আহমদ ছফা ‘অলাতচক্র’ উপন্যাসে লিখেছেন,

“কলকাতা শহরের লোকদের মুখে ইদানিং (১৯৭১) ‘জয় বাংলা’ শব্দটি শুনলে আমার অস্তিত্বটা যেন কুঁকড়ে আসতে চায়। শেয়ালদার মোড়ে মোড়ে সবচে সস্তা, সবচে ঠুনকো স্পঞ্জের স্যান্ডেলের নাম ‘জয় বাংলা’ স্যান্ডেল।… যে চোখ-ওঠা রোগটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, কলকাতার মানুষ মমতাবশত তারও নামকরণ করেছিল ‘জয় বাংলা’।”

‘জয় বাংলা’ একাত্তরে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ লোকজনের কাছে ছিল আবেগ আর আতঙ্কের নাম। একদিকে ‘জয় বাংলা’র সহায়তায় নিজের সব কিছু নিয়ে এগিয়ে এসেছিল, অন্যদিকে ‘জয় বাংলা’র মতো চোখের অসুখে বিপর্যস্ত হয়েছিল দৈনন্দিন জীবন। Georges Childs Kohn তাঁর Encyclopedia of plague and pestilence: From Ancient Times to the Present গ্রন্থে একাত্তরে পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চাশ লক্ষ লোক চোখ-ওঠায় আক্রান্ত বলে উল্লেখ করেন। সমসাময়িক পত্রপত্রিকায় এই সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা পাওয়া যায়।

আক্রান্তদের মধ্যে শরণার্থীরা যেমন ছিলেন তেমনি সংক্রামক এই রোগের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিলেন স্থানীয় অধিবাসীরাও। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সরকারি হিসাবমতে প্রায় ৫ লাখ লোক Acute Hemorrhaging Conjunctivitis (AHC)এর চিকিৎসাসেবা নেন। প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বেশি। কলকাতা শহরের শতকরা ৬৫ জন লোক এই রোগে আক্রান্ত হন। এই AHC চোখ-ওঠা বা Conjunctivitis এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর ভ্যারাইটি।

একাত্তরের মে মাস থেকে শুরু করে আগস্ট পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের অনেকাংশে এই সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ে। মূলত এটি ছিল চোখের কনজাংটিভার প্রদাহ বা চোখ-ওঠা। বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীদের মাধ্যমে এই রোগ বিস্তার লাভ করেছে দেখে স্থানীয়রা একে ‘জয় বাংলা’ রোগ বলে অভিহিত করেন।

একাত্তরে জয় বাংলায় পশ্চিমবঙ্গ কতটা বিপর্যস্ত হয়েছিল ৪ জুন ১৯৭১এর দৈনিক যুগান্তরের একটি শিরোনামে তা স্পষ্ট। ‘চোখের রোগে ট্রেন বন্ধের আশঙ্কা’ শিরোনামের রিপোর্টে বলা হচ্ছে, চোখ-ওঠায় রেলওয়ের বিপুলসংখ্যক কর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। পূর্ব রেলের শিয়ালদহ ডিভিশনের ৪৯ জন গার্ড এই রোগে আক্রান্ত হয়ে ছুটি নিয়েছেন। বহুসংখ্যক বুকিং ক্লার্ক চোখের রোগে আক্রান্ত। সাধারণ ছুটিতে থাকা ২৭ কর্মীর ছুটি বাতিল করেও ট্রেন-চলাচল অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

 

01

 

চোখ-ওঠায় বাতিল হয়ে গেছে ফুটবল ম্যাচ। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বেশ কয়েকটি স্কুল। পত্রিকার পাতায় পাতায় চোখের রোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার বিজ্ঞাপন, কেউ-বা দিচ্ছে হোমিওপ্যাথিকের বিজ্ঞাপন, কেউ-বা সালফাসিটল কিংবা তরল সাবানের বিজ্ঞাপন। সেই সময়কার কিছু বিজ্ঞাপন দেখুন:

 

02

 

07

 

হাওড়ার ক্ষেত্র ব্যানার্জী লেনের ‘সুরেন্দ্রনাথ সেবা সদন’ সকাল ৭টা থেকে ১০টা পর্যন্ত জয় বাংলায় আক্রান্ত রোগীদের হোমিওপ্যাথি ঔষধ বিতরণের বিজ্ঞপ্তি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হত প্রতিদিন। আক্রান্ত লোকজনকে একটি শিশিসমেত লাইনে দাঁড়ানোর অনুরোধ করত দোকানটি।

আবার অনেকেই এই মহামারীতে চেষ্টা করেছেন আনন্দ খুঁজে নেওয়ার। যুগান্তর এ বিকাশভানু লিখেছেন রম্যকথন ‘চোখের রোগের টোটকা নিন’–

 

08

 

চোখ-ওঠায় একদিকে বেড়েছে ঔষধ বিক্রি, অন্যদিকে ভীষণ চাহিদা বাড়তে শুরু করল কালো চশমার।

 

09

 

পত্রিকাগুলো ছাপাতে শুরু করল জয় বাংলা থেকে রেহাই পাওয়ার নানা কৌশল। বিনামূল্যে মেডিকেল ক্যাম্পের আয়োজন করে এই রোগের চিকিৎসা দেওয়া হত। ৬ জুন ১৯৭১ পশ্চিমবঙ্গের সিনিয়র চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. নীহার মুন্সি, ডা. অমল সেন, ডা. আই এস রায়, ডা. প্রকাশ ঘোষ, ডা. জলধর সরকার ও কলকাতা পৌরসভার স্ট্যান্ডিং হেলথ কমিটির চেয়ারম্যান ডা. বীরেন বসু জনসাধারণকে আতঙ্কিত না হয়ে জয় বাংলা রোগে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে বিবৃতি দেন। পৌরসভার মেয়র শ্যামসুন্দর গুপ্ত তাদের সঙ্গে বৈঠক করে, জনসাধারণকে কয়েকটি পরামর্শ দেন। যথা:

১. নুন জল দিয়ে চোখ পরিষ্কার করুন;

২. এই রোগের কোনো ঔষধ নেই। গরম জল দিয়ে চোখ পরিষ্কার করে এতে রেকিউরোক্রোম বা পেনিসিলিন দেওয়া যেতে পারে। খুব বেশি যন্ত্রণা হলে সালফা সেটামাইডের ফোঁটা দিলে উপকার পাওয়া যাবে;

৩. পৌরসভার বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে বিনামূল্যে এসব ঔষধ পাওয়া যাবে;

৪. অপরিষ্কার হাত দিয়ে চোখ স্পর্শ থেকে বিরত থাকুন;

৫. যাদের গলাব্যথা তাদের নুন জল দিয়ে গার্গল করতে হবে।

আবার কলকাতার হোমিও চিকিৎসকরা জয় বাংলা রোগের বিভিন্ন স্তর ও সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কী ঔষধ খেতে হবে তা সাধারণকে জানিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেন। ডা. এস এন রায় হোমিও চিকিৎসকদের পক্ষে পত্রিকায় যে বিবৃতি দেন সেটি তুলে ধরা হল:

 

10

 

পাত্রী দেখতে গিয়ে পাত্রের চোখে চশমা। গোড়াতেই পাত্রীর প্রশ্ন. ‘চোখ উঠেছে’? চোখ-ওঠা নিয়ে যুগান্তর এ কাটুনিস্ট এঁকেছেন এমনই অনবদ্য এক কার্টুন।

যুগান্তর এর রবিবারের সাময়িকী রম্য করে লিখেছেন,

“জ্বালা দিতে ঠাঁই নাই জ্বালা দেয় সতীনের ভাই, কলকাতার লোকের হয়েছে সেই দশা। একেই তো জ্বালা-যন্ত্রণার সীমা নেই, তার ওপরে কোথা থেকে এক চোখের রোগ এসে চেপে বসল। ‘জয় বাংলা জয় বাংলা’ ডাক ছাড়তে ছাড়তে সারা শহর যেন কটা দিনের জন্যে… ধুলি পড়ে একেবারে কলুর… হয়ে গেল।”

এ সবের মাঝেও কলকাতার সাধারণ মানুষ পাশে দাঁড়িয়েছিল শরণার্থীদের। সংক্রামক জেনেও ক্যাম্পগুলোতে শরণার্থীদের মাঝে সাহায্য, সহায়তা ও ঔষধপত্র নিয়ে সহায়তা করেছে। আনন্দবাজার পত্রিকা ১৩ জুন লিখছে, পশ্চিমবঙ্গের এমন কোনো বাড়ি নেই যে বাড়িতে ২/১ জন করে জয় বাংলা রোগে আক্রান্ত হয়নি। বাজারে চোখ-ওঠা রোগের ঔষধ ও রঙিন চশমার সংকটের কথা পত্রিকাটি তুলে ধরে।

চোখ-ওঠা পশ্চিমবঙ্গে এত বেশি প্রভাব ফেলেছিল একাত্তরে, স্থানীয় গণমাধ্যমের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও উঠে এসেছিল জয় বাংলার প্রাদুর্ভাবের কথা। নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চাশ লক্ষ লোকের জয় বাংলায় আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ ছাপে। বাংলাদেশের সংবাদ সংগ্রহে এসে পশ্চিমবঙ্গে বিদেশি গণমাধ্যমের কয়েকজন কর্মীও আক্রান্ত হয়েছেন চোখের এই প্রদাহে।

জনাব Kohn তাঁর সম্পাদিত বইটিতে চোখ-ওঠা রোগটির সংক্রমণের যে দিক নির্দেশ করেছেন তাতে বাংলাদেশ থেকে একটি তীর পশ্চিমবঙ্গের দিকে নির্দেশ করেছেন। তিনি বইটিতে আরও উল্লেখ করেছেন,

“এটি ধারণা করা হয় যে, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শরণার্থীদের মাধ্যমে এই রোগ কলকাতায় সংক্রমিত হয়। সত্য যাই হোক, রোগটির নামকরণ তেমনটি বলছে। লোকের কাছে চোখের এই প্রদাহের স্থায়ী নাম পায় ‘জয় বাংলা’ রোগ। চোখ-ওঠা অর্থাৎ চোখের পর্দা কনজাংটিভার প্রদাহকে পশ্চিমবঙ্গের লোকেরা এখনও জয় বাংলা বলে।”

 

11
যুগান্তরের সেই অনবদ্য কার্টুন

 

তবে রোগটির নাম জয় বাংলা হলেও অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, যদি জয় বাংলার লোকেরা এই রোগটি ছড়িয়ে থাকেন তাহলে মুম্বাইয়ে কেন প্রথম সংক্রমণ ঘটল এবং মুম্বাই থেকে অন্যান্য অঞ্চলে তা ছড়িয়ে পড়ল কীভাবে? তাছাড়া বাংলাদেশের (জয় বাংলা) শরণার্থীদের মাধ্যমে রোগটি যদি ছড়িয়ে থাকে তবে কেন বাংলাদেশের সীমান্তে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে চোখ-ওঠা রোগ ছড়াল না? বাংলাদেশ থেকে শরণার্থীরা পূর্ব, পশ্চিম এবং উত্তর তিন দিকেই আশ্রয় নিয়েছিলেন।

জয় বাংলা রোগের উৎপত্তি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এটা স্পষ্ট করে বলা যায়, পশ্চিমবঙ্গে একাত্তরে এ রোগের যে ব্যাপক বিস্তৃতি, সেটা ঘটেছে শরণার্থী ক্যাম্পের অস্বাস্থ্যকর ঘিঞ্জি পরিবেশ থেকে।

আহরার হোসেন একটি ব্লগে এই রোগে পশ্চিমবঙ্গের পাশাপাশি অবরুদ্ধ বাংলাদেশেও ব্যাপক বিস্তৃতির কথা বলেছেন,

“১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশে কনজাংটিভাইটিস বা চোখ-ওঠা রোগ মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ে। এই রোগে মুক্তিযোদ্ধারা ভুগেছেন, ভুগেছে পাকিস্তানি সৈন্যরা। পাকিবাহিনীর ভোগান্তিটা একটু বেশি ছিল, কারণ তারা এই রোগের সাথে পরিচিত ছিল না। অনাকাঙ্ক্ষিত এই মহামারী কোনো কোনো ক্ষেত্রে ট্যাকটিকালি গেরিলা যোদ্ধাদের কিছুটা সুবিধা এনে দিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধারা চোখ-ওঠা রোগকে মজা করে বলতেন, ‘জয় বাংলা রোগ’।”

D.D Pramanik তাঁর গবেষণা নিবন্ধ Joy Bangla, An epidemic of conjunctivitis in India তে স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন পশ্চিবঙ্গের জনজীবন একাত্তরে সামান্য এই চোখের প্রদাহে কীভাবে আলোড়িত হয়েছিল। রোগটির ব্যাপক বিস্তৃতির জন্য শরণার্থীদের ভূমিকা, ক্যাম্পের জীবন তিনি তুলে ধরেছেন। এই রোগ কল্যাণী, চাপড়ার বড় আন্দুলিয়া, বেতাই, করিমপুর, শিকারপুর শরণার্থী শিবিরে ছড়িয়ে পড়ে। একসময় এটি আক্রমণ করে কলকাতা শহরের শিবিরগুলোর শরণার্থীদেরও।

অন্য রকম জয় বাংলার গল্পটিও তাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটি অংশ হযে উঠেছে।

চৌধুরী শহীদ কাদেরজগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক

Responses -- “ভিন্ন এক জয় বাংলার গল্প”

  1. Pankaj Dasgupta

    পড়লাম,এটা জানা ছিল না সত্যি! তবে বিজ্ঞাপনের তোড়জোড় কিংবা জয় বাংলা চোখ উঠা নিয়ে তাদের ভাবনাগুলো পড়ে অবাক লাগছে আরকি।

    Reply
  2. Alal Ahmed

    মুক্তিযুদ্ধের আপাত বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র ন্যারেটিভগুলো এভাবে উঠে আসুক । অনেক আশা, অনেক শুভকামনা।

    Reply
  3. দানিয়েল

    লেখাটির মাধ্যমে পশ্চিমবাংলার জনগণের ত্যাগ স্বীকারের বিষয়টিও ফুটে উঠেছে। তাই এটাকে নেতিবাচক ভাবে নেয়ার কিছু নেই।

    Reply
  4. Bongo-Raj

    বিজয়ের মাসে এমন একখানা লিখা কি এমন তাত্পর্য বহন করে, লেখক আর BdNews24.com ই শুধু বলতে পারবেন!!
    একটা পত্রিকা তার সুনাম ধরে রাখতে পারবে কি পারবেনা তার দায়িত্ব ঐ পত্রিকার যাহারা কান্ডারী তাদের উপরেই বর্তায় বলেই জানি–

    Reply

Leave a Reply to Pankaj Dasgupta Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—