আজ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি, যা ‘শান্তিচুক্তি’ নামে বহুলভাবে পরিচিত এবং প্রচারিত, স্বাক্ষরের বিশ বছর পূর্ণ হল। বিশ বছর আগে ঠিক এইদিনে চুক্তি স্বাক্ষরকারী দুইপক্ষের মধ্যে যে সৌহার্দ্য, সহযোগিতার মনোভাব, ভার্তৃত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং যে উৎসবের আমেজ ছিল, আজকে সেটা নাই। আজ বিশ্বাসের জায়গায় আছে অবিশ্বাস, আস্থার জায়গায় এসেছে সন্দেহ আর ভাতৃত্বের জায়গায় দৃশ্যত মুখোমুখি অবস্থা। পাহাড়ি আদিবাসীর জীবনে যেখানে উৎসবের আমেজ ছিল, সেখানে বিশ বছর পরে দেখা যাচ্ছে চরম হতাশা। ২৯ নভেম্বর, ২০১৭ ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি বলেছেন, সরকারই চুক্তি বাস্তবায়ন করছে না এবং এ কারণে পাহাড়ে চরম হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে।

এর ফলশ্রুতিতে যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা পরিস্থিতির সৃষ্টি তার জন্য সরকার দায়ী থাকবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের দুই দশক পরে এসেও কেন পাহাড়ি আদিবাসীদের মধ্যে এত হতাশা? এত ক্ষোভ? এসব হতাশার কারণ উপলব্ধির পাশাপাশি, এ প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি এ কারণে যে, বাংলাদেশের সাধারণ জনগণেরও জানা প্রয়োজন কেন চুক্তি স্বাক্ষরের দুই দশক পরেও পাহাড়ি আদিবাসীরা হতাশ এবং ক্ষোভে আক্রান্ত। আমি এখানে খুবই সংক্ষেপে কয়েকটি বিষয়ের অবতারণা করছি।

গত বছর এবং তারও আগের বছর পার্বত্যচুক্তির বর্ষপূর্তিতে আমি বিভিন্ন সংবাদপত্রে লিখেছিলাম, পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘শান্তির পথে’ প্রধান বাধা তিনটি: অতিরিক্ত মিলিটারি উপস্থিতি, ভূমি-বিরোধ এবং সেটেলার বাঙালি সমস্যা। ‘পার্বত্য চুক্তির যথাযথ এবং পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিদ্যমান অনেক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যাবে’, এ মতের সঙ্গে আমিও পুরোপুরি একমত হয়েও পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘শান্তিচুক্তি’ নিয়ে যত লেখালেখি করেছি, প্রায় সর্বত্র বলার চেষ্টা করেছি, ‘কেবল চুক্তির ক্লজ-বাই-ক্লজ বাস্তবায়নই পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকলের সমঅধিকার এবং সমমর্যাদার সহাবস্থান সুনিশ্চিত করে পূর্ণাঙ্গ শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, যদি না মিলিটারি সমস্যা, ভূমি-বিরোধ এবং সেটেলার সমস্যার একটি গ্রহণযোগ্য ও সম্মানজনক সমাধানের পাশাপাশি পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠীর এবং সিভিল-মিলিটারি প্রশাসনের সামাজিক মনস্তত্ত্ব, দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাঙালির মেজরিটারিয়ান আইডিওলজির গুণগত পরিবর্তন হয়।’

প্রতি বছর ২ ডিসেম্বর আসে, পাহাড়ি আদিবাসীরা এবং আদিবাসী নেতৃবৃন্দ নিজেদের ক্ষোভ, দুঃখ, হতাশা প্রকাশ করেন, মিডিয়া খানিকটা দেখাদেখি-লেখালেখি করেন, তারপর সবকিছুই হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। পাহাড়ি আদিবাসীদের দুঃখ আর দুর্দশার কোনো সুরাহা হয় না। কয়েকটি বিষয় জরুরি ভিত্তিতে গুরুত্বারোপ করে ক্রমবর্ধমান সমস্যা সমাধানে এবং হত্যাশা দূরীকরণে উভয় পক্ষের এগিয়ে আসা জরুরি বলে আমি মনে করি। তবে, রাষ্ট্রকে এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

এক.

ভূমি সমস্যার একটা দ্রুত এবং গ্রহণযোগ্য সমাধান প্রয়োজন। কেননা, ১৯৯৭ সালের পর অসংখ্যবার ভূমি কমিশন গঠন করা হয়েছে, কিন্তু কোনো ভূমি কমিশনই কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে, ১৯৯৭ সালের পর থেকে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রায় ৫ হাজার আবেদনপত্র জমা পড়লেও, তন্মধ্যে যাচাই বাছাই করে ২ হাজার নিষ্পত্তির জন্য নির্ধারণ করা হলেও, এখনও পর্যন্ত একটা আবেদনেরও গ্রহণযোগ্য সমাধান সম্ভব হয়নি। তাছাড়া, ভারত থেকে প্রত্যাগত প্রায় ২২,২২৩টি পরিবারের ৬৪,৬১১ জন পাহাড়ি আদিবাসীকে পুনর্বাসনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। এছাড়াও প্রায় ৯০ হাজারেরও বেশি অভ্যন্তরীন উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

 

Chakma people - 13000

 

তাহলে, পার্বত্য চুক্তি কীভাবে পাহাড়ে শান্তি আনবে? চুক্তি স্বাক্ষরের দুই দশক পরও যদি এসব মৌলিক সমস্যার কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান না-হয়, তা তো হতাশার জন্ম দেবেই। সুতরাং রাষ্ট্রকে দ্রুততম সময়ে এসব ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যা ও ভূমি-বিরোধ দূর করা এবং অভ্যন্তরীন উদ্বাস্তু ও প্রত্যাগত শরণার্থীদেরকে যথাযথ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

দুই.

পাহাড়ে অতিরিক্ত মিলিটারির উপস্থিতি পাহাড়ের স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থায় নিঃসন্দেহে একটা প্রভাব বিস্তার করে। চুক্তির একটি অন্যতম শর্ত ছিল, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ক্রমান্বয়ে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে, যাতে মানুষের মন থেকে বিদ্যমান ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ এবং ‘আশংকার আতংক’ দূরীভূত হয়। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের দুই দশক পরও পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে এখনও পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য হারে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়নি। জনসংহতির দাবি অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনও প্রায় ৪ শত ছোট-বড় অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প আছে যার কারণে সাধারণ পাহাড়িরা একটি স্বাধীন, শংকাহীন এবং ভয়হীন জীবন-যাপন করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

ফলে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ক্রমান্বয়ে অস্থায়ী সেনা ক্যাম্পগুলো পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে প্রত্যাহারের ব্যবস্থা হলে একদিকে যেমন চুক্তির শর্তের বাস্তবায়ন হল, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনও একটা ‘ভয়ের সংস্কৃতি’ থেকে খানিকটা মুক্তি পাবে।

তিন.

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি আদিবাসী-অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে স্বীকার করে নিতে হবে কেননা পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের আর দশটি এলাকার চেয়ে আলাদা। এর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, অর্থনৈতিক কাঠামো, ভৌগোলিক পরিবেশ, এতদঞ্চলের মানুষের জীবনাচার, ধর্মবিশ্বাস, ভাষা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সবকিছুই একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। এ বাস্তবতা স্বীকার করে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংরক্ষণের বিয়টি বিশেষ বিবেচনায় গুরুত্ব দিতে হবে।

এখানে মনে রাখতে হবে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামকে আর দশটি এলাকার মতো সাধারণীকরণ না-করে, একটি বিশেষ অঞ্চল হিসাবে স্বীকার করে নিতে হবে, যা পার্বত্য চুক্তিকে সুষ্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে।

চার.

চুক্তি স্বাক্ষরের বিশ বছর পার হয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত তিন পার্বত্য জেলার শাসনভার পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দাদের সরাসরি ভোট নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তরের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এমনকি পাহড়ি-বাঙালি স্থায়ী অধিবাসীদের একটি সঠিক ভোটার তালিকা পর্যন্ত অদ্যাবধি করা সম্ভব হয়নি। ফলে, কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছা এবং আকাঙ্ক্ষার অধীনে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পরিচালিত হয়। যে দল ক্ষমতায় থাকে, সে দল তাদের দলীয় আনুগত্য এবং দলীয় সম্পৃক্ততার প্রশ্নটি বিবেচনায় নিয়ে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়।

ফলে, এসব জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানরা যতটা না পার্বত্য চট্টগ্রামের সাধারণ জনগণের — আদিবাসী এবং বাঙালি — প্রতিনিধি না-হয়ে রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হয়ে উঠে। এসব চেয়ারম্যান পার্বত্য জেলার অধিবাসীদের চাওয়া-চাহিদার চেয়ে রাষ্ট্রের পলিসি কিংবা কেন্দ্রীয় সরকারের আকাঙ্ক্ষা এবং পলিসি বাস্তবায়নের অধিকতর মনোযোগী থাকেন। এ কারণেই চুক্তি স্বাক্ষরকারী আদিবাসী প্রতিনিধি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃত্ববৃন্দ বা আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে তিন পার্বত্য জেলার জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের একটা সমন্বয়হীনতা সবসময় লেগে থাকে।

ফলে, চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার বিশ বছর পরও এসব বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগ না-থাকার কারণে চুক্তিকেন্দ্রিক হতাশা দিন দিন বাড়ছে।

পাঁচ.

পার্বত্য জেলা পরিষদের কাছে এখনও পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য বেশ কিছু বিভাগের হস্তান্তর করা হয়নি যা সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে একটা অনাস্থার এবং অসন্তোষের সম্পর্ক তৈরি করছে। সরকারপক্ষ ইতোমধ্যে বেশকিছু বিভাগ পাবর্ত্য জেলা পরিষদের হাতে হস্তান্তর করলেও স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ভূমি, বন ও পরিবেশ, পর্যটন প্রভৃতি এখনও জেলা পরিষদের হাতে হস্তান্তর করা হয়নি যা চুক্তির নানান শর্তাবলীর অন্যতম। সরকার অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ ও দপ্তরগুলো জেলা পরিষদের হাতে হস্তান্তর করে চুক্তি বাস্তবায়নের পারসেন্টেজ বাড়ানোর চেষ্টা করলে, পাহাড়ের আদিবাসীদের মধ্যে অসন্তোষ তো তৈরি হবেই।

তাই, ক্রমান্বয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ এবং দপ্তরগুলো জেলা পরিষদের হাতে হস্তান্তর করে একটি বিশেষ অঞ্চল হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক এবং শাসনতান্ত্রিকতায় গতি আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হবে।

 

Chakma people - 600

 

ছয়.

চুক্তি স্বাক্ষরের বিশ বছর পরও পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদকে একটি ঠুঁটো জনগন্নাথ বানিয়ে রাখা হয়েছে। তার পর্যাপ্ত লোকবল নাই, অর্থবল নাই, প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সেটা বাস্তবায়নের ক্ষমতা নাই। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর তার কোন কর্তৃত্ব নাই। চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে আজ বিশ বছর অথচ এখনও পর্যন্ত কোন আঞ্চলিক পরিষদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো কার্যবিধি তৈরি করা হয়নি। ফলে, চুক্তি একটা হয়েছে বটে, কিন্তু সেটাকে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন এবং চুক্তির বিভিন্ন ধারা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের সদিচ্ছার অভাব চুক্তি স্বাক্ষরের শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত জারি আছে।

চুক্তি কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটা হতাশার ভাব ক্রমান্বয়ে বৃহৎ থেকে বৃতত্তর হয়ে উঠছে।

সাত.

চুক্তিতে লিখিতভাবে না-থাকলেও পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ক্রমান্বয়ে সম্মানজনকভাবে সেটেলার বাঙালিদেরকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যথাযথভাবে পুনর্বাসনের একটা ব্যবস্থা করা সরকারের তরফ থেকে আন্তরিকভাবে কাম্য ছিল, কিন্তু সেটা কোনোভাবেই করা হয়নি এবং কোনো সরকারের আমলেই সত্যিকার অর্থে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা বাঙালির সঙ্গে পাহাড়ি আদিবাসীদের মধ্যে সংঘাত নেই। পাহাড়ি-বাঙালি দীর্ঘ বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামে একত্রে একসঙ্গে বসবাস করছে, এমনকি স্বাধীনতাপূর্ব বহুকাল থেকে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যখন সেটেলার বাঙালিদেরকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে অভিবাসন করানো হল, তখন থেকে কিছু বাঙালির সঙ্গে পাহাড়ি আদিবাসীদের সংঘাত দ্রুত বাড়তে থাকে যা ক্রমান্বয়ে ‘পাহাড়ি বনাম বাঙালি’ একটা দ্বান্দ্বিক অবস্থান গ্রহণ করেছে।

এখানে মনে রাখতে হবে যে, দ্বন্দ্বটা পাহাড়ি বনাম বাঙালি নয় বরঞ্চ কিন্তু কিছু বাঙালির সঙ্গে কিছু পাহাড়ির। এর একটা অন্যতম কারণ হচ্ছে, পাহাড়িদের প্রতি মেজরিটি সেটেলার বাঙালির দৃষ্টিভঙ্গি যা অত্যন্ত নেতিবাচক। ফলে, সেটেলার বাঙালির উপস্থিতি পার্বত্য চট্টগ্রামের পারষ্পরিক সহযোগিতা এবং সহমর্মিতার মাধ্যমে একত্রে বসবাস করার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের বাধা হিসাবে কাজ করে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এ বিষয়টির প্রতি একেবারেই সুনজর দেয়া হয়নি। কিন্তু এ দ্বৈরথও যে, নানামুখী হতাশার জন্ম দিচ্ছে, সেটা অনস্বীকার্য।

পরিশেষে বলব, ক্রমবর্ধমান হতাশার অন্যতম কারণ হচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষের কাঙ্ক্ষিত সদিচ্ছার অভাব। চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সদিচ্ছার অভাব বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকারের আমলে সুষ্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। ১৯৯৭ সালে চুক্তি স্বাক্ষরের পর আওয়ামী লীগ ২ বছরের বেশি সময় ক্ষমতা ছিল। এরপর বিএনপি-জোট সরকার ক্ষমতায় ছিল ৫ বছর। ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের সরকার ২ বছর। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা আছে প্রায় ৯ বছর। কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়নের সদিচ্ছার অভাব সবসময় ছিল। বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে বলতে গেলে সবচেয়ে তীব্র অনীহা ছিল। কারণ তাদের দাবি অনুযায়ী চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার।

আমাদের মনে রাখতে হবে যে, চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নয়। তাই যে দলই ক্ষমতায় আসুক চুক্তির শর্ত বাস্তবায়ন করা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। প্রকৃতপক্ষে এ দায়িত্ববোধই আসল বিষয়। আমরা যদি সকলে যে যেখানে আছি, সেখানে নিজ নিজ দায়িত্ব এবং কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করি, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যায়।

পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের বিশ বছর পরও চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য যখন পাহাড়ি আদিবাসী নেতৃবৃন্দকে দাবি-দাওয়া পেশ করতে হয়, তখন সেটা আমাদের সকলের জন্য লজ্জার। আর আমরা সকলে এ লজ্জা থেকে মুক্ত হওয়ার আন্তরিক চেষ্টা করলেই পাহাড়ের আদিবাসী এবং অধিবাসীদের হতাশাও ক্রমান্বয়ে দূরীভূত হবে।

রাহমান নাসির উদ্দিননৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

১১ Responses -- “পার্বত্যচুক্তির দুই দশক: এখনও হতাশা কেন?”

  1. হাসান

    ১। আমার প্রথম প্রশ্নঃ পার্বত্য চট্টগ্রামে কি ঘটেছে যে সেখানকার বাঙ্গালীদেরকে সরিয়ে ফেলতে হবে ? যেই রাষ্ট্র-সংবিধান আপনাকে যথেচ্ছা লেখালেখির অধিকার দিয়েছে, সেই একই রাষ্ট্র-সংবিধান তাদেরকে অধিকার দিয়েছে নিজের দেশের ভেতর যেকোন স্থানে থাকার।
    ২। চুক্তিতে নাই তারপরও সরকার বাঙ্গালীদেরকে সরিয়ে নেবে কেন ? শতকরা ৮০ ভাগ অরণ্যবেষ্টিত এলাকায় বাঙ্গালীরা নতুন বসতি স্থাপন করতে পারবে না কেন ? তাহলে নিজের দেশ বলতে আমার কি থাকল ?
    ৩। ঢাকা শহরের মাঝখানে যদি ক্যান্টনমেন্ট থাকতে পারে তাহলে রাঙ্গামাটির মত দুর্গম এলাকায় থাকতে পারবে না কেন ? ওখানে আর্মি কোন লোককে খুন করেছে, বাড়িঘর ধবংস করেছে এরকম কোন সংবাদ প্রথম আলো, বিবিসি কিংবা অন্য কোন সংবাদ মাধ্যমে এসেছে ? লারমা সাহেবদের শান্তি বাহিনীর বিপরীতে দেশের সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখতে সেনাবাহিনী ছাড়া সরকারের আর কি করার ছিল বলে আপনি মনে করেন ?
    ৪। সেটেলার মানে কি, আদিবাসী খেতাব কিভাবে দেওয়া হয় ? বাঙ্গালীরা কেন এদেশের আদিবাসী নয় ? দেশের ১% মানুষের জন্য সরকারী চাকরির ১০% সংরক্ষিত রেখেছিল কোন সেটেলাররা ? আমেরিকান, অস্ট্রেলিয়ান কিংবা আফ্রিকান আদিবাসীদের মত এই উপজাতিদেরকে কারা নির্যাতন করেছে ?
    ৫। ভারতের কাশ্মীর, কিংবা মনিপুর রাজ্যে সেনাবাহিনীর যে বিশেষ ক্ষমতা আছে আপনি কি তা জানেন ? কিংবা ইরম শর্মিলা চানু আপার কথা ? ভারত কেন তাদের সেনাবাহিনীকে এই ক্ষমতা দেয় ? আমার দেশ কেন তার সেনাবাহিনীকে এই ক্ষমতা দিতে পারবে না ?
    ৬। “বাঙ্গালী আছে বলেই আজ পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের মনে কোন শান্তি নাই” কেন ? বাঙ্গালীদের গায়ের গন্ধ কি খুবই খারাপ ?
    ৭। এদেশের প্রাচীনতম জনগোষ্ঠী হল খাসিয়া, গারো আর সাঁওতালরা। তাদের জন্য এক ছটাক জমিও কি কেউ কোন দিন দাবি করেছেন ? হাজং, কোচ, ওঁরাও, মনিপুরী কিংবা রাখাইনদের জন্য ? তাদের জন্য ঢাকায় মিছিল-মিটিং করেছেন ? কেন করলেন না ?
    ৮। আপনি এই উচ্চ ঘনবসতির দেশে ১% মানুষের জন্য ১০% ভূমি নিয়ে “অভয়ারণ্য” প্রতিষ্ঠা করতে চাইছেন ভালো কথা, ঢাকার ফুটপাতে শুয়ে থাকা প্রায় ১০ লক্ষ মানুষকে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিন না ভাই, তাহলে তারা আর পাহাড়ে কাউকে ডিস্টার্ব করতে যাবে না। আপনার মত পাহাড়িপ্রেমী মানুষের বাড়ি দিয়েই সরকার তাদেরকে পুনর্বাসন শুরু করবে কি বলেন ?

    Reply
  2. তানভীর আহমেদ

    সরকার কি পার্বত্য
    চট্টগ্রাম ভূ-খন্ডের নিয়ন্ত্রণ
    হারাতে যাচ্ছে? নাকি স্বাধীন জুমল্যান্ড
    গঠনে একধাপ এগিয়ে দিচ্ছে? এ প্রশ্ন
    এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের ৯ লাখ বাঙালী সহ কোটি-কোটি নাগরিকের।
    উচ্চ আদালতে অবৈধভাবে ঘোষিত
    আঞ্চলিক পরিষদের নেতাদের
    সাথে বৈঠক করে তাদেরই
    সুপারিশে সরকার এমন একটি আইন
    সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমির
    উপর তথা বাংলাদেশের একদশমাংশ ভূ-
    খন্ডের নিয়ন্ত্রণ হারাবে।দীর্ঘদিন ধরে ভূমিবিরোধ
    নিষ্পত্তি কমিশন আইন সংশোধন
    এবং আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠার
    মাধ্যমে পার্বত্য এলাকা নিয়ে পৃথক
    ভূখন্ড গঠনের
    নীলনকশা বাস্তবায়নে নেমেছে একটি মহল। মূলত আড়াইশ বছরের
    অভিবাসী হয়ে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য
    নিয়ে তারা ৪ হাজার বছর
    ধরে বাংলাদেশে বসবাসকারী বাঙালীদের
    বহিরাগত আখ্যাদিয়ে বিতারিত করার
    চেষ্টায় সক্রিয় রয়েছে। ১৯৯৭ সালে সম্পাদিত চুক্তিতে নিজেদের
    উপজাতীয় হিসাবে পরিচয়টি জাতীয় ও
    আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃতি নিয়েও
    আবার নিজেদের
    আদিবাসী হিসেবে প্রতিষ্ঠা নিতে উঠেপড়ে লেগেছে খোদ
    সন্তু লারমা তথা আঞ্চলিক পরিষদ। এটা প্রতিষ্ঠা পেলে পার্বত্য তিন
    জেলায় সরকার তার নিজ কর্তৃত্ব
    হারাবে ধারণা করছে অভিজ্ঞ মহল।
    উঠে যাবে স্বাধীন বাংলাদেশের
    প্রতিষ্ঠিত আইনের শাসন।
    পাহাড়ীরা তাদের নিজস্ব আইনের শাসনে চলবে। ইচ্ছা করলেও অন্য কেউ
    জায়গা কিনতে পারবে না। একই
    সঙ্গে সরকারের অধীনে থাকা কাপ্তাই
    প্রকল্প, বেতবুনিয়া ভূউপগ্রহ এলাকা,
    রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও স্থানীয়
    কর্তৃপক্ষের নামে রেকর্ডকৃত ভূমিও তাদের অধীনে চলে যাবে।সরকার স্ব-উদ্যোগে পার্বত্য
    চট্টগ্রামের ভূমি ব্যবস্থাপনার অধিকার বঞ্চিত হয়ে কার্যত: পার্বত্য
    চট্টগ্রাম ভূ-খন্ডের নিয়ন্ত্রণ
    হারাতে যাচ্ছে। এরই মধ্য
    দিয়ে স্বাধীন জুমল্যান্ড (বাংলাদেশ
    থেকে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র) গঠনের
    স্বপ্নে আরেক ধাপ এগিয়ে নিলেন ষড়যন্ত্রকারীরা। সরকারের
    সংশ্লিষ্ঠদের এধরনের ঐকমত্যের
    সিদ্ধান্তে হতবাক পাহাড়ের
    সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ। উৎকণ্ঠা বিরাজ
    করছে বারবার উপেক্ষিত
    হয়ে আসা প্রায় ৯ লাখ পার্বত্য বাঙালি জনগোষ্ঠির মধ্যে। সংশ্লিষ্ঠ সূত্রে জানাগেছে,
    বৈঠকে আঞ্চলিক পরিষদের নেতৃবৃন্দের
    সঙ্গে ভূমি প্রতিমন্ত্রী মোস্তাফিজুর
    রহমানের প্রচন্ড বাগ-বিতন্ডা হয়।
    সূত্রে আরো জানাযায়, বিদ্যমান
    আইনে ৬(১)(গ) এ উল্লেখিত সম্পত্তিতে পার্বত্য জেলা পরিষদের
    কোন কর্তৃত্ব নেই। কিন্তু এই ধারার
    শর্তাংশ তুলে দিলে তখন তাদের কর্তৃত্ব
    সৃষ্টি হবে। আইনের ৭(৫) ধারায়
    বলা আছে ৬(১)-এ বর্ণিত বিষয়টিসহ এর
    এখতিয়ারভুক্ত অর্থাৎ সকল ক্ষেত্রে সর্বসম্মতির
    ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
    তবে সর্বসম্মতির
    ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে উপনীত
    হওয়া সম্ভব না হলে চেয়ারম্যানের
    সিদ্ধান্তই কমিশনের সিদ্ধান্ত বলে গণ্য হবে। এটি সংশোধন
    করে আইনে থাকছে চেয়ারম্যানসহ
    সদস্যদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ
    সিদ্ধান্তই হবে কমিশনের সিদ্ধান্ত। পার্বত্য অঞ্চলের বাঙালীদের অভিযোগ
    চুক্তি অনুযায়ী গঠিত কমিশনে তাদের
    উপেক্ষা করা হয়েছে। এ কমিশনের
    পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালীদের কোন
    প্রতিনিধি অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি।
    কমিশনের চেয়ারম্যানসহ মোট ৯ জন সদস্যের মধ্যে এই কমিশনে দু’জন
    সরকারী কর্মকর্তা বা প্রতিনিধি এবং বাকি ৭
    জন সদস্যই পার্বত্য চট্টগ্রামের
    পাহাড়ীদের প্রতিনিধি এবং আঞ্চলিক
    পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদ নেতা।
    উল্লেখ্য যে, কমিশনের বিরোধ নিষ্পত্তির পৃথক ৩ জেলার ৩টি প্যানেল
    হলো প্রতিটিই চেয়ারম্যানসহ ৫
    সদস্যের। ফলে আঞ্চলিক পরিষদ
    তথা পাহাড়ে বসবাসকারী একাংশ
    পাহাড়ী জনগোষ্ঠি যে ভাবে চাইবে বা যা বলবে পকারান্তরে তাই
    হবে কমিশনের সিদ্ধান্ত। এ ক্ষেত্রে সেখানে সরকারের কোন
    নিয়ন্ত্রণই থাকবে না। জানাগেছে আঞ্চলিক পরিষদের
    প্রস্তাবিত সুপারিশের ১০টি ধারার
    ৪টিতে প্রচন্ড মতভেদ থাকা সত্ত্বেও
    তা সংশোধনের জন্য
    মন্ত্রিপরিষদে পাঠানোর সিদ্ধান্ত
    নেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আদালতের রায়ও উপেক্ষিত হচ্ছে। ২০০০ সালের
    ২৬৬ নং রিট মামলার রায়ে উচ্চ
    আদালত আঞ্চলিক পরিষদ বাতিল
    করে দেয়। উচ্চ আদালত আঞ্চলিক পরিষদ
    বাতিল করলেও তাদের সুপারিশের
    ভিত্তিতে এই কমিশন আইনের সংশোধনের কার্যক্রম চলছে। ২০১০
    সালের ১৩ এপ্রিল দেয়া উচ্চ আদালতের
    এই রায়ে জেলা পরিষদের কতিপয়
    ধারা যা সংবিধানের
    সঙ্গে সাংঘর্ষিক তাও বাতিল করা হয়।
    বিগত ২৮-শে মার্চ ভূমি মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত
    আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকের
    আলোকে একটি সুপারিশমালা তৈরি করা হয়।
    এই বৈঠকে ১০টি সুপারিশের
    মধ্যে ৪টি ধারার বিষয়ে মতভেদ
    থাকে। কিন্তু পরবর্তীতে গত ১২-শে জুন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ১৯৯৭
    বাস্তবায়ন কমিটির সভায় মতভেদ
    থাকা এই চারটি ধারাও অন্তর্ভুক্ত
    করে একটি সুপারিশ তৈরি করা হয়।

    Reply
  3. তানভীর আহমেদ

    পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল অরাজকতা ও বিভেদের ক্ষেত্রে ভূমি সমস্যাকে সবসময়
    উল্ল্যেখযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার করা হয়েছে এবং হচ্ছে।
    এখানে বসবাসরত সকল সম্প্রদায়ই মৌলিক কিছু প্রতিবন্ধকতার কারণে দীর্ঘদিন যাবৎ নানাবিধ সমস্যায় ভুগছে। এক্ষেত্রে নির্দিষ্টভাবে কোন
    সম্প্রদায় অন্য সম্প্রদায়ের চেয়ে কম- বেশি সমস্যায় নিপাতিত আছে তুলনামূলকভাবে তা বলার সুযোগ নেই। খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি এ অঞ্চলের
    নিত্যদিনের ঘটনা। এছাড়া পাহাড়ি- বাঙ্গালী সমাজে নানা রকমের
    অসন্তোষতো আছেই, পাহাড়ি-পাহাড়ি দ্বন্দ্ব-সংঘাতের চিত্রও
    ক্রমেই পুষ্ট হচ্ছে। আঞ্চলিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও পার্বত্য শান্তিচুক্তি বিরোধী ইউনাইটেড পিপলস্ ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট
    (ইউপিডিএফ) এ’দুটি গ্রুপ পরষ্পরের প্রতি ক্রমেই হিংসাকাতর হয়ে উঠছে এবং সুযোগ পেলেই এক পক্ষ আরেক পক্ষের উপর হামলা চালাচ্ছে। এদের মধ্যে প্রতিনিয়ত বন্দুকযুদ্ধে খুনের ঘটনা ঘটছে। এবং এসব খুনের ঘটনায় এক পক্ষ আরেকপক্ষকে দায়ী করছে। এছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস)-এর নিজেদের মধ্যে আবার দুটি গ্রুপে বিভক্ত। পাহাড়ে অবৈধ
    অস্ত্রের ঝনঝনানি স্পষ্ট। কিন্তু সবকটি গ্রুপই অস্ত্র ব্যবহারের
    কথা বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। শান্তিচুক্তি পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি আনবে ১৯৯৭ সালে একথা ছিল অনেকের মুখেমুখে। জনসংহতি সমিতি অস্ত্র
    জমা দিয়ে যেমন প্রমাণ করেছিল তাদের ভান্ডারে অত্যাধুনিক অস্ত্রের কোন কমতি নেই, তেমনি বিভিন্ন স্থানে জেএসএস ও ইউপিডিএফ-এর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র সংঘাত কি আবারো প্রমাণ করেনা এখনো তাদের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্রের ঘাঠতি নেই? পার্বত্য শান্তিচুক্তির অন্যতম বিষয়
    হলো- পাহাড়ি শরণার্থী এবং অভ্যন্তরীণ পাহাড়ি উদ্বাস্তু পরিবার গুলোর
    পুনর্বাসন। অসংখ্য পরিবারের অমানবিক জীবনযাপন মানবতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যা বেশ জটিল একটি অধ্যায়। বাংলাদেশের সব
    আদিবাসীদের ভূমি ব্যাবস্থাপনা পদ্ধতি অভিন্ন।
    অনুসন্ধানে জানা যায়, ঐতিহ্যগতভাবে ভূমির উপর আদিবাসীদের নিজস্ব কোন
    মালিকানা ছিলনা। যিনি যে পরিমাণ ভূমি ব্যবহার করতেন, প্রথাগতভাবে সেটিই তার মালিকানায় থাকতো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে থাকতো সামাজিক মালিকানা, এতে ব্যাক্তি শুধু চাষের অধিকার ভোগ করতেন। মূলত আদিবাসীর অধিকার চাচ্ছে পাহাড়ী গোষ্ঠীগুলো। জাতিসংঘের আদীবাসী সংজ্ঞায় উল্ল্যেখ আছে, কোন আদিবাসী এলাকায় সেনা চলাচল করা যাবে না। এলাকার কোন জমি সরকার ব্যবহার
    করতে পারবে না। অনুমোদন ছাড়া আদিবাসী এলাকায় প্রবেশও
    নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। এ ছাড়া আদিবাসী হলে অপরাধ করলেও তাদের রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনে কোন বিচার বা গ্রেফতার করা যাবে না। তারা তাদের নিজস্ব
    আইনে অপরাধীদের বিচার করবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম তথ্যাবিজ্ঞমহলের
    তথ্যমতে, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ এবং পাহাড়ী নেতৃবৃন্দ
    নিজেদের আদিবাসীতে পরিণত করতে দেশে এবং দেশের
    বাইরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে তদবির চালিয়ে আসছেন। বিভিন্ন সংস্থার দেয়া তথ্য অনুযায়ী তাঁদের পেছনে রয়েছেন তাঁদের নেতা চাকমা সার্কেল চীফ
    রাজা দেবাশীষ রায়। আদিবাসীর মর্যাদা আদায়ের পাশাপাশি ভূমি কমিশন আইন সংশোধন করতে পারলে তাঁরা তাঁদের লক্ষ্য অর্জন করে ফেলবেন। পাহাড়ের ভারত প্রত্যাগত শরণার্থীদের ভূমি জটিলতা নিরসনে পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন প্রণয়ন ও কমিশন গঠন করা হয়। বিভিন্ন সময় সরকার অধিগ্রহনকৃত ভূমি ও বাঙালীদের নামে দেয়া বন্দোবস্তীকৃত জমিও কমিশনের আওতায় আনতে চাচ্ছেন
    পাহাড়ী নেতৃবৃন্দ। গত বছর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে আদিবাসী শব্দটি ভুল
    ব্যবহার হচ্ছে উল্ল্যেখ করে তা না করার জন্য নির্দেশনা জারি করেন। তখন বলা হয়,
    বাঙালীরা আদি অধিবাসী হিসেবে বিগত ৪ হাজার বছর ধরে বসবাস করছে বলে বিভিন্ন ভাবে প্রতীয়মান হয়। অপরপক্ষে ঐতিহাসিক সূত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের
    ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের ভূখন্ডে তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে ১৭২৭ সাল থেকে দু’শ বছর ধরে বসবাস করছে বিধায় তাঁরা আদিবাসী নন।

    Reply
  4. তানভীর আহমেদ

    পার্বত্যাঞ্চলে সরকারি, আধাসরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে শতকরা ৮০ ভাগ চাকরির সুবিধা ভোগ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ উপজাতিরা। বাকি ২০ ভাগ বাঙ্গালীদের জন্য। বাঙ্গালী পরিচয়ই যেন এখানকার সবচেয়ে বড় অভিশাপ। বার্ষিক বরাদ্দকৃত প্রায় ৯৫ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্যের মধ্যে ২০ হাজার মেট্রিক টন বিশেষভাবে বরাদ্দ করা হয় উপজাতিদের জন্য। অবশিষ্ট অংশ বন্টন করা হয় শরণার্থী, গুচ্ছগ্রাম ও উপজাতি অধূষ্যিত অঞ্চলের বিভিন্ন উন্নয়নে। এক্ষেত্রে বাঙ্গালিদের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। উন্নয়ন বরাদ্দের শতকরা ৯০ ভাগ উপজাতিদের জন্য ব্যয় করা হয়। শান্তিচুক্তি অনুযায়ী আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদের এ দুটি গুরূত্বপূর্ণ সরকারি দফতরের প্রধান কর্তারা উপজাতীয়। সে কারণেও দুটি সরকারি দফতর থেকে বাঙ্গালিরা কোনোরকম সুবিধাই পাচ্ছে না। সংবাদপত্র তথা মিডিয়া এবং দেশের বুদ্ধিজীবি শ্রেণী সবাই পাহাড়ীদের অধিকারের কথা তুলে ধরে। কিন্তু ৬,৫০,০০০ এরও বেশি পুনর্বাসিত বাঙ্গালীদের দু:খ ও কষ্টের কথা কেউ তুলে ধরে না। পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত কতিপয় এনজিও’র কর্মপরিধিও ভ্রান্তিমূলক। যা পার্বত্য শান্তি প্রক্রিয়ার সাথে সাংঘর্ষিক।
    দেশের সংবিধান, মানবাধিকার ও যুক্তির খাতিরেই বলতে হবে পার্বত্য এলাকায় উপজাতী-বাঙ্গালীদের সহাবস্থান ও সমঅধিকার প্রয়োজন। পার্বত্য বাঙ্গালী-উপজাতীদের সমঅধিকারের ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের গ্যারান্টি নিশ্চিত করতে হবে।

    Reply
    • আহসান বিন খাজা মঈন

      আপনি যে সেটেলার বাঙ্গালী আর ‘সম-অধিকার’-এর লোক তা আপনার কমেন্টের ধরণ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। উস্কানি ছড়িয়ে, আগুন দিয়ে প্রতিবছর পাহাড়ীদের বাড়ি পোড়াবেন মিলিটারির ছত্রছায়ায় আর কেউ পাহাড়ীদের পক্ষে লিখলে আপনার গা এত জ্বলে কেন? কারণ একটাই.. সেটা হলো ভয়। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন হলে মিলিটারির খবরদারি কমবে আর পাহাড়ীদের যে জমিগুলো প্রশাসনের ছত্রছায়ায় দখল করেছিলেন সেগুলোও ছাড়তে হবে। আমও যাবে ছালাও যাবে… তাই চোরের মায়ের বড় গলা। চালিয়ে যান ভাই, প্রোপাগাণ্ডা চালিয়ে যান। আপনার মত রাজাকারদের জন্যই বাঙ্গালী মুসলমানদের কেউ বিশ্বাস করে না, সহবস্থান তো দূর কি বাত্

      Reply
  5. মনিরুল ইসলাম।

    আপনার কথাগুলো যেন বই এর পাতা থেকে মুখস্থ করে তুলে দেয়ার মত। সেনাবাহিনী নিয়ে অনেক মহৎ-উদার লেখক দাবীদাররা অনেক নছিহত করতে শুনি-দেখি। আমি সবিনয়ে লেখকের কাছে জানতে চাই-একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরে শান্তিবাহিনীর নামধারীরা প্রকাশ্যে অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়ে রোড মার্চ করে, প্রকাশ্যে পাহাড়ি-বাঙ্গালী নির্বিশেষে সব শ্রেনীর ব্যবসায়িদের কাছ থেকে অস্ত্রের মুখে চাঁদা আদায় করে, মোটা অংকের বিনিময়ে অপহরন করে, আন্তর্জাতিক চক্রের ক্রীড়নক হয়ে এখানকার উগ্রবাদীরা লালিত হচ্ছে, দেশের অভ্যন্তরীন নিরাপত্তাকে বারাবার হুমকীর দিকে তাড়িত করছে, তখন কি দেশের নিরাপত্তা বাহিনী আঙ্গুল চোষবে? মূলতঃ এখানকার জনগোষ্টির দাবী আদায়ের লক্ষ্যে যে বা যারা নেতৃত্ব দিচ্ছে, পুরো পার্বত্যঞ্চলকে সোণা দিয়ে মুড়িয়ে দিলেও তারা কখনো এতদ্বঞ্চলে শান্তি হবে বলে স্বীকার করবে না। আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ হিসাবে তারা তা স্বীকার করবে না। এখানে দ্বন্ধ বাঁচিয়ে রাখার জন্য তাদের সাম্প্রদায়িক উস্কানী চলবেই। আর আপনাদের মত কিছু মানবতাবাদী লেখকদের এসব মহত প্রচারনা(?) দরকার আছে বৈ কি?

    Reply
  6. মো.কামরুজ্জামান

    এই ধরনের মতামত সরাসরি দেশের স্বার্থবিরোধী। স্বাধীন জুম্মল্যান্ড এর উৎসাহ দিবেন না। ছোট এই দেশটিকে ভালবাসুন।

    Reply
  7. আবুল হাসান

    পৃথিবীর দেশে দেশে ‘প্রায় স্বৈরতন্ত্র’ বা কর্তৃত্ববাদ competitive authoritarianism) ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। এই ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক সকল প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব থাকা সত্ত্বেও সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অপব্যবহার করে সাংস্কৃতিকভাবে ভিন্ন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু, জাতিগতভাবে ভিন্ন, বিশ্বাসে ভিন্ন, বিরোধীদের দমিয়ে রাখবে!’ কর্তৃত্ববাদী শাসন বাস্তবায়নের কৌশল কি? “১। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আজ্ঞাবহদের নিয়োগ দেয়া, ২। সরকারি কর্মকর্তাদের নানা উপঢৌকন দিয়ে পক্ষে নিয়ে আসা, দক্ষ -নিরপেক্ষ কর্মকর্তাদের সরিয়ে দলীয় লোকদের নিয়োগ, ৩। বিচারবিভাগকে রাজনীতিকিকরণ, দলীয় লোক নিয়োগ, বিচারপতিদের হুমকি ধামকি দেয়া, ৪। পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা, ৫। সুশীল সমাজের একটা অংশকে নিষ্ক্রিয় করে ফেলা, ৬। ঘুষ, প্রলোভন, ভয় দেখিয়ে অধিকাংশ মিডিয়াকে বশে রাখা, বশ না মানলে নানাভাবে তাদের হেনস্থা করা, ৭। গণমাধ্যম দৃশ্যত স্বাধীন থাকলেও তারা সেলফ সেন্সরশিপ আরোপ করে, ৮। শক্তির জোরে অনুকূল নানা আইন কানুন প্রণয়ন।” জাতিসংঘ, পশ্চিমা গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালারা, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কিংবা ইউএনএইচসিআর, আন্তর্জাতিক কমিউনিটি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন যারা সকাল-বিকাল গণতন্ত্রের সবক দেয়, সুশাসনের বয়ান দেয়, গণতন্ত্রের অবতার হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে হাজির হয়, মানবাধিকার রক্ষার নামে নিত্য আহাজারি করে ।

    Reply
  8. Md. Shahadat Anwar

    সেনাবাহিনি যডি না তাকে এই এলাকা ১ মাস টিকবেনা, তাডের কারনেই টিকে আছে, আর উনি বলতেছে সেনাবাহিনি সরাতে! আর একটা রংপুরের মানুষ যদি ঢাকায় তাকতে পারে তবে কেনো রাংগামাটি তাকতে পারবেনা? এটা কি আমাদের দেশ না?

    Reply
    • প্রতিক চাকমা

      মি শাহাদাত পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কে আপনার জ্ঞান একদম কম।না জেনে আপনি লাফালাফি করছেন।আশা করি জেনে ,বুঝে মন্তব্য করবেন।(বাঙ্গালিরা যদি না ই থাকতে পারতো তাহলে আজ পাহাড়ে আদিবাসী দের চেয়ে বাঙ্গালীর সংখ্যা বেশি হত না)

      Reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। প্রতিক্রিয়া লেখার সময় লক্ষ্য রাখুন--

  • ১. স্বনামে বাংলায় প্রতিক্রিয়া লিখুন।
  • ২. ইংরেজিতে প্রতিক্রিয়া বা রোমান হরফে লেখা বাংলা প্রতিক্রিয়া গৃহীত হবে না।
  • ৩. প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তিগত আক্রমণ গৃহীত হবে না।

দরকারি ঘর গুলো চিহ্নিত করা হয়েছে—