১.

আমাদের বয়সী যে কোনো মানুষকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় তার জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় দিন কোনটি, সে অবধারিতভাবে বলবে সেটি হচ্ছে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। আমি মনে করি আমাদের বয়সী মানুষেরা যারা সেই দিনটিতে বাংলাদেশের জন্ম হতে দেখেছি, সেই সময়ের তীব্র আনন্দটুকু পৃথিবীর খুব কম মানুষ অনুভব করেছে। আমরা খুবই সৌভাগ্যবান একটি প্রজন্ম যারা সেই অবিশ্বাস্য আনন্দটুকু অনুভব করার সুযোগ পেয়েছিলাম।

অথচ বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, সেই দিনটিতে যখন একজনের সাথে আরেকজনের দেখা হয়েছে তখন প্রথম অনুভূতিটি হচ্ছে এক ধরনের বিষাদ। কারণ সারাদেশে একজন মানুষও ছিল না যার কোনো না কোনো আপনজন বা প্রিয়জন সেই যুদ্ধে মারা যায়নি। নূতন বালাদেশের নূতন প্রজন্ম কল্পনাও করতে পারবে না একটি দেশের স্বাধীনতার জন্যে একটি দেশের মানুষ কত বড় আত্মত্যাগ করেছে। বাংলাদেশের পতাকার মাঝাখানে যে লাল বৃত্ত, সেটি সাধারণ মানুষের কাছে শুধুমাত্র এক টুকরো লাল কাপড়। কিন্তু আমরা জানি, সেই লাল রংটুকু কোথা থেকে এসেছে। আমরা জানি সেই লাল রংয়ে আমাদের সব আপনজনের বুকের রক্ত একটুখানি হলেও আছে।

১৯৭১ সালের বিজয়ের আগের দিনগুলোর স্মৃতি আমাদের এখনও এত স্পষ্টভাবে মনে আছে যে, মনে হয় এটি মাত্র সেদিনের ঘটনা। আমাদের পুরো পরিবার তখন পুরোপুর বিচ্ছিন্ন। কে কোথায় আছে কেমন আছে, আদৌ বেঁচে আছে কিনা আমরা কিছুই জানি না। আমি যাত্রাবাড়ীতে একটা পরিবারের সাথে অনেকগুলো শিশুদের নিয়ে আছি। ১৯৭১এর যাত্রাবাড়ী আজকের যাত্রাবাড়ীর মতো নয়, মোটামুটি ফাঁকা। রাস্তার দুপাশে বাড়িঘর নেই। আমি যেখানে আছি তার চারপাশে ছোট একটা জনবসতি।

তখন শেষ যুদ্ধ শুরু হয়েছে। দিনরাত গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাই। শেলিং হচ্ছে, একটা দুটো শেল আশে পাশে পড়ছে সেরকম খবরও ভেসে আসছে। মাঝে মাঝে এত কাছে থেকে এত তীব্র গোলাগুলির শব্দ শুনতে পাই যে, মনে হয় এই বুঝি সেগুলো আমাদের গায়ে এসে লাগবে।িএরকম সময়ে কিছু না করে চুপচাপ বসে থাকা যায় না। তাই কিছু একটা করার উদ্দেশ্যে একটা কোদাল দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে ঘরের উঠানে একটা ট্রেঞ্চ খুঁড়ে ফেলা হল। ট্রেঞ্চের উপরে একটা ঢেউটিনের আস্তর। যখন গোলাগুলির শব্দ খুব বেড়ে যায়, তখন বাচ্চাগুলোকে নিয়ে সেই ট্রেঞ্চের ভেতর বসে থাকি।

বাড়িটার পাশেই রাস্তা। সেই রাস্তা দিয়ে মিলিটারির বহর যাচ্ছে এবং আসছে। একদিন মিলিটারিরা সেই রাস্তা দিয়ে যাওয়া একটা স্কুটারের সব যাত্রীকে মেরে ফেলল। আমরা দেখতে পাই, স্কুটারের ভেতর থেকে মৃত মানুষগুলোর হাত পা বের হয়ে আছে। মৃত মানুষগুলো প্রকাশ্য রাস্তায় স্কুটারের ভেতর দিনের পর দিন পড়ে আছে, কেউ সেটা নিয়ে বিচলিত হচ্ছে না।

এক সময় লক্ষ্য করলাম, রাস্তা দিয়ে বড় বড় ট্যাংক ঘড়ঘড় শব্দ করে ঢাকার দিকে ফিরে যাচ্ছে। তার সাথে সাথে অসংখ্য পাকিস্তানি মিলিটারি। ‘পশ্চাদপসরণ’ বলে একটা শব্দ আছে। এই মিলিটারি বাহিনীকে দেখলেই বোঝা যায় তারা সেই পশ্চাদপসরণ করছে। প্রাণের ভয়ে? আমরা দূর থেকে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকি।

ঠিক তখন একদিন, যখন সূর্যের আলো নিভু নিভু অন্ধকার নেমে আসছে, গোলাগুলির শব্দ কমে আসছে, তখন নৈঃশব্দ বিদীর্ণ করে একজন চিৎকার করে উঠল, ‘জয় বাংলা’।

মূহূর্তের মাঝে আমরা বুঝে গেলাম দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষ হয়েছে। যে স্বাধীনতার জন্যে বুভুক্ষের মতো আমরা অপেক্ষা করছিলাম সেই অপেক্ষার শেষ হয়েছেন সেটি জানার জন্যে আমাদের প্রয়োজন ছিল শুধু একটি শ্লোগান ‘জয় বাংলা’।

কী আশ্চর্য, মুক্তিযুদ্ধের সেই শ্লোগানটি এই দেশে নির্বাসিত হয়েছিল! শুধু শ্লোগানটি নয়, যে মুক্তিযুদ্ধের জন্যে এই শ্লোগান সেই মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত দেশ থেকে নির্বাসিত করা হয়েছিল। দেশের শাসক হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত স্বাধীনতার শত্রুরা। ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানটি ধুকে ধুকে বেঁচেছিল শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের কর্মীদের মাঝে। কেউ সেই শ্লোগান উচ্চারণ করলেই মানুষ ধরে নিত সেই মানুষটি নিশ্চিতভাবে আওয়ামী লীগের কর্মী। দেশের মানুষ মনে হয় ভুলেই গেল যে, এটি কোনো রাজনৈতিক দলের শ্লোগান ছিল না। এই শ্লোগানটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের শ্লোগান। মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র গর্জে ওঠার আগে তাদের কণ্ঠ থেকে প্রকম্পিত হত এই শ্লোগান।

গণজাগরণ মঞ্চের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই যে, তারা মুক্তিযুদ্ধের সেই শ্লোগানটি আবার আমাদের উপহার দিয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য না হয়েও এখন একজন শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রতি গভীর ভালোবায় ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানটি দিতে পারে।

 

Flag - 300

 

২.

বাংলাদেশটি আমরা এমনি এমনি পাইনি। এই দেশটি পাওয়ার একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে। একসময় আমরা পাকিস্তানের অংশ ছিলাম। সেই পাকিস্তান দেশটির জন্যে যে লাহোর প্রস্তাব ছিল সেখানে বহুবচনে দুটি দেশের কথা বলা হয়েছিল। ‘মুদ্রণ প্রমাদ’ বলে দুটি দেশের ধারণাটিকে সরিয়ে একটি পাকিস্তান তৈরি করা হয়েছিল। আমরা জন্ম থেকে দেখে এসেছিলাম বলে মেনে নিয়েছিলাম। এখন নিশ্চয়ই সবাই চোখ কপালে তুলে বলে, এটি কীভাবে সম্ভব? একটি দেশের দুই টুকরো দুই জায়গায় মাঝখানে হাজার কিলোমিটার দূরত্ব? সেটিই ছিল আজব-স্থান পাকিস্তান!

জনসংখ্যায় আমরাই ছিলাম বেশি, অথচ সম্পদের বড় অংশ ভোগ করত পশ্চিম পাকিস্তান। পুরো দেশটি যে ছিল ষড়যন্ত্রের জোড়াতালি দিয়ে তৈরি করা একটি দেশ সেটি বুঝতে বাঙালিদের মাত্র বছরখানেক সময় লেগেছিল। যখন পাকিস্তানের স্থপতি মোহম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকা এসে ঘোষণা দিয়ে গেলেন, উর্দু এবং শুধুমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। বাহান্ন সালে ভাষা আন্দোলন হল। রক্ত দিয়ে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করতে হল। চুয়ান্ন সালে বঙ্গবন্ধু আর সহনেতারা প্রাদেশিক নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে সরকার গঠন করলেন। কিন্তু বছর ঘোরার আগেই সেই সরকারকে বাতিল করে দেওয়া হল। বঙ্গবন্ধু তখন একজন তরুণ রাজনৈতিক নেতা। কিন্তু তার বুঝতে বাকি রইল না যে, পাকিস্তানের এই ষড়যন্ত্র থেকে মুক্তিলাভের একটিমাত্র উপায়, সেটা হচ্ছে সায়ত্তশাসন। তিনি ছয় দফার আন্দোলন শুরু করেন।

এই দেশের নতুন প্রজন্মের যারা দেশকে নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে তাদের সবার এই ছয়টি দফা একবার হলেও পড়ে দেখা উচিৎ। তাহলে তারা অবাক হয়ে আবিষ্কার করবে যে, ছয় দফা আসলে একটিমাত্র দফা, যার অর্থ হচ্ছে স্বাধীনতা।

পাকিস্তানে তখন আইউব খানের সামরিক শাসন, বঙ্গবন্ধু আর তাঁর সহকর্মীরা বেশিরভাগ সময়েই জেলখানায় থাকেন। রাজনৈতিক নেতাদের বলতে গেলে কেউ বাইরে নেই। ছাত্ররা আন্দোলন করে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করে আনল। আজকাল কেউ কল্পনা করতে পারবে, এখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ছাত্রলীগ আছে কাফেটারিয়া-ক্যান্টিনে ফাউ খাওয়া থেকে যারা বড় কিছু চিন্তা করতে পারে না তাদের পূর্বসুরীরা একসময় এত বড় বড় কাজ করেছে?)

উনসত্তরের বিশাল গণআন্দোলনে সামরিক শাসক আইউব খানের পতন হল। ক্ষমতা দেওয়া হল সর্বকালের নৃশংস দানব ইয়াহিয়া খানের কাছে। তখনও আমরা তার সেই পরিচয়টির কথা জানি না।

সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফার প্রতি স্বীকৃতি জানিয়ে বাঙালিরা তাঁকে একটা অভুতপূর্ব বিজয় উপহার দেয়। বাঙালিরা প্রথমবার এই দেশের শাসনভার গ্রহণ করবে, পাকিস্তানি মিলিটারির মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। তাদের বিশাল ষড়যন্ত্রের প্রেসক্রিপশান অনুযায়ী তারা নির্বাচনের রায় অস্বীকার করা মাত্রই সারা দেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলেন। তাঁর অঙুলিহেলনে এই চলতে শুরু করল। মার্চ মাসের সাত তারিখ রেসকোর্সে তিনি তাঁর সেই ঐতিহাসিক ভাষণটি দিলেন, যেটি শুনলে এখনও আমার শরীর শিহরণ হয়!

২৫ মার্চ পাকিস্তান মিলিটারি এই দেশে গণহত্যা শুরু করল। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। শুরু হল মুক্তিযুদ্ধ।

নয় মাসের সেই যুদ্ধের ইতিহাস হচ্ছে আত্মত্যাগের ইতিহাস, বীরত্বের ইতিহাস আর অর্জনের ইতিহাস। পৃথিবীর কয়টি দেশ এরকম একটি গৌবরে ইতিহাস দাবি করতে পারবে?

৩.

বাংলাদেশের একটি কালো অধ্যায়ের সময় ছিল যখন সেই ইতিহাস অস্বীকার করা হত কিংবা খাটো করে দেখানো হত। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বোঝানো হত বঙ্গবন্ধু বলে কেউ নেই, কেউ ছিল না, জিয়াউর রহমান নামের একজন মেজরের ঘোষণায় এই দেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে। রাজাকার শব্দটি উচ্চারণ করা যেত না, পাকিস্তান বলা যেত না, বলতে হত হানাদার। যারা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতেন তাদের শাসন করা হত। শাস্তি হিসেবে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করে দেওয়া হত। যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথা উচ্চারণ করলে দেশোদ্রোহী হিসেবে মামলা করে দেওয়া হত।

ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা আমাকে জিজ্ঞেস করত, ‘স্বাধীনতার ঘোষক কে’। (স্বাধীনতা যেন একটি ছেলের হাতের মোয়া, কোনো একজন তার কথা ঘোষণা করলেই দেশ স্বাধীন হয়ে যায়!) তারা জিজ্ঞেস করত, ‘রাজাকারা কেমন করে মন্ত্রী হয়’– ‘যারা এই দেশ চায়নি, এই দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছে তারা কেমন করে এই দেশ শাসন করে’– ‘তারা কেমন করে তাদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা লাগিয়ে ঘুরে বেড়ায়’।

আমাদের অনেক বড় সৌভাগ্য সেই দুঃসময় আমরা পিছনে ফেলে এসেছি। কেউ আমাদের কাছে জানতে চায় না স্বাধীনতার ঘোষক কে। নূতন প্রজন্ম এখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ এরা পাঠ্যবইয়ে পড়েছে, নিজের কানে শুনতে পেয়েছে। শুধু তাই নয়, এই দেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতে দেখেছে, দেশকে গ্লানিমুক্ত হতে দেখেছে।

এই দেশকে নিয়ে অনেকের অনেক কিছু চাওয়ার আছে, আমার আর কিছু চাওয়ার নেই। এই দেশ থেকে আমি যা চেয়েছিলাম তার থেকে বেশি পেয়েছি। বিজয় দিবসের প্রাক্কালে নূতন প্রজন্মের কাছে আমার শুধু একটিমাত্র প্রত্যাশা– যেটুকু পেয়েছি সেটি যেন কোনোভাবে আবার হারিয়ে না ফেলি।

মুহম্মদ জাফর ইকবাললেখক ও অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

১২ Responses -- “বিজয় দিবসের প্রত্যাশা”

  1. Aziz Rubel

    Dear Sir
    What was your contribution during 1971? You, including your all brothers were adult enough to fight for freedom. Its easy to write something sitting in airconditioned room regarding 1971 but fighting in real battle.

    Reply
  2. Hitangshu

    Sir,
    U & some person also save our country now. I do not kone future of our country. Because our country is full of Mowlobad .So it is a major problem. Our new youth person should understand sacrifice of the mayther of liberation war.

    Reply
  3. সময়

    একটি দেশের দুই টুকরো দুই জায়গায় মাঝখানে হাজার কিলোমিটার দূরত্ব? সেটিই ছিল আজব-স্থান পাকিস্তান! এই আজব পাকিস্তান না হলে কি বাংলাদেশ হত স্যার? বুকে হাত দিয়ে আপনার সমস্থ জ্ঞান খাটিয়ে বলুন।

    Reply
  4. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    মতপ্রকাশ ও সংগঠন করার অধিকারসহ আরো কিছু বিষয়েও প্রকাশিত পর্যবেক্ষণে বক্তব্য রেখেছে জাতিসংঘ কমিটি, কিন্তু বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে প্রাধান্যে এসেছে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডসহ রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর সরকারের চালানো দমন-নির্যাতনের নানাদিক। বলা বাহুল্য, কোনো একটি প্রসঙ্গেই আলোচ্য পর্যবেক্ষণে সামান্য বাড়িয়ে বলা হয়নি। শুধু তা-ই নয়, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ অন্য কিছু প্রতিষ্ঠানও এসব বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। কোনো কোনো রিপোর্টে একথা পর্যন্তও বলা হয়েছে যে, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ‘কর্তৃত্বপরায়ণ’ হয়ে উঠেছে এবং বাংলাদেশে ভিন্নমত প্রকাশের বিষয়টি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বিরোধী রাজনীতিকদের গ্রেফতার করে বিভিন্ন মামলা দায়ের করার এবং নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নির্যাতন, হত্যা ও গুম হওয়ার মতো গুরুতর মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা প্রসঙ্গও রয়েছে প্রায় সব রিপোর্টে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে দায়ীদের বিরুদ্ধে সরকার যে কখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়নি- এমন মন্তব্যও করেছে বিভিন্ন বিদেশী ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। তারা বলেছে, বর্তমান সরকারের অধীনে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশের গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজও অত্যন্ত কঠিন সময় পার করেছে। বড় দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেয়নি। মনে হচ্ছে, সংসদের বাইরেও কোনো বিরোধী দলকে মাথা তুলে দাঁড়াতে দিতে চায় না সরকার। সরকারের সমালোচনা করার কারণে গণমাধ্যমগুলোকে বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। সাংবাদিক ও সম্পাদকদের অভিযুক্ত ও গ্রেফতার করা হচ্ছে।

    আরো অনেক তথ্য ও অভিমতও রয়েছে বিভিন্ন বিদেশী ও আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্টে। সেদিক থেকে বলা যায়, জাতিসংঘ কমিটি আসলে নতুন কিছুই বলেনি। বস্তুত সরকার কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠার কারণে বাংলাদেশে একদিকে বিরোধী গণতান্ত্রিক দলগুলো আন্দোলন দূরে থাকুক এমনকি সাধারণ কোনো কর্মসূচিও পালন করতে পারছে না, অন্যদিকে এসব দলের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি আক্রান্ত অন্য সকলের জন্যও ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মানতেই হবে, জাতিসংঘ কমিটির পর্যবেক্ষণে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী তথা নিরাপত্তাবাহিনীগুলোকে দায়ী করা হয়েছে, যাদের পেছনে রয়েছে সরকারের সমর্থন ও মদদ। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মিথ্যা মামলা দায়ের, প্রতিহিংসামূলক গ্রেফতার, গ্রেফতারের পর রিম্যান্ডে নিয়ে নির্যাতন এবং গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো বিভিন্ন প্রসঙ্গেও পর্যবেক্ষণে পরিচিত তথ্য ও চিত্রই তুলে ধরা হয়েছে। এসব কারণেই জাতিসংঘ কমিটির পর্যবেক্ষণের কোনো একটি বিষয়ের সঙ্গেই ভিন্নমত পোষণ করার সুযোগ খুব কমই আছে।

    বলা বাহুল্য, জাতিসংঘ পর্যবেক্ষণ সরকারের জন্য সুখবর হয়ে আসেনি। তবে সরকারের উচিত জাতিসংঘ পর্যবেক্ষণের মূলকথাগুলো অনুধাবন করা এবং বিষয়গুলোর পুনর্মূল্যায়নে ব্রতি হওয়া। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং মামলা ও গ্রেফতারসহ বিরোধী দলের ওপর দমন-নির্যাতন বন্ধ করার এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে যথেষ্ট ক্ষমতা ও স্বাধীনতাসহ সক্রিয় করে তোলার পাশাপাশি সরকারের উচিত গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যেও সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে একযোগে সচেষ্ট হয়ে ওঠা। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান বিষয়ে এখনই উদ্যোগী হওয়া।

    Reply
  5. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    গত কয়েক বছর ধরে মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্বিচারে গ্রেফতার, গুম, দীর্ঘসময় অন্তরীণ রাখা এবং বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ডের সাক্ষী হয়ে আছে বাংলাদেশ। এছাড়াও সাংবাদিক ও বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) কর্মীদের উপর নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতন এবং চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার উপর সরকারের আরোপিত নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। অধিকন্তু, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও কিছু পশ্চিমা দেশের চোখে বাংলাদেশ সরকার ‘সামাজিক সহিংসতা’ থেকে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

    এই ধরনের হতাশাজনক ঘটনাগুলি তুলে ধরা হয়েছে ২০১৭ সালের ৬ জুলাই নিউইয়র্ক ভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) প্রকাশিত এক রিপোর্টে। এইচআরডব্লিউর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৬ সালের মধ্যে অন্তত ৯০ জন গুমের শিকার হয়েছে। দীর্ঘ সময় আটক রাখার পর তাদের অধিকাংশকে আদালতে হাজির করা হয়, আটক বন্দীদের মধ্যে হত্যা করার ঘটনা ঘটেছে ২১টি আর ৯ জনের কোন হদিসই পাওয়া যায়নি। রিপোর্টে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ৪৮ জনের নিখোঁজ হবার তথ্য পাওয়া গেছে। এর পাশাপাশি, নিরাপত্তা হেফাজতে থাকা অবস্থায় তীব্র নির্যাতন ও বাজে ব্যবহারের অভিযোগ তো রয়েছেই।

    মানবাধিকার গ্রুপটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের ২০১৬ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশ সরকারের কঠোর জঙ্গিবাদ বিরোধী কার্যক্রমের ফলে বিচার বহির্ভুত হত্যাকান্ড, টাকার জন্য আটক রাখা, গুম, অত্যাচার, নির্যাতন এবং মানবাধিকারের অন্যান্য অপব্যবহার বেড়ে গেছে। এই প্রতিবেদনটিতে প্রান্তিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের হত্যা এবং চরমপন্থী মত অন্যদের উপর চাপিয়ে দেয়া, বাল্য ও জোরপূর্বক বিয়ে, বিশেষভাবে নারী ও শিশুদের উপর লিঙ্গ-সহিংসতা, কর্ম পরিবেশ এবং শ্রম অধিকারের অপব্যবহারের ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ অনলাইন বক্তৃতা ও সংবাদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে আর নাগরিকদের গোপনীয়তার অধিকার অব্যাহতভাবে লঙ্ঘন করছে।

    আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা দু:খ প্রকাশ করে বলেছে যে, বাংলাদেশ সরকার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে স্থানীয় মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত হবার পরও এসব ‘ঘৃণ্য কার্যক্রম’ চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের মত অনুযায়ী, ‘মানুষকে আটকে রাখার ক্ষেত্রে, তাদের অপরাধ বা নির্দোষতা এবং তাদের শাস্তি নির্ধারণ এমনকি তাদের জীবিত থাকার অধিকার রয়েছে কিনা সে সম্পর্কেও একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী।’

    গুম, অপহরণ, নির্বিচার আটক এবং বিচার বহির্ভুত মৃত্যুর জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে প্রধানত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সদস্যদেরকে দায়ী করা হয়। বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার বিরুদ্ধেও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। রিপোর্টে এছাড়াও বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বিরোধী কর্মীদের আটক করে ইচ্ছাকৃতভাবে পায়ে গুলি করে পংগু করে দিচ্ছে। ভিক্টিমসরা দাবি করেছে যে, পুলিশ তাদের হেফাজতে নিয়ে যায় এবং তারপর তারা বলে যে তারা সশস্ত্র অপরাধীদের সাথে ক্রসফায়ারে আত্মরক্ষা করতে অথবা সহিংস বিক্ষোভের সময় গুলি চালিয়েছে। এর শিকারদের মধ্যে সন্দেহভাজন অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িতরা যেমন রয়েছে তেমনিভাবে রয়েছে বিরোধী দলগুলোর সদস্যরাও।

    ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বিরোধী দলের সহিংস আন্দোলন, রাস্তায় ভাঙচুর ও অব্যাহত হরতাল ও অবরোধের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে। কিন্তু সরকারের এই ধরনের পদক্ষেপে ‘উচ্চমাত্রার’ বাড়াবাড়ির জন্য স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পক্ষ সমূহ থেকে ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয়। এর বাইরে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্য-প্রণোদিত হত্যাকান্ড এবং সুপরিচিত সাংবাদিক ও বিরোধীদলীয় নেতাদের গুমের রিপোর্টও রয়েছে ।

    Reply
  6. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    আওয়ামী লীগ সরকার কেনো ভারতকে তাদের নির্ভরযোগ্য বন্ধু বা ক্ষমতায় বসে থাকার, ক্ষমতায় আসার বা পুনরায় ক্ষমতায় যাওয়ার নিয়ামক মনে করছে তা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। ভারতের সাধারণ নীতি হলো- বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলকে ছলে-বলে-কৌশলে নিজেদের কব্জায় এনে নিজেদের স্বার্থ কায়েম করা। একমাত্র বঙ্গবন্ধু সরকার এবং ১৯৯৬ সালের শেখ হাসিনার সরকার আংশিক হলেও ভারতের চিরায়ত সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব রুখে দিয়েছিল। অন্য দিকে সব আমলের সব সরকারের সাথেই ভারতের দহরম-মহরম সম্পর্ক ছিল। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক হলো- বাংলাদেশের কোনো সরকারকেই ভারত ক্ষমতায় আনেনি বা ক্ষমতা থেকে বিদায় করেনি এবং কোনো সরকারের বিপদকালে ভারত তাদের পাশে দাঁড়ায়নি।
    অনেকে হয়তো ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ভারত সরকারের বেপরোয়া সমর্থনের প্রসঙ্গ টানবেন। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ভারতের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে বিশেষজ্ঞজনের মত হলো- ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের সময় যদি বিএনপি-জামাত ক্ষমতায় থাকত এবং আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকত তবে ভারত তাই করত, যা তারা করেছে আওয়ামী লীগের পক্ষে। আওয়ামী লীগ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সবচেয়ে রূঢ় বাস্তবতা হলো জনগণ যা ধারণা করে, প্রকৃত ঘটনা কিন্তু তার সম্পূর্ণ বিপরীত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর যে ব্যক্তিত্ব, দৃঢ়তা ও জেদি মনোভাব তা কোনো মতেই ভারতের দাদারা বরদাশত করেন না, যেমনটি করতেন না ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুর ক্ষেত্রে।
    আওয়ামী লীগ যদি স্বেচ্ছায় ভারতের সাথে সামরিক চুক্তি করে তবে তা হবে দলটির জন্য আত্মঘাতী। অন্য দিকে ভারত যদি চুক্তিটি স্বাক্ষরের জন্য চাপ প্রয়োগ করে তবে ধরে নিতে হবে তারা এই চুক্তির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে শেষ করতে চায় অথবা নাজেহাল করে অনুগত তাঁবেদার বানিয়ে রাখতে চায়। আওয়ামী লীগের উচিত বংলাদেশের জনগণের আবেগ-অনুভূতি এবং তাদের প্রচলিত ধারণার প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করা। জনগণের মতামতে যদি কোনো ত্রুটি থাকে তবে সময় নিয়ে ধৈর্যসহকারে সর্বোচ্চ মেধা খাটিয়ে তা সংশোধন করতে হয়। জনগণের সাথে তাড়াহুড়ো করলে বা ধৈর্য হারিয়ে ফেললে কিংবা জেদ দেখালে ফলাফল সব সময় হিতে বিপরীত হয়।

    এ দেশের সব শান্তিপূর্ণ মানুষ ভারতের সাথে বন্ধুত্ব চায়- তবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে এবং কোনো অবস্থাতেই সামরিক চুক্তি বা সমঝোতা চায় না। সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের নাক গলানো এবং ভারতীয় পত্রপত্রিকায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে এড়িয়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের খবর প্রকাশিত হওয়া, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবার নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকার মানহানিকর সংবাদ পরিবেশনকে আওয়ামী লীগ কিভাবে নেয় তা জানি না। তবে দেশবাসী যে ভালোভাবে নেয় না তা দিব্যি করে বলতে পারি। ইদানীং ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসের দেবত্ব লাভ এবং দেশের সুবিধাবাদী ব্যবসায়ী, আমলা ও রাজনীতিবিদদের ঘন ঘন দূতাবাস গমনের দৃশ্য দেখলে কেন জানি রেজা শাহ পাহলভির শেষ জমানায় ইরানে মার্কিন দূতাবাসের তৎপরতার কথা মনে আসে।

    Reply
  7. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    মুক্তযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি এবং নিজেদের তাঁবেদারি স্বার্থ বজায় রাখার জন্য ভারত মুক্তিযোদ্ধা, প্রবাসী সরকার, রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের মধ্যে একাধিক গ্রুপ-উপগ্রুপ সৃষ্টি করে ছিল। ফলে আমাদের মহান মুক্তযুদ্ধে অকারণ রক্তারক্তি, হানাহানি, হত্যা, গুম ইত্যাদি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গিয়েছিল এবং মুক্তযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু সরকারে এবং আওয়ামী লীগে মারাত্মক বিভেদ সৃষ্টি হয়েছিল।

    পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রবাসী সরকারকে ভারত যেভাবে অপমান করেছে তা ইতিহাসে বিরল। বঙ্গবন্ধু সরকারকে তাঁবেদারি সরকারে পরিণত করার জন্য যে অনৈতিক কর্মগুলো পর্দার আড়াল থেকে ভারতের সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো করেছে তা তৎকালীন জাসদ, সর্বহারা পার্টি, নকশাল এবং বামঘরানার গুপ্ত দলগুলোর তৎপরতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যাবে। পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দী বিনিময়, বাংলাদেশের অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট এবং খুলনা অঞ্চলে মেজর জলিলের বিদ্রোহ করার নেপথ্যের ঘটনার মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের যে অপমান এবং রাষ্ট্রটিকে হেয়প্রতিপন্ন ও ক্ষতিগ্রস্ত করার নীলনকশার বীজ ছিল তা দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে বহুবার আলোচিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সরকারের ব্যর্থতা, ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনে বামঘরানার গুপ্ত দলগুলোর কতটুকু সংশ্লিষ্টতা ছিল তার খতিয়ান দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে বহুবার বহুভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

    Reply
  8. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    নির্বাচনের নিয়ামক শক্তি যে ভোটার, তাদের কথা রাজনৈতিক দলগুলো বেমালুম ভুলে যায়। এ কারণে তারা ভোটারদের মন জয় করার কথা ভাবে না। নিজে কী কী ভালো কাজ করেছেন, সে কথা না বলে প্রতিপক্ষকে গালমন্দ করেন। আবার সেই গালমন্দের ভাষাও কখনো কখনো শালীনতার মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। নেতানেত্রীদের এসব কথাবার্তা থেকে নতুন প্রজন্ম কী শিখবে, কী বুঝবে? যত পারুন নিজের ঢোল পেটান। অন্যের সমালোচনা করুন। কিন্তু শালীনতার মাত্রা ছাড়াবেন না।

    নির্বাচনের এক বছর আগে থাকতেই ‘নির্বাচনী যুদ্ধ’ বেশ জমে উঠলেও জনগণের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে ভয়টা কাটছে না। তারা ক্ষমা চাওয়ানোর কিংবা নাকে খত দেওয়ানোর নির্বাচন চায় না। তারা চায় এমন একটি নির্বাচন, যাতে সব দল অংশ নেবে, ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারবে এবং বাড়িতেও নিরাপদ থাকবে। কারও আক্রমণের শিকার হবে না। সেই নিশ্চয়তা কোনো দল দেয়নি। তারা জনগণকে আশ্বস্ত করার বদলে অন্যের গীবত গেয়ে বেড়াচ্ছে। এমনকি নির্বাচন কমিশনের কাজেকর্মেও মানুষ ভরসা করতে পারছে, সে কথা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগের বিজ্ঞ নেতারা ক্ষুব্ধ হতে পারেন, কিন্তু একটু ঘরের দিকে তাকালে এ কথার অকাট্য প্রমাণ হাতেনাতে পাবেন। এই যে বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ
    বনাম আওয়ামী লীগ, যুবলীগ বনাম যুবলীগ, ছাত্রলীগ বনাম ছাত্রলীগ মারামারি-হানাহানি হচ্ছে, তা অনেকটাই কমে যেত বিরোধী দল মাঠে থাকলে। কিছুটা হলেও দলের নেতা–কর্মীদের মধ্যে শক্তি প্রদর্শনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ হতো। এখন তো ‘আমরা সবাই রাজা’।

    বছরখানেক আগে যে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হলো, সেই নির্বাচনে প্রাণহানির খতিয়ানটা নিলেই বোঝা যাবে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা দলীয় আদর্শ ও গণতান্ত্রিক নীতি-মূল্যবোধের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের হাঙ্গামায় বেশির ভাগই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থীর লোকজন কিংবা বিদ্রোহী প্রার্থীর অনুগতদের ওপর মনোনীত প্রার্থীর সমর্থকেরা সর্বশক্তি দিয়ে ঝঁাপিয়ে পড়েছেন। একে কেউ কেউ শত ফুল ফোটার সঙ্গে তুলনা করতে পারেন। তবে এই ধারা চলতে থাকলে শুধু ফুলের গাছ নয়, বাগানও সাবাড় হয়ে যাবে।

    Reply
  9. নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

    ৪৬ বছর আগে যে বাংলাদেশ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করেছে, তারও মূলকথা ছিল গণতন্ত্র। পাকিস্তানের শাসকেরা গণতন্ত্র মানেনি বলেই পাকিস্তান ভেঙেছে। কিন্তু সেই স্বৈরতান্ত্রিক পাকিস্তানি কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার পরও বাংলাদেশ গণতন্ত্রের জন্য বারবার রক্তাক্ত হয়েছে, আন্দোলন-সংগ্রাম করতে গিয়ে বহু মানুষ প্রাণ দিয়েছেন, বহু তরুণের জীবন নষ্ট হয়েছে। আগুনে পুড়ে কিংবা গুলি খেয়েও অনেক মানুষকে মরতে হয়েছে, যাদের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। নতুন করে প্রাণহানি আর সংঘাতের ঘটনা দেশবাসী দেখতে চায় না। দেখতে চায় সব দলের অংশগ্রহণে একটি ভালো নির্বাচন।
    বাংলাদেশে নির্বাচনী হাওয়ার জন্য নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার প্রয়োজন পড়ে না। সারা বছর, বলতে গেলে সরকারের মেয়াদজুড়েই একধরনের নির্বাচনী প্রচার চলতে থাকে। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আমরা এ রকম মহড়াই দেখে অভ্যস্ত ছিলাম। নির্বাচনে বিজয়ী পক্ষ সবকিছু দখলে নিতে চায়; পরাজিত পক্ষ নির্বাচনের পরদিন থেকে মাঠ গরম করে, পরের মেয়াদের নিজেদের দখলদারি বজায় রাখবে বলে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের সমস্যা ফয়সালা জাতীয় সংসদে হয়নি, হয়েছে রাজপথে। কিন্তু ২০১৪ সালের পর সেই দৃশ্য অনেকটা পাল্টে গেছে। এখন আর রাজনীতিতে বিরোধী পক্ষ বলে কিছু নেই। প্রশাসন, জাতীয় সংসদ, জনসভার মাঠ, শিক্ষাঙ্গন, খাল–জলাশয়, হাটবাজার—সর্বত্র ক্ষমতাসীনদের একক আধিপত্য। এতে ন্যুব্জ, দুর্বল ও সদা দৌড়ের ওপর থাকা বিরোধী দলের তেমন ক্ষতি হয়েছে বলে মনে হয় না। বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগই। আওয়ামী লীগ নেতারা প্রায় প্রতিদিনই বিএনপিকে আগামী নির্বাচনে আসার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছেন, নির্বাচনে এলে তাদের কী কী সুবিধা হবে, না এলে কী কী অসুবিধা হবে এ সম্পর্কে নিয়মিত জ্ঞান দিয়ে চলেছেন। ভাবটা এমন যে বিএনপিকে উদ্ধারের দায়িত্ব একমাত্র আওয়ামী লীগের। আবার বিএনপির নেতারাও নির্বাচন নিয়ে নানামুখী কথা বলে যাচ্ছেন। কখনো বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে যাবে, ২০১৪ সালের মতো আরেকটি নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না। কখনো বলছেন, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। এসব বাহাসের মধ্যে জনগণ নতুন দুটি শব্দের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে (আগেও একাধিকবার বলা হয়েছে) নাকে খত দেওয়া এবং ক্ষমা চাওয়া কিংবা ক্ষমা করা। এক পক্ষ বলছে নাকে খত দিয়ে নির্বাচনে আসতে হবে। আরেক পক্ষ বলছে ক্ষমা চাইতে হবে। ক্ষমা চাওয়ানো কিংবা নাকে খত দেওয়ানো গণতন্ত্রের ভাষা হতে পারে না।

    Reply
  10. শ. জামান

    হানাদার বাহিনী লিখতে নিষেধ করা হয়েছিল বলা হয়েছিল ‘দখলদার’ বাহিনী লিখতে।
    আপনার এই লেখাটির জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ ।

    Reply
  11. Rifath Hossain

    স্যার আপনার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে কোন লেখাই পড়ার সময় শেষের দিকে চোখ ঝাপসা হয়ে যায়!

    Reply
  12. আনিস

    হ্যা, স্যার কেউই চায় না- বিএনপি-জামাতের মত কুত্তাগুলা ফিরে আসুক- একমাত্র আওয়ামিলীগই সকলের কাম্য। কিন্তু আওয়ামিলীগকে হেফাজতের সাথে হাত মিলানো মোটেও ঠিক হয় নাই।

    মানুষ এই লোভি তেঁতুল হুজুরদেরকে জামায়াতের মত হেট করে।

    Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—