশিক্ষায় শিক্ষিত করবে, উপযুক্ত পাত্রে বিয়ে প্রদান করবে, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়ে বলেন,
    «كُنْتُ أَنَا وَهُوَ فِي الْـجَنَّةِ كَهَاتَيْنِ».
    ‘সে ও আমি দু’আঙ্গুলের ন্যায় পাশাপাশি জান্নাতে প্রবেশ করব।’[১৪]
    তিনি আরও বলেন, ‘কারো কন্যা সন্তান থাকলে সে যেন তাকে জীবন্ত কবর না দেয়; তার অমর্যাদা না করে এবং পুত্র সন্তানের চাইতে কম আদর না করে তাহলে আল্লাহ তাকে বেহেশতে স্থান দেবেন।’[১৫]
    অধিকার, মর্যাদা ও পরকালীন পুরস্কারের দিক দিয়ে নারী-পুরুষের মধ্যে ইসলাম কোন পার্থক্য নিরূপণ করে না।
    মহানবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) ন্যায় ও মানবতা ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় যে বৈপ্লবিক অবদান রাখেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল নারীর সামাজিক মর্যাদা দান। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ক্রমান্বয়ে মাতৃতান্ত্রিক সমাজের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ইতিহাসে এ প্রথম মায়েরা সামাজিক স্বীকৃতি লাভ করে। প্রাক ইসলামী যুগে পৃথিবীর কোথাও নারীর সামাজিক মর্যাদা ছিল না। তারা ছিল অবহেলার পাত্র ও সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র। তাদেরকে অপবিত্র মনে করা হত। সমাজে যাতে নারী জাতির সম্মান ও মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত হয় তার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। সমাজের অর্ধেকাংশ নারীকে অবহেলা করলে সামাজিক সুবিচার সুদূর পরাহত হবে, এ চেতনা আল্লাহর রাসূলের মধ্যে ছিল পুরাপুরি কার্যকর। রাসূলুল্লাহ (সা.) নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ঘোষণা দেন,
    ‘সাবধান! তোমরা নারীদের সাথে সদ্ব্যবহার কর, কেননা তারা তোমাদের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। সাবধান! তোমাদের স্ত্রীর ওপর তোমাদের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি তোমাদের ওপরও রয়েছে তাদের অনুরূপ অধিকার। পুরুষ তার পরিবার-পরিজনের রক্ষক এবং স্ত্রী তার স্বামীর গৃহের এবং সন্তানদের রক্ষণাবেক্ষণকারী।’[১৬]
    বিয়ে, বিধবা বিয়ে, খুলআ তালাক, স্ত্রীলোকের মৃত পিতা, মৃত স্বামীর সম্পত্তি ভোগের অধিকার প্রভৃতি বিধান দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সা.) ন্যায় ইনসাফ নিশ্চিত করত পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলেন যা অপরাপর যে কোন সামাজিক কাঠামোর চেয়ে ছিল উন্নততর।

    Reply
  7. হোসেন আফতাব

    ইসলামের উপর নাস্তিক দের যেই সকল বিষয়ে আপত্তি তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, : “ইসলাম দাস প্রথা বহাল রেখে অন্যায় করেছে।” -নাউযুবিল্লাহ।
    এ ক্ষেত্রে আমার বক্তব্য হচ্ছে, -ইসলাম পূর্ব জাহেলী সমাজে দাসী-বাদীদের সাথে কি রূপ আচরণ করা হতো আর ইসলাম এসে এ ব্যাপারে দাসী-বাদীদের সাথে কিরুপ আচরণে মুসলমানদেরকে অভ্যস্ত করেছে- এই দুইটি বিষয়ের পাশাপাশি বিশ্লেষণে আমাদের নাস্তিক ভাইরা সম্ভবত: খুব অস্বস্তি বোধ করেন। এই দিকটাতে তারা সহজে আসতে চান না। কারণ এখানে এলেই দেখা যাবে যে, একমাত্র ইসলামই এমন এক দ্বীন বা জীবন ব্যবস্থা যা দাসী-বাদীদেরকে পশুত্বের মতো নির্যাতন-নিপীড়ণ, কষ্ট ও লাঞ্চনাকর জীবন-যাপন থেকে মুক্ত করে মানুষের মতো বাঁচার সুযোগ করে দিয়েছে। অন্য কোন ধর্ম বা আদর্শ যার সামান্যও করতে পারে নি। এই বিষয়ে আলোচনায় না গিয়ে তারা আসলে এবিষয়টিতে মৌন সমর্থন দিয়ে থাকেন (যা ছাড়া তাদের অন্য কোন গত্যান্তরও নেই)।

    তারা দাসদের সাথে আমেরিকাদের আচরণের কথাও চেপে যান। ইসলাম বিরোধিরা ইসলামের দাসপ্রথা নিয়ে যতটা চিন্তা করেন তারা ১৮৬০ এর পুর্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে কি ততটা চিন্তা করেন। এমনকি দাসপ্রথা উচ্ছেদ এর শতবর্ষ পরেও যে বর্নবাদি আইনগুলি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহাল ছিল তা নিয়ে কোন মন্তব্য করেন না।

    এমনকি ১৯৭০ সালেও বৃটেনে অনেক বাড়িভাড়ার বিজ্ঞাপনে হোয়াইট ওনলি লেখা থাকত। এটি বেআইনি হয় অনেক পরে। ইসলামে কেবল মাত্র যুদ্ধবন্ধিদের এই ক্রিতদাস হিসেবে দেখা হতো। তাদের সন্তান রা কিন্তু স্বাধিন হতো। নির্দৃষ্ট কিছু কাজের বিনিময়ে তাদের মুক্তি দেয়ার প্রথাও ছিল। কিন্তু গোপনে হামলা চালিয়ে ঘুমন্ত মানুষদের আটক করে তাদের কে ক্রিতদাস হিসেবে দাবি করার সুযোগ ইসলামে কখনই ছিলনা। আলেক্স হেইলির অমর “রুটস” উপন্যাসে সভ্য! আমেরিকানদের যে বর্ননা দেয়া হয়েছে। মুঘল আমলের শেষ দিকে বাংলাদেশের উপকুলিয় অঞ্চল থেকে পর্তুগিজরা যে মানুষ ধরে ক্রিতদাসে পরিনিত করত তা নিয়ে কোন মন্তব্যও তারা করেননা। অথচ বন্দি পর্তুগিজদের ক্ষমা করার মত উদারতা ও তৎকালিন বাংলার শাসকগন দেখিয়েছেন। এরা ইসলামের দাসপ্রথা নিয়ে যত কথা বলেন ইউরোপ,আমেরিকা দুরে থাক নিজের দেশের ইতিহাসে দাস প্রথার অবস্থান সম্পর্কেও জানেননা। এরা জানেননা যে ক্রিতদাস হয়েও কুতুবউদ্দিন আইবক হয়েছিলেন ভারতের সুলতান। আসলে এদের অন্ধতাই তাদেরকে মিথ্যার পথে নিয়ে যায়।

    এরপর তাদের আপত্তি আসে যেখানে তা হলো, ইসলাম তাহলে দাস প্রথা বাতিল করলো না কেন?
    আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা বলে- এক্ষেত্রে দু’টি বিষয় লক্ষণীয়:
    ১) দাস প্রথা বহাল থাকাটা যুদ্ধবন্দীদের জন্য বেশী উপকারী না দাস প্রথা বাতিল করা?
    ২) দাস প্রথা কি ইসলামের সেই সকল বিধানের অন্তর্ভুক্ত যা ইজমা-কিয়াসের দ্বারা রহিত করা যাবে না?

    প্রথম বিষয়ঃ অর্থাৎ দাস প্রথা বহাল থাকাটা যুদ্ধবন্দীদের জন্য বেশী উপকারী না দাস প্রথা বাতিল করা?
    এটা বোঝার জন্য আসুন আমরা একটু ভেবে দেখি যে দাস প্রথা যদি ইসলাম বাতিল করতো তাহলে তখন কি হতো?

    আমরা জানি যে, যুদ্ধের ঘটনা কোন আনন্দময় ফুটবল-ক্রিকেট খেলা নয় -যেখানে বিজয়ী এবং বিজীত উভয় দলই খেলা শেষে সহি-সালামতে নিজ নিজ ঘরে ফিরতে পারে। বরং যুদ্ধ হলো বিবদমান দু’টি পক্ষের মধ্যে ক্ষোভ-ঘৃণা আর রাগের চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হওয়ার নাম। এজন্য যুদ্ধের ময়দানে প্রতি পক্ষের উপর দয়া-মায়া বলে কিছু থাকে না। এখন এমন একটি যুদ্ধে যেই দলটি অনেক কষ্টে বিজয়ী হয় তাদের মনে প্রতিপক্ষকে চূড়ান্তভাবে নির্মূল করে দেয়ার আগ্রহটাই বেশি সক্রিয় থাকে। যার কারণে দেখা যায় মুসলিমদের উপর বিজয়ী অনেক যুদ্ধেই অমুসলিমরা যুদ্ধশেষে গণহত্যার ভয়াবহ তান্ডবলীলা চালিয়ে ছিলো -আজও চালাচ্ছে। যার জ্বলন্ত উদাহরণ স্পেন-ফিলিস্তিন-ইরাক-আফগানিস্তান ইত্যাদি।

    মুসলিম সৈন্যরাও মানুষ। তাদের মধ্যেও মানবিক রাগ ক্রোধ আছে। এখন যদি তাদের সামনে দাস প্রথা বাতিল
    করা হতো তাহলে যুদ্ধের পর পরাজিত অমুসলিমদের জীবিত থাকাটাই হয়তো দুস্কর হয়ে যেতো স্বাভাবিক কারণেই। কারণ অমুসলিমদের বাচিয়ে রেখে কি হবে? বিজয়ীদের তো কোন লাভ হচ্ছেনা পরাজিতদের দ্বারা। ফলে তাদের মৃত্যু হতো প্রায় নিশ্চিত।
    পক্ষান্তরে যখন তাদেরকে বলা হলো, দাস প্রথা আছে। তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা অহেতুক অমুসলিম হত্যা এড়িয়ে চলতে লাগলো। ফলে প্রাণহাণীও ব্যাপকভাবে হ্রাস পেলো। মুসলিমদের শাসনামলে (৬২২-১৯২৪) অমুসলিমদের হত্যার সংখ্যা শুনলে আপনারা নি:শন্দেহে আশ্চর্য হয়ে যাবেন। যে এতো কম ছিলো!
    বর্তমান এক ইরাক-আফগান যুদ্ধের একশতভাগের একভাগ লোকও সেই ১৩০০ বছরে নিহত হয়নি।
    দ্বিতিয়ত: দাস প্রথা বাতিল করলে যদি অমুসলিমরা বেঁচেও থাকতো তদুপরি তাদের সহায়-সম্বলহীন, আত্মীয়-পরিজন ছাড়া নি:স্বঙ্গ জীবন মৃত্যুর চেয়েও কষ্টকর হতো।

    সবচেয়ে বেশি সমস্যা হতো মহিলা ও নারী বন্দীদের জীবনে। যাদের নিয়ে আপনারা (নাস্তিকরা) এখন বেশি চিন্তা করছেন। শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ মহিলাকেই বাধ্য হয়ে পতিতাবৃত্তিতে নেমে আসতে হতো অন্ন-বাসস্থানের ব্যবস্থা করার জন্যই। অথচ এই সকল সমস্যা যেনো না হয় সেজন্যই হয়তো ইসলাম দাস প্রথা বাতিল করেনি। কেননা দাস প্রথার মাধ্যমে অধিনস্তদের দায়-দায়িত্ব ইসলাম মুসলিম মনিবদের উপর অর্পন করেছে। মনিবের ঘরে দাস-দাসী তাদের আহার এবং বাসস্থানের নিশ্চয়তা পেয়েছে। এরপর ইসলাম তাদেরকে আযাদ করার উপর মুসলমানদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছে। ফলে তারা স্বাধীনও হতে পেরেছে।
    আর যদি কোন মনিব তার দাসীর সাথে যৌন সম্পর্ক করে তাহলে ইসলাম তাকে অনুমতি দিয়েছে। কিন্তু নিজের প্রয়োজন সেরে ভেগে পড়ার সুযোগ দেয়নি। বরং দাসীর গর্ভে সন্তান হলে তাকে নিজের সন্তানের মতোই সম্পদের মালিকানা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে অধিকার দিয়েছে ইসলাম। আর যেই দাসীর গর্ভে মনিবের সন্তান হবে সেই দাসীকেও নাম দিয়েছে -উম্মে ওয়ালাদ বা বাচ্চার মা। এবং এমন দাসীকে বিক্রি করাও নিষিদ্ধ করেছে ইসলাম।

    অর্থাৎ একে বৈবাহিক সম্পর্কের কাছাকাছি একটি সম্পর্কের স্বীকৃতি দিয়ে এর সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে ইসলাম। এভাবে ইসলাম দাস প্রথা বহাল রাখার ফলে মূলত: যুদ্ধবন্দী ও অমুসলিমরাই বেশি লাভবান হয়েছে। নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেচে গেছে, নিশ্চিত ও নিরাপদ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পেরেছে এবং এক সময় আজাদ তথা স্বাধীনও হয়েছে। দাসদের সন্তানরা স্বাধীন হিসেবেই বেড়ে উঠেছে।

    এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষ্যনীয়: আচ্ছা ইসলাম যদি দাস প্রথা বাতিল করতো আর অমুসলিমরা যদি বাতিল না করে বহাল রাখতো তাহলে কি হতো?

    তখন মুসলিমরা বন্দী হতো, নির্যাতিত হতো, তাদেরকে আর বন্দী-বিনিময়ের মাধ্যমে ফিরিয়েও আনা যেতো না। পক্ষান্তরে কাফিররা পরাজিত হলেও ফিরে যেতো এবং আবার ইসলামের বিপক্ষে অস্ত্র নিয়ে মুসলিম নিধন শুরু করতো।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—