স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার অভয়মন্ত্রে উজ্জীবিত করে যে ভাষণ দিয়েছিলেন তা এখন বিশ্বঐতিহ্যের স্মারক। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি ছিল নানা কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। এই ভাষণ ছিল অলিখিত। তিনি একেবারে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত লাখ লাখ জনতার সামনে ভাষণটি দিয়েছিলেন। কিন্তু মনে হচ্ছিল যেন তিনি একটি লিখিত কবিতা পাঠ করেছেন। এই ভাষণের কারণেই বিশ্ববিখ্যাত গণমাধ্যম তাঁকে ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে অভিহিত করেছিল। সম্প্রতি ভাষণটি জাতিসংঘের ইউনেস্কোর ‘মেমোরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল’ রেজিস্ট্রারে স্থান পেয়েছে। যে ভাষণ ছিল বাঙালি জাতিসত্তা বিকাশের এক গৌরবগাথা, সে ভাষণ এখন বিশ্বের এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত। বাঙালি জাতির জন্য এ এক বড় অর্জন।

ইউনেস্কোর স্বীকৃতির আগে অবশ্য বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ ব্রিটিশ লেখক ও ইতিহাসবিদ জ্যাকব এফ ফিল্ডের বিশ্বসেরা ভাষণ নিয়ে প্রকাশিত `We shall fight on the beaches: the speeches that inspired history’ গ্রন্থে স্থান পেয়েছে। বাঙালির বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম ও নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ সংঘটনে বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে সম্প্রতি একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ: রাজনীতির মহাকাব্য’ নামের বইটি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ প্রযকাশ করেছে। সিনিয়র সাংবাদিক অজিত কুমার সরকার সম্পাদিত বইটিতে পরিকল্পনা ও প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রয়ুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের নাম ছাপা হয়েছে।

বইটি আমার পড়ার সুযোগ হয়েছে। আমাকে মুগ্ধ করেছে বলেই এ সম্পর্কে দুচারটি কথা লেখার আগ্রহ বোধ করছি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে দেশে অসংখ্য লেখা প্রকাশিত হয়েছে। পণ্ডিত জনেরা ভাষণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করছেন। এই ভাষণই যে ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা কৌশলী ঘোষণা এবং এই ভাষণের মাধ্যমেই যে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধের রণনীতি ও কৌশল সম্পর্কে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন, তা এখন আমাদের অনেকেরই জানা। তাহলে আলোচ্য গ্রন্থটি আমার মনোযোগ কাড়ল কেন?

বঙ্গবন্ধুর ১৮ মিনিটের ভাষণ থেকে ২৬টি বাক্য নিয়ে ২৬ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি তাদের মতামত বা প্রতিক্রিয়া লিখেছেন। পরিকল্পনাটি অভিনব এবং আকর্ষক। যাঁরা লিখেছেন তাদের যে কেউ একজন ভাষণটি নিয়ে একটি বই লেখার যোগ্যতা রাখেন। কিন্তু একজনের ব্যাখ্যা নয়, এই গ্রন্থে ঠাঁই পেয়েছে ২৬ জনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। পাঠকদের জন্য এটা অবশ্যই বিশেষ পাওয়া।

কে কী লিখেছেন সেটা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে কম কৌতূহলোদ্দীপক নয় কারা ভাষণের কোন বাক্য নিয়ে লিখেছেন। ভাষণে বঙ্গবন্ধুর বাক্য ব্যবহারে যে ধারাবাহিকতা তা অনুসরণ করেই লেখা ও লেখকক্রম সাজানো হয়েছে। যেমন, প্রথমটি লিখেছেন অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। তাঁর বাক্য-– ‘আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়’– আর ভাষণে উচ্চারিত শেষ বাক্য ‘জয় বাংলা’ নিয়ে লিখেছেন সাংবাদিক-কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী।

Bangabandhu book cover - 1

লেখক তালিকায় আরো আছেন, আতিউর রহমান, মুনতাসীর মামুন, আবদুল মান্নান, মুহম্মদ জাফর ইকবাল, মোহাম্মদ ফরাসউদ্দীন, নাসির আহমেদ, আমীর-উল ইসলাম, সৈয়দ বদরুল আহসান, আবু সাঈদ খান, আনিসুল হক, হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, তোফায়েল আহমেদ, কামাল লোহানী, আবুল মোমেন, হাশেম খান, আনিসুজ্জামান, আবদুল খালেক, সেলিনা হোসেন, অজয় রায়, আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, কামাল চৌধুরী, আবেদ খান এবং এস এ মালেক। গ্রন্থটির সম্পাদক এতজন লেখকের কাছ থেকে লেখা সংগ্রহ করে একটি অসাধ্য সাধন করেছেন। কে কোন বাক্য নিয়ে লিখেছেন, কী লিখেছেন তা উল্লেখ করতে গেলে এই আলোচনার কলেবর বাড়বে বিধায় তা থেকে বিরত থাকলাম।

তবে দুএকজনের লেখা থেকে কিছু কিছু অংশ উদ্ধৃত করার লোভও সম্বরণ পরতে পারলাম না। ‘কী করে আমার মায়ের বুক খালি করা হয়েছে, কী করে মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন’– ইয়াহিয়া খানের উদ্দেশে করা এই বাক্য বিশ্লেষণ করে জনপ্রিয় লেখক ও শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল লিখেছেন,

“বঙ্গবন্ধুর বাচনভঙ্গি ছিল খুবই সহজ-সরল এবং মর্মস্পর্শী। সম্ভবত এ কারণেই তিনি দেশের সাধারণ মানুষের কাছে এত সহজে পৌঁছতে পেরেছিলেন। মানুষকে হত্যা করার বিষয়টি কত না ভিন্ন উপায়ে বলা সম্ভব। বঙ্গবন্ধু সেটিকে বলেছেন ‘মায়ের কোল খালি করা’ এবং সম্ভবত এই বাক্য চয়নের জন্যেই কথাগুলো মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে।”

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ‘তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে’– এই বাক্য নিয়ে লিখছেন,

“এখানে কোটি কোটি নিরস্ত্র সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানানো হয়েছে চূড়ান্ত সংগ্রামে অংশগ্রহণের। সেখানে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়িই হয়ে উঠবে দুর্গ। এ কথা অজানা নয় যে, মানুষের ঘরে ঘরে অস্ত্র থাকে না। তাই যা কিছু আছে তাই নিয়ে মোকাবিলার আদেশ। শত্রু তো চিহ্নিত হয়েই আছে, লক্ষ্যও নির্দ্ধারিত। সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে দরকার সংগ্রামের। সাহসিকতার সঙ্গে অবতীর্ণ হতে হবে সে সংগ্রামে। সকলেই যদি এগিয়ে আসে শত্রুকে পরাস্ত করতে, তাহলে বিজয়লাভ অবশ্যম্ভাবী। ঘর যদি অভেদ্য দুর্গ হয়ে না ওঠে, মানুষের ঐক্য যেন দুর্ভেদ্য হয়।”

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুখবন্ধ লিখে গ্রন্থটির গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছেন। শেখ হাসিনা লিখেছেন,

“বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের এই ভাষণ বিশ্ব ইতিহাসে যুগসৃষ্টিকারী সেরা ভাষণগুলোর অন্যতম। বাঙালির মুক্তির পথ-নকশা নির্মাণে অনন্য-দূরদর্শী ভাষণ এটি। এ ভাষণের ভাব, ভাষা, শব্দচয়ন ও সাহসী উচ্চারণ মানবজাতির সংগ্রাম ও আন্দোলনের ইতিহাসের অবিস্মরণীয় উপাদানে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি বাক্যে উঠে এসেছে একটি জাতির ইতিহাস, আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের সংগ্রাম ও বাঙালি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ের কথা।”

‘জয় বাংলা’ নিয়ে লিখেছেন আবদুল গাফফার চৌধুরী লিখছেন,

“জয় বাংলা শুধু একটি স্লোগান নয়। এটি আমাদের অসাম্প্রদায়িক জাতীয় সত্তার শ্রেষ্ঠ রক্ষাকবচ। এই স্লোগান লাখো শহীদের রক্তমাখা, সম্ভ্রমহারা অসংখ্য নারী মুক্তিযোদ্ধার আর্তবিলাপ মিশ্রিত এবং কোটি কোটি মানুষের বিজয়ের উল্লাসে উদ্দীপ্ত। এই ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি বর্তমানে জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদী উত্থানের বিরুদ্ধেও আমাদের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। এই ধ্বনি উচ্চারিত হয়েছে জাতির পিতার কণ্ঠে এবং বাঙালির অস্তিত্ব রক্ষার প্রতিটি সংগ্রামে। এই স্লোগানটি বাঙালিরা ধারণ করে রাখলে তা সব সময় সত্যের সাহস যোগাবে এবং তাদের প্রতিটি সংগ্রামে বিজয়ী করবে।”

বইটিতে সংযোজিত হয়েছে ৭ মার্চের ভাষণের পূর্ণ বয়ান এবং তার ইংরেজি ভাষ্য। এছাড়াও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সংক্ষিপ্ত জীবন-পরিচয় এবং ৭ মার্চের কয়েকটি আলোকচিত্র বইটির আকর্ষণ বাড়িয়েছে। শিল্পী হাশেম খানের আঁকা সুন্দর প্রচ্ছদ এবং ভালো কাগজে ছাপা-বাঁধাইয়ের ২২২ পৃষ্ঠার বইটির দাম ৫০০ টাকা। সাধারণ পাঠকদের কথা বিবেচনা করে বইটির একটি সুলভ সংস্করণ প্রকাশ করার কথা ভাবা যে পারে। এই ভাষণের মর্মবাণী যত বেশি সংখ্যক মানুষের পৌঁছানো যাবে ততই মঙ্গল।

ইতিহাসবিকৃতির একটি বিশেষ কালপর্ব আমাদের অতিক্রম করতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণও এক সময় দেশে প্রায় নিষিদ্ধ ছিল। বঙ্গবন্ধুকে হত্যাপরবর্তী সময়ে ইতিহাসের চাকা পেছনে ঘোরানোর অপচেষ্টা-ষড়যন্ত্র আমরা দেখেছি। সেই কালো অধ্যায়ের পুনরাবৃত্তি রোধে আলোচ্য গ্রন্থ সহায়ক ভূমিকা পালন করবে, যদি এটা ব্যাপকভাবে পঠিত ও আত্মস্থ করা যায়। বলা হয়ে থাকে যে, আমরা বিস্মৃতিপ্রবণ জাতি। এই বই হাতের কাছে থাকলে আমরা হয়তো কিছুটা স্মৃতিতাড়িত হব।

পরিশেষে, এমন একটি সুদৃশ্য এবং অতি প্রয়োজনীয় গ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রকাশনা কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানাই। একই সঙ্গে পরবর্তী সংস্করণ প্রকাশের সময় বইটিতে ভাষণের আরও কয়েকটি বাক্য নিয়ে কয়েকটি লেখা সংযোজনের অনুরোধ রাখছি। বিশেষ করে ভাষণের শুরুতেই ‘ভায়েরা আমার’ বলে যে সম্বোধন তা নিয়ে একটি পৃথক লেখা অবশ্যই থাকতে পারে। কারণ এই সম্বোধন সমগ্র জনতাকে আপন করে নেওয়ার এক জাদুকরী ভূমিকা পালন করেছে। ভাষণের প্রথম বাক্য– ‘আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি’ এবং দ্বিতীয় বাক্য -– ‘আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন’ নিয়েও আলাদা লেখা থাকতে পারে। এই দুটি বাক্য উচ্চারণের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু জনতার উদ্দেশে অনেক কথাই বলেছেন এবং জনতা ঠিকই সেটা বুঝতে পেরেছে।

বইটির বহুল প্রচার কামনা করছি।

বিভুরঞ্জন সরকারসাংবাদিক ও কলামিস্ট।

One Response -- “কালজয়ী ভাষণ নিয়ে ব্যতিক্রমী প্রকাশনা”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—